বসন্তের আগমন...



বসন্তের আগমন
শেখ একেএম জাকারিয়া

‘দখিনা মলয়বায়ু
জুড়ায় এ প্রাণ
কাননে কুসুম কুঁড়ি
ছড়ায় সুঘ্রাণ,
কতসুখ কথকতা
গগনে ও পবনে
হৃদয় আকুল মম
এ বসন্ত বনে।’


কবিতায়  দক্ষিণভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালা অর্থাৎ স্বর্গীয় নন্দন কানন মলয়পর্বত থেকে আগত স্নিগ্ধ হিমলে বাতাস থেকে আভাস পাওয়া যায় ব¯ুÍপ্রকৃতিতে বসন্তের উপস্থিতির। সবাই বিদিত, বাংলা বছরের দিন সপ্তাহ ও মাসের বিবরণজ্ঞাপক তালিকা অর্থাৎ বর্ষপঞ্জি অনুসারে ফাল্গুন ও চৈত্র দু’মাস বসন্ত ঋতু। যার কালপর্ব ১৪ই ফেব্রুয়ারি থেকে ১৩ই এপ্রিল পর্যন্ত। বসন্ত ঋতু বাংলার ছয়টি ঋতুর শেষ ঋতু। যাকে ঋতুরাজ বসন্ত বলা হয়। বসন্ত ঋতুর আবির্ভাব ঘটে শীত ঋতু বিদায় নেবার পর এবং গ্রীষ্ম আসার পূর্বে। এ ঋতুর আগমনে প্রকৃতির বুকে রূপের উজ্জ্বলতা সৃষ্টি হয়, শীতের শুষ্কতায় বিবর্ণ প্রকৃতি ফিরে পায় প্রাণ, গাছে গাছে দেখা দেয় কচি পাতা। দক্ষিণা সমীরণ মাতিয়ে তোলে চারিদিক। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে গাছগাছড়া। প্রকৃতির সবকিছু নতুনরূপে সজ্জিত হয়। এ কারণেই বসন্তকে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতায় অভ্যর্থনা জানিয়েছেন অত্যন্ত সুন্দর ভাবে। তাঁর ভাষায়, আজি দখিন-দুয়ার খোলা/ এসো হে, এসো হে, এসো হে আমার বসন্ত এসো...। চন্তসূর্যের আকর্ষণে সমুদ্র ও নদনদীতে যেভাবে জলস্ফীতি বা জোয়ার দেখা দেয় ঠিক সেভাবেই বসন্তের আগমনে প্রকৃতি ও মানবমনে জেগে ওঠে আনন্দের জোয়ার। প্রকৃতির এমন তুলনাহীন সুন্দরতা আর মানবমনে ভালোলাগার এক বিমূর্ত উপলব্ধি জাগিয়ে তুলে  বসন্ত। তাই এ ঋতু সবার কাছে অতি প্রিয়। এ ঋতুতে  কর্কটক্ৰান্তি ও মকরকান্তি রেখার মধ্যবর্তী উষ্ণমন্ডলে অবস্থিত ভূভাগে অর্থাৎ গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলে উষ্ণতার মাত্রা বেড়ে যায়, কারণ এ সময়ে পৃথিবী সূর্যের দিকে ঝুঁকে থাকে। পৃথিবীর অনেক অঞ্চলে এ ঋতুতে ফুল ফুটে, বৃক্ষে নতুন পাতা গজায়, নতুন বৃক্ষের জন্ম হয়। এ সময় বেশির ভাগ পশুপাখির মধ্যে মিলন ঘটে ও বাচ্চার জন্ম হয়। আবার পৃথিবীর অনেক স্থানে এ সময় প্রচুর বৃষ্টিপাতও হয়। এর ফলে তরু ও লতাপাতা বেড়ে ওঠে, যা ফুল ও ফলের পরবর্তী বেড়ে ওঠায়  জরুরি ও তাৎপর্যবহ ভূমিকা রাখে। বসন্তে  প্রকৃতির সৌন্দর্যবৃদ্ধিতে কৃষ্ণচূড়া, চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা, মালতী, মাধবী, বকুল, পলাশ, শিমুল, অশোক, আকড়কাঁটা, হিমঝুরি, ইউক্যালিপটাস, রক্তকাঞ্চন, কুরচি, গাব, গামারি, গ্লিরিসিডিয়া, ঘোড়ানিম,
জংলীবাদাম, দেবদারু, নাগেশ্বর, পলকজুঁই , পাখিফুল , মণিমালা, মহুয়া, মাদার, মুচকুন্দ, শাল, ক্যামেলিয়াসহ নানা জাতের ফুল ফোটে। এ সময় আ¤্র মুকুলের সুবাসে ম-ম করে আমাদের চারপাশের পরিবেশ। এ রকম আগুন লাগা ফাগুনেই বৃক্ষশাখায় বসে অত্যন্ত কোমল ও মধুর কণ্ঠে প্রিয়তমাকে ডেকে ব্যাকুল হয় বসন্তের কোকিল।
আর এ বসন্ত ঋতুকে অভ্যর্থনা জানানোর প্রধান উপকরণই হচ্ছে ফুল।
পহেলা ফাল্গুনে বা বসন্তের প্রথম দিনে বাঙালি তরুণীরা বাসন্তী বা হলুদ রঙের শাড়ি পরে কেউ চুল বিনুনি করে আবার কেউ খোঁপা বেঁধে সতেজ ফুলের অলংকার পরে ঘুরতে বের হয়। তরুণীদের পাশাপাশি তরুণরাও সেদিন  বাসন্তী রঙের পোশাক পরে। প্রকৃতির ছোঁয়া নিতে তারাও বেরিয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে। বসন্তের প্রথমদিনে দেশের পার্ক ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো বাসন্তী বা হলুদ রংয়ের পোশাক পরা নারী-পুরুষ ও বিভিন্ন রংয়ের ফুলে রঙিন হয়ে ওঠে। অপরদিকে ফাল্গুন মাসে অমর একুশে গ্রন্থমেলা হওয়ার কারণে ঢাকার বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণও বসন্তের রংয়ে রঙিন হয়ে ওঠে। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, টিএসসি, শাহবাগ, চারুকলাসহ সমগ্র দেশে অসংখ্য শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী ও বুড়ো- বুড়িরা বসন্তে উৎসবে মেতে ওঠেন। বসন্ত মানেই সম্পূর্ণতা। বসন্ত মানেই নতুন প্রাণের গুঞ্জরণ। বৃক্ষের কচিপাতায় আলোর ঝিলিকের মতই বাঙালির মনেও জাগে সুখের দোলা। বাঙালি সমাজ জীবনে বসন্তের আগমন সংবাদ নিয়ে আসে “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি।” বসন্তেকালেই ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয়েছিল। বসন্তেই বাঙালি জাতি স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিল। বসন্ত এদেশে শুধুমাত্র প্রকৃতি ও মনের ভেতরে নয়, বাঙালির জাতীয় ইতিহাসেও বসন্ত আসে এক বিশেষ মহিমা নিয়ে। বসন্ত হয়ে ওঠেছে অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্যসাধারণ আনন্দনুষ্ঠান। বসন্তের প্রথম দিন যেন নবীন প্রবীণের এক প্রীতি সম্মিলন। এদিনে ফুল ছাড়াও একে অন্যের হাতে উপহার হিসেবে তুলে দেয় প্রিয় কোনও কবির কবিতার বই কিংবা ভালোবাসার গল্প-উপন্যাস। অসাম্প্রদায়িক উৎসবের রং ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। অনন্য এ ঋতুকে অভ্যর্থনা জানাতে প্রতিবছরই বসন্তের প্রথম দিনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিশেষ প্রস্তুতি নেয় বাংলাদেশের মানুষজন। সব মিলিয়ে বসন্তের আবেদন অপরিমেয় ও অমলিন। কালের ধারাবাহিকতায় ঋতুরাজ বসন্তের আবেদন আরও গভীর হয়েছে।  প্রকৃতির বেশভূষা মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে সার্থক হয়ে উঠেছে বসন্তের আগমন। একারণেই বসন্তের ছোঁয়ায় নিবৃত্ত মন গেয়ে ওঠে,
‘আহা আজি এ বসন্তে
কত ফুল ফোটে,
কত বাঁশি বাজে,
কত পাখি গায়।'


শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট