ধারাবাহিক উপন্যাস : রামবন্দনা : শেষ পর্ব



রামবন্দনা
শাদমান শাহিদ

 (গত সংখ্যার পর)
বিকেল চারটা বাজে। আমরাও গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে সূর্যভবনের সামনে এসে দাঁড়াই। প্রথমে পাতিদেবতারা ভাষণ দেয়, আমরা এসময় সিগারেট টানি। মুখভর্তি শাদা ধোঁয়া মাথার উপর দিয়ে উড়াতে উড়াতে আড়চোখে মঞ্চের দিকে তাকাই।
একসময় মহামায়া মঞ্চে আবির্ভূত হন।
শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে আবেগঘন কণ্ঠে বলতে থাকেন, আজকে আপনারা একটি সত্যিকারের পূণ্যকর্ম করেছেন। অসুর গোষ্ঠীদের পরাজিত করেছেন। পরিত্যাগ করেছেন রক্তখোরদের। সৃষ্টিকর্তার পরিবার আজ তার পূর্ণ প্রতিদান পেলো। আজ আমরা মহাখুশি। এ-দিনের জন্যেই একদিন আমরা রক্ত দিয়েছিলাম। পালাতে বাধ্য হয়েছিলাম গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে। আমাদের দেবাদিদেব রক্ষা করেছেন। সামনের দিনগুলিতেও তিনি আমাদের পাশে থাকবেন। এ-সম্পর্ক রক্ষা করতে আমাদের যা করণীয় তা-ই করবো। আপনারা শুধু আমাদেরকে সাপোর্ট করে যাবেন। মনে রাখবেন আমরা আছি বলেই আপনারা আছেন। উন্নয়নের জাজিমে আরামে ঘুমোচ্ছেন। যদি বিট্টামি করেন তো, মনে রাখবেন আমরাও বিট্টামি করতে পারি। সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দিতে পারি। আমরা গড়তে যেমন জানি, প্রয়োজনে শেষও করতে মুহূর্ত সময় নেবো না।
এই যে বাঁধা-বন্ধনহীন দৃষ্টির আকাশ, ওটা কে সৃষ্টি করেছে? আমরা।
এ-কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা একটু নড়েচড়ে উঠি। আমাদের হাসি পায়। আমরা হাসি। টং-দোকানগুলোতে সিগারেটের কাটতি বেড়ে যায়। দিয়াশলাই খোঁজার দুম পড়ে। একটু-আধটু বিশৃঙ্খলাও হয়, একসময় দেবির ধমক খেয়ে সোজা হয়ে উঠি। তিনি বলতে থাকেন, এই যে উন্মুক্ত সবুজ প্রান্তর, ওটা কে সৃষ্টি করেছে? আমরা।
আবারো আমাদের হাসি পায়। আমরা হাসি।
এই যে নীল সাগর, নদী, পাহাড়-পর্বত, অরণ্যের অন্ধকার, সব কে সৃষ্টি করেছে? আমরা।
আমরা হাসি।
এই যে লাল-সবুজের পতাকা, ওটা কারা সৃষ্টি করেছে? আমরা।
আমরা হাসি।
এ-সময় হঠাৎ সমাবেশের ভেতর থেকে কে যেনো অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠলো, সবকিছুই আপনারা করেছেন আর আমরা শুধু কচু কেটেছি।
এবার আমরা শব্দ করে হেসে ওঠি। হাসতে হাসতে কাশতে কাশতে একে অপরের ওপর হেলে পড়ি। শুরু হয় হুলস্থ’ূল কা-। আমরা তখন আস্তে করে বেরিয়ে আসি। মারামারি করে মরলে তারা মরুক। আমরা না। আমরা বাসায় ফিরে টিভি ছেড়ে দিই—টিভিভর্তি খবর। সারা শহর থেকে মৌমাছির ঝাঁকের মতো খবর এসে জড়ো হয়েছে টিভির ভেতর। এতো খবর চল্লিশ বছরেও কোনো টিভি দেখেনি। বাক্স ছিনতাই, হত-আহত বলতে বলতে শেষ দিকে এসে মিডিয়ার কর্মীরা কেবল ত ত ত ত করতে থাকে। আমরা তখনো হাসি। আর মনে মনে বলতে থাকি, এ ধরনের নির্বাচন মাসে মাসে অনুষ্ঠিত হলে ভালো হতো। এতে আমাদের একটা হাসির খোরাক হয়। সাইকোলোজিস্ট ডাক্তার বলে, সামটাইমস্ ফ্রি-লাফিং ইজ গুড ফর হেল্থ। আমরাও হাসতে চাই। প্রাণ খুলে হাসতে চাই। সম্ভবত এ-কারণেই মাসুদের বাবা আবু বকর সিদ্দিকি সাহেবকেও দেখা যায় কারণে-অকারণে শুধু হাসেন। স্বাভাবিক কথা বার্তায় যেখানে হাসির কোনো আলামত নেই, সেখানেও তিনি গলা ছেড়ে হেসে ওঠেন। আমরা তখন অবাক চোখে তাঁর মুখের দিকে চেয়ে থাকি। লজ্জা পাই। দেখি প্রফেসর আকমল হোসেনও হাসেন। হাসতে হাসতে বলেন, যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে কয়েকটা গান শোনাই। আমরা বলি, একি বলছেন স্যার? গান না আপনি। আপনার কণ্ঠ তো অমৃত। গান স্যার গান। আমরা শুনছি। তিনি আমাদের কথার মার-প্যাচ ধরতে পারেন না। গান শুরু করে দেন। আমরা লজ্জা পাই। হাসে ফাহিমা আজাদও। চাকরি হারিয়ে বেচারি কারণে-অকারণে হাসে। লোকমুখে শুনেছি অর্থাভাবে শহরে রেখে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে যাওয়ার মতো টাকা হাজব্যান্ডের একক আয়ে সঙ্কুলান হচ্ছে না এবং এজন্যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই মনোমালিন্য হয়। হয়তো সে-দুঃখেই দৃঢ়চেতা এ-নারী এখন পাগল প্রায়। শুধু এখানেই শেষ নয়, কী কারণে যেনো হেসে বেড়ায় ফুটপাতের বাসিন্দারাও। যেদিকে তাকাই, দেখি, সবাই হাসে। কথায় কথায় হাসে। কারণে-অকারণে হাসে। হাসির ধরণ দেখে মনে হয়,  কেউ বুঝি হাসির মন্ত্র পড়ে পুরো শহরটার গায়ে ফুঁ মেরে দিয়েছে। 
এরইমধ্যে একদিন ক্লাবে গুরুজি আসেন। বলি—গুরুজি কিছু একটা করুন। সবাই পাগল হয়ে গেলে তো সংসার চলে না। তিনি বলেন—মেডিটেশন। মেডিটেশন করুন। পৃথিবীর সব মহামনীষী ক্রাইসিস মুহূর্তে মেডিটেশন করতেন। মেডিটেশনের ভেতর দিয়েই সমাধানের পথ খুঁজতেন। প্রস্তুতি নিতেন। এসো। আমরাও মেডিটেশনে ডুব দিই। দেখি, কোথায়, কী আছে লুকিয়ে—।
আমরা বললাম, সময় দিন গুরুজি। আরেকটু ভেবে দেখি ।
(সমাপ্ত)



শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট