ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৭০

ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৭০

 তারুণ্যের শিল্প সরোবর : ধানশালিক : সংখ্যা ১৭০,

শুক্রবার, ২৫ জুন ২০২১




















অসময়ের অতিথি...

অসময়ের অতিথি...

 



অসময়ের অতিথি

যাহিদ সুবহান


বাগদীপাড়ার আজকের সকালটা থমথমে। কিছু ঘটেছে হয়তো। তবে কী ঘটেছে তা কেউ জানে না। কিছু বোঝাও যাচ্ছে না। গতরাতে না কি খুব চিৎকার-চেচামেচি শোনা গেছে কমলের বাড়ির উঠোন থেকে। কমলের বউ গীতার চিৎকার শোনা গেছে। ওদের উঠোনের দিক থেকেই এসেছে এ চিৎকারের শব্দ। মাত্র চল্লিশ ঘর নি¤œশ্রেণির হিন্দু বসতী এই বাগদীপাড়ায়। চারপাশে মুসলমান পল্লী। নিশুতি রাতে কোন হিন্দুনারীর এমন চিৎকার গন্ডগোলের বছরের পরে এখনো কেউ শোনে নি। গন্ডগোলের বছর মানে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর এমন ঘটনা ঘটে নি বাগদীপাড়ায়। যাদের বয়স পঞ্চাশের কোঠা ছাড়িয়েছে তারা হয়তো কিছুটা মনে করতে পারবে। যারা এ কালে জন্ম নিয়েছে তাদের সে কথা মনে থাকার কথা নয়। যাদের বয়স ষাট পেরিয়েছে তারা সে ঘটনা পুরোপুরি বলতে পারবে। অন্যরা হয়তো বাপ-দাদাদের কাছে শুনেছে। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া সে ঘটনা ঘটেছিলো দিনের বেলা; ভর দুপুরে। তাই সেদিন ঠিক কী ঘটেছিলো সবাই বলতে পারে। আর গতরাতের ঘটনা ঘটেছে গভীর রাতে তাই কেউ কিছুই জানে না।

মুক্তিযুদ্ধের বছর অক্টোবর মাসের শেষের দিকে হবে। এই বাগদীপাড়ায় ঘটেছিলো এক নারকীয় ঘটনা। একদল হায়েনা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো বাগদীপাড়ার নিরীহ মানুষগুলোর উপর। ওরা পাকিস্তানী সেনা ছিল না; ছিল এদেশেরই স্বাধীনতাবিরোধী কিছু কুলাঙ্গার রাজাকার। চল্লিশ ঘরের প্রায় সব ঘরেই আগুন দিয়েছিল। লুটপাট করেছিল সব। সুন্দরী হিন্দু বালাদের কয়েকজনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল নদী চন্দ্রাবতীর তীরে কাঠালবাগানে। ওরা ক্ষতবিক্ষত করেছিল এইসব হিন্দুবালাদের সরল সতীত্ব। খুব নির্মম ছিলো সেদিনের বাগদীপাড়ার দুপুর। সেদিন নদী চন্দ্রাবতীর তীরে পড়েছিল কয়েকটি নারীদেহ। জীবন্ত অথচ নিথর! খুব হল্লা করে রাজাকাররা এই কাজে অংশ নিয়েছিল। মনে হচ্ছিল যেন ওদের উৎসব চলছে। ফেরার সময় এই নরম কাদামাটির সরল আর অসহায় নারীদের ব্লাউজ ছিড়ে মাথায় বেধে উল্লাস করে ফিরছিলো। এ উল্লাস জয়ের। এ যেন ওদের যুদ্ধজয়ের চিহ্ন। এ যুদ্ধ ধর্মের! আর এই নারীরা গণিমতের মাল। এ বিষয়ে সেদিন বা পরে কেউ প্রশ্ন তুলেছিল কিনা জানা যায় নি। সে সময় অন্যায় বলে কিছু ছিল না। বরং সবই যেন ন্যায় এবং জায়েজ! প্রাণভয়ে সেদিন বাগদীপাড়ার হিন্দুরা যার যার মতো পালিয়েছিল মুসলমান পাড়ায়। বয়স বা অন্য সমস্যায় যারা পালাতে পারে নি তারা যার যার ঘরে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে ছিল। প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা কেউ টু শব্দও করতে পারে নি। সবাই ছিল অসহায় এবং নিরুপায়। ওরা শুধু ঈশ্বরকে ডাকছিল আর তার কাছে বিচার দিয়েছিল। ঈশ্বর সেদিন ওদের আকুতিতে সাড়া দিয়েছিলো কিনা জানা যায় নি। তবে একদল রাজাকার ফেরার পথে সেদিনই অমিতবিক্রমী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ধরাশায়ী হয়েছিল।

নদী চন্দ্রাবতীকে বাগদীপাড়ার নি¤œশ্রেণির এই বাগদীকূল গঙ্গার মতো পবিত্র মনে করে। ওরা মনে করে গঙ্গার মতো চন্দ্রাবতীর জলে ¯œান করলেও পূণ্য হয়। তারা নদী চন্দ্রাবতীকে তাদের জননীর মতো ভক্তি করে। বাগদীরা মরলে শ্মশানপোড়া ছাই তো এই চন্দ্রাবতীই গ্রাস করে। বিজয়ার দিনে মা দূর্গাকে এই নদীতেই বিসর্জন দেয় ওরা। বাগদীরা সারা বছর এই নদীতেই মাছ-শামুক-কাছিম-শাপলা-শালুক-কুইছে ধরে হাটে বেঁচে; নিজেরা খায়। বর্ষা এলেই খাঁ পাড়ার সব পাট এই নদীতেই জাগ দেওয়া হয়; ধোয়া হয়। এ কাজ বাগদীরাই করে। পাটধোয়ার কাজ করে দুটো পয়সা ঢোকে ওদের ঘরে। সারা বছরের চুলার পাটখড়িও জোটে এখান থেকেই। বাগদী গিন্নিদের তাই এ কাজে খুব জোর। নদীর উপর এখন বিশাল ব্রিজ হয়েছে। অথচ এই নদীর ঘাটপাড়ানির কাজ করতো এই বাগদীপল্লীর বাগদীরাই। এই নদীর সাথে ওদের শত বছরের সম্পর্ক। অথচ সেদিন সেই ভয়াল দিনে নদী চন্দ্রাবতীও নীরব ছিল। এই অসহায় মানুষগুলোর ডাকে সাড়া দেয় নি সে। 

বাগদীপাড়া ঘেষেই খাঁ পাড়া। এ গাঁয়ের সবচেয়ে বড় পাড়া। খুব কাছে হওয়ায় খাঁ পাড়ার লোকজনের সাথেই বাগদীদের সব কাজকর্ম, চলাফেরা। খাঁদের সব জমিজমাই এদিকে। চাষাবাদ-ঘরগেরস্থালী থেকে শুরু করে ব্যবসা আর সামাজিক অনেক কাজেই খাঁ পাড়ার লোকজন বাগদীদের উপর নির্ভরশীল। খাঁ দের ডানহাত-বাঁ হাত বাগদীরা। কী অর্থনীতি, কী সমাজ সকল সকল ক্ষেত্রেই আষ্টেপৃষ্ঠে আছে দু’পাড়া। অথচ তারা দুই ধর্মের; দুই শ্রেণির মানুষ!

এসব কারণেই বাগদীরা খাঁদের প্রতি খুব অনুরক্ত। ওদের দৃষ্টিতে খাঁ রা দেবতুল্য। খাঁ পাড়ার মুসলমানরাও বাগদীদের বিপদের সাথী মনে করে। তবে সব খাঁ কে তারা এক পাল্লায় মাপতেও চায় না। যেমন আছু খাঁ। বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। লোকটার পোশাক চমৎকার। সাদা রঙের লন্ড্রি করা জামা, পরনে দামী কাপড়ের প্যান্ট, মুখে চাপদাড়ি। রাজনীতি করার সুবাদে অনেক সুন্দর করে কথা বলে থাকে। অপরিচিত কেউ হঠাৎ তাকে দেখলে এ গাঁয়ের সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষ ভাবতে পারে। তবে তা ঠিক নয়। আছু খাঁর সুনামের চেয়ে বদনামই বেশী। এলাকার মানুষের সাথে বাটপারী, গরীব মানুষের গমচুরি, ভাতার টাকা চুরি, কম্বল চুরির বদনামও আছে। আবার নারী কেলেংকারীর বদনামও আছে কিঞ্চিৎ। বাগদীপাড়ার সুন্দরী মেয়েগুলো আছু খাঁর আরাধনা। 

কমল এই বাগদীপাড়ার ভূমিপুত্র। এ পাড়ায়ই কোন এক ঘন বর্ষার দিনে সে জন্ম নিয়েছিল কহের বাগদীর ঘরে। কহের বাগদীও ছিল জাত বাগদী। সারাদিন তীর-ধনুক নিয়ে বুনো মানুষটা বনে বনে ঘুরতো। শামুক কুড়াতো, কাছিম মারতো, মাছ ধরতো। কমলও একই স্বভাব পেয়েছে। বাপকা বেটা আর কী। কমলের সুন্দরী বউ গীতা। যেমন সুন্দর চেহারা তেমনি শরীরের গঠন। দেখে বোঝার উপায় নেই যে নি¤œবর্গের বাগদীর বউ সে। সংসার কর্মেও গীতার কোন জুড়ি নেই। সেই ভোরে ঘুম থেকে উঠে ¯œান সেরে তুলসীতলায় ধুপধুনো দেওয়া, রান্না করা, ঘুটে কুড়ানো, ঘরদোর গোছানো কত কাজ। আবার বাড়ির উঠোনে লাউ-কুমড়োর মাঁচা, উঠোনে শাক-লতার চাষ করে। নিজের সংসারের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বেঁেচ কিছু টাকা পায়। হাস-মুরগীও পোষে। টানাপোড়নের সংসারে একটু আয়েশ হয়। বর্ষার সময় অন্যদের মতো পাট ধোয়ার কাজ করে। খাঁদের খন্দের সময় ধান শুকানোর কাজ করে। উঠোন লেপা, ঘর-দুয়ার পরিষ্কার করা, বউ-ঝিঁদের ফরমায়েশ খাটে। এতো কাজ করে অথচ সামান্য ক্লান্তি নেই চোখেমুখে। ওদের দুজনের ছোট্ট সংসার ভালোই চলে। ওদের সংসার দেখে অনেকেই ঈর্ষা করে। কথার ছলে অনেকেই ওদের সংসারকে উদাহরণ হিসেবে দাঁড় করায়। বলে ওঠে, ‘যাও গিয়ে দেখে এসো গীতার যেন লক্ষীর সংসার!’

চারিদিকে থৈ থৈ বর্ষার পানি। পাটপঁচা গন্ধে নদী চন্দ্রাবতীর দুই পাড়ের বাতাশ যেন রি রি করছে। বাগদীপাড়া থেকে খাঁ পাড়া সমস্ত পাড়ার কী মুসলমান, কী হিন্দু সব শ্রেণিপেশার মানুষ ব্যস্ত কাচা পাট কাটা, জাগ দেওয়া, পাটধোয়ার কাজে; পাট শুকানো কাজে। এই পাট শুকানোর পর মেপে গুটি বেধে ধলপ্রহরে পৌছাতে হবে মুলগ্রাম, চাটমোহর কিংবা গোড়রী হাটে। এই পাট বেঁচে খা পাড়ায় নগদ টাকা ঢুকবে, টাকা ঢুকবে বাগড়দীপাড়ায়ও। ব্যস্ততা সকলের। ব্যস্ততা কমল আর গীতারও। কমল সারাদিন খাঁদের পাটকেক্ষতে পাট কাটে। পাট জাগ দেয়। পাট শুকানো হলে মাপে, ধরা বাধে। সন্ধ্যায় গোসল সেরে কোনদিন উপেনের চায়ের দোকানে আড্ডা দেয় কোনদিন আবার এক হাতে টর্চ আর এক হাতে কোঁচ নিয়ে মাছ ধরতে যায়। মাঝরাত পর্যন্ত মাছ ধরে ঘরে ফেরে খালুই ভর্তি মাছ নিয়ে। গীতা খুশি হয়। সকালে কাজে যাওয়ার আগেই মাছ কুটে-বেছে রেখে যায়। নদী চন্দ্রাবতীর তীর উপচে পানি ঢুকেছে ধানক্ষেতে-পাটক্ষেতে। এই নতুন পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে কই-টাকি-ট্যাংরা মাছ। এসব তাজা মাছ কমলের বাবার কাছ থেকে পাওয়া নেশাকে জাগ্রত করে। সে ঘরে থাকতে পারে না, ছুটে যায় নদী চন্দ্রাবতীর যৌবন ছিটিয়ে রাখা তীরে। আজন্ম কৈবর্ত বলে কথা; আজন্ম জেলে সন্তানবলে কথা!

একদিন রাতে পাড়ার কয়েকজনের সাথে মাছ ধরতে বের হয় কমল। এক হাতে কোঁচ আর এক হাতে বৈদ্যুতিক টর্চ লাইট। রহিম খাঁর কাছ থেকে মাছ ধরার জন্য টর্চলাইটটা ধার চেয়ে এনেছে সে। লাইটটি বিদেশ থেকে আনা। রহিম খাঁর বড় ছেলে সৌদি আরব থাকে সেই পাঠিয়েছে। টর্চের আলো যেদিকে পড়ে মনে হয় দিনের মতো পরিষ্কার। মাছ ধরতে ধরতে রাত গভীর হয়। নিশুতি রাত; পুরো বাগদীপাড়া ঘুমিয়ে। গভীর রাতে বাড়ির পথে হাঁটা দেয় কমলরা। বাগদীপাড়ায় ঢুকতেই একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে থমকে দাঁড়ায় কমল। এই কণ্ঠ তার চেনা; এই কণ্ঠ গীতার। কমলের উৎকণ্ঠা বাড়ে। কমল মাছভর্তি খালুই, হাতে টর্চ আর কোঁচ নিয়ে দৌঁড়াতে থাকে বাড়ির দিকে। বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে দরজায় টর্চের আলো ধরতেই কমল আবিষ্কার করে এক ভয়াবহ দৃশ্য। রহিম খাঁর ঝোপ পরিষ্কার করার রামদা হাতে নিয়ে দরজা সামনে একজন পুরুষ মানুষকে তেড়ে আসছে গীতা। চোখগুলো রাগে আগুন হয়ে আছে। যেন কালীমূর্তি ধারণ করেছে। এখনই হয়তো কোপ দেবে লোকটির ঘাড়ে। গীতা চিৎকার করে বলছে, ‘শুয়োরের বাচ্চা, তোর এতো বড় সাহস, তুই আমার ঘরে ঢুকিস!’ 

একটা লোক গীতার ঘরে ঢুকেছিল। বাংলার গাঁয়ের সরল কোটি নারীর মতো বাগদীপাড়ার এক সরল হিন্দুবালার সতীত্বের কাছে হার মেনেছে তার লোলুপ দৃষ্টি। কমল সব বুঝতে পারলো। প্রিয়তমা স্ত্রীর এই অপমান মেনে নেওয়া যায় না। কমল বাম হাতে টর্চ লাইট আর ডানহাতে কোঁচটা শক্ত করে ধরে এগিয়ে গেল। মুখে টর্চলাইটের আলো পড়ায় ভয়ে জড়োসরো হয়ে পালাতে থাকা লোকটা হঠাৎ এক মুহূর্তের জন্য মুখ ঘুরালো কমলের দিকে। কমল থমকে দাঁড়ালো। লোকটি কমলের খুব পরিচিত। শুধু কী কমলের; এ পাড়ার সবাই লোকটিকে চেনে। সেই মুখ, সেই জামা-প্যান্ট, সেই চাপদাড়ি। কমল নিজেকে বিশ্বাস করতে পারলো না। শুধু অস্ফুট ভাষায় বলে উঠলো, ‘খাঁ সাহেব আপনি!’   


আটঘরিয়া, পাবনা।


কদমফুল ও মৌমিতা

কদমফুল ও মৌমিতা

 



কদমফুল ও মৌমিতা 

শফিক নহোর 


ক.

মৌমিতার সঙ্গে আমার প্রথম অনলাইনের মাধ্যমে পরিচয়। তবে সঠিক মনে করতে পারছি না কবে পরিচয় হয়েছিল, তবে মনে আছে তখন ইয়াহু চ্যাটরুম ছিল। আমি ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। ক্লাস শেষ করে শংকর প্লাজায় সাইবার ক্যাফে বসে চ্যাট রুমে মেতে উঠতাম, মৌমিতার সঙ্গে। ইমেইল করলে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া পেতাম না। তবুও আমার ভাল লাগা থেকে প্রতিদিন ইমেইল করতাম, তাঁর প্রতি আমার একটা বিশ্বাস ছিল। অসাধারণ সুন্দরী ছিল মৌমিতা তার সাক্ষী ছিল ওর প্রোফাইল পিকচার। আমার মতো অনেক ছেলে ওর সঙ্গে চ্যাট করতো , আমি নিজেই দেখেছি, আমার বন্ধু রানা মৌমিতার সঙ্গে চ্যাট করত, তবে রানা শিওর হয়েই বলেছিল, 

-বন্ধু মাগী তো খুব খচ্চর রে, শালি তো ম্যাসেজ করলে রিপ¬াই করে না। আমি ঠোঁটের কিনারে হালকা হাসি এনে বিদায় নিলাম। চ্যাট রুমে প্রথম যেদিন আলাপ হলো, কত বিচ্ছিরি ধরণের কথাবার্তা বলতো লোকজন এর ভেতরে অনেকেই মেয়ে সেজে আসত, অনেক ছেলে ছিল , যারা মেয়ের বেস ধরে থাকতো। সেই সময়ের স্মৃতি গুলো সত্যি ভিন্ন রকম যা বলে কাউকে বোঝানো সম্ভব না। তবে মৌমিতা ছেলে না মেয়ে এ নিয়ে প্রথম দিকে আমার ভীষণ সন্দেহ হত , অনেক কথা যা একটা মেয়ে সহজে বলার কথা না, কিন্তু মৌমিতা তা সহজে বলতো। আমি ধরেই নিয়ে ছিলাম, সে ছেলে। কারণ একটা মেয়ে কখনো এমন কথা বার্তা বলতে পারে না। কিন্তু আমার বন্ধু রানার কথার সঙ্গে আমি সাত পাঁচ ভেবে অনেক কিছু মিলাতে চেষ্টা করি। আমার যোগফল শূন্য আমাকে ভীষণ ম্রিয়মাণ দেখাত, রানা বলতো, না দেখে কাউকে এভাবে বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। ভালবাসা তো দূরের কথা। সে মেয়ে না ছেলে সেটাই তো আমরা বের করতে পারছি না। তবে রানা আমাকে জানিয়ে দিল বন্ধু আমি এর ভেতরে আর নেই।

সামনে পরীক্ষা সাইবার ক্যাফে এসে আর এভাবে সময় নষ্ট করতে পারবো না। তার সঙ্গে তো টাকাও যাচ্ছে। এটা একটা নেশার মতো হয়ে গিয়েছিল, আমার কাছে। রানা এক প্রকার আড়ালে চলে গেল। 

সংযুক্তা শ্রী মানি সুমি ‘নামের হিন্দু অপরূপা বিবিএ প্রথম বর্ষের ছাত্রী  আমাকে প্রথম দেখায় গোলাপ ফুল দিয়েছিল। 

বলেছিল,

-‘আমি তোমার বন্ধু হতে চাই ?

-সহপাঠী থেকে বন্ধু এ আর তেমন কঠিন কাজ না আমি পারবো, ধন্যবাদ আমাকে গোলাপ দিবার জন্য। এখানে গোলাপ দিলে সবাই তো ভাববে তোমার সঙ্গে আমার প্রেম। প্রেমের জন্য তোমাকে গোলাপ দেয়নি,

-রাজীব, আজ তোমার জন্ম দিন।

আমি অবাক হয়ে সংযুক্তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম খানিকক্ষণ।

রাজীব আজ তোমার সঙ্গে একটু ঘুরতে চাই ? তুমি নিয়ে যাবে, আমি শিশু বাচ্চার মতো খুব সহজে অবুঝ হয়ে যেতাম ; এর বিশেষ কারণ কি ছিল আমি জানি না। হুম যাবো, কোথায় নিয়ে যাবে আমায়। 

‘রবীন্দ্র সরোবর ‘সেখানে আজ প্রথম বর্ষার গান হবে। তুমি তো খুব রবীন্দ্র সংগীত শোনো, হ্যাঁ তা ঠিক। কখন যাবে, ক্লাস শেষ করে। 

আমি ক্লাস শেষ করে দাঁড়িয়ে আছি সংযুক্তার জন্য অবশেষে সে আসল, রিকসা নিয়ে চলে গেলাম, দু’জন রবীন্দ্র সরোবর। সুমিষ্ট কণ্ঠে ভেসে আসছে গান,

বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান,

আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান।

‘মেঘের ছায়ায় অন্ধকারে রেখেছি ঢেকে তারে

এই যে আমার সুরের ক্ষেতের প্রথম সোনার ধান।

রবীন্দ্র সংগীতের ভেতরে একটা যাদু আছে না শুনলে কেউ বুঝতে পারবে না। সংযুক্তা, আমার দিকে তাকিয়ে রইল। দু’জন পাশাপাশি বসে শুনছি, হলুদ কাচা হাত দিয়ে সে আমার হাতের আঙুল স্পর্শ করবার চেষ্টা করল, আমি বুঝতে পারলাম। আমার কাঁধে মৃদু ভাবে মাথা নুয়ে পড়েছে, আমি আশেপাশের মানুষের চোখের দিকে তাকানোর চেষ্টা করলাম। সবাই মুগ্ধ হয়ে গান শুনছে। আমি সংযুক্তাকে একটু নাড়া দিলাম। এখানে অনেক মানুষ, লোকে দেখলে খারাপ ভাববে। চাঁদ মুখটা দেখে মনে হতে লাগল শ্রাবণের মেঘ বুঝি এখনি আমাকে ভিজিয়ে দিয়ে যাবে।


খ.

রাতে আর সেদিন কোন ভাবেই ঘুমাইতে পারলাম না, বই নিয়ে পড়তে বসলে বইয়ের পৃষ্ঠা জুড়ে রুপালী হাসি, মৌমিতা ভেসে ওঠে। আজ ক’দিন সাইবার ক্যাফে যাওয়া হয়না। মেঝ মামা ফোন করেছিল, বলেছেন, বিদেশ থেকে আসবার সময় আমার জন্য ল্যাপটপ নিয়ে আসবে। কনফিগারেশন যেন জানিয়ে একটা ই-মেইল করি, কোন মডেল পছন্দ থাকলে মডেল সহ একটা ছবি দিলে ভাল হয়। মনের ভেতরে একটা খুশি খুশি ভাব। এদিকে সংযুক্তা আমাকে ফোন দিয়েছে, সাইবার ক্যাফে থেকে তার কিছু নোট বইয়ের সহযোগিতা লাগবে। সে গুলো ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে দিতে হবে। ধুর বাল শালি একটা ছেবলা টাইপের মেয়ে মনে হচ্ছে এখন।

-কি রে পাগলা এখনো ঘুমাস নাই কেন?

দোস্ত বিড়ি খাবি, খেলে চল ছাঁদে যাই।

-দোস্ত তুই ঘুমাস নাই কেন ? আর বলিস না চটি পড়লাম।

-ধুর শালার ঘরের শালা, তোরা তো একটা খ্যাত, এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িস ছফা আহমেদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, জাকির তালুকদার এদের বই পড়। শালা চলে গেছে চটিতে। তোর তো রুচিতে বাধার কথা।

-মামা প্রেমের জন্য কার বই পড়ব।

-শোন আমি একটি বই পড়েছি, জোস রে।

-মামা কার লেখা, ইমদাদুল হক মিলনের।

-তুই যা বিড়ি খেয়ে আয়। আমার কাছে আছে যে কোন সময় নিয়ে পড়িস যদি ভাল লাগে আরও দিবো।

-শালা ভালই তো চালাচ্ছিস রে, মালটা কিন্তু জোস, ডিপার্টমেন্টে কিন্তু আর নেই।

হিন্দু মানুষের প্রতি আমার একটু ভরসা কম। খাইছিস, টাইছিস নাকি না হলে কিন্তু পাখি উড়াল দিবো। তখন তোকে কবিতা লেখা ছাড়া কোন উপায় থাকবো না। 

-ধুর শালা কি যে বলিস, মেয়েটা ভাল। সে আমাকে বন্ধু হিসাবে খুব কাছের মানুষ মনে করে। তা ছাড়া আমাদের মধ্যে প্রেমের কোন কথা হয়নি কখনো, আমাকে ভালবাসলে তো বলতো। 

তবে সংযুক্তা কিছু একটা আমাকে বলতে চায়, সত্যিকার অর্থে ওর সঙ্গে প্রেম হবে বা, খারাপ মনোভাব নিয়ে কখনো মেলামেশা হয়নি। আমি সবসময় বলেছি, সে ভাল মেয়ে। 

-এক টান দিবি , শালা টাকার ভয়ে বিড়ি খাস না, সে আমি জানি। শালা তুই তো একটা ছোটলোক।

- হুম ছোটলোক, তুই বড়লোক এবার সেশন ফ্রি টা দিয়ে দিস মামা। হা হা হি হি তোর সঙ্গে সারারাত কথা বললেও শেষ হবে না। আমি ঘুমাবো রে দোস্ত , সকালে একটু সাইবার ক্যাফে যাবো।

- দোস্ত , মালটা কী সত্যিই মেয়ে , প্রেম জমে গেছে না কি?'

-পরে তো আর কিছু জানালি না। এখন তো নতুন একটা জুটেছে ...

-ধুর বাল বাদ দে। কাজের কথায় আসি। মামা বিদেশ থাকে তোকে বলেছিলাম না , মামা দেশে আসবে। একটা ল্যাপটপ নিয়ে আসতে বলেছি , ল্যাপটপের মডেল সহ একটা ছবি ইমেইল করতে বলেছেন, 

-দোস্ত কি খাওয়াবি।

-আগে ল্যাপটপটা দেশে আসতে দে। 

-আসলে কিন্তু খাওয়াতে হবে কথা দে প্রমিস !

- ঠিক আছে কথা দিলাম। 

-মামা তুই এতো ভাল ক্যান, মালটা ভাল আছে বিয়ে করে ফেল। শালা শুনেছি , হিন্দু মায়া বিয়ে করলে না-কি বেহেস্ত যাওয়া যায়। 

-কাল দেখে হলে তোর জন্য বলবো রানা তোকে পছন্দ করে , এবার খুশি। 

-হ'মামা খুব খুশি হয়েছি। 

-তোর কি মনে হয়, মেয়েটি তোর কাছে নিরাপদে থাকবে। তুই তো প্রথম দিনই খেয়ে দিবি শালা লুচ্চা। 

-মামা তুই কি আমারে হার্ড করে কখা বললি , তা বলবো কেন?'

- তুই আমার বন্ধু না। লুচ্চা হইলেও তো মানুষের কাছে বলতে পারছি না কারণ,

তুই আমার রুমমেট।

রানার সঙ্গে বকবক করে রাতে ঘুমাইতে দেরি হয়ে গেল। সকালে উঠতে কষ্ট হবে আজ। সকালে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ন’টা বাজে। দ্রুত উঠে ফ্রেশ হয়ে রেড়ি হয়ে হলের ডাইনিং থেকে নাস্তা করে বের হলাম।


গ.

রিকসা থেকে নেমে ভাড়া পরিশোধ করে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই বুঝতে পারলাম বিদ্যুৎ নেই। মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। ভাবলাম রানাকে কল করি, মোবাইল বের করবো ঠিক এ সময় আলো জ্বলে উঠলো। এ যেন হারানো সন্তান কে ফিরে পাওয়া।

দোকান খুলেছে , দোকানের ম্যানেজার কম্পিউটার গুলো পরিষ্কার করবার চেষ্টা করল, কিন্তু কাস্টমর বেশি থাকায় ২৫ টাকা দিয়ে ৩০ মিনিটের ইউজার নেম আর পাসওয়ার্ড নিতে হয়। একটা স্লিপ হাতে ধরিয়ে দিল। 

মামাকে ইমেইল করে করে দেখলাম , নতুন কে ইমেইল করেছে , মৌমিতার ইমেইল , সংযুক্ত ফাইল ডাউনলোড করে দেখে আমি তো প্রায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলবার মতন। সেদিন যে মেয়ের গান শুনলাম, এ তো দেখছি সেই । যদিও সেদিন দূর থেকে তার গান শুনেছি প্রচন্ড ভিড় ছিল। কিন্তু ইয়াহু চ্যাটে তার ধরণ কোনভাবেই মিলাতে পারলাম না । আমার বুকের ভেতর কেমন ধড়ফড় করতে লাগল। দ্রুত কাজ সেরে আমি বের হবো ঠিক তখন সংযুক্তার ফোন।

বিশেষ কাজে বাড়ি যেতে হবে , বাড়ি থেকে ওর ফোন এসেছিল এমনটা আমাকে জানালো , তার পর থেকে সংযুক্তা আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেনি। কিছুদিন যাবার পর আমি চেষ্টা করেছি যোগাযোগ করবার কিন্তু ওর ফোন সুইচ অফ। 

মৌমিতাকে ইমেইল করেছি , মোবাইল নাম্বার চেয়ে। পরের দিন আবার সাইবার ক্যাফে গিয়ে ইমেইল চেক করে দেখলাম। মৌমিতা মোবাইল নাম্বার দিয়েছে , অনেক গুলো শর্ত জুড়ে দিয়েছে তার সঙ্গে। 

মোবাইল নাম্বারটা ক'য়েক বার দেখে নিলাম যাতে মুখস্থ হয়ে যায়। ফোনে কোন ভাবেই সেভ করে রাখা যাবে না। হলের বন্ধু গুলোতো এককটা বাঁদর নাম্বার গায়েব হবে সঙ্গে মৌমিতা।

রাতে একটু একটু করে যখন কথা বলা শুরু হল। বিষয়টা রানা খুব খেয়াল করেছিল। রানা এমনিতেই আমার পিছনে লেগে থাকে। তাছাড়া বন্ধু হিসাবে সব রানাকে বলা হয়। তার আগেই বলে উঠল , 

-বন্ধু বলেছিলাম, না?

-কি বলেছিলি, বল শুনি?'

-পাখি যে উড়াল দিল, শালা আগেই বলেছিলাম , খেয়ে দে এখনকার মেয়েদের বিশ্বাস নাই। গেল তো তোর বুকে লাথি মেরে।

- কি বলছিস, কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

- মালু যে তোর সঙ্গে বেইমানী করছে , বুঝতে পারছিস।

- এতো ত্যানা প্যাচাস কেন ? সোজাসুজি বল। 

-সংযুক্তার বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে ইতালি থাকে। শোনলাম, প্রচুর টাকার মানুষ। এই কিচ্ছা কাহিনী বাড়ি থেকে শুনে আসলাম । তোরে তো একটা মিসকলও দেয় নাই , ম্যাসেজ ও দেয় নাই। আগে বলেছিলাম , মালুর জাত মামা। এখন বুঝেছিস!

-টুল টা টেনে নে একটু বস , হিন্দুরা তো মেয়েকে এতো দ্রুত বিয়ে দেয় না। ওদের বিয়ের একটা বিষয় থাকে অনেকদিন ধরে জানাশোনা হয়। হঠাৎ করে বিয়ে করল সংযুক্তা। পৃথিবীতে সত্যিই সবাই নিজেকে নিয়ে ভাবে। 

ভালই তো ডুবেছিস, মনে হয়। তা না ঠিক সে আমার খুব ভাল বন্ধু হয়ে ওঠে ছিল। একটু তো খারাপ লাগবেই স্বাভাবিক।

-তোকে বলা হয়নি , মৌমিতার সঙ্গে কথা হচ্ছে বেশ কিছুদিন। মেয়েটি দেখা করতে চেয়েছে ; তোর মোবাইলে তো ক্যামেরা আছে। যেদিন দেখা করতে যাবো ফোনটা দিস কিন্তু ? একটা ব্যাপার আছে না।

- তোর তো সব কাজেই একটা ব্যাপার থাকে। 

-শহরের মেয়ে দেখে শুনে চলিস , না হলে দেখবি তোরে বিক্রি করে অন্য জায়গায় চলে গেছে।

- আচ্ছা রানা তুই কি পজিটিভ চিন্তা করতে পারিস না। চিন্তা করবো কি ভাবে তুই নিজেই নিজের দিকে একটু চেয়ে দ্যাখ আমার কোন কথাটা বিফলে গেছে।

তিন বছর পর !

মৌমিতার সঙ্গে যেদিন আমার প্রথম দেখা হয়েছিল, সেদিন বৃষ্টি ছিল শ্রাবণ মাস । খুব ভাল রবীন্দ্র সংগীত গাইত , 

আমার পরান যাহা চায়,

তুমি তাই, তুমি তাই গো।

তোমা ছাড়া আর এ জগতে

মোর, কেহ নাই কিছু নাই গো।

গল্পের ফাঁকে বলেছিল, টেলিভিশনে চেষ্টা করছে , কিন্তু লোক না থাকায় হচ্ছে না। আমি অবাক হয়ে শুনলাম। মৌমিতার দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছি। লজ্জায় চোখে তুলে আমার দিকে তাকাতে পারছে না। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে এত রূপ দিয়ে তৈরি করেছে , মৌমিতার সঙ্গে দেখা না হলে এটা হয়তো আমার অজানা রয়ে যেত।

মৌমিতা প্রায় সময় আমার সঙ্গে কেমন শরীর ঘেঁসে দাঁড়াত যা আমার খুব অপছন্দ ছিল। সম্পর্কটা আমি যেমন চেয়েছিলাম , ঠিক তেমন হয়নি। তবে একটা সম্পর্ক হয়েছিল সৌজন্যতার খাতিরে তা বেশি দিন টিকে থাকেনি।

মৌমিতা আমাকে ভিন্ন ভাবে চাইত, এতো রূপবতী ভেতরে কেমন মাকাল ফলের মতো। তাঁর লোভ ছিল অনেক বেশি। আমি গ্রামের ছেলে বাবার তেমন টাকা পয়সা নেই, খরচ করবার মতো। যদিও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি খুব কষ্ট করে। মৌমিতার জন্মদিনে দামি উপহার না দেবার কারণে , আমার সঙ্গে প্রায়-দিন মোবাইলে ঝগড়া হত , আমি কোন ভাবেই বোঝাতে পারিনি। আমার নিজের ও কিছু দুর্বলতা ছিল। যা আমি প্রথমে মৌমিতার কাছে প্রকাশ করিনি। একটা সময় আমাদের ব্রেকআপ হয়। শেষ যেদিন মৌমিতার সঙ্গে দেখা হয় সেদিন অনেক গুলো কদমফুল দিয়েছিলাম। মৌমিতা খুব পছন্দ করত। পুরনো স্মৃতি গুলো এই বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় কেমন নিজের ভেতরে নাড়া দিয়ে গেল। আমার আজ সত্যিই মনে হচ্ছে , ‘সংযুক্তা’ আমাকে সত্যিই ভালবাসতো ! আমি বোকা মানুষের মতন তা হয়তো আড়াল করেছি; আজ এই শ্রাবণের সন্ধ্যায় নিজের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে সংযুক্তার জন্য।  


পদাবলি : ০১

পদাবলি : ০১

 



ডেডোক্রেন ভাইরাস

হিলারী হিটলার আভী


কাক ঈশ্বরের কাছে মানুষের উপমা জানতে চায়লো!

ঈশ্বর জানোয়ারের সাথে উপমা দিলো!

কাক হাবিল আর কাবিলের কথা মনে করে কাঁদলো!

এখন শকুন গরু-ভাগা নিয়ে প্রশ্ন করছে !

এরপর সাপ ময়ূরকে নিয়ে প্রশ্ন করবে!

চিংড়িমাছ কেঁচো কেন মেরুদ-হীন জানতে চাবে!

গাধা সমাজচ্যুত- তাই সে নির্বাক থাকবে!

সবশেষে আবাবিল শ্রেষ্ঠজীব শব্দটি নিয়ে একটিই প্রশ্ন করবে!


হঠাৎ মাতালের অট্টহাসির জন্যে সভা ভেঙে গেলো,

মাতালের অট্টহাসিতে ‘ডেডোক্রেন ভাইরাস’ নির্গত হলো!

‘ডেডোক্রেন ভাইরাস’ ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই মানুষের মস্তিষ্ককে 

শতভাগ-ই  বিকৃত করতে সক্ষম!



না হলে থাকুক সব, এভাবেই

আজাদ আল আমিন


যখন ছোবল দিবে একটু কম করে দিও জানোতো আমি খুব ব্যথা কাতর;

তোমার ছোবল কতটা ভয়ঙ্কর সেটা কেউ না জানলেও আমি জানি

আগের মতো যদি দাও বেদনাকাতর হয়ে ছটফট করতে হবে,

যদিও তা নতুন কিছু নয়, খুব পুরোনো.. অবিরত এভাবে যাচ্ছে

তারপরও চাই এবার একটু কম করে দিও।


যদিও বসস্তের কোকিলের ডাক তোমার কানে পৌছে যেত 

অথবা শরতের স্নিগ্ধ সকালের স্পর্শ পেতে

কিংবা আষাঢের বর্ষণ, শীতের ঘনকুয়াশা আলীঙ্গন করতে

তবে তুমিও হতে কোমল মনের অধিকারী

যেখানে অনুরণন হতো অব্যক্ত আর্তনাদের। 


সব বিষাদ এক করে একদিন তোমাকে দিবো

ভার বহন করতে হবে না,

শুধুমাত্র একটু স্পর্শ করে দেখো; 

যদিও তোমার অনুভূতি জীবিত থাকার লক্ষণ অপ্রকাশিত,

তবুও ধূসর মরুতে একটু শীতল হাওয়া পাবার প্রানান্তকর বৃথা 

চেষ্টার মতো একটু না হয় আশার সঞ্চার করলে।


কোন এক সময় উপলব্ধির ব্যপ্তি যদি প্রসারিত হয়,

বিস্তির্ণ মাঠ পেরিয়ে দিগন্তের উঁকি দিও

মাসের পর মাস, বছরের পর বছর যেখানে

তোমার সরব উপস্থিতি নেই, আছে শুধু বেলা শেষ হবার প্রতীক্ষা।

না হলে থাকুক সব, এভাবেই।



চলার পথে

বিধান সাহা


চুপ করে থাকলেও

কোন লাভ হয়নি

জীবনের চলার পথে


নতুন করে বলতে গিয়েও

হয়নি বলা

কোন কিছুই জানি


অনুভবের দ্বারে

পৌঁছে যেতে চেয়েছে

অনেক ইতিবৃত্ত


সেসব কিছুই হয়নি

আসেনি নতুন করে

নতুন প্রত্যয়


জীবন বয়ে গেছে

আপন খেয়ালে

নিবিড়তার টানে


কথা ফিরে গেছে

নিজের মত করে

কোন চিহ্ন না রেখে...


মাটির গম্বুজ 

মুহাম্মদ ইয়াকুব 


বিপুলা পৃথিবীর পাহাড় চূড়ায় 

ঐশ্বর্যের মেলা 


ঈাহাড়ের চূড়া মানে মাটির গম্বুজ 

খুঁটি গাঁড়ে পৃথিবীর বুকে


এখানে নির্যাস চুষে মানুষ 

শিশু, যুবা, বৃদ্ধ- স্তর বিশেষে 

পেশিবহুল হয়ে দাঁড়ায় ক্রমে...


মোহন চিত্তের কাদামাটি সোঁদাগন্ধে

নির্বাক সব গন্ধবণিক


পর্বতারোহী চড়তে চড়তে দেখে 

ঝর্ণাধারা ঢেউ ভেঙে নামে তীব্র বেগে 

শীতল ধারায় ফুটে -

নাম জানা- অজানা ফুলের সমাহার


রিমঝিম বর্ষণ- ভেজা শরীরে 

উন্নত শির ভেসে ওঠে প্রকৃতির কূলে।


পদাবলি : ০২

পদাবলি : ০২

 



সাদৃশ্য

বঙ্কিমকুমার বর্মন


বসে আছি একা, পাশে কেউ নেই তবুও বুকে বাঁধি শুক্লপক্ষের গান । মনে হয় প্রতিটি রাত্রি আনন্দে লাফিয়ে উঠছে দুই চোখে। পথে ঘাটে জোনাকির আলোর মহড়া, ঝলকে ওঠে হৃদয়ের গভীর বনভূমি। আড়ালে কত পাখি নিবিড় যাপন বুনে চলেছে রোজ কোমল আশ্রড়। বেদনাহত চাঁদ নেমে আসে গোবরজলে নিকোনো উঠোনে, পরম মমতায় হাত ধরাধরি করে বসাই চায়ের টেবিলে। দেখি আমাদের দু’জনেরই অনেক দুঃখ জমে আছে জামার বোতামে ।



গোপনে বিপন্ন

আকিব শিকদার


সোনার পিঞ্জিরা রেখে উড়ে যায় পোষা পাখি

সোনার কী দাম আহা রইল তবে

ঘরের বধূই যদি গেল চলে পৃথিবী ছেড়ে

রুপালি খাটটি না হয় পড়ে থাক নীরবে।


মেঘ কেন মিশে যায় গহিন নীলিমায়

হাসে না হাসনাহেনা বিপন্ন বাগানে

জাল ছেঁড়া মাছ দেখায় লেজের দাপট

চলে গেল যে তার লাগি মন কাঁদে গোপনে।


সে যদি গেলই চলে একাকী নিস্বর্গে

আমার থরোথরো বুকে কে ঘুমাবে খোঁপা খুলে

এতই যদি রবে অটুট তার অভিমানÑ

আমার চুরুটের ধুঁয়া প্রজাপতি হবে কার চুলে!!



উৎসব

মাজরুল ইসলাম


বিকাশ ও উৎসবের জন্য

একেকজন স্ব স্ব মহিমায় মদমত্ত !


বিকাশ ও উৎসব আছে তাই

প্রভাতী নবীন সূর্য ধর্ষিত হলে রক্তেভেজা অন্তর্বাস

কিংবা লাশ নিয়ে

কুকুর শেয়াল উৎসব করে প্রতিদিন।



নদীমাতৃক

মহাজিস মণ্ডল


তুমি আড় চোখে তাকিয়ে দেখো

সমস্ত দৃশ্য দু’চোখের তারায় ভাসে


অপরাহ্ন পেরিয়ে উড়ে যাচ্ছে পাখি

নদীজল ঘুরে ঘুরে কথা কয়

একান্ত জীবনের কথা


আমি শব্দ ছুঁয়ে, ছুঁঁয়েছি তোমায়

তোমার শরীরের সকল দহন

কিংবা সকল বর্ণপরিচয়

আমাকে সহসা করে দেয় নদীমাতৃক

যায় কোনও দেশ নাই কোনও সীমানাও নাই...



খুঁজি ফুলের রঙ

আশ্রাফ বাবু


নগ্ন বৃষ্টি ফুলের তোড়া জলের গভীরতায় 

ভুলে যাওয়া মুখগুলোর মতন একটি মুখ,

রাস্তার কাছে বসন্তঋতুর রাজত্ব তোমার। 

ভবঘুরে স্বচ্ছতায় বৈভবী মুখশ্রী

ঈর্ষা করি জলের বিছানায় ভালোবাসার পথ খুঁজে। 


পথগুলো চোখের জল চায় না,

চোখ যতোটা দেখতে পারে, বহু দূর চোখ স্নান করায়।

মার্জিত চিত্রকল্প একগুয়েঁমি ঠোঁটে তোমার, 

চোখ দিয়ে জেতা দৃষ্টির মতন

খুঁত আর সততা বিদায়।


চোখ তার ভেতর আমি সমুদ্র যাত্রায় উপস্থিত 

দেখি অনন্তকালীন নিঃসঙ্গতা, তার বেশি কিছু নয়।

যতোটা তুমি জানো এ কথা মেঘের জন্য বলেছি

সমুদ্রের  জন্য বলেছি, প্রতিটি ঢেউয়ের জন্য 

দেখা আর স্বর্গ শব্দের কাছে হাতের জলে।


সহজে বাতাসের স্বাদ নেবার প্রয়োজনে বেঁচে থাকা

ভালোলাগা উপভোগের খাতিরে চেয়ে থাকা।

চরম মুহূর্তে চোখ  সব কিছুতেই রাজি

লাল ঠোঁটের চেয়েও লাল ঠোঁট উদ্ধারপ্রাপ্তি।

খুঁজি ফুলের রঙ বদলাবার উপহার  

মনোরম জীবনের মতন দিনের শেষে। 


ষাঁড়ের লড়াই

ষাঁড়ের লড়াই

 



ষাঁড়ের লড়াই 

রফিকুল নাজিম 


১.

বাহেরচরে আজ রঙ লেগেছে। সবকিছুতে একটা উৎসব উৎসব আবহ। মেঘনার পাড়ের এই গ্রামে আনন্দ দোলা দিয়ে যাচ্ছে। গ্রামে দূরদূরান্ত থেকে আত্মীয় স্বজনও আসছে। উৎসবটা যেন বাহেরচরের সকল মানুষকে একই সুতায় গেঁথে ফেলছে! আগামীকাল বাহেরচরের উত্তরপাড়া ও দক্ষিণপাড়ার মধ্যে ষাঁড়ের লড়াই হবে। একটা টমটম নিয়ে করম আলী সারাদিন গ্রামে ঘুরে ঘুরে মাইকিং করছে। ঠিক বিকেল ৩টায় স্কুল মাঠে এই লড়াই শুরু হবে।

করম আলীর মাইকিং শুনেই ছালেমা বশিরের হাতটা আরো শক্ত করে চেপে ধরলো। ষাঁড়ের লড়াইয়ের ঘোষণা শুনে তার মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল! অজানা একটা আশঙ্কা তার মনে কালো মেঘের মত দিগ্বিদিক ছুটছে। মেঘনার নয়া জলের মতই দুঃশ্চিন্তার ঢেউ তার বুকে আছড়ে পড়ছে।

- বশির, তুমি আমারে কতা দেও। তুমি এইসব লড়াই-ফড়াইয়ে যাইবা না।

- কও কী, ছালেমা! দীর্ঘ দশ বছর পর আবার আমাগো গেরামে আবার ষাঁড়ের লড়াই অইবো- আর আমি যামু না? আর এই লড়াইয়ের মূল আয়োজক তো তোমার চাচা!

- না গো, যাইবা না। আমার ডর লাগে। আর রজত চাচার মতিগতিও আমার কাছে ঠেকে না। হের মনে যদি কুনু কু-মতলব থাহে?

- আরে না। তোমার চাচায় জেলজুল খাইট্টা অনে ভালা অইয়া গেছে। আল্লা খোদার নাম লয়। হেয় আর আগের মত টেঁটাবাজ না।

- তবুও। তুমি আমারে কথা দেও। তুমি যাইবা না।

- আইচ্ছা। এইসব কতা রাখো ত। তুমি অহন বাড়িত যাও। কেউ দেখলে দুইজনের কপালেঐ দুঃখ আছে।

মুন্সি বাড়ির মেয়ে ছালেমা। সে রজত মুন্সির ভাতিজী। বাহেরচরের টেঁটা যুদ্ধের দুর্ধ্বষ যোদ্ধা এই রজত। দশ বছর আগে সামান্য কথা কাটাকাটি নিয়ে উত্তরপাড়া ও দক্ষিণপাড়ার মধ্যে টেঁটা যুদ্ধ হয়েছিল। বশিরের বাবাকে টেঁটা আর ছেনি দিয়ে নির্মমভাবে খুন করছিল এই রজত। সেই মামলায় রজতের সাত বছরের জেল হয়েছিল। মাসখানেক আগে ছাড়া পেয়েছে। এখন লম্বা জোব্বা পরে। তজবিহ হাতে আল্লাহ আল্লাহ জিকির করে। বশিরের বাড়ি উত্তরপাড়ায়। খাঁ বাড়ির পোলা। বাহেরচরের প্রভাবশালী এই দুইবাড়ির মধ্যে অনেক আগে থেকেই এই সাপে নেউলে সম্পর্ক। তারা টনটনা বাহুর শক্তি প্রদর্শন করেছে অনেকবার। হতাহতও হয়েছে বেশ কয়েকজন। হামলা মামলা। জেল-জুলুম। সবই এখন ইতিহাস। সেই টেঁটা যুদ্ধের পর বাহেরচরে আর কোনো টেঁটা যুদ্ধ হয়নি। বাহেরচর এখন শান্তির জনপদ। এই গ্রামে এখন রাতে বিজলি বাতি জ্বলে। আগের কাঁচা রাস্তাগুলো কালো কুচকুচে পিচে ঢেকে গেছে। এই চরাঞ্চলেও এখন সাঁইসাঁই করে চলে সিএনজি, টমটম। গ্রামে নতুন একটা হাই স্কুলও হয়েছে। ছেলেমেয়েরা এখন আর দা'য়ে শান দেয় না। টেঁটায় শান দেয় না। তারা এখন নিজের মগজকে শান দেয়। কালো কালো বর্ণের মাঝে খোঁজে আগামীদিনের স্বপ্ন। পূর্বপুরুষের কলঙ্কের দাগ মুছতে চায় তারা।

২. 

সকাল সকাল আজমত খাঁয়ের গোয়াল ঘর থেকে ফাটাকেষ্টকে চারজনে টেনে বের করেছে। গোসল শেষে সরিষার তেল মাখা ষাঁড়ের পিঠে সূর্য ঝিলিক মারে। গত দুই বছর ধরে আজমত খাঁ অনেক সেবা যতœ করে কালুকে লড়াইয়ের জন্য তৈরি করেছে। কালুর নামটা হঠাৎই গতকাল ফাটাকেষ্ট রাখা হয়েছে। খেলার মধ্যে হঠাৎ কালু নামটা শুনে যদি ষাঁড়ের মাথাটা বিগড়ে যায়! যদি মাইন্ড খায়! তখন তো খাঁ বাড়ির নাক কাটা যাবে।

ফাটাকেষ্টকে বাহারি ফুলের মালা পরিয়ে স্কুলের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বশির। ফাটাকেষ্টর পেছন পেছন বাদকরা বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে। তারও কিছুটা পেছনে উত্তরপাড়ার শত শত মানুষ হাঁটছে। দেখলে মনে হয় যেন কোনো নির্বাচনী মিছিল!

স্কুলের মাঠে লাল নীল কাপড়ের প্যান্ডেল। কড়ই গাছের ডালে উত্তর ও দক্ষিণ দিকে মুখ করে বাঁধা দুইটা মাইকে মমতাজের গান বাজছে- ‘ফাইট্টা যায়।’ মাঠের ঠিক মাঝখানে চারদিকে বাঁশ দিয়ে ষাঁড় লড়াইয়ের জন্য মাঠ তৈরি করা হয়েছে। মাঠে হাজারখানেক মানুষের ঢল। গাছের মগডালে বসে আছে পাড়ার দুষ্টু শিশু কিশোরের দল। মহিলাদের জন্যও ব্যবস্থা করা হয়েছে পূর্বপাশে। বউঝিয়েরা নতুন কাপড় পরে সেজেগুজে এসেছে। মুন্সি বাড়ির ষাঁড়টি ইতোমধ্যে মাঠে গ্যাঁগো গ্যাঁগো করছে। শক্তির দিক থেকে সেও যে কম না- শিং দিয়ে মাটি খুঁড়ে তাই যেন সে জানিয়ে দিচ্ছে! 

করম আলী মঞ্চে ঘোষকের আসনে বসা। সে ঘোষণা দিতে শুরু করলো, ‘এখনই শুরু হতে যাচ্ছে বাহেরচর গ্রামের শতবষের্র ঐতিহ্যবাহী খেলা ‘ষাঁড়ের লড়াই’। দক্ষিণপাড়ার মুন্সি বাড়ির ডনের সাথে লড়বে উত্তরপাড়ার খাঁ বাড়ির ফাটাকেষ্ট। স্কুলের হাবিব মাস্টার এই খেলার রেফারি। তার হাতে বাঁশি। হাবিব মাস্টার বাঁশিতে ফুঁ দিতেই শুরু হয়ে গেল লড়াই। ষাঁড়ে ষাঁড়ে লড়াই। পাড়ায় পাড়ায় লড়াই। উত্তরপাড়ার ডন আক্রমনে গেলে উত্তরপাড়ার সবাই করতালি দিচ্ছে। তেমনি দক্ষিণপাড়ার ফাটাকেষ্ট আক্রমণে গেলে করতালি দিচ্ছে বশিরেরা। লড়াই চলছে সমান তালে। শক্তির বিচারে কেউ কারো থেকে কম না।

হঠাৎ মঞ্চের কোণায় কয়েকজনের জটলা পেকে গেছে। তর্কাতর্কি থেকে হাতাহাতি। দৌঁড়াদৌঁড়ি। যার যা কিছু আছে- তাই নিয়ে টেঁটা যুদ্ধে নেমে গেছে। বাহেরচর যেন ঠিক দশ বছর আগের দিনে চলে গেছে। বাতাসে মানুষের আর্তনাদ। গোঙানির শব্দ। রক্তের চোরানালা নেমে যাচ্ছে দক্ষিণের মেঘনার দিকে। রজত মুন্সির ছোড়া টেঁটা এসে বশিরের বাম হাতে বিদ্ধ হয়েছে। বশিরের চোখ সে দিকে না। সে এখন বুনো ষাঁড়ের মত গোঁগোঁ করছে। রক্তে তার তুফান উঠেছে। ডান হাতে তিনটা টেঁটা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে  বশির। হৈ হৈ করে এগিয়ে যাচ্ছে উত্তরপাড়ার সকল নারী পুরুষ। তাদের চোয়াল আজ আরো বেশি শক্ত ও দৃঢ়। তাদের চোখেমুখে দাবানল। ছড়িয়ে যাচ্ছে। ছাড়িয়ে যাচ্ছে রক্তে। বশিরদের আক্রমণ ঠিক সুবিধার মনে হয় না রজতের। তাই পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। বয়সের ভারে রজতের দমেও ভাটা এসেছে। রজত পড়ে আছে খোলা মাঠে। তার বুকের ওপর বসে আছে বশির। পিতার হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে সে আজ আকাশের দিকে নির্লিপ্ত চোখে কিছু একটা দেখছে। হয়তো তার পিতাকে কিছু একটা বলছে।

পিছমোড়া বেঁধে বশিরকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। রাস্তার পাশ থেকে এসে বশিরের পথ আগলে দাঁড়ায় ছালেহা। তার হাতে টেঁটা। বশিরের রক্তেমাখা হাতের দিকে টেঁটা এগিয়ে দিয়ে বলে- ‘যাওনের আগে আমার বুকের মধ্যি এই টেঁডা মাইরা যাও।' কথাটা শোনার পর বশিরের চোয়াল আরো শক্ত হয়ে আসে। পুলিশের সাথে হাঁটতে হাঁটতে সে অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। মেঘনার উন্মাতাল ঢেউয়ের শব্দকে ছাপিয়ে সে ছালেহার বিলাপ স্পষ্টতই শুনছে।


নরসিংদী। 


ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৯

ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৯

 তারুণ্যের শিল্প সরোবর : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৯

শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১























গাঙ ভাঙা চরে বুক ভাঙা মানুষ !

গাঙ ভাঙা চরে  বুক ভাঙা মানুষ !


গাঙ ভাঙা চরে বুক ভাঙা মানুষ

মিসির হাছনাইন 


তখন মাঘ মাসের মাঝামাঝি। উত্তরের বাতাস মনে হয় চলমান মানুষটাকে উড়িয়ে নি যেতে পারবে। ভরদুপুরে সুরেলা গাছের পাতা কণ্ঠে একটানা ডেকেই যাচ্ছে ঘুঘুপাখি। উত্তাল মেঘনা কেমন শান্ত এক পুকুর, পরিষ্কার জলের গায়ে কতগুলো বক উড়ে উড়ে নদীটা পাড়ি দিয়ে ঐ চরের কেওড়া বনে চলে গেল। নদীর জল জোয়ারেও খাল পর্যন্ত আসে না, জুতা পায়ে খাল পেরিয়ে গেলেই মাঠ, দশ কদম হাঁটলেই নদী। ঐ তো ভাঙা টিলার উঁচু জায়গায় বিন্দি জালে বাগদা চিংড়ির পোনা ধরছে সবুজ মাঝি। তিনি এই গাঁয়ের জামাই, পুবের চর মানিকায় ঘর, সৎ বাপের ঘরে মায়ের ছলছল চোখ আর দেখবে না বলেইথ বছর দুয়েক আগে বর্ষার এক বৃষ্টিতে নৌকার গুন টানতে টানতে... এতদূর মায়ের দেশ নদীর পাশে বেড়ীবাঁধ, মামা ছলিমের নৌকায় ওঠে মাছ ধরতে যায় সাগরেরও আগে, যৌতুকের দেড় লাখে একখানা নৌকায় বিশ বছরের নয়া যৌবনের ঘর পেতেছে বাবলা গাছের তলে। আর কখনও সে চর মানিকায় গিয়েছিল কিনা তা অজানাই থাক। উচ্চতায় গুল্ম বৃক্ষের সমান, কালো গায়ের রঙ মেখে কত সহজসরল এই মানুষটা বছরের পর বছর ধানিয়াপুর গাঁয়ে বিড়ি খাওয়া কালো ঠোঁটে হেসে হেসে জীবন ভাঙছে মেঘনা নদীর কূলে।


তিন বছরের সংসার, বীণার বয়স পনেরো থেকে ষোলতে পড়েছে.. তখনই তাঁর বিয়ে হয়। লাজুক স্বভাবের এই ষোড়শী কখনও কোন পুরুষের ছায়ায় দাঁড়িয়েছে কিনা তা বলা মুশকিল, কত সহজ, আর, কত ছোট ছোট চাওয়া পাওয়া তাঁর। পড়াশোনা ক্লাস ফাইভ, কোন রকমে দুই বেলা খাওয়া তিন বোনের অভাবের সংসারে, মা তাঁরে উপজেলা শহরে কাজে দেয়থ পৌর কাউন্সিলর জলিল মুন্সীর ঘরে। মফস্বল শহরের হাওয়ায় বছর ঘুরতেই বীণাকে যে কেউ দেখলে বুঝতেই পারবে না নদীর কূলে ঘর। বুকের ওড়না ভালোমতন জড়িয়ে নিতে গেল পাশের ঘরের কলেজ পড়–য়া রিপনের তাকিয়ে থাকা প্রেম লুকিয়ে রাখা চোখথ ধরা পড়ে গেলে বীণা চলে আসে গাঁয়ে। এর কয়েকদিন পরই বীণার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের বছরই তাদের প্রথম সন্তান মারা যায়, কখনও মনেই হয়নি, মৃত জন্ম দেওয়া ছেলে বুকে জড়িয়ে কেটে যাওয়া শোক মুছে বীণা আবার আগের মতন হাসবে, পরাণের স্বামীর জন্যে একলা ঘরে শুয়ে শুয়ে চেরাগ জ¦ালা আলোয় শ্যামলা মুখখানা অপেক্ষায় অপেক্ষার রাত জাগবে, বিছনার ফুল কত সুন্দর সাজবে।

বুকের শোক গোপন করে আবার মা হয় বীণা।

সেবার ইলিশের মৌসুম। নিজের ছোড নাওখান বেচে দিয়ে আবার মামার নৌকায় ওঠে সবুজ। নদীর এদিকটার চেয়ে সাগরের আগে নদীর ¯্রােতে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যায়। তার কারণে অনেক নৌকা এক মাসের খরচে সাগরের কাছাকাছি সামরাজ যায় মাছ মারতে। মামার নৌকা এক মাস পর, সামরাজ থেকে ফেরার দিনে মামাতো ভাই আকরামকে বলে সে চিটাগাং চলে যায়। ততদিনে ফোনে ফোনে কথা হতো বীণার সাথে, বীণাদের ঘর ছিল দুই ঘর পরেই, পনেরো দিন পর পর সবুজ দুই হাজার করে টাকা পাঠাতো। আন্তরিকতায় ভরপুর এই মানুষটা ভালোবেসে ঘর ছেড়েছে, দূর দেশের মানুষকে করেছে আপন। বাপ মরা এতিম এই ছেলেটার কাহিনী আমি লিখছি.. তার আগে চলুন গায়ের মাঝখান থেকে ঘুরে আসি।


২.


নদীভাঙা ধানিয়াপুর গাঁও। মাঝখান দিয়ে যে রাস্তা পুবে মেঘনার বেড়ীবাঁধথ উত্তর-দক্ষিনে চলে গেছে নদী ঘেঁষে আর পশ্চিমে আনন্দ বাজার হয়ে উপজেলা শহরের দিক চলে যাওয়া রাস্তার দু ধারে পাশাপাশি নদীভাঙা মানুষের ঘর, এদের প্রায় সবাই ছিল এককালে কৃষক, সময়ের চলে যাওয়া দিনে এখন কেউ কেউ বাজারের ব্যাবসায়, তিন, চার ঘরের কেউ শিক্ষক, চৌকিদার, দলিল লেখক, গাঁয়ের মেম্বার। নদী থেকে বের হওয়া বিশাল বড় খালটা এখন বাঁধ দিতে দিতে হয়ে গেছে ছোট ছোট পুকুর। পুরো গাঁয়ে একশো খানা ঘর, বেড়ীবাঁধের উপর নদীর আয়ে খাওয়া মানুষের এক কালের কষ্ট, না খেয়ে থাকার দিন অনেকটা মুছে গেছে। এই একশো কি তার একটু বেশি পরিবারথ ধনিয়াপুর মতলব হাজী হাওলাদার জামে মসজিদে সব পেশার মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক আল্লাহর উপসনায় নিজের জানা দুঃখে নীরবে কাঁদে, আহা! সবাই খোঁজে পরকালের সুখ। 


একটু আগে ঘরের সামনে রাস্তায় ওঠে পুকুরের ঐ পাড় মেম্বার বাড়ির ঘাটে, রতন মেম্বার দেখলাম বসে আছে। হঠাৎ হৈ চৈ আওয়াজ আর কান্নার বিলাপে আকরাম এক ভোঁ দৌড়ে চলে আসে মেম্বার বাড়ির উঠানে। মেম্বারকে কাঁধে ভর করে ঘরের বিছনায় শোয়ানো হল, ডাক্তার আসবে বাজার থেকে, একটু চেকাপ করে ওষুধ দিলেই ত সুস্থ, এর আগেও অনেকবার এই অবস্থায় পড়তে হয়েছিল তাঁকে। মাথায় তেলে পানি দিতে দিতে সিলিং ফ্যান ঘুরলেও অনেকে বাতাস দিচ্ছিল, হঠাৎ শোয়া থেকে ওঠে বসে, তারপর বমি করে, এবং চিৎকার দিয়া বলে- “ওরে বুকটা বুঝি গেলো রে”.... পুরো শরীর একবার ঝাঁকুনি খেয়ে চোখ দিয়ে প্রাণপাখি উড়ে গেছে ঐ আকাশে। আহা! দিব্যি সুস্থ মানুষটা দুনিয়া থেকে পাড়ি দিল পরপারে। হায়রে!! মানুষের মৃত্যু, কত সহজ, কতটা সত্য 

যেমন দেখি না পিঠের দাঁগ, পোড়া হৃদয়।


শোকে ঢাকা পুরো গাঁয়ের পশুপাখি, গাছপালা দিনের সূর্য আর রাতের অমাবস্যা। চিটাগাং থেকে খবর পেয়ে সবুজ গাঁয়ে আসছে পরশু। বীণা পোয়াতিথ অন্য সবার মতন তাঁরও জানতে ইচ্ছা হয় পেটের সন্তান ছেলে নাকি মেয়ে।

তবে, যা হা হোক বীণা তাতেই খুশি। সেদিন সন্ধ্যায় ছোট ছোট চুল আর লাল রঙের শার্টে সবুজকে দেখেই বীণার শরম লাগে, এতদিনে সে তাঁর স্বামীর মুখ দেখেনি, শুধু হৃদয়ে খুঁজেছে, যখন তখন কাছে চেয়েছে, আজ হয়তো হঠাৎ দেখায় বুকের ভেতরকার শরম নাকি অন্যকিছুথ

বুঝে ওঠার আগেই বীণা মুখ লুকায়।

“আরো কয়দিন পরে আসতেন। আমি ত ভালোই আছি। দেখবেন, দেখবেন নকশিকাঁথা সেলাই করছি, এই যে ঐখানে দেখেন কতগুলো টাকা জমাইছি...আমগো বাবু হওনের সময় লাগবো, আপনে অনেক হুকায় গেছেন”। একদমে কথাগুলো বললো বীণা।

“হইছে হইছে তুমি এখন রেস্ট লও, এই যে ফল এগুলা খাবা, মামা আর তোমাদের ঘরের জন্যও আনছি, এখন শুয়ে থাকো, উঠতে হবে না, ফল ধুয়েমুছে কেটে দিচ্ছিথ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। ব’লে সবুজ একটা সিগারেট ধরায়, তারপর, বাজারে যায়।

তার ঠিক সাতদিন পর, গভীর রাতে বীণার প্রচন্ড ব্যথা ওঠে। অনেক কষ্টে একটা অটো রিকশা জোগাড় করে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, সবুজের জমানো সব টাকা সে লুঙ্গির প্যাঁচে বেঁধে নেয়। সমস্ত টাকা আর সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়েও সেদিন বাঁচতে পারে নি বাণী ও তার পেটের ফুটফুটে নয়মাসের কন্যা সন্তান। কত অল্পতেই মিলে গেলো তার ছোট্ট সংসারের সুখ দুঃখের হাসিমাখা রাতদিন।

সবুজের বেঁচে থেকেও মরে যাওয়া মুখ যে কেউ দেখলেই মনে হবে আকাশ ভাঙা অপরাধ তাঁর।

এক মাস পর বিয়ে করে রেজিনা নামের এক মেয়েকে।


রবি মৌসুমে ইলিশ ধরা বন্ধ, তিন মাস অবরোধ। এখন জেলেরা রাতদিন বাগদা পোনা ধরছে। একটা কম্বল গায়ে মুড়ে গুটিশুটি নদীর কূল ঘেঁষে উঁচু জায়গাতে যেখানে এক সময় বসতবাড়ি ছিল জোনাক জ¦লা আলোতে দক্ষিণা পিনপিনে বাতাসে সবুজ মাঝি বড় একটা প্লাস্টিকের বাটি থেকে থালাতে পানি নিয়ে হাতের চামচ দিয়ে বাগদা পোনা আলাদা করে পাশের ছোটো বালতিতে রাখছে। রাতদুপুরে পোনা বেশি পাওয়া যায়। একশো পোনার দাম পঁচিশ টাকা। হকার এসে পোনা নিয়ে যায়। রাতদিন মিলে হাজার পোনা ধরতে পারলেই চলে, মাঝেমধ্যে অনেকের পরিশ্রম আর মেধায় হাজার ছাড়িয়ে যায়।


বাগদাথগোলদা পোনা বৈধ ভাবে ধরা নিষেধ আছে, কারণ হাজার হাজার ছোট ছোট মাছ জালে আটকা পড়ে, শুধু পরিনিত পোনা রেখে বাকি জলসহ মাছ ডাঙায় ফেলে রাখে, ফলে সব মাছ মরে যায়। সরকারি ভাবে নিষেধ থাকা সত্ত্বেও অনেকে চুরি করে মাছ ধরে।

এই সময় নদীতে কোস্টগার্ড নৌকা নিয়ে টহল দেয়। যখন তখন যে কেউ ধরা পড়তে পারে, তাই সবাই সতর্ক থাকে।

সবুজ মনে মনে রেজিনার কথা ভাবতেছিল, ঐ তো কাল রাতের ঘটনায় হাতের থালাভর্তি চোখে বাগদা চিংড়ির পোনা রাখতে রাখতে একটা বিড়ি ধরায়, হঠাৎ করে হা হা হা করে হাসে। কিন্তু, কেন হাসলো সে কথা বুঝতে পারে না সবুজ। চারদিকের অন্ধকার আর শীতের বাতাস বারবার  মনে পড়ছে রেজিনার মুখ। নদীর ঘোলা জলে লম্বা বাঁশের সাথে বাঁধা বিন্দি জাল, এক ঘন্টা পর পর টান দিয়ে তুলতে হয়, মাঝখানের বিশ্রামে মাঝির ছোট্ট টঙ ঘরে গিয়ে সোজা শুয়ে পড়েথাকতসব কি জানি হাবিজাবি দেখতেছিল হঠাৎ চোখ খোলে রেজিনাকে দেখতে পেয়ে সবুজ দৌড়ে পালায়।

কিছুদূর গিয়ে একটা উল্টে যাওয়া খেঁজুর গাছের গুড়ির উপর বসে একটা বিড়ি ধরায়। মনে মনে বলে- “শ্লার পুতের শান্তি নাই! কান্তি নাই! তারপর হা হা হা... করে হাসে। কেন যে বারবার হাসিটা চলে আসে বুঝতে গেলেই মনে পড়ে রেজিনার মুখ। না, না বীণার করুণ চোখ


কে যেনো ডাকে, এমন একটা ডাকে তাঁর বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে, এক জীবনে কত পাপ করেছে সে, এক নারীকে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছে, পেতেছে সংসার গাঙ ভাঙা চরে, তবুও ছোট্ট বুকে কতটুকু আশা লয়ে মানুষ নদীর জলে গান গায়থ বুক পোড়া দুঃখে বেঁচে থাকে, তাকিয়ে থাকা চোখে কেমন মুখখানি দেখে দেখে মানুষটা জীবনভর হা হা হা... হাসে।


ডুমুরের ফুল

ডুমুরের ফুল

 



ডুমুরের ফুল

নেহাল অর্ক


আমার স্বামীরে ওরা মাইরা ফালাইছে মুক্তিযুদ্ধের সময়। তহন কিছু বুঝি নাই; নইলে কী তারে যুদ্ধ করতে দিতাম! আমাগো কি লাভ হইছে কিছু? যা হইবার হেগু হইছে। বলতে বলতে ভগীরথী বাজারে যাচ্ছে। সংসারে আয়-রোজগার নাই; একটা গাভীর দুধ বিক্রি করে কোনোরকম চলছে জীবন। যৌবনের চঞ্চলতাকে সে বিসর্জন দিয়েছে একাত্তরের সাথেই।

মাসি কী নিতে বাজারে এলে? সজল, একজন ব্যবসায়ী, জিজ্ঞেস করতেই ভগীরথী কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের কথা বলে। ভগীরথী তার কাছ থেকেই সওদা করে কখনও নগদ দেয়; কিছুটা বাকিও থাকে। নগদ বাকির দেনা-পাওনার মাঝেই নিঃসন্তান ভগীরথী কখন যৌবন পেরিয়ে স্বামীর ঘর ভালোবেসে দত্তপুর গ্রামে পড়ে আছে তা সে নিজেও জানে না। কিন্তু তার এই ত্যাগের মূল্য কই? ক’জনই জানে ক্ষুধা আর জীবনের চাহিদা তাকে যে পরাজিত করে দিয়েছে তার কাহিনী? সজল বাবার কাছ হতে ভগীরথীর কাহিনী শুনে চোখের জলও ফেলেছে; কিন্তু এ পর্যন্তই। একদিন দোকানে বসে ভগীরথী বলেছিলো, রেডিওতে শেখ সাহেবের ভাষণে কিভাবে মোহিত হয়ে নবযৌবনের কোল হতে তার স্বামীকে ছেড়ে দিতেও সেদিন কুণ্ঠাবোধ করেনি। এসব গালগল্পের মাঝেই কেউ একজন বললো, সজল কেমন আছো?

স্যার ভালো আছি; বলেই সজল চেয়ারটা এগিয়ে দেয় জব্বার সাহেবের দিকে। উনি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। জব্বার সাহেবকে দেখেই ভগীরথী চলে যায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একাত্তরের সময়ের কথা বলতে থাকে জব্বার সাহেব। স্যারের মুখের দিকে চেয়ে সজল বলে, লোকমুখে শুনেছি ইদন চাচার ঘরে নাকি অনেক হিন্দু পরিবার স্বাধীনতা সংগ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলো? আয়ুব আলীর গোষ্ঠীর লোকজন নাকি পাকিস্তান বাহিনীর কাছে হিন্দুদের সব তথ্য দিতো?

ঠিকই বলেছো সজল; এরা এখনও দাপট নিয়ে চলছে। এইতো কদিন আগে তাদের গোষ্ঠীর লোকজন একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে; কিন্তু উল্টো মেয়েকেই শাস্তি পেতে হলো।


ঠিকই বলেছেন স্যার, বলেই সজল ও স্যার ভগীরথী ও সমকালীন ঘটনার পূর্বাপর আলাপ করতে লাগলো; আরও দুএকজন এসে যোগ দিলো। এই আলোচনার শুরু হয়; শেষ হয় না। জব্বার সাহেব বাহিরে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, কেউ একজন বিড়বিড় করে বলে ভগীরথীরা আজ খেতে পায় না ঠিকমতো; অথচ রাজাকার ও তাদের দোসররা আজ রাষ্ট্রীয় সুবিধা কুক্ষিগত করছে। জব্বার সাহেব মাথা নাড়ে আর বলে, নদীর ¯্রােতের মতোই সময়ের ডানায় চড়ে স্বাধীনতা পঞ্চাশ বছরের জন্মের ইতিহাস পেরিয়ে এলো; কিন্তু ক’জন এর সুফল পেলো? ভগীরথীর মতো আরও অনেক দরিদ্র মানুষ বঞ্চনা বুকে ধরে ক্ষুধার আর্তনাদে চটফট করছে। তাদের কাছে স্বাধীনতার সুখ ডুমুরফুলের মতোই দুর্লভ ; যা আজন্মকাল অধরাই থেকে যায়।


হবিগঞ্জ।


পদাবলি : ০১

পদাবলি : ০১

 



প্রেম

আনোয়ার কামাল


শুকনো নদীর তলদেশে

জলের ধারা ঘুমিয়ে থাকে

আবারÑ

    সুপ্ত নদী কখনো

আগ্নেয়গিরির মতো জেগে ওঠেÑ

    প্রেমও কী তাই?



তালগাছ ও শিশুতোষ বই

দ্বীপ সরকার


শিশুতোষ বইয়ে

পুরনো একটা তালগাছ

পৃষ্টার এক কোণায়


একটা বাবুই এসে তালগাছে পড়তেই

বইটা নড়ে ওঠে

পাঠরত শিশু বই চেপে ধরে

বাবুইটা শিশুতোষ প্রাণী আগে জানিনি


আমি তালগাছ ধরতে গিয়ে ধরে আনি বাবুই

বাবুই ধরতে গিয়ে তালগাছ

অথচ শিশুদের ধরা শিখলে

গোটা জাতিকে ধরা শিখতাম



কবি ও কবিতা

আদ্যনাথ ঘোষ


এই খোলা চোখ দুটো 

কেবলই শূন্যে 

পড়ে থাকে।

শুধু কবিতার মাঠ সবুজের বুকে  

একাকী ঘুমহীন জেগে থাকে।

খোলা চুলে দুয়ারে দাঁড়ায়

পরাণে উথলিয়া ওঠে 

ঢেউ-নোনা জল

  যেমন মাধবী লতা দোল খায়

বাতাসের গন্ধে মেতে

  ভরা জোছনায়। 

অথচ ঝিলের কান্না 

মিশে যায় গাঙুরের জলের ভিতর।

চাঁদের বুকখানি কাঁদে 

শিবহীন পূজায়।

  যতনে শিল্পের ঢেউ খুঁজে চলে কবি

ছন্দ উপমার ভেতর

  শব্দের দোলায়। 


তবুও মনসার ছোবলÑ  

ভেঙে যায় কবিতার 

বুকের গড়ন।

আর তার রূপ রস 

ধ্বনির শরীর ঘেঁটে 

নারীর ভেতর 

যুবতী সংসারে করে ডুবুরি যাপন।



একটি অপূর্ণ ভালবাসা 

ফারিহা ইয়াসমিন 


শুনেছি ভালোবাসা নাকি রং বদলায়। 

বিশ্বাস করো, যদি তাই হতো বদলে যেতাম আমি। 

এই ছকে বাঁধা জীবনের অপূর্ণ ভালোবাসা থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে তুমি।

 ভালোবেসেছি বটে, তবে তোমার কোন চাওয়াই করতে পারেনি পূরণ। 

 সত্যিই অভিমান হওয়ারই কথা, আর অনুরাগেরও আছে হাজার কারণ। 


কেনই বা ভালোবাসবে আমায় আমি যে বড্ড বেমানান,

কতটুকু ভালবাসি তোমায় কখনো দিতে পারিনি প্রমাণ।

যে ভালবাসায় পূর্ণতার পরিতৃপ্তি নেই, 

পাশে থাকার অঙ্গীকার নেই;

যে প্রেম এত বৈচিত্র্যময়।

সেখানে তো থাকবেই প্রতিমুহূর্তে তোমাকে হারানোর ভয়।


আমি তো তোমার কঠিন দুঃসময়ে পাশে থেকে নির্বিঘ্নে বাড়াতে পারেনি দু হাত।

তোমার কষ্টের সঙ্গী হয়ে কখনো জাগতে পারিনি রাত।

তাহলে কেনই বা মনে রাখবে আমায়, 

আমি যে ভালোবাসাকে দিতে পারিনি পূর্ণতার স্বাদ।


তাইতো হৃদয়ের গভীরে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে শ্যাওলা জমেছে রোজ রোজ,

 হয়তো মনের অজান্তে তুমিও করে চলেছো এক অজানা সুখের খোঁজ। 

 সত্যিই যদি তাই, হয় তবে তাই হোক। 

আমার জন্য ভিজবে না আর তোমার দুটি চোখ।

যত কষ্টই হোক আমার, আমিও নিয়ন্ত্রণ করবো আমার অবাঞ্চিত আবেগ। 

তবে হ্যাঁ শুধু এতোটুকুই মনে রেখো, আমার মনের গভীরতায় চিরদিন রবে তুমি। 

এই পবিত্র ভালোবাসার প্রতিটি পরতে সুখের লীলাভূমি।



সাধক কৃষাণ 

রতন ইসলাম 


কিণাঙ্কে শ্রমের মানচিত্র 

বাস্তবতার অপাঙ্গ চাহনি

চোখের কোণে জমানো ক্লান্তির কাদম্বিনী 

বুকে চাপা পড়া স্বপ্ন-কোঁড়ক 

পিঠ বেয়ে নেমে আসে বাহুচরে

রোদ পোড়াগন্ধ 

বর্ণহীন জীবনকে জিইয়ে রাখার 

জোড়াতালি প্রচেষ্টা 

নিঃসীম ধৈর্যে গিরিপথ ধরে তবুও চলা;

অন্যের উদরে তৃপ্তির-মুক্তির পিদিম জ¦ালাতে

ওখানেই যেন বিরাট স্বার্থকতার শিখর-ছোঁয়া 

সে স্বার্থকতা....

বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণার মন্ত্র জোগায়।




পদাবলি : ০১

পদাবলি : ০১




প্রস্তাব

অসীম মালিক


উনুনে ফিরিয়ে দাও,

হিংসার আগুন !

সাঁঝ প্রদীপের দিকে তাকিয়ে

সলতে হও।


ইজরায়েল, ফিলিস্তিনের রান্নাঘরে এসো,

মায়ের হাতে রান্না খেতে খেতে

দু’জনে হব -

রান্নাঘরের দেশলাই কাঠি।



স্মৃতি সত্তা ও ভবিষ্যৎ 

ধীমান ব্রহ্মচারী


আমি মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম বিকেল ঠিক পৌনে চারটে নাগাদ

ফসিলের আস্তারণ সরিয়ে ভাবলাম এবার ঘরে ফিরতে পারব    


অথচ পারলাম কি ?

বার বার কালো ছায়ার মতো প্রশ্ন গুলো আমাকে ঘিরে পাক খেল পূর্ব থেকে পশ্চিমে

ঘড়িটার কাঁটা ততক্ষণে আরো একটা ঘর পেরিয়েছে


অথচ আমি মরলাম কি?

কফিনের ভেতরকার স্থবির হয়ে পড়ে থাকা মৃত দেহ গুলো যেন ফিরে পেতে উৎগ্রীব তাদের জীবন 

অথচ জীবন ফিরে পাচ্ছে ওরা?


শ্লোগান দল তন্ত্রের ভিত্তি প্রস্তর, আর আমরা জনগণ গড়ছি ইমারত

অঝোর বর্ষায় মাঠ ভেসে যাচ্ছে, জলে হাবুডুবু খাচ্ছি, তবুও শালা মরছি না 


হয়তো মৃত্যু আমাদের ডাক দ্যায় না 


   


ক্ষয় 

তামিম হাসান 


রং পেন্সিলের মতো হচ্ছি ক্ষয়,

কিভাবে যেনো হয়েছিলো হঠাৎ 

আমাদের পরিচয়।

বরষার জলধারায়, 

কে যেনো মেঘের রেলিং ছুঁয়ে দাড়ায়!

বিদ্যুৎ চমকে ক্ষনিকেই হারায়। 

কিছু দৃষ্টি হঠাৎ আকর্ষনের সৃষ্টি! 

এই মেঘময় শহরে শিলাবৃষ্টি।


তোমারে আজ দ্যাখবো

রোদ্দুর রিফাত 


তোমারে দেখিনা অনেকদিন আজ দ্যাখবো;

পুষ্পশরীর নিয়ে এসো— আমি উল্লাস মোড়ের

পাশে জলাশয়ের কাছে রেইন্ট্রিতলায় দাঁড়িয়ে থাকবো।


আজ চুল খোলা রেখে মেরুন হিজাব আলনাতে তুলে

আমার দেওয়া কালো টিপের পাতা থেকে একটা টিপ

ললাটে চেপে নির্ভুল কাজল রেখা টেনে আমার সামনে দাঁড়িয়ো।


তোমারে আজ দ্যাখবো; যেভাবে দ্যাখে নারী

স্বর্ণালঙ্কারের দোকানে পছন্দের নেকলেস—

দ্যাখতে দ্যাখতে তোমার হাত ছোঁব, নাকে নাক ঘষে

নাকফুল থেকে সোনালী উজ্জ¦লতা ধার নিবো,

চিবুকের তিলে রাখবো আঙ্গুল আলতো করে

তখন নিসর্গ কালিমা পাঠ করবে আর আমি তোমার ভিতর যাবো তারপর নির্ভুল বানানে

লিখে দিবো এক দীর্ঘ কবিতা যেখানে হেরে যাবে একটি সন্ধ্যা।




আর কিছু হলো না;

রাকিবুল হাসান রাকিব 


তার সাথে... 

ক’দিন আগে দেখা হলো 

ক’দিন আগে কথা হলো... 


তার সাথে... 

কিছু রাগ; অভিমান; ঝগড়াঝাটি; 

কখনো হাসি; কখনো কান্নাকাটি। 

কভু পাশে; কভু দূরে; কভু মাঝামাঝি। 


তার সাথে... 

সবকিছু হলো জমানো হলো ঋণ;

কখনো আপন; কখনো পর বাজে বীণ 

যাবার বেলা হলো... মন উদাসীন।


তার সাথে... 

আর কথা হলো না; দেখা হলো না;

দিন কেটে রাত হলো দিন হলো না? 

তার সাথে কিছু হলো না। 

কারও প্রতি আমার প্রতি কারও 

রাগ; অভিমান; ভালোবাসা; বদনাম!

আর কিন্তু হলো না; আর কিছু রইলো না।



হেমন্তের বিকেলে

আহরাফ রবিন


হলুদ হেমন্তের বিকেল।

পাতা ঝরা ক্ষণে

ভেসে যেতে চাই চলে যেতে চাই।


হলুদের ভেতর আজ গুমোট

হাওয়া। অস্থির মাতাল সময়।


মাঠে কার্তিকের ধান-

ইছামতি আর কালিগঙ্গায়

শান্ত জল- মৃদু শীতল স্রোত।


নবনীতা

            বৃক্ষ

                 নদী

কবিতা- আমি চলে যাচ্ছি

এই হেমন্তের খোলা হাওয়ায়।



বেদনার নীল বালুচর

জান্নাতুন নাহার নূপুর


আজ আমি বলতে চাই

আমার স্বপ্নের পুরুষের কথা

স্বপ্নে আসা সেই পুরুষটি একজন বীর পুরুষ

স্বপ্নের ভেতর দেখি তাকে অনিমিখ লোচনে

কি মায়া! তার চোখে

কি ভালোবাসা! প্রশস্ত চওড়া বুকে

যে বুকে ঠাঁই পেয়েছিল এই বাংলা

ঠাঁই পেয়েছিল কুলি-মজুর

ঠাঁই পেয়েছিল কৃষক-শ্রমিক

ঠাঁই পেয়েছিল অনাহারে থাকা, কষ্টে থাকা

বঞ্চিত, লাঞ্চিত বেদনাহত মানুষগুলো।

ঠাঁই পেয়েছিল এই বাংলার প্রতিটি মানুষ।

অষ্টরম্ভা এই জন্মভূমিতে জন্ম দিয়েছিল স্বাধীনতার

বপন করেছিল সোনার দেশ, বাংলাদেশ।

সোনার দেশে আমার স্বপ্নের পুরুষটিই একদিন ‘বলি’ হলো,

তাঁকে শুইয়ে দিলো চিরনিদ্রায় লাল পাঞ্জাবী পরিয়ে

তাঁকে আর তাই ছুঁয়ে দেখা হলোনা আঙ্গুলের ডগায়।

স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে যাবে আজীবন

তাঁর স্মৃতিকে শূন্য বুকে আকড়ে ধরে বাকিটা পথ

হাঁটতে হবে অজানার পথে.....

ভালো থেকো স্বপ্নের  প্রিয় পুরুষ আমার,

আমি থেকে গেলাম

বেদনার নীল বালুচরে!


শব্দমালা : সাদিক আল আমিন

শব্দমালা : সাদিক আল আমিন



শব্দমালা

সাদিক আল আমিন


জেঠ মাস


জেঠ মাসে ওরা বিয়ে করে। জেঠ মাসে ওরা পানপাতা চিবিয়ে বৃষ্টিতে নাচে তা-ধিনধিন। বৃষ্টি থামলে ওরা হলদে সালোয়ার পরিহিতা নির্লিপ্ত বালিকাকে ভিজে চপচপ হেঁটে যেতে দেখে। দেখতে দেখতে মেঘ ঘনিয়ে শুরু হয় ঝড়। জেঠ মাসে ওরা ঝড়ের বিপরীতে নিজেদের দেহ ঋজু রাখার চেষ্টা করেÑ উড়োচুল সারিসারি ডাবগাছের মতো। জেঠ মাসে সব হলুদ ভিজে যায়। জেঠ মাসে সব গাছে মৌসুমি ঘ্রাণ। জেঠ মাসে ওরা টিনের ছাউনিওয়ালা টাঁটির বেড়ার ঘর বানিয়ে থাকে ফাঁকা কান্দরেÑ তালগাছের বাবুই পাখি যেন। একটু পরেই আবার উড়ে যায় টিন, তাঁতিবাবুইয়ের বাসা, হলুদ সালোয়ার। জেঠ মাসে শ্বশুরঘর থেকে আব্বার বাড়িতে ফিরে আসে ঘরজামাই সোলটেশ। গত জেঠেই ওর বিয়ে হয়েছিলÑ মনে করতে করতে বৃষ্টিতে ভিজে আর পানপাতা চিবায় সে।



অতীতকাল


বুনোহাঁস খুঁটে খুঁটে খায় মানুষের

মাটিতলে লুকিয়ে রাখা অতীত


খেয়ে বড় হয়; হতে হতে

বুকভর্তি পালকে মেলে দেয় সমস্ত শাদা

শাদার ভিতরে লুকিয়ে থাকে ধরণীর ওম

ওমের ভিতরে থাকে সুখ, অন্তিম আমোদ

বুনোহাঁস আমোদে ডানা মেলে উড়ে যায়

ফেলে যায় তার নিজের অতীত

মানুষ সেই অতীত চুমে কবিতা লেখে উপমায়


অথচ নিজের অতীত নিজের কাছে 

কেন এত তেতো লাগে প্রিয়?



গন্ধবকুলের শুভ্রশোক


আমার ভীষণ রোগা দাদীমার ক্রমেই কমছে আয়ু

সেই সাথে দাদাও পাল্লা দিয়ে যুবক হয়ে ওঠে

কী করুণ জীবন দান করে আবার থেমে গেছে জরায়ু!

ভাঙা রাতের ভেজানো কপাটে জীবনকথা ফোঁটে

আমি ছোট শিশু হবে বয়স চার কি পাঁচ 

আলোহীন কলহাস্যে দেখছি কতো শোক

ভুলে থাকো যদি, পারবে না কখনো করতে আঁচ

দেখে ফেলেও না দেখার ভান করা অসতর্ক চোখ


নিভু নিভু চেরাগের কেরোসিন মৃদু হাওয়ায় কাটায় রাত

দেখে নিও তখনÑ হাফপ্যান্ট-পরা আমাকে, ভাবুক

জীবনের জানা নেই আছে তখনো কতো ঘাত-প্রতিঘাত

আমি গালে হাত দিয়ে একা বসে থাকি উজবুক 

দাদা পিঠে শীর্ণ হাত চাপড়ে বলে, ‘বেটি সে কার?’

আমি অকস্মাৎ খুব চমকে লজ্জায় মুখ চেপে ধরি তার




বিরতি


আরও একটু সময় দিলে

হাসবো আমরা


আপাতত বিষাদ নিয়ে

থাকতে দাও

কিছুটা সময়


কে জানে!

হয়তো-বা বিষাদেই লুকোনো আছে

তোমার হারানো গ্রাম, সবুজ ধানখেত

আমি কেবল-ই কৃষক হয়ে

চষে বেড়াই তোমার ভূমি

সহস্র বর্গমাইল


আপাতত বিষাদেই থাকি নিহিত

বৃষ্টিরাত, ঝড়গ্রাম, বোশেখ, রাতের বাতাস

কেমন শূন্যসুখের লোভ জাগায়!

তোমাকে পাওয়ার থেকেও

লোভনীয় সে লোভ


আরও একটু সময় দাও

বিষাদ চুমি

তারপর না’হয় মিথ্যে হাসি

হাসবো দু’জন!