হৃদবাসিনী



হৃদবাসিনী
আল-আমীন আপেল

১.
নিশিকে বিদায় জানিয়ে প্রভাত ডেকে এনেছে চিরযৌবনা সূর্যটা। সূর্যকরোজ্জ্বল এইপ্রভাতে গোমড়ামুখো হয়ে ঘরের পাঁচিলে পিঠ ঠেকিয়ে আছে রিমি। যে চঞ্চল দুহিতা অবকাশের দিবাভাগে সচরাচর মায়ের অভিনিবিষ্ট সহকর্মী হিশেবে রান্নাঘরে অবস্থান করে, সে আজকে অনাবিষ্ট হয়ে আছে; ব্যাপার কি? সৌমিকের সাথে গোলমাল হয় নি তো! নাহ, সৌমিক তো ন’টার আগে বিছানা ছাড়তেই নারাজ। এ হতচ্ছাড়াটাকে নিয়ে হয়েছে যত দিকদারি! নানা, দাদা, বাপ- কারো জীনে এমন আলসেমির অভ্যেস আছে বলে শুনি নি; এটা হয়েছে একেবারে উল্টো! জাতে অজাত!
‘জিতুও ছোটবেলায় অমন করত, আর ওর মা ইচ্ছে মতোন বকা দিত; প্রাকটিসে আসতে দেরি হত, তাই প্রায়শ ওর গন্ডদেশে আমাদের ‘শ্রদ্ধেয় গুরু’-এর পাঁচ আঙ্গুলি আল্পনা আঁকত। আহ! কি ফিলিংস হত মাইরি!’
‘দ্যাখো কান্ড! মানুষে কষ্ট পেত আর শিমু কেমন মজা নিত! কোন জাতের মেয়ে মানুষ গো তুমি, জোয়ান একটা ছেলে মাইর খাইত আর তুমি ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে নিশ্চুপার মহা-ভূমিকা পালন করতে!’
‘ইচ্ছে করেই করতাম, ভালো লাগত। সে ভালো লাগার মজা তুমি কি বুঝবে! বুঝবে না।
এই যাহ! রিমির কথা ভুলেই বসেছি; নাকি পিরিয়ডের সময় হয়েছে? নাহ, সে তো দিন দশেক বাকি, চেহারাও তো সে কথা বলছে না। হলো কি মেয়েটার? নাকি সুমন রাস্তায় একা পেয়ে... ছি: নিজের মেয়ের সম্পর্কে কি সব নোংরা কল্পনা প্রসব করছি!
‘তবে জিতু কিন্তু জোস ছিল; লম্বায়, চেহারায়। উফ! শরীরটা কেমন টানত ওর দিকে। ছি: ভাববে না আমি চরিত্রহীনা ছিলাম। শরীরটা টানত, বলতে: নাচের প্রাকটিসের সময় মনে হত, ওর সাথে যদি প্রাকটিস করতে পারতাম! কিন্তু সে কপাল হয় নি কোনোদিন। ও অনিমার সাথে নাচত। এক্সপ্রেশনের চে’ ঢের এক্সপ্রেশন দিত অনিমা। দেখেই গা জ্বলত!’
‘দিদি, এই প্রসঙ্গ পাল্টাও; ভাল্লাগছে না!’
‘ওকে, প্রসঙ্গ চেঞ্জ; এখন বলো চা দেবো এক কাপ?’
‘দাও দিদি, টিভিটা অন করে দিও প্লিজ, রাজনীতির একটু খোঁজ নেই।’
‘ধ্যাত! তোমার রাজনীতি, ভাল্লাগে নাহ! জাস্ট থ্রি মিনিট ওয়েট করো, চা চলে আসবে। আর তোমার বামহাতের কাছে হাত দাও, দ্যাখো, রিমোটটা তোমার দিকে চেয়ে আছে।’
‘তোমাকে ধন্যযোগ, পেয়েছি দিদি।’
আল্লাহর দুনিয়ায় এই কিসিমের মানুষও আছে? কেমন বেহায়া রে বাপু! স্বামীর এত টাকা এরপরও অন্যের ঘরে চা খোঁজে!

সত্যি বলতে কি, এই বেআক্কেলি কাজগুলো সইতে সইতে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। গুরুর যেমন চায়ের কাপে চুমুর সাথে মাঝেমধ্যে সিগারেটে টান দেয়ার অভ্যেস ছিল; একটা সময় মনে হত, ঠিক’ই আছে, ছেলে মানুষ দু’এক টান দিতেই পারে। এ নিয়ে রাজনীতি করার কিচ্ছু নাই!
২.
‘মা, তুমি আসলেই খারাপ! তোমাকে সেইদিন কতবার বললাম: চলো কুড়িগ্রাম যাই, সৈয়দ শামসুল হককে দেখে আসি; নাহ! তোমার কান অবধি গেল’ই না কথা; বেগম রোকেয়া ভার্সিটিতে গতবার আসলো, তখনো নিয়ে গেলে না।’
‘সকাল  সকাল এতো চিল্লাস ক্যান? আচ্ছা, যাবো এবার, প্রমিজ।’
‘রাখো তোমার প্রমিজ! এবার গিয়ে তো তাঁর কবর দেখতে হবে!’
‘কবর..! হায় আল্লাহ! বলিস কি! তিনি মারা গেছেন?’
‘তুমি তো আছো তোমার পরানের দিদিকে নিয়ে, জানবে কেমনে? খবরে দেখলাম।’
আসলে আমি একটা খারাপ মানুষ! না মা হিশেবে, না স্ত্রী হিশেবে- কোনো দিক দিয়েই উপযুক্ত নই আমি।
‘বলিস কি রিমি? ক্যামনে কি! বুঝলাম না!’
দিদির চোখে জল টলমল করছে। কেঁদে দিবে- এমন একটা ভাব; ভাব না, সত্যি জল গড়িয়ে পড়ছে, আমারও। দু’বার তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম, কোনো ছবি তোলা হয় নাই, তাঁর সাথে। ইস! মেয়েটার এই ইচ্ছেটাও পূরণ করতে পেলাম না। দিদি, আমি আর রিমির পছন্দের কবি ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক।
মেয়েটা কাঁদছে, কাঁদুক। কাঁদলে মন হালকা হয়। ওকে ডিস্টার্ব না করাই ভালো এখন।
৩.
বরফগলা সকাল। কঠিন শীত নেমেছে এবার। জানালা খুললেই মেলে থাকা চোখের দৃষ্টিকে আলিঙ্গন করে শাপলাচত্বর, শাপলা সিনেমা হল, এতটা কাছে। সেটাও দেখা যাচ্ছে না আজ।
রিমি কলেজে গেছে, কারমাইকেল কলেজে; যেটাকে বাবার দেশের লোকেরা ‘লালবাগ গরুহাটী কলেজ’ বলত। অবশ্যি যে ভুল বলত, তা কিন্তু নয়! কলেজের পাঁচিল ঘেঁসে হাট; রবিবার, বুধবার- হাটবার। আনিসুল হকের ‘লাল পিরান’ নাটকেও এ হাটের নাম আছে, শুনেছিলাম মনে কয়।

আর ছেলেটা রংপুর মেডিকেল কলেজে পড়ছে, এবার চান্স পেল। এমন ভাগ্য খুব কম বাচ্চাদের হয় যে, নিজের  জেলাতেই পড়ার, বিশেষ করে মেডিকেলের ক্ষেত্রে। সে খেয়ালে ছেলেটার আমার কপাল ভালোই!
‘স্বামী তো কাজ আর কাজ! স্ত্রীকে ছুঁয়ে দ্যাখারও ইচ্ছে হয় না! জিতুকে কত ছুঁতে চাইতাম, ব্যাটার কত্ত দেমাক! আমারে ছোঁয়ই না।’
‘হুম, এই কথাটা তুমি ঠিক বলছ; আমি তোমার ভাইকে কত্ত চান্স দিতাম কলেজ পড়ার সময়, চান্স নিত না। কত পহেলা বোশেখে, কত আগুনঝরা পহেলা ফাগুনে- আমার যতœ নিয়ে সাজা রূপচর্চা বৃথা গ্যাছে! সব সময় বলত- বিয়ের পর। এখন অবশ্য আদরই করে। থাক, বেশি না বলি; বললে আবার তোমার মনে আগুন লাগবে!
‘বাহ! তুমি ভালোই..
‘চুপ পাজি!
‘হুম, ঠিক বলছ; থাক, চুপ মারলাম। দেখো দেখি কান্ড! শীতে বাচ্চাগুলি যে ক্যামনে বাহিরে গেল!
‘ঠিক, ওদের মতো বয়সে আমিও কত দুরন্তপনা দেখিয়েছি!
‘তুমি বসো, আমি কফি বানাই, কি বলো?
‘আচ্ছা, রোজ এভাবে জ্বালাই, কিছু মনে করো নাকি?
‘ধুর, তুমি আমার দিদি না! কি মনে করব আবার! তুমি বসত চুপটি করে, আমি আসছি।’
‘দেখলেন তো কি পরিমাণ মিথ্যে বলতে পারি আমি, ভিতরে ভিতরে ইরিটেড হই আর মুখে বলি ভালো কথা। আসলে কেনো বলি, সেটা ক্লিয়ার করা দরকার। এই যে ভদ্রমহিলা - যার স্বামী গত দু’মাস আগে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। অথচ তিনি গত পরশু-ও বললেন তার স্বামী নাকি তার জন্য কত কি কিনে এনেছেন; আসলে তো..
ডাক্তার বলেছেন: ওনার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে। প্রচন্ড মানসিক চাপে, কষ্টে তার এ অবস্থা হচ্ছে; এমন পরিস্থিতিতে তার মনের বিপরীতে কিছু করা বা বলা-দুটোই খারাপ ফল বয়ে আনতে পারে।
‘মানুষটাকে, পর করে দেবার কারণ তাই খুঁজে পাই না!
‘এই যা! কফি তো পুড়ে যাচ্ছে মনে হয়! নাহ, পোড়ে নি; আর একটু দেরি হলেই সব নষ্ট হত।
৪.
আচ্ছা, শীতের রাত এত লম্বা হয় কেন! বিচ্ছিরি লাগছে। শরীরটা কেমন পোড়াচ্ছে! অথচ বৈবাহিক বন্ধনসূত্রে পাওয়া স্বামীটা সেটা কিছুতেই বুঝতে পারে না; পাশ ফিরে শুয়ে আছে। প্রথম প্রথম অবশ্য রেসপন্স দিত ভালোই, নইলে রিমি আর সৌমিকে আমদানি কেমনে করলাম!
কেনো জানি সৈয়দ শামসুল হকের ঐ কবিতাটা মনে পড়ছে, ঐ যে-
‘আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,
ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়,’
জীবনের সাথে যেন মিলে গেছে কবিতাটা। কলেজে থাকতে আমি এই একটি কবিতাই যে কতবার আবৃত্তি করেছি; তার হিশেব কষা কঠিন। এই কবিতাই, এখন আমার জীবনের জাতীয় সঙ্গীত। হায় রে দুনিয়া! কল্পনা কেমনে বাস্তব হয়! তাহলে কল্পনা করা কি পাপ? যার ফল বয়ে বেড়াতে হয় চিরকাল! তবে সব কল্পনা বাস্তব হলে, আমার কাচ্চা-বাচ্চারা তাদের দাদি-দাদার মুখও দেখতে পেত।
আচ্ছা, জিতু এখন কি করে, কোথায়, কেমন আছে? অনিমার সাথে কি বিয়ে হয়েছে ওর- আমার আধমরা মনে এর কোনো উত্তর নেই।
প্রথম যেদিন ডান্স ক্লাবে জিতু আমাকে দেখল, কেমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল ও। সে ভাষা আমি বুঝতাম না, কেবলেই মনে হলো- এই তো একটা মুখ, এইতো একজোড়া ঠোঁট, যে ঠোঁটে আমি নিশ্চিন্তে চুমু আঁকতে পারি।
জীবনে একজোড়া ঠোঁটেই চুমু আঁকতে হয়, দ্বিতীয় জোড়ায় চুমু আঁকা মানেই চরিত্রহীনতা? যদি ভাগ্যরেখার হেরফের হয়! দ্বিতীয় জোড়ায় ঠোঁট রাখতেই হয়; তা হলেও কি ‘চরিত্রহীনতা’ ?
৫.
‘না, আমার ইশারায় সাড়া দেয় নি জিতু, অনিমাকে ভালোবেসেছে ও।’
‘ধুর, তুমি আবার সে ছেলের কথা মনে করে চোখ ভেজাও? তুমি একটা ম্যাড! এসব করতে হয় না রে পাগলি, স্বামীকে কাছে টানার চেষ্টা করো, আরো বেশি ভালোবাসো।’
‘হুম, তাই তো করি দিদি। আজ চলো, তাজহাট রাজবাড়ি যাই, সেই বিয়ের পর একবার গিয়েছিলাম; আর যাওয়া হয় না!’
‘হা হা! তোমার মাথা গ্যাছে। এজ কত হইছে, সে খেয়াল আছে! কত বড়ো বড়ো দুই সন্তানের মা হইছ আর শখ করছ তাজহাট যাবা!’
‘তাতে কি হইছে, আজব!
‘তুমি সত্যি যাবে?
‘নাহ, যাব না। এবার চুপ যাও, প্লিজ।’
দ্যাখেন কান্ড! কেউ বলবেন এই মহিলা অসুস্থ! যেকোনো সময় যে পাগল হয়ে যেতে পারে! আল্লাহ মালুম, কি আছে তার কপালে। চল্লিশ বছর বয়সের ছাপ পড়েছে তার চোখের নিচে, গালে, চুলে। সে খেয়াল তার রাখার ফুসরতই নেই যেন!
‘দিদি, চলো হাঁটতে হাঁটতে কলেজের দিক যাই। কতদিন যাই না!’
সিম্পল ঘটনাকে প্যাঁচিয়ে ‘কাহিনী’ না বানিয়ে,  রাজি হয়ে গেলাম। সৌমিক মেডিকেলে আর রিমি প্রাইভেট পড়তে গেছে লালবাগের দিকে। ও- কে না হয় ডেকে নেয়া যাবে আড্ডায়।
হাঁটছি, আমি আর দিদি; মানে সাবিনা ভাবি-যাকে দিদি বলতেই ভালো লাগে আমার। চোখগুলো কেমন জ্বলজ্বল করছে দিদির! বাহ! ভালো লাগছে বোধ হয়, আমারো বেশ লাগছে।
‘আচ্ছা, তোমার জীবনটা এমন হলো ক্যান?’
‘ক্যামনটা লাগে! শালীর কাজ নাই, খালি আমার পাস্ট-হিস্টোরি ঘাটাঘাটি!
রাগটাকে দমিয়ে রেখে, মুখে বললাম: দিদি, রবির দোকানের চা’টা দারুণ। চা খেয়ে, কলেজের দিক হাঁটতে হাঁটতে বলব।
৬.
সেদিন আর বলা হয় নি। বলেই বা কি হত! যা হবার তা তো হয়েই গেল। তবে এটা যে হবে, তা কল্পনাও করি নি। কারণ, রিমি আর সৌমিক কত বড়ো হয়েছে, ওদের দিকে তাকিয়ে হলেও এটা অসম্ভব। কার মুখে কি শুনল, নাকি সাবিনা ভাবি কিছু বললো; বুঝতে পারলাম না।
বাড়িতেই রেখে গিয়েছি, টিভি দেখছিল। ছেলেমেয়ে দু’টো তাদের জায়গায়- কলেজে, মেডিকেল।  আধা-ঘন্টা খানিকের মাথায় লালবাগ থেকে বাজার করে, ঘরে ঢুকেছি-
‘তুই চরিত্রহীনা, তোর জিতুর সাথে সম্পর্ক ছিল। তোকে আমি তালাক দিলাম- এক তালাক, দুই তালাক, তিন তালাক...’
‘চুপ করো, রিমির বাবা চুপ করো। কি বলো এসব!
খরচের ব্যাগটা হাত থেকে ফ্লোরে, সদ্য কেনা আলু-শিম-টমেটোগুলো প্রচন্ড ঝাঁকুনি পেল, ব্যাগের ভিতরে।
পায়ে পড়ে কত কান্নাকাটি করেছি, হাত জোড় করেছি, শোনে নি সেদিন। যেই মানুষটার জন্যি বাপ-মা ছেড়ে আছি, সে এটা কিভাবে বললো!
৭.
বাবা সেই বার ইলেকশন করছেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান’ পদের জন্যি।
সে উপলক্ষে আমাদের গ্রামে নাট্যদল, নৃত্যশিল্পী আনলেন বাবা। রোজ সন্ধ্যেবেলা যারা নাচ-গানে মাতায় গ্রামের মানুষদের; জায়গায় জায়গায় নির্বাচনী প্রচারণার অনুষ্ঠানের পর বাড়িতে ফেরা মানুষদের জন্য বাড়তি আনন্দ। নৃত্যশিল্পী হিশেবে এসেছিল ‘আখতারুল’ নামে একজন।
‘এল’ প্যাটার্নের আধাপাকা প্রকান্ড বাড়ি। দুপুরবেলা, বাবা প্রচারণায় বেরিয়েছেন, মা-ও বেরিয়েছে বাবার সাথে। নাট্যদলের সবই একটু বাজারের দিক গেছে। বাড়িতে ভোলার মা, আমি আর সেই আখতারুল।
পড়ন্ত বিকেল। বাড়িটা এখন অনেকটা সুনসান।
আমার পাশের ঘরটাতেই ভাতঘুম দিয়েছে আখতারুল। আমার মাথায় আবার কি যে ভূত চেপেছে, নাচ শিখব। ভাবলাম, জেগে আছে কিনা দেখি, নিজের ইচ্ছের কথা বলি তাকে।
নির্ভয়ে ঘরে ঢুকলাম, আস্তে আস্তে। দেখি, শুয়ে আছে। তার মাথার কাছে বসলাম। বাহ! কি মায়াভরা মুখটা! কত স্মার্টভাবে কথা বলে, কি সুন্দর নাচে! গতকাল স্কুল মাঠে প্রাকটিস করার সময় দেখেছি। 
আমি দুষ্টামি করে টেবিলে রাখা পানির গ্লাসটা থেকে পানি নিয়ে, আখতারুলের মুখে ছুড়লাম, একটু; ভয়ে চমকে উঠল সে!
ভাগ্যিস ভোলার মা বাড়ির পিছনের পুকুরপাড়ের দিক ছিল! আখতারুল চিৎকার করতে যাবে- অমনি আমি তার মুখ চেপে ধরলাম। জীবনে প্রথম কোনো পুরুষেকে ছুঁইলাম। সে উঠে বসতে চেষ্টা করলো; হাত সরিয়ে নিলাম আমি, তার মুখ থেকে। চলে আসব- ঠিক, ঐ সময় হাতটা আস্তে করে চেপে ধরল আখতারুল। লজ্জা লাগছে ভীষণ!
তারপর.... নাচ শেখানোর নাম করে, দরজা বন্ধ করে..
আর বলতে পাচ্ছি না! কারণ, জীবনের প্রথম ভালো লাগার পুরুষ এই রকম স্মৃতি উপহার দিবে, ভাবি নি। হ্যাঁ, বলতে পারেন চিৎকার কেন করি নি? চিৎকার করার সুযোগ কি ছিল? চিৎকার করতে চেয়েছিলাম, আমার গলা টিপে ধরেছিল। বুকটা তছনছ করে দিয়েছে সেদিন, ইচ্ছে মতো হাত চালাচ্ছিল বুকে। দম বন্ধ হবার উপক্রম...
এ ঘটনার একমাত্র সাক্ষী ভোলার মা। ও তো চিৎকার করতেও পাচ্ছে না! লোক জানাজানি হলে এ বংশের মান শেষ হবে- এই ভয়ে। এই ভোলার মায়েই আমাকে স্কুল নিয়ে যাওয়া-আসা করত। কত আদর করত!
ভোলার মা কোনো মতে ঘরে ঢুকতেই, আখতারুল নিজেকে সামলে বেরিয়ে পড়লো ঘর থেকে।
‘ঐ খানকির ব্যাটা, কই যাস! খাড়া!
‘না, ভোলার মা তাকে ধরতে পারে নি তাকে, পালিয়েছে।
আশপাশে লোকেদের বাড়ি নেই বললে চলে, আছে কিছু দূরে দূরে। আমাদের বাড়ির আশপাশে খালি পুকুর আর বাঁশঝাড়। বাড়ির পাশে বিশাল বাঁশঝাড়, এটা গিয়ে লেগেছে স্কুলের পাশের রাস্তায়; কোনো মতে বাঁশঝাড় পেরুতে পারলেই- পগার পার! কে চেনে!  চিনলেও ভাববে, বোধ হয় বিড়ি খেতে যাচ্ছে বাজারে।
ছেড়া কামিজটা লুকিয়ে ফেলা, জঘন্য লীলার ঘরটাকে ঠিক করে রাখা, সব কাজ করেছে ভোলার মা। আমার ঘরের বিছানায় আমাকে শুয়ে দিল সে। আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। বুকটা কেমন জ্বলছে, চিরে গ্যাছে দু এক জায়গায়, মনে হয়। ভোলার মা চোখ মুছতে মুছতে ঘর ছেড়ে বের হলো।
সন্ধ্যে হয়ে আসছে। বাবা মা ফিরলেন। জানোয়ারটা সত্যি পালিয়েছে।
ভোলার মা, আমার মাকে ফিসফিসিয়ে বললো: ভাবি, বেটির মনে হয় স্রাব হইচে, পোথথোম পোথথোম তো! জ্বলা-যনতোনা কইরবার ধচ্চিল। মুই অসুদ আনি খিলি দিচো। শুতি আচে, উয়ার কাচে যাবার দরকার নাই।
আমি ঘুমের ভান করে সব শুনছি, কাঁথার নিচ থেকে।
‘আচ্ছা, তুই তাহলে ওর সাথেই থাকিস রাতে, খেয়াল রাখিস। কিছুক্ষণ পর আমরা দক্ষিণপাড়ায় যাব, তোর সাহেবও যাবেন। ফিরতে ফিরতে অনেক রাত।’
বাবা ব্যস্ত থাকায় খেয়াল করেন নি; বাবা অস্থির তার গুণধর ভাড়াটে নৃত্যশিল্পীর জন্যি। বিরোধীদলের চেলাদের হুমকির মুখেই কি আখতারুল পালিয়েছে? -এমনটাই ভাবছে সবাই। বাবা বললেন: আমার খাসা দুই হাজার টাকা গেল রে!
বাবা সেইবার হেরে গেলেন। বাবা ভেঙে পড়েছেন। বড়ো ভাইয়েরা ইংল্যান্ডে, দেশে যে আসবে সে সুযোগ সহজে হয় না।
‘বাবা আর যেন নির্বাচন করতে না দ্যাখি আপনাকে; কি দিয়েছে নির্বাচন: ফোনে রাগ নিয়ে বললো কথাগুলো, ভাইয়েরা।
রাগে জ্বলছি আমিও, এই রাগে আমি কেমন করে শীতল হই! এই একটা কারণে সবাই আমাকে ভয় পায়, সেটা হলো- জেদ। জেদ চাপলে কারো সাধ্য ছিল না আমাকে আটকায়। ভাইদের বলে দিলাম: ক্লাশ এইট, এই গ্রামে পড়ছি না আমি! রংপুরে পড়ব। স্ট্রেটকার্ট বললাম কিন্তু! নো চান্স টু চেঞ্জ ইট।
৮.
কেরানিপাড়া। শীতের সকাল। মিষ্টি রোদ, ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাকে।
‘হন্নে হয়ে খুঁজলাম আখতারুলকে, পেলামও দু’মাস খুঁজে; পাবলিক লাইব্রেরির মাঠে। কিন্তু না চেনার ভান করলো সে।’
‘বলো কি দিদি! আখতার ভাই তোমাকে চিনল না?’
‘না, আমাকে দেখে যেন আকাশ থেকে মাটিতে পড়ল। আমিও ছাড়ার পাত্রী নই, উচ্চ মাধ্যমিক অবধি পড়ার পাশাপাশি ডান্স শিখলাম। হ্যাঁ, ওরই ডান্স ক্লাবে। জীবনের প্রথম পছন্দের পুরুষকে ‘স্বামী’ হিশেবে পেতে কার না ইচ্ছে থাকে! আমারো ছিল।’
‘দিদি, তুমি পারোও বৈকি! পরে কি তুমি বিয়ে করে নিলে?’
‘হুম, তবে বাবা মা কেউ রাজি ছিলেন না, ভাইয়েরাও না। আর সে-ও তো অনেক টালটি-বালটি করছে, তাই তো জিতুর সাথে মিশতে চেয়েছিলাম; ও-কে ক্ষ্যাপানোর জন্য, দেখানোর জন্য। কেরানিপাড়ায় মামা বাসায় থেকেই উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেছি, অনার্স ভর্তি হয়ে বিয়ে।’
‘তাহলে মামাই তো সব খরচ চালাত তাই না? মামী কেমন?
‘আজ্ঞে, না জনাবা; আমি তিনটে টিউশনি করাতাম, সে সময়ে। তিনটে মিলে তিনশ টাকা পেতাম; নিজের যৎসামান্য প্রসাধনী, টুকিটাকি খরচ, পড়ার বই- সব ওই টাকা দিয়েই ম্যানেজ করতাম; ম্যানেজ হত না, তবুও করে নিতে হত। মামীটা ভালোই ছিল, রোজ দুইবেলা খেতে দিত, আরেক বেলা না খাইয়ে রাখত; বেশ তাই না?’
‘এটাকে কেউ বেশ বলে! তুমি যে কি বুঝি না!’
‘আমি তোমার দিদি, হা হা!’
‘হা হা’
৯.
শালবন মিস্ত্রীপাড়া।
দোচালা বাড়ির মধ্যবিত্ত উঠোনটায় লাগানো আম্রপলি গাছটায় মুকুল এসেছে। রক্তগাঁদার গাছটা একটুখানি নেতিয়ে পড়েছে, রিমি লাগিয়েছিল শীতে।
আজ কত বছর হয়ে গেল; অথচ সাবিনা ভাবির কোন খবর নাই! তার বাবা-মা নিয়ে গেলেন বাড়িতে, চিকিৎসা করানোর কথা বলে। আর কই ফিরে আসলো দিদি! আমার জন্য আজ কত্ত আনন্দের দিন! দিদি থাকলে খুব খুশি হত। রিমি আর সৌমিক- আগামী সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছে; সরকারি খরচে। রিমি যাচ্ছে পলিটিক্যাল সায়েন্সে ছ’মাসের একটা কোর্স করতে; আর সৌমিক পি.এইচ.ডি. করতে। ভাবছি ওদের এবার লেখাপড়ার পাঠটা চুকে গেলে বিয়ে দিয়েই দিব; বয়স তো কম হলো না, ওদের।
মানুষটাকে ছাড়া কি সুখের দিন গ্যাছে সেটা আর কত বলি! বাবা বিছানায় পড়েছেন, মা-ও অনেক দূর্বল হয়ে গেছে; ভাইয়েরা খোঁজ নেন না। কিছু জমি, দুটো পুকুর বর্গা দিয়ে-যা আসে তা দিয়ে মা-বাবার দিব্যি চলে। রমেশ কাকুর সাথে সেদিন সিটি মার্কেটে দেখা হলো; কেমন বুড়ো বুড়ো ভাব চলে এসেছে চেহারায়। তার কাছেই বাবা-মার খবর শুনলাম।

রিমি, সৌমিকদের একটা বড়ো কষ্ট- নানা, নানিকে দেখল না তারা।  ভাবছি- অনেক বছর তো হলো, নিজেও সেই কত বছর থেকে বাপের মুখ দেখি না, মায়ের কোলে মাথা রাখি না; যাব নাকি ওদের নিয়ে আজ! রাগ কত পুষে রাখি?
ছেলে-মেয়ে দুটো জীবনে অনেক কিছুই পায় নি। কত কি খেতে চাইত, ফ্রেন্ডদের সাথে ট্যুরে যেতে চাইত; কিন্তু শেষ অবধি যাওয়া হত না। নিজেরা টিউশন করিয়ে টুকটাক নিজের খরচাপাতি চালাত। একটা বেসরকারি স্কুলে পড়িয়ে যা পাই; তা দিয়েই এই বাড়াবাড়িতে থাকছি, ওদের নিয়ে। চেয়েচিন্তে চলতে হয় প্রায়শ, তবু বাবার কাছে যাওয়া হয় না।
‘মা, বাবাও কিন্তু কম নয়। মা হয়ত আমার জন্যি কাঁদে, খুব কাঁদে! সে কান্নার কোনো ভ্যালু নিশ্চয়ই দেন নি বাবা! দিলে মা ঠিক আমাকে খুঁজত, এখানে আসত। আর মামা- সে তো আমার বিয়ের আগেই পৃথিবীকে ‘গুড বাই’ বলে দিয়েছেন; হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে। মামী তো মামার লোকান্তরে চল্লিশ দিনের মাথায় বাবার বাড়ি গেছে, আর ফেরেনি; ফিরেই বা কি হবে! ছেলেপুলেও তো নেই; একটা মেয়ে দু’বছর বয়সে নেকমরদের মেলায় হারিয়ে গেল, বড় ছেলেটা কোন ফটকাবাজ মেয়ের পাল্লায় পড়ে পালালো আর কোনো খবর নাই; বোধ হয় বিয়ে-শাদি করেছে।
ছেলে মেয়েগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে, আখতারুলের প্রিয় সেই স্মৃতিমাখা বাড়িটা ছাড়তে হয়েছে আমাকে। মিস্ত্রীপাড়ায় এসে উঠতে হয়েছে এই বাড়িতে। কতবার বাড়ি করতে চাইল ওরা, কিন্তু করা হয় না। তবে এবার বানাতেই হবে, ওদের জন্যি।
‘আচ্ছা, রিমির বাবা কোথায় আজ? আমার কথা কি একটা বারও মনে ওঠে না! আমি তো একজোড়া ঠোঁটেই চুমু এঁকেছি, অথচ সে বুঝল না!
দেখতে- সত্যি স্মার্ট ছিল আখতারুল, জিতুর চে’ ঢের স্মার্ট। পাঁচ ফিট সাত ইঞ্চি উচ্চতার মানুষটার দু’গাল জুড়ে শোভা পেতো চাপদাড়ি; গায়ের রঙটা ফর্সা।
নিশ্চিত আর একটা বউ পেয়েছে, যে তার চাহিদার রাতের উপযোগ মেটায়; ভেজা চুলে ঘুম ভাঙায় হয়ত!
১০.
কাজলা, রাজশাহী।
রাত বারোটা।
গত পরশু রংপুর টাউন থেকে ফেরার পথে, কুড়িয়ে পাওয়া এই ডায়েরিটা নতুন নয়, পুরনো; নৃত্যশিল্পী  জপিদ খানের কাছে। চোখের পানি ঝরছে, দু’গাল বেয়ে। ডায়েরিটার শেষে লেখা: ০৫-১১-১৮; আর আজ ০৯-১২-১৮। তার মানে.. ওই অনুষ্ঠানে সে এসেছিল, বেঁচে আছে এখন।
এটা স্কুল শিক্ষিকা শিমু আহমেদের ডায়েরি নয়, এটা জপিদের প্রথম স্ত্রীর লেখা ডায়েরি, অংশুর ডায়েরি। নিজের নাম, স্বামীর নাম, বাচ্চাদের নাম, দিদির নাম- সব কাল্পনিক; ‘জিতু’ আর ‘শ্রদ্ধেয় গুরু’ শব্দ দুটো সত্য, হিমালয়ের মতোন সত্য।
সেদিন অংশু বাজারে গিয়েছিল। অংশুর শোবার ঘরের টেবিলে পড়েছিল ডায়েরিটা; পড়ল জপিদ। সংকীর্ণ মনে সন্দেহ জন্মালো, মাথায় আগুন উঠল - ব্যস! মুখের উপরে তালাক! কতটা বোকামি করেছে জপদি, কতটা জঘন্য মানুষের পরিচয় দিয়েছে অংশুর কাছে- এখন বুঝতে পাচ্ছে। আচ্ছা, ফিরে যাবে ওর কাছে! না, কোন মুখ নিয়ে যাবে?
যে মেয়ে সেই ছোট্টবেলায়, তার সাথে ঘটে যাওয়া নোংরা স্মৃতিকে মনে চেপে ধরে, আবেগের বশবর্তী হয়েছে; নিজের সাথে স্ট্রাগল করে, বাপ-মা, ভাইদের ছেড়ে, শত অপমান সহ্য করে- এই অমানুষটাকে অবলম্বন করে বাঁচতে চেয়েছিল; সেই মহতী রমণী অংশুর সামনে কিভাবে দাঁড়াবে জপিদ? আর অনাদরে, চেয়েচিন্তে, খেয়ে, না খেয়ে বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েগুলো! ওদের কি জবাব দেবে? ফিরে যাবার কি আসলেই রাস্তা খোলা আছে?
বাইশ হাজার টাকায় কেনা কড়াই কাঠের দৃষ্টিনন্দন বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে আছে রাইসা, শুধু আজ নয়; বিয়ের পর থেকে গত দশটা বছর! প্রায়শ ওইভাবে শোয়- জপিদের দ্বিতীয় স্ত্রী। কোনো ছেলেপুলে হয় নি রাইসার; সমস্যাটা বউয়ের, ডাক্তার বলেছেন।
বাবা-মায়ের কথায় অসম্মতি জানানোর পথ ছিল না; বাধ্য হয়ে স্বামীপরিত্যক্তা রাইসাকে তাই বিয়ে করতে হয়েছে জপিদের। বিয়েটাই করা হয়েছে; কিন্তু, মনে তো অংশু-ই বাস করে, ওর জন্য চোখ জোড়া ভেজে কত রাত, সে কথা কি অংশু জানে?
আজ অংশুর ডায়েরিতে লেখা সেই কবিতাটা.. হ্যাঁ, সৈয়দ শামসুল হকের সেই কবিতাটা মনে পড়ছে জপিদের-
‘আমি কার কাছে গিয়া জিগামু সে দুঃখ দ্যায় ক্যান,
 ক্যান এত তপ্ত কথা কয়, ক্যান পাশ ফিরা শোয়, ’

শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট