পদাবলি

পদাবলি



আলপিনে জড়ানো জ্যোৎস্না
উদয় শংকর দুর্জয়

জোস্নার আলপিন বিঁধে আছে অযুত কাল ধরে, রেটিনার চারপাশে;
এক ফোঁটা কান্নার হ্রদে, ভেসে আছে নিস্তব্ধ পাঁচতলা জাহাজ।
দুপুরের রঙ ছুটে আসে বিভ্রান্তি ফেলে, একপাল নীল ঘোড়া হয়ে;
প্রত্যাহ আকাশ ভাঙে কলতান রুখে, নিশ্চুপ ক্লান্তির ফিনিক্স বেহাগ।

পাল্টাতে এসে মৃদু কলরোল, থেমে গ্যাছে উল্লাসের দল;
ভাব্বার বিষাদ লিখে, ফিরে গ্যাছে সোনালি আলবাট্রাস।
কখন যেন স্টারলিং সুর চুরি করে গায়, স্বর্নচাপার গান,
এক অষ্টাদশী রোজ তাড়িয়ে বেড়ায় নিরুদ্দেশি পেগাসাস।

ত্রিকোণী রোদ্দুরে ভেজাতে আসা অঞ্জলির গৃহদ্বার,
বিবর্ণ বেহালায় পড়ে থাকে বিভ্রমের কলতান।
আর চাইলেও নিকষ ফেরি, উড়ে আসবে না, ছেড়ে পাটাতন।
এক অন্যযানে, সমুদ্র থেকে তুলে নেবো, ধুলো সমেত রুপোলি মনিহার।


গুজরিপঞ্চম
জোবায়ের মিলন

-এই রীতিটা পীড়া দেয়।
মৃত্যুর পর এসে বুক চাপড়ায় সকলে
চোখ চিপে পানি বের করে হায় হায় করে
স্মৃতিকে পুঁজি করে দিনের পর দিন, রাতের পর রাত
হাজার শব্দ সুতায় গাঁথে, শোক বার্তায় জলধি বানায়;
মৃত্যু পূর্ব সম্পর্ক এক বিরাট বিস্ময়।
রুদ্রকে নিয়ে আজকের শত আয়োজন মনে করিয়ে দেয়
সেইসব দিনরাত্রি’র কথা, যখন একটা চাকুরীর
তেষ্টা নিয়ে মাটিকে দুভাগ করেছে রুদ্র, বিলাপে। এটা একটা
উদাহরণ।

-এরকম উদাহরণ কালের অঙ্গনে অনেক।

তসলিমার নির্বাসন লজ্জিত করে বেতবনের সবুজ।
তসলিমা ফিরে এলে শাপলা ফুটবে বলে ধুতরার গায়ে
জ্বালাধরা সন্ধ্যা নামে;
-সত্যকে জখম সহজ, চিরায়িত সত্যের মৃত্যু নেই।
তসলিমার নামে এ উদ্যানে সভা হবে, শোক হবে,
বক্তৃতা হবে, করতালি হবে; তসলিমা আলো-রোদের
উদাহরণ হবে সমূহ একদিন।

থাকি বা না থাকি, থাকো বা না থাকো
রৌদ্র কন্যারা একদিন, তার থেকে তুলে নেবে ভোরের
ঝিলিক। 


ভেঙ্গে পড়ছে সব
রফিকুজ্জামান রণি

তুমুল উল্লাসে ভেঙ্গে পড়ছে সব
রোদ থেকে ভেঙ্গে পড়ছে ক্রোধ
কোলাহল থেকে ভেঙ্গে পড়ছে শব্দ
তুফান থেকে ভেঙ্গে পড়ছে গর্জন
এবং মেঘ থেকে ভেঙ্গে পড়ছে ছায়া

শুধু স্তব্ধতা, ভীষণ রুক্ষতায়-
ভেঙ্গে পড়ছে তারা থেকে তারা!


কবির হাসি ফুঁটে
সাজ্জাক হোসেন শিহাব

কদম ফুলের পাতায়-ঐরাতে বাদলের তারা
ফুটেছিলো! আঁধারডানায় ভর করে দূরদেশ
থেকে উড়ে এসেছিলো অচেনা মায়াবী রুপকথা!
বাতাসে আবেগী ঢেউ ছিলো! কেউ তো সাগর হয়ে!
সেই সাগর, যে গভীর অসীম বৃষ্টি একা লুটে!
আমি দেখি সেই আষাঢ়ে আজো কবির হাসি ফুটে!


এই আশ্বিনের কাছে
নুরুল ইসলাম বাবুল

ফালি ফালি মেঘের মতো উড়ে যায় দিন,
দিনগুলো টেনে টেনে দীর্ঘ করে আমাদের বয়স;
কখনো মাথার ওপর জমে থাকে সাদা-সাদা মেঘ
মেঘগুলো মায়া করে করে ছায়া দেয়,
সেই নিবিড় ছায়ার ভেতর দিয়ে হেঁটে হেঁটে
পৌঁছে যাই শিন শিন আশ্বিনের দিকে...

আহা!  কতকাল পড়ে আছি এইখানে
বুকপকেটে ভরে নিয়ে
হেমন্তের হিম-হিম সকাল;
জামার আস্তিনে গিঁট দিয়ে বেঁধে রাখি
গলে যাওয়া শিশির।

দিনগুলো শুধু উড়ে উড়ে যায়
ফালি ফালি মেঘের মতো
তবু অনাদীকাল পড়ে আছি এই আশ্বিনের কাছে।





কল্পনা
লুফাইয়্যা শাম্মী

হলদে জ্যোৎস্নার মত মেঘে জড়িয়ে ভেবে নিচ্ছি তুমি ছুঁয়ে আছো, আমায় ভাবছো তোমার স্বপ্নের চূড়ায়! তখন আকাশ নেমে আসে কোলের উপর, তুমি রূপকথার গল্প শুনে চুপটি করে ঘুমিয়ে যাও, যেন নিতান্ত’ই অবুঝ শিশু। মেঘের দলে গা ভাসিয়ে তোমায় ছুঁয়ে আমিও ডুবে যাই উর্মিদোলায়।


পাখিটা উড়ে গেছে
আহমদ মেহেদী
(উৎসর্গ : পৃথিবীর সমস্ত পুত্রহারা পিতাদের)

এটাই হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দের সংবাদ, এই সংবাদ  বিশ্ব জয়ের আনন্দের  চেয়েও কোনো অংশে কম নয় আপনি প্রথম ছেলে কিংবা মেয়ের বাবা হয়েছেন!
বাবার হৃদয় সমস্ত শক্তি দিয়ে  তখন আনন্দে নেচে উঠে তাঁর’ই রক্তখন্ড টাকে এক নজর দেখার জন্যে!
কাকে প্রথম জানাবে এই খবর? বাবাকে? মাকে? কাছের বন্ধুদের?

কিছুক্ষণের মধ্যে  ডাক্তার এক দুঃসংবাদ দিলেন-আপনার বাচ্চা ত অসুস্থ! তাকে আইসিও তে নেয়া জরুরী,
কি আশ্চর্য! কেন কি হয়েছে আমার ছেলের?
আনন্দের মাঝে এ যে ভীষণ যন্ত্রনা আমার সমস্ত হৃদয়টাকে এভাবেই ভেঙ্গে দিবে কে জানতো,
আমার এমন লাগছে কেন- মনে হচ্ছিল এই পৃথিবীর সব অমানুষ মিলে আমাকে পিষে ফেলতে চাইছে ....একটু দয়া ধর হে দয়াময়!

একটি আসেইসেনকিউবেটরের মধ্যে শুয়ে আছে আমার আদরের মেহরাব!
ডাক্তার কিছুক্ষণ পরপর আমাকে আর আমার ছোট ভাইকে ব্রিফিং করছেন, তাকে দেখার সুযোগ করে দিচ্ছেন।
কেমন সাহস ঐ ডাক্তারের, আমি নাকি ছুঁয়ে দেখতে পারব না! এবার সর্বশেষ অবস্থান জানানো হচ্ছে আমাদের! আমাদের চোখের জল দেখে ডাক্তারের চোখে ও জল এসে পড়ল, আমি শেষবারের মত আমার মেহরাবকে গালে আদর করে এলাম, বুঝতে পারছি -পাখিটা কষ্ট পেয়ে  উড়ে যাচ্ছে, উড়ে চলে গেছে!
হে বিধাতা তুমি ত জানতে সেদিন আমার বিনিময়ে আমার পাখিটাকে চেয়েছিলাম তোমার কাছে।
আজ এই পৃথিবীর সবাইকে জানিয়ে রাখি পরকালে আমি স্বর্গ-নরক যেখানেই থাকি; আমার এই পাখিটাই চাই....হে দয়াময়!


মাটি হওয়ার ইতিহাস!
বিদ্যুৎ দেব

মাথার উপর পাক মারে তিনপাখা মেশিন। নিয়মের তিন সুত্রে ঘুরে আমার পৃথিবী। যদিও মাটি ঘেরা আমার শরীর। আকাশটা ঢেকে দিল রঙ্গিন টিন। জ্বর গায়ে আমার কত কিছু মনে হয়। মাটির গান শুনায় প্রিয়জন।
মাটির বুকে পাথর সাজায় স্বপ্ন দেখা আদমের পরম্পরা। সংখ্যা বাড়ায় গানিতিক হারে। বাড়ায় শব্দ যন্ত্রণা। ঘাম দেয়া শ্রমিকের ছায়া পড়ে সূর্য পশ্চিমে হেঁটে গেলে। এই সময়  মানুষের  মুখ দেখায় পাতা কালারের। ভয় পাই আমি । মন চায় পড়ে নিই মাটির হওয়ার ইতিহাস!





আক্ষেপ
নুশরাত রুমু

মেঘলা বিকেল বেলা আমি যে একেলা
শূণ্যে ধোঁয়ার আগল মনটা পাগল পাগল
         কেইবা কাকে বোঝে?
বেঁধেছে সংঘাত চলছে অজুহাত
করছে দোষারোপ ছুঁড়ছে কথার তোপ
         কে আর মনকে খোঁজে?




আধুলী সঞ্চয়
পারুল  নিশা

বিভৎস্যতার প্রকষ্টে ভালবাসা পেতে ,
কান পাতে সহিংস বুকে।
নিজের বোধ বুদ্ধির প্রসস্থতা রুখে।
অন্ধের আয়না বা চিরুনীর বিভক্ততা নেই,
মনের সব চাওয়া পাওয়া যেন অব্যক্ততাই।

পরিত্যক্ত শরীরের মত জীবনটাও যেন অতিরিক্ত,
তিক্ত সময়ের হাত ধরে পথ চলতে বিরক্ত।
যাওনা নদী তটে, চাওনা কারো আঁখি পটে,
তবুও বদনাম রটে।

জন্ম দেখেছি আগেও অনেক, মরতে দেখেছি বারংবার।
পথে ঘাটে দেখি কত বিবস্ত্র চিৎকার।
অগ্রাধিকার হিংসার ফাঁদে পড়ে কাঁদে।

বেঁচে থাকার প্রত্যাশা হয় শিরচ্ছেদ।
দুঃক্ষের হাটে জীবন বেঁচে খায়,
আঘাতে আঘাতে আধুলী সঞ্চয়।

কথা বলার আগে
হরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়

এখন যার কথা বলার সময়
একটু আগেও সে এখানে ছিল
নাম ঘোষণার পরই
তাকে আর দেখতে পাচ্ছি না

একটা কথাও সে বলে নি
তবু রাস্তা দিয়ে পরপর
বেশ কয়েকটা বাস ছুটে গেল
আকাশটা কালো হয়ে এলো

এবার কিন্তু আপনার পালা
দেখুন নিজেকে কতটা আগলে রাখতে পারেন ।

ওরা মরে
কৃপাণ মৈত্র

ওরা পাথর কাটতো, সাদাপাথর।
 ঠিকরে পড়তো চাঁদের আলো,
প্রদীপের লক্ষ শিখা সব কোণের ফোঁকরে ঢুকে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতো।
 অস্ত সূর্য লাল অনুরাগের চিঠি পাঠাতো প্রতিদিন। শিশিরস্নাত সোহাগ।
 খবর নিত না তাদের যাদের বুকের জমাট রক্ত
 বিদ্রোহ করে নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত করে।
ঈশ্বরের অবিচারে ঈশ্বরকে দাঁড় করায় ঈশ্বরের কাঠগড়ায়।
এক পৃথিবীর বাতাসে ও তাদের কুলায় না।
যে সৃষ্টি একসময় সুখের নিদ্রা ডেকে আনত প্রসব সন্তানের উজ্জ্বল হাসির মতো-
সে চোখ স্বপ্ন দেখার সাহস পায় না। বুকঠেলা দীর্ঘশ্বাস, সঙ্গে চাপ চাপ রক্ত। ক্ষীণদৃষ্টি
সৃষ্টি দেখতে গিয়ে দেখে চিতার আগুনের লেলিহান শিখা। স্মৃতিটা ঝাপসা হয়, সব চেনা
সরে সরে যায়। তবুও সাদাপাথরে সূর্য বা চাঁদের
কলঙ্করেখা পড়ে না। বৈভবের গরিমা তবু সমুজ্জ্বল। একফোঁটা চোখের জল কেউ জমিয়ে
 রাখেনি ওদের তরে।ওরা মরে প্রতিদিন মরে।



কিছুটা এলোমেলো
পারভেজ মল্লিক

আমার জানালা থেকে শহরটা দেখা যায়। এলোমেলো। বাসি।
মুহূর্তরা কুয়াশায় দিক হারায়। চাহনিতে সাবেকি জলছাপ।
রেডিও ষ্টেশনে ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম ঘেঁটে বেড়াই। কিনে নিয়ে আসি
প্রবন্ধের ভুল বানান। আর সম্পর্কের জটিল বারগ্রাফ।

অভিনবত্ব আসবে একদিন। কফি পেয়ালায় শুকনো ঠোঁটের দাগ।
ফুটপাতে পিকাসোর তুলির টান। হাতে হাতে ঘোরে। সস্তা বিকোয়।
মাসমাইনের কাবার হওয়ার তাড়া। অবসরে প্রিয় নাস্তিক বিভাগ।
খালি পেটে জমে জল্পনা; শব্দ আসে। লিখতে পারিনা। কবি নই।

ট্রাম রাস্তার ভিড়ে একটু তফাৎ খুঁজে পাওয়ার আবদার। নিয়মিত চেষ্টা।
খুঁজে পেলে ফিরে এসো। ওরা দেখুক। ট্রাজেডি নয়। কমেডি হবে শেষটা।



শরতের গল্প
নাসরিন জাহান মাধুরী

যদি আগামী শরতেও বেঁচে থাকি  তবে এই শরতের গল্পটা শেষ করবো-
অনেক কথা বলার আছে এই শরতের।
গেলো শরতে যেমন গল্প করেছি এর আগের শরতের।
এমনি চাঁদভাসি রাত, এমনি টিপটিপ বৃষ্টি-
তবে আজকের গল্পটা আগামী শরতের জন্যই তোলা রইলো।
আমরা ভালোবাসি বিগত দিনের গল্প শুনতে আর বলতে-
এই শরতে যদিও আমার মন ভালো নেই তবুও সেকথা বলবোনা।
বলবোনা শ্বেতশুভ্র মেঘগুলো নীল পাহাড়ে কেমন করে মিশে যাচ্ছিলো।
কেমন করে মেঘের ছায়া হাওড়ের জলে পড়ে মায়াবী অপরূপ দৃশ্য করেছিলো।
কেমন করে নৌকায় ঢেউয়ের তালে দুলে দুলে জীবনের গান গেয়েছিলাম।
ফিরে এসে বন্ধুর না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার খবর ঠিক কতটুকু কষ্ট দেয়-
সেটাও জমা রইলো আগামী শরতে বলার জন্য-
জানি অনেক কিছু বলার থাকে, বলবো বলবো করেও বলিনা-
বলা হয়ে ওঠেনা,
তারপর চলে যাই অমোঘের আহ্বানে অনেক অনেক দূরে-
এই শরতের গল্পগুলোও আগামী শরতের জন্যই রইলো
বেঁচে থাকার শর্ত সাপেক্ষে;
কারণ আমরা ভালোবাসি বিগত দিনের গল্প শুনতে আর বলতে।
বর্তমানে থেকেও অতীতে বসবাস আমাদের খুব পছন্দ।

খুব একলা একলা লাগে...

খুব একলা একলা লাগে...


খুব একলা একলা লাগে...
আব্দুল্লাহ আল তানিম


পরিবারের সবার ছোট্ট মেয়েটির নাম ইরা। সবার ছোট বলে তাকে সবাই ভালোবাসে। ইরা একটু দুষ্টু, একটু চঞ্চল, একটু মিষ্টি প্রকৃতির মেয়ে। এভাবেই দিন শেষে সন্ধ্যা নেমে আসে। তারপর রাত্রি হয় নতুন একটি ভোরের অপেক্ষায়। ইরার দিন কেটে যেতো খেলার সাথীদের সঙ্গে। ইরার এভাবেই বেড়ে উঠতে লাগলো। আহারে, জীবন কত সুন্দর।

সমাজের আর দশ পরিবারের সাথে তাদের পরিবারও একটি সুখী পরিবার ছিলো।  সব কিছুই ঠিকঠাক যাচ্ছিলো। কিন্তু একদিন তাদের পরিবারে নেমে আসে অন্ধকারের ঘনঘটা। যখন সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে, তার আম্মুকে সাপে কাটে । সাপে কাটার পর প্রাথমিক অবস্থায় এটাকে গুরুত্ব দেন নি কেউ। যখন সবাই গুরুত্ব দেওয়া শুরু করলেন, ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। চিকিৎসা চলতে থাকলো কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হেরে যান তার মা। এখান থেকেই ইরার জীবন যুদ্ধ শুরু হয়। তারা দুই বোন- এক ভাই। বড় বোনের বিয়ে হয়ে যায় মায়ের মৃত্যুর আগে। এখন ইরাকেই পরিবারের সব কিছু দেখাশুনা করতে হয়। ছোট্ট মেয়েটি কি আর করবে ও কি-ই বা সামলাবে। রান্নাবান্না থেকে শুরু করে সব কিছুই ইরাকে করতে হয় এখন। নিজের পড়ালেখা চালানোর সাথে সাথে একটা পরিবারের এত কাজ করা এইটুক ছোট্ট মেয়ের পক্ষে অসম্ভব । তবুও সে তার নিয়তি কে মেনে নিয়েছে।

ছোট বোন ইরার এসব কষ্ট দেখে। বড় ভাইয়াটা আর সহ্য করতে পারলেন না। এজন্য ইরার বড় ভাইয়া এখন ঠিক করেছে একটা বিয়ে করবেন। ঘরে বউ আসলে ইরার অনেক ভালো হবে। ইরাও অনেক খুশি হবে।

ইরা যখন নবম শ্রেনী উঠে তখন ভাইয়ার বিয়ে ঠিক হয় । বিয়ে ঠিক হওয়ার দিন ইরা এক দেখাতে  ভাবিকে দেখে পাগল হয়ে যায়। ভাবি অবশ্য দেখতে শ্যামবর্ণের হলেও খারাপ না চেহারা, ছিলো মায়াবী। তার কিছুদিন পর ইরার ভাইয়ার বিয়ে হয়। পরিবারে একজন নতুন সদস্য আসে। তার ভাবি তাকে অনেক ভালোবাসে। পরিবারের সব কাজ এখন ভাবি একাই করে । একটা মানুষ একটা পরিবারের সব কাজ একাই করে দেখে ইরার খুব খারাপ লাগতো তাই ভাবিকে কাজে সাহায্য করে। ভাবিকেও ইরা অনেক ভালোবাসে। তাদের পরিবারে আবার সুখের ছায়া ফিরে এলো। হ্যাঁ, সত্যিই জীবন অনেক সুন্দর।

এই সুখের ছায়া বেশিদিন থাকলো না। ভাইয়ার বিয়ে কিছুদিন পর তার বাবাও বলে বিয়ে করবে। উনার দেখাশুনার জন্য তো একজন মানুষ প্রয়োজন তাই উনি বিয়ে করবেন। পরিবারের কেউ-ই রাজি ছিলো না। কেউই চায় না বাবা আরেকটা বিয়ে করুক। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে সবার অমতে বাবা একটি নতুন বউ নিয়ে ঘরে আসে। তারা নতুন মাকে কেউ মেনে নিতে চায় না।  ভাই-বোন কেউই নতুন মা কে পছন্দ করেনা। সৎ মাও তাদের সাথে ভালোভাবে মিশে না। সৎ মাও তাদেরকে অন্য চোখে দেখেন। সৎ মায়েরা যেমন হয়, সব কিছু থেকেই তাদেরকে আলাদা করে ফেলে। এখন এভাবেই চলছে তাদের সংসার। জীবন খুব কঠিন। 

এখন ইরার গল্পে আসা যাকঃ

ইরা যখন ক্লাস নাইনে পড়ে তখন থেকেই একটা ছেলে ইরাকে পছন্দ করতো। ছেলেটা তাদের এলাকার-ই ছিলো। সে স্কুলে যাবার পথে ছেলেটা তাকে খুব বিরক্ত করতো। এভাবে একদিন বিরক্ত করে,  দুই দিন করে, তিন করে, না এত দেখি প্রতিদিন করে। ইরা কিছুই বলতো না কারণ ইরা জানে বাবার কানে অব্ধি পৌঁছলে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিবে বাবা। কিন্তু হঠাৎ একদিন ইরার বাবার কাছে কে যেন বলে দিয়েছিলো। তার বাবা এসব জানতে পেরে তার স্কুল যাওয়া বন্ধ করে দেন। ইরাকে কারো সাথে মিশতে দিতেন না। ইরা একা হয়ে যায়। জীবনে কিছু থাকুক আর না থাকুক গল্প করার মতো যদি ভালো একটা বন্ধু পাশে থাকে তাহলে আর কিছুই লাগে না। ইরা একা হয়ে যাওয়াতে সব কিছুই এলোমেলো লাগছে তার। ইরার বাবা ভাবেন, মেয়েটাকে কিছু দিনের জন্য ঢাকায় তার মামার বাসায় পাঠিয়ে দিলে হয়তো ভালো হবে। এখানে তো ইরা একা একা থাকছে।  তারচেয়ে বরং মেয়েটা কিছুদিন মামার বাসায় যাক। ইরার বাবা তাকে কিছু দিনের জন্য ঢাকায় তার মামার বাসায় পাঠিয়ে দেন ।

ঢাকায় আসার কিছুদিন পর হঠাৎ করে একটা ছেলেকে ইরার পছন্দ হয়। ছেলেটির নাম ইভান।  ইভানেরও ইরাকে পছন্দ হয়। যদিও তারা সম্পর্কে যায় নি। তবে তাদের মাঝে ফোন আলাপ হতো। তারপর ইরা বাড়িতে চলে আসে সামনে বার্ষিক পরীক্ষা তাই।  

নবম শ্রেণী থেকে দশম শ্রেণীতে সে ভালো রেজাল্টে উত্তীর্ণ হয়। দশম শ্রেণীতে উঠার পর সেই আগের ছেলেটি আবার বিরক্ত করা শুরু করে। ছেলেটি কিভাবে যেন জানতে পারলো, ইরা ঢাকায় একটি ছেলেকে পছন্দ করে। এটা শুনে ছেলেটি ক্ষেপে যায়।  তাই এলাকায় সবাইকে বলে বেড়ায় তার সাথে নাকি ইরার সম্পর্ক। তাদের নাকি বিয়েও হয়েছে ইত্যাদি । সবাইকে ইরার নামে অনেক কিছু বলে।  তখন েেথকে ইরার বাবা  আবার তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেন। এভাবে ইরা একা একা থাকতে থাকতে চলে এলো এসএসসি পরীক্ষা। অনেক কষ্ট করে পড়ালেখা করে ইরা।  সে কারো সাহায্য পায়নি। সহপাঠীদের কাছ থেকে অনেক কিছুই জানা যায় শিখা যায়।  কিন্তু তার বাবা কখনোই মিশতে দিতেন না। ইরা অনেক কষ্ট করে পরীক্ষাটা দিলো।  এসএসসি পরীক্ষাতে খুব ভালো রেজাল্টে পাস করলো ইরা।

এবার সে কলেজে ভর্তি হলো । কলেজে ভর্তি হওয়ার পর কিছু দিনের মাথায় ঢাকার সেই ইভান নামের ছেলেটি আবার যোগাযোগ করা শুরু করে দেয় । তাদের ফোন আলাপ হতো। ইরার কলেজের কোনো সহপাঠী বন্ধু/বান্ধবী ছিলো না। তবে লুকিয়ে লুকিয়ে ইভানের সাথে কথা বলতো। ইভান আর ইরার মাঝে ভালো একটা বন্ধুত্ব তৈরী হয়। বলে রাখি ইরার তখনও কোনো মোবাইল ছিলো না। ইরা তাদের বাসার ফোন থেকে লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলতো। এভাবেই কিছু দিন চলে যায়। তারপর আসে এইচ এস সি পরীক্ষা ।  পরীক্ষা তেমন ভালো হয়নি ইরা ভাবছে যদি সে খারাপ রেজাল্ট করে তাহলে হয়তো আর পড়ালেখা করাবে না।  ভাবতে ভাবতে রেজাল্টের সময় চলে আসলো। কিন্তু একি ইরা তার রেজাল্ট পেয়ে পুরোই অবাক হয়ে যায়।  ইরা অনেক ভালো রেজাল্টে পাস করে। সে এখন পৃথিবীতে দশটা সুখী মানুষের মধ্যে একজন। 

ইরার বাবা এবার ঠিক করেন মেয়েটাকে একেবারে ঢাকায় পাঠিয়ে দিবেন লেখা পড়া করার জন্য। সে ঢাকায় চলে আসে তারপর ইভানের সাথে আরো গভীর হয় সম্পর্কটি। এখন তারা একে অপরকে না দেখলে সময় কাটে না। ইরা নতুন একটি ফোন কিনে সারাক্ষণ ইভানের সাথে কথা হতো। তারা দুজনই মন লেনাদেনা করে একে-অপরের সাথে। তাদের গল্পটা আরো সুন্দর হতে লাগলো। ভালোবাসার মানুষের সাথে আমরা ঝগড়া একটু বেশিই করি। ইরা আর ইভানেরও ঠিক তাই সারাক্ষণ ঝগড়া লেগে থাকতো।  তবে দিনশেষ তাই একে-অপরকে ছাড়া কিছুই বুঝে না। এভাবে-ই তাদের ভালোবাসা দিন দিন বাড়তে থাকলো। খুব সম্ভবত ভালোবাসা একটি সুন্দর শুদ্ধতম অনুভূতি। আহ! জীবন সুন্দর ।

একটা সময় আসে ছেলেটা ইরাকে অনেক জ্বালাতো। ইরার স্বাধীনতা দিতো না। ইরার কোনো বন্ধুর সাথে মিশতে দিতো না। ইরা ইভানকে পাগলের মতো ভালোবাসে। ইভানে প্রেমে ইরা অন্ধ হয়ে গেছিলো।  শুনেছি প্রেমে অন্ধ হওয়া ভালো না। প্রেমে অন্ধ হওয়াতে সব কথা মেনে নিতো। আসলেই সব কিছু মেনে নেওয়া আর মানিয়ে নেওয়াটাই মেয়েদের ধর্ম। ইরা আর কিছুই চাই না সে ইভান কে নিয়েই সুখে থাকতে চায়। সময় গড়াতে না গড়াতে ইভান ইরা কে সন্দেহ করা শুরু করলো। সন্দেহ নামক শব্দটি খুব খারাপ। সন্দেহ করলে কোনো কিছু খুব বেশিদিন ধরে ঠিকে থাকে না। সন্দেহ করলে সময়ের সাথে সাথে সম্পর্কটাও নষ্ট হতে থাকে। যাই হোক ইরা সব কিছু মেনে নিয়েছে কারণ ইরা ইভানকে ছাড়া এক মুহুর্তও থাকতে পারবে না। একটা মেয়ে একটা ছেলেকে যে পাগলের মতো ভালোবাসে তা ইরাকে না দেখলে বোঝা যেতো না। আর আমরা মানুষ,  আমরা বড়-ই অদ্ভুত, আমরা বড়-ই বিচিত্র। কেউ সময় না দিলে অবহেলা করলে। উল্টো তার প্রতি ভালোলাগা কাজ করে, তাকে ভালোবাসি । আর কেউ ভালোবাসলে উল্টো তাকে সময় দেই না অবহেলা করি। ঠিক তেমনি ইভান এখন ইরাকে একটু অবহেলা করে। ইরা সব কিছুই বুঝতে পারতো কিন্তু ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাখে কিছুই বলতো না ।

একদিন ইরা বুঝতে পারলো যে ছেলেটা ইরার কাছ থেকে কি যেনো লুকিয়ে রাখছে, বলছেনা। ইরা এসব জানারও চেষ্টা করেনি কারণ ইভানকে ইরা খুব বেশি বিশ্বাস করতো। ইরা জানে বিশ্বাস না থাকলে পৃথিবীতে কোনো কিছুই করা সম্ভব না। তাই ইভান কে অনেক অনেক বিশ্বাস করতো। এরপর হঠাৎ একদিন ইরা জানতে পারলো ছেলেটার পরিবার সম্পর্কে। মানে সে যে পরিচয় দিয়েছিলো তা সব মিথ্যা ছিলো। ইভান আসলে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে। সে বলেছিলো ভালো একটা জব করে আর লেখাপড়া করে আসলেও তাও না। সে ছোটখাটো একটা জব করে কিন্তু লেখাপড়া করে না। আরো অনেক কিছু মিথ্যা বলেছিলো ।

তারপর সব কিছু জেনেও ইরা ইভানকে কিছু বলেনি। তার সবকিছু ইরা মেনে নিয়েছে। ইরা ইভানের কাছে শুধু একটু ভালোবাসা চাইতো। দিনশেষ তাই একটু ভালোবাসা দিলেই ইরার চলবে। ইরার আর কিছুই লাগবে না।  কিছুই না।
 
আসলে ইভানের লোভ ছিলো ইরার দেহের প্রতি। ইরাকে ইদানীং বারবার বলে যে ওরা ফিজিক্যাল রিলেশনে যাবে। ইরা রাজি হত না। রাজি না হওয়াটা স্বাভাবিক। রাজি হবেই বা কেন। এজন্য ইরা অনেকবার সুইসাইড করার চেষ্টা করে কিন্তু পারেনি। তারপর ইভান  ইরাকে অনেক বুঝিয়ে, অনেক কিছু বলে, বলেছে ইরাকে বিয়ে করবে হ্যান-ত্যান। তার সব পশুত্বের বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে ইরাকে রাজি করালো ফিজিক্যাল রিলেশনে যেতে। প্রেমে অন্ধ হওয়া ইরা রাজি হলো, আসলেই প্রেমে অন্ধ হওয়াটা একদম বোকামি, একদম।

এরপর কিছুদিন যেতে না যেতে ইরার কাছে একটা বার্তা আসলো। বার্তাটি পেয়ে ইরার মাথার উপর থেকে আকাশটা হারিয়ে গেছিলো। তীব্র কষ্টের কিছু শুনলে সত্যি সত্যি মাথার উপরের আকাশটাও হারিয়ে যায়, কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। ইরা জানতে পারলো ইভান আসলে বিবাহিত। তার বিয়ের দুই বছর হয়ে গেছে। ইভান যে মেয়েটাকে বিয়ে করেছিলো ঐ মেয়ের সাথেও প্রেম করে বিয়ে হয় তাদের।

যেদিন এই বার্তাটা পায় সেদিন থেকে ইরা আর রাতে ঘুমায় না। রাতে না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ইরার চোখের নিচে কালি পড়ে আছে। ইরা সেই কালি কাজল দিয়ে ডেকে রাখে।  আর কান্না ? মেয়েদের কান্না আমরা কেও ই দেখতে পাইনা, শুনতে পাইনা,  বোকা বোকা মেয়েরা খুব নিঃশব্দে কাঁদতে পারে। ইরা জানে চোখের জলের কোনো রঙ নেই নয়তো বালিশটা রঙিন হয়ে যেতো।

ইরার সাথে ইভানের এসব সম্পর্ক তা ইরার বাসার সবাই জানতে পেরে ইরাকে সবাই মানসিক শাস্তি দেওয়া শুরু করে। আসলে কোনো পরিবারই এসব কখনোই  মেনে নেয় না। বাসার সবাই তাকে বাজে ভাবে বকা দেয়। এসব সহ্য করতে না পেরে হুট করে একদিন ইরা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। সে বাসা থেকে বেরিয়ে আসে।
তারপর একটা হোস্টেলে উঠে। হোস্টেলে আসার পর থেকে পড়ালেখা আর হোস্টেলের খরচের জন্য একটা ছোট্ট জব খুঁজে, এবং একসময় পেয়েও যায় ।

ইরা আর কখনো ইভানের সাথে যোগাযোগ করে নাই। ইভান হয়তো ইরাকে খুঁজছে অনেক কিন্তু একটা জীবন্ত মানুষকে জবাই করলে সে কি আর বেঁচে রয় ??  হয়তো বেঁচে আছে। কিন্তু মনটা অনেক আগেই মরে গেছে। একটা মানুষের বিশ্বাস নিয়ে এভাবে খেলা করা ইভানের একদম ঠিক হয় নি। একটা মানুষের মন ভেঙ্গে গেলে সব ভেঙ্গে যায়। একটা মনকে বারবার ভাঙ্গা যায় না একবার ভাঙ্গা যায়। এখন ইরার কাছে ইভান একটা ভুল নামক শব্দ। ইরা ভাবে সে এতই বোকা যে একটা মানুষকে এতদিন ধরে একটুও চিনতে পারলো না।  আচ্ছা একটা মানুষকে চিনতে কত দিন সময় লাগে ?? হয়তো একজীবনেও চিনা হয় না। আসলেই পৃথিবীর মানুষ খুব অদ্ভুত ।

এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর ইরার কাছে একটা ম্যাসেজ আসে যে ইভান ইরার সব আপত্তিকর দৃশ্য ইন্টারনেটে সে আপলোড করবে ইত্যাদি।

এখন ইরা কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে, কি করবে, এদিক থেকে ফ্যামিলি সাপোর্ট নেই। কাউকে লজ্জায় বলতেও পারছেনা। সে পথ হারা পথিকের মত হয়ে গেছে। সে কি করবে বুঝতে পারছিল না। তবুও শক্ত হয়ে আছে ইরা।

কিছুদিন পর লোকের মুখে শুনা যায়। ইরার নগ্ন দৃশ্য চারিদিক ছড়িয়ে পড়েছে।

সে নিজেকে প্রশ্ন করে এখন তার কি হবে ?? পরিবারের কাছে মুখ দেখাবে কিভাবে, সমাজের কাছে মুখ দেখাবে কিভাবে ?? এইসব ভিন্নরকম প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরপাক খায়। সে নিজেকে কিভাবে কন্ট্রোল রেখেছিলো জানিনা।

তার কিছুদিন পর ইরাকে আর দেখায় যায় নি। আমরা আর তার কোনো খোঁজ পাইনি। সে এখন কোথায় আছে, কেমন আছে। জানা হয় নি আর, হয়তো জানা হবেও না।

পূনশ্চ:
জীবনের চলার পথে আমরা কখনো কখনো না জেনে না বুঝে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। কাউকে পুরোপুরি ভাবে না জেনে কোনো সম্পর্কে জড়ানো উচিৎ না। একটা ভুল হয়তো আপনার জীবন সমাপ্তি ঘটাতে পারে । প্রতারকদের কাছ থেকে নিজেকে দূরে রাখুন। নিজে ভালো থাকুক, সবাইকে ভালো রাখুন।




মানুষ

মানুষ


মানুষ
ইলিয়াস বাবর

নাছের ভাইয়ের অমন হৃদয়বিদারী কান্না-অশ্রুর সাথে ‘খোদা রহম করো’ নামক শব্দবন্ধ স্পষ্টভাবে শুনতে পেয়ে নিজের কান নিয়েই সন্দিহান হয়ে পড়ি আমি। এ কি আমাদের নাছের ভাই? জীবনের অর্ধেক আয়ু শেষ করা নাছের ভাইকে আমরা জানি খোদার অস্তিত্বকে অস্বিকার করা বান্দা হিসেবে। ম্যালাদিনের মেলামেশা, আড্ডাগল্পে নিজেকে নাস্তিক প্রমাণে ব্যস্ত রাখেন তিনি। বলেন, এসব ধর্ম-আল্লাখোদা ভীরুদের কাজ, আমার নয়। গ্রাম থেকে আসা, বাপদাদার রীতিতে মক্তবে কাটানো সকালগুলো তখন চোখে ভাসে, থাপ্পড় লাগায় দিলে। শিশুদের কণ্ঠ মিলিয়ে সূরাপাঠ, কোরান কি রেহালে বেখেয়ালে পায়ের স্পর্শ হলে চুমু খাওয়া, বুকে কপালে লাগিয়ে আদব প্রকাশের দৃশ্যের সাথে কোনভাবেই যায় না নাছের ভাইয়ের ভাষা। পুত্রের অকাল বিয়োগে অশ্রুপাত আর রহমের প্রার্থণায় আজকের নাছের ভাইকে আড্ডার নাছের ভাইয়ের সাথে মেলাতে কষ্ট হয় আমার। মানুষ কি তবে...

না না, আরেকবার অবশ্য নাছের ভাইকে এমন মোলায়েম আর প্রার্থণার ভঙ্গিতে পেয়েছি আসিফ ভাইয়ের বাসায়। খাবারদাবার, হাতিঘোড়া মারার পর কণ্ঠে গান তুলেছে তখন আসিফ ভাই। আচমকা লক্ষ্য করি, রুমের জিনিসপত্র কাঁপছে, এমনকি বসার পালঙ্কও! যার যার হুশ হাতে নিয়ে দৌঁড়াতে ব্যস্ত হলে আসিফ ভাই সাবধান করেন, দৌঁড়োলে হুড়োহুড়িতে পা ভাঙবে, পাঁচতলা থেকে নামতে গিয়েই দেখবেন জান খতম! ওমা, নাছের ভাই কই? এই ঘোর কম্পনে তার মতো মুরব্বি আমাদের দিশা না দিয়ে কই গেলেন! প্রায় অন্ধকারে, রুমের এক কোণে নাছের ভাই দেখি ভয়ে কাঁপছে। বিড়বিড় করে পড়ছে, ইন্নি কুনতুম মিনাজজোয়ালিমিন... কাছে আসতেই ইশারায় জানায়, আজান দাও, ভূমিকম্পের সময় আজান দিতে হয়! আসিফ ভাই গানের সুর অতীত করে আজান ধরে, দূর থেকেও শোনা যায় আজানের ধ্বনি, উলুর ধ্বনি। পরিবেশ শান্ত হয়ে এলে নাছের ভাইই আড্ডার মধ্যমনি, তাকে নিয়ে হাসাহাসি করতে থাকি কতিপয় বেপথু মরদ। আজকের অশ্রুর সাথে ভূমিকম্পকে মেলাতে রুচিতে লাগে বেশ। সন্তানহারা পিতা নাছের ভাই, ব্যথায় ব্যাকুল আজ তার হৃদয়। নাছের ভাইয়ের অকালমৃত সন্তানের লাশ দাফন শেষে বাসায় ফেরার পথে কেবলি মনে প্রশ্ন জাগে, মানুষ কত প্রকার ও কী কী?

ধারাবাহিক উপন্যাস : উর্মিলা নগরে থাকে : পর্ব ০২

ধারাবাহিক উপন্যাস : উর্মিলা নগরে থাকে : পর্ব ০২


(গত সংখ্যার পর)
০২.
বাস থেকে নামতেই প্রায় সন্ধ্যা। নগরের আলোকোজ্জ¦ল বাহার দেখে বিস্ময়ের সীমা নেই উর্মিলার। তারপর সারাপথে শঙ্কা। অপরিচিত সবকিছু। নানা ভাবনায় নিজেকে দুর্বল মনে হয়েছিল। একা একা শুভপুর থেকে এ নগরে এসেছে! অচেনা সবকিছুই ভীতিকর। তারপরও উর্মিলার কেন যেন মনে হয়েছিল বেবী আপার নিকট পৌঁছুতে পারলে সবকিছু সহজ হয়ে যাবে।
মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে নেমে রিকশা নিয়ে নাখালপাড়া ‘নারী মুক্তি কেন্দ্র’ অতি নিকট। বেবী আপা ওইভাবে লিখেছে সব ব্যবস্থাই করা থাকবে।
নারী মুক্তি কেন্দ্রের সামনে রিকশা থেকে টিনের ট্রাঙ্ক নামাতে গিয়ে উর্মিলার একবার মনে হয়েছিল রিকশাওয়ালা ঠিক জায়গায় নিয়ে এসেছে তো? গেটের কাছে এক মধ্যবয়সী লোক উর্মিলাকে নিয়ে গেল দু’তলায়।
ওর বয়সী এক মেয়ে বলল, ‘আমি রুবী। ময়মনসিংহের ধোবাউড়া বাড়ি। বেবী আপা আমাকে নিয়ে এসেছে। তিন মাস ধরে এখানে আছি। তোমার স্থান হয়েছে আমার রুমে।’
পাশাপাশি দুটো বড় আয়রনের খাট। খাটের পাশে ট্রাঙ্ক রেখে উর্মিলা অনুভব করল ওর প্রচ- ক্ষুধা লেগেছে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় নানা উৎকণ্ঠায় কিছুই খাওয়া হয়নি। তারপর এতটা পথ জার্নি।
এ সময় রুবী বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি। যেদিন প্রথম এলাম আমারও তোমার মতো মনে হয়েছে। হাত মুখ ধুয়ে ডাইনিংয়ে গিয়ে খেয়ে আসো। তারপর লম্বা ঘুম দাও। এ নগরকে চিনতে কিছুতো সময় লাগবে।’
উর্মিলা অবাক হয়। সবকিছু কেমন সুবেশ। বাবার কথা মনে হয়। বাবা কী ভাবছে ওর কথা? ভাববেই তো। বাবা যে একা! উর্মিলা ছাড়া কে আছে তার। আজ থেকে বাবা একজন নিঃসঙ্গ দুঃখী পিতা।
রুবীর সঙ্গে ভালো করে পরিচয় হওয়ার আগেই জাঁকিয়ে ঘুম এল ওর। কখন ওরা ঘুমিয়ে পড়ল তা কেউ জানতে পারল না। শুধু উর্মিলার একবার মনে হয়েছিল, বাবা কী জেগে আছে। শুভপুর কী ওর জন্য অপেক্ষা করবে?

উর্মিলার জন্য কেউ অপেক্ষা করেনি। পথশ্রান্ত উর্মিলার ঘুম ভাঙে সকাল আটটার পর। রুবী তখন অফিসে  চলে গেছে। উর্মিলাকে জানায়নি। যাওয়ার আগে টেবিলে চিরকুট রেখে গেছে। ‘দশটার দিকে বেবী আপা তোমাকে নেওয়ার জন্য লোক পাঠাবে। প্রস্তুত থেকো।’ দরজা গলিয়ে এক চিলতে তেসরা আলো। দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকায় উর্মিলা। আটটা সাঁইত্রিশ। বিছানায় শুয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে। বিছানায় চিৎ হয়ে শুয়ে রুমের ঈষৎ আলো-আঁধারিতে সমান্তরাল আলোর বলের নাচন অনুভব করে চোখের মণিতে। শরীরের প্রতি অঙ্গ ব্যথায় টনটন করছে। শুভপুর থেকে রাজধানী ঢাকা। একশ’ সতেরো কিলোমিটারের পথ। রাস্তার জ্যাম আর গরমে অতিষ্ঠ। তারপরও ভালোভাবে বেবী আপার কাছে পৌঁছাতে পেরেছে তাতেই উর্মিলার আনন্দের সীমা নেই। ঘড়িতে আটটা পঞ্চাশ। তড়িঘড়ি করে উঠে বাথরুমে ঢোকে। একবারে গোসল করে তৈরি হয়ে বের হয়। জানালা খুলতেই হুইসেল বাজিয়ে তেজগাঁও-এর দিকে ট্রেন ছুটে যেতে দেখে। চৈত্র মাসের ঝকমকে সকাল। ট্রাঙ্ক থেকে এসএসসি মার্কশিটসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মোটা ফাইল বের করে টেবিলে রাখে। নতুন সেলোয়ার কামিজ সঙ্গে উড়না জড়ায়। রুবীর টেবিলের আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। তাই তো! সত্যি আজকে অন্যরকম মনে হচ্ছে উর্মিলাকে। বেবী আপার পছন্দ হলে সব ঠিক। আবার বেবী আপা যদি ভাবে গ্রামের মেয়ে, রাজধানীর জন্য অনুপোযুক্ত। এমন ভাবনাগুলো নিয়ে ডাইনিং টেবিলে আসে। নাস্তা খেয়ে রুমে এসে অপেক্ষা করতে থাকে। দশটায় বেবী আপা লোক পাঠাবে। কী কাজ দিয়ে শুরু হবে ওর জীবন? লেখাপড়ার সুযোগ আছে তো? বেবী আপা তো লিখছে, ‘মনে রাখিও শিক্ষাই মেয়েদের বড় শক্তি।’ রুবীর সঙ্গে কথা বলতে পারলে ভালো হতো। তিন মাস আগে এখানে এসেছে। ওর অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে হবে।
ঠিক দশটায় দারোয়ান ডাকতে এল। বেবী আপা লোক পাঠিয়েছে। রুমের চাবি বুয়ার হাতে দিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচ তলায় নামতে থাকে। হাতে কোর্ট ফাইল কাঁধে ঝোলানো সাধারণ ভ্যানেটি ব্যাগ। গাড়িতে উঠে নিজেকে খুব অলৌকিক মনে হয়। এত সুন্দর গাড়ি! ড্রাইভারকে কোনো কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই কারওয়ানবাজার বেবী আপার অফিসের সামনে এসে গাড়ি পার্ক করে। গাড়ি থেকে নামতে সাহায্য করে ড্রাইভার। গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বলে, ‘ওই দিকে লিফট। সাত তলা।’
দুরু দুরু বুক কাঁপছে উর্মিলার। এর আগে বাবার সঙ্গে দু’বার ঢাকায় এসেছিল। বাবা ঘুরে ঘুরে ঢাকার শহর দেখিয়েছিল। রমনা পার্ক, গুলিস্তান সিনেমা হল, জাদুঘর, চিড়িয়াখানা, হাইকোর্ট, শাহবাগ, রেসকোসর্, ইউনিভার্সিটি দেখা হলেও লিফটে ওঠা হয়নি।
লিফটম্যান বলে, ‘ম্যাডাম ক’তলা।’
‘সাত তলা। বেবী আপার অফিস।’
লিফটম্যান বোতামে টিপ দেয়। লিফট চলার সঙ্গে সঙ্গে উর্মিলার বমি বমি ভাব হলো। হঠাৎ করে মাথা শূন্য হয়ে গেল। তা খুব অল্প সময়ের জন্য।
লিফট থেকে নামতেই রুবীর সঙ্গে দেখা।
‘তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। বেবী আপা দু’বার খোঁজ করেছে। ওই সোফায় বসে রেস্ট নাও। তারপর আপার রুমে যাও।’
এইটুকু সাহায্যের জন্য রুবীর প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। উর্মিলার হাত কাঁপছে, বুক কাঁপছে। হঠাৎ করে ওর প্রচ- শীত অনুভূত হলো। সারা অফিস হিমশীতল। তারপরও তৃষ্ণা পায়। রুবীর কাছ থেকে চেয়ে পানি খায়। রুবীর মতো আরও দু’তিনটি মেয়ে বেশ অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিয়ে উর্মিলাকে দেখে। কারো দিকে তাকাতে চায় না উর্মিলা। বেবী আপার মুখ মনে করে।
রুবীÑবেবী আপার রুম পর্যন্ত উর্মিলাকে নিয়ে যায়। রুমে ঢুকে অবাক হয় উর্মিলা। বেবী আপা অনেক ভারিক্কি হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে মানুষ এত বদলে যেতে পারে!
‘আপা, উর্মিলা।
‘তুমি তো অনেক সুন্দর হয়েছ। তোমার বাবা কেমন আছেন?’
উর্মিলা বেবী আপার মুখোমুখি চেয়ারে বসে পড়ে।
‘জ্বি  আপা, বাবা ভালো আছেন।’
‘শেষ পর্যন্ত তুমি বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারলে তাতেই আমি খুশি হয়েছি।’
‘আমি তো আপনার কথা বিশ্বাস করেছি।’
উর্মিলা সরল উত্তর দেয়।
‘তাই! ঠিক আছে। নিয়ম-কানুনগুলো শিখে নাও। সময় লাগবে। আমি তো কলেজে ভর্তির ব্যবস্থা করব। সময় হলে কাজের প্যাটার্ন তুমিই বুঝে যাবে।’
উর্মিলা অপলক তাকিয়ে থাকে বেবী আপার দিকে।
‘আপাতত তোমার কোনো কাজ নেই। রুবী তোমার আগে এসেছে। ওর নিকট জানার চেষ্টা করবে। রাজধানী শহর। তোমার কতো কী জানার আছে?’ বেবী আপা বেশ গুছিয়ে কথাগুলো বলে।
উর্মিলার মনে হয় ও কোনো দেবীর সঙ্গে কথা বলছে। ওর মধ্যে একধরনের মুগ্ধতা কাজ করে।
পিয়ন চা নিয়ে আসে। এক  কাপ উর্মিলার দিকে এগিয়ে দেয়।
‘চা খাও। রুমে গিয়ে রেস্ট নাও। সময় হলে অফিস তোমাকে ডাকবে।’
উর্মিলা ধূমায়িত চায়ে চুমুক দেয়। ইতোমধ্যে ফাইল নিয়ে আসে একজন। ফাইল পড়ে গাইড লাইন দিয়ে টেলিফোনে কথা বলে। উর্মিলার চা শেষ হয়ে যায়।
‘উর্মিলা, বৃদ্ধ বাবার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হয়। শুভপুর গিয়ে তোমার মধ্যে আমি লড়াকু চরিত্র পেয়েছি। ধৈর্য অনেক বড়ো ব্যাপার। অপেক্ষা করতে হয়। তুমি পারবে।’ বলতে বলতে বেবী আপা জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। এতক্ষণ পর উর্মিলার কান্না পায়। চোখ জলে ভিজে ওঠে। কেন এ কান্না উর্মিলা জানে না।
লাঞ্চ আওয়ারে রুমে ফিরে আসে উর্মিলা। টেবিলে রাখা দুপুরের খাবার খায়। বিছানায় শরীর এলিয়ে দিতেই জাঁকিয়ে ঘুম এল। সাত-পাঁচ ভাবার আগে ঘুমিয়ে যায়। ঘুম ভাঙে বিকেল বেলায়। পাঁচটার পর রুমজুড়ে অন্ধকার। সূর্য গাছ-গাছালি, দালান-কোঠার আড়ালে। চারদিক ছায়া ছায়া। দুপুরের মতো উত্তপ্ত নয়। তারপরও গরমে ভিজে গেছে। বিন্দু বিন্দু স্বেদ রোমকূপের গোড়ায়। ব্রা জ্যাবজ্যাবে ঘামে ভেজা। বাথরুমে ঢুকে একদম ফ্রেশ হয়ে বের হয়। আর এ সময় রুবী আসে।
কোনোকিছু বলার আগে বাথরুমে ঢুকে যায়। বের হয় একটু দেরি করে। উর্মিলার উৎকণ্ঠা বাড়ে। বেবী আপা কী রুবীকে কিছু বলেছে। বলতে পারে। রুবী তো এখন গার্ডিয়ান। বেবী আপা তাকে দায়িত্ব দিয়েছে। উর্মিলার প্রাথমিক দেখভাল করার। তাছাড়া রুবী তিন মাস আগে এসেছে। বেবী আপাসহ অফিসের মানুষ সম্পর্কে ওর তো প্রাথমিক ধারণা থাকবেই। এ কারণে কৌতূহল।
‘রেললাইন ধরে হেঁটে এলাম। গরমে অস্থির লাগছে। পথ বেশি না। তারপরও।’
রুবী গরগর করে বলে যায়।
উর্মিলা বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করে, ‘হেঁটে কেন?’
‘রাস্তা অল্প। টাকাও বাঁচানো।’
‘ও তাই! রুবী, আমার খুব খারাপ লাগছে।’
‘প্রথম প্রথম আমারও তাই হয়েছিল।এখন সয়ে গেছে। তোমারও যাবে।’
‘ধোবাউড়াতে কে আছে?’
‘বাবা-মা আর তিন বোন।’
‘আমার শুধু বাবা।’ উর্মিলা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে।
‘তাইলে তো পিছুটান কম। সামনে শুধু এগিয়ে চলা।’
‘রুবী তুমি এমন করে বলো যেন সামনের পথ খুব সহজ।’
‘তোমার জন্য সহজ।’
‘কেন?’
বেবী আপা তোমাকে পছন্দ করে। সারা অফিস জানে তুমি এসেছ। সবাইকে তোমার প্রতি নজর রাখতে বলেছে।’
উর্মিলা হঠাৎ করে কথা শূন্য হয়ে পড়ে। লাজুক চোখে রুবীর দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।
এ সময় আজান পড়ে। সূর্য ডুবে গেছে। তার একটু পরে চা নিয়ে বুয়া আসে। উর্মিলা বলে, ‘আমি এত চা খাই না। অফিসে খেয়েছি।’
রুবী বলে, ‘চা খাওয়া ভদ্রতার লেবাস।’
‘আমি কি এতকিছু জানি!’
‘জানবে। শুধু প্রোগ্রাম অফিসার জাকির সাহেবের কাছ থেকে দূরে থাকবে।’
‘কেন?’
‘ও আমার বুকে হাত দিয়েছিল।’
উর্মিলা অবাক হয়। আরক্ত লজ্জায় ওর মুখ ছলকে ওঠে। রুবীর সঙ্গে কথা বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। বিষণœতা ওর ওপর ভর করে। বাবার কথা মনে পড়ে। শুভপুরের আদ্যিকালের লোহার ব্রিজ থেকে লাফিয়ে পড়া কিশোরীর ডুব-সাঁতারের ছবি ভেসে ওঠে। না না ওখানে উর্মিলা নেই। উর্মিলা এখন জাকির সাহেবের হাত থেকে বাঁচার জন্য নিজকে প্রস্তুত করছে।
তারও বেশ পরে নারকেলের চিকন পাতায় উঠে আসে চৈত্রের পিঙ্গল চাঁদ। জানালা দিয়ে উর্মিলা চাঁদের দিকে তাকায়। এক চিলতে আকাশের গায় চাঁদ ঝুলে আছে। আধভাঙা। বাঁকানো চাঁদ। নগরে চাঁদ জোছনা বিলায় না।
(চলবে)

কয়েকটি ভয়ংকর রাত

 কয়েকটি ভয়ংকর রাত


 কয়েকটি ভয়ংকর রাত
সৌরভ হাসান

মিতু ইদানিং রাতে ঠিকমতো ঘুমুতে পারেনা। অদ্ভুত একটা ভয় কাজ করে সবসময় মিতুর ভেতরে। ভয়টা নিয়ে কারো সাথে আলোচনা পর্যন্ত করতে পারছেনা। যাকেই এই ঘটনা বলুক না কেন সবাই হেসে উড়িয়ে দিবে। কেউ মিতুর কথা বিশ্বাস করবেনা। নিজেকে কেমন পাগল পাগল লাগছে মিতুর কাছে।

কিছুদিন আগের ঘটনা।
মিতু ঘুমুচ্ছিলো। জানালার পাশেই সবসময় ঘুমায় মিতু। গরমে জানালা পুরোটা খুলে দিয়ে ঘুমুচ্ছিলো। হঠাৎ মিতু বুকে ভারী কিছুর উপস্থিতি লক্ষ করলো। একটা হিম শীতল হাত মিতুর বুক-পেটে দৌড়ে কি যেন খুঁজছে। মিতু ভেবেছিলো হয়তো এটা কোন দুঃস্বপ্ন। কোনরকম চোখ খুলে জানালা বন্ধ করে পানি পান করলো। সে রাতে আর ঘুমুতে পারেনি মিতু।

সেই রাতের পর প্রতি রাতেই মিতুর ঘুম ভাবে একটা অশরীরী হাতে স্পর্শে। যেটা মিতুর নাক থেকে ক্রমশই নিচে নামতে থাকে। ঘুম ভেঙে গেলে মিতু চিৎকার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কোনভাবেই হাতটা সরাতে পারেনা মিতু। যে কোন ধর্ষক ধর্ষণ করতে চাচ্ছে মিতুকে। মিতুর মুখ আটকে যায়। মিতুর মনে হয় ওর মুখ কেউ সুপার গ্লু দিয়ে আটকে দিয়েছে। কথা বলার শক্তি থাকেনা এতটুকুও। হাতটার মজা নেওয়া শেষ হলে হাতটা অদৃশ্য হয়ে যায়। বিছানায় লুটিয়ে পরে মিতুর ক্লান্ত শরীর।

যত দিন যাচ্ছিলো, হাতটার পরিধি ততই বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। এখন প্রতিরাতে হাতের সাথে একটা অস্পষ্ট মুখ ও শরীরের কিছুটা অংশ দেখা যায়। মিতু প্রতিরাতে শব্দহীন চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে জাগে।

প্রতিরাতে চেষ্টা না ঘুমিয়ে জেগে থাকতে। কিন্তু শরীর সেটা বুঝেনা। রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে মিতুও ঘুমিয়ে যায়। আবারও সেই দেহটা আসে। মিতুকে ভক্ষণ করতে চায়। মিতুর শরীর চায়। মিতু বুঝতে পারে, তার সাথে কি হতে চলছে। অথচ তার করার কিছুই থাকেনা।

এখন প্রতিরাতে মিতু ইচ্ছের বিরুদ্ধে জেগে থাকে। ঘুম আসার ভয়ে বিছানায় যায়না। সারারাত বারান্দায় বসে অথবা রুমে বসেই কাটিয়ে দেয়। যে রাতে ঘুমায় না  সে রাতে মিতুর ঘরে কিছু আসেনা। শুধু মাঝে মাঝে উঠানে একটা বিড়ালের ডাক শুনতে পায়। সাধারণ বিড়ালের ডাক নয়, অতীব ভয়ংকর সেই ঢাক। গা হিম হয়ে যায় মিতুর। নিশ্বাস ফেলতে কষ্ট হয়। পিপাসায় বুক ফেটে  যেতে চায়। ফ্রিজে রাখা বোতলের সবটুকু পানি যেন এক ঢোকে গিলে ফেলে।

মিতুর বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর থেকে মিতু একাই থাকে বাসায়। আত্মীয়-স্বজন তেমন নেই। ছিলো না কখনোই। তখন থেকেই একা থাকার অভ্যাস। পুরোনো জংলার পাশে এমন রাজপ্রাসাদ খুব কম আছে দেশে। তবুও মিতু সাহস করে একাই থাকে। কত কত ছেলে মিতুর পেছনে ঘুরঘুর করে। এসবে পাত্তা দেয়না ও।

এলাকার মানুষ তাকে বিয়ের কথা বললে সে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে হাঁটা শুরু করে। সে একা থাকতে চায়। খুব একা। অন্যকারো জীবনের সাথে নিজেকে জড়াতে চায়না।

গত কয়েকদিন ঘুমায়নি মিতু। তাই গতকাল রাতে চোখে যেন সুপার গ্লু লেগে গিয়েছিলো। কিছুতেই চোখ খুলে রাখতে পারেনি। তাই ঘুমিয়ে গেল শেষ পর্যন্ত। রাত গভীর হচ্ছে। অশরীরী সেই আত্মাটা এসেছে মিতুর ঘরে। না, আজ শরীরে হাত দেয়নি। মিতুকে ডাকতে লাগলো। তার গলার কণ্ঠটা এমন ভয়ংকর! মিতু একলাফে বিছানা থেকে উঠে গেল। চিৎকার মিশ্রিত শব্দ বেরুলো মুখ থেকে,
-কে কে! এখানে কে?
-শান্ত হও মিতু। আমি!
-আপনি কে?  কি চাই আমার কাছে?
আত্মাটা একটু একটু করে এগিয়ে আসছে মিতুর দিকে। মিতু লাফিয়ে নেমে গেল বিছানা থেকে। তখন আত্মাটা বলল,
-আমি তোমাকে চাই মিতু। শুধু তোমাকে চাই।
-দেখুন আমাকে ছেড়ে দিন। আমি আপনাকে ভয় পাচ্ছি খুব।
-কাছে এসো মিতু।
এটা বলেই আত্মাটা মিতুর দিকে এগিয়ে গিয়ে মিতুর গলায় হাত রাখলো। মিতু জ্ঞান হারালো।

পরেরদিন সকালে ঘুম ভাঙলো মিতুর। সারা শরীর ব্যথা। জ্বর এসে গেছে। কোনরকম কোঁকাতে কোঁকাতে ঘর থেকে বের হয়ে এলো মিতু। এই বাড়িতে আর থাকবে না সে। কোনদিন থাকবেনা। বাড়ি-ঘড় বিক্রি করে দিয়ে চলে যায় মিতু।

এই ঘটনার ১৫ বছর পার হয়ে গিয়েছে। মিতু এখন দুই বাচ্চার মা। বড় মেয়ে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। ছোটমেয়ে এখনো স্কুলে ভর্তি হয়নি। মাঝে মাঝেই ওরা ভূতের গল্প শুনতে চায়। মিতু খুব আগ্রহ ও কিছুটা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সেই গল্প বলে। বাচ্চারা আনন্দ পায়। মিতুর চোখে একই সাথে ভয় ও আনন্দের জল ঝরে।

হেমন্তগাঁথা

হেমন্তগাঁথা


হেমন্তগাঁথা
মুহাম্মদ তাফহীমুল ইসলাম

ছয় ঋতুর দেশ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। বছর ঘুরে শরতের পরই আগমন হয় হেমন্তের। হেমন্ত এক চমৎকার ঋতু। হেমন্তের সাথে অন্য কোন ঋতুর তুলনা হয়না। মাঠে-মাঠে যখন আমন ধান পাঁকতে শুরু করে মানুষের আর বুঝার বাকী থাকে না যে- হেমন্ত হাজির। মাঠের আমন ধান যখন পেঁকে সোনালী রঙ্গ ধারণ করে কৃষকের চোখে-মুখে ফোটে ওঠে হাসির প্রতীক। মনে বয়ে যায় খুশির বন্যা। দীর্ঘ কষ্টের ফসল যখন ঘরে আসে শুরু হয়ে যায় অপেক্ষাকৃত ব্যস্থতা। ছেলে-মেয়ে সবাই মিলে ধান মাড়ানোসহ বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত হয়ে যায় নিজ দায়িত্বে আনন্দের সাথে। রাত-দিন পরিশ্রম করে ব্যস্থতা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর খুশিতে গ্রহণ করে পারিবারিক বিভিন্ন কর্মসূচি। তার মধ্যে পিঠা বানানো অন্যতম। কৃষক বধু নিজ হাতে পিঠা বানিয়ে তুলে দেয় সন্তানদের মুখে। এরপরে সে পিঠা নিয়ে বেড়াতে যায় বাপের বাড়ি, মেয়ের শশুরবাড়িসহ নিকটাত্মীয়ের বাড়িতে। ঈদের সময় মানুষ যেভাবে ছুটে যায় আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে ঠিক তেমনি কৃষক পরিবার খুশিতে উদ্বেলিত হয়ে ছুটে যায় একে অপরের বাড়ি। তাদের পরিবারে ঈদটা যেন হেমন্তকালেই আসে।

মসজিদের মুয়াজ্জিনের সুমধুর কন্ঠে যখন ফজরের আযানের শব্দ ধ্বনিত হয়। গ্রামের ঘুমন্ত মানবকূল জেগে ওঠে। কনকনে শীত উপেক্ষা করে ঠান্ডা পানি দিয়ে অযু করে লুটিয়ে পড়ে সিজদায় প্রভুর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষনায়। নামাজ-কালাম শেষে খেজুর গাছে ঝুলানো রসের হাঁড়ি নামিয়ে আনে গ্রামের রস ব্যবসায়ী ছালামত আলী। যিনি এলাকায় রস আলী নামে পরিচিত। তিনি সব গাছের রস একতত্রিত করে যখন বিক্রির জন্য পাড়ায় পাড়ায় ছুটে গিয়ে ‘রস লাগিবুনা রস?’ (রস লাগবে রস?) বলে ডাক দেন। রস প্রেমিকরা ছুটে আসে কিনতে। মূহুর্তেই খালি হয়ে যায় রস আলীর রসের হাঁড়ি। হেমন্ত কালে রস দিয়ে পিঠা খেতে কার না ভালো লাগে!

সকাল বেলায় মাঠের সবুজ ঘাসে দেখা মিলে বিন্দু বিন্দু শিশির কণার। যার ছোঁয়া পেতে শিশুরা খালি পাঁয়ে হাটতে আনন্দবোধ করে। সাজ সকালে কুয়াশার চাদরে ঢাকা থাকে পুরো গ্রাম। মাঠে গেলে কুয়াশায় আবৃত থাকায় সবুজের দেখা মিলেনা। পুকুরের এক পাড় থেকে দেখা যায়না আরেক পাড়। বেলা বাড়ার সাথে সাথে কুয়াশা দূর হয় সূর্যের কিরণের কাছে পরাজিত হয়ে। রাতের বেলায় কনকনে শীত। চোখ বন্ধ করলেই চলে আসে ঘুম। আরামে ঘুমাতে কষ্ট হয়না মোটেও। এক ঘুমেই আলো ফোটে ফজর হয়। তোষক মুড়ে দিয়ে একটু একটু শীতকে অনুভব করতে ভালো লাগে সবার। যদিওবা বৃদ্ধ বয়সীদের একটু কষ্ট হয়। গাছে গাছে দেখা যায় নতুন পাতা। মাঝে মাঝে আকাশ পানে উড়ে যেতে দেখা যায় ঐক্যবদ্ধ অতিথি পাখির দলকে। যা শুধুমাত্র গ্রামেই দেখা যায়। শহরে উঁচু উঁচু দালানের ভিড়ে এসব কিছুর দেখা মিলে না। গ্রামে পুকুর, পাহাড়, সবুজ মাঠ, খাল-বিল, নদী কতো কিছুর সাথে পরিচিত হওয়া যায়। তাই শহরের বাসিন্দারা হেমন্দের সাথে তেমন পরিচিত না। হেমন্তের কথা বললে তারা চিনে না। তারা গুড়ের পানি দিয়ে পিঠা খেয়ে খেজুর রসের ঢেঁকুর তোলে। কিন্তু গ্রামের অধিবাসীকে হেমন্তের কথা বললে তারা সহজে চিনতে পারে- হেমন্ত কি।