ভ্রমনকাহিনী : শেকড়ের টানে




শেকড়ের টানে
মীম মিজান

রাজশাহী। এই একটি শহর, যার কথা মনে পড়লে আবেগে আপ্লুত হই। এই শহরের মানুষগুলো অমায়িক। সবার চাওয়া-পাওয়া খুবই অল্প ও সাধারণ। নরম সুরে কথা বলে। আতিথীয়তায় এক দৃষ্টান্ত। আম ও সিল্কের জন্য বিখ্যাত এই শহরটি অনেক পর্যটকের কাছে আকর্ষণের জায়গা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সবুজ ও দেশের ২য় বৃহত্তম উচ্চ-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, পদ্মা নদী, শাহ্ মাখদুম রুপোসের (র.) মাজার, চিড়িয়াখানাসহ অনেক দর্শনীয় জায়গা আছে।
গবেষণার কাজ ও সাহিত্যের টানে ছুটে গেছিলাম সেই প্রিয় শহর ও ক্যাম্পাসে। ঢাকাথেকে ছেড়ে আসা 'ধুমকেতু' ট্রেনে সিরাজগঞ্জ কড্ডার মোড়ে 'মনসুর আলী রেলস্টেশন' এ এক ছোটখাটো যুদ্ধ শেষে 'চ' নম্বর বগিতে উঠে নিজ আসনে বসি। 'জামতৈল', 'উল্লাপাড়া', 'বরালব্রীজ', 'চাটমোহর', 'ঈশ্বরদী বাইপাস' ও 'আব্দুলপুর জংশন' পার হয়ে রাজশাহী রেলস্টেশন পৌঁছতে দুপুর দু'টো বেজে দশমিনিট। পথিমধ্যে দেশের সর্ববৃহৎ বিল 'চলন বিল'র বুক চিরে আমাদের বয়ে নিয়ে চলা সাদা ও সবুজ রংয়ের 'ধুমকেতু' ট্রেনটি তার জানালা দিয়ে কত সবুজ ক্ষেত ও ইরিক্ষেতে পানিসেচের ইঞ্জিন ও ডিপকল দেখার প্রয়াস দিল। কত ধরনের রসুন ও ভূট্টার ক্ষেত। তালগাছ, খেঁজুরগাছ, গমক্ষেত, জটলাপাকানো কলাগাছ, দূরে দূরে দু'য়েকটা গরু-ছাগল ঘাস খাচ্ছে। পুকুরগুলো শুকিয়ে গিয়ে কচুরিপানাগুলো রোদে পুড়ে বিবর্ণতা পেয়েছে। আইলের মাথায় বসে কিশোর ছেলের নিয়ে আসা দুপুরের খাবার খাচ্ছে কিছু কৃষক। মাঝে মাঝে উঁচু জায়গায় গাছপালা বেষ্টিত বাড়ি দেখেছিলাম।
প্রাণের ক্যাম্পাস রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রেন প্রবেশ করলে স্মৃতিগুলো চলচ্চিত্রের দৃশ্যের ন্যায় মানসপটে ভাসতে থাকল। পূর্বপাড়ার ও পূর্বদিকে বিস্তৃত আখক্ষেত। মাঝখান দিয়ে একটি রাস্তা। রাস্তার দু'ধারে কড়ই গাছ। উত্তরপাশে হরিজন সম্প্রদায়ের বস্তি। উত্তর-দক্ষিণ রাস্তা সংলগ্ন সেই বদ্ধভূমিটি একপায়ে দাঁড়িয়ে। প্রথমবর্ষে দলবেধে ঠিক এই বদ্ধভূমিতে রেহেনা, আব্দুল্লাহ, সালমাসহ কতবার আসতাম। রেল লাইনের লোহার উপর হাঁটার চেষ্টা করতাম। চারুকলা ও ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টের সামনের জলাতে লাল পদ্ম তুলে দিতাম তাকে। ভদ্রা মোড়থেকে খানিকটা পূর্বদিকে সেই রেললাইনের জায়গাটা আমাকে সুখস্বপ্নে বিভোর করে দিল। হ্যাঁ! এই সেই জায়গা। যেখানে প্রথম তাকে বলেছিলাম 'ভালোবাসি অনেক তোমায়।' তারিখটিও স্মৃতিপট জানিয়ে দিল ২০০৭ সালের ২০ এপ্রিল।
ট্রেনস্টেশনের সেই প্লাটফর্মগুলো আমায় বলছে, 'মীম মিজান, এই সেই জায়গাগুলো যেখানে দাঁড়িয়ে কতদিন তুমি অপেক্ষা করেছিলে ঢাকা ফেরত ট্রেনগুলির জন্য। আজও কী অপেক্ষা করবে কোনো ট্রেনের জন্য?'
আমি উত্তর করলাম, 'না। ঢাকা ফেরত ট্রেনের সেই কবিলা আজ আমার জন্য রাজশাহী থেকে কখন ফিরব একমাত্র তনয়সহ অপেক্ষারত।'
ব্যটারিচালিত রিক্সা করে সোনাদিঘি মোড়ে পৌঁছে লৌহের আঁধার কচুশাক ও মুরগী গোস্ত দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ শেষকরে চিরাচরিত অভ্যেস বইয়ের দোকানে ঢুকলাম। অনেক খুঁজে খুঁজে কথাসাহিত্যের ছয়টি বই কিনলাম। বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন সময়েও বই সংগ্রহের একটি নেশা ছিল। সেই নেশাটি এখনো ছাড়তে পারিনি। বই সংগ্রহ শেষে পদ্মানদীর তীরে গেলাম। হায় পদ্মার তীর! কী অপরিচ্ছন্ন এখন তুমি! কী উচ্ছিষ্ট! কী দুর্গন্ধ! তবে শাহেব বাজার কাঁচাবাজারের দক্ষিণদিক হতে পূর্বদিকের তীরটা বেশ সাজানো হয়েছে। অবসর কাঁটানোর জন্য রঙ্গিন চেয়ার, টেবিল ও ফুচকার দোকান সারি সারি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর 'পদ্মানদীর মাঝি' উপন্যাসের সেই পদ্মা আর আজকের বন্ধুত্বের হাতে গলাটিপে ধরার পদ্মা কী পার্থক্য! বালুময় পদ্মায় অপরাহ্নের যুগলবন্দী সময় যাপনের উদ্দেশ্যে ঝলমল পরিচ্ছদে উচ্ছ্বাস নিয়ে চারটি পা পাশাপাশি চালিত করে অসংখ্য জুটি হাঁটছে।


তুমি কেন আজ আসলেনা আমার সাথে? আমিও যেতে চাই উত্তপ্ত বালুকারাশীকে মাড়িয়ে হাতটি ধরে একটু দূরে। সবপাখিগুলো যখন নীড়ে ফিরবে, তখন আমরাও ফিরব। আমি অশ্রুসিক্ত। আমার হৃদ-আতœা হু হু করে লু হাওয়ায়।
পদ্মার তীরে দাঁড়িয়ে মুঠোফোনে কথা বললাম বর্তমান বাংলা কথাসাহিত্যের সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রধান কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক স্যারের সাথে। স্যার সীমাহীন ব্যস্ততা সত্তেও আমাকে সন্ধ্যায় তার বিহাসের বাসায় যেতে বললেন। হানুফার মোড়ের এক ছোটভায়ের মেসে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে দ্রুতই ইজি বাইকে ছুটে চললাম বাংলাভাষী পাঠকদের অন্যতম আকর্ষণ হাসান আজিজুল হক স্যারের বাসায়। স্যারের বাসাটা বিহাসের গেট পেরিয়েই হাতের বায়ে। পূর্বদিককার দেয়ালটি ঘেষেই স্যারের দোতলা বাসা। স্যারের বাসাটা দক্ষীণমুখী। প্রথমেই একটি হাফওয়ালের গেইট। সেই হাফওয়াল দিয়েই বাড়ির সীমানা নির্ধারিত। উপর তলায় স্যারের বড়মেয়ে থাকেন যিনি একটি কলেজে অধ্যাপনা করছেন। আর ছোট্টমেয়ে টোটন আপু কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন। তিনি নিচতলায় থাকেন। তার সাথে তেমন কেউ একটা কথা বলেন না। আমি একটু কুশল বিনিময়ে তার ভিতরে খুশির ঢল অনুভব করলাম।স্যার বাসার নিচতলার দক্ষীণদিকের পাশাপাশি দুটো কক্ষের পশ্চিমের কক্ষটাতে ঘুমান। পূর্বের কক্ষটি তার পড়াশুনা ও লেখার ঘর। অনেক বড় বড় জানালা ও গ্রিল এই কক্ষটিতে। পর্দাগুলোও উজ্জ্বল রংয়ের। চারদিকে গাদা গাদা বই। দক্ষীণদিকের স্যারের সেই কক্ষদুটোর থেকে উত্তরদিকে টোটন আপুর কক্ষ পর্যন্ত বিশাল এক বৈঠকখানা। জাতীয় অনেকগুলো দৈনিক বৈঠকখানার টেবিলে ছড়িয়ে আছে। চতুর্দিকে সাজানো সোফাগুলো দেখতে দারুন। বৈঠকখানার দেয়ালে অধিকাংশ জায়গাজুড়ে স্যারের বিভিন্ন বয়সের স্কেচ করা চিত্র। টোটন আপুর ঘরের দক্ষীণ দেয়াল ঘেষে একটি শোকেস আছে। শোকেসটি পূর্ণ ও ঠাসাঠাসি বিভিন্ন প্রকার পদক ও ক্রেস্টের দ্বারা। পশ্চিমদিকে বেশ কিছু জায়গাজুড়ে কিচেন। দেয়ালের এক জায়গায় দেখলাম স্যারের সহধর্মীনির স্কেচচিত্র। শাবিপ্রবি'র অধ্যাপক জাফর ইকবাল অতর্কিতে হামলায় পতিত হওয়ার পর মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী বিশেষ করে হাসান আজিজুল হক স্যারদের মতো ব্যক্তিগণ তাদের নিরাপত্তার বিষয়ে খুবই সজাগ হয়েছেন।
তদুপরি স্যারের বাসায় সার্বক্ষণিক সাহিত্যপ্রেমীদের আড্ডা চলে। আমি প্রবেশ করতেই স্যার হেসে হেসে বললেন, 'মীম মিজান, তুমি তো সিরাজগঞ্জ থেকে এসেছ। কিন্তু আমার সিনিয়র বন্ধুদের সাথে আমি এখন আড্ডা দিচ্ছি। তুমি যদি কালকে আসো বেশ খুশি হবো।' স্যার আমাকে দাঁড় করিয়ে রেখেই মিনিট তিনেক ব্যক্তিগত কিছু বিষয় জানতে চাইলেন সোৎসাহে। আমার উত্তরগুলো শুনে স্যার অত্যন্ত প্রীত হলেন। দেখলাম অনেক বয়ঃবৃদ্ধ ব্যক্তিদের সাথে তিনি একান্ত আড্ডায় মশগুল। আমি দোয়া চেয়ে বিদায় নিলাম।
সন্ধ্যার অব্যহতি পরে বিনোদপুরে নির্মাণাধীন সাততলা ভবনের উপরতলায় সিঁড়িভেঙ্গে উঠে তারুণ্যে উচ্ছ্বল কবি, গবেষক, সম্পাদক ও শিক্ষক প্রিয়মানুষ মাহফুজ আখন্দ স্যারের সাথে আলাপচারিতা, সাহিত্য আড্ডা, মতবিনিময় ও বই উপহারের একটা দারুন পর্ব শেষ হয়।


রাত নয়টা নাগাদ মিলিত হই আমার গবেষণার তত্ত্বাবধায়ক শ্রদ্ধেয় প্রফেসর ড. মো. কামাল উদ্দিন প্রধান স্যারের সাথে। এই হেয়ালী ও বাউণ্ডুলে জীবনে অনেকটাই দেরী করে বেলেছি গবেষণার অগ্রগতিতে। একটি সম্মানজনক পেশা ও লেখার পিছনে ব্যায় করে ফেলেছি পাঁচটি বছর। তাই খেসারত দিতে হবে আমাকে পুনঃভর্তির মাধ্যমে। সদ্যা হাস্যজ্জ্বল ও ইতিবাচক মানসিকতার পরম উদাহরণ স্যার আপ্যায়ন করালেন চারদেশের চারপ্রকার খাদ্য উপাদান দিয়ে। ইরানের বিখ্যাত কাজুবাদাম। আরব্য খেঁজুর। সন্ত্রাসী রাষ্ট্র মিয়ানমারের কাঠবাদাম ও ম্যাডামের হাতে তৈরি বিশেষ ধরনের গোস্তের সিংগারা দিয়ে। তত্ত্বাবধায়ক মহোদয়ের কাছথেকে বের হয়ে কথাসাহিত্যিক ও কোমল হৃদয়ের মানুষ মাতিউর রহমান ভাইয়ের সাথে দেখা করার জন্য মণ্ডলের মোড়ে অপেক্ষায় থাকলাম। মাতিউর রহমান ভাই কোলকাতার একদল কবি-সাহিত্যিকদের সাথে রাজশাহী কলেজসহ কিছু জায়গা ঘুরে আড্ডা দিচ্ছিলেন। তাই একটু দেরীই হলো একসাথে হতে।
কথাসাহিত্যিক মাতিউর রহমান ভাই আসলেন। ভাইয়ের মুখে এ্যালার্জির সমস্যা ও কোমর ব্যাথার কথা বলতেই তিনি প্রায় আশ্চর্য হলেন। 'তুমি তো মেধাবী ও স্মৃতিধর মানুষ ভাই! একবারের দেখায় সবকথাই মনে রেখেছ!' বলে বিস্ময় প্রকাশ করলেন। মণ্ডলের মোড়ে বসে গল্পে গল্পে একচাপ খেলাম। এরপর হাঁটতে হাঁটতে তার বাড়ির দিকে গেলাম। তার বাড়িটিও নির্মাণাধীন। ভাবী গরম গরম গমের রুটি, ডিম ভাজি ও সব্জি দিলেন। খেতে খেতে অনেক গল্প ও হাসাহাসি করলাম। খাওয়া শেষে বিছানায় শুয়ে রাত সাড়ে এগারটা পর্যন্ত সাহিত্যের নানা বিষয়, ব্যক্তিগত অনেক বিষয়ই আলোচিত হলো দুজনের মধ্যে। বাসাথেকে বেরুবার সময় তার সম্পাদিত 'সিড়ি' নামক পত্রিকার একটি সংখ্যা সৌজন্য উপহার দিলেন। প্রায় অর্ধেক রাস্তা এগিয়ে দিলেন।
রাতে হানুফার মোড়ে একটি মেসে রাত্রি যাপন করে সকালে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে সাইকেল চালিয়ে ক্যাম্পাসে গেলাম। ক্যাম্পাসের মূল প্রশাসনিক ভবনের সামনের জোহা সমাধীস্থলটির পরিবর্তন দেখলাম। একটু এগিয়ে লিচুতলার সেই ফাঁকা জায়গাটা দেখলাম। সেখানে একটি স্মৃতি স্থাপনা তৈরী হয়েছে। লাইব্রেরি চত্বরে দেখি প্রাইভেটের অনেক কুণ্ডুলী। টুকিটাকি চত্বরটি প্রাণবন্ত। কেউ কউ বিতর্ক নিয়ে ব্যস্ত। অনেকেই সেগ্রেট ফুকছে। দেখলাম মতানীরাও আছে। আমি ডাকলাম। নানীরা আমাকে দেখেত কী খুশি! খুশিতে চোখগুলো চিকচিক করছিল। আমাকে দুই নানীর মাঝখানে বসিয়ে সেই কী গান গাইল দু'জন! কত স্বাদের একপ্লেট খিচুরি ও ডিমভাজি খেলাম।
টুকিটাকি চত্বরথেকে রিক্সাকরে রা.বির সাবেক ভিসি ও আমার শ্বশুর এলাকার মানুষ বাংলাসাহিত্যের মধ্যযুগের গবেষক প্রফেসর ড. আব্দুল খালেক স্যারের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য তার 'নর্থবেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি'তে গেলাম। উল্লেখ্য যে তিনি উক্ত ইউনিভার্সিটির ভিসি। অনেক খোঁজখবর নিলেন স্যার। আক্ষেপ প্রকাশ করলেন সদ্যপ্রতিষ্ঠিত 'রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়' নিয়ে। তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সকল কাজ করলেন অথচ তিনিই আজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের কোন পদেই নেই। স্যারের সাথে দেখা শেষে ইজি বাইকে চলে আসি আবারো বিহাস। বিহাসে হাসান আজিজুল হক স্যারের সাথে দেখা করলাম।
আমার দু'দিনের প্রিয় শহর রাজশাহী ও প্রাণের ক্যাম্পাস রা.বির সফরের বিদায় ঘন্টা বেজে উঠল। বিনোদপুরে বাসে উঠে রওয়ানা হলাম সিরাজগঞ্জের দিকে। ফাতেমা পরিবহনের বাসটি সবুজের সমারোহে দুইসারি গাছের মাঝখানে কালোপিচের রাস্তার উপর গতিতে পূর্বমুখে ছুটতে থাকল।



শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট