ধারাবাহিক উপন্যাস : উর্মিলা নগরে থাকে : শেষ পর্ব


[গত সংখ্যার পর]
ভিড় ঠেলে টিএসসি-র দিকে এগোচ্ছি। ডিসেম্বরের এই শীতে ঘাম বের হচ্ছে। রাস্তায় উপচে পড়া ছাত্র-জনতা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছড়িয়ে গেছে। স্লোগানমুখর, ‘এরশাদ, তুই কবে যাবি?’
‘উমির্, ‘চিপপা লাইগাতো মইরাই যাইতাম।’ চামেলী আপা বললেন।
আমি বলি, ‘এমনি করেই এগোতে হবে। বেবী আপা ও শহীদ জননী টিএসসি-র মোড়ে অবস্থান নিয়েছেন।’
কবি নজরুলের মাজার পেরোতেই মনে হলো, কবি কী শুনতে পাচ্ছে জনতার উল্লাস? কবি ঘুমিও না। আমরা জেগে আছি।
ডা. মিলন স্তম্ভের কাছে আসতেই সাংবাদিক হারুন হাবীব বললেন, ‘উর্মি কতক্ষণ পর তুমি সবচেয়ে খুশি হবে।’
আমি বলি, ‘কেন, হারুন ভাই?’
‘স্বৈরাচার নাকি নিপাত যাচ্ছে?’
‘বলেন কী?’
‘হ্যাঁ। এ সংগ্রামে তুমি তো আলোচিত নারী।’
‘সংবাদে আপনার কলাম পড়লাম। রাষ্ট্রধর্ম বদলানোর কারণে দেশে মৌলবাদীদের উত্থান ঘটবে। বিষয়টি আমাকে নাড়া দিয়েছে।’
‘ধন্যবাদ। দেখো, অপেক্ষা করো।’
ঠিক এ সময় জনতার গগনবিদারী চিৎকার আর হুড়োহুড়িতে হারুন ভাই হারিয়ে গেলেন। চামেলী আপা আমার এক হাত শক্ত করে ধরে আছে। টিএসসি চত্বর থেকে মাইকে ঘোষিত হচ্ছে, ‘এইমাত্র দাঁতাল এরশাদ প্রধান বিচারপতির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। তিন দলের রূপরেখা অনুযায়ী নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আগামী তিন মাসের ভিতর নির্বাচন হবে। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।’
এখন আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। বেবী আপার কাছে পৌঁছানো অসম্ভব।
সেøাগানে সেøাগানে বন্যার মতো মিছিল যাচ্ছে।
‘উর্মি, সেইফ সাইডে দাঁড়াতে হবে নইলে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে যাবে।’ চামেলী আপা বলতে থাকেন।
কিন্তু কোথায় দাঁড়াব, ঢাকা শহরে এত লোক সেটা তো আগে জানতাম না। বুক ধড়ফড় করছে। একধরনের ভয় কাজ করতে থাকে। টিএসসি খোলা চত্বরে বক্তৃতা করছে ছাত্র নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক, এবং  সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা। হঠাৎ আমার মনে হলো, শহীদ জননীর শরীর খারাপ। আজকের দিনে কি তিনি থাকবেন না? ডা. মিলনস্তম্ভ ত্যাগ করতেই মনে হয়, ‘প্রিয়, শহীদ মিলন, আজ তোমার রক্তের জন্য এইসব।’
জনতার উন্মাতাল উল্লাসে সমগ্র ঢাকা শহর এখন মানুষের নগরী। মানুষের মনে এত ক্ষোভ জমা ছিল। নয় বছর স্বৈরশাসনের পর মানুষ যেন হাফ নিঃশ্বাস ফেলছে। এরপর মনে হলো, বক্তৃতা কেউ শুনছে না। মুহুর্মুহ করতালিতে মুখরিত যে নগরী সেখানে বাণী শোনার ধৈর্য কোথায়?
মঞ্চ থেকে ওরা অনেক দূরে। বেবী আপাকে দেখা যাচ্ছে না। কে কে বক্তৃতা করছে তাও বোঝার উপায় নেই। শুধু চামেলী আপা একবার বলল, ‘উর্মি ভুগ লাগছে তো?’
‘উপোস করুন।’
‘আমি তো আগে এত মানুষ দেখি নাই।’
জগন্নাথ হল মাঠে আতসবাজি ফুটছে। আকাশে আতশবাজির খেলা। বেবী আপা মাইক পেল রাত পৌনে দুটোয়। জনতার কণ্ঠ মেলানো আমি শুনতে পেলাম বেবী আপা নূর হোসেনসহ সকল শহীদের স্মরণ করছে। ওইটুকুই। বেবী আপার কণ্ঠ ধরে এগোতে গিয়ে ছাত্রদল নেতা খন্দকার বাবুল চৌধুরী, ছাত্রলীগ নেতা আবদুস সাত্তার টিংকুর দেখা পেলাম।
টিংকু ভাই বললেন, ‘উর্মিলা, আজকের দিনটি আমি তোমায় উৎসর্গ করলাম।’
আমি হেসে বলি, ‘কিছু করতে হবে না। দেশটার প্রতি মমতা রাখবেন।’
হঠাৎ মাইকে ঘোষিত হলো, ‘এই গণ-আন্দোলন একটি বাঁকের মধ্যে এসে বেগবান হয়েছে, সেই বাঁকের নাম, উর্মিলা পাল। আর শেষ হলো একজন নূর হোসেনের জন্য। নূর হোসেন নেই। উর্মিলা আছেন। এখন উর্মিলা পাল তার অনুভূতি জানাবেন।’
আমি লক্ষ করলাম সাংবাদিক কামাল লোহানী আমাকে ডাকছেন। পাশে কবি সুফিয়া কামাল। আমি মাইকের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমার হাত পা কাঁপছে। টিএসসি চত্বরে লাখো জনতা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। সেøাগানে সেøাগানে মুখরিত জনতা হঠাৎ করে নিথর হয়ে যায়। আমি একবার বেবী আপা, একবার কবি সুফিয়া কামালের দিকে তাকালাম। আমার মনে হতে লাগল, এক জনমে মানুষ এর বেশি কিছু চায় না।
‘আমি শুভপুরের উর্মিলা পাল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখিনি। আজ এ দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্রের জন্য যে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমি উর্মিলা পাল হয়ে গেলাম। তার আগে একাত্তরের শহীদদের স্মরণ করছি। স্মরণ করছি বসুনিয়া, নূর হোসেন, ডা: মিলনসহ গণতন্ত্রের লড়াকু মৃত্যুঞ্জয়ী শহীদদের। গণতন্ত্রের এ মুক্তির দিনে এ প্রত্যাশা রাখছি।  আর যারা দেশ চালাবেন, তারা যেন দেশ ও মাটির প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন। মনে রাখবেন, জননী-জন্মভূমি আক্রান্ত হলে এগিয়ে যেতে হয়। সন্তান হিসেবে এটাই আমাদের দায়িত্ব। আমি প্রতিজ্ঞা করছি। যতদিন বেঁচে থাকব ততোদিন এ ভূমির ফসল কাউকে লুণ্ঠণ করতে দেব না।’
চারদিক জনতার উল্লাসে আমি এখন মাইক ছেড়ে চলে এলাম। কবি সুফিয়া কামাল আমাকে জড়িয়ে ধরলেন গভীর মমতায়।
বেবী আপা একবার বলল, ‘উর্মি, তোর মতোন সন্তান জাতি উপহার পেয়েছে।’
আমি আবেগে কেঁদে ফেলি। রাত পৌনে তিনটার দিকে বেবী আপাকে নিয়ে আমি আর চামেলী আপা নজরুলের মাজার অতিক্রম করছি ঠিক তখনও মনে হলো, ‘কবিকে বলি, ঘুমিও না। আমরা জেগে  আছি। আর তুমি কেবলি কাস্তে শানানোর শব্দ শোনো।’
বেবী আপা একবার বলল, ‘উর্মি একটু চা খেলে ভালো লাগত।’
চামেলী আপা বলে, ‘ভুখে পেট পোড়ায়।’
শাহবাগের রাস্তায় চলছে নানান রকম বিজয় উৎসব। দেশাত্মকবোধক গান বাজছে মাইকে। ড্রাম আর খোল-করতালের দ্রিমিকি দ্রিমিকি শব্দ।
পিজি পেরোতেই বিচিন্তার মিনার মাহ্মুদের সঙ্গে দেখা।
বেবী আপাকে বললেন, ‘আপা, আমি দু’মিনিট উর্মিলা পালের সঙ্গে কথা বলি।’
‘বেবী আপা হেসে বলেন, আজকের দিনে তো ওর সঙ্গেই কথা বলবে।’
শেষ রাতে বেবী আপাকে ইন্দিরা রোড পৌঁছে দিয়ে যখন বাসায় ফিরলাম তখন ভোর হয়ে আসছে। চারদিকের মসজিদ থেকে আজান ভেসে আসছে, ‘কল্যাণের জন্য এসো।’ ডিসেম্বরের কনকনে শীতের এই ভোরবেলা অন্যরকম একটি সূর্যোদয় হবার আগেই আমি আর চামেলী আপা ঘুমিয়ে গেলাম।

যখন ঘুম ভাঙল তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। ক্লান্তিতে বিছানা ছাড়তে দেরি হলো। নিজেকে পরিপাটি করে  দুপুরের খাবার খেয়ে যখন কলেজে পৌঁছালাম তখন চারটা বেজে গেছে। কলেজজুড়ে উল্লাস চলছে। রিকশা থেকে নেমে গেট পেরুতেই সেøাগান এল, ‘উর্মিলা দিদি, এগিয়ে চলো আমরা আছি তোমার সাথে।’
আর কিছুই মনে নেই। কে আমাকে চ্যাংদোলা করে ডলি আপার রুমে নিয়ে গেল তা বোধগম্যের আগেই যেন কলেজ ক্যাম্পাস জনারণ্য হয়ে গেল।
ডলি আপা বলল, ‘ব্র্যাভো, উর্মিলা। তুমি আমাদের গর্ব।’
হই-হুল্লোড়ে কলেজ উড়ছে। ডলি আপার রুমের টিভিতে বারবার আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন স্পিস দিচ্ছেন। সবাই গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার করছেন। কোনোরূপ বিশৃঙ্খলা এড়াতে ছাত্র-জনতার প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছেন। ডলি আপার রুম থেকে বেড়িয়ে দেখি সন্ধ্যা নামছে। নানান ছাত্র সংগঠনের নেত্রীরা আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
ছাত্রলীগ নেত্রী সালমা দিদি আমার গলায় মালা পরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘উর্মি আজকের দিনটির জন্য এত রক্তপাত। এ মালাটা রক্তে চুবানো নয়। ভালোবাসায় সিক্ত।’
আমি বললাম, ‘সালমা দিদি, আমি রাজনীতি বুঝি না। ন্যায়-অন্যায় বুঝি।’
সালমা দিদি বলেন, ‘তাতেই চলবে। তুমি আমাদের স্বপ্নের তরীর কাপ্তান। পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছ।’ আমার চোখে জল এল।  শ্রাবণের ধারার মতো জল। কেন আমি জানি না। সালমা দিদি আমাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরেন।
কলেজ থেকে বের হতে রাত আটটা বেজে যায়। গেট পেরিয়ে যেতেই মনে হয় ওই চায়ের দোকানে দীপু ভাই দাঁড়িয়ে আছেন। একট্ ুএগিয়ে গেলে তড়িৎ এসে বলবেন, ‘দেবী ভেনাস, আপনার জন্য আমি  ট্রয়ের মাঠে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি। পড়েননি? কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন, ‘নিহত জনক আগামেনন কবরে শায়িত আজ।’
আমি রিকশায় নাখালপাড়ার দিকে এগিয়ে যেতেই মনে হয়, ‘প্রিয় দীপু ভাই, আপনার জন্য এক জীবন অপেক্ষা করা যায়। শুভপুরের উর্মিলা পাল অপেক্ষা করছে।’ 
[সমাপ্ত]

শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট