ধারাবাহিক উপন্যাস : জোসনা রাতে জাগে প্রাণ : পর্ব ০৭




জোসনারাতে  জাগে আমার প্রাণ
আবুল কালাম আজাদ

[গত সংখ্যার পর]
রাত সারে তিনটা। হুমায়ূন ফকির বলল, স্যার, আমরা কিন্তু শেষ প্রহরে প্রবেশ করেছি।
কেমনে বুঝলে?
দেখেন একটু একটু বাতাস বইতে শুরু করেছে। বাতাসে সামন্য শোঁ শোঁ শব্দ। আলোটা কেমন যেন ভৌতিক।
লেখক তো শেষ রাত সম্পর্কে এমন কথাই বলেছিলেন। তুমি তো লেখকের কোনো লেখা পড়ো নাই, অথচ তোমার কথা.......। বোঝা গেল, লেখকদের লেখার সবটা কল্পনা নয়।
অবশ্যই নয়, কল্পনাকে পুঁজি করে অত বড় লেখক হওয়া যায় না।
ইউ আর রাইট।
আরেকটা ইংরেজি শিখলাম।
শুধু তো জ্যোৎস্নাই দেখলাম, স্মৃতিতে গেঁথে রাখার মত বিশেষ কিছু করলাম না।
স্যার, আমরা অবসরে গান গাই। আমি গীতিকার, হাবিব সুরকার, আর জাফর গায়ক। ভাবের সময় তিনজনই এক সাথে গাই। স্যার, আজ ছাড়া জীবনে কোনোদিন জ্যোৎস্না নিয়া ভাবি নাই। অথচ অনেক আগেই জ্যোৎস্না নিয়া একটা গান বাঁধেছি। শুনবেন স্যার?
কেন শুনবো না? জাফর গা-তো গানটা।
জ্যোৎস্না মাখা চাঁন্দি রাইতে
আমার পরাণ করে আঁইঠাঁই
এই দুনিয়ায় আমি আবার
মানুষ হইতে চাই।।
মায়ের কোলে ছোট্ট শিশু চাঁন্দের পানে চেয়ে,
খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে
মা ওঠে গান গেয়ে-
আয় আয় চাঁদ মামা
টিপ দিয়ে যা
চাঁদের কপালে চাঁদ
টিপ দিয়ে যা।
মাগো একবার কোলে তুইলা নাও
চাঁন্দি রাইতে গান শুনাইয়া যাও
মাগো তুমি গান শুনাইয়া যাও
গান শুনাইয়া নতুন জনম দাও।
জ্যোৎস্না মাখা চাঁন্দি রাইতে
আমার পরাণ করে আঁইঠাঁই
এই দুনিয়ায় আমি আবার
মানুষ হইতে চাই।।
গানটা শুরু করেছিল জাফর। সে এক লাইন গাইতেই হাবীব আর হুমায়ূন তার সাথে কন্ঠ তুলল। তিন জনের কন্ঠ মিলল খুব। সুরটা খুবই দুঃখ ভেজা। মনের নিদারুন আকুতি যেন বেরিয়ে আসছে সুর হয়ে।
নিলয় আর অন্তর হাত তালি দিেেত গিয়েও থেমে গেল। কারণ, ওরা দেখল তাদের তিনজনের চোখেই পানি। কেউ যখন কাঁদছে তখন হাত তালি দেয়া ঠিক হবে না।
বাবা বললেন, তোমাদের মনের আকুতি আমি বুঝতে পেরেছি।
হুমায়ূন বলল, কী আকুতি বুঝলেন স্যার?
এই জীবন থেকে তোমরা মুক্তি চাও। তোমরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চাও।
জ্বি স্যার, কিন্তু সেটা আর আমাদের পক্ষে সম্ভব না। আমরা রাতের বেলা বনদস্যু। দিনের বেলা এলাকার সন্ত্রাসী। সাধারণ মানুষ আমাদের ভয় পায়। আর আমরা পুলিশের ভয়ে অস্থির থাকি। বিশ্বাস করেন স্যার, একটা ভিখারীর জীবন আমাদের কতটা টানে তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। বাকি জীবনটা যদি ভিখারী হয়েও কাটাতে পারতাম.......।
তোমাদের জন্য কিছু করতে পারলে আমার খুব ভাল লাগত। কিন্তু আমি খুব দূর্বল একজন মানুষ। অর্থ এবং ক্ষমতা দুই দিকেই দূর্বল। দূর্বল মানুষরা অন্যের জন্য তেমন কিছু করতে পারে না।
স্যার, ভোর হয়ে গেছে। আমরা এখন উঠবো। আপনারা কি আবার কখনো এখানে জ্যোৎস্না উপভোগ করতে আসবেন?
এখনই তা বলতে পারছি না। হয়তো আসবো।
স্যার, আগামি পূর্ণিমায় আবার আসেন। তখন বেশ শীত থাকবে। শীতের কুয়াশায় মোড়া জ্যোৎস্না দেখবেন স্যার। স্যার, ম্যাডামকেও নিয়ে আসবেন। যদি আমাদের বিশ্বাস করতে পারেন। স্যার....এই যে আপনার পা ছুঁয়ে.........।
আহ! আমি তোমাদের বিশ্বাস করেছি। তোমাদের অবিশ্বাস করার কিছুই নেই। আমি শুধু বিশ্বাস করি না এদেশের রাজনৈতিকদের। তারাই এ দেশটাকে যত ভাবে সম্ভব ডোবাচ্ছে। নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছে। আজ জিপিএ-৫ এর বন্য বয়ে যাচ্ছে। এও এক ধরনের ডোবানো। আজ ধর্মান্ধরা মাথা তুলে সুশিক্ষিতদের মাথায় কোপ হানছে। এও এক ধরনের ডোবানো। আজ আমাদের শিল্প-সাহিত্য-ইতিহাস-ঐতিহ্য-বিজ্ঞানচেতনা বিনষ্ট হচ্ছে। এও এক ধরনের ডোবানো।
স্যার, কুকুর মানুষকে কামড়ায় আবার প্রভূর জন্য জীবন দেয়। আমরা আপনার জন্য জীবন দিতে পারব।
আমি তোমাদের প্রভূ?
জ্বী স্যার, আপনি আমাদের জ্যোৎস্নায় বনপ্রকৃতি দেখা শিখিয়েছেন। আপনি আমাদের শিক্ষক।
আমি তোমাদের জ্যোৎস্না দেখা শেখালাম কিভাবে? আমি তো সব হুমায়ূন আহমেদের কথা বলেছি।
আমরা কি কোনোদিন তাঁর নাম জানতে পারতাম? স্যার, আবার....আর একবার.....।
অন্তর বলল, আমি মাকে বলবো আপনাদের কথা। আমি মাকে আনতে চেষ্টা করব।
হুমায়ূন দুই হাতে অন্তর আর নেহালকে বুকে জড়িয়ে ধরল।  

   (৮)
বাসায় ফেরার দুই দিনে একবারও মা কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
অন্তর নিজে থেকে কিছু বলবে কিনা তা বুঝতে পারছে না। কারণ মা’র মুখটা থমথমে। বাবা দিব্যি অফিস করছে।
দু’দিন পর অন্তর গেল বাবার ঘরে। কোনো গল্প-টল্প করতে নয়, একটা প্যারাগ্রাফ লেখার জন্য। এ্যা মুন লিট নাইট। একটি জ্যোৎস্না রাত। বাবা বলল, পুরো একটা জ্যোৎস্না রাত বনে কাটিয়ে, আমার কাছে এসেছিস এ্যা মুন লিট নাইট প্যারাগ্রাফ লিখতে?
ইংরেজিতে লিখতে হবে তো। আমি কি আর অত শব্দ জানি? গ্রামারেরও একটা ব্যাপার আছে।
আচ্ছা, তুই লিখে নিয়ে আয়। আমি ভুল-চুক ঠিক করে দিব।
অন্তর চলে যাচ্ছিল। বাবা বলল, আর শোন, তুই যে একটা গল্প শুরু করেছিলি সেটা দ্রুত শেষ কর। এখন থেকে নিয়ম করে কিছু কিছু লিখবি। পড়বি, দেখবি, শুনবি আর লিখবি। আমার খুব ইচ্ছে করছে যে লিখি, কিন্তু আমার দ্বারা সেটা হবে না। তুই লিখলে লেখক না হলেও লেখকের বাপ তো হতে পারব। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাবো।
অন্তরের ভেতর কিছুটা বিস্ময়। বাবা আমূল বদলে গেছে। ক’দিন আগেও যে মনে করতো, লেখক হওয়া মানে ফেসে যাওয়া, লাইফ ত্যাজপাতা হয়ে যাওয়া। যতবড় লেখক, জীবন ততবড় ত্যাজপাতা। আর এখন.....! বদলানো ভাল। মানুষ বদলায়। কিন্তু এরকম রাতারাতি এতটা বদলানো ভাল না।
তারপরও অন্তর কিছু না বলে নিঃশব্দে যাচ্ছিল, বাবা ডাকল, শোন....।
অন্তর থামল। থেমে পেছনে তাকাল। বাবা বলল, তোর মা কিছু জানতে চায়নি?
কী বিষয়ে?
এই যে আমরা পুরো একটা রাত বনে......।
না, কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
আশ্চার্য!
আমি কি নিজে থেকে কিছু বলবো, বাবা?
বলা উচিত। এত বড় একটা অভিজ্ঞতার কথা মাকে জানাবি না?
কিন্তু মা’র মুখটা কেমন থমথমে।
তাহলে একা একা বলতে যাসনে, আরাম পাবি না। দেখি সময় সুযোগ বুঝে দু’জন মিলে কথা বলবো।
সময়-সুযোগ খুঁজতে খুঁজতে চলে গেল আরও তিন দিন। সময় থাকলে মা তেমন সুযোগই দেয় না যে, কথাটা তোলা যায়।
শেষে বাবা রাতে খাবার খেতে বসে নিজেই কথাটা তুলল। তুলল একটু অন্যভাবে-মানে ইনডাইরেক্টলি। মা একটা তেলাপোকা দেখে চমকে উঠেছিল। বাবা বলল, সামান্য একটা তেলাপোকা দেখে এভাবে চমকে ওঠো, তোমার দিকে যদি কেউ গুলি ভরা পিস্তল তাক করে বলতো-এই মান্দারপুত, যা আছে বাইর কর, তখন কী করতে?
মাজেদা হি হি করে হেসে উঠল। মা বড় চোখ করে বাবার দিকে তাকাল। বলল, হঠাৎ পিস্তলের প্রশংগ কেন?
না এমনি। তুমি তেলাপোকা দেখে চমকে উঠলে কি না।
তেলাপোকার সাথে পিস্তলের সম্পর্ক থাকতে পারে না। আমার দিকে কে গুলি ভরা পিস্তল তাক করবে?
একটা এক্সাম্পল আর কি।
আমার মনে হয় অবশ্যই তোমার মিরকাত আলীর কাছে যাওয়া উচিত।
একটা মিথ্যা দশবার উচ্চারণ করলে সত্যের মত হয়ে যায়। তুমি যেভাবে আমাকে মানসিক রোগি বলছো তাতে অন্যরা শুনলে........।
তুমি স্বাভাবিক আচরণ করছো না।
আমি স্বাভাবিক আচরণ করছি। অস্বাভাবিক আচরণ করছো তুমি।
আমি?
হ্যাঁ তুমি, একটা পুরো মুন লিট নাইট আমরা বাপ-বেটা বনে কাটিয়ে এলাম। এ ব্যাপারে তুমি কিছু জানতে চাইলে না।
এ ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই।
আগ্রহ থাকাটা কি স্বাভাবিক নয়?
তুমি এখন আমাকে অস্বাভাবিক প্রমাণ করতে চাইছো?
আমি তা চাইছি না, তুমি নিজেই তা প্রমাণ করছো।
আমি প্রমাণ করছি?
অবশ্যই, মানুষ হল জগতের সবচেয়ে কিউরিয়াস প্রাণী।
অন্তর ফস করে বলে বসল, বাবা, কিউরিয়াস অর্থ কী?
মনে হচ্ছে তুই ইংরেজিতে উইক। এই পরিচিত শব্দটার অর্থ তোর জানা থাকার কথা। ভোকাবুলারি ইনক্রিজ করার চেষ্টা কর। প্রতিদিন ডিকশনারি থেকে বিশটা করে শব্দ পড়ে আমাকে জানাবি। খাওয়া শেষ হলে ডিকশনারি খুলে দেখে নিবি কিউরিয়াস অর্থ কী?
কিউরিয়াস অর্থ কি আগ্রহী বা অনুসন্ধিৎসু এরকম কিছু?
ঠিক আছে।
বাবা পূর্বের কথায় ফিরে গেল, যা বলছিলাম, মানুষ হল জগতের সবচেয়ে কিউরিয়াস প্রাণী। কিউরিয়াস বলেই মানুষ এতদূর আসতে পেরেছে, না হলে এখনও বাঁদর হয়েই ডালে ডালে ঝুলতো। আর মানুষের মধ্যে নারী জাতি হল অধিক কিউরিয়াস-বিশেষ করে স্বামী-সন্তানের ব্যাপারে। এতবড় একটা ঘটনা.......।
আমি অপার আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করছি, বলো তো তোমাদের জঙ্গলে মুন লিট নাইট কেমন কাটল?
চমৎকার একটা রাত কাটিয়েছি। এক কথায়, তুলনাহীন। যদি আমাকে কেউ প্রশ্ন করে, তোমার জীবনের স্মরণীয় রাত কোনটা? আমি নির্দিধায় এই রাতটার কথাই বলবো। তারখিটা আমি ডায়েরিতে টুকে রাখতে চেয়েছিলাম। পরে রাখিনি। ভেবে দেখলাম, এরকম একটা তারিখ যদি ডায়েরিতে টুকে রাখতে হয় তাহলে সেটা আবার স্মরণীয় হল কিভাবে। অন্তর তুই কি তারিখটা ডায়েরিতে টুকে রেখেছিস বাবা?
না রাখিনি। যদি কখনো স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়েও যায় তাও তারিখটা আমার মনে থাকবে। ধরো, আমি সব ভুলে গেছি। বাপের নাম, মায়ের নাম এমনকি নিজের নাম পর্যন্ত। তখন কেউ যদি আমাকে জিজ্ঞেস করে-আচ্ছা, তোমার মায়ের নামটা কী? আমি অবলিলায় বলে দেব এই তারিখটার কথা।
মা কড়া কন্ঠে বলল, তুইও তোর বাপের মত এক্সট্রা কথা বলতে শুরু করেছিস। তোকেও মিরকাত আলীর কাছে নিয়ে যাব। বাপের মত হবার চেষ্টা করবি না। বাপকা বেটা হবে এটা আমি বিশ্বাস করি না। ছেলেরা হবে মায়ের মত, আর মেয়েরা হবে বাপের মত। তুই-ই শুধু ব্যতিক্রম। বাপ নেউটা হয়েছিস। ভাগ্য ভাল যে, কোনো গুন্ডা-পান্ডা তোদের দেখেনি, তাহলে স্মরণীয় রাত না হয়ে মরণীয় রাত হয়ে যেত।
[ক্রমশ...]


শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট