ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৯

ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৯

 তারুণ্যের শিল্প সরোবর : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৯

শুক্রবার, ১৮ জুন ২০২১























গাঙ ভাঙা চরে বুক ভাঙা মানুষ !

গাঙ ভাঙা চরে  বুক ভাঙা মানুষ !


গাঙ ভাঙা চরে বুক ভাঙা মানুষ

মিসির হাছনাইন 


তখন মাঘ মাসের মাঝামাঝি। উত্তরের বাতাস মনে হয় চলমান মানুষটাকে উড়িয়ে নি যেতে পারবে। ভরদুপুরে সুরেলা গাছের পাতা কণ্ঠে একটানা ডেকেই যাচ্ছে ঘুঘুপাখি। উত্তাল মেঘনা কেমন শান্ত এক পুকুর, পরিষ্কার জলের গায়ে কতগুলো বক উড়ে উড়ে নদীটা পাড়ি দিয়ে ঐ চরের কেওড়া বনে চলে গেল। নদীর জল জোয়ারেও খাল পর্যন্ত আসে না, জুতা পায়ে খাল পেরিয়ে গেলেই মাঠ, দশ কদম হাঁটলেই নদী। ঐ তো ভাঙা টিলার উঁচু জায়গায় বিন্দি জালে বাগদা চিংড়ির পোনা ধরছে সবুজ মাঝি। তিনি এই গাঁয়ের জামাই, পুবের চর মানিকায় ঘর, সৎ বাপের ঘরে মায়ের ছলছল চোখ আর দেখবে না বলেইথ বছর দুয়েক আগে বর্ষার এক বৃষ্টিতে নৌকার গুন টানতে টানতে... এতদূর মায়ের দেশ নদীর পাশে বেড়ীবাঁধ, মামা ছলিমের নৌকায় ওঠে মাছ ধরতে যায় সাগরেরও আগে, যৌতুকের দেড় লাখে একখানা নৌকায় বিশ বছরের নয়া যৌবনের ঘর পেতেছে বাবলা গাছের তলে। আর কখনও সে চর মানিকায় গিয়েছিল কিনা তা অজানাই থাক। উচ্চতায় গুল্ম বৃক্ষের সমান, কালো গায়ের রঙ মেখে কত সহজসরল এই মানুষটা বছরের পর বছর ধানিয়াপুর গাঁয়ে বিড়ি খাওয়া কালো ঠোঁটে হেসে হেসে জীবন ভাঙছে মেঘনা নদীর কূলে।


তিন বছরের সংসার, বীণার বয়স পনেরো থেকে ষোলতে পড়েছে.. তখনই তাঁর বিয়ে হয়। লাজুক স্বভাবের এই ষোড়শী কখনও কোন পুরুষের ছায়ায় দাঁড়িয়েছে কিনা তা বলা মুশকিল, কত সহজ, আর, কত ছোট ছোট চাওয়া পাওয়া তাঁর। পড়াশোনা ক্লাস ফাইভ, কোন রকমে দুই বেলা খাওয়া তিন বোনের অভাবের সংসারে, মা তাঁরে উপজেলা শহরে কাজে দেয়থ পৌর কাউন্সিলর জলিল মুন্সীর ঘরে। মফস্বল শহরের হাওয়ায় বছর ঘুরতেই বীণাকে যে কেউ দেখলে বুঝতেই পারবে না নদীর কূলে ঘর। বুকের ওড়না ভালোমতন জড়িয়ে নিতে গেল পাশের ঘরের কলেজ পড়–য়া রিপনের তাকিয়ে থাকা প্রেম লুকিয়ে রাখা চোখথ ধরা পড়ে গেলে বীণা চলে আসে গাঁয়ে। এর কয়েকদিন পরই বীণার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের বছরই তাদের প্রথম সন্তান মারা যায়, কখনও মনেই হয়নি, মৃত জন্ম দেওয়া ছেলে বুকে জড়িয়ে কেটে যাওয়া শোক মুছে বীণা আবার আগের মতন হাসবে, পরাণের স্বামীর জন্যে একলা ঘরে শুয়ে শুয়ে চেরাগ জ¦ালা আলোয় শ্যামলা মুখখানা অপেক্ষায় অপেক্ষার রাত জাগবে, বিছনার ফুল কত সুন্দর সাজবে।

বুকের শোক গোপন করে আবার মা হয় বীণা।

সেবার ইলিশের মৌসুম। নিজের ছোড নাওখান বেচে দিয়ে আবার মামার নৌকায় ওঠে সবুজ। নদীর এদিকটার চেয়ে সাগরের আগে নদীর ¯্রােতে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যায়। তার কারণে অনেক নৌকা এক মাসের খরচে সাগরের কাছাকাছি সামরাজ যায় মাছ মারতে। মামার নৌকা এক মাস পর, সামরাজ থেকে ফেরার দিনে মামাতো ভাই আকরামকে বলে সে চিটাগাং চলে যায়। ততদিনে ফোনে ফোনে কথা হতো বীণার সাথে, বীণাদের ঘর ছিল দুই ঘর পরেই, পনেরো দিন পর পর সবুজ দুই হাজার করে টাকা পাঠাতো। আন্তরিকতায় ভরপুর এই মানুষটা ভালোবেসে ঘর ছেড়েছে, দূর দেশের মানুষকে করেছে আপন। বাপ মরা এতিম এই ছেলেটার কাহিনী আমি লিখছি.. তার আগে চলুন গায়ের মাঝখান থেকে ঘুরে আসি।


২.


নদীভাঙা ধানিয়াপুর গাঁও। মাঝখান দিয়ে যে রাস্তা পুবে মেঘনার বেড়ীবাঁধথ উত্তর-দক্ষিনে চলে গেছে নদী ঘেঁষে আর পশ্চিমে আনন্দ বাজার হয়ে উপজেলা শহরের দিক চলে যাওয়া রাস্তার দু ধারে পাশাপাশি নদীভাঙা মানুষের ঘর, এদের প্রায় সবাই ছিল এককালে কৃষক, সময়ের চলে যাওয়া দিনে এখন কেউ কেউ বাজারের ব্যাবসায়, তিন, চার ঘরের কেউ শিক্ষক, চৌকিদার, দলিল লেখক, গাঁয়ের মেম্বার। নদী থেকে বের হওয়া বিশাল বড় খালটা এখন বাঁধ দিতে দিতে হয়ে গেছে ছোট ছোট পুকুর। পুরো গাঁয়ে একশো খানা ঘর, বেড়ীবাঁধের উপর নদীর আয়ে খাওয়া মানুষের এক কালের কষ্ট, না খেয়ে থাকার দিন অনেকটা মুছে গেছে। এই একশো কি তার একটু বেশি পরিবারথ ধনিয়াপুর মতলব হাজী হাওলাদার জামে মসজিদে সব পেশার মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এক আল্লাহর উপসনায় নিজের জানা দুঃখে নীরবে কাঁদে, আহা! সবাই খোঁজে পরকালের সুখ। 


একটু আগে ঘরের সামনে রাস্তায় ওঠে পুকুরের ঐ পাড় মেম্বার বাড়ির ঘাটে, রতন মেম্বার দেখলাম বসে আছে। হঠাৎ হৈ চৈ আওয়াজ আর কান্নার বিলাপে আকরাম এক ভোঁ দৌড়ে চলে আসে মেম্বার বাড়ির উঠানে। মেম্বারকে কাঁধে ভর করে ঘরের বিছনায় শোয়ানো হল, ডাক্তার আসবে বাজার থেকে, একটু চেকাপ করে ওষুধ দিলেই ত সুস্থ, এর আগেও অনেকবার এই অবস্থায় পড়তে হয়েছিল তাঁকে। মাথায় তেলে পানি দিতে দিতে সিলিং ফ্যান ঘুরলেও অনেকে বাতাস দিচ্ছিল, হঠাৎ শোয়া থেকে ওঠে বসে, তারপর বমি করে, এবং চিৎকার দিয়া বলে- “ওরে বুকটা বুঝি গেলো রে”.... পুরো শরীর একবার ঝাঁকুনি খেয়ে চোখ দিয়ে প্রাণপাখি উড়ে গেছে ঐ আকাশে। আহা! দিব্যি সুস্থ মানুষটা দুনিয়া থেকে পাড়ি দিল পরপারে। হায়রে!! মানুষের মৃত্যু, কত সহজ, কতটা সত্য 

যেমন দেখি না পিঠের দাঁগ, পোড়া হৃদয়।


শোকে ঢাকা পুরো গাঁয়ের পশুপাখি, গাছপালা দিনের সূর্য আর রাতের অমাবস্যা। চিটাগাং থেকে খবর পেয়ে সবুজ গাঁয়ে আসছে পরশু। বীণা পোয়াতিথ অন্য সবার মতন তাঁরও জানতে ইচ্ছা হয় পেটের সন্তান ছেলে নাকি মেয়ে।

তবে, যা হা হোক বীণা তাতেই খুশি। সেদিন সন্ধ্যায় ছোট ছোট চুল আর লাল রঙের শার্টে সবুজকে দেখেই বীণার শরম লাগে, এতদিনে সে তাঁর স্বামীর মুখ দেখেনি, শুধু হৃদয়ে খুঁজেছে, যখন তখন কাছে চেয়েছে, আজ হয়তো হঠাৎ দেখায় বুকের ভেতরকার শরম নাকি অন্যকিছুথ

বুঝে ওঠার আগেই বীণা মুখ লুকায়।

“আরো কয়দিন পরে আসতেন। আমি ত ভালোই আছি। দেখবেন, দেখবেন নকশিকাঁথা সেলাই করছি, এই যে ঐখানে দেখেন কতগুলো টাকা জমাইছি...আমগো বাবু হওনের সময় লাগবো, আপনে অনেক হুকায় গেছেন”। একদমে কথাগুলো বললো বীণা।

“হইছে হইছে তুমি এখন রেস্ট লও, এই যে ফল এগুলা খাবা, মামা আর তোমাদের ঘরের জন্যও আনছি, এখন শুয়ে থাকো, উঠতে হবে না, ফল ধুয়েমুছে কেটে দিচ্ছিথ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। ব’লে সবুজ একটা সিগারেট ধরায়, তারপর, বাজারে যায়।

তার ঠিক সাতদিন পর, গভীর রাতে বীণার প্রচন্ড ব্যথা ওঠে। অনেক কষ্টে একটা অটো রিকশা জোগাড় করে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল, সবুজের জমানো সব টাকা সে লুঙ্গির প্যাঁচে বেঁধে নেয়। সমস্ত টাকা আর সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়েও সেদিন বাঁচতে পারে নি বাণী ও তার পেটের ফুটফুটে নয়মাসের কন্যা সন্তান। কত অল্পতেই মিলে গেলো তার ছোট্ট সংসারের সুখ দুঃখের হাসিমাখা রাতদিন।

সবুজের বেঁচে থেকেও মরে যাওয়া মুখ যে কেউ দেখলেই মনে হবে আকাশ ভাঙা অপরাধ তাঁর।

এক মাস পর বিয়ে করে রেজিনা নামের এক মেয়েকে।


রবি মৌসুমে ইলিশ ধরা বন্ধ, তিন মাস অবরোধ। এখন জেলেরা রাতদিন বাগদা পোনা ধরছে। একটা কম্বল গায়ে মুড়ে গুটিশুটি নদীর কূল ঘেঁষে উঁচু জায়গাতে যেখানে এক সময় বসতবাড়ি ছিল জোনাক জ¦লা আলোতে দক্ষিণা পিনপিনে বাতাসে সবুজ মাঝি বড় একটা প্লাস্টিকের বাটি থেকে থালাতে পানি নিয়ে হাতের চামচ দিয়ে বাগদা পোনা আলাদা করে পাশের ছোটো বালতিতে রাখছে। রাতদুপুরে পোনা বেশি পাওয়া যায়। একশো পোনার দাম পঁচিশ টাকা। হকার এসে পোনা নিয়ে যায়। রাতদিন মিলে হাজার পোনা ধরতে পারলেই চলে, মাঝেমধ্যে অনেকের পরিশ্রম আর মেধায় হাজার ছাড়িয়ে যায়।


বাগদাথগোলদা পোনা বৈধ ভাবে ধরা নিষেধ আছে, কারণ হাজার হাজার ছোট ছোট মাছ জালে আটকা পড়ে, শুধু পরিনিত পোনা রেখে বাকি জলসহ মাছ ডাঙায় ফেলে রাখে, ফলে সব মাছ মরে যায়। সরকারি ভাবে নিষেধ থাকা সত্ত্বেও অনেকে চুরি করে মাছ ধরে।

এই সময় নদীতে কোস্টগার্ড নৌকা নিয়ে টহল দেয়। যখন তখন যে কেউ ধরা পড়তে পারে, তাই সবাই সতর্ক থাকে।

সবুজ মনে মনে রেজিনার কথা ভাবতেছিল, ঐ তো কাল রাতের ঘটনায় হাতের থালাভর্তি চোখে বাগদা চিংড়ির পোনা রাখতে রাখতে একটা বিড়ি ধরায়, হঠাৎ করে হা হা হা করে হাসে। কিন্তু, কেন হাসলো সে কথা বুঝতে পারে না সবুজ। চারদিকের অন্ধকার আর শীতের বাতাস বারবার  মনে পড়ছে রেজিনার মুখ। নদীর ঘোলা জলে লম্বা বাঁশের সাথে বাঁধা বিন্দি জাল, এক ঘন্টা পর পর টান দিয়ে তুলতে হয়, মাঝখানের বিশ্রামে মাঝির ছোট্ট টঙ ঘরে গিয়ে সোজা শুয়ে পড়েথাকতসব কি জানি হাবিজাবি দেখতেছিল হঠাৎ চোখ খোলে রেজিনাকে দেখতে পেয়ে সবুজ দৌড়ে পালায়।

কিছুদূর গিয়ে একটা উল্টে যাওয়া খেঁজুর গাছের গুড়ির উপর বসে একটা বিড়ি ধরায়। মনে মনে বলে- “শ্লার পুতের শান্তি নাই! কান্তি নাই! তারপর হা হা হা... করে হাসে। কেন যে বারবার হাসিটা চলে আসে বুঝতে গেলেই মনে পড়ে রেজিনার মুখ। না, না বীণার করুণ চোখ


কে যেনো ডাকে, এমন একটা ডাকে তাঁর বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে, এক জীবনে কত পাপ করেছে সে, এক নারীকে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছে, পেতেছে সংসার গাঙ ভাঙা চরে, তবুও ছোট্ট বুকে কতটুকু আশা লয়ে মানুষ নদীর জলে গান গায়থ বুক পোড়া দুঃখে বেঁচে থাকে, তাকিয়ে থাকা চোখে কেমন মুখখানি দেখে দেখে মানুষটা জীবনভর হা হা হা... হাসে।


ডুমুরের ফুল

ডুমুরের ফুল

 



ডুমুরের ফুল

নেহাল অর্ক


আমার স্বামীরে ওরা মাইরা ফালাইছে মুক্তিযুদ্ধের সময়। তহন কিছু বুঝি নাই; নইলে কী তারে যুদ্ধ করতে দিতাম! আমাগো কি লাভ হইছে কিছু? যা হইবার হেগু হইছে। বলতে বলতে ভগীরথী বাজারে যাচ্ছে। সংসারে আয়-রোজগার নাই; একটা গাভীর দুধ বিক্রি করে কোনোরকম চলছে জীবন। যৌবনের চঞ্চলতাকে সে বিসর্জন দিয়েছে একাত্তরের সাথেই।

মাসি কী নিতে বাজারে এলে? সজল, একজন ব্যবসায়ী, জিজ্ঞেস করতেই ভগীরথী কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের কথা বলে। ভগীরথী তার কাছ থেকেই সওদা করে কখনও নগদ দেয়; কিছুটা বাকিও থাকে। নগদ বাকির দেনা-পাওনার মাঝেই নিঃসন্তান ভগীরথী কখন যৌবন পেরিয়ে স্বামীর ঘর ভালোবেসে দত্তপুর গ্রামে পড়ে আছে তা সে নিজেও জানে না। কিন্তু তার এই ত্যাগের মূল্য কই? ক’জনই জানে ক্ষুধা আর জীবনের চাহিদা তাকে যে পরাজিত করে দিয়েছে তার কাহিনী? সজল বাবার কাছ হতে ভগীরথীর কাহিনী শুনে চোখের জলও ফেলেছে; কিন্তু এ পর্যন্তই। একদিন দোকানে বসে ভগীরথী বলেছিলো, রেডিওতে শেখ সাহেবের ভাষণে কিভাবে মোহিত হয়ে নবযৌবনের কোল হতে তার স্বামীকে ছেড়ে দিতেও সেদিন কুণ্ঠাবোধ করেনি। এসব গালগল্পের মাঝেই কেউ একজন বললো, সজল কেমন আছো?

স্যার ভালো আছি; বলেই সজল চেয়ারটা এগিয়ে দেয় জব্বার সাহেবের দিকে। উনি গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। জব্বার সাহেবকে দেখেই ভগীরথী চলে যায়। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে একাত্তরের সময়ের কথা বলতে থাকে জব্বার সাহেব। স্যারের মুখের দিকে চেয়ে সজল বলে, লোকমুখে শুনেছি ইদন চাচার ঘরে নাকি অনেক হিন্দু পরিবার স্বাধীনতা সংগ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলো? আয়ুব আলীর গোষ্ঠীর লোকজন নাকি পাকিস্তান বাহিনীর কাছে হিন্দুদের সব তথ্য দিতো?

ঠিকই বলেছো সজল; এরা এখনও দাপট নিয়ে চলছে। এইতো কদিন আগে তাদের গোষ্ঠীর লোকজন একটা মেয়েকে ধর্ষণ করে; কিন্তু উল্টো মেয়েকেই শাস্তি পেতে হলো।


ঠিকই বলেছেন স্যার, বলেই সজল ও স্যার ভগীরথী ও সমকালীন ঘটনার পূর্বাপর আলাপ করতে লাগলো; আরও দুএকজন এসে যোগ দিলো। এই আলোচনার শুরু হয়; শেষ হয় না। জব্বার সাহেব বাহিরে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ, কেউ একজন বিড়বিড় করে বলে ভগীরথীরা আজ খেতে পায় না ঠিকমতো; অথচ রাজাকার ও তাদের দোসররা আজ রাষ্ট্রীয় সুবিধা কুক্ষিগত করছে। জব্বার সাহেব মাথা নাড়ে আর বলে, নদীর ¯্রােতের মতোই সময়ের ডানায় চড়ে স্বাধীনতা পঞ্চাশ বছরের জন্মের ইতিহাস পেরিয়ে এলো; কিন্তু ক’জন এর সুফল পেলো? ভগীরথীর মতো আরও অনেক দরিদ্র মানুষ বঞ্চনা বুকে ধরে ক্ষুধার আর্তনাদে চটফট করছে। তাদের কাছে স্বাধীনতার সুখ ডুমুরফুলের মতোই দুর্লভ ; যা আজন্মকাল অধরাই থেকে যায়।


হবিগঞ্জ।


পদাবলি : ০১

পদাবলি : ০১

 



প্রেম

আনোয়ার কামাল


শুকনো নদীর তলদেশে

জলের ধারা ঘুমিয়ে থাকে

আবারÑ

    সুপ্ত নদী কখনো

আগ্নেয়গিরির মতো জেগে ওঠেÑ

    প্রেমও কী তাই?



তালগাছ ও শিশুতোষ বই

দ্বীপ সরকার


শিশুতোষ বইয়ে

পুরনো একটা তালগাছ

পৃষ্টার এক কোণায়


একটা বাবুই এসে তালগাছে পড়তেই

বইটা নড়ে ওঠে

পাঠরত শিশু বই চেপে ধরে

বাবুইটা শিশুতোষ প্রাণী আগে জানিনি


আমি তালগাছ ধরতে গিয়ে ধরে আনি বাবুই

বাবুই ধরতে গিয়ে তালগাছ

অথচ শিশুদের ধরা শিখলে

গোটা জাতিকে ধরা শিখতাম



কবি ও কবিতা

আদ্যনাথ ঘোষ


এই খোলা চোখ দুটো 

কেবলই শূন্যে 

পড়ে থাকে।

শুধু কবিতার মাঠ সবুজের বুকে  

একাকী ঘুমহীন জেগে থাকে।

খোলা চুলে দুয়ারে দাঁড়ায়

পরাণে উথলিয়া ওঠে 

ঢেউ-নোনা জল

  যেমন মাধবী লতা দোল খায়

বাতাসের গন্ধে মেতে

  ভরা জোছনায়। 

অথচ ঝিলের কান্না 

মিশে যায় গাঙুরের জলের ভিতর।

চাঁদের বুকখানি কাঁদে 

শিবহীন পূজায়।

  যতনে শিল্পের ঢেউ খুঁজে চলে কবি

ছন্দ উপমার ভেতর

  শব্দের দোলায়। 


তবুও মনসার ছোবলÑ  

ভেঙে যায় কবিতার 

বুকের গড়ন।

আর তার রূপ রস 

ধ্বনির শরীর ঘেঁটে 

নারীর ভেতর 

যুবতী সংসারে করে ডুবুরি যাপন।



একটি অপূর্ণ ভালবাসা 

ফারিহা ইয়াসমিন 


শুনেছি ভালোবাসা নাকি রং বদলায়। 

বিশ্বাস করো, যদি তাই হতো বদলে যেতাম আমি। 

এই ছকে বাঁধা জীবনের অপূর্ণ ভালোবাসা থেকে চিরতরে মুক্তি পেতে তুমি।

 ভালোবেসেছি বটে, তবে তোমার কোন চাওয়াই করতে পারেনি পূরণ। 

 সত্যিই অভিমান হওয়ারই কথা, আর অনুরাগেরও আছে হাজার কারণ। 


কেনই বা ভালোবাসবে আমায় আমি যে বড্ড বেমানান,

কতটুকু ভালবাসি তোমায় কখনো দিতে পারিনি প্রমাণ।

যে ভালবাসায় পূর্ণতার পরিতৃপ্তি নেই, 

পাশে থাকার অঙ্গীকার নেই;

যে প্রেম এত বৈচিত্র্যময়।

সেখানে তো থাকবেই প্রতিমুহূর্তে তোমাকে হারানোর ভয়।


আমি তো তোমার কঠিন দুঃসময়ে পাশে থেকে নির্বিঘ্নে বাড়াতে পারেনি দু হাত।

তোমার কষ্টের সঙ্গী হয়ে কখনো জাগতে পারিনি রাত।

তাহলে কেনই বা মনে রাখবে আমায়, 

আমি যে ভালোবাসাকে দিতে পারিনি পূর্ণতার স্বাদ।


তাইতো হৃদয়ের গভীরে অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে শ্যাওলা জমেছে রোজ রোজ,

 হয়তো মনের অজান্তে তুমিও করে চলেছো এক অজানা সুখের খোঁজ। 

 সত্যিই যদি তাই, হয় তবে তাই হোক। 

আমার জন্য ভিজবে না আর তোমার দুটি চোখ।

যত কষ্টই হোক আমার, আমিও নিয়ন্ত্রণ করবো আমার অবাঞ্চিত আবেগ। 

তবে হ্যাঁ শুধু এতোটুকুই মনে রেখো, আমার মনের গভীরতায় চিরদিন রবে তুমি। 

এই পবিত্র ভালোবাসার প্রতিটি পরতে সুখের লীলাভূমি।



সাধক কৃষাণ 

রতন ইসলাম 


কিণাঙ্কে শ্রমের মানচিত্র 

বাস্তবতার অপাঙ্গ চাহনি

চোখের কোণে জমানো ক্লান্তির কাদম্বিনী 

বুকে চাপা পড়া স্বপ্ন-কোঁড়ক 

পিঠ বেয়ে নেমে আসে বাহুচরে

রোদ পোড়াগন্ধ 

বর্ণহীন জীবনকে জিইয়ে রাখার 

জোড়াতালি প্রচেষ্টা 

নিঃসীম ধৈর্যে গিরিপথ ধরে তবুও চলা;

অন্যের উদরে তৃপ্তির-মুক্তির পিদিম জ¦ালাতে

ওখানেই যেন বিরাট স্বার্থকতার শিখর-ছোঁয়া 

সে স্বার্থকতা....

বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণার মন্ত্র জোগায়।




পদাবলি : ০১

পদাবলি : ০১




প্রস্তাব

অসীম মালিক


উনুনে ফিরিয়ে দাও,

হিংসার আগুন !

সাঁঝ প্রদীপের দিকে তাকিয়ে

সলতে হও।


ইজরায়েল, ফিলিস্তিনের রান্নাঘরে এসো,

মায়ের হাতে রান্না খেতে খেতে

দু’জনে হব -

রান্নাঘরের দেশলাই কাঠি।



স্মৃতি সত্তা ও ভবিষ্যৎ 

ধীমান ব্রহ্মচারী


আমি মুক্তি পেতে চেয়েছিলাম বিকেল ঠিক পৌনে চারটে নাগাদ

ফসিলের আস্তারণ সরিয়ে ভাবলাম এবার ঘরে ফিরতে পারব    


অথচ পারলাম কি ?

বার বার কালো ছায়ার মতো প্রশ্ন গুলো আমাকে ঘিরে পাক খেল পূর্ব থেকে পশ্চিমে

ঘড়িটার কাঁটা ততক্ষণে আরো একটা ঘর পেরিয়েছে


অথচ আমি মরলাম কি?

কফিনের ভেতরকার স্থবির হয়ে পড়ে থাকা মৃত দেহ গুলো যেন ফিরে পেতে উৎগ্রীব তাদের জীবন 

অথচ জীবন ফিরে পাচ্ছে ওরা?


শ্লোগান দল তন্ত্রের ভিত্তি প্রস্তর, আর আমরা জনগণ গড়ছি ইমারত

অঝোর বর্ষায় মাঠ ভেসে যাচ্ছে, জলে হাবুডুবু খাচ্ছি, তবুও শালা মরছি না 


হয়তো মৃত্যু আমাদের ডাক দ্যায় না 


   


ক্ষয় 

তামিম হাসান 


রং পেন্সিলের মতো হচ্ছি ক্ষয়,

কিভাবে যেনো হয়েছিলো হঠাৎ 

আমাদের পরিচয়।

বরষার জলধারায়, 

কে যেনো মেঘের রেলিং ছুঁয়ে দাড়ায়!

বিদ্যুৎ চমকে ক্ষনিকেই হারায়। 

কিছু দৃষ্টি হঠাৎ আকর্ষনের সৃষ্টি! 

এই মেঘময় শহরে শিলাবৃষ্টি।


তোমারে আজ দ্যাখবো

রোদ্দুর রিফাত 


তোমারে দেখিনা অনেকদিন আজ দ্যাখবো;

পুষ্পশরীর নিয়ে এসো— আমি উল্লাস মোড়ের

পাশে জলাশয়ের কাছে রেইন্ট্রিতলায় দাঁড়িয়ে থাকবো।


আজ চুল খোলা রেখে মেরুন হিজাব আলনাতে তুলে

আমার দেওয়া কালো টিপের পাতা থেকে একটা টিপ

ললাটে চেপে নির্ভুল কাজল রেখা টেনে আমার সামনে দাঁড়িয়ো।


তোমারে আজ দ্যাখবো; যেভাবে দ্যাখে নারী

স্বর্ণালঙ্কারের দোকানে পছন্দের নেকলেস—

দ্যাখতে দ্যাখতে তোমার হাত ছোঁব, নাকে নাক ঘষে

নাকফুল থেকে সোনালী উজ্জ¦লতা ধার নিবো,

চিবুকের তিলে রাখবো আঙ্গুল আলতো করে

তখন নিসর্গ কালিমা পাঠ করবে আর আমি তোমার ভিতর যাবো তারপর নির্ভুল বানানে

লিখে দিবো এক দীর্ঘ কবিতা যেখানে হেরে যাবে একটি সন্ধ্যা।




আর কিছু হলো না;

রাকিবুল হাসান রাকিব 


তার সাথে... 

ক’দিন আগে দেখা হলো 

ক’দিন আগে কথা হলো... 


তার সাথে... 

কিছু রাগ; অভিমান; ঝগড়াঝাটি; 

কখনো হাসি; কখনো কান্নাকাটি। 

কভু পাশে; কভু দূরে; কভু মাঝামাঝি। 


তার সাথে... 

সবকিছু হলো জমানো হলো ঋণ;

কখনো আপন; কখনো পর বাজে বীণ 

যাবার বেলা হলো... মন উদাসীন।


তার সাথে... 

আর কথা হলো না; দেখা হলো না;

দিন কেটে রাত হলো দিন হলো না? 

তার সাথে কিছু হলো না। 

কারও প্রতি আমার প্রতি কারও 

রাগ; অভিমান; ভালোবাসা; বদনাম!

আর কিন্তু হলো না; আর কিছু রইলো না।



হেমন্তের বিকেলে

আহরাফ রবিন


হলুদ হেমন্তের বিকেল।

পাতা ঝরা ক্ষণে

ভেসে যেতে চাই চলে যেতে চাই।


হলুদের ভেতর আজ গুমোট

হাওয়া। অস্থির মাতাল সময়।


মাঠে কার্তিকের ধান-

ইছামতি আর কালিগঙ্গায়

শান্ত জল- মৃদু শীতল স্রোত।


নবনীতা

            বৃক্ষ

                 নদী

কবিতা- আমি চলে যাচ্ছি

এই হেমন্তের খোলা হাওয়ায়।



বেদনার নীল বালুচর

জান্নাতুন নাহার নূপুর


আজ আমি বলতে চাই

আমার স্বপ্নের পুরুষের কথা

স্বপ্নে আসা সেই পুরুষটি একজন বীর পুরুষ

স্বপ্নের ভেতর দেখি তাকে অনিমিখ লোচনে

কি মায়া! তার চোখে

কি ভালোবাসা! প্রশস্ত চওড়া বুকে

যে বুকে ঠাঁই পেয়েছিল এই বাংলা

ঠাঁই পেয়েছিল কুলি-মজুর

ঠাঁই পেয়েছিল কৃষক-শ্রমিক

ঠাঁই পেয়েছিল অনাহারে থাকা, কষ্টে থাকা

বঞ্চিত, লাঞ্চিত বেদনাহত মানুষগুলো।

ঠাঁই পেয়েছিল এই বাংলার প্রতিটি মানুষ।

অষ্টরম্ভা এই জন্মভূমিতে জন্ম দিয়েছিল স্বাধীনতার

বপন করেছিল সোনার দেশ, বাংলাদেশ।

সোনার দেশে আমার স্বপ্নের পুরুষটিই একদিন ‘বলি’ হলো,

তাঁকে শুইয়ে দিলো চিরনিদ্রায় লাল পাঞ্জাবী পরিয়ে

তাঁকে আর তাই ছুঁয়ে দেখা হলোনা আঙ্গুলের ডগায়।

স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে যাবে আজীবন

তাঁর স্মৃতিকে শূন্য বুকে আকড়ে ধরে বাকিটা পথ

হাঁটতে হবে অজানার পথে.....

ভালো থেকো স্বপ্নের  প্রিয় পুরুষ আমার,

আমি থেকে গেলাম

বেদনার নীল বালুচরে!


শব্দমালা : সাদিক আল আমিন

শব্দমালা : সাদিক আল আমিন



শব্দমালা

সাদিক আল আমিন


জেঠ মাস


জেঠ মাসে ওরা বিয়ে করে। জেঠ মাসে ওরা পানপাতা চিবিয়ে বৃষ্টিতে নাচে তা-ধিনধিন। বৃষ্টি থামলে ওরা হলদে সালোয়ার পরিহিতা নির্লিপ্ত বালিকাকে ভিজে চপচপ হেঁটে যেতে দেখে। দেখতে দেখতে মেঘ ঘনিয়ে শুরু হয় ঝড়। জেঠ মাসে ওরা ঝড়ের বিপরীতে নিজেদের দেহ ঋজু রাখার চেষ্টা করেÑ উড়োচুল সারিসারি ডাবগাছের মতো। জেঠ মাসে সব হলুদ ভিজে যায়। জেঠ মাসে সব গাছে মৌসুমি ঘ্রাণ। জেঠ মাসে ওরা টিনের ছাউনিওয়ালা টাঁটির বেড়ার ঘর বানিয়ে থাকে ফাঁকা কান্দরেÑ তালগাছের বাবুই পাখি যেন। একটু পরেই আবার উড়ে যায় টিন, তাঁতিবাবুইয়ের বাসা, হলুদ সালোয়ার। জেঠ মাসে শ্বশুরঘর থেকে আব্বার বাড়িতে ফিরে আসে ঘরজামাই সোলটেশ। গত জেঠেই ওর বিয়ে হয়েছিলÑ মনে করতে করতে বৃষ্টিতে ভিজে আর পানপাতা চিবায় সে।



অতীতকাল


বুনোহাঁস খুঁটে খুঁটে খায় মানুষের

মাটিতলে লুকিয়ে রাখা অতীত


খেয়ে বড় হয়; হতে হতে

বুকভর্তি পালকে মেলে দেয় সমস্ত শাদা

শাদার ভিতরে লুকিয়ে থাকে ধরণীর ওম

ওমের ভিতরে থাকে সুখ, অন্তিম আমোদ

বুনোহাঁস আমোদে ডানা মেলে উড়ে যায়

ফেলে যায় তার নিজের অতীত

মানুষ সেই অতীত চুমে কবিতা লেখে উপমায়


অথচ নিজের অতীত নিজের কাছে 

কেন এত তেতো লাগে প্রিয়?



গন্ধবকুলের শুভ্রশোক


আমার ভীষণ রোগা দাদীমার ক্রমেই কমছে আয়ু

সেই সাথে দাদাও পাল্লা দিয়ে যুবক হয়ে ওঠে

কী করুণ জীবন দান করে আবার থেমে গেছে জরায়ু!

ভাঙা রাতের ভেজানো কপাটে জীবনকথা ফোঁটে

আমি ছোট শিশু হবে বয়স চার কি পাঁচ 

আলোহীন কলহাস্যে দেখছি কতো শোক

ভুলে থাকো যদি, পারবে না কখনো করতে আঁচ

দেখে ফেলেও না দেখার ভান করা অসতর্ক চোখ


নিভু নিভু চেরাগের কেরোসিন মৃদু হাওয়ায় কাটায় রাত

দেখে নিও তখনÑ হাফপ্যান্ট-পরা আমাকে, ভাবুক

জীবনের জানা নেই আছে তখনো কতো ঘাত-প্রতিঘাত

আমি গালে হাত দিয়ে একা বসে থাকি উজবুক 

দাদা পিঠে শীর্ণ হাত চাপড়ে বলে, ‘বেটি সে কার?’

আমি অকস্মাৎ খুব চমকে লজ্জায় মুখ চেপে ধরি তার




বিরতি


আরও একটু সময় দিলে

হাসবো আমরা


আপাতত বিষাদ নিয়ে

থাকতে দাও

কিছুটা সময়


কে জানে!

হয়তো-বা বিষাদেই লুকোনো আছে

তোমার হারানো গ্রাম, সবুজ ধানখেত

আমি কেবল-ই কৃষক হয়ে

চষে বেড়াই তোমার ভূমি

সহস্র বর্গমাইল


আপাতত বিষাদেই থাকি নিহিত

বৃষ্টিরাত, ঝড়গ্রাম, বোশেখ, রাতের বাতাস

কেমন শূন্যসুখের লোভ জাগায়!

তোমাকে পাওয়ার থেকেও

লোভনীয় সে লোভ


আরও একটু সময় দাও

বিষাদ চুমি

তারপর না’হয় মিথ্যে হাসি

হাসবো দু’জন!



বাউণ্ডুলে নজরুলের দুঃখ-শৈশব...

বাউণ্ডুলে নজরুলের দুঃখ-শৈশব...

 


বাউণ্ডুলে নজরুলের দুঃখ-শৈশব

কামাল আহমেদ 


চরম দরিদ্র্যতাকে সঙ্গে নিয়ে পীর পুকুরের এক মাটির ঘরে কাজীদের পরিবারে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে, বাংলা ১১ জৈষ্ঠ্য তারিখে এক সুদর্শন ফুটফুটে শিশু জন্মায়। সেদিন ছিল প্রচন্ড ঝড়ের রাত, রাতেই জন্ম তার। নাম তার দুখু মিয়া, কখনও নজর আলী। পিতা কাজী ফকির আহমদ, পিতামহ কাজী আমিন উল্লাহ। মাতা জাহেদা খাতুন। মাতামহ তোফায়েল আলী। পিতা, পিতামহ ছিলেন মাজারের খাদেম। আজন্ম দুঃখ কপালী সেই ছেলেটিই পরবর্তী বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

নজরুল পরিবারের পূর্বপুরুষেরা মুঘল স¤্রাট শাহ আলমের সময় পাটনার হাজীপুরের পাট চুকিয়ে বর্ধমান মহকুমার চুরুলিয়ায় এসেছিলেন। তারা দরিদ্র ছিলেন না। কথিত আছে, চুরুলিয়ায় এক সময় রাজা নরোত্তম সিংহের রাজধানী ছিল, ছিল অস্ত্র নির্মাণ কেন্দ্র। পরিবারের পীরপুকুরের বসতঘরের  পূর্বদিকে ‘রাজা নরোত্তমের গড়’, হাজি পাহলোয়ানের খনন করা পীরপুকুর ঠিক বাড়ির দক্ষিণদিকে। পুকুরের পূর্বপাড়ে হাজী পালোয়ানের মাজার, পশ্চিমপাড়ে মসজিদ। প্রথমদিকে মুঘল আমলে এই পীরপুকুরে একটি বিচারালয়ও ছিল; কাজীরা যেখানে বিচার করতেন। কালের যাত্রায় এই কাজী পরিবার একসময় চরম দরিদ্রতায় পড়েন। জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামের পীরপুকুরের পাশে এক জীর্ণশীর্ণ মাটির ঘরে তাদের কষ্টের বসবাস।

১৯০৮ সালে পিতার মৃত্যু হলে নয় বছরের নজরুলের পরিবারে অভাব-অনটন চারপাশ ঘিরে থাকল। মক্তবের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে গেল। পিতার পেশায় খাদেম হিসেবে মাজারে লেগে গেলেন, মসজিদে ঝাড়ামোছা করেন। এতে কি অভাব ঘুচে? ইতোমধ্যেই চাচা ফজলে আহমদ ও চাচা বজলে করিমের কাছে ফার্সি শেখেন। কবিতা লেখার শুরু তখন থেকেই, উর্দু-ফার্সি-বাংলা মিশিয়ে।

একদিকে ক্ষুধাযুদ্ধ, অন্যদিকে শৈশবেই বাউ-ুলে মন ও বিচিত্র জীবনবোধ- সব মিলিয়ে নজরুল আর মাজারের খাদেমের কাজটা চালিয়ে যেতে পারলেন না। যোগ দিলেন ‘লেটো দলে’। লেটো দলে নাচ, গান, কবিতার লড়াই, গানের লড়াই, তর্কযুদ্ধ ইত্যাদি জমে উঠত। এতে নজরুলের যে কিছুটা বাড়তি রোজগার হত তা-ই নয়; পেশাটিকে তিনি ভালোবেসেও ফেলেছিলেন। এ রাস্তায় তিনি এ বয়সেই বেশ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। একাধিক দলের নাটক লিখে দিতেন। এভাবেই মূলত নজরুলের ধীরে ধীরে সাহিত্য সংস্কৃতির সাথে প্রাথমিক পরিচিতি গড়ে ওঠে। অর্জন করেন বিচিত্র অভিজ্ঞতা। হিন্দু পুরাণ ও আঞ্চলিক লোকসংস্কৃতির পরিচয়ও এখানে। এসবের ধারাবাহিকতায় তিনি ‘চাষার সং’, ‘মেঘনাদ-বধ’, ‘শকুনি-বধ’, ‘দাতাকর্ণ’, ‘রাজপুত্র’, ‘আকবর বাদশা’ আখ্যায়িকা মুলক নাটক ও প্রহসন রচনা করেন। বাউ-ুলে নজরুল-মন এ জগতেও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তবে বিষ্ময়কর প্রতিভার গুণে অল্পদিনের এই লেটো-জগত নজরুলের পরবর্তী জীবনের উপর প্রভাব ছিল বিস্তর।

একটা কথা বলা প্রয়োজন, নজরুল বাউ-ুলে হলেও পাঠ বিমুখ ছিলেন না। বইপড়ায় তার অন্যরকম টান ছিল বরাবরই।

১৯১১ সালের শেষদিকে তিনি বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোটে চলে গেলেন। অজয় নদীর তীরবর্তী মাথরুন গ্রামের নবীনচন্দ্র ইন্সটিটিউটে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হলেন। অর্থ-কষ্ট আবারও পিছু নিলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ হলো। এবারও তার ভবঘুরে জীবন। যোগ দিলেন বাসুদেবের কবি দলে। কবি দলের গান তিনিই লিখতেন। সাথে কবিতা, নাটক চলতো। কখনো ঢোল বাজিয়েও আয় করতেন। গান গেয়ে মাতিয়ে রাখতেন সবাইকে।

এই বাসুদেবের দলে গান করতে গিয়ে বর্ধমানে এক খ্রিষ্টান রেলওয়ে গার্ড এর সাথে পরিচয়। গার্ড নজরুলকে চাকুরির প্রস্তাব করতেই রাজি হলেন। চাকুরী হলো। কাজঃ রেল স্টেশন থেকে প্রসাদপুর বাংলোয় গার্ড সাহেবকে খাবার পৌঁছে দেয়া। দেড় মাইল মাটির পথ হেটে টিফিনবাক্সে করে প্রতিদিন খাবার আনতে হত। কখনও আসানসোল থেকে মদ আনতে হত। অবসরে গার্ড সাহেব ও তার স্ত্রীকে গান শোনানোও নজরুলের কাজ ছিল। 

সেই গার্ড সাহেব একদিন তাদের নিজেদের আপদমুক্ত করতে কিশোর নজরুলকে মিথ্যা কলঙ্কে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন। গার্ড সাহেবের স্ত্রীর আগের স্বামীর এক খোড়া কন্যাসন্তান তাদের কাছে ছিল। তার বাবা তাকে ফেরত চাইলে গার্ড ও তার স্ত্রী কন্যাটিকে প্রাসাদপুরের বাংলোতে কিশোর নজরুলের সাথে পাঠিয়ে দিলেন। এদিকে মেয়ের বাবাকে জানিয়ে দিলেন, মেয়েটি গার্ড সাহেবের মুসলমান ‘বয়’ নজরুলের সাথে কোথাও পালিয়ে গেছে। ঘটনায় নজরুলকে দু‘মাসের মাইনে পঞ্চাশ টাকা ধরিয়ে দিয়ে বিদায় দেয়া হল।

নজরুল তাঁর এক বন্ধু রুস্তম আলীর কল্যাণে আসানসোলে এসে এম বকসের রুটির দোকানে খাওয়া-থাকাসহ মাসিক পাঁচ টাকা মাইনেতে চাকুরি নেন। সারাদিন রুটি তৈরি ও বিক্রি করাই কাজ ছিল। কাজের ফাঁকে কোনো একটা সু্যােগে নজরুল আসানসোল ইংরেজি হাইস্কুলে ভর্তি হলেন। বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হয়ে নজরুল ষষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলেন। নজরুল স্কুলের হেডমাস্টার কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিকের প্রিয় পাত্র হয়ে গেলেন। সেখানে একই ক্লাসে পড়–য়া কাজী আবুল হোসেন বন্ধু হয়ে গেলেন। সেই সুবাদে আবুল হোসেনের বড়ভাই কাজী রফিক উদ্দিন দারোগার সাথে পরিচয় ও পারিবারিক আসাযাওয়া হতো নজরুলের। নজরুল ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হলেন কিন্তু বেতন বকেয়া থাকায় নাম কাটা গেল। স্কুল ছাড়তে বাধ্য হলেন নজরুল।

১৯১৪ সালে নজরুল ময়মনসিংহের দরিরামপুরের কাজীর সিমলায় বন্ধু কাজী আবুল হোসেনের বাড়িতে চলে আসলেন। এখানে দরিরামপুর ইংরেজি হাইস্কুলে দু’জনেই ভর্তি হলেন। নজরুল বিনাবেতনে পড়ার সুযোগ পেলেন। কাজীর সিমলা থেকে দরিরামপুরের দূরত্ব পাঁচ মাইল তাই দু’জনেই স্কুলের নিকটে ত্রিশালে বিচুতিয়া ব্যাপারীর বাড়িতে জায়গীর নিলেন। ছুটির দিনে দরিরামপুর আর অন্যসময় ত্রিশালে কাটাতেন।

নজরুলের দূরন্ত ও অভাগা জীবনের সাথী ছিল - বই।

নজরুলের সাথে বই থাকতোই। দূরন্তপনার সময়টুকু ছাড়া বাকিসময় বই পড়েই কাটতো। খাবারের সময়ও পাশে বই। তখনও কবিতা লিখতেন, সুযোগ পেলে নাট্যাভিনয়। স্কুলে বা বিয়ে বাড়িতে অনুষ্ঠানে গান গেয়ে, নেচে আসর জমাতে তার জুড়ি নেই।

১৯১৫ সালে দরিরামপুর ইংরেজি হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে উঠলেন ফাস্ট হয়ে। পরীক্ষায় ফার্সিতে যেখানে বেশীরভাগ ফেল সেখানে নজরুল আটানব্বই পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন।

তখনই একদিন বন্ধু আবুল হোসেনকে সাথে করে ময়মনসিংহ শহরে ঘুরতে এসে সেখান থেকেই বন্ধুকে বিদায় দিয়ে আসানসোল চলে এলেন। পেছনে রেখে গেলেন ত্রিশাল, দরিরামপুর বা কাজীর সিমলার বহু স্মৃতি।

১৯১৫ সালে নজরুলকে রাণীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজ স্কুলে ভর্তি না করায় দীর্ঘ এক চিঠি লিখে এক বন্ধুর কাছে রেখে গেলেন। চিঠি পড়ে চিঠির ভাষায় হতবাক হেডমাস্টার দ্রুত খবর দিয়ে নজরুলকে ভর্তি ব্যবস্থা করলেন। ভর্তি হলেন অষ্টম শ্রেণিতে। থাকার ব্যবস্থা হল মোহামেডান বোডিং এর মাটির ঘরে। বোডিং খরচ, বেতন, খাওয়া খরচ নজরুলকে দিতে হতো না। রাজবাড়ী থেকে সাত টাকা বৃত্তি পেতেন তিনি। সেখানে তার বন্ধু হন পরবর্তী সময়ের বিখ্যাত সাহিত্যিক শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। দু’জনে দুই স্কুলে পড়লেও রোজ দেখা হতো। একসাথে লিখতেন, খেলতেন, ঘুরতেন গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড, ই আই রেলওয়ে লাইন ও নিকটবর্তী অরণ্যে। পুকুরে সাঁতারকাটা, সিয়ারসোল পুরনো বটতলার এক জটা-জুটধারী সন্যাসীর গঞ্জিকাসেবন দেখতে যেতেন। এয়ারগান নিয়ে দুজনে খ্রিষ্টানদের নির্জন কবরস্থানে ইংরেজ মারা খেলেন। সাহিত্যচর্চাও চলতে থাকে। ১৯১৭ সালে দশম শ্রেণিতে উঠলেন। তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোল ভারতবর্ষেও লাগল। নজরুল সৈনিক জীবনে যোগ দেন। তারপর বাকিটাও বহু ভাঙ্গা-গড়ার ইতিহাস।

সহসাই সৈনিক জীবনের ইতি হলো। শুরু হলো পৃথিবীর তাবৎ বিষ্ময় নিয়ে আবির্ভূত কবি নজরুলের বিচিত্র জীবন। তখনও দারিদ্র্য তাঁর পিছু ছাড়েনি, তাঁর আজন্ম স্বভাবটাও দারিদ্র্যের পিছু ছাড়েনি। তবুও তিনি পেয়েছিলেন হিমালয় সমান ভালোবাসা। আবার জীবদ্দশার শেষ প্রায় অর্ধেক জীবন হিমালয় সমান কষ্টও পেয়েছেন আমৃত্যু। এমন এক মহাত্মা মানুষের এই দুঃখ- জীবন, হয়তো ¯্রষ্টার ইচ্ছেতেই হয়েছিল। হিমালয় সমান দুঃখ জীবন ধারী এই মানুষটিও অমরত্বের সারথি হয়ে হাজার হাজার বছর বেঁচে থাকবেন তাঁর অমর সৃষ্টিতে, ‘সৃজন ছন্দে.. মহা আনন্দে.. ’ ।

দরিদ্র ও অভিভাবকহীন কাজী পরিবারে নজরুলের শৈশব না কেটে যদি উল্টো হত, তবে হয়তো আজকের কাহিনী লিখতে হত কি-না জানিনা। হতে পারতো, তিনি অসাধারণ ধীশক্তির অধিকারী হিসেবে উচ্চ শিক্ষিত হয়ে ব্রিটিশদের কাছে বড় কোনো চাকরি নিয়ে বা রায়বাহাদুর খেতাব নিয়ে বেশ সুনামে জীবন উপভোগ করতেন। আজ হয়তো অনেকেই তা ভুলে যেত। কিন্তু বিধাতার ইচ্ছে ছিল অন্যরকম। জীবনভর ক্ষুধা, শৃঙ্খলায় না বাঁধা জীবন, হিসেব- নিকেশ না করা, স্বভাবজাত দ্রোহবোধ ও সবশেষ সর্বনাশা দীর্ঘ ব্যাধি নিয়ে যেটুকু ‘সৃজন ছন্দে’ তিনি মেতে উঠেছিলেন, সেটটুকুই আমাদের জাতীয় কবি, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

শিক্ষক, সাহিত্যকর্মী, চুনারুঘাট, হবিগঞ্জ।


মানুষ নয়, সংখ্যা!

মানুষ নয়, সংখ্যা!

 


মানুষ নয়, সংখ্যা! 

প্রিন্স আশরাফ


কীসের শব্দ মা? গাজা উপত্যকার সুজায়ার ছোট্ট একটি ঘরে গাদাগাদি করে শুয়ে আছে চার সন্তান। প্রশ্নটা সবচেয়ে ছোটজনের। মা জবাব দেন না। একমনে আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকেন। আরেকটি শব্দ। আরো কাছাকাছি। আরো কানফাটানো। ছোটজনের প্রশ্নের পুনরাবৃত্তিতে মা এবারে ফুঁপিয়ে ওঠেন। শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন কোলে। খালি পেটে ঘুমের ভান করে থাকা অন্য তিনজন মাকে জ্বালায় না। অসহনীয় শব্দ থেকে রেহাই পেতে চোখের পাশাপাশি যেন নিঃশ্বাসটুকুও বন্ধ করে রাখে। দুদিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। পানি আসছে না কলে। ঘরে একদানা খাবার নেই। কিছুক্ষনের জন্য সব শান্ত। অল কোয়াইট অন দ্য ওয়েস্টার্ণ ফ্রন্ট। প্রার্থনায় ফলে যাওয়ায় সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় মার চোখ ভিজে ওঠে। আহা রে! আরেকটি দিন! আরেকটি সূর্যোদয়! সন্তানেরা দেখবে আরেকটি সকাল। হয়তো সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। বাচ্চারা আবার স্কুলে যাবে। খেলা করবে বাসার সামনে। দুষ্টুমি করে মায়ের বকুনি শুনবে। ছোটখাটো একটা ব্যবসা শুরুর কথাও ভাবছেন মা। একটু যেন শীত শীত লাগছে। ছোট্ট বাচ্চাটার গায়ে একটা জীর্ণ কম্বল জড়িয়ে দেন মা। মা, যুদ্ধ কি শেষ? ছোটজনের প্রশ্নের উত্তর ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ আলোর ঝলকানি। সব কটি সন্তানই চোখ মেলে চেয়ে আছে ধেয়ে আসার আলোর দিকে। আর কোন প্রশ্নে মাকে বিব্রত হতে হয় না। সব প্রশ্ন আর পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠে গেছেন তিনি। জাতি সংঘের কর্মকর্তাদের মৃত্যুখাতায় আরো পাঁচটি সংখ্যা যোগ হয়। 

যুদ্ধ দু’পক্ষের ব্যাপার। এক পক্ষ জেতে। সুতরাং আরেকপক্ষকে পরাজিত হতে হয়। আসলে পরাজিত হয় মানুষ। ভূলুন্ঠিত হয় মানবতা।

    রাষ্ট্র অনেক বড় ব্যাপার। অনেক বড়। অনেক বড় তাদের স্বার্থ। অনেক বড় বড় তাদের পা। রাষ্ট্রযন্ত্রের বড় বড় পায়ের নিচে পড়ে থেতলে যায় ক্ষুদ্র মানুষ। থেতলে যায় মানবতা।

জাতিসংঘের হিসাবে হতাহত হয় সংখ্যায়। যুদ্ধে মরে সংখ্যায়। সাতশ বা হাজার মরে। নিহত নয়শ। সংখ্যা মরে। ওই সাতশ বা হাজার তো কোন বিমুর্ত সংখ্যা নয়। সাতশ বা হাজার মানুষ। শিশু, বৃদ্ধ, নর-নারী। মানুষ।

     একজন মানুষ। তার চোখ, মুখ, নাক, কান সবই আছে। আছে শরীর। আছে মন। আছে জন্মের ইতিহাস। তাদের প্রত্যেকে জন্মের সময় বাড়িতে উৎসব হয়েছে। প্রত্যেকে যখন হাটিহাটি পা পা করেছে, বাড়িতে আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেছে। প্রত্যেকের মনে আছে এক আকাশ স্বপ্ন।

       হামাস তাদের দিকে রকেট ছুড়ছে এই অভিযোগে তারা আক্রমণ করতে বাধ্য হয়েছে। হামাস যুদ্ধবিরতি মেনে চললেও ইসরাইল গাজা ভুখন্ড অবরোধ অব্যহত রাখায় গত  তারা যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসে।  গাজায় শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার শুরু করে ইসরাইল বাহিনী। শুরু হয় তান্ডবলীলা। ঘন্টায় ঘন্টায় মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। নিহত হাজার ছাড়িয়েছে। আহতও পাচ সহস্যাধিক। গাজার পালামের্ন্ট ভবন মন্ত্রণালয় মসজিদ স্কুল বিশ্ববিদ্যায়লয় হাসপাতাল এমনকি হাসপাতালের এম্বুলেন্স পর্যন্ত হামলা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। তারা ঘরে ঘরে প্রবেশ করে নিরীহ বেসামরিক ফিলিস্তিনি নারী শিশুদের হত্যা করছে। ইসরাইলের কথিত হামাসের ৭০টি রকেট হামলায় ইসরাইলী সরকার চারজন সেনাসদস্যের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে। আর হামাসের অবকাঠামো ধ্বংসের নামে এ পর্যন্ত হাজার খানিক মৃতের খবর জানিয়েছে সরকার। তার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই নারী ও শিশু। চারদিনের শিশুও বাদ যায়নি বর্বেরের হাত থেকে। পুরানো কৌতুক’ই নতুন করে মনে পড়ে যায়।

    এক বার এক মেষশাবক মানে ভেড়ার বাচ্চা ঝরনার পানি খাচ্ছিল। এলো এক নেকড়ে। নেকড়ের নজর পড়ে যায় ভেড়ার বাচ্চার দিকে। ভেড়ার বাচ্চাকে নেকড়ে খাবে। কিন্তু বিনা ভূমিকায় খায় কি করে? ‘হেই ভেড়ার বাচ্চা, তুই আমার পানি ঘোলা করেছিস কেন? তুই আমার দিকে রকেট হামলা চালিয়েছিস কেন?

      ‘হুজুর, আপনি উজানে আমি আপনার ভাটিতে, আমার পক্ষে আপনার পানি ঘোলা করা অসম্ভব। বরং সত্যি কথা বলতে কি , আপনিই আমার পানি ঘোলা করেছেন। আপনি যুদ্ধ বিরতি না মেনে আমাদের উপর হামলা চালিয়ে আসছেন।

    ‘তাহলে গত বছর তুই আমার পানি...। যুদ্ধবিরতির আগে তুই হামলা চালিয়েছিল।’

     ‘হুজুর, তখন তো আপনারাও। দুঃখিত যে এ অভিযোগও সত্যি নয়। গত বছর আমার জন্মই হয়নি।’

    ‘তাহলে গত বছরে তোর বাপ আমার পানি ঘোলা করেছিল। এখন বোঝ তার শাস্তি। আমি যখন বলেছি তোরা শান্তির বিপক্ষে। তো বিপক্ষেই। এখন আমরা শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধারের নামে তোদের ধুলোয় মিশিয়ে দেব। নাম নিশানা মুছে ফেলব।

    খলের ছলের অভাব নেই। নেই ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রের ওজরের অভাব। ক্ষমতাশালী যাকে খেতে ইচ্ছে  করবে, খাবে। পিষতে ইচ্ছে করবে, পিষবে

     ফিলিস্তিনীদের উপর চলমান সংহিসতা বন্ধের ব্যাপারে প্রথমেই আসে জাতিসংঘের কথা। কিন্তু  বরাবরের মতই জাতিসংঘ ঠুটো জগন্নাথ। যদিও জাতিসংঘ ইসরাইলকে সর্তক করে দিয়েছে। বলেছে এটা মানবতার বিপর্যয়ের দিকে গড়াচ্ছে। ইসরাইল জাতিসংঘের সর্তকতা থোড়াই কেয়ার করে চালিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসযজ্ঞ। বিষ নেই তার কুলোপনা চক্কর। আমেরিকা সাথে থাকলে জাতিসংঘ ঘোড়ার ঘাস কাটবে? কবি শামছুর রহমান যথার্থই বলেছেন- 

জাতিসংঘ পরিণামহীন দেবতার মত

                   ডানা ঝাপটায়, শূন্যতায়!

গাধা যখন মোট বয়, তখনো যেমন গাধা, যখন বোঝা নামিয়ে রাখে তখনো সে গাধা। কথাটা ইসরাইলের বেলাতেই সমান সত্য। কথাটা ইসরাইলের বেলাতেও সমান সত্য। যখন যুদ্ধে নামে আর যখন শান্তির কথা বলে, তখনো তা সমান আগ্রাসী।

    খুনের অভিযোগে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো একজনের কাছে বিচারক জানতে চাইলেন, সে খুন করেছে কি না?’

     অভিযুক্ত উত্তর দিলেন, ‘আমি একজন শান্তি প্রিয় মানুষ।’

     আদালত খুনের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত ব্যক্তি স্বীকার করলেন, খুনটি তিনি করেছেন। বিচারক বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন- তারপরও আপনি বলতে চান আপনি শান্তিপ্রিয় মানুষ। ‘খুন হওয়ার পর লোকটি আশ্চর্য রকম শান্ত হয়ে গিয়েছিল ধর্মাবতার অভিযুক্ত উত্তর দিল।

    একটি স্কুল। বাচ্চাদের। স্কুলের লাগোয়া পার্ক। শিশুরা খেলছে। একদল খুদে খোকাখুকু। তাদের নরম গাল। মাথাভরা ঝাকড়া চুল। মায়াভরা বড় বড় চোখ। সেকি ছোটাছুটি। হৈচৈ।

    ঠিক তখনই অকম্মাৎ আকাশে একটা প্লেন দেখতে পায় তারা। হৈচৈ করে তারা প্লেন দেখতে আকাশের দিকে তাকায়। ছোট্ট একটা বোমা ছুড়ে দিয়ে প্লেনটা বিন্দুর মত মিলিয়ে যায়। চোখের পলকে। বোমাটা নিচের দিকে নামছে। শিশুদের দিকে। পার্কের দিকে। বিকট শব্দ। মুহুর্তে সব কিছু নেই হয়ে গেল। হৈচৈ নেই। ছোটাছুটি নেই। এক শিশুর আরেক শিশুর পিছনে ধাওয়াধায়ি নেই। নরম গাল নেই। মায়াভরা বড় বড় চোখ নেই। ওই পার্কের ঝাকবাধা শিশুরা নেই। পাখি পতঙ্গ পুষ্প শিশু কিছুই নেই। শুধু মৃত্যু, শুধু মৃত্যু।

     গাজায় ইসরাইলিদের হামলা নিহতদের অর্ধেক নারী ও শিশু। প্রায় তিনশতের উপর শিশু এ পর্যন্ত এই হামলায় মারা গেছে। ওরা জানে না কি ওদের অপরাধ।

     পাপড়িটা বড় বোকা

     কোৎ করে গিলে ফেলে মৃত্যু।- সুমন চট্টোপ্যাধায়ের গানের পাপড়ির মতো বড়দের বোকামিতে নিষ্পাপ শিশুগুলি কোৎ করে মৃত্যু গিলে ফেলছে।

     সদ্যজাত চারদিনের শিশুও বাদ যায়নি। মায়ের কোলে এসে বাহাত্তর ঘন্টা পেরুতে না পেরুতেই দুনিয়ার বুক থেকে বিদায় নিল শিশুটি। ইটালির প্রখ্যাত সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচি বলেন- ‘আমার ভেতরের ভ্রণটিকে আমি বলেছি, প্রিয় শিশু, জীবনটা হচ্ছে যুদ্ধ। নিরন্তর যুদ্ধ। জানতে চেয়েছি এই পৃথিবীতে সে জন্ম নিতে চায় কি না।  সে বলেছে, ‘নরকে যাও তুমি মা। আমি আর জন্ম নিচ্ছি না।’

   আমার ভাগ্নে পোকা-মাকড় নিয়ে খেলা করে। একদিন সে পায়ের তলায় একটা টিকটিকি পিষে মারছিল। আমি দেখতেই আমাকে বলল, ‘দেখ ছোটমামা, টিকটিকি কত বদমাশ, লেজ নাড়ছে।’

    যে পিষে মারে সে না জানলেও যে পিষ্ট হচ্ছে সে জানে যে লেজ নাড়ে আনন্দে নাকি বেদনায়।


ফিলিস্তিনের গল্প

ফিলিস্তিনের গল্প


 

ফিলিস্তিনের গল্প 

কাজী তানভীর 


তারুণ্যদীপ্ত ফিলিস্তিনি নওজোয়ান, আনাস। 

গত দুমাস ধরে ঘরদোর সাজাচ্ছিল। হবু প্রীয়তমা সায়মা ঘরে আসবে। সায়মা খুব সুন্দরী মেয়ে। 

সে দন্তচিকিৎসক। পরিবারদ্বয়ের মধ্যে বিয়ের আলাপালোচনা পাকা। ঈদের পরপরই তারা বিয়ের পীড়িতে বসবে, আল্লাহ তায়ালা যদি চান! 

মসজিদুল আকসাকে কেন্দ্র করে অর্ধ-রমাদ্বান পেরুবার পর জয়ানবাদি ইয়াহুদিরা রীতিমত ফিলিন্তিনিদের উপর জুলুমের খড়গ চালাতে শুরু করে। প্রতিদিনই নিরিহ ফিলিস্তিনিরা আহত হচ্ছে। একদুইজন করে শহিদের কাতারেও সারিবদ্ধ হচ্ছে! 

পুরো ফিলিস্তিন জুড়ে হাহাকার। আতঙ্ক! আকসা মসজিদকে ঘিরে ইস্যুটা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিগনিত হল। তাই ইয়াহুদিয়া স্রেফ আকসাতে সীমাবদ্ধ রয়ল না। তামাম ফিলিস্তিনের জনবসতি গুলোতেও হামলা শুরু করল। রকেট হামলা করল। বিমান হামলা করল। বহুতল ভবন, মসজিদ তাঁবু সবকিছু ধ্বসিয়ে দিল। ধ্বংসস্তুপ প্রায় শহর-নগর! 

ঈদের দিনও থেমে ছিল না দখলদার ইয়াহুদিদের এই পৈশাচিক বর্বরতা। বোমার শব্দে ঈদের দিনের সকাল হল ফিলিস্তিনিদের! সেদিনও শহিদ হলো অনেক মাসুম বাচ্চা। ধ্বংসস্তুপ পড়ে আছে ঈদের জামা-কাপড় জুতা ও খেলনার পুতুল! কী নির্মম! 

নওজোয়ান আনাস বর্ণনা করে ;

‘আমি সেদিন সায়মার কাছে গিয়েছিলাম। আশ্চর্য হলাম! এই নাজুক পরিস্থিতিতে সে হাসছিল। আমি বলেছিলাম, “ওয়াল্লাহি, তুমি আমার চেয়েও দৃঢ়। মনোবল প্রখর।  মাশাল্লাহ।”

সেদিন তার কাছে থেকে চলে আসি। গতরাতে যখন অভিযান শুরু হয়েছিল, তখন আমি সায়মাকে হোয়াটসঅ্যাপে ম্যাসেজ লিখেছিলাম, তুমি কেমন আছ? সায়মা জবাব বলল, “আমি ভাল আছি, আলহামদুলিল্লাহ! কিন্তু আমার ভীষণ ভয় হচ্ছে।” 



আমি তাকে বলেছিলাম,“ কোনো নিরাপদস্থানে লুকে যাও”। দুর্ভাগ্যক্রমে, ম্যাসেজটি ওর কাছে পৌঁছালো না আর!  ঠিক তখনই বোমাবিস্ফোরিত হলো ওদের বাড়িতে। সব তছনছ হয়ে গেল। 

আমি সায়মাকে তার ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির ধ্বংসস্তুপে প্রায় ১০ ঘণ্টা যাবৎ অনুসন্ধান করেছিলাম। এই আশায় যে, সায়মা এখনও বেঁচে আছে। আমি খুব আগ্রহের সাথে ধ্বংসস্তুপের প্রতিটি ইট-পাথর সরাচ্ছিলাম। প্রায় ১০ ঘন্টা যাবৎ। এই আশায় যে, হয়ত সায়মা জীবন ধ্বংসলীলায় আটকে আছে।

অবশেষে, সিভিল ডিফেন্সের লোকেরা সায়মাকে পেল। তাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল, তবে সে ধ্বংসস্তুপের তলে ছিল ! তার চারপাশে ধূলিকণা ও গুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল! তারমধ্যেই সায়মা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছে।

সায়মা, বুকভরা আশা, ঈদানন্দ উদযাপন শেষে দীর্ঘপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে নির্ধারিত বিবাহের দিনে

নববধূবেশে সজ্জিত হবে। নতুন জিন্দেগী গড়বে।

কিন্তু সে ও তার পরিবারের প্রত্যেকে শহিদ হয়ে গেল। বড় সৌভাগ্যবান তারা সকলে। সবাই এখন দুর্গন্ধযুক্ত পৃথীবি ছেড়ে বেশ আয়েশে আছে, স্বর্গে!

আমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। আল্লাহর কসম। আমি অত্যন্ত আনন্দিত। 

সে ও তার পরিবার খুব সৌভাগ্যবান। তারা শহিদ হয়েছে। আর, একজন শহিদ ৭০ জন গোনাহগারকে

জান্নাতে নিয়ে যেতে সুপারিশ করতে পারে। 

আমি আশা রাখি , আমার প্রেয়সী সায়মার সর্বপ্রথম সুপারিশ আমার জন্যই হবে, ইনশাল্লাহ। 

আল্লাহ যেন তাকে আমার জন্য জান্নাতের হুরদের সরদার্নি বানিয়ে দেন। তার কিছু ডাক্তারি সরঞ্জাম এখনো আমার কাছে আছে। এগুলো ওর স্মৃতি। 

বহু বছর পড়াশোনা কোশেশ ও মেহনতের পর ডেন্টালিস্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে সায়মা! সে তার জীবনের সমস্ত কিছুকে দন্তচিকিৎসার জন্য আত্মত্যাগ করেছিল। আমার জান্নাতী প্রেয়সীর এই স্মৃতিগুলো আমাকে খুব আনন্দ দেয়!

আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস নাসিব করুন। ’

কত প্রিয়-প্রিয়তমার গল্প শুনি। পার্থক্যটা হলো, 

এদের অনেকে আত্মহত্যা করে মরে জাহান্নামে যায়। আর অনেকে শহিদ হয়ে হাসিমুখে জান্নাতে যায়। পরকালের অনন্ত সুখশান্তি’ই আসল সুখশান্তি।


পদাবলি

পদাবলি

  



যেদিন বারোমাস ফুঁসে উঠলো

নাসিমা হক মুক্তা


হঠাৎ খসে পড়ল একখ- মেঘ

দিগন্তের গায়ে হাউমাউ সুর তুলে বৃষ্টি

ঝমঝম বৃষ্টি, শব্দটি দারুণ শিহরিত

সমস্ত শরীরজুড়ে মন পরাগ চিকচিক করছে

মুখোমুখি জীবন!


আমি দেখছি, একা, পাশে আছি শুধু নিজেই

কিভাবে যে মেঘমেলা,

ঝরঝর ঝরে পড়ে

অনুভবে খুনসুটির নানান ছলের করতালি

আমি মানুষ, একা তালি ওঠে না

কেবল মনে ভাসে বৃষ্টির পর যে জল ঢেউ খেলে

সেরকম পুকুর চায়

বৃষ্টির মতো করে ইশারা ইশারা ঢেউ খেলবো


অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা জলসেচ

হাওয়ার পালের সাথে রঙ বদলে

চঞ্চুর মুখে বুনে সুখ

বুকের মধ্যে যেদিন বারোমাস ফুঁসে উঠলো

তখন’ই বৃষ্টি উধাও

বছরের পর বছর অনাবাদি থেকে গেল

তার পরের জীবন.....



 স্রষ্টার নেশিলা ফুঁক

আসিফ আহমদ 


এখন স্রষ্টার দু’আঙ্গুলের মধ্যখানে আমি।

খানিক আগেই মস্তকে আমার অনল দিয়ে ফুঁকতে শুরু করেছেন তিনি।

আর আমি শেষ হতে শুরু করেছি একটু একটু করে।


অথচ এই খানিক আগেই আমি সযত্নে গচ্ছিত ছিলাম চামড়ার মোড়কে ।

সেখান থেকে বের করে মস্তকে আগুন দিতেই, 

আমি একটু একটু করে ধূসর হয়ে ঝড়তে শুরু করেছি। 

শেষ হতে শুরু করেছি স্রষ্টার প্রতিটি নেশিলা ফুঁকে...!!



ফ্রেম

কনকজোতি রায়


মন জুড়ে তারাহীন আকাশ

হৃদয়ে অলীক কল্পনার অনুরনন

চোখের পাতায় ভেসে যাওয়া টুকরো টুকরো মেঘ।


অনেকদিন বৃষ্টি হয়নি,

সিঞ্চনের আশায় পাতাগুলি হলুদ

শুষ্ক ধানের শিষে ফলে না মমতার ফসল,

ক্ষয়িষ্ণু শিকড় উৎপাটনের অপেক্ষায়,

ধুমকেতুর মতো হঠাৎ এসেই মিলিয়ে যায়

লাল নীল আর সবুজ স্বপ্নগুলো,

ভালবাসার মোড়কে নকল সোনা

বাজারদর তারই সবচেয়ে বেশী

অলিতে গলিতে হীরের টুকরোর ছড়াছড়ি।


প্রজাপতিটা আসেনি অনেকদিন

ওটা শুধুই রং ভুল করে

ধরতে পারলে বাঁধিয়ে রাখতাম

সুদৃশ্য ফ্রেমে,

নিরাভরন নয়, মালা দিয়ে।



চলে গেলে রেখে যাবো ঢেরবেশি

রফিকুল নাজিম 


বিস্তৃত আকাশ ও নীল জোছনা- আমি রেখে যাবো

চলে গেলে রেখে যাবো ধানক্ষেতে উতলা বাতাস

পরিচিত পাখি, নাম না জানা ফুল, সবুজ লতাপাতা।

আমি চলে গেলে রেখে যাবো নদীজাত মায়া; দুই তীর,

আমার দুরন্ত শৈশব, উচ্ছ্বল কৈশোর ও তাগড়া যৌবন,

আমি চলে গেলে রেখে যাবো কেবল তোমাকে ও প্রেম।


আমি চলে গেলে সঙ্গে করে নিয়ে যাবো সব অবহেলা 

বুকে পোষা অভিমান, গৃহস্থালি দুঃখবোধ। 

লাল, নীল, বেগুনি রঙের কষ্ট। বিরহকাল। বৈরীতা।

সন্ন্যাসচারিত মন ও বর্বর কাম কামনা- আমি রেখে যাবো

এবং উচ্ছন্নে যাওয়া এই বাউ-ুলে প্রেমিককে

আমি টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাবো তোমার অলক্ষ্যে; ওপারে।



গণতন্ত্র 

মাসুদ পারভেজ


কাঁধের উপর নিজের লাশ নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দরবেশ বাড়ি,

ছোট দরবেশ ধমক দিয়ে বলল- হাঁট 

আমি হাঁটতে থাকলাম.....

পথি-মধ্য মেজ দরবেশ পানের রক্ত সোনার বালুতে পিক দিয়ে বলল- পারা দিস না, সোনার দাম কইমা যাইবো; পথ ফিরাইয়া দৌড়া।

আমি দৌড়াতে থাকলাম...

একবছর পর বড় দরবেশকে পেয়ে গেলাম, বললাম এই লাশের বয়স কত? 

তিনি বললেন- যেইদিন প্রথম ভোট দিছিলি, সেইদিন থেকেই তোর কাঁধে। চিন্তা লইস না আর কদিনই তো। আরেকটু জোরে দৌড়া।


আমি আমার লাশ কাঁধে নিয়ে একশো বছর দৌড়াচ্ছি।


ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৭

ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৭

 তারুণ্যের শিল্প সরোবর : ধানশালিক : সংখ্যা ১৬৭,

শুক্রবার, ২১ মে ২০২১