ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৭৯

ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৭৯

 তারুণ্যের শিল্প সরোবর : ধানশালিক : সংখ্যা ১৭৯

শুক্রবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২২














ফিরে পাওয়া...

ফিরে পাওয়া...

 



ফিরে পাওয়া

মো. আরিফুল হাসান


রাত তিমির। কুয়াশার চাদর ভেদ করে দুজন মানুষ চলছে। হেমন্তের রাতে তাদের পায়ের নিচের ভেজা পাতাগুলো মচমচ করে ভাংছে না। তবু সামান্যতম শব্দে তারা চমকে চমকে উঠছে।

করিমের বৌকে ভাগায় নিয়ে যাচ্ছে রহিম। রহিম এ বাড়ির কাজের ছেলে। করিম বিয়ে করেছে আজ ছয় বৎসর হলো। কোলে ছেলেপুলে নেই। গেরামের ডাক্তার ওষুধ দিয়েছে আমেনাকে। কিন্তু কাজ হয়নি। আসলে ওষুধ উল্টো জাগায় পড়েছে। অসুখটা করিমের।

করিম মুন্সি এ গায়ের জমিদার। হ্যা, জমিদারই বলা চলে। তবে ইতর জমিদার। গ্রামের প্রায় অধিকাংশ জমিজিরাত করিমের নিজের নামের। বাপ-দাদা চৌদ্দপুরুষের আমলে কী করে যে এত জাগা-সম্পদ তাদের হাতে চলে এসেছে তা কেউ জানে না। তবে বুঝতে শিখে, করিমকে দেখে তারা বুঝতে শিখে কী করে ধন-সম্পদ বাড়াতে হয় এবং রক্ষা করতে হয়। ছাব্বিশ দোন ক্ষেত করিমের। অথচ কোনোদিন দোকানে বসে এক কাপ চা পর্যন্ত খায়নি। ধান পেকে গেলে, যখন কামলারা সবাই দুই হাতে ধান কাটে করিমের ক্ষেতের, তখন করিম পিছা হাতে তাদের পেছনে পেছনে ঝাড় দেয়। মাটিতে লুকিয়ে থাকা পাখিদানাটুকুও করিম খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তোলে। নিজের শষ্যের একবিন্দু সে ছেড়ে দিতে রাজি নয়।


আশ্বিনের রোদ। আমেনা বধু হয়ে আসলো এ বাড়িতে । ঘোমটা পড়া চামেলি ফুলটা এত বড় বাড়ি দেখে খুশি হয়েছিলো। ভেবেছিলো স্বর্গ হয়তো সয়ং নেমে এসেছে তার কপালে। বাড়িতে কাজের লোকের অভাব নেই। দু’তিন জন রাখাল। সারাবছর ক্ষেত-খামারি দেখার জন্য জনাতিনেক বছর কামলা। আর সকল কামলার কামলা করিম মুন্সি, সে তো নিজেই একশো।

কিন্তু সুখ স্থায়ী হয়নি আমেনার। বিয়ের বছরই শ্বশুরটা মরলো। সেও এক ভয়ানক পিচাশ ছিলো। একমাত্র ছেলে করিমকে নিতে দেয়নি তাকে ডাক্তারের কাছে। লোকে বলে, বুড়োটা চিকিৎসা না করাতে মারা গেছে। করিমের এসব শুনতে লাগে। সে নিতে চেয়েছিলো, কিন্তু বাপটা গো ধরল কি ধরলো! না, ডাক্তারের কাছে সে কিছুতেই যাবে না। হায়াত না থাকলে মারা যাবে। কিন্তু ওষুধ কিনে অপচয় করার মতো ফালতু লোক সে কিছুতেই নয়। করিমও কি কম কৃপন। বাবা একবার বলাতেই রাজি হয়ে যেতো, কিন্তু আমেনা কি মনে করবে? তবু সে দু’তিন বার সেধেছে, বলেছে, মরার সময়ও কি মানুষের ধনের লোভ যায় না। বৃদ্ধ কষ্টে হেসে বলেছে, না যায় না।

আসলে ধনের লোভ আমেনারও যায় না। তাই তার কষ্টটাও বাড়ে। রাত হলে করিম ক্লান্ত হয়ে শুয়ে থাকে পাশ ফিরে। রাতের বেলায় করিমের দেহে জরও আসে প্রতিদিন। আমেনা গা হাত টিপে দেয়। করিম এক সময় ঘুমিয়ে পড়ে। কখনো কখনো বানচিলিকের মতো করিম হয়তো জেগে উঠে। কিন্তু সে ওঠাকে ওঠা বলে না। আকাশের বিদ্যুত চমকেরো স্থায়িত্ব আছে, কিন্তু করিমের নাই।


এভাবে একের পর এক দীর্ঘ দিবস-রাতগুলি পাথর হয়ে গেলে আমেনার মনে বিষ ডুকতে থাকে। বিষের জ্বালায় আমেনা অস্থির হয়। ছোবল মারে কাজের লোক রহিমের উপর। আমেনার বিষ রহিমের সারা দেহে ছড়িয়ে গেলে তারা চুপি চুমি মিল করতে থাকে যোগফলের। একদিন অংক মিলে গেলে তারা পরস্পরের হাত ধরে বেরিয়ে পড়ে নিঃসীম দিগন্তের রাতের অন্ধকারে।

আমেনা হাতটা শক্ত করে ধরে রহিমের। রহিমের পেশিবহুল হাত আমেনার হাতটাকে পেঁচিয়ে ধরে। গ্রামের অন্ধকার ভেদ করে তারা চলছে। রাত বারোটা অবধি তারা হেঁটেছে তিন ঘন্টা, পাড়ি দিয়ে এসেছে তিন ক্রোষ পথ। পথ তবু তাদের ফুরায় না। তাদেরকে যে আরও দূরে যেতে হবে। আরো দূরে, আরো আরো দূরে। অনেক দূরে হারিয়ে যাবে তারা। অনেক দূরে। কোনো এক উপত্যকার তীরে ছোট্ট একটি বাসা বাঁধবে তারা। তাদের কোল জুড়ে খেলা করবে ছোট্ট ফুটফুটে শিশু। সেসব অস্থির ভাবনায় তাদের রাতের পথ তেমন যন্ত্রণাদায়ক মনে হয় না। তারা পরস্পরের হাত ধরে পরস্পরের হৃদস্পন্দন অনুভব করে পথ এগোয়।

ভোরের আগে আগে তারা ছাব্বিশ মাইল পথ চলে এসেছে। আখাউড়া থেকে ভোরের প্রথম ট্রেনে চেপে বসেছে কুমিল্লা গন্তব্য করে। কুমিল্লা এসে তারা সকালের সোনারোদে একটি বাসাও পেয়ে যায়। নদীর ধারে। পালপাড়া ব্রিজের কাছে ছোট্ট দোচালা টিনের ঘরটি তাদের আশ্রয় হয়ে উঠে। ধর্মমতে বিয়ে তাদের হয়নি। কিন্তু মনের ধর্মই বড় ধর্ম। স্বামী-স্ত্রী সংসার করতে থাকে। রহিম সারাদিন কাজ করে সন্ধ্যায় বাসায় আসে। আমেনাকে জড়িয়ে ধরে। বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখে কোয়েল পাখির মতো। চুমুতে চুমুতে আমেনার উজ্জ্বল মুখ রাঙা হয়ে উঠে।




আমেনার এ সুখও সয় না। একদিন দুপুরের নজর পড়ে আমেনার উপর বাড়িওয়ালার। তার নজর তীক্ষè। আমেনাকে বিদ্ধ করে যেনো। আমেনা দ্রুত রোদের আঁচলে শাড়ি মেলে দিয়ে দৌঁড়ে ঘরে পালায়। বাড়িওয়ালা মিটিমিটি হাসে। আরেকদিন দুপুরের বেলায় বাড়িওয়ালা এসে আমেনার কাছে জল চায়। বাড়িওয়ালা চেয়েছে, আমেনা না দেয় ক্যামনে। দরজা খুলে পানি দিতে গেলে ইচ্ছে করে আমেনাকে ছুঁয়ে দিয়েছে বাড়িওয়ালা। আমেনা দ্রুত দরজা ভেজিয়ে মুখ লুকিয়ে কেঁদেছে। রহিম বাড়ি আসলে সবকিছু খুলে বলেছে রহিমকে। রহিম আশ্বাস দিয়েছে খুব শীঘ্রই তারা নতুন বাসা দেখে উঠে যাবে। আমেনা যেনো সাবধানে থাকে সে ইঙ্গিতও দিয়েছে তাকে। কিন্তু ইঙ্গিত কাজ হয়নি। সেদিন রাতেই আমেনাকে তুলে নিয়ে যায় বাড়িওয়ালা। হাত-পা বেঁধে, মুখ বেঁধে মারতে মারতে অজ্ঞান করে রহিমকে গাড়ির ডিকিতে তুলে নিয়ে ফেলে দেয় গোমতি নদীর ভাটিতে। তারপর আমেনাকে নিয়ে বিশ্বরোডের এদিকে একটি হোটেলে উঠে বাড়িওয়ালা।

রাতভর অকথ্য বর্বর আনন্দে মেতে থেকে সকালের দিকে পঞ্চাশ হাজার টাকায় তাকে হোটেলের লোকদের কাছে বিক্রি করে দেয়। হোটেলে সারাদিন তালাবদ্ধ থাকে আমেনা। কাস্টমার এলে বাহির থেকে দরজা খুলে দিয়ে আবার বাহিরে তালা মেরে দেয়া হয়। হোটেলের চার দেয়ালে আমেনার আকাশ দেখা হয় না। সময়ে সময়ে খাবার দিয়ে চলে যায় একটা মানুষ। তাও দরজার তল দিয়ে। কে যায়, কে দিয়ে গেলো কিছুই দেখার সুযোগ নেই আমেনার। কেবল মুখ বুঁজে সহ্য করা ছাড়া তার আর কিছুই করার নেই।

ভাবে, পুলিশ এসে একদিন উদ্ধার করবে তাকে। কিন্তু পুলিশ আর আসে না। হোটেলের এ অংশটা ব্যাজমেন্টের নিচে। ফলে পুলিশ আসলেও উপর দিয়ে সাজানো গোছানো আবাসিক হোটেল দেখে তারা ফিরে যায়। অথবা পুলিশও জানে ব্যাপারটা। হয়তো এ ব্যবসায় তাদেরও হাত আছে, আছে লাভালাভের হিসাব। তাই নির্বিগ্নে চলতে থাকে নগর সভ্যতা ও পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে নগর কদর্যতা।


করিমের বাপের বংশের আর কেউ নেই। নিজের বংশের কেউ হওয়ার আগেই বৌটা ভেগেছে। করিমের কেমন যেনো উদাসীন উদাসীন লাগে আজকাল। কোনো কিছু ভালো লাগে না। কেমন মনমরা হয়ে থাকে সারাক্ষণ। কাজকর্মে মন নেই। জমির ধান শুকিয়ে তামা হতে থাকে। কামলারা বলে, প্রভু, আবার বিয়া করেন। সব ঠিক হয়া যাইবো। কিন্তু কিছুই ঠিক হয় না। করিমের আর বিয়ে করতেও ইচ্ছে জাগে না। কেমন যেনো বৈরাগ্য ভাব চলে আসে তার ভেতর। কেবল রাত হলে প্রবলভাবে মনে পড়ে আমেনাকে। চোখের তারায় তখন আমেনা ভানুমতি-খেল হয়ে দেখা দেয়। তার রাতের ঘুম চলে যায়। একটা গরম আগুন তখন মেরুদ-ের ভেতর দিয়ে জেগে উঠে। প্রবলভাবে নাড়ায় তাকে। একসময় লাভাবিস্ফোরণ করে ক্লান্ত হয়ে ঢলে পড়ে করিম। আহা, সুখ। এই সুখের জন্যই তো আমেনা আজ ঘর ছেড়ে পালিয়েছে। আগে এমন সুখের মজা বুঝলে তার হয়তো চামেলি ফুলের মতো বৌটাকে হারাতে হতো না।

ডাক্তারের কাছে যায় করিম। ওষুধ খায় যৌনশক্তি বাড়াতে। তারপর প্রস্টিটিউটের খোঁজে যায় শহরের দিকে। বাড়ি থেকে ছাব্বিশ কিলোমিটারের পথ আখাউরা। সিএনজিতে যেতে বড়জোড় ঘন্টাখানেক লাগে। তারপর ট্রেনে উঠে সোজা কুমিল্লায় গিয়ে নামে। এ হোটেল ও হোটেল করে অনেক মেয়ের সাথে মিলিত হয়েছে সে। কিন্তু সে তৃপ্ত হয়নি। কোথায় যেনো একটা গোপন অতৃপ্তি থেকেই যায় শেষমেষ। যার কাছেই উদগমিত হয়, তার মুখেই সে আমেনার মুখ খোঁজে। কিন্তু আমেনার মতো চামেলিফুলের শোভা কয়জনের আছে। সুখ পায় না করিম। ভ্রমরবিভ্রান্তি নিয়ে এ ফুল থেকে সে ফুলে, ও ফুল থেকে অন্য ফুলে হন্যে হয়ে মরে।

করিমের মা মারা গেছে শৈশবে। লোকে বলে জন্মের তিন দিনের মাথায়ই বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করে সে। এ নিয়ে অবশ্য অনেক কথা আছে। লোকে বলে, বাঞ্জা বুইড়ার ঘরে সন্তান? অসম্ভব। এই সন্তান কোনো কাজের লোকের টোকের হইব। এই কলঙ্ক ঢাকতেই নবপ্রসূতা বিষপান করে। আজ করিমের মনে মায়ের কথা ভাসছে ভীষণ। কেমন ছিলো তার মা। তার মা কি সত্যিই কারো সাথে শুয়েছিলো? সে কি অন্য কারো সন্তান। হলেই বা হলো কি? তার মাকে মরতে হলো কেনো? ছেলেসহ মাকে বের করে দিতো। বড় হয়ে করিম মায়ের চোখের জল মুছে দিতো গভীর মমতায়।

আজ হোটেলে বড় কোনো খদ্দের এসেছে। সাবসুবা মানুষ। হোটেলের অনেকেই ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। করিমকে আজ পাত্তা দিচ্ছে না কেউ। এ ব্যাপারটি করিমের মনে খুব লাগে। সে জানে, এরকম সাবসুবা সে দুচারটা কিনে ফেলতে পারে। হ্যা, সে হয়তো সাহেবদের মতো কোট টাই পড়ে না। তার হয়তো ফটাস ফটাস ইংরেজি বলার বিদ্যা নেই। কিন্তু তার ধন সম্পদের কমতি তো নেই। সে এগিয়ে যায় মেনেজারের দিকে। মেনেজার তাকে অবজ্ঞাভরে দূরে সরাতে চায়। করিম সরে না। বলে, অই লোক কত দিবো। দশ হাজার। করিম বলে আমি দিমু চল্লিশ হাজার। মেনেজার হেসে বলে, কন কি স্যার? আর দুই গুন বাড়ালে তো আপনাকে সারাজীবনের জন্য দিয়ে দিতে পারি। হ, পছন্দ হইলে সারা জীবনে জন্যই কিন্যা লইয়া যামু।


অন্ধকারে মুখটা ঠাহর হয় না করিমের। এই কি আমেনার মুখ? না, না, এমন হতে পারে না। বিছানার এক কোণে বাঁশি ফুলের মতো লুটিয়ে আছে আমেনা। আমেনাও চিনতে পারে না করিমকে। না না, এ হতে পারে না। যেই লোক ছয় বছরে ছয়বারের মতো জেগে উঠতে পারেনাই সেয় কীভাবে মাইয়া মানুষ খুঁজতে হোটেলে আইসবো? না না, এ হতে পারে না। কিন্তু তারপরেও এ-ই হয়। করিম চিনতে পারে আমেনাকে। আমেনাও চিনতে পারে করিমকে। তারা পরস্পর গলাগলি করে কান্দে। আমেনা পায়ে পড়ে করিমের। আমারে তুমি মাফ কইরা দাও। করিম আমেনাকে টেনে বুকে নেয়। আমিও আর নিষ্পাপী নই। কত রমনীর কাছেই তো গেছি, নিজেরে নষ্ট করছি আমিও! চল, এই বার ঘরে ফিইরা চলো। আমেনা বিস্ময়ের চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকে করিমের মুখের দিকে।


মো. আরিফুল হাসান

কুমিল্লা, বাংলাদেশ




পদাবলি ০১

পদাবলি ০১

 




নতুন ভোরের অপেক্ষায়

শাহ জালাল শামীম 


পরিচিত মুখগুলোর অনেকে হারিয়ে গেছে

পেটের তাগিদে ছিটকে গেছে অনেক মেধাবী মুখ।


স্বামীর অত্যাচার মেনে নিয়ে গুমরে পড়ে থাকা মেয়েটির চোখ জ্বলছে।

সবাই ভাতের হোটেলে কাজ নিতে চায় কেন!


অনেকে ফিরতে পারে না

ইচ্ছে হলেই ফেরা যায় না।

বলা যায় না ভালো আছি

বলা যায় না ভালোবাসি!


তবুও চাই, নতুন ভোর আসুক।



বুকের বাঁ পাঁজর ভেঙে যায় 

রুদ্র সাহাদাৎ 


বুকের বাঁ পাঁজর ভেঙে যায় অজানা শঙ্কায়

পাখিদের গান শুনি না কোনোখানে 

ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শুনি নৈঃশব্দ্যে অন্ধকার পথে

জোনাকিপোকাও অভিযোগে অভিমান করে আছে। 


আলীশান রোড়ের মোড়ে বসে থাকি 

হারিয়ে ফেলেছি সব স্মৃতি চিহ্ন। 


মানুষ জন্মসূত্রে নিজে নিজেই একা 

স্বার্থে অভিনয় মানুষে মানুষে দেখা। 


দম ফুরালে সবই শেষ 

সাড়ে তিন হাত মাটিতে নিঃশেষ 

বুকের বাঁ পাঁজর ভেঙে যায় অজানা শঙ্কায়

কখন কে আসে কখন কে যায়

হিসেব নেই জীবনপাঠে...



আফসার স্যার  

মিসির হাছনাইন


চোখ ভিজে গেছে নীরব দাঁড়িয়ে থাকা গাছদেরও কি এক গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে আছেন স্যার বুকটা ছিঁড়ে যাচ্ছে.. এতো এতো করে যে ডাকলাম মনে হল, এখনই চোখ খুলে তাকাবেন, সাদা কাপড়ের যে ফুল ঝরে পড়ে আছে ঠান্ডা হিম ঘরেথ কতটা প্রিয় সে চেনা হাসিমুখ দোল খায় হৃদয়ে হৃদয়ে  দূর আকাশের নক্ষত্রথ জীবন জানে কিনা জানি না! যে সান্নিধ্য কখনও মনে হবে না ফুরিয়ে গেছে আপনাকে হারিয়ে এই শরৎ ভাঙা সময়ে চলে যাবে দিন যদি কখনও নক্ষত্র জীবনের মানে বুঝতে পারি, দেখা  হবে নক্ষত্র জীবনে।


পদাবলি ০২

পদাবলি ০২

 



অহংকার 

হাফিজুর রহমান 


এই নে-রে ভাই, একা খাবে তালের রস;

সিন্দুকে তুলে রেখে তোর অর্জিত যশ,

একটি কথা জেনে রেখো তবে

কোনকিছুই নয় অবহেলার

প্রয়োজনে আছে সবে।


কার ঘরের দুয়ারে, কখন যে যাবে কে!

কী প্রয়োজনে কেন, সময় বলবে ডেকে,

বড়াই করো না অর্থ- সম্মানের

নিমিষেই যাবে ধূলায় মিশে

সবেই হবে অপমানের।



দুর্ভিক্ষের নায়ক

আহমাদ সোলায়মান


জীবনের দিনে আর সূর্যের আলো নেই

চোখ দু’টো যেন এক কঙ্কাল নদী

সময়ের ঘড়িটার ফুরিয়েছে ব্যাটারি

দিক ভুলে সকালের ঘুম ভাঙে যদি!

কৃত্তিম হাসিগুলো ঠোঁট খুজে ক্লান্ত

পা দুটির কোনোদিন ভাঙলো না ভ্রান্ত

এই যদি হয় এক জীবনের সংগ্রাম

দুর্ভিক্ষের নায়ক দেওয়া যায় এর নাম।



মৃত্যু মায়াবিনী

সাকিব জামাল


মৃত্যুকে আমি বেশ কাছে থেকে দেখেছি, কয়েকবার।

শান্ত, শুভ্র প্রেমিকার মতো ভীষণ মায়াবিনী।

ভালোবেসে আমাকে জড়িয়ে নিতে চায় বুকে অনন্তকাল।

না, ভৌতিক কোনো রূপ নেই তার,

নেই ভয়ঙ্কর কোনো কর্কশ স্বর।

কেবল লজ্জাবতীর মতো রহস্যময়তা আছে- 

কাছে আসে আবার আসে না!

তবে সে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, অলৌকিক মায়ায়-

একদিন কাছে আসবেই। আলিঙ্গন হবে বিরামহীন প্রেমে!




এ কেমন নীরবতা?

মাহতাব উদ্দিন 


হে সাগর,

এ কেমন নীরবতা?

তব বক্ষে চলছে না তো কোনো পোত

বিশাল জলরাশির মাঝে

তুমি আজ খরস্রোতা। 

মড়মড় শব্দে ভেসে চলা ঢেউগুলো থেকে 

কান্নার আওয়াজ আসছে ধেয়ে!

যেন এক মৃত্যুপুরী। 

দূর আকাশের নীচে নৌযানে মাঝির কণ্ঠে; 

ভাটিয়ালি সুর ভেসে আর আসে না যে! 

নদীতটে বৃক্ষরাজি,

নির্বাক দাঁড়িয়ে যেন অশ্রুপাতে।


অতিথি আসন !

অতিথি আসন !

 



অতিথি আসন

শফিক নহোর


রাইপুর বাসস্ট্যান্ডে আমি দাঁড়িয়ে আছি গাড়ির অপেক্ষায়। চোখের পলকে একটি গাড়ি এসে দাঁড়ালো। আমি পা সামনে বাড়িয়ে দিলাম। তখন একটি অটোরিকশা এসে আমার পথ বাঁধাগ্রস্তকরল। গাড়িটি আর একটু সামনে এগিয়ে গেল। আমি হাত উচিয়ে হেলপারকে ইশারা করলাম। গাড়ি থেমে গেল।


গাড়িতে উঠে একটি অষ্টাদশী মেয়ের চোখে আমার চোখ আটকে গেল । নির্লজ্জ বেহায়ার মতো আমি আবারও তার চোখের দিকে তাকালাম। অবশ্য মেয়েটি তার দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছিল।


মেয়েটির মুখোমুখি ছিটে আমি বসে রইলাম। একটু মাথা উঁচু করে তাকালে সোজাসুজি দৃষ্টি চলে যায় মেয়েটির বক্ষে । গাড়ি দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। আমি মেয়েটার পায়ের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলাম। এবং বুকের দিকে একবার তাকিয়ে দেখলাম এবং তার মুখের দিকে তাকালাম। এমনভাবে তাকালাম মেয়েটি বোঝার কথা নয় কিন্তু মেয়েটা অত্যন্ত আধুনিক এবং ট্যালেন্ট মনে হল। আমি অনুভব করতে পারলাম, মেয়েটি আমার তাকানো বুঝতে পেরেছে। দৃষ্টি সংযত করে প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ।


আমি গাড়ির গ্লাসের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম মেয়েটা আমার দিকে দু'বার তাকিয়েছে, সেই তাকানোর ভেতরে বিরক্ত মিশ্রিত ছিল।


হঠাৎ তার হাতে থাকা মোবাইল ফোনের রিংটোন বেজে উঠল। মেয়েটি ফোন কেটে দিল। তের সেকেন্ড পর মেয়েটির মোবাইল ফোন আবার বেজে উঠল।

মেয়েটি দ্বিতীয় বার ফোনটা কেটে দিল।


তার পর ফোনের ডাটা অন করে সে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ঢুকে পড়ল। ডাটা সংযোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নোটিফিকেশনের শব্দ শুরু হল। মেয়েটি ফোনের বাটন চেপে সাউন্ড কমিয়ে দিল।


কন্টাক্টর একজন ভাড়া কম দিয়েছে খিস্তি দিয়ে বলে উঠলো,

আগে কইবেন না মিয়া! হুদাই ক্যাচাল করলাম ।

মামা আপনি কই যাইবেন। ভারা দ্যান।

আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,

সামনে যাবো, পরে দিচ্ছি।

এইযে আপা কই যাইবেন? ভাড়াটা দেন?


মেয়েটি তার কথায় কর্ণপাত না করে মনোযোগ দিয়ে সোশ্যাল নেটওয়ার্কে চ্যাট করছে; আমার দৃষ্টি আবারও তার চোখের দিকে আটকে গেল। মেয়েটির চোখের কোণায় শিশিরবিন্দুর মতন জল জমে আছে। এক ফোটা জল গড়িয়ে ফোনের স্ক্রিনে পড়ল।

মেয়েটি তার জর্জেট ওড়না বুকের কাছে হাত দিয়ে টেনে ধরল।

আমার যেখানে নামার কথা সেখানে না নেমে আমি মেয়েটিকে ফলো করতে শুরু করলাম।

মেয়েটির সম্ভবত ডাটা অফ করে ফোনটি ভ্যানিটি ব্যাগের ভিতর রেখে দিল।

জর্জেট ওড়না তার বুক থেকে বারবার বাতাসের সরে যাচ্ছে। সে বারবার নিজের ওড়না ঠিক করছে আর চোখের জল মুছছে।

গাড়ি থেমে গেল শেষ স্টেশনে এসে। ভাড়া দিয়ে নেমে পড়লাম 

মেয়েটি গাড়ি থেকে নেমে একটি ফ্লেক্সিলোডের দোকানে গিয়ে দাঁড়ালো ।

আমি তার শরীর ঘেঁষে দাঁড়ালাম। তার শরীর দিয়ে মিহি সবরি কলার ঘ্রাণ বের হচ্ছে ।

আমি পিছন থেকে বলে উঠলাম; ভাই আমার নম্বরটা একটু দ্রুত লিখুন ।


মেয়েটি পাশ কেটে বেরিয়ে গেল।

পাশের দোকান থেকে একটি সিগারেট নিয়ে লাইটার দিয়ে অগ্নিসংযোগ করতেই পকেটে থাকা মোবাইল ফোন বেজে উঠল।

আমি হ্যালো হ্যালো বললাম, ওপাশ থেকে কোন সারা শব্দ এলো না। নেটওয়ার্ক সমস্যা ভেবে আমি ফোনটা রেখে দিলাম।

সিগারেট শেষ করে ফোনটা হাতে নিয়ে নম্বরটা ডায়াল করলাম।

একজন বয়স্ক বৃদ্ধ মহিলা তার কণ্ঠ শুনে মনে হল সে হাঁপানি রোগী। কথা বলতে তার সমস্যা হচ্ছে ।

আমি বিনয়ের সাথে তার কাছে জানতে চাইলাম।

আপনি আমাকে ফোন দিয়েছিলেন? কে বলছেন, কোথা থেকে বলছেন?

সে জোরেশোরে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলল,

দীপা, দীপা দেখ তোকে কে যেন ফোন দিয়েছে।

ফোনের লাইনটি বিচ্ছিন্ন হয়নি আমি প্রত্যাশায় ছিলাম; কেউ একজন হ্যালো বলে উঠুক। অতঃপর কর্কশ গলায় বলে উঠল,

মানুষের আর ফোন দেবার সময় নেই। হুট হাট যখন তখন ফোন দেবে।

ফোনটি হয়তো তখনো মেয়েটির মায়ের হাতেই আছে। এই শব্দটি দূরবর্তী একটি শব্দ হয়ে আমার ফোনে বেজে উঠলো।

হ্যালো কে বলছেন?

আমি রাসেল বলছি,

কোন রাসেল?

তার শেষ বাক্যটি শুনে মনে হল সে বেশ কয়কজন রাসেল নামের ছেলেকে চেনে।

আমি কিছুক্ষণ দম ধরে থেকে তাকে অভয় দিয়ে বললাম,

ভয় পাবার কিছু নেই। আমি রাসেল, দক্ষিণ যাত্রাবাড়ী থাকি। আপনি কোথা থেকে বলছেন?

এ কথা শোনার পর,

মেয়েটি ফোনের লাইন কেটে দিল। 

আমি পুনরায় নম্বরটা ডায়াল করে ফোন দিলাম । অযাচিত কণ্ঠে ভেসে আসলো। “আপনি যে নম্বরটিতে ডায়াল করেছেন, এই মুহূর্তে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।”

অযাচিতভাবে মাথার ভেতর ঢেউয়ের প্রলেপ এসে আমাকে জাগিয়ে দিচ্ছে। মেয়েটির কমল ঢেউ দোলানো শরীরের তক মোহনীয় আবেশ আমাকে ঘিরে ধরলো। মাল্টা আকারের আকর্ষণীয় বক্ষদ্বয়, জোনাকি আলোর মত সে দৃশ্যমান হতে লাগল চোখের সামনে। নিকোটিনের ধোঁয়ায় আমি তার অবয়ব ভুলে অফিসের পথে রওনা দিলাম।

তিনদিন পর আজ আমার অফিস। কাকতালীয় ভাবে বৃহঃপ্রতিবার সরকারি ছুটি ছিল। ব্যাংক তো দু’দিন বন্ধসেটা সবার জানা। হাফ ওয়াল বিল্ডিং, উপরে টিনের ছাওনি গরমের দিনে মনে হয় কেউ গরম বালু শরীরে ঢেলে গিয়েছে। এর ভেতর পানি নেই, রাস্তার কাজের জন্য গ্যাস লাইন বন্ধ। কাজের বুয়া দুদিন এসে ফিরে গেছে । ছুটির এ তিনদিন আমার সঙ্গে ঘটে গেছে বেশ কয়েকটি ঘটনা। সবচেয়ে অবাক করা বিষয়টি হচ্ছে গাড়ির সেই মেয়ে! সে আমার কাছে নামহীন, ঠিকনাহীন থাকলেও আজ সকালে নিশ্চিত হয়েছি, মেয়েটির নাম দীপা ।

ভেতরে ভেতরে একটা অনুভূতি কাজ করল। আমার মুখ দিয়ে দু’লাইন রবী ঠাকুরের সেই বিখ্যাত গানের কথা বের হয়ে আসল।

সখী, ভাবনা কাহারে বলে। সখী, যাতনা কাহারে বলে ।

তোমরা যে বলো দিবস-রজনী ‘ভালোবাসা’ ‘ভালোবাসা’




অফিসের ডেস্কে আমার সামনে দু’জন দাঁড়িয়ে আছে। আমি চেয়ারটা এগিয়ে নিয়ে মনিটরে চোখে রেখে কাজ করছি। হালকা একটু মাথা উঁচু করে তাকাতেই একটি মেয়ের আগমন ঘটল। সামনের জনের জন্য তা অদৃশ্য আমি দ্রুত কাজ শেষ করে একজনকে বিদায় দিতেই, পরের জন্য তার ফিক্সড ডিপোজিটের ড্রাপটি এগিয়ে দিয়ে বলল,

-স্যার আমার টাকা কী আজ তুলতে পারবো?

আমি তার মুখ ও চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম।

- টাকা তুলছেন কেন? আপনার নমিনির নাম কি?

- স্যার নমিনির নাম আমার স্বামী ।

- ঠিক আছে, আপনার স্বামী বুঝলাম। তার নাম বলেন।

মেয়েটি আমার কথা শুনে বোকার মত দাঁড়িয়ে রইল। আমি তাকে আবারও তাগাদা দিয়ে বললাম, আপানার স্বামীর নাম বলুন। সে একটু লজ্জা পেয়ে ফিস্ ফিস্ করে বলল, জালাল ।

পরের কাস্টমারের দিকে তাকিয়ে আমার চোখ উপরে উঠে গেল । আমার গলা শুকিয়ে গেল। হাতের কাছে পানির পট ছিল তা মুখে লাগিয়ে ডক ডক করে পানি খেয়ে নিলাম। মিনি স্ট্রোক রোগীর মত আমার কথা অর্ধেক বের হচ্ছে অর্ধেক আমার গলার ভেতর কাটা ধিঁধে থাকলে যেমন লাগে ঠিক তেমন হতে লাগল। আমি তার মুখের দিকে না তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম,


-কী নাম আপনার?

-দীপা !

- শুধু দীপা?

তার প্রতি উত্তরে কোন জবাব সে দিল না। পাথরের মত আমার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।

- নমিনির নাম বলুন,

-মনিকা দীপা সাহা

- টাকা তুলছেন কেন? রেখে দিলে তো ভালো হতো ।

- আমার ভালো নিয়ে আপনাকে ভাবতে বলেছি ?

মেয়েটি আমার দিকে একটু এগিয়ে এসে কথাটা যখন বলল, তখন মনে হল কানের ভেতর কেউ গরম লোহার রড ঢুকিয়ে দিচ্ছে । আমি তাকে ইশারা করে ক্যাশ দেখিয়ে দিলাম। সে কতটা সাহস নিয়ে আমাকে এমন করে বলল, আমি শুধু তাই চিন্তা করতে লাগলাম।


অফিস ছুটির পরে সিন্ধান্ত নিলাম আজ দীপাদের বাসায় যাবো । শহরে আসলে কারো বাসায় খালি হাতে যাওয়া ঠিক হবে না। আমি মিষ্টির দোকান খুঁজতে লাগলাম ।

মনের ভেতর থেকে বলে উঠল, মিষ্টির

চেয়ে ফল নেওয়া সবচেয়ে বেশি ভালো হবে । এক কেজি আঙ্গুর আর এককেজি কমলা কিনে একটা রিকসা নিয়ে সোজা চলে গেলাম। দীপাদের বাসায় ।

পুরনো একটা বাসা আশেপাশের পরিবেশ দেখে মনে হল এখানে অনেক মানুষ আসে । আমি দীপাদের বাসার সামনে দাঁড়িয়ে কলিংবেল দিলাম। ভেতর থেকে দীপার মা দরজা খুলে আমাকে বলল,

- কাকে চাই?

-এটা কি দীপাদের বাসা ।

-জি!

- আপনি কে?

- আমি রাসেল ।

- এ নাম তো কোনোদিন শুনিনি ।

-তা দীপা তো আজ বাসায় নেই, আপনি দীপাকে ফোন করে আসেনি?

আমার শরীরটা ভালো না, শ্বাস কষ্টটা বেড়েছে। বয়স হলে যা হয় । শরীরে রোগের অভাব নেই। কদিন আর বাঁচব। মেয়েটা খুব চেষ্টা করছে, আমাকে বাঁচানোর । 

আমার হাতের পলিথিন ব্যাগ দীপার মা সামনের ট্রে-টেবিলে রেখে আলাপ শুরু করল, দীর্ঘ আলাপ। এ বয়সে মানুষ কথা বলতে বেশি ভালোবাসে হয়তো।

-প্লিজ কিছু মনে করবেন না। আপনি কি বাসায় একাই থাকেন?

দীপার মা হেসে বলল,

-একা থাকব কেন? আমার সঙ্গে দীপা থাকে । ওর যেদিন বাহিরে কাজ থাকে সেদিন রাতে আমি একাই থাকি ।

-সরি আপনার মেয়ে কী কোনো জব করেন? মানে গোয়েন্দা বা সরকারি কোনো জব।

-না ।

-তাহলে কীসের জব করে।

-মানুষের সেবা।

-মানে?

-শরীর সেবা।

-সরি আমি ঠিক বুঝতে পারছি না আপনার কথা।

-কেন দীপা আপনাকে কিছু বলেনি?

-আমার চিকিৎসার জন্য দীপা পেশাটা গ্রহণ করেছে ।

-আপনি কি পানি খাবেন?

-জি!

-কাঁপছেন কেন?

-না, ঠিক আছে ।

-দীপা তো শিক্ষিত,সুন্দরী ।

-শিক্ষিত মানুষই তো বেশি আসে।

কলিং বেল বেজে উঠল।

-এই অসময়ে আবার কে এলো ।  আপনি বসুন, আমি দেখছি ।

-কী রে দীপা ফিরে আসলি যে।

-সে ফোনে না করে দিয়েছে, কিন্তু টাকাটা বিকাশ করে দিয়েছে।

-তার টাকা নিয়েছিস কেন?

-কাজ না করে পরের টাকা নেওয়া ঠিক হয়নি ।

একটু সামনে এগিয়ে এসে তার মাকে প্রশ্ন করল,

-মনে হচ্ছে বাসায় কেউ অপেক্ষা করছে ।

-ও হ্যাঁ। তোকে বলা হয়নি।রাসেল এসেছে।

-কোন রাসেল?

-তোর বন্ধু?

-আমার বন্ধু!

দীপা সামনে এগিয়ে এসে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। কী যেন বলতে চেয়ে থেমে গেল। আমিও দীপাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলাম।


সে বিনয় স্বরে বলল,

-দাঁড়িয়ে গেলেন কেন?

-বসুন ।

- মা’ তাকে নাশতা দাও ।

-আপনি একটু কষ্ট করে বসুন। আমি ভেতর থেকে ফ্রেশ হয়ে আসছি ।

আমার জন্য দীপার মা প্লেট ভর্তি নাশতা নিয়ে এলেন । আমার দিকে তা এগিয়ে দিয়ে সে তার রুমে গিয়ে খিল এঁটে দিল। কিছুক্ষণ পর দীপা আমার সামনে এলো। 

দীপার দিকে তাকিয়ে আমি আরো অন্ধকারে ডুবে গেলাম। ঠোঁটের গাঢ় লিপিস্টিক গায়ে বিদেশি পারফিউমের ঘ্রাণে আমার নাক বন্ধ হয়ে আসছে। দীপা আমার হাত স্পর্শ করল। আমি পুলকিত হলাম। কী মোলায়েম হাত ওর।

দীপা আমাকে হাত ধরে তার অতিথি আসনের দিকে নিয়ে যেতে লাগল।

আমি দীপাদের পেছন দরজা দিয়ে দৌড় দিয়ে পালিয়ে গেলাম ।


সেদিনের পর থেকে আমি এখনো দৌড়াতে দৌড়াতে পৃথিবীর পথ শেষ করেছি, তবুও দীপার গায়ের সেই ঘ্রাণ আমার নাকে এসে লাগছে এখনো।


ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৭৮

ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৭৮

 তারুণ্যের শিল্প সরোবর : ধানশালিক : সংখ্যা ১৭৮,

শুক্রবার, ২২ অক্টোবর ২০২১

















চিনের মরমী কবি : বেই দাও

 চিনের মরমী কবি :  বেই দাও

 



চিনের মরমী কবি

বেই দাও 

অনুবাদ : আকিব শিকদার 


বেই দাও একজন নির্জনতাপ্রিয় কবি। চিনের যে ক’জন কবি কবিতায় মরমীবাদ আগলে রেখেছেন, কবি বেই দাও তাদের মাঝে একজন। বেই দাওকে বলা হয় রহস্যবাদী কবি।

 বেই দাও শব্দটির অন্য উচ্চারণ “পেই তাও” এবং শব্দটির অর্থ “উত্তরের দ্বীপ”। কবির জন্ম ১৯৪৯ সালের ২ আগস্ট বেইজিং এ হলেও কবির শিকড়টি চিনের উত্তরের একটি দ্বীপে প্রোথিত। বেই দাও এর প্রকৃত নাম ঝাও ঝোনকাই। কবি নির্জনতা পছন্দ করেন বলেই হয়তো ‘বেই দাও’ ছদ্মনামটি বেছে নিয়েছিলেন। মরমী এ কবি চিনের লোকদের হৃদয়ে হৃদয়ে আসন করে নিয়েছেন।



সময়ের গোলাপ 


যখন দারোয়ান নিদ্রিত থাকে ফটকে

আর তোমরা দল বেঁধে ঝড়ের সাথে বাড়ি ফিরে আসো

এই যে আলিঙ্গনে চলার বয়স- তা হলো

সময়ের গোলাপ।


যখন পাখিদের চলাচল আকাশকে সাজায়

আর তোমরা পেছনে তাকিয়ে সূর্যাস্ত দেখো

এই যে অন্তর্ধানের মাঝে প্রত্যক্ষ- তা হলো

সময়ের গোলাপ।


যখন তলোয়ার বেঁকে যায় ডুবো জলে

আর তোমরা ব্রিজের ওপরে দাঁড়িয়ে তোলো বাঁশিতে সুর

এই যে বাঁধাবিঘেœ সজোর আর্তনাদ- তা হলো

সময়ের গোলাপ। 


যখন কলম আঁকে দিগন্তের রেখা

আর তোমরা প্রাচ্যের ঘণ্টাধ্বনীতে বিস্ময়ে জেগে ওঠো

এই যে ধ্বনির অনুরণনে কম্পন- তা হলো

সময়ের গোলাপ।


মনের আয়নাতে বিম্বিত যে-কোনও মুহূর্ত

যা পৌঁছে দিতে পারে পুনর্জন্মের দরজায়

খুলে দিতে পারে সাগরের কপাট- তা হলো

সময়ের গোলাপ।



ফিরে আসা ধ্বণী


আকাশের পাখিগুলো সোনালী আলোতে উড়ে

ফিরে এসে বসে পাহাড়ি গাছের ডালে

রাতের ফানসগুলো নিভে গিয়ে 

পরে যায় মাটিতে।

আমাদের ডাক, হে প্রভু, ফিরে যায় তোমার কানে। 


আমাদের চিৎকার পাহারে সাগরে নদীতে 

কত ধ্বণী প্রতিধ্বণী হয়ে ফিরে আসে পুণরায়।

হে প্রভু, তোমার গোপন সুর ফিরে যায় তোমার কানে।


জানালার ওপাশে বিকেল...

জানালার ওপাশে বিকেল...

 


জানালার ওপাশে বিকেল...

সৈয়দ নূরুল আলম


দিনের আলো মরে এসেছে। একটু পরে জানালার ওপাশে বিকেল নামবে। এইমাত্র রুবী রুম থেকে বের হয়ে গেল। ওকে হাসান আজ আপনি থেকে তুমি বলেছে। একত্রে বসে দু’জনে ড্রিং করেছে। শূন্য দূরত্বে এসেছে কিনা হাসান তা মনে করতে পারছে না। প্রথম দিন, বে-হিসেবি হয়ে ও একটু বেশি খেয়ে ফেলেছিল।

ইদানিং মেয়েরা অফিসে নানা কিছু বিক্রয় করতে নিয়ে আসে। কখনও মোটা মোটা দেশি-বিদেশি বই, কখনও কসমেটিক্স। কখনও বা শাড়ি-থ্রি পিচ। অফিসের মেয়ে কলিগরা বেশ উৎসাহ নিয়ে এসব কিনে থাকে। ভাসমান বেঁচা-কেনা। সো-রুমের দরকার হয় না। কর্মচারি নেই। ভ্যাট-টেক্স দিতে হয় না। স্বাভাবিক ভাবে এসব জিনিসের দাম কিছুটা কম থাকে। এতে করে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের লাভ।

বনানী পনের নম্বর রোডে টাচ এন্ড ফেয়ারের অফিস। এরা বিভিন্ন ধরনের প্রশাধনী সামগ্রী তৈরি করে। বছর পাঁচেকের মধ্যে ভালো একটা মার্কেট পেয়েছে। প্রথমে একতলা-দোতলা মিলে অফিস ছিল। এখন তিনতলাটাও অফিস হিসেবে নিয়েছে। হাসান ভাবছে, আগামী দু’বছরের মধ্যে পাঁচতলা পুরো বাড়িটা-ই অফিস হিসেবে নিতে পারবে।

হাসান এ অফিসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি। ডাইরেক্টর এডমিন ও ফাইন্যান্স। ওর ওপরে আছে মল্লিক সাহেব। এ কোম্পানীর চেয়ারম্যান। এ দু’জনই কোম্পানীকে টেনেটুনে, জল হাওয়া দিয়ে বড় করেছে।

গুলশান, হাসানের রুমে এসে বলে, স্যার ইনি রুবী আপা। শাড়ি বিক্রি করেন। এ শাড়িটা ভাবীর জন্য নিতে পারেন। মিতু ভাবী তো সুন্দর। মানাবে ভালো।

হাসান শাড়ি চেনে না। না সুতো, না রঙ। কিনতে কিনতে মানুষ এসব চিনে ফেলে। কিন্তু হাসান বিয়ের আগে শাড়ির মার্কেটে কখনও যায়নি। এমনকি বিয়ের পরেও। যা কেনার মিতু নিজেই কেনে। মার্কেটে যেয়ে হাসান শুধু পাহাড়াদার হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।

গুলশান শাড়িটা ভালো বলাতে হাসান আস্থা পায়। বলে, তুমি যখন বলছো, দিয়ে দাও।

রুবী একটা প্যাকেটে শাড়িটা ভরে, হাসানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ধন্যবাদ স্যার। 


হাসান বাড়ি ফিরে মিতুকে শাড়িটা দেখালে মিতু খুব খুশি হয় এবং বলে, এককাজ করলে কেমন হয়, আমি তো বাড়ি যাচ্ছি। যাওয়ার সময় মা-ভাবী-মিনু ওদের জন্য কয়েকটা শাড়ি নিয়ে যাই। তুমি এ শাড়িটা অনেক কমে পেয়েছ। এটা বসুন্ধরা মার্কেটে তিন হাজার-সাড়েতিন হাজারের কমে পাবে না। 

‘ঠিক আছে, গুলশানকে বলব।’

‘খালি গুলশান-গুলশান করো কেন?’ ওকে কী দরকার। রুবী না কি যেন মেয়েটার নাম বললে, ওকে বাসায় আসতে বলো। দেখে শুনে পছন্দ করি।’

হাসানের প্রথম ইস্যু। প্রথমবার মেয়েরা মায়ের কাছে যায়। তাই মিতুও দিনাজপুর মায়ের কাছে যাবে।

হাসান বলে, ঠিক আছে, মেয়েটাকে আগামী শুক্রবার আসতে বলব।

‘শুক্রবার কেন? তার আগে আসতে বলো। আমি তো শনিবার চলে যাব। আর শোন অনেকগুলো শাড়ি আনতে বলবা। ওর মধ্য থেকে কয়েকটা বেছে নেব।’

‘শুক্রবারই আসতে বলি। শুক্রবার ছাড়া তো আমি বাসায় থাকি না।’

পরের দিন হাসান অফিসে যেয়ে গুলশানকে শাড়ি নেয়ার কথা বললে, গুলশান রুবীকে ফোন করে বলে, শুক্রবার বেশ কিছু শাড়ি নিয়ে তোমাকে স্যারের বাসায় যেতে বলেছেন। ভাবি নিজে পছন্দ করবেন। স্যারের বাসার ঠিকানা আমি তোমাকে টেক্স করে দিচ্ছি।

‘ধন্যবাদ গুলশান আপা। আপনি আমার জন্য অনেক কিছু করছেন। ওদিন স্যারের কাছে না নিয়ে গেলে, স্ট্রং রিকোমেন্ড না করলে, স্যার শাড়ি কিনতেন? রুবী আনন্দে গদগদ হয়ে বলে। 

‘আমি আর কী করলাম! এমনিতে তোমার ব্যবহার ভালো। অল্পতে সবাই গলে যায়। তোমার জন্য শুভকামনা।’

‘ওকে আপা। ভালো থাকবেন।’

কিন্তু শুক্রবার যাওয়ার কথা থাকলেও রুবী ওদিন হাসানের বাসায় যায় না। কোন সংবাদও দেয় না।

মিতু কুমড়োর মতো মুখ করে বলে, কই তোমার মেয়েটা তো এলো না। এখন! আমি বাড়িতে মা- বোনদের বলে রেখেছিÑ তোমাদের জন্য শাড়ি নিয়ে আসছি।

এ প্রশ্নের উত্তরে হাসান কিছুই বলতে পারে না। মেয়েটি এমন করবে তা ওর ধারণার বাইরে ছিল। 

মিতু ফোসফাস করতে থাকে।

হাসান দুখিদুখি মুখ করে বলে, বুঝতে পারলাম না। মেয়েটার কী হলো। ফোন করব তারও উপায় নেই। ওর ফোন নম্বর আমার কাছে নেই। ঠিক আছে, আমি যখন সামনে মাসে তোমাকে দেখতে যাব, তখন নিয়ে যাব।

মিতু হ্যাঁ-না কিছু বলে না। এ সময় রাগ-অভিমান করে শরীরের ওপর চাপ নিতে চায় না মিতু। তাই মন খারাপ করে, পরের দিন বাবার বাড়ি চলে যায়। 

 ট্রেনের টিকিট কাটা ছিল। হাসান কমলাপুর ষ্টেশনে যেয়ে মিতুকে ট্রেনে তুলে দিয়ে আসে। হাসান দিনাজপুর পৌঁছে দিয়ে আসতে চেয়েছিল।

মিতু বলেছে, আমি একা যেতে পারব। বাবা তো ষ্টেশনে এসে নিয়ে যাবে। কোনো অসুবিধা হবে না। তাছাড়া তুমি তো ঘনঘন ছুটি পাবে না। দু’সপ্তাহ পরে আমাকে দেখতে যেতে চেয়েছ না?

তবু হাসানের মন খারাপ হয়। এ সময়ে একা একা যাওয়া! যদিও এখন তিন মাস বাকি।

যত সময় ট্রেন না ছাড়ে, হাসান জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে। ট্রেন চলা শুরু করলে হাত নেড়ে মিতুকে বিদায় জানায়।

হাসানের অফিস সকাল ন’টায়। মিতুকে সাতটায় ট্রেনে তুলে দিয়ে হাসান আর বাসায় যায় না। সরাসরি অফিসে চলে আসে। হাসান মাঝে মধ্যে বেশ আগে অফিসে চলে আসে। এসে আগেরদিনের জমা ফাইলগুলো ছেড়ে দেয়। গতকালকের দু’টো ফাইল টেবলে পড়ে আছে কিন্তু ফাইল দু’টো দেখতে হাসানের মন চাচ্ছে না। ভেতরটা গজ গজ করছে। কতক্ষণে গুলশান অফিসে আসবে।

এ সময় পিয়ন হারুন এসে বলে, স্যার কফি দেব?

‘না।’

‘না’ শব্দে বোম্বাই মরিচের ঝাঁঝ ছিল, সেটা বুঝতে পেরে হারুন আর কোনো কথা বলে না। ওদিনের দু’টো নিউজ পেপার টেবলে রেখে রুম থেকে বের হতে যায়।

হাসান  হারুনকে ডেকে বলে, এই শোন, গুলশান ম্যাডাম এসেছেন?

‘জ্বি স্যার।’

‘ডাকো তাকে।’

হারুন গুলশান ম্যাডামের রুমে যেয়ে বলে, ম্যাডাম, হাসান স্যার মনে হয় খুব রেগে আছেন। আপনাকে ডাকে।

গুলশান ভয়ে ভয়ে হাসান স্যারের রুমে ঢুকে বলে, গুড মর্নিং স্যার।

‘গুড মর্নিং। ওই মেয়েটাকে বলেছিলেন, শুক্রবার বাসায় আসতে?’

‘কেন যায়নি স্যার! আমি তো বলেছিলাম।’

‘বাসার এডড্রেস বলেছিলেন?’

‘জ্বি স্যার। এডড্রেস টেক্স করে দিয়েছিলাম।’

‘ও তো যায়নি। তোমাদের ম্যাডাম তো খুব রাগ করেছে। বাবার বাড়ি খালি হাতে যেতে হলো। ভেবেছিল মা-বোনদের জন্য কয়েকটা শাড়ি নিয়ে যাবে।’

‘স্যার আমি এখনই রুবীকে ফোন দিচ্ছি।’

গুলশান রুম থেকে বের হয়ে রুবীকে ফোন দেয়। ফোনে উত্তর আসেÑ সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কয়েকবার ফোন দেয়। প্রতিবারই একইÑ সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। 

গুলশান কাচুমাচু হয়ে, রুমে এসে বলে, স্যার রুবীকে ফোনে পাচ্ছি না। ফোন যাচ্ছে না।

‘লিভ দিস।’

‘স্যার আপনাকে কফি দিতে বলি?’

‘না। যান, কাজ করেন গিয়ে।’

গুলশান মন খারাপ করে রুম থেকে বের হয়ে আসে। হাসান স্যারের কাছ থেকে এধরণের ব্যবহার এই-ই প্রথম পেল।


শুক্রবার হাসানের বাসার ডোরবেল বাজলে, হাসান এসে দরজা খোলে। দরজায় রুবী দাঁড়িয়ে।

‘তুমি!’

হাসান  রুবীকে না-চেনার ভান করে বলে।

‘স্যার আমি রুবী। ওই যে অফিসে ভাবির জন্য শাড়ি নিলেন।’

‘তো?’ 

‘গুলশান আপা ফোন করে আমাকে বলেছিলেন, আরও কয়েকটা শাড়ি নেবেন, তাইÑ’

‘ভেতরে আসুন।’

 ভেতরে আসুন কথাটা এমন ঝাঁঝ মিশিয়ে হাসান বলে, তাতে রুবী বুঝে যায়, সামথিং রং।

রুবী ড্রয়িং রুমের এক কোনে যেয়ে ভেজা বেড়ালের মতো বসে, কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে পায়ের কাছে রাখে। দু’টো ব্যাগই বেশ ভারি। একটা কাধে, একটা হাতে নিয়ে রুবী সবসময় বেরোয়। এতেকরে কেউ বুঝতে পারে না, ও শাড়ি ফেরিকরে বিক্রয় করে।

হাসান নিজের রুমে চলে যায় এবং পাঁচ মিনিট পরে ফিরে আসে। 

রুবী লক্ষ করে, দরজা খোলার সময় হাসান স্যারের গায়ে গেঞ্জি ছিল। চুল ছিল এলোমেলো। পড়নে ছিল লুঙ্গি। এখন একটা হাফসার্ট পড়ে, চুল আঁচড়িয়ে, লুঙ্গি পাল্টে, প্যান্ট পড়েছে।

রুবী ভেবেছিল, পোষাকের এ পরিবর্তনের সাথে সাথে, হাসান স্যারের ভেতরের রাগটাও পাল্টাবে। কিন্তু না। হাসান আগের শক্ত স্বরেই বলে, কবে আসবেন গুলশান বলেনি?

‘বলেছিল, শুক্রবার।’

‘তো?’

‘আজ তো শুক্রবার।’

‘শুক্রবার তো মাসে চারটে থাকে। বছরে থাকে অনেকগুলো।’

‘বুঝলাম না, স্যার।’

‘গত শুক্রবার আসার কথা বলেছিলাম।’

‘স্যার গুলশান ম্যাডাম তো নির্দিষ্ট করে বলেননি। শুধু বলেছেন, শুক্রবার দেখা করতে। বিশ্বাস না হয়, আমার ফোনে রেকর্ড করা আছে, শুনবেন স্যার?

‘দরকার হবে না। তবে যখন বলা হয় শুক্রবারের কথা, তখন পরের শুক্রবারকেই বুঝায়।’

‘স্যরি স্যার। আমি বুঝতে পারিনি। আমি আপার ফোন পেয়ে, আমাদের বাড়ি রাজশাহী চলে গিয়েছিলাম,আরও ভালো ভালো কিছু শাড়ি আনতে।’

‘তুমি ফোনও ধরোনি।’

‘স্যার আমাদের বাড়ি রাজশাহী শহর থেকে অনেক ভেতরে। একটা অজপাড়াগাঁ। ওখানে প্রায়ই ইলেকট্রিসিটি থাকে না। ফোনে চার্জ ছিল না।’

‘বুঝলাম। কিন্তু যিনি শাড়ি নেবেন, তিনি তো চলে গেছেন।’

‘কোথায় গেছেন স্যার? আসবেন না?’

হাসান একথার আর উত্তর দেয় না। বলে, আজ তুমি ফিরে যাও। তোমার ফোন নম্বর রেখে যাও। প্রয়োজন মতো আমি ডাকব।’

একথা শুনে রুবীর ভেতরটা ছেৎ করে ওঠে। কতো আশা নিয়ে এসেছে, সামনে ওর থার্ড সেমিস্টারের ফি জমা দিতে হবে। কয়েকটা শাড়ি বিক্রয় করতে পারলে, বাকিটা টিউশন ফি মিলে হয়ে যেত।

তবে আশার আলো, হাসান স্যার ওকে ‘তুমি’ বলেছে। নিশ্চয় আগের রাগ আর পুষে রাখেনি।

তাই ভেবে রুবী সাহস নিয়ে বলে, স্যার নতুন কিছু শাড়ি এনেছি, আপনি একটু দেখেন।

‘আমি তো শাড়ির কিছু বুঝি না।’

‘স্যার ম্যাডাম কি, ভাই বাড়ি গিয়েছেন? কবে আসবেন?’

‘হ্যাঁ। ওদের বাড়ি গিয়েছে। প্রথম ইস্যু। আসতে বেশ দেরি হবে।’

দেরি হবে শুনে রুবী দ্বিতীয় বারের মতো ধাক্কা খায়। ও নিজের বুকের মধ্যে ধক ধক ঢেঁকির পাড় শুনতে পায়। ওর সব যোগবিয়োগ এলোমেলো হয়ে যায়।

রুবী শেষ চেষ্টা করে বলে, স্যার এক কাজ করলে হয় না, ম্যাডামকে ভিডিও-তে শাড়ি দেখান।

‘না, সেটার আর দরকার নেই। আমি সামনের মাসে সতের তারিখ ওদের ওখানে যাব। তার আগে একদিন আসো। এর মধ্যে আমি একদিন মিতুর সাথে কথা বলে নেবো।’

‘কিছু মনে করবেন না স্যার। তার আগে মানে, ডেটটা যদি নির্দিষ্ট করে বলতেন। না হলে, আজকের  মতো ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হবে।’

‘সতের তারিখের আগে দশ তারিখ, শুক্রবার।’

‘ওকে স্যার। তবে আজ একটু যদি দেখতেন। কষ্ট করে এসেছি, আমার ভালো লাগত। আর ম্যাডামকে কিছু বর্ণনাও দিতে পারতেন।’

কিছু সময় থেমে রুবী আবার বলে, স্যার আমি আরেকটা জিনিস বিক্রি করি।

‘কী?’

‘অভয় দিলে বলতে পারি।’

‘আমি কি পুলিশ, না র‌্যাব?’

‘না। আপনি পছন্দ করেন, কী করেন না, তাই ভাবছি।

‘আমি তো অভয় দিয়েছি।’

রুবী আর কোনো কথা না বলে, ব্যাগ থেকে একটা বোতল বের করে,টি টেবলের ওপর রেখে বলে, অনেকে চায়। তাই মাঝে মধ্যে সাথে রাখি।

‘আমি কখনও খাইনি। অভিজ্ঞতা নেই।’

‘তা হলে রেখে দেই।’

‘তাই করো।’

রুবী কোনো দ্বিরুক্তি না করে, যেখানে বোতলটা ছিল, সেখানে রেখে দেয়।

‘স্যার, আজ উঠি তা হলে।’

‘বোতলটা নিতে পারলাম না বলে, মন খারাপ করেছো?’

‘না স্যার। খুশি হয়েছি। আমারই ভুল হয়েছে। আপনার অনুমতি ছাড়া আনা ঠিক হয়নি।’

‘তোমার তো এটা ব্যবসা। নানা ধরণের পন্য সাথে রাখতেই পারো।’

রুবী হাসানের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, স্যার আপনি একদিনের জন্যও খাননি?

‘বললাম তো। আমি ওসবের গন্ধ শুকতে পারি না।’

‘স্যার এটা হোয়াইট লেডিস ওয়াইন। খুব সফট। একবার ঠোঁট ছোঁয়াতে পারেন।’

‘না। ওকে।’

‘উঠি স্যার।’

‘অনেক দূর থেকে এসেছ। এক কাপ কফি খেয়ে যাও।’

‘ধন্যবাদ স্যার। আমি কফি খাই না।’

‘তা হলে অন্য কী খাবে?’

‘কিচ্ছু না।’

তুমি বসো, আমি দেখি, এই বলে হাসান ভেতরে যেয়ে কিছু সময় পর দু’টো প্লেট হাতে করে ফিরে আসে। একটায় দু’পিচ কেক। অন্যটায় কয়েকটা চকলেট। প্লেটটা রুবীর সামনে টেবলে রাখতে রাখতে হাসান বলে, কোনো বাসা থেকে খালি মুখে যেতে নেই।

ধন্যবাদ স্যার। না ভাবলাম বাসায় ম্যাডাম নেই। আপনার কষ্ট হবে। রুবী ওড়নার আঁচল খুটতে খুটতে বলে।

কষ্টের অপর নামই তো জীবন। এই যে তুমি কষ্ট করছো না? আচ্ছা, গুলশান বলছিলÑতুমি নিজের আয় দিয়ে পড়াশুনা করছ। একটা ভালো প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ছ।

 রুবী হাসানের একথার কোনো জবাব দেয় না। মাথা নিচু করে থাকে।

আরে লজ্জা কিসের! কোনো কাজকেই হালকা করে বা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কাজ তো কাজই। তাছাড়া তুমি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পড়াশুনা করছ, এটাতে ভাববার কী আছে। আরও মুখ উঁচু করে বলবে নিজের পড়ার খরচ নিজে যোগার করছ।

হাসানের একথায় রুবী মুখ তুলে বলে, স্যার আমার বাবা তো কোনো টাকা-পয়সা পাঠাতে পারেন না। প্রতি মাসে আমার মামা কিছু পাঠান আর আমাদের স্কুলের হেড মাষ্টার স্যার কিছু পাঠান। বাকিটা আমার টিউশনি আর এই শাড়িটাড়ি বিক্রি করে যা হয়।

রুবীর একথা শুনে হাসানের মন নরম হয়। হাসান বলে, শোন, কখনও মন খারাপ করবে না। কোন কাজই ছোট না। শোন তয়, আমি আমার স্কুল-কলেজ জীবনে প্রায় ছ’বছর বাসায় বাসায় পেপার বিলি করেছি। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে, বাসায় বাসায় পেপার পৌঁছে দিয়ে, তারপর ক্লাসে যেতাম। এতে আমার কোনো লজ্জা ছিল না। এখনও নেই। আমার বাবাও তোমার বাবার মতো গরীব ছিলেন। আমার লেখাপড়ার খরচ দিতে পারতেন না।

হাসানের একথা শোনার পর রুবীর চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। বলে, স্যার ওই বয়সে আপনি জীবনকে বুঝতে পেরেছিলেন, তাই আজ এতবড় হতে পেরেছেন।

‘ঠিক তাই। তুমিও একদিন বড় হবে।’

একথা বলে হাসান কী যেন ভাবে। কান চুলকায়। তারপর বলে, ঠিক আছে শাড়িগুলো দেখাতে চেয়েছিলে, দেখাও। আর তোমার পছন্দ মতো পাঁচটা শাড়ি রেখে যাও। আমি তোমাকে চেক লিখে দিচ্ছি।

হাসানের একথা শুনে রুবীর চোখ-মুখ সকালের কাঁচা রোদের মতো ঝলমল করে ওঠে। ও খাওয়া রেখে ব্যাগ খুলতে যায়।

হাসান বাঁধা দিয়ে বলে, আরে সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে না। আগে কেক খেয়ে নাও। আর চকলেটগুলো পকেটে ঢোকাও। রুমমেটদের দিও। 

লজ্জা ও আনন্দ মিশ্রিত একটা আদল ফুটে ওঠে রুবীর সাড়া মুখে। রুবী বুঝতে পারে, স্যারের এ ধরণের একটা অতীত আছে দেখে, বিষয়টাকে এতসহজ, এতআন্তরিক ভাবে নিয়েছেন।

রুবী একটা কেকের অর্ধেকটা খেয়ে বলে, স্যার এখন কফি খেতে ইচ্ছে করছে। তবে আমাকে যদি বানাতে দেন, তবে।

‘তুমি যে বললে কফি খাও না।’

‘একেবারে খাই না বললে, ভুল বলা হবে। মানে, পরিবেশ পরিস্থিতি ফেবারে থাকলে মাঝে মধ্যে খাই। তখন খাওয়ার ইচ্ছেটা অনেক বেড়ে যায়। দমিয়ে রাখতে পারি না।’

‘তা হলে বলতে চাচ্ছো, পরিবেশ এখন তোমার ফেবারে?’

রুবী একথার কোনো উত্তর না দিয়ে বলে,স্যার, যতই সময় যাচ্ছে, যতই আপনাকে দেখছি, ততই আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়ে যাচ্ছে।

হাসান রুবীর একথার কোনো উত্তর দেয় না। দেয় না মানে, কী বলবে খুঁজে পায় না। কয়েক সেকেন্ড দু’জনই নিরব থাকে। পরে নিরবতা ভেঙে রুবী বলে, স্যার কফি বানানোর অনুমতি দিলেন তো?

‘যাও, কিচেনে সব কিছু আছে। কফি এখন আমি নিজেই বানিয়ে খাই। মিতু যাওয়ার সময়, কাজের মেয়ে হাসিকে ছুটি দিয়ে গেছে। আমি একা থাকবÑতাই।

একথা বলে হাসান একটু মৃদু হাসে।

কথার অর্থ রুবী বুঝতে পেরে, রুবীও চোরা হাসি হাসতে হাসতে রান্না ঘরে যায়। চার মিনিটের মাথায় রুবী এককাপ কফি বানিয়ে এনে হাসানের দিকে এগিয়ে দেয়। হাসান তখন একটা ম্যাগাজিনের পাতা ওলটাচ্ছিল। ম্যাগাজিন থেকে মুখ তুলে কফির কাপটা নিয়ে বলে, তোমার কফি?

‘স্যার এককাপই বানিয়েছি।’

‘কেন?’ 

‘স্যার, আপনার সামনে বসে কফি খেতে আমি পারব না, তাই শুধু আপনার জন্য বানিয়েছি।’

‘আমার সাথে বসে কফি খেতে লজ্জা কিসের! তোমাকে তো বললাম। তুমিও ব্যবসা করছো। আমিও ব্যবসা করছি। শুধু তোমারটা একটু ছোট, আমারটা একটু বড়, এই যা পার্থক্য।

হাসান একটু থেমে, কফির কাপে একটা লম্বা টান দিয়ে বলে, ঠিক আছে, কফি না খাও, তোমার ব্যাগে যে লেডিস ওয়াইন আছে, ওটা বের করো। আমরা দু’জনে একটু খাই।

রুবী হাসানের কথা শুনে, হা করে হাসানের দিকে চেয়ে থাকে। চট করে ব্যাগটা খুলতে পারে না। ওর হাত কাঁপতে থাকে।  


পদাবলি : ০১

পদাবলি : ০১

 



শুধু তোমাকে ভালোবাসি 

রৌদ্র রাকিব 


বহুবার বলেছি; বহুকাল অপেক্ষা করেছি; 

বহুদিন দেখেছি; বহুবার কতকথা শুনেছি; 

শুধু তোমাকে ভালোবাসি বলে।


তবুও ভালো আছি; তবুও বেঁচে আছি; 

তবুও হাসিখুশি আছি; তবুও সুখে আছি;

শুধু তোমাকে ভালোবাসি। 


তুমি চলে যাও- তুমি ভুলে যাও!!

তুমি কিছু রেখে যাও- তুমি হারিয়ে যাও- 

শুধু তোমাকে ভালোবাসি।




চলে যাবো

মাসুদ পারভেজ 


তোমাদের এই ঝঞ্ঝাট জমকালো কৃত্তিম কোলাহলপূর্ণ শহর ছেড়ে চলে যাবো,

চলে যাবো তোমাদের দেয়া কবি নামের এক অভিশাপ নিয়ে

জানো তো, কঠিন দুঃখবোধ না থাকলে নাকি কবি হওয়া যায় না,

আমি আজীবন সে প্রয়াস চালিয়ে যাবো।

যদিও তোমাদের প্রতি অনেক অভিযোগ আছে আমার, অনেক কথা বলবার আছে;

বলবার আছে- তোমাদের শহরে পাখিদের ঠাঁই নেই, বৃক্ষ নেই, সহস্র মানুষের ভেতর একটিও মানুষ নেই।

সুন্দরী অনেক ললনা আছে একটিও প্রেমিকা নেই,

অনেক অনেক প্রেমিকা আছে একটিও প্রেম নেই।

অনেক পুরুষ আছে কিন্ত একজনও বিশ্বস্ত সঙ্গী নয়।

তোমাদের শহরে সবুজ বিছানি নেই আছে চকচকে মার্বেল পাথরের অহংকার।

পুকুরের বা নদীর ঘোলা পানি নেই আছে পিত্তরংয়ে সুইমিংপুল।

তোমাদের দালানগুলো আকাশ দখলে নেওয়ার প্রতিযোগিতা এখন চরমে।


বলবার আছে তোমাদের শহরে গণহারে মানুষ মেরে গণতন্ত্রের চর্চা হয়

নারীর যৌনতার আবাদ করে নারীবাদের চর্চা হয়।

বেতনধারী স্বীকৃত বুদ্ধিজীবীদের পানশালা হয় রাজদরবারে।

চলে যাবো এই কাগজে প্লাস্টিকে মোড়ানো শৌপিচের অভিনয় ছেড়ে।


তোমাদের কুকুরগুলো নাকি নবজাত মনিষ্যপুত্রেরও বেশি আদর অভিলাষ নিয়ে লালিত হয়।

তোমাদের অভিজাত শোবার ঘরে, বারান্দায় কুকুরের আশ্রয় থাকতে পারে একজন কবির নয়।

তোমাদের দালানের ছাদে বায়োপ্ল্যাগে মৎসকুলের অভিশাপ নিয়ে আমি এক মুহুর্তও থাকতে চাই না।


আমি সবুজ পাতার ফাঁকে বেরিয়ে আসা একমুঠো রোদ্দুরের জন্য চলে যাবো,

ঝিলে ফোটা রক্তকমলের পাশে মিটিমিটিয়ে হাসা একটুকরো চাঁদের জন্য চলে যাবো।

চলে যাবো ছাগলছানার তিড়িং-বিড়িং নাচের খোঁজে অথবা গরু বাছুরের নিষ্পাপ চাহনির জন্য।

নীল আকাশের তলে দলে দলে পাখির ডানা মেলা সুন্দরের জন্য

চলে যাবো সবুজের আঁচল ছিঁড়ে এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া নদীর জন্য।

চলে যাবো সোঁদামাটি, পলিমাটির গন্ধে ভরা মানুষের কাছে,

চলে যাবো একটি স্নিগ্ধ বিকেল এর কাছে

চলে যাবো শিশির ভেজা একটি সকালের কাছে

চলে যাবো একটি সুন্দর নিশ্চুপ নিশ্চল নিষ্পাপ পৃথিবীর কাছে।



প্রেমিক বলতে এখনো তোমাকেই বুঝি

রফিকুল নাজিম 


অনেকদিন হয় তোমার নাগাল পাই না

কই পালাইছো? 

আমাদের এইদিকে কি আর আসো না?

কেরামতের টং দোকানের চায়ের তৃষ্ণা মিটে গেছে

তোমার রং চায়ের নেশাটা কেটে গেছে?

আজকাল কি তবে দুধ চায়ে ঠোঁট ভিজাও?


জানো?

এখনো সেই শালিকটা বিকেলে আমার বারান্দায় আসে,

রেলিংয়ে বসে। তারপর আমার চোখে মায়া মেখে দেয়

আমি এটা ওটা খেতে দেই, 

শালিকটা ঠোঁট বাড়িয়ে খায়।

আহা! উড়াল পাখিটাও আমার পোষ মেনেছে; 

কেবল তোমাকে আমার বশে আনতে পারিনা,

কেবল তুমি আসো না,

কেন্ আসো না, নাগর?

অথচ আমি নিয়ম করে বারান্দায় আসি

আড়চোখে ইতিউতি তোমাকে খুঁজি

তবুও কোত্থাও তোমাকে আর পাই না।

আচ্ছা-তুমি কি এখন অন্য মহল্লায় যাও

হাতে ফুল নিয়া কি অন্য গলিতে দাঁড়াও

অন্য কোনো বারান্দার দিকে বিড়ালের মত মুখ দাও?

চুকচুক করো?

কার জানালার পর্দা গলিয়ে অন্দরমহলে চোখ বাড়াও?


অথচ আমার চোখ কেবলই তোমাকে খুঁজে... 

আকুলিবিকুলি মনটা তোমাকেই প্রেমিক মানে; 

অন্য কোনো সিটি প্রেমিক সে খোঁজে না

প্রেমিক বলতে এখনো সে শুধু তোমাকেই বুঝে।



স্বকীয়তা হারিয়ে

জহির খান


ঝড়ের বেগে চলছে সময়

অসমাপ্ত গল্পের পিছনে


তবুও নিষ্ঠুর গল্পের নায়ক

দেখার চেষ্টাই করলো না তোমাকে!

পদাবলি : ০২

পদাবলি : ০২

 



সাড়ে তিন হাত মাটির ঘর                      

রিয়া সাহা অর্পা


সাড়ে তিন হাত মাটির ঘর কিনেছি তো জন্মতেই,  

ধরা যখন খুব ক্লান্ত নিয়ে আমায়, 

ঠাঁই সে ঘরেতেই,

অতলে একলা কায়া আমার ,

ভবঘুরে আত্মা খুঁজে চেনাজন না পায় ।

নাই প্রদীপ,

তো অন্ধকার-ই বা কই !

চিৎকার নেই কাঠের বাক্সের বাইরে,

অন্দরে নিস্তব্ধ সংসার।

আধভেজা হয় না মাটি ,

আসে না দ্বারে কেও !

আসে তো অতীত !!

ডাকে আমারে,

ফুসরত নাই একলা সঙ্গের !

দেখো তবে সঙ্গ দেয় আজ কে তোমারে !!


এলোমেলো চুল, ফ্যাকাশে দাগ 

মা দেখলে শাসনে টেনে নিতো আঁচলে।

অচেতন মন, 

কোথায় গেল শত নিয়ম !

বাবা থাকলে রাগ করতো বেশ করে।

প্রিয় যদি আজ কথা মিটাতে আসেই-বা,

গভীর অতলে দেখেও দেখে না আমারে। 


নিসর্গ ঘরখানা আঁকড়ে ধরে বলে,

শান্তির ঘুম দাও, রজনী !

কায়াও যে থেকে যাবে ধরণীর-ই।

অনন্তকাল নয় সকল তা তো তুমি জানতে ! 


আপন আমার,

নিঃশেষ চিহ্ন অক্ত ,

সাড়ে তিন হাত মাটির ঘর !!!

আমার অজানা অন্বয় !!



ধাওয়া

সুজন আরিফ


অঘোষিত সিস্টেম দাঁড়িয়ে যায়

কার ইশারায়?

পুঁজির মিছিল বের করে

কেউ লুকিয়ে কেউবা বন্দনায়।


শতভাগ জয় নিয়ে ঘরে ফিরে ঈশ্বর

নেই কোনো হাওয়া

আহা! মানুষ সন্ধ্যার মত মরে যায়

খেয়ে রাত্রির ধাওয়া।



উদয়াস্ত

 সেলিম খান


সূর্য ডুবে যাচ্ছে, আমিও যাবো।

শুধু সময়ের অপেক্ষা।

পাখিরা সারাদিন ঘুরে ফিরে একসময় তার আপন নীড়ে ফিরে যায়,

শুধু জেগে থাকে নিশাচররা।

আমিও আমার আপন নীড়ে যাবো,

অবশ্যই যাবো, সময়টা আসতে দেও।

তখন হয়তো তোমার অপেক্ষা করে,

কফির মগটা হাতে নিয়ে অপেক্ষা করা হবে না।

কে জানে ওখানে কফির ব্যবস্থা আছে কিনা?

থাকতে পারে, জানা নেই।

আমি চলে গেলে পৃথিবীর ভার কমবে না হয়তো,

আমার জায়গা দখল করবে অন্য কেউ।

হয়তো পৃথিবীর ভার কমার নয়।

 আমি অস্ত যাবো নিশ্চিত, আজ হোক, কাল হোক, কিংবা পরশু।

এসেছে নতুন সূর্য জায়গার অভাবে করছে আনছান,

আমি বরং অস্ত যায় বাঁচুক নতুন প্রাণ।




ব্যবধান ভুলে হৃদয়ের চাওয়া

মহিউদ্দিন বিন্ জুবায়েদ


অনেক ব্যবধান মধ্যিখানে..

তুমি অনেক দূরে নাগালের বাইরে

কুয়াশাবেদে মেঘপুঞ্জ সপ্তআকাশ ওপরে

তবু.. ডাকলেই যেন কাছে পাই

একান্ত নিভৃতে নিরবে কথোপকথনে।


প্রতিরাত তুমি খুব কাছাকাছি আছো..

ব্যবধান ভুলে হৃদয়ের চাওয়ায়। মন

থেকে মনের গভীরে...খুব কাছে।



রঙহীন মরিচীকা 

রুদ্র সাহাদাৎ 


মানুয়ের ভিড়ে থেকেও আজও মানুষ চিনি না 

জীবন জীবন চিল্লাতে চিল্লাতে জীবনের অর্ধেকই কেটে গেলো অজান্তে কেউ জানে না


প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠে দেখি রণক্ষেত্র, যে যার মতন গন্তব্যের সন্ধানে ছুটছে

মুখোশের মেলায় হাট বসে রঙিণ আয়োজন 

মাঝেমধ্যে সব কিছু অচেনা লাগে ফ্যাকাশে চারিধার রঙহীন মরিচীকা

কেমন করে বেঁেচ থাকছি,কেউ জানে না ।


গল্পের শুরু এখানেই...

গল্পের শুরু এখানেই...

 



গল্পের শুরু এখানেই...

ইয়াকুব শাহরিয়ার


আজকে টিউশনিতে যাবো না। ভালো লাগছে না। ভাবি ফোন দিলেন। ভাবি মানে- স্টুডেন্টের মা। যে ছাত্রকে পড়াই তার মাকে ভাবি ডাকি। তিন বছর ধরে পড়াই। কেজি টু’তে পড়ে। ফোন পেয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও  বিরক্তির ছাপ মুখে নিয়ে উঠে যাই। বাসা থেকে বেড়িয়ে রিকশার অপেক্ষা করছি। অফিস থেকে ফোন এলো। সন্ধ্যায় বসের ফোন পেয়ে পিলেচমকে উঠার মতো অবস্থা। আরেকটা অফিসে চাকরি করি। আমার মূল পেশা চাকরি। টিউশনি না। ভাল লাগে তাই করি। দরকারি কাজে অফিসে যেতে হবে। অফিস আমার বাসা থেকে বেশ দূর না হওয়ায় হেঁটেই চলে গেলাম। একটা হিসাব বসকে বুঝিয়ে দিয়ে টিউশনিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।

অফিস থেকে বের হতেই রিকশার ড্রাইভার একজন বলল- মামা কই যাবেন? রিকশা পেয়ে যাই। রিকশাতে চড়ে বসে টিউশনিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। বাসায় ঢুকতেই দেখি আবির বসে পড়ছে। আবির আমার ছাত্রের নাম। তিন বছরে একদিনও দেখিনি আমি আসার আগে এভাবে পড়তে বসেছে। কিছুটা অবাক হলাম। আমি ঢুকতেই আবির বলল- গুড ইভেনিং স্যার। রিপ্লাই দিয়ে কিছু বলতে না বলতেই মনোযোগ অন্যরুমে গেলো। চিকন গলায় কে একজন বলছে- এমন টিচার বাবার জন্মেও দেখিনি। নিজের ইচ্ছা মতো আসেন। দায় দায়িত্ব বলতে কিছু নাই। কি দরকার উনাকে রাখার। দেশে আর টিচার নাই, নাকি? বলতে বলতে এদিকেই আসছে। কাছে এসে বলছে- আবির, আজ তোর বাবাকে বলবি টিচারকে......  বলতেই আমার সামনে এসে হাজির। হাতে হরলিক্সের গ্লাস। তবে তাতে হরলিক্স আছে বলে মনে হয় নি। কারণ আবির হরলিক্স খায় না। সে চা খায়।

আমাকে দেখে থমকে গেলো মেয়েটি। কোনো কথা নেই। ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। হরলিক্সও দিচ্ছে না। আবির বললো- সোনামনি, দিবে? গ্লাসটা দিয়ে দৌঁড়ে চলে গেলো। আমার চোখ ছানাভরা!  চিপচিপা গড়নের আরো মেয়ে দেখেছি, এতো সুন্দরি দেখিনি। চমৎকার চোখ, মুখ, চুল আর কণ্ঠ। আমিও কিছু বলিনি। শুধু মুচকি হাসছিলাম। এতোক্ষণে বুঝে গেলাম যে, সে ভাবির বোন। মানে আবিরের খালা হয় সম্পর্কে। সোনামনি ডাকে আবির। অনেক প্রশংসা শুনেছি সোনামনির।

কিছুক্ষণ পড়িয়ে নিলাম আবিরকে। তার মা চা নিয়ে আসলেন। সাথে সোনামনি। আবিরের আম্মু হাসছেন। ভদ্র মহিলা খুব ফ্রিয়ার। ভাল। তিনি পরিচয় করিয়ে দিলেন- ও হচ্ছে কুসুম। আমার ছোট বোন। এমসি কলেজে গনিতে অনার্স করছে। সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে। তার কথায় আপনি কিছু মনে করবেন না প্লিজ। ও এরকমই। তিনি চলে গেলেন। কুসুম সরি বললো। বললাম- আচ্ছা ঠিক আছে। আমি আমু। কিসে পড়ছেন, সিলেটে কোথায় থাকা হয় এরকম কথায় কথায় অনেক কথা  হলো। আবির আমার আর কুসুমের মুখের দিকে বার বার তাকাচ্ছিল আর হাসছিল।


ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৭৭

ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৭৭

 তারুণ্যের শিল্প সরোবর : ধানশালিক : সংখ্যা ১৭৭,

শুক্রবার, ১৫ অক্টোবর ২০২১