http://weeklydhansalik.blogspot.com/

ইপেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ২০৬

ইপেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ২০৬

 তারুণ্যের শিল্প সরোবর ।। বর্ষ ৮ম ।। সংখ্যা ২০৮,

শুক্রবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ০২ ফাল্গুন ১৪৩০, ০৪ শাবান ১৪৪৫। 


























আগের জন্মে মানুষ ছিলাম!

আগের জন্মে মানুষ ছিলাম!

 


আগের জন্মে মানুষ ছিলাম!

আসহাবে কাহাফ 



পাখি হয়েই জন্মেছি বলে অসহ্য যন্ত্রণার মাঝেও বেঁচে থাকতে হয়! আচ্চা, পরের জন্মে মানুষ হয়ে জন্মালে কেমন হয়? 

ধুর বোকা, পাখির আবার পরের জন্ম! যেখানে আশরাফুল মাখলুকাত তথা মানুষেরই কোনো পরের জন্ম হয় না, সেখানে পাখি ও পরের জন্ম!


কালো পাখিটির এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভরা মন্তব্যে, লাল পাখিটা কিছুটা নড়েচড়ে উঠল। তারপর, বলল; মানুষ যে বলে, আমি পরের জন্মে এই হবো, ঐ হবো, সেই হবো! তাহলে, এ গুলো কি মিথ্যা? 

হ্যাঁ, এসব মিথ্যা, মানুষের পরের জন্ম বলতে কিছু নেই, যা আছে তা, মৃত্যুর পরের জীবন, যেমন মৃত্যুর পরপর যে জীবন শুরু হয়, সেটা কবরের জীবন। কবরের জীবনের পর মানুষ যেখানে জেগে উঠবে, শেষ বিচারের আশায়, সেটা হাশরের জীবন। এরপর অন্তত কালের জান্নাত বা জাহান্নামের জীবন! 


লাল পাখিটার এমন লম্বা ও গম্ভীর প্রতিত্তোরের প্রতি একধরনের অনীহা থেকে, কালো পাখিটা বলল, চল, দূরে কোথাও উড়ে যায়। 


পৃথিবীতে পাখিদের কোনো সীমানা নেই, সীমাবদ্ধতা নেই, নেই পাসপোর্ট কিংবা ভিসা নীতি, ফলে যখন যেখানে উড়ে যেতে পারে; সূদুর সাইবেরিয়ায় শীত বেশি হলে যেমন, উড়ে উড়ে বাংলাদেশে চলে আসা যায়, একইভাবে, বাংলাদেশে বসে মন-খারাপ হলেও, উড়ে উড়ে যাওয়া যায়, হিমালয়ের দেশে অথবা আরব দেশের মরুভূমির কোনো এক পর্বতশৃঙ্গে। তবে, ইনসান এসব পারে না কেন? ইনসান ত সৃষ্টির সেরা জীব। লাল পাখিটার প্রস্তাব শোনে দুটো পাখি উড়াল দিল আকাশের বুকে।


উড়ে উড়ে ক্লান্ত পাখি দুইটা গিয়ে বসল, একটা গাছের মগডালে। গাছটা স্থির দাঁড়িয়ে আছে জলাশয়ের পাড় ঘেঁষে।। মাঝে-মধ্যে হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ে উঠছে, কিন্তু কোনো শিকারী বা দুষ্ট ছেলেদের ঢিল ছুটে আসার ভয় এখানে নেই। গাছটার পাতা গাঢ় সবুজ, কোনো ফল নেই, ফুল নেই; তবে কিছু নতুন পাতা ফুটেছে। হালকা সবুজ রঙের এসব নতুন পাতা দেখে, লাল পাখিটা বলল, এখানে থাকা যায়, হয়তো কিছুদিন পরেই মুকুল আসবে, তারপর ফল।


মাঝে মধ্যে মনে হয়, মানুষের মত, পাখিরা গাছের নাম জানে না, ফুলের নাম জানে না, ফলের নাম জানে না! তবে, কোনটা খাদ্য আর কোনটা অখাদ্য তারা ভালো করেই জানে। এ একজায়গায় মনে হয়, মানুষের চেয়ে পাখিরা এগিয়ে। ইদানীং মানুষ যা খাদ্য তাও খায়, যা অখাদ্য তাও খায়, কোনো বাছ-বিচার নেই। মানুষ ভালো চালের ভাত খায়, দামি দামি মাছ- মাংস খায়, আবার সুযোগ পেলেই ঘুষ খায়, সুদ খায়! অথচ, পাখিদের এমন জীবন, সে যা প্রয়োজন কেবল তা খায়, কোনো সংগ্রহ শালা নায়, সঞ্চয়ের চিন্তা নায়, বাসায় ফ্রিজ নায়। তাই মানুষের মত অত জুলুম শোষণের প্রয়োজন পড়ে না। কিছুক্ষণ পর পাখি দুইটা ধীরে ধীরে আরো নিচের দিকে একটা শক্ত ডালে নেমে আসল। ডালটা কিছুটা জলের কাছাকাছি। উপর থেকে দেখা যায়, স্বচ্ছ জলের উপর নিজেদের ছবি ভেসে উঠেছে। লাল পাখিটা কালো পাখির উদ্দেশ্যে বলল, আজকে তোমাকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে। দেখ, তোমার মাথা, ঠোঁট, পাখনা কী ঝরঝরে! 


কালো পাখিটা সেদিকে কোনো কর্ণপাত করছে না দেখে, লাল পাখিটা আবার জিজ্ঞেস করল, তোমার কী মন খারাপ? 

না। 

তবে এত চুপচাপ যে?

ভাবছি, তুমি কত সুন্দর করে জীবনের কথা বল, আশার কথা বল, তোমার মত সঙ্গি পেয়েছি, আমি কতই না ভাগ্যবান। 

ধুর তুমি, সবসময় বেশি বেশি বল। এসবই ত আমার কাজ, সবসময় আমার সঙ্গীর পাশে থেকে, তাকে অনুপ্রেরণা দেওয়া, খারাপ কাজে নিষেধ করা, ভালো কাজে সহযোগিতা করা। আচ্চা,  বল ত, মানুষগুলো কেন আমাদের মত হয় না? কেউ কারো ভালো সহ্য করতে পারে না, প্রসংশা করতে পারে না, উপকারে এগিয়ে আসে না। পাশে থেকে অনুপ্রেরণা দিতে পারে না। কেবল, অন্যের ভুল-ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা করাই কি মানুষের ধর্ম? 


লাল পাখিটা চিন্তা করল, সত্যিই তাই। পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে বিনা মতলবে কখনোই অন্যের প্রসংশা করে না। সারাক্ষণ, একে অন্যের দোষ খুঁজে, গীবত করে, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কোনো শ্রদ্ধা নেই, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কোনো দায়িত্ববোধ নয়, যা আছে তা কেবল কাম আর কাম! এবার সে কালো পাখির দিকে, তাকিয়ে বলল, চল গোসল করি।


মানুষের মত পাখিদের হয়তো পর্দার বিধান নেই, তাই, পাখি হলে, যেখানে সেখানে গোসল করতে পারা যায়। লজ্জাস্থান ঢাকার কোনো পায়তারা নেই। আবার, মানুষের মতো, আশে-পাশে কেউ আড়ি পেতে আছে, গোপনে ভিডিয়ো করছে এমন কোনো ভয়ও নেই। কিন্তু আমরা যারা মানুষ, তারা এক অদ্ভুত প্রাণী, যে জানে, সেখানে কেউ, গোসল করছে, হোক সে নারী বা পুরুষ,  এটা গোসলের স্থান; তারপরও আমরা উঁকিঝুঁকি দিই। কী বিচ্ছিরি! গোসল শেষে দুটো পাখিই আবার মগডালে উঠে এসেছে। এখানে রোদের ঝিলিক খেলা করছে নতুন পাতার শরীরে। লাল পাখিটা তার ঠোঁট লাগিয়ে দিয়েছে, কালো পাখির ঠোঁটে,  তারপর গলা বেয়ে পালকের নিচে, এভাবে কয়েকবার সে কালো পাখির চারপাশে প্রদক্ষিণ করে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। কালো পাখিটা বার কয়েক ডানা ঝাপটা দিয়ে দুজনেই আবার উড়ে গেল। কোথায় উড়ে গেল? পৃথিবীতে বড়ো বড়ো পাখিদের ত নির্দিষ্ট কোনো ঘর নেই, বাড়ি নেই, কেবল বাবুই আর চড়–ই পাখি ছাড়া। পিছুটানও নেই, যার মায়ায় সাঝবেলায় আবার ফিরে আসতে হবে! তারপরও কি পাখিরা ফিরে আসে? মানুষের মত? প্রতি সন্ধ্যায়? প্রিয়জনের সান্নিধ্য পেতে? মানুষ ফিরে আসে, আসতেই হয়; আপন নীড় ছাড়া পৃথিবীতে মানুষের আর কিছুই নেই, এ পৃথিবী তার কাছে যথেষ্ট ছোটো, যে বাধা পড়েছে, মায়ার কাছে, মানুষের কাছে, প্রেম ও প্রনয়ের কাছে। তাহলে, পাখিদের কি স্বজাতির প্রতি প্রেম নেই? প্রনয় নেই? কে জানে! 


উড়তে উড়তে বহু পথ পাড়ি দিয়ে পাখি দুইটা এবার পৌঁছে গেল বঙ্গভবনের আঙ্গিনায়,  সারি সারি গোছানো গাছ, নানা রঙের ফুলের বাগান। এসব তাদের ভালো লাগে, প্রায় তারা এখানে আসে, এখানকার সবকিছুই যেন, ঘড়ির কাটার সাথে তাল মিলিয়ে ঘুরছে, কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, জটলা নেই, গ্যাঞ্জাম নেই। অদ্ভুত নীরবতা তবে, ব্যস্ততার কমতি এখানে কোনো কালেই ছিলো না। ইতোমধ্যে বঙ্গভবনে সবার খাওয়া দাওয়া শেষ, আশেপাশে আরো কিছু পাখি দেখা যাচ্ছে, যে যার যার মত, গাছে গাছে উড়ছে, নিচে নামছে, খাচ্ছে, কেউ বা নিজস্ব সুরে গান করছে। এমন সময় লাল পাখিটা খেয়াল করল, বঙ্গভবনে প্রবেশ করছে রাষ্ট্রপতির গাড়ির বহর। কিন্তু, আজ যে মানুষটা গাড়ি থেকে নেমেছে, যাকে সবাই চতুর্দিকে ঘিরে আছে, তাকে পরিচিত মনে হচ্ছে না! সে কালো পাখিকে ডেকে বলল, শোনছ? দেখ ত, আজকে যিনি প্রবেশ করছে, তাকে কি তুমি চিন? এ লোকটাকে ত আগে কখনো দেখিনি! এতদিন যে লোকটা ছিলো, সে কোথায়? তাকে দেখছি না কেন? 


কালো পাখিটা তখন বলল, আরে বোকা, এ লোকটিই হল, এদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি, গতকালই যিনি রাষ্ট্রপতি ছিলো, এর আগেও যারা রাষ্ট্রপতি ছিলো,  এখন তারা নাই, তাদের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ।  

কী বল এসব? ক্ষমতা আবার কী? আর যদি ক্ষমতা নামক কোনো কিছু কারও কাছে থাকে, তার আবার মেয়াদ থাকবে কেন? 

সে তুমি বুঝবে না! 

বুঝব না কেন? তুমি কি এটা ভুলে গেছ, এদেশের প্রধানমন্ত্রীও একজন মেয়ে! মেয়ে হয়ে যদি, তিনি একটা দেশ চালাতে পারে, আমি কেন বুঝব না, ক্ষমতা কী? ক্ষমতার মেয়াদ কী? তুমি বল, আমি বুঝব।


পৃথিবীর এ আরেক অদ্ভুত নিয়ম, পাখি হোক আর মানুষ, সবজায়গায় স্ত্রী তথা মা-জাতিকে অবলা ভাবা হয় কেন? কেন ভাবা হয়, তারা সবকিছু বুঝবে না, জানবে না! এটার সঠিক কোনো ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। তবে, মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করি, আসলেই কি তারা কম বুঝে? এসব প্রশ্নের সদুত্তর আছে নেই। কালো পাখিটার এ জবাব শুনে, লাল পাখিটা কিছুটা বিব্রতবোধ করল। তারপরও,  নিচু স্বরে বলল, আচ্চা, বলছি তবে, মনযোগ দিয়ে শোন। ক্ষমতা হল, নিম্নবর্গের উপর উচ্চবর্গের কর্তৃত্বের মাপকাঠি! যার কথায় যত দ্রুত কোনো কাজ সম্পন্ন হবে, যে কোনো কাজ যত দ্রুত শেষ করতে পারবে, বুঝতে হবে তার ক্ষমতা তত বেশি। আর, এ যে মুখের কথায় কাজ করানোর বা নিজে কাজ করার যে যোগ্যতা সেটাই ক্ষমতা। আর তুমি বললে না, ক্ষমতার আবার মেয়াদ,  আসলে সবকিছুরই একটা মেয়াদ থাকে, ক্ষমতা যে যাকে দেয়, সেই একটা মেয়াদ দিয়ে দেয়, মেয়াদ শেষে সে ক্ষমতা আর কারো থাকে না, যদি কোনো ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা কাউকে দেয়, সেটার যেমন একটা মেয়াদ থাকে, তেমনি মানুষ যদি কাউকে কোনো ক্ষমতা দেয়, তারও একটা মেয়াদ থাকে। সে মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেই মানুষ তার আপন জায়গায় ফিরে যায়। যাক গে, আগের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা এখন আর নেই, এ যে নতুন মুখ দেখছ, তিনিই এখন এদেশের সর্বময় ক্ষমতার মালিক। 

তাহলে আগের যে রাষ্ট্রপতি ছিল, তিনি এখন কোথায়? 

তিনি তার নিজ বাড়িতে, নিজের কাজকর্মে ব্যস্ত। 

তাকে কি এখন আর এতে নিরাপত্তা দেওয়া ও সেবা করার মানুষ আছে? 

না!  

কী বল? তাহলে একদিন, এখন যিনি নতুন রাষ্ট্রপতি এসেছেন, তাকেও এখান থেকে চলে যেতে হবে? 

হ্যাঁ। 

যদি এসব স্থায়ীই না হয়, তবে কেন তিনি এত আরাম আয়েশে অভ্যস্ত হচ্ছেন? তিনি ত স্বাভাবিক জীবন-যাপন করলেও পারেন। 

জানি না! চল, দূরে কোথাও যায়। 

পাখি দুইটা আবার উড়াল দিল আকাশের দিকে। পাশাপাশি উড়তে উড়তে কালো পাখিটা বলল, তুমি কি পরের জন্মে মানুষ হবে? 

উত্তরে লাল পাখিটা বলল, আমি আগের জন্ম মানুষ ছিলাম!


প্রণয়ের সন্ধ্যাফুল

প্রণয়ের সন্ধ্যাফুল

 



প্রণয়ের সন্ধ্যাফুল

রিয়াদ এনাম


এই যে বিমূঢ় একাকী জীবনের স্বরলিপি গুনি আজও। আলোর পেখম মেলে ধরা তোমার সচিত্র প্রতিমা আঁকার অভিকল্প খুঁজি দিনমান। আমার বিমর্ষ স্বপ্নভেজা সন্ধ্যা না হয় একটি পেয়ালায় তুলে রাখবো, কিন্তু ভোরের আলমিরায় কে তুলে রাখবে আমার নিশীথ জাগা রোদন। যখন দিবাকরের মতো প্রস্ফুটিত চুমু এঁকে দেবো আমার খসখসে গালে। যদিও আমি তোমার আঁচলে মাথা রাখতে চাও না। অদৃশ্যের হাতছানি তাই আমাকে ভিখেরি বানিয়েছে, আমি অবশ্য নতুন কিছুর পিপাসা বোধ করি আজন্ম অনুরোধে।


অবৈধ মানচিত্রে আমি কোন দিন চোখের জানালা খুলে দৃষ্টিপাত করিনি। দেখিনি কারো গালের টোল পড়া বিমুগ্ধ হাসি। আমার ইচ্ছে তো আমরণ বেঁচে থাকা পবিত্র জায়নামাজে; ভুলের সাহু সিজদা আমার জীবনে ক’বারই বা এসেছে! আমি তার মূল্য চুকিয়েছি হাজার বার। সন্ধ্যে নামার আগে একটা পাখি আমায় বলে গেছেতোমার প্রণয়ের সন্ধ্যাফুল আর ফুটবে না। বর্ষায় যদি নদী ভরে যায় শাপলা শালুকে, তবুও আমি বেসে যাবো ভালো; এ কথা আমার জীবনের মতো অদ্বিতীয় সত্য।


শ্রাবণ বর্ষায় যেদিন আমি তোমার খোঁপায় গুঁজে দিয়েছিলাম বেলী ফুলের পাপড়ি, সেদিন আমি ছিলাম উড়ন্ত ঘুঘু আর তুমি ছিলে ডানা ভেজা শালিক। আমি নির্ঘুম চেয়েছিলাম তোমার বাহুর আস্তিনে। আর কান পেতে ছিলাম তোমার ঠোঁট চাপা কোকিলের মিষ্টি গানে। এ যেন অন্তিম ইচ্ছার চিলেকোঠা। কোথাও কোন ছন্দপতন নেই যে সুরের, যেই জাগ্রত মূর্ছনার। তবুও দিনান্তে দ’জন নিহত নক্ষত্রের মতো খসে পড়ি দোটানার তুফানে।


আ, তুমি ভুলে গেছো তোমায় নিয়ে নয়া স্বপ্নের কতো বেসাতি আমি গড়েছি, কত সুঠাম চিন্তার বাহনে হইহুল্লোড়ে যাপিত জীবনের বায়ান্ন বসন্ত পার করে এসেছি। তা তোমার ভুলে যাবারই কথা; কিন্তু আজও আমি ঐ নিমগ্ন চিরকুটের শব্দ দিয়ে বুনি বেঁচে থাকার শীতলপাটি। এটা যদি শেষ ইচ্ছে হয় তবে তো কথা নেই। অন্যথা আমি এর ষোলোআনা পুষিয়ে দেবো কোনো আঁধার মানবীর পথ খুঁজে খুঁজে। জানো না কি, এক অচেনা দুপুরে তোমার পত্রে লিখেছিলাম প্রণয়ের চাদরে কত না আকাশ পাতাল স্বপ্নযুদ্ধ!



পদাবলি : ০১

পদাবলি : ০১

 



যুথীকে মিস করি 

সৈয়দ নূরুল আলম 


যদি তুমি আসো, নবান্নের কোনো এক সকালে, তোমায় নিয়ে যাবো দূরের সোনারঙ ধানক্ষেতে- নতুন আমন ধানে ভরে আছে মাঠ, দেখবে সেখানে কিষাণ-কিষাণী গীত গেয়েগেয়ে ধান কাটে, ঝিরিঝিরি ঠান্ডা বাতাসে। ফসল তোলার আনন্দ ঝুলে থাকে মুখে। দেখবে তুমি অই দূর জলাশয়ে, দিনান্তের শেষ গোধূলি শুয়ে আছে কুয়াশা বিশ্রিত জলরাশির ওপরে। হিসেব মিলাতে চাইলে মিলবে কী! সে বয়েস হারিয়ে এসেছি দু'জনে, যদি তুমি খুঁজো খেলার পুতুল, হারানো ন্যাংটা সময়, পাবে?

 খুব মিস করি তোমাকে ।


অষ্টপ্রহর

সারমিন চৌধুরী 


অভিমান অচিরেই ঘুনে ক্ষয় হয়েছে 

খোলে দিয়েছি সব বন্ধ কপাট।

তুমি ফিরবে এইটুকুই আস্থা বিশ্বাসে

ঘুমহীন কাটিয়েছি সুদীর্ঘ রাত। 


অভিযোগের উঁচু দেয়াল খসে পরেছে

তুলে নিয়েছি পথের সমস্ত বেড়ী। 

তোমার খুঁজে সর্বত্রই হন্য হয়ে ছুটেছি

একলা দিয়েছি সাত সমুদ্র পাড়ি। 


পিচঢালা রাস্তায় দু’পা খসেছে দাবদাহে 

হাসিমুখে করেছি সব পীড়া গ্রহণ।

তুমি এসে হৃদয়ের ইটবালি জুড়বে বলে 

অপেক্ষায় ব্রত থেকেছি আমরণ।


ঊসন্ত গেছে-নীরবে দেয়নি বদনে দোলা

ফোঁটেনি বাহারি রঙের হরেক ফুল। 

নিরাশার রোদ মেঘ ছড়িয়ে করে আঁধার 

তবুও, কুড়ায় আমি পথের সব ধুল। 


কতো অজুহাত ভাসিয়ে দিয়েছি ঢেউয়ে

পান করেছি মনের জমানো বিষাদ। 

তুমি আসবে জলন্ত সূর্যের আলো হাতে 

স্পর্শ দিয়ে মিটাতে বিরহ-অবসাদ।



ধানমন্ডির মটকা চা 

মোহাম্মদ আল রাহাত


নির্লিপ্ত দুপুরে বেখেয়ালি রোদ তোমাকে যখন পোড়াবে! 

ক্লান্ত শরীরে এক কাপ মটকা চা খোওয়াবে ?

দৃষ্টিনন্দন! বয়সটাও রং ধরবার তাই আটকে গেলাম,

কিন্তু এখানে প্রেমিকদের ঘনিষ্ঠতাকে মিলিয়ে যত সব জটিল অংকরে, শংকরে 

আমি হাটলাম দক্ষিণ তপ্ত প্রান্তরে, কংক্রিটে । 

 

কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় সবুজ রঙের চেয়ারে বসে ;

এক প্রেমিকাকে দেখলাম সিগারেট ফেলে বিষন্ন স্বরে মটকা চা চেয়ে নিতে।  

পুরাতন কড়ইগাছের ছায়ায় একদল তরুন

চা ওয়ালা মটকা চা পরিবেশন করেন।

আমরাও ২ কাপ মটকা চা চেয়ে নিলাম। 

সিমেন্টের বেঞ্চ, এবড়োখেবড়ো লেকের ক্লেশ,

নাজুকের আগে আমার চা খাওয়া তখন শেষ।


রবীন্দ্র সরোবর, ডিঙ্গি রেস্টুরেন্টে, চটপটির দোকান এ যেনো দোকান বলয়। 

আড্ডা, গান গাওয়া গিটার, সিগারেট আর মটকা চায়ে বোকা প্রেমিকের পকেট ক্ষয়। 

সতর্ক দৃষ্টি মেলে যাযাবর বাচ্চাদের দল

ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে আছে 

কেউ তাকালেই দিবে ডুব 

শিমুল, ছাতিম, চালতা, মেহগনি, নিম জলপাই আর সবাই যখন চুপ।


পূর্বের মোঘল বসতি, ঈদগাহ, কারবান নদীর পরিত্যক্ত খাল সবইতো হারানো.. 

বর্তমান শুধু বলি প্রেমিকদের 

তাও তো না

অনেকে এখানে একা একা বসে চোখের জল ফেলে, কেউ বিজয় কেতন ওড়ায়, চলে পতিবাত, আন্দোলন। কেউ আবার মটকা চায়ে মস্তিষ্কের জটলা ছুটান।



অপরা সেনসিটিভ মানচিত্র ও উপপাদ্যের তৃতীয় কঙ্কাল সমগ্র

নিমাই জানা


আমি এখন ঠিক শয়তানের মতো ভাঙা কাঁচ খাওয়া হেফাজত পালানো থ্রি এক্স মাইক্রোসফট টেসলা রেজুলেশন সেনসিটিভ বন্দীর লাল নখ, ছদ্মবেশী চকচকে ব্যাসাল্ট পাথর হয়ে উল্টানো লাল ব্লাউজের দোকান থেকে হিউয়েন সাঙের কবর ভর্তি মাটি আর রুই মাছের স্কেলিটন ভাঙ্গা অপরা শরীরের দগদগ ক্ষত,

১০০ এম জি ঘনফলের লম্বা দাঁত সেফালাক্সিনের লাল ট্যাবলেটের শূন্যস্থান বায়ুর ভেতরে ঢুকে মেঘ শূন্য আবহবিকারের রক্তাল্পতা মেঘগুলোকে নিয়ে হাঁ মুখের গর্তে ঢুকিয়ে দিচ্ছি কেঁচোর কঙ্কালের ঋতুকালীন গন্ধ দ্রব্যের বারুদ ঝাঁঝালো কয়লা, মেহগনি গাছের ঋতুমতী আঙুলগুলোতে সাপের মতো প্যাঁচ খেয়ে দোলাচ্ছে জন্মদোষের হিমবাহ ঋষি, আহ ! রক্তের চাটনিটা বড় মিষ্টি লাগছে আজকাল, যজ্ঞ করছে পাকস্থলী শুন্য পুরোহিতের দল

কালো রঙের আঙুর ভর্তি নারীরা পৃথ্বীশ অভয়ারণ্যে হাঁটতে হাঁটতে অজগরদের সঙ্গে সঙ্গমহীন বিশ্বামিত্র যজ্ঞের চারপাশে বসে বসে আরো একবার জরায়ুরস খেয়ে ফেলল, তৃতীয় পর্বের নিলিপ্ত সংহার কর্তা ব্রহ্মার মস্তক ছেদন করে দিলেন আমিও দ্বিখ- গলার পাশে জমে থাকা হরমোনাল গ্রন্থির মতো চটচটে কম্বোজ ও নন্দন বিষয়ক অসিটাকে দোলাই,

স্নায়ু রক্তের ওমেগা পিরামিড ডানায় ঢুকিয়ে ফেলি শুক্রাণুর বীজ, স্ন্যাক্স সাদা পাউডার দ্রবণের অতি ঋণাত্মক শ্যাওলা রেচন, ঙ দৈর্ঘ্যের নারীরা যৌনের ঘনিষ্ঠতম উপপাদ্য জানত না



দেওয়াল

আদনান আল মিসবাহ


বিষন্নতা যখন পৃথিবীতে রাজ করে 

তিন ঘন্টা কান্দনের পর কটকটি 

হাতে পাওয়া বালকের মুখ থেকে 

সদ্য ফোটা হাসিটুকু কেড়ে নেয় 

হৃদ মাঝারে-

পদ্মফুলটা ফোটার আগেই নেতিয়ে পড়ে 

আমি তখন পাথুরে দেওয়ালকে আলিঙ্গন করে 

অশ্রু ঝরাই অঝোর ধারায় 


হৃদয়ে বিষমাখা রক্তের স্রোত

প্রবাহিত হলে 

দেওয়ালের সাথে ভাগ করে নেই-

রক্তের প্রবাহ 

গভীর রাতের নির্জন নিস্তব্ধতায় 

দেয়ালের কাছে শুনতে চাই 

নিঃশব্দের পদাবলি


কুহকী আলেয়া নিয়ে বেড়ে ওঠা আমার 

স্বার্থপর বন্ধুটি বিশ্বাসঘাতকতা করলেও 

দেওয়াল- 

আমার প্রতিটি আবদার রক্ষা করে 

পিনপতন নীরবতা চূর্ণ করে আমাকে শেখায় 

জীবনমেরুর দীর্ঘ পথে-

একাকী চলার সবক


আমি যখন তোমার অলক্ষ্যে থাকি

মুহিতুল ইসলাম মুন্না


আমি যখন তোমার অলক্ষ্যে থাকি

তখন আমি তোমার আঁখির পূজা করি

দূরে বহু দূরে থাকলে মনের পূজা করি 

আরো দূরে অচিনপুরে থাকলে তোমার

রসপূর্ণ শরীরের ঘামের পূজা করি,

তা করি অনন্তকাল করে যাব,

ঠিক তোমাকে কাছে না পাওয়া পর্যন্ত।

কিন্তু আমার পিছনে সময়ের ঝান্ডাধারীর

ঘন্টার আওয়াজ শুনি, আমার যে সময় 

ফড়ফড়িয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

আমি তোমার উষ্ণ আলিঙ্গনে আপ্লুত,

বিচলিত, হয়ে যেতে চাই।

আমি তোমার আলিঙ্গন না পাওয়া পর্যন্ত

 যুগ যাপিত অপেক্ষা করতে থাকব।

কিন্তু কখন যে আসবে মায়ার বসুন্ধরা

ছেড়ে চলে যাওয়ার ডাক, কে জানে। 

হয়তো,

ক্ষুধিত হৃদয়ের পিপাসা এভাবেই থেকে যাবে।



পদাবলি : ০২

পদাবলি : ০২

 



শ্বেত পাথরের  কান্না

সবুজ আহমেদ 


তোমাকে পাবো না প্রতীক্ষার পবিত্র প্রভাতে

তা আমি সম্পর্কের শুরুতেই জানি

তোমার চলন-বলন ধৈর্য-নেই বললেই চলে

নিমপাতা মুখে তবুও এতদূর এগিয়েছি

বুকের স্ফীত স্তন আর ইচ্ছে শক্তির বলে 


কত কবিতার রং ঢেলে দিয়েছি নতুন বইয়ে

হৃদান্তরের ঝরা রক্ত অবিরত গায়ের ঘাম দেখে

কেমন করে তুমি দেখেও নিশ্চুপ না দেখার ভানে।



দেখা না দেখা 

মীযান তাসনীম


তোমাকে প্রথম দেখি শিল্পকলায়। বারান্দায় হাঁটছিলে। একবার এদিকে এসে আবার ফিরে যাচ্ছো। সম্ভবত কারো জন্য অপেক্ষা করছিলে। কার জন্য অপেক্ষা করছিলে? 


তোমার চোখের দিকে একবার তাকিয়েছিলাম। এরপর আর সাহস হয় নি। আমি এমনিতেই মানুষের চোখের দিকে তাকাতে পারি না। তোমার চোখে কীভাবে চোখ রাখি?


ইচ্ছে করছিলো তোমাকে গিয়ে কিছু বলি। অনেক কথা মন থেকে জবান পর্যন্ত এসেছিলো। তোমার কাছে বলতে গিয়ে কথা জড়িয়ে যেতে পারে। এই ভয়েই কি বলি নি?


এরপর আবার দেখলাম তোমাকে। হ্যাঁ, আবার। শিল্পকলার বাইরে। কেউ একজন তোমার সঙ্গে ছিলো। যার কারণে তুমি স্বাচ্ছন্দ ছিলে। সে কে ছিলো? 


আমাদের আর কখনো দেখা হবে না। এবং দেখা যে হয়েছিলো তুমি জানোও না। নাকি দেখা হবে আবার?  নাকি তুমি জানো দেখা যে হয়েছিলো? 



একটু অপেক্ষা করো মোহিনী

জায়্যিদ জিদ্দান


সহস্র বছর ধরে আমার পথচলা- পৃথিবীর নরম গায়ে একে দিচ্ছে প্রগাঢ় নিষ্ঠুর চিহ্ন।

তোমাকে দেখার এক সুতীব্র ইচ্ছা-

বেড়ে বেড়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে আকাশ-বিভা।

একটু অপেক্ষা করো মোহিনী! আরেকটু।

কিছুক্ষণ আগেই রেখে এলাম আমাদের মিলনকেন্দ্র।

পাশেই ছিল ছাতিমগাছ টা।

আধপাকা পুকুর, টলটলে জল, বৃদ্ধ মেহগনি সব আগের মতোই আছে।

তবে জানো! সেই টিউবওয়েল টা এখন আর নেই।

এই তো আমার পদরেখা মেরে ফেলছে তোমার পদচিহ্ন - যা তুমি রেখে গিয়েছিলে অর্ধশত বছর আগে।


তোমার পূর্বপুরুষ ঢেলে গিয়েছিল যে রক্ত, মুক্ত করেছিল যে দলা দলা নিশ্বাস-


জানো! আজ দেখলাম - সে রক্ত শুষে নিচ্ছে ক্ষুধার্ত মৃত্তিকা। দলা দলা সে নিশ্বাস উড়ে যাচ্ছে আকাশপথে।

ওই তো! ওই তো সামনেই আরশি নগর।

তারপরেই পদ্মফুলের ঘাট। নদীটা পেরোলেই

ভেসে উঠবে-

আমার মায়ের ভানুমতী সুন্দর মুখ।

মেঘ ফুল, রোদ্দুর, নির্বাসিত লাউয়ের সুকান্ত মৃণাল-

মৃদু উত্তাপ, বিস্তৃত ধানক্ষেত, শিশু সূর্যে আলোয় তোমার চকচকে সোনামুখ।

আমি আবার দেখবো।

দেখবো- মক্তবি শিশুর মুখে সুপ্রসন্ন হাসি।

চরম উচ্ছ্বাসে সকালের পিছু নিয়েছে উদাস দুপুর।

মাগরেবের আযান। অতঃপর সন্ধ্যাকূপির আলোয় দাদির ভূতুড়ে গল্প - আমি আবার দেখবো।

একটু অপেক্ষা করো মোহিনী! আরেকটু..!



উল্টো পথের ইতিকথা

দীপঙ্কর ইমন


সেই কবে, 

হিজলের বনে দেখেছিলাম তোমার ছায়া


তারপর,

ছায়াপথ ঘুরে এসে

আমার দেহে যখন যান্ত্রিক রক্তে সয়লাব 

তবুও 

তোমার সেই চোখেই করতে চাই কবিতার মুগ্ধপাঠ।


সেইসব গুচ্ছ গুচ্ছ গ্রাম গুলো

সোডিয়ামের কি অদ্ভুত মেকাপ করছে আজ 

অথচ

পানকৌড়ির ডানায় চেপে

আজও আমি

তোমার যুবতী শরীর স্পর্শ করতে চাই।


শিমুলের বনে 

এখনও কি কোনো কিশোর, যুবক হয়ে উঠে

অথবা প্রেমিক?


সোডিয়ামের পেটে

আমাদের সবগুলো জ্যোৎস্না রাত। 

শিয়ালের উৎসব নেই

কবি হাঁটছে

তীর্থ যাত্রার উল্টো পথে।


নিঃসঙ্গ দোয়েল 

জিয়া হক


তোমাকে একনজর দেখবো বলে 

আশিটা বছর অপেক্ষা করেছি

বকের মতো এক ধ্যানের অপেক্ষা

এক এক করে কেটে গেছে যৌবন বার্ধক্য জ্বলজ্যান্ত জীবন


তোমাকে দেখার সুযোগ হয়নি

সমস্ত হৃদয় জুড়ে তোমার উপস্থিতি থাকলেও 

গোলাপ ঝরে গেছে

বকুল শুকিয়ে গেছে

হিজল ফুলও আর আগের মতো নেই

আমার নদী খুন হয়ে গেছে 

আমার গ্রাম গিলে ফেলেছে খাইখাই শকুন

তবুও না তোমার সাথে দেখা না


একদিন একটা দোয়েল জানালায় লেজ দোলাচ্ছিল

দোয়েলের একটা পা নেই

কী বিরহ-মধুর গান তার

মুহূর্তেই পুরোটা খেয়াল কেড়ে নেয়

কোথাও হারিয়ে গেলাম

অবশেষে নিজেকে আবিষ্কার করলাম

একপায়ের দোয়েল নিঃসঙ্গ দোয়েল হিসেবেই।


শিলুক

শিলুক

 



শিলুক

আহাদ আদনান


‘এই, রিডল’টা বানিয়েছ’?

‘কী? কীসের রিডল’?

‘ভুলে গেলে? রিডল, ধাঁধা, হেয়ালি, শিলুক। আমাদের গুপ্তধন লুকিয়ে রেখেছি না? একটা শিলুক বানাও’।

‘উফ, ঘুমাও তো। রাত বিরাতে মাথায় ফেলুদা ভূত চেপেছে’।

ভূত চাপুক আর নাই চাপুক, এই লুকিয়ে রাখা ব্যাপারটা নিয়ে বেশ উত্তেজনায় আছে নাহ্রুমা। অল্প কিছু স্বর্ণের গয়না করেছে ওরা। বড়জোর পনেরো ভরি হবে। বাসায় আলমারিতে তালা দেওয়া থাকে। মাঝেমাঝেই চুরি, ডাকাতির ভয় কাজ করে। কোথাও বেড়াতে গেলে, কিংবা দুইজনই যখন বাইরে থাকে, চিন্তা হয়। কয়েকদিনের জন্য ঢাকার বাইরে গেলে তো বটেই। মধ্যবিত্তের সংসার। এক আসবাব থেকে আরেক আসবাবে স্থান পরিবর্তন করে লুকিয়ে রাখাটাই ভরসা।

তবে গত মাসে নিচের ফ্ল্যাটে ডাকাতি হওয়ার পর ওদের ঘুম উড়ে গেছে। ডাকাত মালপত্র আছে জেনেই এসেছিল। সেই তুলনায় ওদের সম্পদ খুব সামান্য। কিন্তু কী কষ্ট করে এগুলো করেছে, ওরাই জানে। আশিক কাজ করে একটা ওষুধ কোম্পানির সেলসে। মোটরসাইকেল নিয়ে ছুটাছুটি, অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা, সারাক্ষণ চাপে থাকা এখন আর ভালো লাগে না। গ্রামের মাছের খামার থেকে বছরে দুইবার টাকা আসে। একটা ব্যবসা যদি দাঁড় করানো যেত। এই চাকরিটা আর করতে ইচ্ছে করে না। নাহ্রুমার স্কুলটা এই পাড়াতেই। সকালে গিয়ে কাজ শেষ হতে হতে দুপুর হয়ে যায়। প্রিয় ভাতঘুমটা তার ছুটে যায় প্রায়ই। সন্ধ্যায় টিউশনের আগে পড়ন্ত বিকেলে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় সে। এপাশ ওপাশ করতে করতে ডুব দেয় হুমায়ূন, মানিক, শরদিন্দু আর সত্যজিতের লেখায়। বই নয়, মোবাইলে পিডিএফে। ইদানিং আগাথা ক্রিস্টি, স্যার আর্থার কোনান ডোয়েলও পড়া হচ্ছে। গল্পের ফেলুদা, ব্যোমকেশ আর হোমস ভর করে তার মাথায়।

‘আজ পিতজা কিঙয়ে গিয়েছিলে, না’?

‘কিভাবে বুঝলে’?

‘তোমার শার্টের পকেটে মাশরুম আর গোল মরিচের গন্ধ পাচ্ছিলাম। ওদের মাশরুম স্যুপ গোল মরিচ দিয়ে খেয়েছিলে? বিলটাও তুমি দিয়েছ? কিছু খুচরা টাকা বেঁচেছিল? ওয়েটারকে টিপস না দিয়ে টাকাগুলো পকেটে ঢুকিয়েছ না? বেশি টাকা হলে মানিব্যাগেই রাখতে’।

পাক্কা দশ সেকেন্ড আশিক নাহ্রুমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থেকে একটি কথাই বলে, ‘ইনক্রেডিবল’!

‘আমি বেশ গোয়েন্দা হয়ে উঠেছি, বলো’?

‘তাই তো দেখছি। আমাকে আরও সাবধান হতে হবে দেখছি’।

‘তুমি স্কুল কলেজে কোনো গল্প, উপন্যাস পড়তে টড়তে? পাঠ্য বইয়ের বাইরে বই কিনেছ কোনোদিন’?

বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে আশিক টয়লেটে পালায়। তবে আবার সে ধরা পড়ে রাতের বেলায়।

‘এই একটা গল্প পড়বে? গুপ্তধন। রবি ঠাকুরের লেখা ছোটগল্প। পড় না’।

‘পাগল হয়েছ। ঘুমানোর সময় ফাজলামি। আমি এখন ঘুমাব’।

‘ঘণ্টা ঘুমাবে। ফেসবুক, ইউটিউব টিপতে টিপতে ঘুমিয়েছ কোনোদিন দুইটার আগে? এখন বাজে মোটে পৌনে বারো। যাও, পড়তে হবে না। শোন ভালো করে’।

ইউটিউব থেকে একটা চ্যানেলের অডিও গল্প ঠিকই শুনে ফেলে ওরা। ঈশান কোনের ঈশানী, কহে দিলাম নিশানি। আশিক মজাই পায় গুপ্তধন শুনে।

‘এইবার যা বলি ভালো করে শোনো। এই ঈদে আমরা কাঠমা-ু  যাচ্ছি কনফার্ম। ধরো, এসে দেখলে খালি ফ্ল্যাটে ডাকাতি হয়ে গেছে। সব গয়না হাওয়া। কী করবে তখন’? 

‘সেটা আমি ভেবে রেখেছি। তোমাদের বাসায় আম্মার কাছে রেখে গেলেই হবে’।

‘জি না। আম্মা যাবেন কক্সবাজার। তিনি এই আগুনের কয়লা পাহারা দিবেন না, বলে দিয়েছেন’।

‘তাহলে তো সমস্যা। কাঠমা-ু ক্যান্সেল করতে বলছ’?

‘ধুর, সেটা বললাম কোথায়। তোমাকে এই গল্প কেন শোনালাম বোঝোনি’?

‘গুপ্তধন? দুইহাজার তেইশে ঢাকার ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে তুমি গুপ্তধন লুকিয়ে রাখবে? আর ইউ ক্রেজি ম্যান’?

‘আমি কিন্তু সিরিয়াস’।

‘শুনতে তো মজাই লাগছে। কোথায় রাখবে গুপ্তধন? খাটের তলায়? এসির ইঞ্জিন বক্সে? ডিপ ফ্রিজে মাংসের ভেতর? বেসিনের পাইপের পিছনে? ডাকাতরা এসব জানে না? পাগল’!

‘আমাদেরতো সাবেকি আমলের খাট। জাজিমের নীচে যে কাঠের মোটামোটা তক্তা সেখানে তার নিচে আমরা ছিদ্র করে গোপন পকেট করব। এমনিতে কাঠ দিয়ে ঢাকা থাকবে। উপর থেকে বোঝা যাবে না। গয়না রাখতে গেলে কিংবা বের করতে গেলে তোমাকে তোষক, জাজিম সরিয়ে, কাঠ সরিয়ে নিচে শুতে হবে। শুয়ে গোপন কাঠের মুখ সরালে তারপর পাবে গয়না। আমাদের গুপ্তধন’।

‘তা এই কাজটা কে করবে শুনি? যেই কাঠের মিস্ত্রি দিয়ে এটা করাবে সেই যদি ডাকাত দলের সর্দার হয়’?

‘সেই দায়িত্ব আমার’।

সত্যি সত্যি এক সপ্তাহের মধ্যে কাজটা হয়ে গেল। নাহ্রুমার দেশের বাড়ি খুলনা থেকে ওর মামা একটা পুরনো কাঠের মিস্ত্রি নিয়ে আসল। অনেক কসরত করে এমন এক ব্যবস্থা হলো যেন, পুরো খাটটাই একটা সিন্দুক হয়ে গেল। কুঠুরি আছে, মালামাল আছে, কিন্তু দরজা জানালা নেই। ওর মামা যাওয়ার আগে শুধু বলে গেলেন, ‘বুদ্ধিটা আমার পছন্দ হয়েছে রে মা’।

ওদের এখন সোনা কেনার নেশা ধরেছে। যেভাবে হোক অন্য বিলাসিতা ছেড়ে, টাকা জমিয়ে শুধু সোনা আর সোনা। গুপ্তধন জমা শুরু হতেই নাহ্রুমার মাথায় আরেক পোকা ঢুকল।

‘গুপ্তধন তো জমাচ্ছি। ভুলে গেলে এটা খুঁজে বের করার একটা সূত্র বের করতে হবে কিন্তু’।

‘মানে কী? ভুলব কেন’?

‘ধরো দুজনেই বুড়ো হয়ে গেলাম। আলঝেইমার্স হয়ে স্মৃতি হারিয়ে ফেলতে লাগলাম। তখন কী করবে?

কিংবা আমাদের একটা বাবু হলো। একদিন দুম করে আমরা মরে গেলাম। ওকে বলে যেতে হবে না সম্পদের কথা? পাবে কিভাবে এসব’? 

কথাটা বলেই চুপ হয়ে যায় সে। বিয়ের আট বছর হয়ে গেছে। সন্তান না হওয়ার দুঃখটা এখনও বুকে দগদগে ঘা হয়ে রয়েছে। সময় সময় লবণের ছিটা পড়লে ঘা তো জ্বলবেই। প্রসঙ্গটা হালকা করতে আশিকই কথাটা পারে।

‘জানো আমাদের গ্রামে নানী দাদিরা মুখে মুখে সুন্দর সুন্দর ধাঁধা বানাতো। কিশোরগঞ্জের সেই গ্রামে আমার সন্ধ্যা কাটত ধাঁধা মিলিয়ে। দাদি অবশ্য বলত শিলুক। আমি কিন্তু শিলুক ভাঙাতে ওস্তাদ’।

নাহ্রুমা খুশি হয়ে ওঠে।

‘তুমিই তাহলে একটা শিলুক বানাও। ছড়ার মত শিলুক। আমরা মুখস্ত করে রাখব। কিংবা লিখে রাখব। ডাকাত এসে পড়ে ফেললে বুঝবে না কিছুই। গল্পের ডাকাতের মতো এতো আইকিউ আছে নাকি ঢাকার চোরদের’?

আশিকের একটা প্রমোশন হয়ে গেছে। আবার বন্ধুরা মিলে কম্পিউটার মার্কেটের দোকানটাও জমিয়ে ফেলেছে। ওজনও বাড়ছে ইদানিং। ‘বড়লোক’ মানুষের লক্ষণের মত প্রেশার বাড়তির দিকে, গ্লুকোজ বাড়তির দিকে আর কোমরে ব্যথা হচ্ছে রাত বিড়াতে। রাতে শোয়ার সময় কোমরের নিচে হটব্যাগ রেখে ওরা এখন আলোচনা করে ‘রিডল’ কিংবা শিলুক নিয়ে। গত সপ্তাহে আরেকটা ডাকাতি হয়ে গেছে পাশের বিল্ডিঙে। ‘সবাই কি আমাদের মত চালাক’, ভাবে ওরা।

‘এই আমি কিন্তু একটা শিলুক তৈরি করে ফেলেছি। শুনবে’?

‘ওয়াও, শুনব মানে। বলো বলো’।

‘সারে সারে শোয়া থাকে গড়ানের ডাল,

মিয়া বিবি গুটিসুটি, মাকড়ের জাল,

শিলা বুকে বাসা বাঁধে ঝিনুকের নাল,

সাবধান সাধু, আসে মহা কলিকাল’।

‘অসাধারণ। অবিশ্বাস্য। তোমার এত প্রতিভা আগেতো বলোনি। দাঁড়াও লিখে রাখি। নয়তো ভুলে যাবো’।

‘দেড়টা বাজে। সকালে লিখলে হয় না’?

‘না, হয় না। এই যে আমার বিখ্যাত ডায়রি। আবার বলে ফেল সোনামণি’।

মুক্তোর মতন সুন্দর হাতের লেখায় শিলুকটা লিখে ডায়রিটা বালিশের পাশেই রেখে দেয় নাহরুমা। আবার শুরু হয় গল্প। আজ ওদের ঘুম উড়ে গেছে। যদিও কাল মঙ্গলবার, অওর্কিং ডে, তবু কোনো ভাবনা নেই। কালকের কথা কাল ভাবলেই হবে। 

আজ দুজনেরই ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। কিশোরগঞ্জের হাওরে মাছ ধরা, খেতে সরিষা লাগানো, বরষায় চাপটি খাওয়া। কিংবা খুলনায় ট্রলার করে সুন্দরবনে ঘোরাঘুরি, আখের খেত, চিনির মিলের কোয়ার্টারের বিকেল। ওরা যতক্ষণে হাতের তালুর ঘাম, বাতাসের অক্সিজেন অণু ভাগাভাগি করে নেয়, হঠাৎ করে একটা ঝাঁকুনি ওদের কাঁপিয়ে দেয়। কয়েক সেকেন্ডের আলোড়ন।

‘এই ভুমিকম্প হচ্ছে’?

‘তাই তো মনে হচ্ছে’।

কথা শেষ হয় না। আবার প্রচ- কম্পন। লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়েছে ওরা। চারদিকে চিৎকার হচ্ছে। 

‘বের হও তাড়াতাড়ি। আল্লাহ গো, রক্ষা করো’।

‘এক সেকেন্ড। গয়নাগুলো নিয়ে নিই’।

নাহরুমা কিছু বলার আগেই বাঁকা হয়ে জাজিমটা উঠাতে যায় আশিক। আর তখন মেরুদ-ের নিচে একটা তীক্ষ্ণ শব্দ হতেই ব্যথায় আর্তনাদ করে বসে পড়ে সে।

‘আল্লাহ গো, কী করলে তুমি’?

এমন লম্বা ভুমিকম্প আগে হয়নি এই শহরে। আশিক উঠতে পারছে না। রাহনুমা অনেক কষ্ট করেও ওকে নড়াতে পারছে না। সম্পদ, গয়না, গুপ্তধন, শিলুক, ওদের পৃথিবী থেকে কর্পূরের মত সব উবে গিয়ে একটাই সত্যি পড়ে থাকে। ভয়ঙ্কর, প্রলয়ঙ্করী ভূকম্পন।

পরেরদিন সকাল। এই শহর কারও চেনা নয়। ধ্বংসস্তুপ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা এ যেন এক মৃত্যুপুরী। চারদিকে লাশের সারি। আহতের আর্তনাদ। কংক্রিটের জঙ্গলে উদ্ধার তৎপরতা থমকে আছে। এমনকি মিডিয়ার লেন্সের ঝলকানিও নেই তেমন। 

অসংখ্য মৃতদেহের মাঝে ইস্কাটনের এই রাস্তায় পড়ে আছে একজোড়া নরনারীর লাশ। মেয়েটা এখনও জড়িয়ে রেখেছে ছেলেটাকে। 

বিয়ের কলেমা নামের মহা সেই শিলুকে মিলেছিল যেই গুপ্তধন, মৃত্যুর সময়ও তাকে হাতছাড়া হতে দেয়নি লোভী মেয়ে আর ছেলেটা। মানবজীবনের মতো এমন সোনার খনি কি আছে আর?   


মাতুয়াইল, ঢাকা। 


ভ্রমণকাহিনী : পর্ব : ০২ : মুর্শিদাবাদ- পথে প্রান্তরে ইতিহাস...

ভ্রমণকাহিনী : পর্ব : ০২ : মুর্শিদাবাদ- পথে প্রান্তরে ইতিহাস...

 



মুর্শিদাবাদ :
পথে প্রান্তরে ইতিহাস...

মাজরুল ইসলাম


[গত সংখ্যার পর...]

                মহীপাল: সাগর দিঘী থানার একটি ছোট গ্রাম মহীপাল। এই নগরে রাজধানী ছিল পাল রাজাদের। এখনও মহীপাল নগরীতে প্রাচীন স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। দাক্ষিণাত্যের রাজা রাজেন্দ্র চোল আনুমানিক ১০২০-১০২৩ সমরাভিযান চালিয়ে মহীপালকে পরাজিত করে এবং রাজ্য লুণ্ঠন করেন।

                   কিরীটেশ্বরী : মুর্শিদাবাদ জেলায় হিন্দু দেবালয়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীনতম মন্দির। মূল মন্দির সংলগ্ন আরও ছোট ছোট অনেক মন্দির দৃশ্যমান। ঐতিহাসিকদের ধারণা এই মন্দিরের নির্মাণকালথ ১৪৬৫ খ্রীষ্টাব্দ। বাহান্ন পীঠের একটি পীঠ বলে এই স্থানের নামথথ কিরীটেশ্বর বিজয় রায় সেন বিরচিত ‘তীর্থ- মঙ্গল’ কাব্যে কিরীটেশ্বররীর বর্ণনা আছে। রিয়াজুস সালাতীন ও রেনেলের কাশিমবাজার দ্বীপের মানচিত্রে কিরীটকোনাকে ‘তীরতকোনা’ বলে উল্লেখ করেছেন। ১৭০৪ সালে দর্পনারায়ণ রায় ডাহাপায়ায় আসেন। এখানে এসে এই মন্দিরের সেবার যথেষ্ট বন্দোবস্ত করেন। অনেকদিন তাঁদের হাতে দায়িত্ব ছিল। দর্পনারায়ণ রায় মন্দিরটির পুনঃনির্মাণ ও কালী সাগর নামে পুকুর খনন করে দেন। মন্দিরের দক্ষিণ দিকে আজও হাজামজা অবস্থায় পুকুরটি দৃশ্য মান। পৌষমাসের প্রতি মঙ্গলবার কীরীটেশ্বরী মন্দিরে বিশেষ পুজো ও সারা মাসব্যাপী মেলা চলে। দেশ বিদেশের প্রচুর ভক্তদের সমাগম হয়। লালবাগ কোট স্টেশন থেকে তিন মাইল দূরত্ব।

                   খেরুর মসজিদ: সাগরদিঘী থানার অন্তর্গত খেরুর এক ছোট গ্রাম। ইতিহাস প্রসিদ্ধ সুপ্রাচীন মসজিদ এটি। জনশ্রুতি আছে, এই মসজিদটির আশপাশ থেকে পাওয়া গেছে গুপ্ত যুগের বহু নিদর্শন। মসজিদটি তিন গম্বুজ বিশিষ্ট। মসজিদের দেওয়ালে দৃষ্টি নন্দন টেরাকোটা কাজের শৈল্পিক ভাবনার বহির্প্রকাশ দেখতে পাবেন। মসজিদের প্রধান দরজা উপরে একটি শিলালিপি থেকে জানা যায় ৯০০ হিজরীতে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ নির্দেশে মোয়াজ্জেম রিফাত খাঁ নির্মাণ করেন।

                    কসবা বাহাদুরপুর: মোঘল শাসন শুরু থেকে গড়ে ওঠে কসবা। কসবার মধ্যে মুর্শিদাবাদ জেলার ভগবানগোলা থানার কসবা বাহাদুরপুর সর্বপ্রথম। ১৫৭৪-১৫৯০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে কসবা বাহাদুরপুর গড়ে উঠেছিল। প্রাদেশিক রাজধানী গড়ে উঠেছিল মুর্শিদাবাদে কিন্তু বড় বাজার গড়ে উঠেছিল কসবা বাহাদুরপুরে। ভগবানগোলা থানার ৫৬ নং গ্রাম। তৎকালে এখানে একটি নীল উৎপাদনের কারখানা ছিল। নীল চাষের কাজে ব্যবহৃত পুকুর আজও দৃশ্যমান। কিন্তু কারখানার নালা সবই লুপ্ত হয়ে গেছে। আখেরীগঞ্জ ভগবানগোলা রাস্তায় মাঝামাঝি নহর সংলগ্ন এই গ্রামটি। একসম প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল এখানে। কসবা বাহাদুরপুর গ্রামের অদূরেই বৈষ্ণব ধর্মের পীঠস্থান  বুধুর তেলিয়াপাড়া। বাঙলার সুলতান সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের মৃত্যুতে তাঁর পুত্র বাহাদুর সিংহাসন অধিকার করেন। বাহাদুর অধুনা বাংলাদেশের মৈমনসিংহ জেলার ঘিয়াসাপুরে ‘ঘিয়াসাবাদ’ নামে একটি শহর ও বাজার গড়ে তুলেছিলেন। তার কারণ লক্ষ্ণৌতির সঙ্গে এই শহরের নিরাপদ এবং অদূরে। সহজে যাতায়াতের জন্য এই শহর গড়েছিলেন। দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলক শাহ লক্ষ্ণৌতির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে আসছেন শুনে বাহাদুর শাহ সপরিবারে ঘিয়াসাবাদে আত্মগোপন করতে চেয়েছিলেন। সুলতান গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের নির্দেশে কেন্দ্র বাহিনী লক্ষ্ণৌতির দখল নিলে বাহাদুর সেখানে থেকে ঘিয়াসাবাদ পালিয়ে যান। জলপথ পরিত্য্যাগ করে স্থলপথ ধরেন। এবং সুতি, লালগোলা, ভগবানগোলা, আলাইপুর, আখেরীগঞ্জ রাজশাহী সড়ক পথেই পালিয়ে যাবার পথ। কিন্তু শরীর বইতে পারছে না দেখে বিশ্রামের জন্য বাহাদুরপুরে ডেরা করেন। এই সুবাদে বাহাদুরের নামে গ্রামের নাম হয়েছে বাহাদুরপুর। ক্রমে কসবা বাহাদুরপুরে পরিণত হয়।

                  মোঘল টুলি ও আকবর নগর: বঙ্গপ্রদেশে মোঘল আধিপত্য বিস্তার করার পর থেকেই শাসন কার্য চালিয়েছে জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে। যেমন গোয়াস, মোঘল টুলি প্রভৃতি। আকবরপুরের সাবেকি নাম আকবরশাহী। বর্তমান আকবর পুর। সম্রাট আকবরের আমলে তাঁর অগণিত টাকশাল ছিল। আকবরের যে টাঁকশাল গুলোর নাম জানা যায়, তার মধ্যে সব টাঁকশাল থেকে সব ধরনের মুদ্রা নির্মাণ হতে না। তামার মুদ্রা প্রস্তুতকারী টাঁকশাল গুলোর মধ্যে প্রথম নাম এসে যায় আকবরপুরের নাম। তাঁর শাসনকালে বাঙলা সুবেহে প্রথম টাঁকশাল গড়ে আকবরপুরে। দ্বিতীয় টাঁকশাল গড়ে উঠেছিল মুর্শিদাবাদ জনপদের জাফরাগঞ্জে। মোঘল টুলি, আকবরপুর গ্রামদ্বয়ের নামের সঙ্গে সম্রাট আকবরের নাম সংপৃক্ত। মোঘল সুবেদার ও সিপাহসালার মুনিম খাঁ,খান-ই-খানান ২৫ সেপ্টেম্বর ১৫৭৪ খ্রীষ্টাব্দে আফগান সুলতান দাউদ কাররানির সঙ্গে যুদ্ধ হয়। এবং যুদ্ধে মুনিম খাঁ জয়লাভ করেন। তখন থেকে বাঙলা দিল্লির অধিনে আসে। যুদ্ধ চলাকালীন সম্রাট আকবর নিজে যুদ্ধ সামগ্রী ও খাদ্য নিয়ে আসেন। মুকসুসাবাদ শহরকে নিরাপদ স্থান ভেবে এখানেই শিবির স্থাপন করেন। সম্রাট আকবরের সেনা বাহিনী যেখানে থাকত সেখানকার নামকরণ হয় আকবরপুর। আর সম্রাট যেখানে থাকতেন সেখানকার নামকরণ হয় মোঘল টুলি।

                  জাফরাবাদ: সুলতান সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহর স্থলাভিসিক্ত হোন তাঁর পুত্র সিকন্দর শাহ। বাঙলাদেশের সোনারগাঁও সরকারের পদ ও ক্ষমতা দখলকারী ফখরুদ্দিন মুবারক শাহর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় সাতগাঁও ও সরকারের সুবেদার ইজজউদ্দিন ইয়াহিয়া এবং লক্ষ্ণৌতির সরকারের সুবেদার কদর খাঁ। এমন সময় সোনারগাঁওর সরকারের সামান্য আরমার-বিয়ারার ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ অন্যায় ভাবে ক্ষমতা দখল ও স্বাধীনতা ঘোষণা দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের চোখে সমগ্র বাঙলার নিন্দা মনে করে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ও সমরাভিযান করলে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের পরাজয় হয় এবং পালিয়ে গিয়ে বাগড়ীর অজ গ্রামে আত্মগোপন করে। জাফর খাঁ ছিলেন রাজস্ব বিভাগের উচ্চ পর্যায়ের রাজকর্মচারী। তাঁর সুপারিশে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের পুনর্বহাল হোন। ফখরুদ্দিন মুবারকের শাহের জামাতা ছিলেন জাফর খাঁ। জাফর খাঁ শ্বশুরের সঙ্গে দেখা করেন। এই কথা জানতে পেরে সিকন্দর শাহ ঘটনার সত্যাসত্য প্রশ্নে সেনা অভিযান করতে বলে। দিল্লির সেনা বাহিনী রাজমহল, সুতি, লালগোলা, আলাইপুর পথে এগিয়ে আসে। এমন সময় লক্ষ্ণৌতির সামরিক বাহিনী হাজির হয়। উভয় পক্ষ যুদ্ধ করে। সেই থেকে এই স্থানের নাম জাফরাবাদ। গ্রামটি বর্তমান অধুনা রানিতলা থানার অন্তর্গত।

                   রানিতলা: মুর্শিদাবাদ জেলার  অধুনা রানিতলা থানার অন্তর্গত একটি  গ্রাম। গ্রামটি প্রাচীনত্বের দাবি রাখে। ১৮৫২-১৮৫৫ খ্রীষ্টাব্দের রাজস্ব জরীপে যথাক্রমে ৬৮ ও ৬৯ নাম্বার গ্রাম দু’টোর সম্মিলিত রুপ রানিতলা। জেলা জরীপে একত্রিত করা হলে নামকরণ হয় ‘রানীতলাশ’ বর্তমান রানিতলা নামেই পরিচয় লাভ করেছে। অতীতে ইংরেজরা পুলিশ প্রশাসন ব্যবস্থা চালু করে। পুলিশ ব্যবস্থা বলবৎ করতে ‘রানীতলাশ’ নামে পুলিশের প্রশাসনিক বিভাগ চালু করে এবং পরে এখান থেকে থানা চলে যায় ভগবানগোলায়। দীর্ঘদিন পর রানিতলায় পুনরায় থানা গঠিত হয়েছে। রানী ভবানীর  এখনো অনেক স্মৃতি দৃশ্যমান। রানিতলা হাট প্রাচীনত্বের দাবিদার। এই হাটের জন্ম, ১৮৮০ সাল। সপ্তাহে দু’দিন হাট বসে মঙ্গলবার ও শুক্রবার।

[চলবে...]

ইপেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ২০৭

ইপেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ২০৭

 তারুণ্যের শিল্প সরোবর ।। বর্ষ ৮ম ।। সংখ্যা ২০৭,

শুক্রবার, ০২ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, ১৯ মাঘ ১৪৩০, ২০ রজব ১৪৪৫ ।