ইপেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৬

ইপেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৬

 তারুণ্যের শিল্প সরোবর : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৬,

শুক্রবার, ১৯ মার্চ ২০২১





















আদিমতার গোলবাহার

আদিমতার গোলবাহার

 



আদিমতার গোলবাহার

সৌর শাইন


মানব সমাজ থেকে দূর বহু দূরে এই পলায়নপর জীবন! প্রাণবায়ু হাতের মুঠোয় বন্দি। আশঙ্কার ঘোর কাটে না, দুঃস্বপ্নেরা ঢেউ তোলে। খুন ও ক্ষুধার হিশেব কষে জীবন যখন জটিল ধাঁধা তখনও সে বুকের ভেতর বহন করছে এক টুকরো পৈশাচিক হৃদয়, আদিমতার ধর্ষকামি নেশা। এই পাহাড় অরণ্যের গহীন জগতে জড়িয়ে আছে সুহিত মন্ডল। মিশে আছে জড়াজড়ি করে। একখ- মৃত্যু স্মৃতির ভেতর মরে মমি হয়ে আছে। এই বন্য ভুবনে শাল পাতার বুকে বিক্ষিপ্ত শিরা-উপশিরা দেখে সুহিত মন্ডল প্রায়ই বলে, অভিশপ্ত জীবনের গতি পথ বড়ই বেঁকাতেড়া!

বক্ররৈখিক পথ ও পায়ের দাগ একজন আরেক জনের প্রতিপক্ষ না হলেও ওদের দূরত্ব অনেক। চেনাজানা সীমারেখার মধ্যে সাক্ষাত ঘটে বিচিত্র সময় ক্ষণিকের ইচ্ছায়। দু’পক্ষের বোঝাপড়া ততটা সহজ নয়, তবু একদিন জাগতিকভাবে চিনে নেয় পরস্পরকে। সবুজের যে সংসার হালকা বাতাস পেলে খলখলিয়ে হাসে সেখানে সভ্য জগতের মানব সন্তানের পা যুগল একদিন শুকনো পাতার বুক ভেঙে মর্মর ধ্বনি তোলে। মুক্ত আনন্দ এখানে পরম পাওয়া। অরণ্য ও কারার তফাৎ কতটা মধুর তা কেবল সেই ফেরারিই বুঝতে পেরেছে।

শেষ বিকেলের চিহ্ন মিলিয়ে যাবার পরপরই অসুস্থ সুহিতের পেটে ক্ষুধা কামড় বসায়। কয়েকদিনের মরা ক্ষুধাটা আজ জেগে ওঠেছে। চারপাশে তাকিয়ে সে গোলবাহারকে খোঁজে। পুরনো থলে থেকে ছত্রাকজমা কয়েকখ- হরিণের শুকনো মাংস বের করে চিবুতে থাকে। সাথে যোগ করে কাঁচা কলা ও পাহাড়ি মাটি। কয়েকমাস আগের মাংস তেতো লাগছে খানিকটা। শুকানোর সময় যে লবণটুকু মাখিয়ে ছিল, সেটা যেনো উধাও। আহা লবণ, অরণ্যে বড় দুর্লভ বস্তু! কত ঝুঁকি নিয়ে চুরি করতে হয় সমুদ্রপাড়ে চাষীদের ক্ষেত থেকে। জ¦র মাখা জিহ্বায় মাংসের সাথে সাথে কাঁচা কলার স্বাদ মিশে এক বিচ্ছিরি রকম ছোঁয়া এনে দেয়, ভেতর থেকে নাড়ি ভুরি ছিঁড়ে বমি আসতে চায়। তবু সুহিত গলার ভেতরে খাদ্য বস্তু ঠেলে দিতে থাকে, ক্ষুধা দমাতে প্রাণপণ চেষ্টা করে। বাঁশের চোঙা ভরে পানি পান করে। ক্ষুধাবৃত্তির বন্য পথে সুহিতের অনন্য আবিষ্কার টক-মিঠা স্বাদের এক জাতের পাহাড়ি মাটি, যা ওর কাছে পাকা বাঙি ফলের মতো লাগে। তিন কিলোমিটার দূরে দুটো ছোটো পাহাড় আছে, যেখানে পাওয়া যায় এই সুস্বাদু মাটি।

সুহিতের পায়ের ব্যথাটা আজ বেশ কমে এসেছে। শরীরটাও ঝরঝরে লাগছে। গত দিন দশেক আগে শুয়োর শিকারের সময় পাহাড়িদের ছোঁড়া তীর এসে বিঁধে সুহিতের বাঁ পায়ে। পেশির মাংস ছেদ করে তীরের অগ্রভাগটা খানিকটা বেরিয়ে আসে। সুহিত বড় বিপাকে পড়ে তখন। প্রাণ বাঁচিয়ে অতি কষ্টে লুকাতে হয় ঝোপের ভেতর। ধরা পড়লে হয়তো তাকে ওরা জীবন্ত পুড়িয়ে খেত। এই সব বনমানুষদের কাছে সব প্রাণিই খাদ্য স্বরূপ! ঝোপে দীর্ঘ সময় ঘাপটি মেরেছিল, বিপদ কেটে যাবার আভাস পেয়ে সে গুহায় ফেরার পথ ধরে। তীরটা উল্টোভাবে টেনে বের করা ছিল খুবই কষ্টকর, তীরের মুখে সূঁচালো খাঁজগুলো মাংস ছিঁড়ে বের হতে চায়। বার কয়েক চেষ্টায় ব্যর্থ সুহিত নিরুপায় হয়ে মাংস কাঁচি দিয়ে কেটে জীবন উদ্ধার করে। তারপর এক অজানা চিকিৎসায় নিজেকে সমর্পণ করে। কলাগাছের শুকনো বাকল প্যাঁচিয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধে, এতে রক্ত পরা রোধ হয়। আর বাড়তে থাকে ব্যথা, জ¦রসহ গোটা শরীর ব্যথায় গ্রাস করতে সময় লাগে কয়েকঘণ্টা। প্রতিদিনই বনের নানা লতাপাতা চিবিয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে আসছে। বিগত মুমূর্ষু দিনগুলিতে সুহিতের পাশে ছায়ার মতো ছিল গোলবাহার। সাধ্যমত জুগিয়েছে মুখের আহার, যতœ ও সোহাগ। যা সুহিতকে ভীষণ রকম অবাক করেছে। কতটা ভালোবাসা হলে এভাবে পাশে থাকা যায়।

শরীরটা সামান্য সতেজ হলেও, পায়ের ক্ষতটা এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। সেলাইয়ের অভাবে মাংসের ফাটলটা জোড়া লাগেনি, স্পষ্ট দেখা যায় ভেতরটা কাঁচা, টকটকে লাল। ভাগ্য বিড়ম্বিত সুহিতের কাছে এটা রহস্যময় হাসির মতো লাগছে। এই ফাটল আরেকটা দৃশ্যকে চোখের সামনে তোলে ধরছে বার বার, সেটা এক নারীর যোনি, ঠিক এভাবেই ভাঁজ খোলা রঙিন চাকতির মতো ছিলো, যা সুহিতের মগজে আজও লেপ্টে আছে। নির্দয় দৃশ্য, অথচ সুহিতের মনে বেদনার লেশ মাত্র জন্মেনি, জাগেনি দুঃখবোধ কিংবা অনুশোচনা।

চারপাশ অন্ধকার হলে চাঁদের আলো উঁকি দেয় গুহার আঙিনায়। সুহিত গোলবাহারের অপেক্ষায় চারপাশটা লক্ষ্য করে। এক সময় দূর থেকে শিস তরঙ্গে গোলবাহারের অস্তিত্ব বোঝা যায়। একটা বনমোরগ শিকার করে নিয়ে এসেছে।

কাছে আসতেই সুহিত গোলবাহারকে জড়িয়ে চুমু খায়। নিভু নিভু উনুনে শুকনো কাঠ পাতা মেলে ধরে। আগুন উসকে এলে মোরগটা সেখানে ধরে। পোড়া মাংস খেতে খেতে সুহিত বার বার কামার্ত হয়ে তাকায় গোলবাহারের দিকে। গোলবাহার নিশ্চুপ ভঙ্গিতে গোলগাল হয়ে বসে আছে পাশে। রাত বাড়তে বাড়তে জমানো তেষ্টা উথলে জাগে সুহিতের শরীরে। চুমু খেতে খেতে বলে, বউ ব্যাপার কী? আজ কি একটু বেশি খেলে নাকি? মুখে মাছের গন্ধ পাচ্ছি। আমার কথা কি মনে পড়ল না? আগামী পূর্ণিমাতেই আমরা আবার সাগরপাড়ে যাইবো। মাছ ধরার মজবা জমাবো। হা হা হা..

সুহিতের একচেটিয়া কথায় নিরুত্তর গোলবাহার, নিজের মাটিমাখা শীতল শরীরটা নিস্তেজ ভঙ্গিতে ছেড়ে দেয়। কামনার শিখা জ্বেলে সুহিত শরীর জুড়ে পেঁচিয়ে নেয় গোলবাহারকে। হাতের ছোঁয়া গোলবাহারের শরীরে ঢেউ খেলে যায়, একটু একটু খোলস উপড়ে নেয় সুহিতের নখের আঁচড়। ফোঁস ফোঁস নিশ্বাসের উঠানামা ও ঘাম ঝরা পাইথন প্রেম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।

সুহিত হাতড়ে খুঁজে গোলবাহারের যোনি, কিছুটা সময় আঙুল নাড়াচাড়া করে ভেজা পথে ঠেলে দেয় পুরুষাঙ্গ। আঁতকে ওঠা গোলবাহার ছুটে যেতে পারে না, বরং সুহিতকে প্যাঁচিয়ে রাখে নিরুপায় হয়ে। ঝড়ো রাতের দুঃস্বপ্ন মনে উথলে ওঠে। কাঁচাদিনের এক অপরিণত সংসার এই ভুবনে কেমন করে গড়ে ওঠল?

খুনি পরিচয়ের এই আত্মগোপন যে মৃত্যু অবধি থাকবে তা সুহিত বুঝে নিয়েছে। দূরের ঐ বটগাছে ঝুলে থাকা শত শত ঝুরের মতো চোখের সামনে দোল খাচ্ছে ফাঁসির রশি। প্রতিকূলতার গোলকধাঁধায় এই বন্য ঐশ^র্য ও পাহাড়ের বুকে ক্ষতময় গুহাকে সবচেয়ে বড় আপন ভাবে সে। বুনো জীবন মানে মৃত্যুর পাড় ঘেঁষে চলা, তবু সে এখানে বীরত্ব ও রাজত্ব কায়েম করে নিয়েছে। আর একাকিত্বের দরিয়ায় একমাত্র সাথী গোলবাহার।

বছর পাঁচেক আগে, এক মৃত্যু খেলার রাতে সুহিতের সাথে গোলবাহারের পরিচয়। ঝড়ো বাতাসের ভেতর জেল পালানো পথিক তখন ছুটছে অজানা গন্তব্যে। ছুটন্ত পথে সে এক পঙ্গু ভিক্ষুকের মাথা ফাটায় কয়েদি পোশাক বদলে নেবার উদ্দেশ্যে। ভিক্ষুক সোজা কথায় দিতে চায়নি, তাই লাঠির আঘাতে অচেতন করে শরীর থেকে কেড়ে নেয় একটা লুঙ্গি ও ছেঁড়া শার্ট! উলঙ্গ ভিক্ষুককে ঠেলে রোডের পাশে গাড়ির আড়ালে রেখে ছুটতে থাকে। শহরের শেষ প্রান্তে এসে পায় নির্জন সমুদ্র তটে। উত্তাল সমুদ্রে যে সাইক্লোন জেগেছে সুহিত তা জানতো না। হঠাৎ আবহাওয়া অধিদপ্তরের মাইকিং কানে আসে, বুঝতে পারে দশ নম্বর বিপদ সংকেত চলছে। উপায় না পেয়ে সুহিত ছুটতে থাকে পুবের পাহাড়ের দিকে। ততক্ষণে সাগরের বিক্ষুব্ধ পানি ছুটে এসেছে পাড়ে। ঢেউয়ের উচ্চতা বেড়ে উঠেছে। কিছু বুঝতে পারার আগেই সুহিতকে ভাসিয়ে নিয়ে পাহাড়ের গায়ে ঠেঁকায়। অনেক কষ্টে সে একটার পর একটা গাছ জড়িয়ে ধরে। হিং¯্র ঢেউয়ের আঘাতে হঠাৎ হাত আগলা করে দেয়, ঢেউ তবু সুহিতকে ছিনিয়ে নিতে পারে না। বুঝতে পারে গাছের ফাঁকে বা কোথাও একটা পা আটকা পড়েছে। প্রকৃতির আশির্বাদে বেঁচে যায় সুহিত, প্রচ- লড়াই করে আবার জড়িয়ে ধরে গাছটা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবে জড়িয়ে থেকে টিকিয়ে রাখে প্রাণবায়ু। পরনের লুঙ্গিটা নিমেষে উধাও হয়ে যায়। পরদিন ভোরে ঝড়ের তেজ কমে আসে, কিন্তু পানি থৈ থৈ করছে চারপাশে। এক সময় সুহিত বুঝতে পারে যে আকাশমণি গাছটি ধরে আছে সেখানে গাছের সাথে সে এক বিশাল অজগরকেও জড়িয়ে রেখেছে। তার একটা পা আটকে আছে অজগরের শরীর ও গাছের প্যাঁচের মাঝখানে। এই আটকে থাকাটাই ওর শরীরকে ধরে রেখেছে। প্রথমে সুহিত ভয় পেয়ে কাঁপতে থাকলেও, এক সময় অজগরটার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে নিশ্চল ভঙ্গি ও বেঁচে থাকার আকুতি। ঝড়ো হাওয়ার সাথে পানির ¯্রােত অপ্রতিরুদ্ধ হয়ে আছড়ে পড়ছে। মৃত্যু যে কতটা কাছে এসে দাঁড়িয়েছে তা সহজে দেখতে পায় সে। বেলা দুপুর হতেই পানি নামতে শুরু করে তুমুল বেগে। সুহিত গাছটাকে শক্ত করে জড়িয়ে রাখ্,ে হঠাৎ ওর মনে হয় কেউ ডান হাত ও শরীর সুদ্ধ টেনে নিয়ে যাচ্ছে স্রোতের পেছনে। হাতের দিকে তাকাতেই সুহিত দেখতে পায় ওটা আরেকটা অজগর, আকারে ছোটো, শরীরের অর্ধেক অংশ পানির সাথে চলে যাচ্ছে, বাকি শরীরটুকু সুহিতকে পেঁচিয়ে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সুহিত নিজেকে রক্ষা করার জন্য জাপটে ধরে গাছ, আর ডান হাতে খাবলে ধরে অজগরটাকে। কোনোক্রমে পানির ¯্রােত থেকে সাপটাকে টেনে আনে। কাছে আসতেই অজগরটা সাধ্যমতো সুহিতকেসহ গাছটা জড়িয়ে ধরে। গোটা দিন ও রাত পেরিয়ে আবার সূর্যোদয় হয়। ক্ষুধার্ত মৃত প্রায় সুহিত দেখে পানি অনেক দূর নেমে গেছে। নিজেকে দেখতে পায় মাটি থেকে বিশ-পঁচিশ ফুট উপরে আকাশমণির মগডালে। দুটো অজগর সাপ তার পাশেই আছে। সুহিতের আটকে থাকা পা বার বার টেনেও বের করতে পারে না। কি কঠোর ভঙ্গিতে গাছটাতে লেপ্টে আছে অজগরটা, কোনো খোঁজই নেই। জোর জবরদস্তি চলতে থাকে, ছোটো অজগরটা খানিক সরে গিয়ে সুহিতকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচার উপায় করে দেয়। একটা সময় সুহিত বুঝতে পারে বিশাল অজগরটা আসলে মৃত, মারা পড়েছে হয়তো ঝড়ের রাতেই। আর মৃতদেহ ও গাছের প্যাঁচে আটকে আছে সুহিতের পা। বহুক্ষণ টানাটানির পর হঠাৎ পা বেরিয়ে আসে ও মুহূর্তে কাঁদাজলে লুটিয়ে পড়ে সে, সাথে ছোটো অজগরটাও। এই সাপটা আকারে আট-নয় ফুটের মতো হবে। অবুঝের মতো সাপটা সুহিতকে আশ্রয় ভেবে আবারও জড়িয়ে ধরে। এবার আর সহ্য করতে পারে না সে, ভয়ে পঞ্চ ইন্দ্রিয় নিশ্চুপ হয়ে আসে। জ্ঞান ফেরার পর দেখতে পায় সাপটা ওর কাছে কু-ুলি পাকিয়ে বসে আছে। সুহিতের মনে পড়তে শুরু করে জেল পালানো স্মৃতি। তখনই সে ছেঁড়া শার্ট কোমরে প্যাঁচিয়ে ছুটতে শুরু করে পাহাড়ের ওপাশে। সাথে ছুটতে থাকে সাপটাও। কিছুদূর যাবার পর সুহিত থমকে দাঁড়ায়, অজগরটা এভাবে পিছু নেবার কারণ কী? করুণ চাহনিতে ফুটে ওঠে আকুতি। নির্দয় সুহিতের মাঝে মায়া জাগে। বুঝতে পারে মা হারা এই জীবটা এখন তাকেই আপন ভাবছে। অজগর নির্বিষ তাই ভয় অনেকটা স্তিমিত হয়ে আসে। সেদিন থেকে দু’টি প্রাণিই চলতে আরম্ভ করে অজানা অরণ্যে।

দিন কুড়ি পরে সুহিত পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে, পায়ে ব্যথাটার অস্তিত্ব আর থাকে না। শরীরে ফিরে পায় পুরনো তেজ। জীবন ও স্পর্শের সঙ্গী গোলবাহারকে নিয়ে আগের মতো দিন কাটছে। দুপুর কিংবা বিকেলের দিকে ওরা শিকারে বের হয়। বন্য ছাগল, হরিণ ও শুয়োর ওদের প্রধান টার্গেট। যে পথ দিয়ে বন্য প্রাণিরা দল বেঁধে যায়, বল্লম হাতে সেখানে হামলা করে সুহিত। এই বল্লমগুলো সে শাল গাছের ডাল সূচালো করে তৈরি করেছে। গোলবাহারের শিকার কৌশল ভিন্নরকম, গরমের সময় যেসব গাছের ছায়ায় বন্য প্রাণির পাল এসে বিশ্রাম নেয়, কিংবা জলাশয়-ঝর্ণার ধারে পানি পান করতে আসে সেসব স্থানে গোলবাহার ঘাপটি মেরে বসে থাকে। শিকার কাছে এলে সুযোগ মতো প্যাঁচিয়ে ধরে, শ^াসনালী বরাবর প্রচ-রকম চাপ দিতে থাকে, আর একটু একটু শিকারের শরীর গিলতে থাকে। এছাড়া চল্লিশ-পঁতাল্লিশ কিলোমিটার দূরে সমুদ্র পাড়েও ওরা ছুটে যায় মাছের সন্ধানে।

প্রতিদিনই বিকেল ঘনিয়ে এলে সুহিত ও গোলবাহার শিকারে বেরিয়ে পড়ে। যেসব পাহাড়ে হাতি থাকে সুহিত সেদিকে ভুলেও যেতে চায় না। পাহাড়ি হাতি ভীষণ রকম রগচটা! ওদের অঞ্চলে কারোর উপস্থিতি সহ্য করে না। হাতির হিং¯্রতার কবলে একবার এক পাহাড়ি যুবকের করুণ মৃত্যু হয় সুহিতের চোখের সামনে।



সূর্য পশ্চিমে হেলে পড়েছে। একদল শেয়াল এসে ভিড় করে সুহিতের সামনে। অতি আগ্রহ নিয়ে গোলবাহারকে দেখতে থাকে, যেনো এখুনি হামলে পড়বে। সুহিত বল্লম দেখিয়ে চেঁচাতেই শেয়ালগুলো পালায়। সবকিছু ভুলে একমনে খুব ধীরে এঁকেবেঁকে চলতে থাকে গোলবাহার, সুহিত বল্লমটা কাঁধে নিয়ে হাঁটে। কয়েকটা পাহাড় ডিঙিয়ে ওরা ক্লান্তির নিশ^াস ছাড়তে থাকে। মাথার উপর ঝাঁকে ঝাঁকে ঈগলের আনাগোনা। দীর্ঘ সময় ধরে চিৎকার চেঁচামেচিতে মাতিয়ে রেখেছে গোটা এলাকা। হঠাৎ উপর থেকে বিশাল এক ঈগল ওদের দিকে তেড়ে আসে। বিপদ বুঝতে পেরেই সুহিত বল্লম উঁচিয়ে আঘাত করে, আর তৎক্ষণাৎ ঈগলটা বিঁধে বল্লমের অগ্রভাগে। অনাকাক্সিক্ষত এই ঘটনায় চমকে ওঠে গোলবাহার। কয়েকগুণ উচ্চ শব্দে চিৎকার করে অন্য ঈগলগুলো, তবে একজন সঙ্গীর করুণ পরিণতি দেখে ভয়ে আর এগিয়ে আসতে পারে না, বরং অন্যদিকে উড়তে থাকে। সুহিত নিথর ঈগলটা গোলবাহারের দিকে ছুঁড়ে দেয়। গোলবাহার ক্ষিপ্ত গতিতে ঈগলটাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে প্যাঁচিয়ে ধরে। চির শত্রুকে পেয়ে সে যেনো রোষানল ঢালছে।

সুহিত বলে, বউ এমন করলে চলবে? ওটাকে তো শায়েস্তা করেই তোমার কাছে পাঠালাম, আর নতুন করে কী মারবে?

ঈগলটা গিলে গোলাবাহার সেই চির চেনা ভঙ্গিতে এগোতে থাকে।

সুহিত মুগ্ধ হয়ে গোলবাহারের ছুটে চলা দেখে। কি আশ্চর্য রূপ! শরীর জুড়ে বিচিত্র রঙিন নকশা! হলুদ, ধূসর, সাদা, কালো, সবুজ নানা রঙের সমাহার! উনিশ-বিশ ফুটের বিশাল দেহের মাঝে রিংয়ের ভেতর ডায়ম-ের মতো ছোপ চিত্র, আর মাঝখানে ধূসর রঙের প্রলেপ। ছোপগুলোর আশপাশে ফোঁটা ফোঁটা কালচে দাগ!

সুহিত নিজেকে মাঝে মধ্যে প্রশ্ন করে বসে, কেনো তুই মানুষ হয়ে জন্মালি? মানুষ হয়েই যদি জন্মাবি, তবে মনের ভেতর কেন এক অমানুষের আত্মা বসবাস করে? মনুষ্য সমাজ কেন তোকে ঠেলে দিলো অপকর্মের পথে? কেনইবা পিতা-মাতা বলে কিছু নেই তোর ভাগ্যে? আসলে তোর মানুষ হওয়াটাই ভুল, তার চেয়ে সে যদি রেটিকুলেটেড পাইথন হইতি, তাহলে এক সুখের সংসার সাজাতে পারতি গোলবাহারের সাথে। প্রেমের সুখ তরঙ্গে শরীর জুড়ে পরিণত বাণ ডাকতে পারতি।

এসব আত্মকথনে সুহিত বিশ্রী বিকৃতভাবে হাসে, নিজের ভেতর নিজেকে বিদ্রুপ করে, নিজেকে অপদস্ত করে কুরুচিপূর্ণ আনন্দ লাভ করে। অথচ, সুহিত জন্মেছিল নি®পাপ শিশু হয়ে, এই পুঁজিবাদী ভোগবাদী কুৎসিত পৃথিবী তার উপর চাপিয়ে দিয়েছে পাপাচারের বোজা, মনুষ্যত্বহীনতার তকমা! কে সুহিতের মা? কে সুহিতের বাবা? কেনোই বা ওরা সুহিতের সাথে এমন আচরণ করল? কী উত্তর দেবে সভ্য মানব সমাজ? কোনো উত্তর নেই। বরং আরো অজ¯্র সুহিত নির্মাণের পথ উন্মুক্ত হয়ে আছে।

স্মৃতির কোটরে থাকা কিং কোবরার দংশন থেকে মুক্তি পেতে সুহিত ভিন্ন কিছু মনের ভেতর ঠাঁই দিতে থাকে। প্রথম নারী মাংস খুবলে খাবার স্মৃতি, যেখানে পুঞ্জিভূত নির্দয় হবার সীমাহীন নেশা। কখনো কখনো স্বেচ্ছায় নিজেকে নিয়ে অবাক হতে চায় সুহিত, ভাবতে চায় কি সুন্দর কুৎসিত বন্য জীবনে অভ্যস্ত সে। বার বার মনে করতে চায় গোলবাহারের সাথে সেই প্রথম সঙ্গমের কথা। সাইক্লোনের হাত থেকে বেঁচে ফেরার পর সুহিত অনেকদিন নানা জায়গায় ঘুরেফিরে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটায়। তবু গোলবাহার সুহিতকে ছেড়ে কোথাও যায়নি। সারাদিন এদিক-সেদিক ছুটে বেড়ালেও, সন্ধ্যের পর ঠিক সুহিতের কাছে ফিরে আসে। এক সময় ওরা একটা গুহা খুঁজে পায়, যে জায়গাটা হয়ে ওঠে শীত কিংবা বৃষ্টিতে আরামদায়ক আশ্রয়। দেড়-দু বছর পর গোলবাহার সুহিতকে অবাক করে দিয়ে বেশ কিছু ডিম উপহার দেয়। যখন গোলবাহার শরীর থেকে ডিম বের করতে থাকে, তখন সুহিতের চোখ আটকে যায় গোলবাহারের প্রস্ফুটিত যোনিতে, পরিণত রূপে উজ্জ্বল! চিরকাল হিং¯্র কামনার ক্ষুধায় জর্জরিত সুহিত জীবনের এই শেষ প্রান্তে এসে নতুন সুখের পথ পায়। তারপর? শরীর উন্মত্ত হয় এক অচেনা জৈবিক সঙ্গমে। এদিকে গোলবাহার বছরে প্রতিবারই গুহার এক কোণায় ডিম পেড়ে তা দিচ্ছে, কিন্তু সে ডিম থেকে কখনো বাচ্চা বের হয়নি। সুহিত প্রায় সময়ই হেসে বলে, বউ, আমি তো তোমার বন্ধ্যা স্বামী, সন্তানের মুখ দেখবা কেমন কইরে? তারচেয়ে বরং, ভাল জ্ঞাতি স্বামী খুঁইজ্জা লেও। অথচ, গোলবাহার অবুঝের মতো কোথায় পালিয়েও যায় না, কোনো পাইথন পুরুষকেও খুঁজতে চায় না। কেবল যেন প্রেম খুঁজে পায় সুহিতের কাছে। এটা কি প্রেম নাকি কৃতজ্ঞতা না ছলনা? সুহিত ঠিক বুঝে না।

প্রায় রাতে ঘুমকালে সুহিতকে আক্রান্ত করে দুঃস্বপ্ন, মৃত্যু বার বার গলা টিপে ধরতে চায়। একখ- কাঁটা মাংস তড়পাতে থাকে চোখের সামনে। উরুর ভাঁজ খুলে কামনার পাপড়ি মেলে ধরা সেই নারীর শরীর হয়ে ওঠে প্রতিশোধ পরায়ণ! আর সুহিত হয়ে ওঠে ক্ষিপ্ত! তার ভেতর জগত সংসারকে ছিন্ন-বিছিন্ন, ক্ষত-বিক্ষত করে দেবার ইচ্ছে জেগে ওঠে। ধর্ষকামিতার প্রবল নেশা পেয়ে বসে। কখনো গোলবাহারকে শিশ্ন কামনা ও নখের আঁচড়ে ক্ষতাক্ত করে। কখনো শিকার করে আনা ছাগল বা হরিণের মৃতদেহ কেটে টুকরো টুকরো করে। আবার কখনো বল্লম হাতে নিয়ে নি®পাপ গাছ-গাছালির উপর নির্দয়ভাবে ধ্বংসলীলা চালায়।

পরিচয় বিহীন শিশু সুহিত বেড়ে ওঠেছিল নদী বন্দরের জনসমাগমের ভেতর। তাকে ¯েœহ দিয়ে ঠাঁই দিয়েছিল এক নিঃসন্তান উপজাতি বুড়ি। সে বুড়িই মৃত স্বামির নামে সুহিতের নাম রাখে। বুড়ির ছিল সামান্য আয়ের পথ, শহুরে বাসা-বাড়িতে চাঁপা শুটকি বিক্রি করা। বুড়ি যখন মারা যায় তখন সুহিতের বয়স আট। আবার সে বেড়িয়ে পড়ে পথে। এবার ঠাঁই পায় বন্দরের হাবিবুল্লা নামে এক মাছ ব্যবসায়ীর ঘরে। সুত্রাধারা ঘাটে হাবিবুল্লা নদীর পাড়ে সামান্য বাঁশ-বেতের ঘর বানিয়ে থাকে। তিনটা বিয়ে করলেও শেষ পর্যন্ত কোনো বউ থাকেনি। হাবিবুল্লার কাজের সহকারি হয়ে সুহিত বাড়তে থাকে। কারণে অকারণে ধমক ও গালমন্দ খেয়ে সে দিন কাটায়। দিন দিন হাবিবুল্লার কাজের ধরন পাল্টাতে থাকে, সে সুবাদে সুহিত শিখতে পারে কীভাবে ইলিশের পেটের ভেতর ইয়াবা ঢুকিয়ে পাচার করতে হয়। যখন হাবিবুল্লা কোনো মেয়েকে নিয়ে রাতে ঘরে আসতো, বালক সুহিতকে ঘরের বাইরে ঘুমাতে হতো। এভাবে ক্ষোভে দুঃখে সুহিত এগোয়।

একবার হাবিবুল্লার সাথে বিবাদ বাঁধিয়ে সুহিতচলে যায় বন্দরে কুলিগিরি করতে। সেখানে কুলিদের বিক্ষিপ্ত বিশ্রী আচরণ সয়ে একটা কৈশোর সে পেরিয়েছে, আবার ফিরে এসেছে হাবিবুল্লার ঢেরায়। লক্ষ্যহীন উল্কাপি-ের মত সুহিতের এখানে-সেখানে ক্ষুধার্ত বিচরণ। তারপর বিপথের চক্র এসে ঘুরতে থাকে তাস খেলার মাঠ ও মিনতি নামে এক নারীর শরীরে। রতন কুলির বিশ-বাইশ বছরের মেয়ে মিনতির বেশ্যাবৃত্তির কথা কলোনির সবাই জানত। কিশোর সুহিতও ডুবে কামের ঘোরে। মিনতির শরীর আস্বাদনের নেশা সুহিতকে আবেগী প্রেমিক রূপে আবিভূর্ত করে।

একরাতে হাবিবুল্লা মিনতিকে বিয়ে করে ঘরে আনে। এতে সুহিত মনে মনে ভীষণ চটে গেলেও, মিনতির শরীর কাছে পাবার সুযোগ চিন্তা তাকে আনন্দিত করে। হাবিবুল্লার অগোচরে সুহিত মিনতির শরীরে খুঁজে সুখের ধারা। একদিন হাবিবুল্লা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, তারপর থেকে তার কোনো খোঁজ মেলেনি।

মিনতি ও সুহিত মেতে ওঠে দেহজ লীলায়। ওদের জৈবিক সম্পর্কের খবর সূত্রাধারা ঘাটের লোকজনের মুখে মুখে ছড়াতে থাকে। সব এড়িয়ে বয়সের ব্যবধানকে তোয়াক্কা না করে ওরা একদিন ঘর বাঁধে সুখের প্রতিজ্ঞায়। কয়েক বছর কেটে গেলেও কিন্তু মিনতির কোলে কোনো সন্তান আসেনি। তবে কামুক সুহিত স্বভাব আচরণ পাল্টাতে থাকে। তার মগজ ডুবে থাকে তাস খেলা ও বহুগামিতায়। মিনতিকে বাধ্য করে বাপের কাছ থেকে টাকা এনে দিতে। টাকা না পেলে শরীর কামড়ে ক্ষত-বিক্ষত করে তোলে। রতন কুলির মৃত্যুর পর সুহিতের বাজে আচরণ আরো বাড়তে থাকে। জুয়া খেলা ও নেশা দ্রব্যের রসদ যোগাতে মিনতিকে আবারো বাধ্য করে পুরনো বিপথে যেতে। নিরুপায় পতিভক্ত নারী মন খদ্দেরের সাধ মিটিয়ে যা পায় তাই তুলে দেয় সুহিতের হাতে, তবু রক্ষা পাওয়া দু®কর! এই অসহ্য নরক থেকে বাঁচার চিন্তা করে মিনতি, অবলম্বনযোগ্য পুরুষ খুঁজতে থাকে। ফেরিঘাটে বসে থাকা বৃদ্ধ পঙ্গু ভিক্ষুককে বিশ^াসের বশে কথা দেয়, সুহিতের ঘর থেকে পালিয়ে দূরের কোনো শহরে যেতে চায় ওরা। মিনতি ও ভিক্ষুকের ঘন ঘন সাক্ষাত সুহিতের দৃষ্টিগোচর হয়। প্রথমে সন্দেহ হয়, বৃদ্ধটা রতন কুলির আত্মীয় কেউ হয়তো, আর মিনতি সুহিতের চোখে ফাঁকি দিয়ে নিশ্চয়ই বৃদ্ধের কাছে টাকা জমাচ্ছে। ফেরিঘাটের বৃদ্ধকে প্রাণ হরণের ভয় দেখাতেই এক এক করে সব উগড়ে দেয়।

রাতে প্রকাশ পায় সুহিতের নির্দয় রগচটা দুর্ব্যহার। থাপ্পড়ের আঘাতে মিনতির চোখে রক্ত জমে যায়। নিরুপায় মিনতি বিদ্রোহিনী হয়ে রান্না ঘর থেকে পেঁয়াজ কাটার ছুরি সুহিতকে ছুড়ে মারে। বিপরীত চক্রে চকচকে ছুরিটা সুহিতের হাতে ওঠে। মনুষ্যত্বের পরাজয় ঘটিয়ে সুহিতের মাঝে দেখা দেয় পৈশাচিক রূপ! মিনতির শরীর ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়। অবলা নারীর যোনি ও স্তন কেটে ঘরের মেঝেতে ছুড়ে ফেলে। রক্তাক্ত যোনির মাংস তখন গলা কাটা পাখির মত তড়পাতে থাকে, যে দৃশ্য এখনও সুহিতের চোখে দেখা দেয়।

টানা পাঁচ বছর জেলে কাটালেও আদালতের রায় তখনও আসেনি। সুহিত জেলের ভেতর দু’ধরনের দুঃস্বপ্ন দেখত, জজ রায় পাঠ করছেন, নৃশংসভাবে স্ত্রী খুনের অপরাধে সুহিত মন্ডলকে মৃত্যুদ- কিংবা যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়া হলো! ঘুমের ঘোরে সুহিত আৎকে ওঠে! আবার কখনো সবকিছু ভুলে যেতে নিজেকে অসুর ভাবতে চায়, জগতের সকল অপকর্ম করার ইচ্ছে জেগে ওঠে। জেগে ওঠে নিজের ভেতরে তাড়িত দুর্দমনীয় কামাসক্ত রূপ! অসুরের মতো দাঁতে দাঁত এঁটে, গ্রীবার রগ ফুলিয়ে, দু’চোখ বিস্ফোরিত করে ফেটে পড়ে বীর্যস্খলনের চিৎকারে।

একসময় জেল পালানোর চিন্তা আসে। অসুস্থ হবার ভান করে হাসপাতালে যাবার সুযোগ হয়, আর জরুরি বিভাগে ভিড়ের মধ্য থেকে আচমকা দৌড়! তারপর তো সাইক্লোনের কবল! গোলবাহারের সাথে আজ অবধি সংসার!

গভীর পাবর্ত্য অরণ্যে এসে সুহিত ভুলতে বসেছে সভ্য জগতের জামা। বন্য প্রাণির শুকনো চামড়া এখানে পরিধেয়। চুল-দাঁড়ি-গোঁফ অনবরত বৃদ্ধি পেয়ে এক সময় জট পাকিয়ে একাকার হয়ে ওঠেছে। কাঁচা কিংবা পুড়ানো প্রাণিজ আমিষ ভক্ষণে শরীর উত্তেজনায় তপ্ত হয়ে উঠে আর রাতের পর রাত সুহিত জ¦লন্ত কামনার শিখা নিবেদন করে গোলবাহারের কাছে। শীতল প্রাণির শরীর চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে তোলে, কখনো দাঁত বসিয়ে কামড়ে দিতে থাকে। প্রথম দিকে নারী মাংসের ক্ষুধা যখন সুহিতের মাথায় আসত, তখন নানা ভাবনা বিচ্ছিন্ন বলয়ে ঘুরত। কখনো ভাবত কোনো পাহাড়ি নারীকে তোলে এনে দিনের পর দিন ধর্ষণ করবে, মেটাবে মনের জ¦ালা। সুহিতের সে ইচ্ছে বার বার মাটি হয়ে যায়, যখন মনে পড়ে পাহাড়ি নারী-পুরুষ সবাই তীর চালনায় পটু। ধরা পড়লে সর্বনাশ! ওদের আচরণ বড় নির্মম! ভিন্ন গোত্রের যে কাউকে ওরা শত্রু ভাবে, ধরতে পারলে পুড়িয়ে খায়। কেবল বেঁচে থাকার নিমিত্তে সুহিত নিজেকে গুটিয়ে নেয়, গোলবাহারকে কাছে টানে।

গত কয়েকদিন ধরে গোলবাহার কিছুই খাচ্ছে না। সুহিত চেষ্টা করেও সফল হতে পারেনি। এই আচরণ ওর মধ্যে আগেও দেখা গিয়েছে। গোলবাহার না খেয়ে থাকলেও তো সুহিত নিজের কামনাকে দমাতে পারে না। রাতে যখন কামার্ত হয়ে চুমু দিতে থাকে, তখন নখের আঁচড় বসাতে থাকে শরীর জুড়ে, আঁচড়ে ওঠে আসে ছেঁড়া ছেঁড়া খোলস, খোলসের নিচে সুহিত খোঁজ পায় নয়া চামড়ার। বুঝতে পারে, এটা আবারো ডিম প্রসবের লক্ষণ! গোলবাহারের ক্ষুধা মেটাতে ভাল শুয়োর শিকার করতে হবে! ভাল শুয়োরের সন্ধান পাওয়া যায় দক্ষিণের দিকে। ভাবতে থাকে কালকেই সেদিকে যাওয়া চাই, মাথার ভেতর যখন এই ভাবনা ঘুরতে থাকে. তখন হঠাৎ সুহিতের মনে পড়ে সে এখন সঙ্গমে লিপ্ত! ভাবনা থেকে সরে এসে হঠাৎ সুহিত দ্বিগুণ তেজে জ¦লে ওঠে, মুখে অকথ্য ভাষায় গালি উচ্চারণ করতে করতে গোলবাহারের শরীরে নখের আঁচড় বসায়। আঁচড়ে আঁচড়ে ক্ষত বিক্ষত হয়ে কাতরাতে থাকে নিরুপায় গোলবাহার।

শনঝোপের ভেতর শালগাছের ডালের সূঁচালো বল্লম ছুঁড়ে মারতেই নাদুসনুদুস শুয়োরটা লুটিয়ে পড়ে। সুহিত কাছে গিয়ে বল্লমটা টেনে বের করে। গোলবাহার আপন কায়দায় একটু একটু করে শুয়োরটা গিলতে থাকে। প্রায়ই বড় ধরনের শিকার খেয়ে গোলবাহার বিশাল পেট নিয়ে চলতে পারে না, দু’তিনদিন সেখানেই পড়ে থাকে। আজকেও তাই হয়েছে, শনঝোপে নিস্তব্ধ শুয়ে আছে। সুহিত অনেক বলে কয়েও গোলবাহারকে টলাতে পারলো না, গুহায় ফিরে আসতে হলো একা।

কিন্তু পরদিন সেখানে গিয়ে দেখতে পায় দাউ দাউ আগুন জ¦লছে। শনঝোপ ছাই হয়ে যাচ্ছে। এসব যে পাহাড়িদের কাজ সুহিত বুঝতে পারে, ঝোপ সাফ করে জুম চাষের ফন্দি। চারপাশ নিরাপদ কি না, তা একবার আঁচ করে এগিয়ে যায় সুহিত। ছাইয়ের ভেতর হাঁফাচ্ছে গোলবাহার! শরীর পুড়ে একাকার, লেজ ধরে টানতেই চামড়া ওঠে আসতে লাগলো। শেষে গাছের মোটা ডালের সাথে বেঁধে অনেক কষ্টে ঝর্ণার কাছে নিয়ে যায়। কাঁদাজলে গোলবাহারকে নামিয়ে শরীর ডুবিয়ে রাখে অনেকক্ষণ! তারপর টেনে আনে গুহায়। ফোসকা পড়া গোটা শরীর হরিণের চামড়া দিয়ে প্যাঁচিয়ে রাখে। সুহিতের মনে আশঙ্কা জন্মে গোলবাহার বাঁচবে না। কিছুদিন পর সে আশঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণ করে ধীরে ধীরে গোলবাহার সুস্থ হয়। সুহিতের শরীর ও মনে ভীষণ যন্ত্রণা ধরিয়ে দিয়েছিল এই অসুস্থতা, কামক্ষুধার নেশা আসক্তি মানে না বারণ! মাটিতে শুয়ে অস্থিরতায় কাতরানো ছিল রাতের নিমজ্জতা। 

আবার যখন গোলবাহার স্বাভাবিকতায় ফিরে আসে সুহিত ডুবে যায় দেহজ খেলায়। কত শতবার সে আনন্দিত হয়েছে নিজেকে গুহামানব ভেবে ও পাইথন জগতের সাথে মানব শ্রেণির যৌনতার সেতুবন্ধন গড়তে পেরে। এটাকে সে নিজের ভাগ্যে সৌভাগ্য স্বরূপ বিবেচনা করে, জেলের ভেতর ফাঁসির দুঃস্বপ্ন দেখে পচে মরার চেয়ে এই জীবন বড়ই মধুর। এখানেও জৈবিতার সাধ মেটানোর পথ রয়েছে সে স্বাদ নারী ভক্ষণের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।

সুহিত কখনো কখনো নিরবে ভাবে, সে-ই প্রথম এই পৃথিবীর বুকে এমন দুর্লভ নিকৃষ্টতম ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, নয়তো কখনো কি কোনো মানব সন্তান সর্পশ্রেণির সাথে এরূপ নগ্নসুধার পরিচয় দিতে পেরেছে? আবার ভাবে, হয়তো তার আগেও কোনো না কোনো পূর্ব পুরুষ নিশ্চয় এই ভাবেই কামনায় ডুবে ছিলে। নয়তো এই ভাবনা এই চিন্তা এই ক্ষুধা কেমন করে সুহিতের মগজকে বশ করল?

সবই প্রকৃতির নিয়ামক ও রহস্যে ভরা খেলা, যে খেলার অন্ত নেই। এই রহস্য সুহিত বুঝে না, জানে না, মানে না। কখনো কখনো প্রকৃতির বোকামি দেখে সুহিত মনে মনে বিদ্রুপ ভরা দৃষ্টিতে হাসে আর প্রশ্ন তুলে প্রকৃতি কি এই জগৎকে নিরপেক্ষভাবে বিচার করে? নয়তো মিনতির খ-িত মাংসের আর্তনাদের ফল কোথায় গেল? কোথায় গেল ফাঁসির রশি, কোথায় গেল যাজ্জীবন কারাভোগের শাস্তি? গোলবাহারের সাথে সঙ্গম শেষে প্রায় সময়ই সুহিত এসব ভেবে উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। ফেরারি জীবনে সে যে বন্য জৈবিকতার পৈশাচিক সুখ অন্বেষণ করে নিয়েছে, এর কৃতিত্ব কেবলই তার।  

বর্ষা আসতেই গোলবাহারের আচরণে পরিবর্তন আসে, সুহিতের দেহজ দুনিয়া থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চায়। কামনার রসনা বিহীন সবকিছুই সুহিতের কাছে বিষাদ ঠেকে। এদিকে গোলবাহার একটা একটা ডিম প্রসব করে গুহার কোণ বোঝাই করতে থাকে। একটা-দুটো নয় ষাট-পঁয়ষট্টিটা ডিম। সে ডিমের উপর কু-ুলি পাকিয়ে বসে থেকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তা দেয়। সুহিত বার বার ডেকেও কাছে টানতে পারে না। কয়েকদিন কেটে যায়, অনাহারে থেকে একমনে গোলবাহার ডিম ফোটানোর ধ্যানে বিভোর।

কাম আসক্তির ধ্যানে মগ্ন সুহিত গোলবাহারের এই আচরণ সহ্য করতে পারে না, রেগে আগুন হয়ে উঠে। টেনে হিঁচড়ে, গোটা কয়েকটা ডিম ভেঙে কাছে টেনে আনে কামের বাসনায়। চুপচাপ সহ্যের পরিচয় দেয় গোলবাহার। দিন কয়েক কেটে যায়, প্রতিনিয়ত চলতে থাকে অনিচ্ছার সাথে দেহজ সার্থের লড়াই। সুহিত এই বিপত্তি আর মানতে পারে না, গোলবাহার যে কেবলই তার ভোগ্যবস্তু, সেখানে শুধুই তার শিশ্নতন্ত্রের রাজত্ব! 

গোলবাহারের দুর্বলতা এই অকেজো ডিমগুলোর প্রতি, মাতৃত্বের আকাক্সক্ষা। সুহিত বুঝতে পারে এই জঞ্জাল সাফ না অবধি গোলবাহারের একরোখা আচরণ দূর হবে না। ডিমগুলো ধ্বংস করতে পারলে, নারীমনে আর কামের প্রতি অনিচ্ছা দেখানোর সাধ্য থাকবে না।

কুড়ি দিনের অনাহারে থাকা গোলবাহারকে অনেক চেষ্টা করেও কিছু খাওয়ানো যায়নি। সুহিত রেগে খুন! হামলে পড়ে গোলাবাহারের উপর, সংকুচিত যোনিকে যতটা সম্ভব বন্যনখের আঘাতে টেনে কেটে প্রসারিত করে। লেলিহান নিশ^াস নিতে নিতে ঠেসে দেয় রণার্দ্র ক্ষুব্ধ পুরুষাঙ্গ! বোবা আহাজারি নিয়ে যতটা সম্ভব নিজেকে রক্ষা করতে চায় গোলবাহার, সুহিতের পুরুষত্বের কাছে পারে না। নির্বিষ হবার বেদনা বুকে নিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কামনার ক্লান্তি দূর করতে সুহিত নিশ^াস ফেলতে ফেলতে বিরতি দেয়, এক চোঙা পানি গলায় ঢালে। এই সুযোগে গোলবাহার আচমকা সরে গিয়ে ডিমগুলোর উপর বসতে চায়। ক্ষুব্ধ কামার্ত সুহিত চিৎকার করে ওঠে, এক এক করে পায়ের তলায় পিষে ডিমগুলো ভাঙতে থাকে, গুহার মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে। ভাঙা ডিমগুলোকে জড়াজড়ি করে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টায় দিশেহারা গোলবাহার। ক্ষণিক বাদে ব্যর্থ হয়ে সে দূরে কু-ুলি পাঁকিয়ে বসে। কেটে যায় বেশ কিছুক্ষণ, এক সময় ডিমের পিচ্ছিল বিজলে একাকার গোলবাহার সুহিতকে প্যাঁচিয়ে ধরে পরম যতেœ!

আহ্লাদে সুহিত গোলবাহারকে জড়িয়ে ধরে, বউ, আমারে সোহাগ করো বউ, আরো সোহাগ করো...

তন্ময় হয়ে চোখ বুজে সুহিত। গোলবাহার সুহিতের চামড়ার উপর ঘষে গলাগলি করে গোটা শরীরে বিজল মাখিয়ে দেয়। সুহিত গোলাবাহারের পিচ্ছিল শরীরে খোঁজে ফেরে কামমহল যোনির সন্ধান, পায় না। যোনির অবস্থান সুহিতের উরু পেরিয়ে আরো উপরে, সুহিত বুকের উপর থেকে গোলবাহারের লেজ টেনে নামাতে চায়। পাইথন যোনিতে সে মানব শিশ্ন ঠেসে দিতে চায়, ঠিক তখনই গোলবাহার সুহিতকে প্যাঁচিয়ে শ^াসনালী বরাবর প্রাণপণ চেপে ধরে। ক্ষুধার্ত গোলবাহার বহুদিন পর বন্য শুয়োর শিকারের লড়াই করছে। যে শুয়োরকে জন্ম দিয়েছে মানুষের সভ্য বুর্জোয়া বিত্তশালী অপরাধপ্রবণ সমাজ। গোলবাহার শুয়োরটাকে মাথার দিক থেকে গিলতে গিলতে এগোয়...নিমেষে মিশে যেতে থাকে সাইক্লোনের ঝাপ্টা!



বেদের মেয়ে স্বর্ণা

বেদের মেয়ে স্বর্ণা

 



বেদের মেয়ে স্বর্ণা

শহিদুল ইসলাম লিটন


সালমা একাদশ ২য় বর্ষের ছাত্রী। লেখাপড়ায় যেমন ভাল ঠিক তেমনি স্বভাব চরিত্র ও খুব ভাল। দেখতে খুব সুন্দর সে সর্বদা পর্দা পুষিদা বজায় রেখে চলাফেরা করে। পার্শ্ববর্তী গ্রামের ছেলে হৃদয় সালমার সাথে একই কলেজে পড়ে। তার স্বভাব চরিত্র বেশ ভাল নয়। সে সালমাকে বেশ কয়েকবার প্রেমের প্রস্তাব দিলে সালমা তা প্রত্যাখান করে। সালমা একদিন খুব সুন্দরভাবে হৃদয়কে বুঝিয়ে বলে দেখ হৃদয় আমি একজন নারী। একদিন আমাকে কারো না কারো জীবন সঙ্গীনি হতে হবে। প্রেম সবার জীবনে আসে ঠিকই কিন্তু তা অনেক বিচার বিশ্লেষণের বিষয়। তোমাকে আমার পরিবারের সবাই ভালভাবে চিনে বিধায় তারা কোনদিন আমাকে তোমার সাথে বিবাহ দিতে রাজী হবে না। আর আমিও আমার পরিবারের অমতে কোনদিন কাউকে জীবন সঙ্গী করতে পারবো না। এটাই আমার শেষ কথা সুতরাং তোমাকে অনুরোধ করে বলছি-আমাকে তুমি কোনদিন বিরক্ত কর না। হৃদয় সালমার মনের শেষ কথা শোনে মনে মনে চিন্তা করে, সালমা এটা তোমার শেষ কথা হলে কি হবে, আমার হৃদয়ে যে সব সময় তোমার কথা, তোমার কল্পনা, তোমার মায়াবী চেহারার প্রতি”ছবি আমাকে পাগল করে রেখেছে।

আমি জানি আমার হৃদয়ের মূল্য তোমার অন্তরে আন্তরিক ভালবাসার মর্যাদা কোনোদিন পাবে না। কিন্তু প্রতিটি মুহুর্তে তোমাকে কাছে পাওয়ার জন্য আমার হৃৎপিন্ড থেকে যে রক্ত ঝরছে। আমি কি একটি অবাস্তব স্বপ্ন অন্তরে লালন করে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাবো। নির্বোধের মত চিন্তা না করে বরং আমি আরেকদিন শেষবারের মতো সালমার সামনা-সামনি হবো। তাকে বলব- সালমা আমার জীবনের সব ভুলকে পরিহার করে আমি সুন্দর জীবনে ফিরে আসবো। তোমার ভালবাসার পরশে আমি একজন খাঁটি মানুষ হতে চাই। অনুগ্রহ করে আমাকে ফিরিয়ে দিওনা সালমা। সালমা হৃদয়কে বলে দেখ হৃদয় তুমি তো আমাদের গ্রামেরই একজন। হাজার হাজার মানুষের চোখে, হৃদয়ে অংকিত রয়েছে তোমার কু-কর্মের ইতিহাস। গ্রামের প্রতিটি মানুষের সাথে তোমার আমার বসবাস। গ্রামের প্রতিটি মানুষ তোমাকে কতটুকু ভালবাসে তা কি একবার ভেবে দেখেছো। মানুষের অগণিত ঘৃণা আর পাপের কালিমা বহন করে কাটছে তোমার প্রতিটি দিন। যেহেতু এই গ্রাম তোমার আমার জীবনের শিকড়। আমাকে কেন্দ্র করে আমার পরিবারের যে আশা আকাঙ্খা তাদের অবমূল্যায়ন করে আমি কি করে তোমাকে গ্রহণ করবো?

এই গ্রামে তুমি যাদের হৃদয়ে আঘাত করেছো, ঝরিয়েছো চোখের পানি, তুমি কি এতো সহজে পারবে তাদের মুখে হাসি ফুটাতে। আজ তোমার বোধশক্তি জাগ্রত হয়েছে, তুমি সুপথে ফিরে আসতে চাও আমি তোমাকে ধন্যবাদ জানাই। তবে হঠাৎ যদি বনের ভিতর থেকে কোন অজানা ফুল গোলাপের মতো সৌরভ বিলায় তাকে কি সহজে কেউ গোলাপ হিসাবে মেনে নিতে পারবে। তা যে অনেক ভাবনা চিন্তার বিষয়। সালমা মনে মনে বলে আমি তো জানি তোমার অতীত ইতিহাস। পবিত্র প্রেমের জালে আটকে কত মেয়ের সাথে করেছো নিষ্ঠুর আচরণ। সালমার মুখ থেকে এই ধরণের বেদনাদাযক কথা-বার্তা শোনে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে হৃদয়। মনে মনে ভাবে সালমার চিত্ত জয় করা তার পক্ষে সহজে সম্ভব নয়। তাই একদিন সে সালমাকে অপহরণ করে বিবাহ করার সিন্ধান্ত নেয়। পরিকল্পনা মতো কলেজ থেকে ফিরার পথে সে সালমাকে অপহরণ করতে চায়। তিনজন বন্ধু মিলে জোর করে একটি ট্যাক্সিতে তুলতে চাইলে সালমা জোরে চিৎকার দিলে আশপাশ থেকে লোকজন ছুটে আসে।

অপহরণে ব্যর্থ হলে সে সালমাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। সে দৃশ্য অতি কাছ থেকে অবলোকন করে এই গল্পের নায়িকা বেদের মেয়ে স্বর্ণা। স্বর্ণা গ্রামের পার্শ্ববর্তী নদীর ধারে ঝুপড়ির মধ্যে বসবাস করত। সে অত্র স্থানে অনেকদিন থাকার সুবাধে সালমা ও হৃদয়কে ভালভাবে চিনতো। সালমাকে অপহরণের কারণে সালমা বাদী হয়ে আদালতে মামলা করে। আসামী হয় হৃদয়। হৃদয় এই মামলা থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য উকিলের পরামর্শ মোতাবেক স্বর্ণাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করে। সে একদিন স্বর্ণার কাছে গিয়ে বলে-স্বর্ণা তুমি এই মামলার রাজ স্বাক্ষী এই নাও ২০ হাজার টাকা। তুমি আমার কথা মতো আদালতে গিয়ে বলবে আমি সালমাকে ছুরিকাঘাত করিনি। স্বর্ণা মনে মনে ভাবে এইতো সুবর্ণ সুযোগ অপরাধীকে শাস্তি দেওয়ার। সে টাকা হাতে নিয়ে তাকে বিদায় দেয়, আর বলে আমি আদালতে গিয়ে তোমার কথা মতো বলব। আসামী পুরোপুরি নিশ্চিত যে, তার শাস্তি হবে না। তারিখ মতো স্বর্ণা আদালতে হাজির হয়। উকিলের জেরা মোতাবেক স্বর্ণা সঠিকভাবে স্বাক্ষী দিয়ে হৃদয়কে আসামী হিসেবে আদালতে সনাক্ত করে। আকাশ ভেঙ্গে পড়ে হৃদয়ের মাথার উপর। একি করল মেয়েটি। উকিল সাহেব চিন্তায় পড়ে গেলেন সম্পূর্ণ মামলা যেন গুড়েবালি। তিনি মেয়েটিকে ছোট লোক বলে গালি দিলেন।

আর বললেন কত টাকা পেয়েছো বাদীর নিকট থেকে বলে অপমান করলেন। মেয়েটি বলল বাবুজি এক ভিন্ন সমাজ থেকে এসেছি আমি যেখানে এই ধরণের পরিস্থিতির কারণে আজ পর্যন্ত বিচারের জন্য আমাদেরকে খুব একটা আইন আদালত ঘাটাতে হয় না। সীমাবদ্ধ আশা আকাঙ্খার মধ্যে কাটে আমাদের জীবন যাপন। আমাদের বিচার ব্যবস্থা, আমাদের নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সামান্য কোন ঝগড়া-ঝাটি হলে আমাদের সর্দারই তা সমাধান করে দেন। আজ যখন পরিস্থিতি বাধ্য করেছে আমাকে এখানে আসার তাই ভাবলাম একটি স্বাক্ষী দিয়ে আপনাদের সমাজে একটি ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত করে যাই। এই মামলায় হৃদয় আমাকে বিশ হাজার টাকা দিয়েছে। আমি তার কাছ থেকে বিশ হাজার টাকা নিয়েছি। আমার নিকট তার দেওয়া টাকা আমি প্রথমে আদালতের কাছে জমা রাখতে চাই। পরবর্তীতে আমার বক্তব্য হল আমি যদি এই টাকা না রাখতাম তাহলে হৃদয়ের মনে দুর্বলতা থাকত এবং সে পলাতক থাকত। সে ভাবত এই মামলা থেকে সে বাঁচতে পারবে না। তাই আমার ধারণা আদালত অতি সহজে তাকে আজ উপস্থিত পেত না। বাবুজি আপনার এই বড় বড় বইয়ে কি লিখা আছে তা জানি না। আমি এত কথার মারপ্যাঁচও বুঝিনা। শুধু জানি একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীর প্রতি যে কেউ অন্যায় ও জুলুম করলে তা আমার শক্তি সাহস ও জ্ঞান দিয়ে প্রতিবাদ করবো। বাঁচতে হলে টাকার প্রয়োজন ঠিকই। তাই জীবন নির্বাহের স্বার্থে অনেক সময় সত্য মিথ্যা একাকার করে মানুষকে ভুলিয়ে এমনকি কিছু প্রতারণা করে টাকা রোজগার করি ঠিক, কিন্ত তারও একটি সীমাবদ্ধতা আছে। মানুষের উপকার না হোক কিন্ত জীবনের মারাত্মক কোন ক্ষতি হোক এমন কোন কাজ করি না।

আমাদের কথায় মানুষের মনে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য আসলে ঝাঁড় ফুকের বিনিময়ে খুশি হয়ে কেউ কিছু টাকা পয়সা দেয়, তাতো খুব সীমিত। কিন্ত তারও একটি ক্ষেত্র আছে। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এমন কি যেখানে মানুষ তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় এমন কোন কাজকে প্রশ্রয় দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কেননা সৃষ্টিকর্তাতো একজন আছেন। পরকালে তার দরবারে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে। উকিল সাহেব আপনি আমাকে ছোট লোক বলে গালি দিয়াছেন। আপনি একজন আইনের লোক আপনার একজন মক্কেলকে বাঁচানো আপনার পেশাগত দায়িত্ব। আমি শুনেছি আপনি একজন এই শহরের নামী দামী উকিল। বেশ সুনাম ও প্রভাব প্রতিপত্তি আছে আপনার। আপনার কাছে আমার প্রশ্ন, আজ যদি সালমার স্থলে আপনার কোন মেয়ে বা ভগ্নি হতো আর সেখানে যদি আমি আপনার মামলার স্বাক্ষী হতাম তাহলে কেউ আমাকে এইভাবে ছোট লোক বললে আপনি নিশ্চয় প্রতিবাদ করতেন। উকিল সাহেব মেয়েটির কথা শোনে লজ্জায় মাথা নিচু করেন। স্বর্ণা বলে আমি যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়ে এই মামলায় অপরাধীকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছি। আপনি যদি একবার তাকে বলতেন তুমি যে, জঘন্য কাজ করিয়াছো আমি তোমাকে  খুব ঘৃণা করি। আপনার এই মৌন ঘৃণাটুকু অপরাধীকে তার অপরাধ প্রবণতা থেকে কিছুটা হলেও নিবৃত রাখত। অপরাধীর মনে অনুশোচনা জাগ্রত হত। শাস্তির ভয়ে অনেকে অপরাধ থেকে দূরে থাকত। আপনি তো একজন আর্থিকভাবে পুরোপুরি স্ব”ছল। দামি দামি সিগারেটের ধোঁয়ায় যে অর্থ ব্যয় হয় তা খরছ না করে এই ধরণের হীন মামলা হাতে না নিতেও পারতেন।

উকিল সাহেব অসৎ আনন্দের চেয়ে পবিত্র বেদনাই মহৎ। স্বর্ণা আদালত থেকে বের হয়ে সোজা চলে যায় এক অজানা গন্তব্যের দিকে। স্বর্ণা তার জীবনের নিরাপত্তার জন্য আর কোনদিন ফিরে আসবে না আমাদের এই সমাজে। স্বর্ণা লোভ ও স্বার্থের উর্ধ্বে থেকে একটি পক্ষপাতহীন সুন্দর বিচার উপহার দিয়ে অগণিত পাঠকের মনের মুকুরে বেঁচে থাকবে চিরকাল এই গল্পের মাধ্যমে।


গ্রাম: চান্দাই পশ্চিম পাড়া

উপজেলা: দক্ষিণ সুরমা, জেলা: সিলেট।



পদাবলি : ০১

পদাবলি : ০১

 



মিস ইউ

জহির খান


খুব কী জরুরী এখন এমন প্রস্থানে প্রিয়তু

পাঠে অপাঠে কিছু সময় থাকতেই পারতে


আজ আহ্ কী মায়ায় কায়ায়

কিছু মেঘ বুকের বাম পাশটায়

খুব করে কাতরাচ্ছে কাঁদছে

এই শাদা শূন্য রাত বিরাতে

যুগল ¯্রােতের পাল তাড়িয়ে


এই বেশ ভালো নেই- এখন

মুখের ব্রুন ও চোখের নিচে কালো দাগ

সেই সাথে ভালো নেই হাত ও পায়ের নখ

ভালো নেই মন খারাপ করতে নেই


ভালো নেই পাশে আছি এইসব কথালিপি

ভালো নেই ভালো নেই ভালো নেই

মনে পড়ে মনে করে যাপনের সুখ...




বসন্তনামা

রফিকুল নাজিম


আমার ফাগুন গুম করেছে দস্যু সেই জনে

পলাশ শিমুল রঙ ধরেছে অন্য কারো মনে,

অন্য ডালে গান ধরেছে চেনা কোকিল পাখি

অন্য চোখে ফুল ফুটেছে আমার ভেজা আঁখি।


তোমার গলায় মিষ্টি শুনি বসন্তের ঐ গান

শীতের ঝরা পাতার বুকে উড়াল পিছুটান,

আমার ফাগুন তোমার হলো আমি শূন্য হই

ফের বসন্তের আশায় আমি কান পেতে রই।


একদিন যদি আসে ফাগুন তুমি ফিরো ঘরে

সেইদিন মনে ফুল ফুটিবে পাখির মিষ্টি স্বরে,

আমরা দু’জন হবো সুজন বাসর সাজাবে ফুল

মুছে যাবে বিষাদ প্রহর অতীত দিনের ভুল।



প্রভেদ

রেহমান আনিস


তোমরা যখন মনের সুখে জোছনা দেখ, আকাশ দেখ বিষন্নতার ভার কমাতে সাগর দেখ, ঊর্মি দেখ

আমরা তখন কাঁদার মাঝে হাঁটু গাড়ি, হাত গুজে দিই, দুচোখ ভরে সবুজ দেখি।


তোমরা হলে অনেক বড়, ইচ্ছা হলেই যা খুশি তাই করতে পারো 

আমরা হলাম বিশ্বায়নের নব্য গোলাম, দেই তোমাদের হাজার সালাম।


তোমরা যখন ইচ্ছে মতো উড়তে পারো, ঘুরতে পারো আমরা তখন পথের ধুলো, খড়কুটো আর আবর্জনা।


তোমরা হলে উপর ওয়ালা, হুকুম দাতা 

আমরা হলাম দাসদাসী আর মানলে ওয়ালা। 


তোমরা সাহেব, তোমরা কুলীন তোমরা হলে

ইচ্ছা স্বাধীন 

আমরা তো সেই গ্রাম্য চাষা, রিক্সাওয়ালা, লোহার শ্রমিক।


তোমরা যখন অস্ত্র চালাও, কলম চালাও, দম্ভ করে বুকটা ফুলাও

আমরা তখন ভুইফুড়ি আর সুঁই ফুড়ে খাই, ঘাম ঝরে যায় 

চোখের কোণায় অশ্রু গড়ায় সকাল-বিকাল সন্ধ্যাবেলায়, রাতের বেলায় তারায় তারায়।


তোমরা কেবল হুমকি দিলে ধামকি দিলে চোখ রাঙালে, একটি বারো ভাবলেনা যে

আমাদেরও ইচ্ছে করে নীল আকাশের পাখি হতে জোছনা রাতের চাঁদটি হতে 

বলছি আবার ইচ্ছে করে 

সকালবেলার সূর্য হতে, কাজল বিলের শাপলা হতে এমন আরও অনেক কিছু আমাদেরও ইচ্ছে করে।


ভাগ্য যখন হয়না ভালো, অন্ধকারে দেয়না আলো, ওসব ভেবে লাভ কী বল?

তারচে বরং সামনে চলো, পথের মাঝে যা কিছু পাও শোকর করো।


ছন্দ: স্বরবৃত্ত



ভেসে যায় বসন্তদিন

সাদিক আল আমিন


বাতাসের মৈথুনের মতো উড়ে উড়ে ছড়িয়ে পড়ে রেণু

অথচ আমার সলাজ বিকেল কথা ছড়ায় না

যেমন কথা ছড়ায় দেবদারু, তোমাকে ছায়া দেয়া কৃষ্ণচূড়া

আমার শুকনো খড়ের মতো হলুদ দুপুর কথা ছড়ায় না

গোলপাতায় বসত গড়ে তোমাকে ছুঁয়ে আসা গল্পেরা

তোমার বাড়ির উঠোনে কবুতরকে খেতে দেয়া রূপকথার দানাগুলো

সহজেই একেকটা গল্প হয়ে ওঠে

তোমার বাড়ির স্যাঁতসেঁতে গলির শুরুতে স্বপ্নেরা ঘুমিয়ে পড়ে

শরীরে দিয়ে প্রণয়ের আস্তরণ, আমি জেগে উঠি ভুল ঘুম-জগতে

বিভ্রান্ত কিছু মোহের মতো কোথা থেকে যেন বাতাস আসে

কাঙ্ক্ষিত লজ্জার দানাগুলো সব উড়ে উড়ে যায়; আর আমি

আশ্চর্য খয়েরি-রঙা এক কবুতর হয়ে পিছু নেই চির মিথ্যে সেসব গল্পের




তুমি রইদ পোহাইলে

মাসুদ পারভেজ


তুমি রইদ পোহাইলে

আমার বোধের আঁতুরঘরে আগুন লাইগা যায়,

আইচ্ছা, তুমি যে রইদ পারা দিয়া পুকুরে যাও- সূর্যে খারাপ লাগে না?

আমি হইলে তামাম দুনিয়া জ¦ালাইয়া ছারখার কইরা দিতাম।

তুমি পুকুরে ডুব দিলে পানি যে তোমারে কেমনে কেমনে জড়াইয়া ধরে....!

বিশ্বাস কর, আমার ইচ্ছা করে পুকুরটারে পুরা শ্মশান বানাই ফেলাই!

এই উতলা বাতাস তোমার চুল নিয়া আঁচল নিয়া কেমনে খেলে....

আমার বুকের ভিতর তুফান শুরু হইয়া যায়, কাউরে কিচ্ছু কইতে পারি না ।

রাইতে তুমি উঠানে দাঁড়াইলে চাঁদটাও তোমার দিকে এমন কইরা তাকায়

আমার ইচ্ছা করে একটা বঁটি লইয়া চাঁদটা ফালা ফালা কইরা ফেলাই।

বাত্তি জ্বালাইলে আলো তোমারে চুমাইয়া ধরে নিভাইলেই আঁধার, আমি কই যাইতাম তোমারে লইয়া!!

আয়নার সামনে যাইতেই তোমারে তার ভিত্রে ঢুকাইয়া ফেলায়, আমার নিঃশ্বাস ভারি হইয়া ওঠে।

দামি বেদামি কসমেটিক্স লিপস্টিক ঠোঁটে লাগাও, মুখে লাগাও, গায়ে মাখো- তারা কি তোমারে ছাইড়া দেয়?

খালি আমারে ছাইড়া তুমি দূরে থাক

আমার চোখ তোমারে ছুঁইতে পারলেও আমার হাত তোমারে ছুঁইতে পারে না,

মনে রাইখো-

আমার পরান তোমারে যেইভাবে ছোঁয় দুনিয়ার কোনো কিচ্ছুই আর তোমারে তেমন কইরা ছুঁইতে পারে না, পারবো না।



পদাবলি : ০২

পদাবলি : ০২

 



আমার ঠিকানা

শাহীন খান


আমার ঠিকানা পুঁইয়ের লতায়

কোলাহল আর নিরবতায়

শর্ষে ফুলে ফুলে

পাবে তুমি ঝিঙের মাচায়

বন্দি জীবন পাখির খাঁচায়

ইশকুলে ইশকুলে। 

সন্ধ্যা তারায় জোছনা রাতে

খোকা যখন খেলায় মাতে

রাখাল বাজায় বাঁশি

ঝিলিমিলি রোদের মাঝে

সকাল দুপুর কিংবা সাঁঝে

ফিরে আসি ফিরে আসি।

পাবে আমায় ছড়া গানে

বৃষ্টি খরা ঝড় তুফানে

ঝরণা  খালে ডোবায়

বাংলা ভাষায়, স্বাধীনতায়

থাকি মায়ের মিঠে কথায়

লাল সবুজের শোভায়।

থাকি আমি বন্ধু প্রেমে

বাঁধা আছি মায়ার ফ্রেমে

ঝিঁঝির পালা সুরে

আমায় পাবে হাসির ছটায়

নাহি পাবে দুর্ঘটনায়

থাকি দূরে দূরে।

গরীব দুখির হৃদয় জুড়ে

আছি স্বর্ণ কহিনূরে

টেকনাফ- তেঁতুলিয়ায়

পদ্মা মেঘনা যমুনায় আছি

আছি বুকের কাছাকাছি

আছি হিয়ায় হিয়ায়।

আমায় পাবে বাংলাদেশে

বাতাস হয়ে যাইরে ভেসে

কই যে কথা কানে

মাটি আর আকাশ নীলে

দিঘি পুকুর এবং ঝিলে

আছি প্রাণে প্রাণে। 


ভুলতে পারিনা

রফিকুল নাজিম 


গত গ্রীষ্মের তাপদাহও মুছতে পারেনি তোমাকে 

ভেবেছিলাম বর্ষার ঘোলা জলে ভেসে যাবে দূরে

অথচ তুমি আরো জেঁকে বসেছিলে আমার মনে!

ভেবেছিলাম শরতের মেঘে করে ওড়ে যাবে অন্য আকাশ

আমি বেমালুম ভুলে যাবো; অথচ হেমন্তেও তুমি সাবলীল

ঝিলের নীল পদ্মের মতো ব্যথা হয়ে লেপ্টে আছো বুকে!

তাই প্রার্থনা করেছি শীত আসুক; ঘন হয়ে আসুক কুয়াশা

আমাদের গোসলঘরের আয়নার মতো তুমিও ঝাপসা হও

অথচ এই শীতেও গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকো আমার মনে

বুকের বা’পাশে ওম হয়ে থাকো; ভাবনায় উষ্ণতা ছড়াও!


ব্যর্থ প্রার্থনার শেষে আমরা আরো ঘন হয়ে বসি মুখোমুখি,

শুনেছি- তোমাকে বরণ করার দারুণ প্রস্তুতি নিচ্ছে বসন্ত!



অভিমানী তিথি রে তুই

জামান আহম্মেদ ইমন


অভিমানী তিথি রে তুই

দিলি মিছে আশা,

দুঃখ মনে ঘর বাঁধিলো

সুখ হারালো ভাষা রে

সুখ হারালো ভাষা।।


তোকে নিয়ে-ই  স্বপ্ন ছিলো রে 

কাটাবো সারাজীবন,

তুই অন্যের বুকেতে হাসছিস দেখছি

জল দিলো রে নয়ন,

সুখ হারালো ভাষা রে মন

সুখ হারালো ভাষা।।


গভীর রাতে মাঝে মাঝেই শুনি

তোর পায়ের আওয়াজ,

ভালোবাসবি বইললা তুই দিয়েছিস

জ্বালাময়ী তীরের সাজ।

সুখ হারালো ভাষা রে মন

সুখ হারালো ভাষা।।


একটিবার ও জিজ্ঞেস করিসনি তিথি

কেমন কাটছে সময়,

ঘুম পাখীটা ও পালিয়ে বেড়াচ্ছ  আজো

অনুভব ব্যাথার অময়,

সুখ হারালো ভাষা রে মন

সুখ হারালো ভাষা।


যেদিন খবর নিতে আসবি রে তুই

দেখবি পোড়া দেহ,

স্মৃতিপট বুকজুড়ে থাকবে তোর’ই

আমি’ই অন্যকেহ,

সুখ হারারো ভাষা রে মন

সুখ হারালো ভাষা।।


নীল আঙিনায় সবুজের মেলা

আশরাফ  খান 


আবার যদি ফিরে আসো একবার দেখে যেও

কতোটা যুবতি হয়ে উঠেছি আমি পূর্ণবার

লাল সবুজ ঘোমটায় কতোটা সুন্দর হয়েছে আমার অবয়ব 

তুমি যখন আমাকে দেখেছিলে তখন আমার ভীষণ দুঃসময়

তখন আমার অনুচ্চারিত ধ্বনিগুলো শব্দ হওয়ার আগেই হারিয়ে যেত 

বুকের হিমঘরে লুকিয়ে থাকত স্বাধিনতা সংগ্রাম রণাঙ্গণ

বাহিরে এলেই বুটের তলায় পিষ্ট করা হতো নীল গোলাপ

জয় বাংলা বলার সাহস ছিল না আমাদের ; তুমি সবই জানো  

তুমি যখন আমাকে দেখেছিলে

তখন আমি এক ধর্ষীতা নারী ছিন্নভিন্ন আমার শরীর

বস্ত্রহীন সোন্দর্যহীন আমাকে দেখে

তুমি লজ্জায় ঘৃণায় আত্মহত্যা করেছিলে।  

 

আবার যদি ফিরে আসো একবার দেখে যেও 

আমি এখন বীরাঙ্গনা নারী দাড়িয়ে আছি লালসালু স্টেজে

সসস্ত্র বাহিনীর সসস্ত্র স্যালুটের সামনে সারিতে  আমি এবং আমরা  

ফুলেল শুভেচ্ছায় ভরে উঠেছে আমাদের  হতচ্ছড়া আঙ্গিনা 

আমাদের নীল বাগান থেকে মরা পাতাগুলো ঝড়ে গেছে

নতুন কুড়ি গজে উঠেছে সেখানে; সবুজের  মেলা বসেছে নীল আঙিনায়

তুমিতো এইটুকুই চেয়েছিলে। 


আজ এখানে 

শ্রদ্ধা আছে....

ফুল আছে ...

ভালোবাসা  আছে....

সবই আছে 

শুধু তুমিই নেই....

 



অশ্রু

অসীম মালিক


অশ্রু তুমি কার?

শুধু মায়ের !

শুধু বাবার !

নাকি শুধু চোখের !


অশ্রু কার রঙে?

মরা নদীর গাঙে,

রক্তমাখা চাঁদ

চৈতি মেলার সঙে !


অশ্রু কার সীমা?

সে কী চেনে সুর্মা !

আঁচল আছে তার?

করতে জানে ক্ষমা !


অশ্রু চেনে চোখ,

প্রেমিক কিছু লোক।

কাজললতা যারা,

আঁচলে মোছে শোক।


আকাশ পেলে চোখ,

বৃষ্টি কিছু হোক।

পাথর বুকে শোক,

নদীজন্ম হোক !


নিজস্বগল্প : পাণ্ডুলিপির কান্না !

নিজস্বগল্প : পাণ্ডুলিপির কান্না !

 


পাণ্ডুলিপির কান্না 

মজনু মিয়া 


কারো মিষ্টি কথায় কান দিতে নাই, কথাটা শুনেছিলাম কিন্তু মনে ছিলো না ভেতরের আকাঙ্খা এতোটা প্রবল ছিলো যে, নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। 

শাহ আলম সরকার, আমার বন্ধু রনজিতের বন্ধু। সে গান লেখে সুর করে গান গায় এবং কি গীতিকার হিসাবে দু-এক জন লোককে তালিকাভুক্ত করিয়ে দিতে পারে, এমন কথা বলেছিলো আমার বন্ধু রনজিত। আমার দীর্ঘ দিনের আশা গীতিকার হবো, বন্ধুর কথায় মন গলে গেলো। বললাম বন্ধু তুমি ভালো করে শোনো। কি কি লাগবে?  তখন সব কিছু বন্ধু রনজিত শুনলো এবং শাহ আলম সরকারের ফোন নম্বর সহ আমার সাথে আলাপও করিয়ে দিলো। সে পুরো নাম বলল, আলহাজ শাহ আলম সরকার। এমন নাম মুখে দাড়িওয়ালা ছবি আর কথা এতো মিষ্টি মধুর যে, যে কেউ তার কথায় রাজি হয়ে যাবে। 

যাইহোক, বন্ধু রনজিত কে, সে বলল, টাকা লাগবে, আমি চাই না,, যাদের দিয়ে কাজ করাব তারা খালি খালি কাজটা দ্রুত করে দিতে চায় না। পনেরো বিশ হাজার টাকা লাগবে। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম, এতো টাকা পাব কোথায়? কিছু দিন চলে গেলো। আবার একদিন বন্ধু রনজিত ফোন দিল, কি খবর তোমার? বললাম, এতো টাকা নাই। পাঁচ দশ হাজার হলে না হয় কষ্ট করে জোগার করে দেবো। তখন বন্ধু রনজিত বলল, আচ্ছা আমি আলাপ করে দেখব। পরের দিন বলল, মজনু তোমার জন্য,, বিশেষ অনুরোধে শাহ আলম ভাই দশ হাজার টাকায় করে দেওয়ার জন্য রাজি হয়েছে দু এক দিনের মধ্যে পঁচিশ টি গান সহ অন্য কাগজপত্র টাকা নিয়ে জমা দিয়ে আসতে হবে, উত্তরার শাহ আলম ভাই র পত্রিকা অফিসে। 

ঠিক মতো কাগজ পত্র ও এনজিও থেকে দশ হাজার টাকা তুলে সাথে নিয়ে চললাম। শাহ আলম এর ফোনে যোগাযোগ করে। দেখা হলো, কথায় মন গলিয়ে দিলো, পারে তো সাথে সাথে গীতিকার হওয়ার চিঠি টা দিয়ে দেয়!  সব দিয়ে আসলাম, বলল, তিন মাসের মধ্যে চিঠি চলে যাবে। 

ছয় মাস চলে গেলো, চিঠি আসে না, ডাক পিয়নের কাছে খবর নেই, বলে না নাই চিঠি!  এক বছর চলে গেলো, ফোন দেই, বলে হবে, আমি অফিসে গিয়ে চিঠি নিয়ে আসব। দু বছর তিন বছর আর চিঠি এলো না! এখন ফোন দিলে ধরে না! বন্ধু রনজিত কে বললে ফোন দেয় কথা বলে ছলাকলায় নানান কথা বলে সান্ত¡না দেয়। সাত বছর পর, দেখি অনেক বন্ধু যারা আমার ফেসবুক বন্ধু তাদের অনেকে গীতিকার হয়েছে পোস্ট করেছে তারা। মনের ভেতর চিৎকার দিয়ে উঠলো, আমি গীতিকার হতেও পারলাম না একটা বছর ধরে এনজিও ঋণ শোধালাম আবার টাকাটাও মাইরা দিলো!!

এখন আর আমার সাথে ফোনে বা ফেসবুকে কথা বলে না! টাকা মানুষ কে অমানুষ করে দেয়, এই দশ হাজার টাকা দিয়েই আমি মজনু বুঝলাম। বন্ধু রনজিত মুখ কালা করে থাকে সেও আহাম্মুক হয়ে গেছে,, লোভ হাজী কাজী যাই বলুন কাউকে ছাড় দেয় না!

আমার পান্ডুলিপি আজও বাক্স বন্ধ হয়ে কেঁদে ফেরে!!

হৃদয়ের কান্না লুকাতে মাঝে মধ্যে নিজেকে ধিক্কার দেই, ছিঃ ছিঃ টাকা! একজন হাজী মুখে দাড়িওয়ালা বয়স্ক লোক এক পা কবরে চলে গেছে নাতী নাতনীর মুখ দেখেছে পত্রিকা অফিস করেছে, কুসুম কলি নামে একটা সংগীত একাডেমি করেছে অথচ একজন গরীব কবির কয়টা টাকা নিয়ে কাজ করে দেয় না, টাকা ফেরতও দেয় না কথা বলা যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়!!!

একটা কথা জেনেছি তাহলো,, গীতিকার হতে টাকা লাগে না,, জানলাম কিন্তু আমার লোকসান দিয়ে তারপর,, আমার গল্প যারা পড়লেন তাদের মধ্যে কেউ যদি এমন কোনো ইচ্ছে মনে পোষণ করেন,, তবে মনে রাখবেন টাকা পয়সা দিয়ে কখনো নয়!! আমার মতো বোকামি কভু নয়।


মির্জাপুর , টাংগাইল


ইপেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৫

ইপেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৫

 তারুণ্যের শিল্প সরোবর : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৫

শুক্রবার, ১২ মার্চ ২০২১






















ক্ষত !

ক্ষত !

 




ক্ষত

নেহাল অর্ক 


শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে আজ অনেক ভিড়। দিনের শেষাংশ একটা লাল আভার সাথে মিশে বিদায়ের করুণ রাগীনির নিথর অবয়ব গড়ে তুলেছে পশ্চিম আকাশে। কিছু পরেই আঁধারের কালো হাত পরিচিত মুখগুলোকে বর্ণহীন একটা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করে দিবে। এমন সময় ট্রেন থেকে নেমে এলো এক যুবক। ছিমছাম গড়নের মাথায় ঝাকড়া চুল, ভাসা ভাসা চোখের উপর যেনো গভীর একটা মায়া। নেমেই রিক্সার খোঁজে চঞ্চল হয়ে উঠে যুবকের মন। একটি রিকশা এলে যুবক তাতে উঠে বসে। খানিকটা আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করেছে আঁধার। রিকশায় উঠে যুবক সোজা চলে যায় চা বাগানের  বাংলোর দিকে; আগেই বাংলো বুকিং করা ছিলো তার। রিক্সা থামতেই কাজল দৌড়ে এসে যুবককে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠে। কাজল বাংলোর কেয়ারটেকার হিসেবে আছে বছর দশেক হবে। স্যার, আমি কাজল এই বাংলোর কেয়ারটেকার। 

ভালো আছো? ম্যানেজার সাহেব আছেন বাগানে? ইত্যাদি কিছু প্রশ্নের আসা-যাওয়ার মাঝেই যুবক পৌঁছে যায় বাংলোতে। রুমের ভেতরে প্রবেশ করতেই যুবকের মোবাইলে একটা কল এলো,  কার কল তা বুঝতে পারলোনা কাজল ! 


হ্যাঁ ভাই,  আমিই অনির্বাণ,  এশিয়া ব্যংকের ব্যবস্থাপক। আপনি কোথায় আছেন? এসব কথোপকথনের আবেশের মাঝে কাজল যুবকের নামটি রপ্ত করে নেয়। স্যার অনেক দূর হতে এসেছেন বোধহয় ! একটু ফ্রেশ হয়ে নেন। বাথরুমে সবকিছু গুছিয়ে রাখা আছে, বলেই কাজল বের হয়ে যায়। অনির্বাণ ফ্রেশ হয়ে চেয়ারে বসে আজকের পত্রিকা পড়ছে। হঠাৎ বাগানের ম্যানেজার সফিক সাহেব ও তার স্ত্রী জাইফা এসে দরজায় নক করতেই অনির্বাণ দরজা খুলে তাদের অভ্যর্থনা জানালো।

কেমন আছেন? প্রথমে সফিক সাহেব জানতে চাইলো। পিছনে সফিক সাহেবের স্ত্রী জাইফা তখনও দাঁড়ানো। কালো দুটি চোখে অনেক গভীরতা লুকানো, চুলগুলো পড়ে আছে পিঠের পরে যেনো স্ফীত নিতম্বকে ছুঁই ছুঁই করছে। মরাল গ্রীবার তলদেশে ছোট একটা কালো প্রায় তিল হলুদের উজ্জ্বলতাকে আরও কমনীয় করে তুলেছে। জলপাই রঙের শাড়িতে আবৃত জাইফার দেহ অতি দীর্ঘ নয় আবার খর্বও নয়; এক অপূর্ব পুলক দীপ্তি তার চোখে-মুখে ফোঁটে আছে। স্মিতহাস্য চেহারায় জাইফা চোখ দুটি তুলে একফাঁকে দেখে নেয় আগন্তুককে।


সফিক সাহেব তার স্ত্রীকে পরিচয় করিয়ে দেয় অনির্বাণের সাথে।  সকলে মিলে আড্ডা চলে কিছু সময়, তারপর রাতের খাবার নিয়ে আসে কাজল। সফিক সাহেব ও জাইফাকে অনির্বাণ অনুরোধ করলে তারাও এখানে ডিনার করে। ডিনারের ফাঁকে অনির্বাণ এখানে কেনো আসলো, ক’দিন থাকবে ইত্যাদি বলে নেয়। পারস্পরিক কথপোকথনে সবাই তাদের জানা-অজানা অনেক গাল-গল্প শেষ করে বের হয়। সফিক সাহেব স্ত্রীকে নিয়ে বাসায় চলে যায়। তবে রেখে যায় কিছু সময়ের প্রবাহ; যার ঢেউ জাইফার গোছানো মনের বাগানটাকে তছনছ করে ফেলে। বাগানের বাংলোতে এর আগেও অনেক অগন্তুক এসেছে, আবার চলে গেছে। সবার সাথেই জাইফার দেখা হয়, কথা হয়। এটা তাদের একটা স্বাভাবিক সৌজন্যতা বলা যায়। কিন্তু এমন করে কেউ জাইফাকে নাড়িয়ে দেয়নি এর আগে কখনো। 


সফিক সাহেব চলে যাবার পর অনির্বাণ দরজা খুলে বসে থাকে কিছু সময়। বাহিরে শীতের কনকনে হাওয়া এসে ঘরটাকে শীতল করছে। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বিছানায় হেলান দিলেই ঘুম চলে আসবে; সেটা বুঝতে পেরে দরজাটা বন্ধ করে বিছানায় হেলান দিবে এমন সময় কাজল এসে ডাকলো।

স্যার, ঘুমিয়ে গেলেন নাকি? অনির্বাণ দরজা খুলে দিলো।  কাজল ভেতরে প্রবেশ করে বললো, স্যার আপনার কোনোকিছু লাগলে আমাকে বলবেন। আমি আপনার পাশেই আছি,  ম্যানেজার স্যারের বাংলোতে থাকি। এটা আমার মোবাইল নম্বর, যে কোনো দরকারে আমাকে ডাকলেই আমি আসবো। অনির্বাণ কিছু বলেনা, কেবল কাজলের আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে। তুমি কোনো চিন্তা করোনা, আমার কোনো সমস্যা হলে অবশ্যই তোমাকে ডাকবো, বলে কাজলকে বিদায় দেয়। তারপর দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে রাত গভীর হতে থাকে। বাগানের এই নির্জনতায় রাতের আঁধারও মনের আনন্দে হাহাকার করতে থাকে।




ঘুম আসছে না জাইফার চোখে। পাশের ঘরে সফিক সাহেব ঘুমে কাতর। ঘুম আসছেনা বলে জাইফা স্বামীর ঘরে যায়। বেশকছু দিন হয় সফিক সাহেব আলাদা ঘরে রাতে থাকে। যদিও প্রয়োজন অপ্রয়োজনে দেখা করতে কোনো বাঁধা নেই। কোনো কোনো সম্পর্কের গভীরতা দূর হতে রঙিন কাগজে মোড়ানো বর্ণিল মনে হলেও তার ভেতরের গভীরে যে খরস্রোতা নদীর প্রবাহ থাকে সেটা দেখা যায়না। সফিক সাহেবের এমন ঘুমে জাইফার বেশ মায়া হয়, মনে হয় মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়। রাতের এই আঁধার জাইফাকে প্রাগৈতিহাসিক সময়ের সাথে সাক্ষাৎ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, সে নিজেকে সামলাতে পারছেনা যেনো। তারপরও অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নেয়। কী যেনো এক অদেখা দুরত্বে দু’জন বাস করছে প্রতিনিয়ত। সংঙ্গাহীন এই দুরত্বের কোনো সীমানা নির্ধারণ করা যায়না কেবল অসীম দূরত্বে চেয়ে থাকাটাই স্বান্তনা।


শীতের কনকনে ঠান্ডা থেকে বাঁচার জন্য বাহিরের কুয়াশায় যেনো প্রকৃতি কম্বল জড়িয়ে শুয়ে আছে। বাগানের গাছগুলোর ফাঁকে চাঁদের আলো আঁধারকে খানিকটা পথ দেখাতে ব্যস্ত। জাইফা বারান্দায় এসে  চেয়ারে বসে। মনের ভিতরে যেনো তোলপাড় চলছে, মনে হচ্ছে এই জীবনটাকে সে ছিটকে ফেলে দেয়। বছর দশ হলো বিবাহিত জীবনে তাদের কোনো সন্তান আসেনি, আর আসবে বলেও সম্ভাবনা নেই। স্বামী রাত হলেই অতিথিশালায় আমোদ ফুর্তি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠে।  রাতের গভীরতায় জাইফার বেদনাসিক্ত হৃদয়ের হাহাকার আরো বাড়তে থাকে। শূন্য বুকের উঠোনে খেঁকশিয়াল রাতের আঁধারে সঙ্গ দেয়। অতিথিরা বাগানে আসলে বাংলোতে এই আসর জমে প্রায়ই কিন্তু নতুন এই আগন্তুকের কথা ভেবে জাইফার মনে অনেক কৌতুহল সৃষ্টি হয়। আগের অতিথিদের মধ্যে একটা নেশার ভাব লক্ষ্য করতো জাইফা কিন্তু তার মধ্যে এটা সে খুঁজে পায়নাই।


রাত গভীরে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় অনির্বাণের। আর ঘুম আসছেনা তাই বিছানা ছেড়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে। একটা সিগারেট শুঁকতে শুঁকতে নেমে আসে রাস্তায়। এই রাস্তাটি আরেকটি বাংলোর সাথে সংযোগ করা আছে। রাতের চাঁদ অনির্বাণকে পথ দেখায়। কিছুটা এগোতেই ম্যানেজারের বাংলোর বারান্দায় চোখ পড়লো অনির্বাণের। থমকে দাঁড়িয়ে খানিকটা হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে রইলো। একটা মুখ ও সেই শাড়ির রঙটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছেনা। চুলগুলো ঠিক আগের মতোই ছেড়ে চলে গেছে নিতম্ব অবধি। এটা কাল্পনিক অস্তিত্ব নাকি মনের ভুল সেটা বুঝতে পারছেনা অনির্বাণ। একটু এগোতেই চেনা গেল। এতো রাতে জাইফা বারান্দায় কেনো দাঁড়িয়ে আছে তার হিসেবে মেলাতে পারছেনা অনির্বাণ । সফিক সাহেবের সাথে জাইফাকে দেখে এক অসম্ভব সুখী দম্পতি মনেয়েছিলো অনির্বাণের। অথচ জাইফা গভীর রাতে এখানে কী যেনো হারায়ে বসে আছে। সন্ধ্যা রাতের সেই জাইফা আর এখানে বসে থাকা জাইফার মাঝে কোনো মিল খুজে পাচ্ছেনা অনির্বাণ। 


সময় বহে চলছে আপন গতিতে।  শিশিরের পায়ের আওয়াজ ভেসে আসছে। একটু পরেই হয়তো আঁধারকে পেছনে ফেলে আলো এসে হাজির হবে। ততক্ষণে অনির্বাণের মনের ভিতর যে ঝড় বইছে তা শান্ত করবে কে? জাইফাকে অনির্বাণ  প্রথম দেখেছে সফিক সাহেবের সাথে। তখনই কোনো এক ফাঁকে তাকে আপাদমস্তক কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুক্তিবোধহীন চাহনিতে দেখে নেয় অনির্বাণ। কিছু চাহনি কেবল চোখ দিয়ে হয়না এতে মনের একটা তীব্র সংযোগ থাকে বলেই সেটা দেখায় রূপ নেয়। একটা সুন্দরের মোহে ডুব দিয়েছিলো অনির্বাণ এখন সেটা বড্ড মায়ায় রূপ নিয়েছে। অনির্বাণের বারবার মনে হচ্ছে একটু এগিয়ে জাইফার সাথে একটু কথা বলে, তার বরান্দায় বসে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করে। এমন হাজারো ইচ্ছা অনিচ্ছার ভাবনার স্রোত বয়ে যাচ্ছে তার ভিতর। আকাশে চাঁদের মায়ার সাথে মিতালি করে অনির্বাণ  এগিয়ে চলছে সামনে। ঠোঁটের সিগারেট আগুনের তীব্রতায় ভেতরে ভেতরে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে ক্রমে ক্রমে। 


সারাটা রাত বারান্দায় কাটিয়ে ভোরে একটু ঘুমিয়ে পড়েছে জাইফা। সফিক সাহেব সকাল বেলা উঠে দেখে জাইফা ঘুমাচ্ছে। সকালের নাস্তা শেষ করে বেরিয়ে পড়েছে সফিক সাহেব ; আজ তার দুপুরের ট্রেন ধরে ঢাকায় যাবার কথা। ঢাকায় কাল এবং পরশু দু’দিন চা বিষয়ক একটি সম্মেলনে যোগদান শেষে আবার ফিরবে শ্রীমঙ্গল। জাইফাকে গতরাতেই বাসায় ফেরার সময় বলেছিলো ব্যপারটা; তাই জাইফাকে ঘুমে রেখেই বেরিয়ে পড়ে সফিক সাহেব। জীবনের চলার বাঁকে দৈনন্দিন ঘাত-প্রতিঘাতে মনের অজান্তে’ই  মানুষ মাঝে মাঝে রোমান্টিকতায় আচ্ছাদিত  স্বাভাবিক সৌজন্যতাটুকুও হারিয়ে ফেলে।


ঘড়ির কাঁটা দশটা ছুঁই ছুঁই করছে। জাইফা ঘুম থেকে উঠে সোজা বাথরুমে চলে যায়। সকালের স্নান সেরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুলগুলো ছেড়ে দেয়। হালকা গোলাপি শাড়িতে তাকে আলাদা লাগছিলো নিজের কাছে। জাইফা বারবার সামনে রাখা আয়নায় নিজের অবয়ব দেখে নিজেকে সে হিংসা করছে। প্রতিবিম্বিত জাইফাকে সে অবাক হয়ে দেখে চুলগুলো সামনে এনে বারবার তাকায়। দেখতে দেখতে হঠাৎ মনের আয়নায় আওয়াজ তুলে অনির্বাণের মায়াবী চোখের কথা বলার অনুরণন। ধীরে ধীরে আয়নার সামন থেকে সরে জানালার পাশে দাঁড়াবার একটা প্রয়াস চালায় সে। শীতের সকালের রোদ জাইফার  চুলগুলো থেকে চুমুকে চুমুকে সমস্ত পানি শুষে নেয়। অনাহুত স্বাধীনতা পেয়ে চুল এবং মন দুটোই উড়তে থাকে মোর ঘোড়ানো জীবনের অজ্ঞাতনামা গন্তব্যে। হঠাৎ মনে হলো কাজলকে ডেকে পাঠানোর কথা। তাই ফোনটা হাতে নিয়ে কাজলকে ডেকে আনে জাইফা।

কাজল, বাংলোর সাহেব সকালে নাস্তা খেয়েছে তো! তুমি উনার দেখভাল করো ঠিকমতো; যেহেতু তোমার স্যার ওখানে নেই তাই তুমি নিজ উদ্যোগে খোঁজ-খবর রেখো। আমাকে সময় সময় আপডেট জানিও, কেমন। কথাগুলো বলে জাইফা একহাজার টাকার একটি নোট কাজলকে দেয়। কিছু মাছ-মাংস সহ আরো কিছু আনতে বলে তাকে। কাজল টাকা নিয়ে বের হবে এমন সময় জাইফা কাজলকে ডাক দেয়।

আচ্ছা কাজল, তুমি একটা কাজ করো।

জী মেম বলেন, কী করতে হবে আমাকে? কাজল জানতে চায়।

দুপুরের খাবার বাংলোর সাহেব এখানে খাবে। তুমি তার ব্যবস্থা করো এবং ওনাকে আমার নিমন্ত্রণ পৌঁছে দিও, বলেই জাইফা কাজলের নিকট হতে বিদায় নেয়।


অনির্বাণ চেয়ারে বসে পত্রিকা পড়ছে। সকালের নাস্তা শেষ করে মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে আছে। ভাবনার সাথে চোখের দৃষ্টি একাকার হয়ে মিশে গেছে পত্রিকার পাতায়। দরজা খুলে রেখেছিলো যাতে সূর্যের আলো এসে ঘরের সমস্ত অবসন্নতা কাটিয়ে দিয়ে যায়। কাজল দরজায় দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু কিছু বলছে না। হঠাৎ অনির্বাণ কাজলকে দেখে ভিতরে আসতে বলে। কী জন্য এসছো? অনির্বাণ জানতে চায়। দুপুরে স্যারের বাংলোতে আপনার লাঞ্চ হবে, মেম আপনাকে বলতে বলেছে। বলেই কাজল চলে যায়। পত্রিকা আর পড়া হলোনা অনির্বাণের ; কেবল কালো কালো অক্ষরের উপর প্রাণহীন চোখের চাহনি রাতের আঁধারের অপরিচিত কিছু ঘটনার স্মৃতি খুঁজে বেড়ায়। 


মাঝে মাঝে জাইফা রান্না করে সফিকের জন্য।  আজ সে নিজেই রেঁধে সব তৈরি করেছে।  ঘড়িতে একটার কাঁটা পেরিয়ে গেছে কিছু আগেই, জাইফা কাজলের জন্য অপেক্ষা করছে। হালকা নীলাভ রঙের একটা শাড়ি পরে চুলগুলো ছেড়ে দিয়েছে তাদের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে। খানিকটা এলোমেলো চুলের খর্বিত অংশ গ্রীবাদেশ স্পর্শ করে আছে, তার মাঝে কালো একটা তিলের অবস্থান যেনো সুন্দরকে আলাদা একটা কাব্যিক অলংকার দান করেছে।  অলংকারের বাহুল্য বর্জিত জাইফা সাধাসিধা থাকতেই পছন্দ করে। হঠাৎ কাজল এসে হাজির হয়। কাজলকে কিছু বলার চেষ্টা করতেই চোখে ধরা দেয় ঝাকড়া চুলের ছিমছাম গড়নের রাতের সেই মানুষটি, যাকে অনির্বাণ বলেই জাইফা ডাকবে বলে স্থির করে রেখেছে। পরস্পরের কুশল বিনিময় শেষে খাবার টেবিলে বসে অনির্বাণ। আগেই সব প্রস্তুত করে রাখা ছিলো; অনির্বাণ একা খাবেনা বলে পীড়াপীড়ি করলে জাইফাও এক টেবিলে খেতে বসে। খেতে খেতে দুজনের গাল গল্পে কিছু আসে, কিছু যায় আবার তার রেশ টেনে নতুন গল্পের জন্ম হয়। পাশেই মৃদুস্বরে বাজতে থাকে একটি রবীন্দ্র সংগীত;.....জগতের আনন্দ যজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ।’


ভাবী কেমন আছেন?  খাবার পর জাইফা জানতে চায় অনির্বাণের কাছে । কিছু সময় নিরব থেকে অনির্বাণ বলে, এখনও তেমন কিছু হয়ে উঠেনি। কথাটা শুনে জাইফা ভাবছে ভদ্রলোককে একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিলাম বোধহয়।  তাই  সে নিজেই পরিস্থিতিকে দুজনের অনুকূলে আনার জন্য আরো অনেক কথা বললো। দীর্ঘ আলাপচারিতায় দুজনের কাছেই পরিবেশটা খুব উপযোগী মনে হচ্ছিলো সময়কে আরো দূরে টেনে নেওয়ার। শীতকালে সচরাচর বৃষ্টি হয়না। কিন্তু মাঘ মাসের বৃষ্টি ফসলের জন্য খুবই উপকারী। গল্প ও আড্ডার শেষ না-হতেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। একটা অলসভাব এসে গেছে তাই উঠতেও মন চাইছেনা অনির্বাণের। তারপর জাইফার নিকট থেকে চলে যাওয়াটাও বেশ খারাপ  লাগছে মনে। দুজনেই সময়টাকে খুব উপভোগ করছে।


বৃষ্টির ফোঁটা টিনের চালে ভীষণ তাল সৃষ্টি করছে। মাঘের কনকনে শীত জাইফার শরীর যেনো উষ্ণতার চাদরে ঢেকে রাখার জন্য হাহাকার করছে। শীতের মাঝে বৃষ্টির এই নগ্নতার কথা ভেবে অনির্বাণকে শুয়ে থাকতে বলে বিছানা প্রকস্তুত করে দেয় জাইফা। এলায়িত চুলের ফাঁকে হলুদে রাঙানো মুখের প্রতিচ্ছবি একবার দেখে নেয় অনির্বাণ। জাইফাও চলে যায় তার কক্ষে। বিছানায় হেলান দিয়ে জাইফা মোবাইল থেকে একটি কল দেয় সফিক সাহেবকে।  কুশল বিনিময়ের পর আরও কিছু কথা বলে রেখে দেয় ফোন। কখন আসবে তুমি?  জাইফা সফিক সাহেবকে জিজ্ঞেস করে। তীব্র হাহাকারের প্রতিধ্বনি অবিরত জাইফার ভিতর বাহিরে আওয়াজ তোলে। জীবনের এই বাঁকে না পেলো মাতৃত্বের স্বাদ না পেলো শারীরিক সুখ। কতোজন জাইফার সৌন্দর্যের প্রশংসা করে তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলো। সেদিকে ফিরেও তাকায়নি সে। দিন দিন হতাশার ক্রমবর্ধমান চাপ আর সইতে পরছেনা জাইফা। কাজল একবার ফোন দিয়ে খোঁজ নেয় সামগ্রিক অবস্থার। জাইফা কিছুতেই শান্তি পাচ্ছেনা যেনো। উঠে যায় বিছানা থেকে; ঘরময় কেবল পায়চারি করে।


সন্ধ্যা হয়ে গেছে, বৃষ্টি তখনো থামছে না। বিদ্যুৎ মশাই চলে গেছে বেশ আগে। একটা অন্ধকার নেমে এসেছে বাগানের সারটা বুক জুড়ে। অনির্বাণকেও যেনো এই আঁধার ক্রমশঃ গ্রাস করছে। বারান্দায় এসে দাঁড়ায় অনির্বাণ। এই আঁধার কী সব ভেঙে চুরমার করে দিয়ে যাবে ! অনির্বাণ বুঝতে পারছেনা কিছুতেই। মরাল গ্রীবাদেশে কোমল চুলের নৃত্য অনির্বাণ যেনো প্রথম দেখলো জাইফার মাঝে। অন্ধকার সমগ্র ঘরে যেনো এক বেদনার হাহাকারকে আমন্ত্রণ জানাতে ব্যস্ত। জাইফা আলো জ্বেলে দিবে ভেবে অনির্বাণের ঘরে আসে।

কোথায় আছেন এই অন্ধকারে? আলো জ্বালাননি কেনো?  বলতে বলতে জাইফা সামনের দিকে এগিয়ে যায়। অনির্বাণকে দেখা যাচ্ছিলোনা; খুব কাছাকাছি আসতেই দুজন সতর্কভাবে দাঁড়ায়। অন্ধকারে কেউ কাউকে চিনতে পারছেনা যেনো। জাইফার চুলের একটা নেশা জাগানো গন্ধ অনির্বাণের নাক দিয়ে প্রাণের ভিতরে প্রবেশ করে নোঙর ফেলে। নিজকে এইপর্যায় সমলাতে না পেরে আগ্রাসী কঠিন হাত বাড়িয়ে দেয় জাইফার দিকে। জাইফার এলোমেলো কোমল চুলের নৃত্য অনির্বাণের মুষ্টিবদ্ধ আঙুলের দ্বারা শাসিত হতে থাকে। জাইফাও নিজেকে বাঁধা দেয়না জগতের এই প্রাচীনতম খেলায় সংযুক্ত হতে। ক্রমেই বাড়তে থাকে খেলার তাল, লয় আর গুঞ্জন। দুজনেই উপভোগ করতে থাকে হৃদয় উপচিয়ে পড়া ঢেউয়ের গর্জন।


আঁধারের কালো হাত সমগ্র বাগানের সবুজকে যেনো দুমড়েমুচড়ে দিয়ে গেছে কিছু সময়ের মধ্যে। বড় ঝড় হয়তো বেশি সময় থাকেনা কিন্তু স্বল্প সময়ে তার তান্ডব রেখে যায় বিশাল ক্ষত। ভবিষ্যৎ হয়তো তার গতিপথ নির্ধারণ করে দিবে সময়ের আপন নিয়মে কিন্তু যে ক্ষতের সৃষ্টি হলো তার ভার উভয়েরই বয়ে যেতে হবে সারাজীবন। ক্রমেই রাত বাড়তে থাকে; কিছু না বলেই অনির্বাণ চলে আসে নিজের বাংলোয়। জাইফার ক্ষত-বিক্ষত অন্তর ছাঁচ হীন বিছানায় পড়ে থাকে। রাতের আঁধারের তীব্রতা ভোরের আলোর পথকে সুগম করে দেয়। খসে যাওয়া প্রকৃতির আস্তরণ সযতনে লাগাতে থাকে দুজনে। সকালবেলা সফিক সাহেবের ফোনে ঘুম ভাঙে জাইফার। সকালের প্রয়োজনীয় কাজ শেষে স্নান করে নেয়। মরে যাওয়া গাছের ডালে যেনো সবুজ কঁচি পাতা উঁকি মারে। সফিক সাহেব আজ সন্ধ্যা নাগাদ আসবে বলে জাইফাকে জানায়। একটা তীব্র ক্ষত দগদগে ব্যথা নিয়ে বেঁচে আছে জাইফার মনে। গভীর চোখের সর্বনাশা মায়া কাজের গতিপথ পাল্টে দেয় মাঝে মাঝে।


দুপুরের খাবারের আগে অনির্বাণ জাইফাকে ফোন দেয়। গতরাতে ঘটে যাওয়া অনির্ধারিত ঘটনার রেশ কাটাতে পারেনি কেউ। লাঞ্চ করা হয়েছে? অনির্বাণ জানতে চায়। জাইফা না সূচক জবাব দেয়। আরো অনেক কথা হয় ; একটি অনাহুত রাতের পরিবেশ দুজনকে এমনভাবে পরিচয় করে দিয়েছে যেনো বহু জনমের আগে তাদের একবার দেখা হয়েছিলো। কী যেনো এক গভীর আকর্ষণ দুজনকে চুম্বকের মতো টানে। অল্পসময়ের পরিচয়ে যে সম্পর্কের ভিত রচিত হয়েছে তার উপর দাঁড়িয়ে অনির্বাণ একবার জাইফাকে বিয়েরও প্রস্তাব দেয়। অসীম আকাশের নীচে যে বেদনার ঘর বাঁধা  হয়েছে তা ভাঙবে কী দিয়ে জাইফা। কোনো উত্তর দেয়না,  নিরবতার একটা গভীর ভাষা থাকে। মানুষের অসহায়ত্ব  এই নীরব ভাষায় ব্যক্ত হয়। সফিক সাহেব বাংলোতে ফিরে আসে। প্রকৃতি সন্ধ্যা পূজার আয়োজন সাজাতে ব্যস্ত। জাইফাকে অনির্বাণ বলেছিলো কাল পর্যন্ত ছুটি আছে, তাকে ফিরতে হবে কর্মস্থলে। বিষন্নতা সন্ধ্যার  আয়োজনকে জোর করে অতীতের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। জাইফা গত রাতের কথা ভাবতে থাকে। অনির্বাণের মায়াবী চোখ আর আগ্রাসী হাত যে ক্ষতের তৈরি করেছে তা সারাবে কী দিয়ে জাইফা। ধীরে ধীরে তা মন থেকে সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। সফিক সাহেবের  সব কথার উত্তর দেয়না জাইফা কেবল এক অজানা অস্থিরতা চলছে মনের উঠোনে । ভাবনার ফাঁকে অনির্বাণের প্রস্তাবটার কথা মনে উঁকি দেয়। সময়ের ¯্রােত ভাবনাগুলোকে আগ্রাসী করে তুলে। বিবর্ণ ভবিষ্যৎ বর্তমানের ভাঙা কাঁচের টুকরোতে হেঁটে হেঁটে রক্তাক্ত হতে থাকে ।


হবিগঞ্জ।


ভিক্ষাবৃত্তি

ভিক্ষাবৃত্তি

 




ভিক্ষাবৃত্তি

মাজরুল ইসলাম


ভেড়ামারা চরের খাস জমি নিয়ে অনেক দিন ধরে ফ্যাসাদ চলছে। ততোদিনে আমার কোলে-পিঠে  দুট্যা ছ্যাল্যা আলো। ঘরের লোকটা পরের জমিনে মুনিশ খাট্যা যে টাকা পাছিল তাথেই কোনোরকমে দুবেলা প্যাট চলছিল।

এখন সেই দিন আর নাই। চরের খাস জমির বাল্যা মাটিতে চাপা পড়ে গেলছে। রহ্যা গেলছে শুধু ছ্যাল্যা দুট্যাকে লিয়া গাঁয়ে গাঁয়ে ভিক্ষ্যা করা।

এমন ধারা দশা হবে আমি ভাবতে পারিনি। আমার খুব কষ্ট হয়। ক্যানে হবে না ! এডা তো সত্য কথা আমার মিনস্যা দলকে খুব ভালোবাসত। তবে ফারাক এখানেই যে আমার মিনস্যা ফন্দি ফিকির জানত না। দল তার পরানপিয়ো ছিল। আমার মিনস্যা দলের লাগ্যা পরাণ দিয়া দিতক। কোনো বাধা সে মানত না।

ভেড়ামারা চরের খাস জমি দখল্যারা জোর করে আবাদ করতক। দল ক্ষমতায় আলো, আস্যা এক্ষুন সেই খাস জমি উদ্ধার করে গরিব মানুষের মধ্যে বিলিবন্টন করতে চাহইল। গাঁয়ে গাঁয়ে মিটিং করল। মিছিল করল। তারপর একদিন ভেড়ামারা চরের খাস জমি উদ্ধারের জন্য ডাক দিলো দল।

আমদের খায়্যা না খায়্যা বেশ দিন গুজরাছিল। কিন্তুক সেডা বেশি দিন রহলো না। দলের ডাকে খাস জমি উদ্ধারের জন্য লড়াইয়ে ঘরের লোকটাও গেল। মাথায় পাগড়ি, হাতে নিশান। দখল্যাধের লাঠ্যাল আমার জীবনের যতকিছু ভাঙ্যা দিল। ‘ও’-খুন হল। আর পাট্টা পেল দলের সুবিদাবাদী লোক গুলান।

মিনস্যার মৃত্যু দিনে ক’বছর ঘটা করে ছবিতে ফুলের মালা দিল। এখন কিছুই হয় না। শুদু আঁধারে ঢাকা পড়ে গেল আমার সেইদিন গুলান। দলের লোক গুলান আমার কথা একবারও ভাবে না। খিদের জ¦ালায় আমাকে ছুটতে হয় লোখের দুয়্যারে দুয়্যারে। আর যারা পাওয়ার তারা পায়্যা তলে তলে ঘর গুছিয়ে, মুখ মুছ্যা বসে গেলছে।

ঘরে দুট্যা সুমত্ত মায়্যা। বিহ্যা দূরের কথা, ঠিক মতন তাধের ভাত কাপড় দিথে পারিনা। গাঁয়ে গাঁয়ে ভিক্ষ্যা করা বই এত দিনপরও কপালে একটুকুন জমি জুটেনি।

                          

মুর্শিদাবাদ


পদাবলি : ০১

পদাবলি : ০১

 





অবারিত জোছনার হাট

তাজওয়ার মুনির


আকাশে উর্বশী চাঁদ।

জানালার ফাঁক গলে সে আলো এসে পড়ছে

আমার ফুলতোলা চাদরের উপর।

চারদিকটা কেমন ফকফকা।

হঠাৎ বিজলি বাতি চলে গেলো।

জোছনায় ভিজতে ভিজতে চলে গেলাম অজানায়...


বিদ্যুৎবিহীন শুনশান নীরব প্রান্তর।

প্রান্তর জুড়ে জোছনা। সে জোছনা হা করে গিলছি গোগ্রাসে।

মৃদুমন্দ সমীর গায়ে হালকা পরশ বুলিয়ে যায়।

দূরের ঝোপ থেকে ডেকে উঠে হুক্কাহুয়া রবে বুনো শেয়াল।

হুতোম প্যাঁচাটা ডেকে উঠে করুণ সূরে।

ডাহুক তার সঙ্গীর সঙ্গ পাবার আশে অনবরত

ডাকতে ডাকতে গলায় উঠে গেছে রক্ত।


সহসাই খেয়াল হলো, চাঁদের আলো তোমার সুন্দর

নিটোল চিকন কপোলের উপর লুকোচুরি খেলছে।

নারকেল পাতারা কাপছে দখিনা সমীরে।

চাঁদ আর নারকেল পাতার মধ্যে একটা মৃদু অথচ

দৃঢ় ধস্তাধস্তি হয়ে গেল অবস্থান করা নিয়ে।

কে কার আগে কতক্ষণ তোমার সুন্দর

মুখখানির সুধা উপভোগ করতে পারে।


হালকা বায়ে কেশগুলো বারবার উড়ে এসে

একটা অবস্থান নিতে চাচ্ছে তোমার মুখশ্রীতে।

যেন আমার সাথে ওদের জনম জনমের শত্রুতা!

আমি অপলক তাকিয়ে এসব দেখতে থাকি।


হঠাৎ ফোনের ভাইব্রেশনে কেটে যায় তন্দ্রা।

কোথাও কেউ নেই। শুধু আছে আমার এক ফালি চাঁদ

আর চাঁদের স্নিগ্ধ আলো।

আমি এই চাঁদের আলো নিয়েই থাকতে চাই।

পান করতে চাই অবারিত জোছনা একাকীত্বে। নীরবে।



প্রত্যাবর্তন 

মিশির হাবিব


বয়স বাড়লে মানুষ ছোট হয়

সমাজের কাছে, মানুষের কাছে; 

প্রকৃতির কাছে নতজানু হয়।


বয়স বাড়লে পরিবেশে কমে 

মানুষের মূল্য। 

উৎফুল্ল শিশু প্রকৃতির অতিথি 

বয়স্ক জীবন উপেক্ষিত; 

অবহেলিত জীবনে মানুষ 

খুঁজে ফিরে বাল্যস্মৃতি। 


শৈশবে ফিরতে দাও, 

বয়স বাড়লে নিলীন জীবন । 



বনলতা

সোহেল রানা


এই তো ঘুরে আসলাম বনলতা হয়েই 

বনলতা এখনো জীবনানন্দময়ী- 

চিরায়ত চিরকাল 

জীবনের কথা কয় 


কিন্তু ‘জীবনানন্দ দাশ’-এর কবিতার মতোই 

বিরহবিধুর বাঁশি বাজাচ্ছ এ হৃদয়! 


আমিও একদিন ঝরে যাব বনলতা আক্ষেপ বুকে লয়ে- 

হৃদয়ের জমাকৃত শিশিরজল 

রাঙাবে ঘাস; পথ- 

আমি ধুলো হয়ে মিশে রব এই বাংলায়! 


আহা মিটিবে না মিটিবে না 

আর বনলতা- তোমার দেখার সাধ! 



নুন কাহিনী

দ্বীপ সরকার


পান্তা ভাতে নুন নাই

হিম থামিয়ে সমুদ্রে গেলাম নুন আনতে

সমুদ্র বললো ‘জল বসন্তের কোলা ব্যাঙ হও এবং সমুদ্রে যাও’

আমি কোলা ব্যাঙ হলাম

সমুদ্রে গেলাম ডুব দিয়ে

সীমাহীন দুরত্বেÑ

দেখি নুন নাই সেখানে


প্রতারক সমুদ্র

ফিরে এসে সমুদ্রের উঠোন হাতরিয়ে দেখি

আঁজলা আঁজলা নুনের হিরিক

আয়তাকার ঘরে ঘরে নুন আছে নিতান্ত ঢিবি হয়ে

আমি নুন নিয়ে ফিরলাম ঘরে


আমি ইতিহাস ঘেঁটে দেখলাম

নুনের জন্ম সমুদ্রে

আগে ভেবেছি নুনের মা আছে পৃথিবীতে


পদাবলি : ০২

পদাবলি : ০২

 




গন্তব্য ভুলে বেখেয়াল.. অতঃপর

মহিউদ্দিন বিন্ জুবায়েদ


স্বজনের কর্মসূচি..

হাসিখুশি নানা আয়োজনে। নব চাঁদ যেন বরণে আগ্রহ। 

এগিয়ে যায় দিন মাস ও বছর ¯্রােতস্বিনী নদী যেমন।


মন প্রসারিত হয়। ধান কাউনের মাঠে

দূর্বা ঘাসের গালিচার আন্তরনে..

ফুল পাখি বন অপরূপের দেশ। স্বপ্ন দেখায় ভুল ঠিকানার।


গন্তব্য ভুলে বেখেয়াল.. অতঃপর

সময় নিঃশেষ ডাকে সাড়া দিয়ে একাকিত্ব



বাসন্তী প্রিয়তমা 

মো. রাসেল হাসান 


আজ কোকিল ডেকে  ভেঙ্গে দিল আমার কাঁচা ঘুম,  

বসন্ত আজ দিয়ে গেল  আলতো করে চুম। 

     স্বপ্নে দেখি মোর প্রিয়সী 

     আমার জন্য বেশ উদাসী 

হাজার ফুলে সেজে এসে  উঠলো আমার কোল। 

ভাঙল যখন মিথ্যা স্বপন পড়লো হিয়ায় রোল। 


খোঁপায় গাঁথা চামেলী, জুই, অশোক ফুলের পাপড়ি,

 গলে ছিল কৃষ্ণচূড়ার আগুন ঝরা ঝাপড়ি,

     গালে ছিল অপার যাদু,

     ওষ্ঠে খোদার রাখা মধু।

স্বর্গ থেকে আসলো যেন এই রূপসী হুর!

দু’জন মিলে গিয়েছিলাম

অনেক বহুদুর। 


আমি শোনায় কাব্য এবং সে শুনালো গান। 

একটি কোকিল দিয়েছিল ভাঙিয়ে অভিমান। 

     গানের ফাঁকে চুম দিত সে। 

     দীঘল, আঁধার চুল বাতাসে 

দুলছিল আর ছড়াচ্ছিল স্বর্গীয় এক ঘ্রাণ। 

হঠাৎ আমার মধুর স্বপ্নের ঘটলো অবসান।  


মনের প্রিয়া মনেই আছে, হয়নি প্রিয়সী। 

ভিনদেশি ওই প্রিয়াটাতো চাঁদের অধিবাসী। 

     দেখাই দুইয়ের হবে নাকো, 

     মিথ্যে স্বপ্ন কেন আঁকো! 

জানালে শুধু বসন্ত এসেছে, আসোনি তুমি প্রিয়তমা-

তুমিই বলো এর শাস্তি কি দিব, নাকি করে দিব ক্ষমা।



আগমনী 

রিপলু চৌধুরী 


আজ সাতসকালে  নতুন করে অন্যরকম ঘ্রাণ আসছে নাকের ডগায় , 

সেই ঘ্রাণে ঘুম ভেঙে গেল আমার,

শুনতে পেলাম কোকিলের মিষ্টি কন্ঠ কুহ কুহ ডাকছে, 

চোখ মেলে দেখতে পেলাম পূর্ব আকাশে সূর্যের এক অমায়িক হাসি। 


তাহা দেখে আমি বাড়ির সামনে ছুটে আসি, 

দেখতে পাই শিমুল আর কৃষ্ণচূড়া লালে পরিপূর্ণ 

নানান রঙের পাখি কিচিরমিচির ডাকছে 

কোকিল পাখি শিমুল আর কৃষ্ণচূড়া ডালে বসে কুহ কুহ গান গাইছে, 

বাতাসের সাথে ভেসে আসছে এক সুগন্ধি গন্ধ। 


সেই পাখির কন্ঠ আর সুগন্ধি সুবাসে ছুটে আসে এক নতুন আগমনী, 

সেই আগমনী বলে দেয় বসন্ত এসে গেছ,

আম গাছে মুকুল ফুটছে ডালিম গাছের ডালিম পাকছে 

প্রকৃতি ফিরে পায় নতুন এক পরিবেশ 

প্রকৃতি বলে দেয় বসন্ত এসে গেছে।


মিহিকল্প !

মিহিকল্প !

 



মিহিকল্প

সা’দ সাইফ


ভোরের আলো ফুটতে তখন অনেক দেরি। সাড়হীন গাছপাখিগুলো কিচিরমিচির রবে কণ্ঠমধু ঢেলে দেয়নি প্রকৃতির কানে। কিন্তু রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের নিয়ন বাতির কুহেলী ভেদ করা আবছা আলোক, পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে চলছে এস.কে পরিবহনের দূরপাল্লার পরিবহনটি। দোদুল দুলছে। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে চালক যেন নিজের সাথে নিজেই প্রতিযোগিতায় মেতেছে। পঁয়তাল্লিশ আসন বিশিষ্ট গাড়ির যাত্রীদের সবাই হয়ত গভীর ঘুমে মগ্ন । দুইজোড়া চোখ তখনো নিদ্রাহীন, ছন্নছাড়া। চোখের পাতাগুলো চাইলেই এক করা যায়না। মাঝেমাঝে চিত্ত দুর্বল করা গাড়ির ঝাঁকুনি আরও দুর্বল করে দিয়ে যাচ্ছে চারপাশের নিস্তব্ধতা।

স্বর্ণা তানভিরের কাঁধে মাথা রেখে ঢুলছে। এলোচুল তানভিরের নাক-মুখে বিড়বিড় করে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। কিন্তু তানভিরের সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। থাকবেই বা কী করে!

বিশাল এক পাহাড় কেটে ওপরে ওঠা নিদারুণ-ই না কষ্টের ফেরা। যে কষ্ট সবাই না পারে নিতে না পারে সহ্য করতে।

তানভিরকে যে সেই কাজই করতে হচ্ছে।

‘এই, তুমি চিন্তা করছ কেন শুনি?’

তানভিরের মুখে স্বর্ণার কোমল হাতের কোমল পরশে কেঁপে ওঠল মুখটা।

‘কই নাতো!’

'ক্ষুধা লেগেছে, কিছু খাবে?’

নাহ।

তুমি তো সে কখন থেকে না খেয়ে আছো, ব্যাগের ভেতর কিছু খাবার আছে। বের করো।


এ যেন ঠিক টালিউডের ‘চিরদিনই তুমি যে আমার’ সিনেমার বাস্তব জেরক্স কপি।

তানভির যে কতবার এই সিনেমার দর্শক হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। অথচ আজ তাকেই সেই সিনেমার মত বাস্তব অংশ হতে হচ্ছে।

তানভির আফসোস করে বলে ওঠল, ‘হায়রে নিয়তি!’

এই নিয়তি তাদের পক্ষে থাকলে তাদেরকে আজ বাসা থেকে পালিয়ে আসতে হতোনা। বাবা-মা-ও কষ্ট পেত না। ধুমধাম করে বিয়ে দিয়ে দিত যদি!

যদি শব্দটা আবার দীর্ঘশ্বাসে রুপ নিল তানভিরের কাছে। বুকের বাঁ পাশে তখন চিনচিনে ব্যথা।

আচ্ছা, এই সমাজের ভালোবাসার মানুষকে মেনে নিতে কেন এত ওজর-আপত্তি? মানুষ কেন বোঝেনা, নিজের পরিবারও কেন বোঝেনা? সুপাত্রে কন্যা দান করাটাই তাদের কাছে সব। তাদের সন্তান ভালো থাকার কিছু পাচ্ছে কিনা সেটা কি পরিবার দেখতে পায়না? নাকি সমাজই তাদের অন্ধ বানিয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর অজানা তানভিরের কাছে, ঠিক ততটাই স্বর্ণার কাছে।


গত কয়েক মাস ধরে যখন স্বর্ণার বাড়িতে বিয়ের জন্য প্রস্তাব আসছিল, স্বর্ণা সাফসাফ তানভিরকে বলে দিয়েছিল, আর যাইহোক, বাড়ির পছন্দে সে বিয়ে করবে না। দরকার হলে পালিয়ে আসব আমরা।

ভীষণ ভালোবাসায় আবদ্ধ দুজনকে তাই বেছে নিতে হল উদ্দেশ্যহীন এই যাত্রা। কে  জানে কোথায় হবে তাদের ঠিকানা!


ফুলস্পিডে চলন্ত গাড়ি হঠাৎই ঝাঁকুনি খেয়ে ব্রেক কষলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল কয়েকজন লোক। তানভির-স্বর্ণার সিট বরাবর এসে সোজা স্বর্ণার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে বের করে নিল সিট থেকে। গাড়ির যাত্রীরা ততক্ষণে সজাগ হয়ে গেছে। কিন্তু সবাই নির্বিকার। কারও কিছু করার ক্ষমতা নেই যেন। তানভির বাধা দিতে যাচ্ছিল,অমনি কুলা সাইজের একটা হাত সটান এসে পড়ল তানভিরের মুখ বরাবর। স্বর্ণা তানভিরের ব্যাথাহুত মুখ দেখে গলাছেড়ে চিৎকার করে ওঠল আ......আ....আ....। বাঁচাও.....

স্বর্ণার চিৎকারে তার মা পাশে এসে মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘কী হয়েছে মা? বলল আমাকে।

স্বর্ণার মুখে ভয়ের একটা আচ্ছন্ন ভাব যেন তখনো রয়ে গেছে। এতসময় ধরে সে স্বপ্ন দেখছিল তাহলে! ধুর ছাই! তাই বলে এত ভয়ংকর স্বপ্ন! কী এক বিচ্ছিরি অবস্থা।

‘মা, তানভির তোকে সেই কখন থেকে ফোন দিচ্ছে, না পেয়ে আমার কাছে ফোন দিয়েছে। দিনে-দুপুরে ঘুমাচ্ছিস বলে আর ডেকে দেইনি। জামাই বাবাজির সাথে একটু কথা বলতো মা। কী এক দরকারী কথা আছে নাকি।’

আজ তিনদিন হলো, তানভির-স্বর্ণার বিয়ে হয়েছে। লাভ ম্যারেজে। দুজন দুজনার আকাক্সিক্ষত মানুষকে পেয়ে স্বর্গসুখ বারবার ছুঁয়ে যাচ্ছে যেন তাদেরকে।

স্বর্ণা তখন  মুখে একমিষ্টি হাসি নিয়ে তানভিরের কাছে কল দিল। ওপাশে তখন শব্দ পৌঁছে গেছে ক্রিং...ক্রিং......।


সরকারি এম এম কলেজ।

ইংরেজি বিভাগ।

অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ।