গয়নার নৌকা
গয়নার নৌকা
শফিক নহোর
অপ্র্যতাশিত ভাবে মুন্নির সঙ্গে আমার ফিজিক্যাল রিলিশিনশিপ গড়ে ওঠে। তার থেকে মুন্নি আমাকে খুন করার জন্য লোক ভাড়া করে। আমি ফেরারি আসামীর মত পালিয়ে বেড়াতে লাগলাম। ঘরের ছোট ছিদ্র দিয়ে আলো আসলেও ভয় করতো কেউ বুঝি আমাকে দেখে ফেলল। এই ভয়কে উপেক্ষা করে একদিন বৃষ্টিভেজা দুপুরে মুন্নি আতœহত্যা করেছে শুনে দৌড়ে গেলাম।
আমি তখন নানা বাড়ি থেকে লেখাপড়া করি। মুন্নি আমাকে ভয় দেখাত, আমাকে বিয়ে না করলে বড় মামার কাছে বিচার দেবে?’ আমার সামনে এসে এ কথা কখনো বলেনি। তবে সালমা আমাকে বলত, কিরে মুন্নিকে নাকি তুই বিয়ে করবি, আমার কাছে বল না সত্যি কথা।
আমি সালমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতাম।
এই তাকিয়ে থাকাটা অন্যায় কিছু না সুন্দর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় অনন্ত একশ বছর। ছুটির দিনে চরদুলাই বটগাছের নিচে বসে আছি। আমি গয়নার নৌকায় পাড় হবো। বাড়ি থেকে খবর এসেছে মায়ের শরীর ভালো না। বড় মামা আমাকে প্রায়ই বলে,
-সেলিম তোকে কিন্তু ডাক্তার হতে হবে।
আমি মামার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি; তালা ঝুলানো আমার মুখ থেকে কোন শব্দ বের হল না। মামার কথা শুনে আমার চেহারা ম্লান হয়ে যেত; আমি বাণিজ্যবিভাগ নিয়ে লেখাপড়া করছি, আমার দিন কাটে ডেবিট-কেডিট চুড়ান্ত হিসেব নিয়ে। ডাক্তার হবো কীভাবে? কি সব ভাবনা ভাবে মামা আল্লাই ভালো জানেন। সেদিন বাড়ি পাতালক শিশুর মত মামার সামনে থেকে সরে দাঁড়ালাম।
আমি যে টিনের ঘরে পড়তাম, সেই ঘরের জানাল ছিল না। নতুন ঘর টিন কেটে রেখেছে, জানালা লাগলোর জন্য সেই ফাঁকা জায়গায় শীতের দিনে পাটের বস্তা দিয়ে রেখে দিতাম। যাতে বাহির থেকে কুয়াশা ও ঠা-া বা-তাস না আসে। একদিন সেই খোলা জানালা দিয়ে মুন্নি আমার রুমে এসে মুখ আটকিয়ে ধরল, আমি চিৎকার করবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু মুখ দিয়ে কোন প্রকার শব্দ বের করতে পারছি না। আমার হাতে হালকা একটা কামড় দিয়ে চলে গেল। অথচ কিছুই বলল না। আমি ফিসফিস করে জানতে চাইলাম,
-এখানে কেন এসেছিস?
মুন্নি কোন কথা না বলে জানালার ফাঁকা দিয়ে বের হয়ে চলে গেল। সাপের মতো ওর পা নড়ছে, আমার শরীর কাঁপছে, যদি কেউ দেখে ফেলে তবে বেশি ভয় পেতাম মামা যদি কিছু বলে। সেটা আমি সহ্য করতে পারব না। আমার লেখা পড়ার খরচ যদি বন্ধ করে দেয়। এই ভাবনাটা আমাকে ব্যথিত করত, অসহায় করে তুলতো প্রায় সময়। নিজের না থাকলে পরের দিয়ে কিছু হয়না এাঁ মামা বাড়ি পড়তে না গেলে বুঝতে পারতাম না।
পরের দিন সন্ধ্যায় সালমা এসে বারান্দার সামনে দাঁড়িয়ে রইল। কিছু একটা বলতে চেয়ে আবার থেমে গেল। চলন্ত ট্রেন যেমন করে থেমে যায় ঠিক তেমন। মনে হচ্ছিল অনেক দ্রুত কিছু একটা বলকে বাস্তবে কিছুই বলছে না।
মুন্নি আমাকে বলল,
-তোর ব্যাকারণ বইখান দে। কাল সকালে দিয়ে দেবো।
-আমার বই নাই, আমি সালমার বই নিয়ে পড়ি।
মুন্নি কথা না বাড়িয়ে চলে গেল।
ছোট মামা বিলে কারেন্ট জাল পেতেছে। কৈ, পুটি মাছ পেয়ে কলপাড়ে মাছের বালতি থেকে পানি ঢেলে আবার নতুন পানি দিচ্ছে। আমি একটু এগিয়ে যেতেই সালমা আগ কেটে গিয়ে মুন্নীকে বলল,
-ভালোই তো চলছ, আমি সব জানি।
-জানিস ভালো কথা। সব জানিস তা আমাকে বলছিস কেন? তোর নাঙকে গিয়ে বল।
-খুব জ্বলছে তাই না। বই কিনে নিতে পারিস না।
-পারি কিনব না, তোর কোন সমস্যা? তুই আমার পেছনে লেগে কিছুই করতে পারবি না।
সেলিম, তোকে কোনদিন ও বিয়ে করবে না। ‘নদীর মাছ সাগরে পড়লে যা হয়।’
-এতো ভাব দেখাচ্ছিস কেন রে মাগি।
-তোর চেয়ে কি আমার চেহারা কম সুন্দর!
মুন্নী ও সালমার ধারালো ছুড়ির সেই কথাবান আমার কানের সদরদরজায় ঠকঠক কড়া নাড়তে শুরু করল।
মনোযোগ না দিয়ে বাহিরে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছি তখন রাজীব এসে বলল,
-ক্রিকেট খেলা শুরু হয়ে গেছে। তুই এখনো বসে আছিস। দ্রুত রেডি হয়ে নে।
মাঠ থেকে রাজীব আমাকে ডাকতে এসেছে। রাজীব অভিযোগ করে বললো,
-মাস্টারের ছেলে খেলতে দেবে না। ওরা না কি মাঠের পাশের জমিতে গম বুনছে, খেতের আইলে বল গিয়ে পড়লে। যে আনতে যাবে তার নাকি ঠ্যাঙ ভেঙে দেবে ?
-বলা সহজ, করা কঠিন। চামড়ার মুখে মানুষ কত কথা বলে। আজকাল কথা বলতে পারলেই মানুষ নিজেকে বীরবাহাদুর ভাবে।’ আসলে সমাজে যাদের কাছে এখন টাকা নেই তাদের কোন দাম নেই, চেয়ারম্যানের ছাওয়াল দলের অধিনায়ক। চল দেখি, কার ঠ্যাঙ কে ভাঙে? সময় হলে সবি বিড়াল হয়ে যাবে।
মাগরিবের আজান হচ্ছে খেলা শেষ। বাড়ি এসে কলপাড়ে হাতমুখ ধুচ্ছি তখন মুন্নি জগ ভরতে এসেছে, আমার পেছনে দাঁড়িয়ে। কোন কথা বলছে না। আমার শরীর ঘেঁসে টিউবওয়েলের হ্যান্ডেল ধরল, আমি বুঝতে পারছি না কি বলবো। আঁধার গাঢ় হতে লাগলো। জগ থেকে পানি নিয়ে হালকা ছিটিয়ে দ্রুত চলে গেল। বুকের ভেতর হাহাকার অনুভব করলাম।
নয় ছয় ভাবনা ভাবতেই সালমা চলে আসলো। ওর মুখের দিকে তাকাতেই জগতের মেঘ ওর মুখ জুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। মলিন চেহারা, ঠোঁটে হাসি নেই, সাপের মত ফুলে ফেপে থাকত সে স্বভাব এখন নেই। শান্ত অবুঝ বালিকার মত আমাকে বলল,
-এখন খুব খুশি হয়েছিস তাই না? আমি জানতাম তুই কিছুই বলবি না। তোর সাহস আছে? আমাকে আজ রাতে পালিয়ে নিয়ে যেতে।
কথা শুনে আমার কান গরম হয়ে গেল। গলা শুকিয়ে আসছে। আমি মাটির দিকে চেয়ে আছি, ছালমার চোখ বেয়ে অশ্রু মাটিতে গড়িয়ে পড়লো এই মহুর্তে ঠিক কি বলবো বুঝতে পারছি না। কাঁপা কণ্ঠে জিগ্যেস করলাম।
- তোর কি বিয়ে ঠিক হয়েছে?
- সেটা জেনে তোর কি? তুই তো একটা কাপুরুষ!
- মৃদু পায়ে সামনে এগিয়ে গেলাম। বড় মামি বলল,
-জানিস, কাল না ছালমার বিয়ে!
- আচ্ছা মামি মেয়েদের কি অল্প বয়সেই বিয়ে দিতে হয়।
- ধূর পাগল, মেয়ে মানুষ কি ঘরে তুলে রাখার জিনিস। ভালো ছেলেপক্ষ পেলেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিতে হয়। তুই এ সব বুঝবি না। বুঝিনা বলেই তো আমার মুখের সামনে সালমা কাপুরুষ বলতে পারে? মুন্নির স্মৃতি আমাকে ভীষণভাবে তাড়িত করে, আমাকে অস্থির করে ফেলে। কি এমন ভুল ছিল আমার। এতো তাড়াতাড়ি তার নিজস্ব একটা কালো অন্ধকার ভুবন হবে। তাকে আর কখনো দেখবো না। কথা বলতে পারব না। এই আপরাধবোধ আমাকে পাগল করে দেয়। ভেতরের কষ্টটা আমি কাউ বলতে পারি না। মুন্নি চলে যাবার পর থেকে ছোট মামি আমার সঙ্গে কথা বলে না। অথচ প্রতিদিন রাতে সে আমার জন্য খাবার টেবিলে রেখে যায়। আমি অশ্রুজলে সিক্ত হই। এই বেদনার করুন সুর আমার বুকের ভেতর মুন্নি বলে যে চিৎকার করে ওঠে। তা তো আমি কাউকে দেখাতে পারি না, বলতে পারি না। সেচ্ছায় অগ্নিদহনে নিজেকে জ¦ালিয়ে অন্তর আতœাশুদ্ধ করা গেলেও বেদনার ক্ষত নিজেরই রয়ে বেড়াতে হয় অনন্তকাল। মুন্নির স্মৃতির সঙ্গে অন্য কারো স্মৃতি আমার জীবনে যুক্ত হোক আমি চাই না। মুন্নি অসাধারণ রুমাল সেলাই করত, আমাকে বলেছিল, তোর নামের প্রথম অক্ষর আর আমার নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে রুমাল তৈরি করবো শেষ হলে তোকে দেবো! আজ হঠাত পুরনো আলমারি খুঁজতে গিয়ে সেই রুমাল পেলাম। একটি রুমাল এত ওজন হতে পারে আমি হাতে নিয়ে বেশিক্ষণ রাখতে পারিনি। চোখ ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল।
আজ সালমার বিয়ে গয়নার নৌকা ঘাটে চলে আসছে পাশের বাড়ির কে যেন সংবাদ দিয়ে গেল।
মামি আমাকে ডাকছে,
-জামাই নামাতে হবে। তোর বড় মামা এই অসময়ে বাজারে গেল কেন? দেখতো।
- আমি রুম থেকে বের হবো এমন সময় দেখি মুন্নি দাঁড়িয়ে আছে। আমি চিৎকার করে মামিকে ডাক দিলাম। মামি দেখে যাও মুন্নি বাড়ি ফিরে এসেছে।
তার পর আমার আর কিছুই মনে নেই, হেমায়েতপুর থেকে সাতাশবছর পর ফিরে এসে দেখি, পরিচিত মুখগুলো নেই। নেই সেই গয়নার নৌকা, আমার মানসিক সমস্যা হয়েছিল। আগের সেই স্মৃতি মনে করতে পারি না। তবে ভেতর থেকে কে যেন বলে ওঠে মুন্নী তোকে ভালোবাসতো খুব।
ঘটনাক্রমে মানুষ এবং আমুর একজীবন
ঘটনাক্রমে মানুষ এবং আমুর একজীবন
ইয়াকুব শাহরিয়ার
আমি একটি অবরুদ্ধ ঘোড়া কিংবা সাদা কবুতরের মতো। কথাটি কেনো বললাম তার একটু ঘোর থেকে যাক্। চালাক কিংবা ‘সমজদার’ পাঠকেরা সেটা বুঝে নিবেন নিজ দায়িত্বে। নিজেকে নিয়ে ইদানিং আমি যা-তা মন্তব্য করে ফেলছি। আগ-পিচ কিছুই ভাবছি না। যেমনটি ভাবেননি বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, আইনজ্ঞ ও ‘টকিস্ট’ জনাব মিরা হামিদ। মিরা একটি মেয়েলি নাম কিন্তু এখানে মি. মিরা একজন পুরুষ। টকিস্ট মানে টকশোতে যিনি নিয়মিত কথা বলে থাকেন। একবার দেশের নামকরা সব সাংবাদিকদের সামনে বলে উঠলেন ‘কিছু মানুষ ঘটনাক্রমে মানুষ হয়ে জন্মেছেন, হয়তো তার পশু হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু কোনো এক ঘটনার পটভূমিতে তিনি মানুষ হয়ে জন্মেছেন। বর্তমানে তার অবয়ব টিক মানুষের মতো। হতে পারে তার পেশাগত পরিচয় শিক্ষক, সাংবাদিক কিংবা ডাক্তার। কিন্তু সে মানুষ। তার হাত আছে। পা আছে। মাথা, মাথার চুল, বড় বড় গোঁফ, পাওয়ারফুল চশমা অনেক কিছুই আছে। আর এসব কারণেই সে মানুষ।’ মাথায় মগজের জায়গায় যদি ‘মানুষের বিষ্টা’ অথবা গোবর থাকে তাও সে মানুষ। মি. মিরা’র অনেক কথাই কানে এসেছিলো সেদিন, কিন্তু একটি কথা আমার কানে আজও বাজে। ‘মানুষ কখনো কখনো ঘটনাক্রমে মানুষ হয়ে জন্মায়।’
আমার মনে এসব দর্শন তত্ত্বের কথাবার্তা উদ্রেক হওয়ার কোনো কথা না। আমি সাধারণ একজন মানুষ। চৌহাট্টায় বসে থাকি। রিকশা গুনী। মানুষের হাটাহাটি দেখি। লেবু মিয়ার আদা-চিনি মিশ্রিত রং চা খাই। চায়ে হাল্কা লবণের ফ্লেভার থাকে। কুকুর দেখি। মাঝে মাঝে মানুষ দেখি। আমার দেখার শেষ নেই। দেখতে দেখতেই আমি ক্লান্ত প্রাণ এক। দার্শনিক চিন্তার সময় কোথায়? মাঝে মাঝে ভাবি বই পড়বো। কখনো ভাবি পত্রিকা পড়বো। কিছুই করা হয় না আমার। এই ভাবনা পর্যন্তই আটকে থাকে আমার ভাবনার জগত। আবার কখনো চিন্তা করি ‘মাস্টার সাহেব’ হয়ে যাই। পরক্ষণেই আবার এই চিন্তা থেকে বেড়িয়ে আসি। এ পেশায় যাওয়া যাবে না। এই পেশার অনেক ওজন। যাচ্ছে তাই মানুষ মাস্টারিতে গেলে পেশার ওজন কমে। তাই আমার মতো পাতলা মানুষ ভারী এ পেশায় যাওয়া যাবে না। যেমন-তেমন নীতি হীন বা লাজ লজ্জাহীন মানুষ এই পেশায় ঢুকেছে বলেই পেশাটার এমন দশা! নীতিনৈতিকতার স্খলন ঘটেছে মাতরাত্মকহারে, ছাত্ররা শিক্ষক পেটায়। তাই ভাবছি এই পেশায় যাওয়া যাবে না। আমি বরং চৌহাট্টাতেই বসে থাকি। এখানে বসে গান গাই, রিকশা গুনী। লেবু মিয়ার রং চা খাই।
হঠাৎ করে বিমানের স্পীডের মতো ধুম করে আমার সামনে এসে একটি রিকশা থামলো। রিকশাটির হুড তোলা ছিলো। রিক-াবী বাজারে দিক থেকে এসেছে। হুড ফেলে রিকশাতে থেকেই কুসুম বলছে ২৫ টাকা দাও। আমার কাছে টাকা আছে কিন্তু বললাম নাই। মন মরা হয়ে বসে আছি। ড্রাইভার মামা ২ শ’ টাকার নোট ভাংতি করে ৩০ টাকা রেখেছে। কুসুম এসেছে নবাব রোড থেকে। কুসুম আমার প্রেমিকা। আমাকে সে ভালোবাসে আবার বাসে না। আমিও তাকে ভালোবাসি আবার বাসি না। এসব কথার মানে হয় তো সাধারণ পাঠকরা বুঝবেন না। যারা বুঝেন তারা অস্বাধারণ পাঠক। ঊর্ধ্ব শ্রেণিক পাঠক হওয়ার জন্য তাঁদেরকে একটি বিশেষ সম্মাননা দেওয়া উচিৎ, তবে আমি দিতে পারবো না। কারণ আমার টাকা নাই। টাকা ছাড়া কি আর সম্মাননা দেওয়া যায়? আমার প্রথম এবং দ্বিতীয় সত্তা বলবে, সম্মানের প্রশ্নে টাকা কোনো কিছুতেই মেটার করে না। কিন্তু মি. মিরা হয়তো টাকাকে প্রাধান্য দেবেন। কারণ তিনি আইনজ্ঞ কিন্তু মিথ্যা ছাড়া আদালতে তার দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। তিনি বুদ্ধিজীবী তার মানে তিনি মিথ্যা কথা প্রায় বেশিরভাগ সময় শিল্প রূপ দিয়ে বলেন। তিনি টকিস্ট মানে টাকার বিনিময়ে কোনো একটি পারপাস তিনি সার্ভ করেন। স্বার্থ হাসিল করে টিভি টেলিভিশনে এসে জাতিকে ছাত্র বানিয়ে দক্ষ শিক্ষকের মতো তিনি নৈতিক কথাবার্তার আড়ালে অনৈতিকতার চাষবাস করেন। মি. মিরা’র মতো টাকা হলে আমি দক্ষ পাঠকদের পুরষ্কৃত করবো।
কুসুম আজ আর থাকবে না। আমার হাতে কিছু টাকা গুজে দিয়ে চলে যাবে। আমি তাকে যেতে দিবো না। কারণ সে আজ আমার পছন্দের নীল শাড়ি পড়েছে। হাতে নীল চুড়ি, খোঁপায় গাঁদাফুলের মালা। পায়ে কিছুটা হাই হিলের জুতা। আজ তাকে অসম্ভব সুন্দরী লাগছে। হাতে আল মাহমুদের সোনালী কাবিন। পড়েছে কি না সে কথা জানি না। এ যুগে এসে মেয়েরা বই নিয়ে হাটে ভাবতেও ভালো লাগে। কুসুম মি. মিরাকে পছন্দ করে না। কারণ বুদ্ধিজীবী টাইপের এই লোকটা আসলে বুদ্ধিজীবী না। খাটাশ। খাটাশ একটা গালি। বেতালা রকমের অপমানজনক ভদ্র গালি। আরো অনেক ভালো মানের গালি আছে কিন্তু সব গালি সবাইকে দেওয়া যায় না। যেমন ধরুন, কুকুর। কাউকে কুকুর গালি দিলে কুকুর জাত খুশি হয়। কিছু বলে না। কিন্তু মি. মিরা টাইপের খাটাশ প্রকৃতির ছদ্মবেশী লোকদের কুকুর গালি দিলে শহরের কুকুরগুলো আবার প্রতিবাদ করে উঠবে। বলবে, আমরা নিকৃষ্ট প্রাণি হতে পারি, কিন্তু কিছু কিছু মানুষের চেয়ে আমরা ভালো। তাদেরকে গালি দিতে চাইলে আমাদের সাথে তুলনা করতে পারবেন না।
কুসুম দাঁড়িয়ে আছে। আমি রিকশা মামাকে ডাক দিলাম। দু’জন উঠে বসলাম রিকশায়। হুড তুলতে চাইলাম কিন্তু কুসুম তুলতে দিলো না। আমাদের রিকশা ছুটে চললো দাড়িয়ার পাড়ার ছোট গলি হয়ে ক্বীনব্রিজের দিকে। সেখানে সুরমাপাড়ে বসে সুরমার গোলা পানিতে দেখবো তথাকথিত স্বচ্ছ মানুষদের নোংরা চেহারা। কুসুম তখন গপাগপ পুচকা গিলতে থাকবে। আমি মনের বেখেয়ালি হয়ে চটপটি খেতে থাকবো। কারণ, আমি মনে করি পুচকা মেয়েলি খাবার আর চটপটি পুরুষালি। অনেক কিছুরই কারণ থাকে না। আমরা এই ভাবনারও কোনো কারণ নেই।
সুনামগঞ্জ
শব্দমালা : শোভন মণ্ডল
শব্দমালা
শোভন মণ্ডল
শূন্য এ বুকে...
যত এগোই জীবনের দিকে
মৃত্যু ছায়া ফেলে পায়ের নিচে
যতই আলোর দিকে মুখ করে থাকি
অন্ধ করে দিতে চায় এই প্রিয় চোখ
আমাদের চলা আসলে হেঁটে যাওয়া হোঁচট খেতে খেতে
বিছানো লাল-নীল মার্বেল পাথরে ঘষে নেওয়া এ শরীর
ঝলমল করে, সারা জীবন ধরে
কোথাও কি আঁচল ভরে গেছে উপহারে?
কোথাও কি মুঠোর মধ্যে ধরা আছে স্নেহ আর ভালবাসাখানি?
এ প্রশ্ন করতেই হবে
যতই এগিয়ে যাই মৃত্যুর দিকে
জীবন আলিঙ্গন করে শূন্য এ বুকে
শরীর
ঘামের বিন্দুগুলো বুকের আনাচে লুকোয়
দেখেছি আদর-বেলায়
শুধু এক প্রেমের আখ্যানে আরও কিছু বাকি থাকে দেহ
মন্ত্রের মত নিটোল সন্দেহ
চোখের ঘেরাটোপে মেঘ নামে
পুরনো জানালায় পর্দা ওড়ে হাওয়ায়
সে সব তো অছিলার মত মেলা থাকে সাজ
ব-দ্বীপে সাজিয়ে রাখা চর
আর ছোট ছোট লতা-গুল্ম-গাছ
উড়িয়ে দেওয়া যায় সব
সবই তো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যায়
এই মাত্র পাখির পালক উড়তে উড়তে নেমে এল ঝিলে
জলে কোনও সত্যিকারের ছায়া নেই
সবটাই মায়া বলে মনে হয়
এক এক দিন শুধু ঘুমিয়ে থাকে মন
মনে হয় এভাবে কেটে গেলে বেলা
আমাদের আর হেরে যাওয়ার গল্প থাকবে না
ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেবো কষ্টের পালক
শুধু মায়াগুলো উড়ে যাবে আকাশ গঙ্গায়...
ইপেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ২১৬
তারুণ্যের শিল্প সরোবর । ধানশালিক। বর্ষ ৮ম ।। সংখ্যা ২১৬
শুক্রবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ১২ পৌষ ১৪৩১, ২৫ জমাদিউল সানী ১৪৪৫ ।
সৈয়দ শামসুল হকের রচিত কবিতা
সৈয়দ শামসুল হকের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৭ শে ডিসেম্বর। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা কুড়িগ্রামে। আট ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিলেন সৈয়দ হক। ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয় সৈয়দ শামসুল হক ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
একেই বুঝি মানুষ বলে
নষ্ট জলে পা ধুয়েছো এখন উপায় কি?
আচ্ছাদিত বুকের বোঁটা চুমোয় কেটেছি।
কথার কোলে ইচ্ছেগুলো বাৎসায়নের রতি,
মানে এবং অন্য মানে দুটোই জেনেছি।
নষ্ট জলে ধুইয়ে দেবে কখন আমার গা,
তোমার দিকে হাঁটবে কখন আমার দুটো পা?
সেই দিকে মন পড়েই আছে, দিন তো হলো শেষ;
তোমার মধ্যে পবিত্রতার একটি মহাদেশ
এবং এক জলের ধারা দেখতে পেয়েছি-
একেই বুঝি মানুষ বলে, ভালোবেসেছি।
তুমিই শুধু তুমি
তোমার দেহে লতিয়ে ওঠা ঘন সবুজ শাড়ি।
কপালে ওই টকটকে লাল টিপ।
আমি কি আর তোমাকে ছেড়ে
কোথাও যেতে পারি?
তুমি আমার পতাকা, আমার কৃষির বদ্বীপ।
করতলের স্বপ্ন-আমন ধানের গন্ধ তুমি
তুমি আমার চিত্রকলার তুলি।
পদ্য লেখার ছন্দ তুমি−সকল শব্দভূমি।
সন্তানের মুখে প্রথম বুলি।
বুকে তোমার দুধের নদী সংখ্যা তেরো শত।
পাহাড় থেকে সমতলে যে নামি-
নতুন চরের মতো তোমার চিবুক জাগ্রত−
তুমি আমার, প্রেমে তোমার আমি।
এমন তুমি রেখেছ ঘিরে−এমন করে সব-
যেদিকে যাই-তুমিই শুধু-তুমি!
অন্ধকারেও নিঃশ্বাসে পাই তোমার অনুভব,
ভোরের প্রথম আলোতেও তো তুমি!
এপিটাফ
আমি কে তা নাইবা জানলে।
আমাকে মনে রাখবার দরকার কি আছে?
আমাকে মনে রাখবার?
বরং মনে রেখো নকল দাঁতের পাটি,
সন্ধ্যার চলচ্চিত্র আর জন্মহর জেলি।
আমি এসেছি, দেখেছি, কিন্তু জয় করতে পারিনি।
যে কোনো কাকতাড়–য়ার আন্দোলনে,
পথিক, বাংলায় যদি জন্ম তোমার,
আমার দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাবে।