পদাবলি



দুঃসময়
চন্দনকৃষ্ণ পাল

মাটির প্রদীপ ছিলো খুব কাছে, আজ তার শরীরে ধুলো
প্রদীপের স্থানে আজ মোমবাতি
দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে এই বুঝি প্রজ্জ্বলন হলো
এই বুঝি আলোতে মাখামাখি হয়ে গেলো সব তৈজস!

জ্বলে কই? জ্বালানোর দায় নিয়ে যে আজ এসেছিলো গৃহে
সে দেখো বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাওয়া চাখে
শহুরে তালের টেকে গ্রামীণ শব্দ খুঁজে ফিরে
কচুরীপানার ঝোঁপে ডাহুকের চলা ফেরা দেখে
আর দেখে বহুতল ভবনের আকাশ ছোঁয়ার নেশা...

স্বপ্নের সাইনবোর্ড জ্বলে নেভে এরে ওরে আহবান করে
সেও সেই আলোকেই ভালোবেসে সন্ধ্যে কাটায়
মোমবাতি অন্ধকারে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে দেখে
মানুষের জ্ঞানহীন কা-কারখানা
তার চোখে জল নেই, থাকলে দুঁ’ফোটা দিতো ভূমিকেই,
স্বাক্ষী হতো সাথে তার দুঃসময়ের।

একশত বিলিয়ন নিউরনের কসম
শাহীন মাহমুদ

কার্বন যৌগ বলেই খালাস
কাঠ-কয়লা বোঝাতে চাইলে নিশ্চয় ?
কোটি কোটি নিউরনে তুমি ভেসে গেলে
এই অযাচিত বিস্মরণে তুমি প্রজাপতিকে সাপ
আর সাপকে  নির্মোহ প্রাণ বলে দিব্যি চালিয়ে দিতে চাইলে
আসলে তুমি ও কি সেই জাতের পাগল?
নিউরনের গহীনে আঁক মায়া নামক এক নর্দমার তৈলচিত্র
হীরার উলটো পিঠে ভুলের মাশুলে কাঠকয়লায় পোড়াও
একশত বিলিয়ন নিউরনের কসম ।
তুমি বেঁচে থাকো আজকালকার সম্মেলক স্মৃতিঘরে
লোভ, মোহ আর মায়ায় থোড়াই নিকুচি করি ।
তবে তাই হোক; রয়ে যাক তোমার সেই নৈতিক অসুখ
এসো তবে অযৌন প্রক্রিয়ায় বংশ বিস্তার করি
তোমার মতো আমিও মানুষ হতে চাই
তোমার মতো আমিও মুক্তজীবি প্রাণী হতে চাই ।

ভালোই তো আছি
রেবেকা ইসলাম

বেশতো ভালোই আছি,
বখাটে মেঘের সাথে সন্ধি করে
আঁচলটা মেলে দেই নির্দ্বিধায়,
কুঁকড়ে যায় কুন্দনের দস্যি কাজগুলো,
যৌবনের ভাঁজে ভাঁজে তখন ভেজা বিকেল....
আজকাল কষ্টের নিশিন্দা তিতা
আমায় করে না অস্থির,
স্বপ্নভূক কীটের আক্রমণে হইনা ধুন্ধুমার
দীর্ঘশ্বাসের ট্রেন চলে যায়,যাক না
আমার এক হাতে হেমলকের পেয়ালা
অন্য হাতে শত পঙ্ক্তির বেণী
তারপর শ্লথের গতিতে নেমে আসে রাত
নাগেশ^রের থোকায় থোকায়
ঝুলন্ত বারান্দার পাঁজরে,
ভালোই তো আছি কবিতাপুরে।


দিন শেষে...
শাহমুব জুয়েল

১. কোন এক প্রাণবন্ত ক্ষনে জ্ঞানের দড়ি ধরে পারাপার, ভেজা ঘাসের উপর অপুষ্ট তরুণ ছিলাম;
তাই নজর লাগেনি কারো দু’ একজন এলেও বাদামের খোসার মত রয়ে গেছে দূর্বাঘাসে; আড়ালে
অভাবী কিন্তু ইনোসেন্ট ওতে কী আর জীবন বাঁচে; সেদিন বড্ড কষ্ট হতো, নেহাত অসহায় ভেবে...

২. দু’নম্বরী বন্ধুর পাল্লায় পড়ে পার করেছি যুগলের ব্যাগ কখনো নদী, কখনো রেল কখনোবা ফুসকা
স্টফেজ সব সালারই গার্লফ্রেন্ড আছে, আমার ভয়েস আছে গেলাশে গেলাশে কষ্ট ঢালি,
ললিত প্রান্তে বন্ধু নাকি শিয়াল- কুকুর হজম করি অজান্তে...

৩. গুরু ছিলো বৃক্ষ সমান, আদর করতো নিজ সন্তান শিখাতো নীতির কাঠি, জ্বলতো শুধু পরান
কবিতাই আমায় খেলো, কে যেন এগিয়ে এলো অভাবের কবিতার সম্মুখে প্রেমের কবিতা গেলো
শরীরে এলো বিরহের চুম্বন, এবার বুঝি হৃদয় দহন চারটি সিঁড়ি হলো মেঘনাসম, লাগে ঝড় পবন...

৪. দুপরের খানা খেয়ে যুগেছে হিশেব, আমি টিউটর সাব- মস্ত দিন শেষে জিবিকার সন্ধানে অঙ্গন ত্যাগ
ওহ কী দু:সহ সময় কেটেছে যেন ঘন মেঘ, চায়ের বাগান হাওড় বাওড়, স্বপ্নময়নদী পড়ন্ত বিকেল শেষে
বিরহ কাটেনি তখনো, প্রথমপাঠের গ্রাসে অজানা ডট থেকে একটা স্বর এসে, দুটো পাঠক মিলে গেলো-
গ্রন্থাগারের পাশে...


আশা নিরাশার ঢেউ
সাইয়্যিদ মঞ্জু

মহাজনের সিন্দুকে নিবসন
বাড়ি ভিটার পুরানো তকসিমনামা
জননীর বালাহীন দু’হাত, দুলহীন কর্ণদ্বয়
নাকের ছেদিত ছিদ্রে নিঃসঙ্গ নাকফুল
তবুও হয় না কিছু
অস্থির পিতার প্রবোধদায়ী হস্ত স্বজনের দিকে।

পসরা সাজিয়ে বসে আছে সওদাগর
সোনার হরিণের অদৃশ্য হাটে,
কড়ির ঝুলি নিয়ে হাজির বিদ্যাওয়ালা ক্রেতা
লেনাদেনা শেষে,আশা নিরাশার ঢেউ
অতঃপর ঘর অভিমুখে ক্লান্ত যুবক।

আগেরমত ঘুরে না যেন সময়ের কাঁটা
পরিমিতকাল অপেক্ষা আর অপেক্ষা
বুঝি না এই আমি
সত্যি কি কিছু হয়!


শর্তহীন শর্ত
সাঈদ সাহেদুল ইসলাম

যতদিন
তুমি রবে না শর্তহীন
ততদিন
আমার সবকিছু অর্থহীন।

যদি না এই শর্ত মানো,
আমার বাঁচা কঠিন হবে
কী ভবিষ্যৎ বর্তমানও।

যতবার
দাবি করেছি অধিকার
ততবার
ভেবেছি তুমি নদী কার?

তুমি আমার যদি হবে,
তোমার শর্তে কেঁদে কেন
আমার দুচোখ নদী হবে?

পাগলের কোনো ধর্ম নেই
যাহিদ সুবহান

মানসিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে মানুষ
আমরা সবাই যাকে পাগল বলে সজ্ঞায়িত করি
পাগল অন্যের ঘরে আগুন দিতে জানে না
পাগল ধর্মের জন্য করে না কারো শিরচ্ছেদ
পাগল তার চোখ দিয়ে শুধু মানুষ দেখে
পাগল জানে ধরণীর সব মানুষই মানুষ
পাগল জানে না সব ধার্মিকই মানুষ নয়
পাগল জানে না মানুষ আর ধার্মিক ভিন্ন
পাগল জানেনা ধার্মিকও অমানুষ হতে পারে
পাগল তো পাগলই আমাদের চোখে
পাগল ঈশ্বরকেও মানুষ ভাবতে পারে
পাগলের কোনো ধর্ম নেই পৃথিবীতে
পাগলের কোনো ধর্ম থাকতে নেই ...   

নিথীথের গল্প
সাজ্জাক হোসেন শিহাব

আমি জেগে থাকি একা কীর্তনখোলাতে
উালাফালা চোখে দেখি নদীর আকুতি!
নিথীথের গল্প শুনি শো শো আওয়াজ !
বিষণœ রজনী একা একা কাঁদে হায়
বুক চিরে বের করে বেদনা গল্প ।
আতœাহীন নগরীতে কিসের কৈতর
আসে অবেলায় ! ফরফর করে
এনদ্বীপে ! একা বার্তা আসে জীবনের-
যে বার্তা কেউ ডিকোড করেনা কখনো ।

জুতার তলা খোয়ানো মানুষ
মোহাম্মদ অংকন

পথ-ঘাট চেনা; তবুও মাঝে মাঝে হোঁচট খাই, পড়ে যাই, ঘুরে দাঁড়াই। জুতা জোড়া হাতে নিয়ে চোখ মেলতেই যা দেখতে পাই; সে কথা ভাবতেই আমার একটা দীর্ঘকাল কেঁটে যায়।

প্রতিদিন তাঁজা গোলাপ ছিড়ে এনে ফিওে নিয়ে ডায়েরীর ভাজে লুকিয়ে রাখা কতটা বিষাদের; তা শুধু জুতার তলা খোয়ানো মানুষগুলোই অনুধাবন করতে পারে।

পথ-ঘাট চেনা; শুধু চিনতে দেরি হয় জানালার পাশে বসে থাকার মনীর মনটাকে; সে একবারও চেয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করেনা- কোন সে পথিকতার জন্য জুতার তলা ক্ষয় করছে!


কষ্ট-ব্যর্থতা-বেদনা সীমাহীন
সিরাজ অনির্বাণ

অবিরাম নির্বাক কান্না হৃদয় করে ক্ষত বিক্ষত
অতীত-এ্যালবামে স্বপ্ন-কণা রেখে অজানায় চলে যায়
বিশ্বাসী হস্ত-পদ-নাসিকা-বদন আর মায়াবী কণ্ঠস্বর।

প্রাথমিক পুষ্পানুভূতিগুলো ধরে রাখার প্রত্যাশায়
জোড়া-মন চোখে স্বপন মেখে ডুব দেয় সময়-হাওড়ে
পানকৌড়ির মতো টুকে টুকে খুঁজে নিতে আবেগের কণা।

বিসর্জনের পরে যখন ফিরে আসে শ্রান্ত হয়ে মলিন মুখে
ফিরে আসে ব্যর্থ জীবন একমুঠো নীলিমা বুকে করে
বাস্তবতার রাজপথে তখন বেজে ওঠে বিরহীবংশী
একমুঠো বিষাক্ত-বাতাস এসে নিভিয়ে দেয় সংগ্রামী প্রদীপ
অন্ধকারে ভেতরে বসে কাঁদে রক্তাক্ত বেদনার দল।

সোনালি দিনের শেষে মৌনতা ঘিরে ধরে মুখরিত চারদিক
পূর্বাকাশের সূর্যটা বলে দেয়-
সত্যিকার ভালোবাসায় কষ্ট-ব্যর্থতা-বেদনা সীমাহীন।


ব্যয়বহুল কথার মলাটবন্ধি
শহিদুল আলীম

হে মাননীয় সাংসদবৃন্দ,
হে মাননীয় মন্ত্রীপরিষদ,
আপনারা সুরক্ষিত সংসদে দাড়িয়ে যখন কথা বলেন
মিনিটের লক্ষ-লক্ষ টাকার ব্যয়ভার আমরাই বহন করি
এ-ভাবে হাজার কোটি টাকার কথা জমা হতে হতে-
দামি অফসেট পেপারের মোটা যে বইটির
আপনারাই নাম রেখেছেন, পবিত্র সংবিধান
আমরা আমজনতা,
তার ভিতরের জমানো কথার ক’টা কথা আমরা জানি!
এতো সাধনার এতো ব্যয়বহুল কথাগুলোর ক’টা কথা আপনারা মানেন?
তার একটা হিসেব হোক।
আজ অরক্ষিত রাজপথে তপ্ত রোদে দাড়িয়েÑ
বৃষ্টিতে ভিজে হিসেব চাইতে এসেছি বিনা খরচে!
আপনাদের খরুচে-কথার, অপব্যয়ের হিসেব নাইবা দিলেন!
দয়া করে বিনামূল্যের কথার উপর জলকামান ছুড়বেন না...


কবিতা আর লিখব না
আবু আফজাল সালেহ

কবিতা আর লিখব না!
কবিতা লিখতে বোলো না আমার।
মানচিত্র ছিঁড়ে খেতে চায় শকুনেরা!
দেশপ্রেম নেই আজ; শুধুই কাগজে-কলমে।
নিজ স্বার্থের কাছে বিকিয়েছি তা!

কবিতার শব্দগুলো আসে না এখন
বিমুখ কবিতাগুলো দলছুট হরিণের ন্যায়।
আমরা সবাই রঙিন চশমা পরে-
তাই কবিতার শব্দগুলো আসে না ঠিকমতো।
কবিতাগুলো চিল্লিয়ে বলে- ওহে কবি
রঙিন চশমা খুলে রাখুন-
নাহলে আমি পালালাম




মগ্ন চৈতন্যে
সুমি সৈয়দা

এসো এসো নহলী
           মগ্ন চৈতন্যে লুট করি রোদ্দুর

আত্মার নিভৃতে পুড়ুক
রোহিনী বিনিন্দিত প্রেম

হে নীলাম্বু যৌবন
                পান করি প্লাবনের মালকোষ

অচেনা অনুভূতি হারাক
লুন্ঠিত মজনুন ভালোবাসায়।

দেয়াল প্রেমিক
বিটুল দেব

দেয়ালের শব্দফুলে দারুণ সুবাস। কালোফুলের বিন্যাসে মুগ্ধ চিত্ত পাঠে, ডুবে যাই রূপরেখার মায়ায়। মনে ধরে, দেখতে প্রতিভাবানের আলো। হায়... কবি! প্রথম আঁকিবুকির দেয়াল। হয়ে যায়... শব্দের দেয়াল প্রেমিক। মাঝে মাঝে হতভম্ব, এমন বিচিত্র আনন্দ আয়োজনে।
নরোম করতল স্পর্শের চেয়ে হাজারগুণ আমোদের আকর্ষণ। সুরার পেয়ালা নিয়ে মনোহরণীর আপ্যায়িত চোখ আর মনচুরি হাসির স্বর। লিওনার্দো হার মানতো যদি দেখতো দেয়ালের কারুকাজ।
 

শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট