আনোয়ার রশীদ সাগর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আনোয়ার রশীদ সাগর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সম্পর্ক

সম্পর্ক

 

    অলঙ্করণ : জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ


সম্পর্ক 

আশ্রাফ বাবু


চুয়াডাঙ্গা ফেরার জন্য সৈয়দপুর স্টেশনে একটু তাড়াতাড়ি চলে আসে জেসমিন। সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেস। রিসার্ভেশন যদিও কনফার্মড, তাও কয়দিন ধরে যেভাবে সারা নীলফামারী তথা দেশে রাজনৈতিক ক্যাচাল নিয়ে উত্তাল, তাতে মনে সংশয় ছিলো আজও ট্রেন চলবে কিনা। একদিনের নীলফামারী সফরে কাজগুলো শেষ করতে গিয়ে সারাদিন খাওয়া হয় নি। ভেবেছিল, তাড়াতাড়ি স্টেশনে পৌঁছে কিছু খেয়ে নেবে। উফফ, আসবার সময় যা অভিজ্ঞতা হলো, এখনো মাথার রগ দপ দপ করছে।                 

মাহিন্দ্রের পেছনের সিট থেকে ড্রাইভারকে যতটুকু দেখেছি, তাতে রোগাটে চেহারা, মুখে দাড়ি, চুল অবিন্যস্ত, বয়স ৪০-র কাছাকাছি। গাড়িতে ওঠার পরে জেসমিন শুধু বলেছিল, ‘আপনি এই পথ দিয়ে কেন যাচ্ছেন, সামনের রাস্তা ধরলে হতো না’। প্রতিদিন যে হারে ধর্ষণের ঘটনা বাড়ছে। এই মধ্য চল্লিশেও নিজেকে নিরাপদ লাগে না। কিন্তু ড্রাইভার লোকটি বেশ বীরত্বের সঙ্গে উত্তর দেয়,              

‘জানেন আমি বিশ বছর ধরে গাড়ি চালাচ্ছি। এই শহরের অলি-গলি সব চেনা। এখন তো সব মানুষ গুগল রুট ম্যাপ চেনে। ওসব আমার লাগে না’।           

এরপর সারা রাস্তা দেশের পরিস্থিতি, ডি-মানিটাইজেসন, নেতা-নেত্রীদের কার্যকলাপ নিয়ে বকর বকর করে গেল। বলার সময় এক হাত স্টিয়ারিঙ্গে রেখে অন্য হাত হাওয়ায় উঠিয়ে এইস্যা ছুঁড়ছিলো, জেসমিন ভাবলো, লোকটি নিশ্চয়ই কোন ইউনিয়নের নেতা। তারপরেই খটকা লাগলো,   

‘জানেন, এরপর শুধু দুই শ্রেনীর মানুষ থাকবে, একশ্রেনীর আয় লাখ টাকা এবং অন্য শ্রেনীর কোটি টাকা। দারিদ্রসীমার নীচে কোন মানুষ থাকবে না। পুরো ক্যাশলেস হয়ে যাবে। রাস্তায়, সোনা পরে থাকলেও কেউ ছুয়ে দেখবে না। ঘরে বেশী টাকা রাকলেই সরকার জেনে যাবে। তাই চুরি, ডাকাতি, ঘুষ সব ভ্যানিস’।                  

জেসমিন বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘তাই নাকি?’। বলেই ভাবলো, এই রকম কথাতো শোনেনি কোথাও। জেসমিনের উত্তর পেয়ে লোকটি আরও উৎসাহিত হয়ে প্রায় সমস্ত শরীরটাকে অ্যান্টি-ক্লকওয়াইজ ঘুরিয়ে বলে ওঠে,     

......‘হ্যাঁ, জানেন না চীন আর রাশিয়াতেও একই নিয়ম। ওখানে সবাই সমান’।      

......‘আরে আরে সামনে দেখে চালান, গাড়ি আসছে তো’।  

রীতিমতো বজ্রকঠিন স্বরে বলে, ‘আপনার ভয় নেই। না দেখেও চালাতে পারি’। এবার লোকটিকে ঠিক স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে না। আজ সুস্থমতো স্টেশনে পৌঁছাতে পারবে তো?      

.........‘জানেন, এখন দেশের এই অবস্থা কেন? এটা আমাদের পূর্বপুরুষদের পাপের ফল, বুঝেছেন। যেমন, বাবার পাপের ফল নিজের সন্তানকে পেতে হয়, তেমন। দেখছেন না, এখন মানুষ নিজের কাছের জনদের থেকে বাইরের লোকের কথা বেশী শোনে আর বিশ্বাস করে। সেদিন আমার বউকে, মা বল্লো, শুটকি রান্নাতে বেশি ঝাল দিতে। বউ না শুনে নিজের মার কথামতো কাচামরিচ দিলো। ব্যাস, তেলে পুড়ে এমন রং, কেউ খেয়ে মজা পাইলনা। তাই তো রবীন্দ্রনাথঠাকুর বলেছিলেন, মঙ্গলে উষা বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা  যা। মানে, যেখানে খুশী চলে যা। সবাই জাহান্নমে যা, বুজলেন?’।        

দুত্তোরী, এতো রীতিমতো আধ-পাগলা বা মাতাল। সমাজতন্ত্র, শ্বাঁশুড়ি, শুটকি, রবীন্দ্রনাথ, মিলে মিশে  চচ্চরি বানিয়ে ইচ্ছে মতো যুক্তি দিয়ে চলেছে। জেসমিনের আতংকে হাত-পা অবশ। কি করবে এখন? বেশী উচ্চবাচ্চ করলে যদি ক্ষেপে গিয়ে নামিয়ে দেয়...অগত্যা চুপ করে বসে থাকলো। গাড়ি এদিক ওদিক এঁকে–বেঁকে হর্ন দিতে দিতে এগিয়ে চললো। জেসমিনের মনে হচ্ছিল পিছনে পুলিশের তাড়া খেয়ে হিন্দী সিনেমার ঢঙ্গে কিডন্যাপাররা ওকে নিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে পালাচ্ছে। একেবারে দম বন্ধ অবস্থা!    

নীলফামারী থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে সৈয়দপুর স্টেশনে ঢুকিয়ে ড্রাইভার যেই দাঁড় করিয়েছে, জেসমিন লাগেজ নিয়ে গাড়ির দরজা খুলে একেবারে বাইরে। অন-লাইনে পেমেন্ট করা ছিল, তাই রক্ষা। তারপরে, একটুও সময় নষ্ট না করে একেবারে স্টেশনের ভেতরে। কি স্ট্রেঞ্জ অভিজ্ঞতা! উত্তেজনা টের পাচ্ছে এখনো।      

ঘড়িতে দেখলো, ৫.৩০। সময় আছে অনেক। কফি খাবে বলে এদিক-ওদিক ঝকঝকে স্টলগুলিতে উঁকি দিল। থরে থরে সব খাবার। কিন্তু দাম ও মান কোনটাই ঠিক পছন্দসই নয়। তাই পাশ কাটিয়ে কোনের দিকে একটি স্টলে গিয়ে কফি চাইল। সেখানে দুটি ছেলের মধ্যে একজনকে বেশী সপ্রতিভ লাগলো, তার বয়স,২৮-২৯।                    

কফি খেতে খেতে হঠাৎ দূরের ঝকঝকে স্টলগুলির দিকে আঙ্গুল উঁচিয়ে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলো,     

......‘এখানে রাতের খাবার কোথায় ভাল পাব?’ ছেলেটি স্টলের কাঁচঘেরা কাউন্টারের উপর ঝুঁকে প্রায় ফিসফিসে জানালো,    

......‘একটাও ভাল না’।   

...... ‘তাহলে, কোথায় পাবো?’, বেশ শুকনো মুখে জেসমিন বলে ওঠে।   

...... ‘আপনি কি খাবেন? মাছ না মাংস?’

...... ‘নিরামিশ’  

...... ‘তাহলে আপা, এই সোজা প্ল্যাটফর্মের বাইরে যান। দেখবেন, (সন্দু) হোটেল। সুন্দর চালের ভাত, রুটি, দুটোই ওখানে পাবেন’।     

...... ‘এ বাবা, লাগেজ আছে তো। আচ্ছা ফোন-এ অর্ডার করলে দিয়ে যাবে না?’  

...... ‘না আপা। চলে যান না, কাছেই তো। এখানে লাগেজ রেকে যান। আমরা আছি, দেখে রাখবো’।     

জেসমিনের সন্দিহান মন জানালো, খবরদার, বিশ্বাস কোরোনা। যত মিষ্টি কথা, তত খারাপ অভিসন্ধি। তাই চালাকি করে বলে,     

......‘অতদূরে আর যাবনা। এখান থেকেই নিয়ে নিচ্ছি’। কফির কাপটা পাশের ডাস্টবিনে ফেলে ট্রলি ব্যাগের হ্যান্ডেলে হাত রাখতেই, ছেলেটি কাউন্টার থেকে বেড়িয়ে এসে,   

......‘চলুন, আপনাকে নিয়ে যাচ্ছি। এই কালু দোকানটা কটু দেখিস তো’।         

এরপর, জেসমিনকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই, ট্রলিব্যাগটা হাতে নিয়ে হাঁটা শুরু করে।   

......‘আরে আরে করছো কি? না না আমি নিচ্ছি’, জেসমিন বেশ জোরেই বলে ওঠে। ছেলেটি হেসে বলে,  

......‘ ভয় নেই, আসুন না’। কিছুটা হতবম্ব হয়ে জেসমিনের পিছু পিছু চলা শুরু করে।       

ফুটবলাররা যে ভাবে ড্রিবলিং করে বল নিয়ে এগোয়, ওরাও সেইভাবে সৈয়দপুর স্টেশন নির্মাণ হকারের গলির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে। ভিড়ের মাঝে হঠাৎ ছেলেটিকে হারিয়ে ফেলতেই ভয় পেয়ে যায় জেসমিন। ভাবে, অচেনা একটি ছেলের সঙ্গে আসা খুবই হঠকারিতা হয়েছে। লাগেজও তার জিম্মায়। নিশ্চয়ই অন্য মতলব আছে। আজকালকার দিনে নইলে একজন অচেনা মানুষকে কোন উদ্দেশ্য ছাড়া কেউ সাহায্য করে?                    

অবশেষে কিছুটা হেঁটে তারা সন্দু হোটেলে পৌঁছায়। ভেতরে ঢুকেই মালিককে দেখিয়ে বলে, ‘আপা কি খাবেন বলুন’।      

হোটেলের ভেতরটা ছোট হলেও বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। জেসমিন খাবার অর্ডার দিতেই, ছেলেটি পাশে এসে বলে,       

......‘স্টেশনের ঐ দোকানগুলোর থেকে এখানে সব গরম পাবেন। ভাল রান্না। দামও কম’।    

জেসমিনের মনে হলো, কমিশনের লোভেই এইসব করছে। ফেরার সময় ছেলেটি জেসমিনের  ট্রলি ব্যাগের সাথে খাবারের ঝোলাটাও বয়ে আনল। ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে ব্যাগটিকে লাগেজ ট্রলির উপর চাপিয়ে দেয়। জেসমিন জানতে চাইলো সবাই তো দিচ্ছে না, তুমি কেন দিলে? ছেলেটি স্মিত হেসে বলে,    

......‘আমরা কেন নিয়ম মানবো না’। 

আশ্চর্য! জেসমিন অবাক হয়। ভাবে, এইসব সাহায্যের বিনিময়ে এবার নিশ্চয় টাকা চাইবে। তাই বলে ওঠে,

...... ‘তুমি যা করলে, আমি কোনদিন ভুলবো না। আপা বলে ডেকেছো, এই নাও, যা ভাল লাগে খেয়ো।’ জেসমিন ১০০ টাকা ব্যাগ থেকে বের করে।       

ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয়, ‘আপা ডেকেছি, আপনাকে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়েই যাব। এর জন্য আপনার কাছ থেকে টাকা নেবো? ভাই-এর দায়িত্ব আপাকে দেখাশোনা করা। কত নম্বর কোচ?’   

কথাটা চাবুকের মত গায়ে এসে লাগে জেসমিনের। তারমানে, এতক্ষন ধরে ছেলেটিকে নিয়ে যা যা ভেবেছিল তার একটাও তো মিলছে না। টাকাটা হাতে নিয়ে নিজের দোদুল্যমান মন নিয়ে আস্তে করে বলে,   

...... ‘এখানকার কোন ট্রেন কয় নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসে, কোন কোচ কোথায় দাঁড়ায়, আমার সব মুখস্থ। চলুন, নিয়ে যাচ্ছি। আসলে, আমারও এক আপা আছে। আপনাকে দেখে আপার কথাই মনে পড়ছে’।  

...... ‘কোথায় থাকে তোমার আপা’।      

...... ‘কুড়িগ্রাম। এই তো গত বছর বিয়ে দিলাম, ছেলে সরকারী চাকরী করে। ব্যস আমি নিশ্চিন্ত। বাবা-মা আমাকে বিয়ের জন্য বলচে, আমি রাজী হচ্ছিনা। এই আপার বিয়ে দিলাম জমি বিক্রি করে, একটু নিশ্বাস নিই’।       

...... ‘তাই, বা, তুমি তো খুব দায়িত্বশীল ছেলে’।   

...... ‘বাবা ঢাকা থেকে আসার পরে, দোকানে কাজ করে খুব কষ্টে ৩ বিঘা জমি কিনেছিল। সেখান থেকেই এক বিঘা দিদির জন্য বেচে দিলাম। এখন বাবা-মাকে দেখা-শোনার জন্য মাসে মাসে টাকা পাঠাই। বাবা অনেক কষ্ট করেছে এক সময়। তাই বলেছি, আমি দেখবো। তুমি বিশ্রাম নাও’।      

...... ‘সত্যি, তোমার মা-বাবা খুব লাকি’।      

...... ‘না আপা, আমি চেষ্টা করি সৎ ভাবে বাঁচতে, মানুষকে ভালবেসে জীবন কাটাতে। জানেন, এই স্টেশনে আমি ১০ বছর বয়স থেকে আছি। সবাই আমাকে চেনে আর ভালবাসে। দোকানের মালিক আমার উপরে ভার দিয়ে, নিশ্চিন্তে আছে। মাসে ৮,০০০ দেয়। এখানেই উপরে থাকি। এই স্টেশনই আমার বাড়ী ঘর। মাঝে মাঝে বাবা-মাকে দেখতে কুড়িগ্রাম যাই। এই হাসু ভাই চা দাও দেখি ২ টা’।    

কথা বলতে বলতে প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে পৌঁছে দুটো ফাঁকা চেয়ার-এ ওরা বসে। চা দিতেই, জেসমিন টাকা বের করে। ছেলেটি জানায়, ‘এখানে কেউ দাম নেবে না’।      

......‘এমা, সেটা তো তোমার জন্য। আমি....’।     

......‘হাসু ভাই নেবেই না, এখানে আমরা সবাই খুব মিলেমিশে থাকি। আপনি আমার আপা তো। তাই সবার আপনজন হলেন’। চা-এর লোকটিও হেসে চলে যায়। মোটামুটি কিছুক্ষনের মধ্যে কুলী থেকে হকার, এমনকি টিকিট কালেক্টরের কাছেও জেসমিন হয়ে ওঠে ‘ওর আপা’। এরপরে চেয়ারে পা গুটিয়ে কত গল্প শোনায়। সে এক অচেনা সৈয়দপুর স্টেশনের আনাচে-কানাচের যাপন-কাহিনী।           

কিছুক্ষনের মধ্যে ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢোকে। ছেলেটি জেসমিনের সব লাগেজ নিয়ে একদৌড়ে ট্রেনে উঠে সিটের নীচে ঢুকিয়ে হাসি মুখে বলে, ‘ব্যস, আপা বসে পড়–ন’। জেসমিন বসতেই, ‘আমি আসছি একটু’, বলে ট্রেন থেকে নেমে যায়। কোন কিছু বোঝার আগেই একটা বড় জলের বোতল নিয়ে ফিরে আসে।          

......‘আরে আরে, আমার কাছে জল আছে তো। আচ্ছা, এটার টাকা...’। কোন উত্তর না দিয়ে ছেলেটি প্ল্যাটফর্মে নেমে যায়। জেসমিনের মুখোমুখি জানালার রড ধরে দাঁড়ায়। সারা মুখে বিষন্নতার ছাপ, চোখ ছলছল করছে,     

......‘আপা, আপনি খুব ভাল। আবার এসো, আমাকে এখানেই সবসময় পাবে’।  

জেসমিন হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। অনেক না বলা কথা ফুটে উঠছে ছেলেটির চাহনিতে। বিশ্বাস! ভালবাসা!  এমন সময় হঠাৎ ট্রেন দুলে ওঠে। চলা শুরু হতেই জেসমিনের মনে এলো, আরে ওর নামটাই তো জানা হয় নি।       

......‘তোমার নামটা?’। ট্রেন তখন অনেকটাই গতি নিয়ে ফেলেছে। তাও শুনতে পেলো,     

......‘র-হ-ম-ত প্রামা-নিক’।  

রহমত! রহমত! এ এক অদ্ভুত অনুভুতি! যা জেসমিনকে স্তব্ধ করে দিল। মনে মনে বললো, ‘ভাল থাকিস ভাই। দেখা হবে। আমি আবার আসবো’।            

ট্রেনের গতির সঙ্গে জোরে হাওয়া লাগতে লাগলো গায়ে। জেসমিন অনেকক্ষন একদৃষ্টে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলো। রহমতের মায়াবী মুখটা বার বার ভেসে উঠছে। হঠাৎ ওর মনে এলো, আচ্ছা, রহমত-রাও তো কুড়িগ্রাম থেকে এসেছিল। এখন রাজনীতি নিয়ে যা চলছে......এতদিন এই দেশে থাকার পরেও যদি ওদের ঘরছাড়া হতে হয়, ডিটেনসন ক্যাম্প! রক্তপাতহীন নিঃশব্দ অঙ্গচ্ছেদের যন্ত্রনার মতো জেসমিনের মন ফাফিয়ে কেঁদে উঠলো..... না, না, এ হতে পারে না, অসম্ভব। আল্লাহ এতো নিষ্ঠুর নয়। তারপর চোখ বন্ধ করে একমনে প্রার্থনা করে যেতে লাগলো, ‘রহমতের যেন কিছু না হয় আল্লাহ, কিছু না হয়, ওকে খুব, খুউব ভাল রেখো’।



পদাবলি : ০১

পদাবলি : ০১

 



শুধু তোমাকে ভালোবাসি 

রৌদ্র রাকিব 


বহুবার বলেছি; বহুকাল অপেক্ষা করেছি; 

বহুদিন দেখেছি; বহুবার কতকথা শুনেছি; 

শুধু তোমাকে ভালোবাসি বলে।


তবুও ভালো আছি; তবুও বেঁচে আছি; 

তবুও হাসিখুশি আছি; তবুও সুখে আছি;

শুধু তোমাকে ভালোবাসি। 


তুমি চলে যাও- তুমি ভুলে যাও!!

তুমি কিছু রেখে যাও- তুমি হারিয়ে যাও- 

শুধু তোমাকে ভালোবাসি।




চলে যাবো

মাসুদ পারভেজ 


তোমাদের এই ঝঞ্ঝাট জমকালো কৃত্তিম কোলাহলপূর্ণ শহর ছেড়ে চলে যাবো,

চলে যাবো তোমাদের দেয়া কবি নামের এক অভিশাপ নিয়ে

জানো তো, কঠিন দুঃখবোধ না থাকলে নাকি কবি হওয়া যায় না,

আমি আজীবন সে প্রয়াস চালিয়ে যাবো।

যদিও তোমাদের প্রতি অনেক অভিযোগ আছে আমার, অনেক কথা বলবার আছে;

বলবার আছে- তোমাদের শহরে পাখিদের ঠাঁই নেই, বৃক্ষ নেই, সহস্র মানুষের ভেতর একটিও মানুষ নেই।

সুন্দরী অনেক ললনা আছে একটিও প্রেমিকা নেই,

অনেক অনেক প্রেমিকা আছে একটিও প্রেম নেই।

অনেক পুরুষ আছে কিন্ত একজনও বিশ্বস্ত সঙ্গী নয়।

তোমাদের শহরে সবুজ বিছানি নেই আছে চকচকে মার্বেল পাথরের অহংকার।

পুকুরের বা নদীর ঘোলা পানি নেই আছে পিত্তরংয়ে সুইমিংপুল।

তোমাদের দালানগুলো আকাশ দখলে নেওয়ার প্রতিযোগিতা এখন চরমে।


বলবার আছে তোমাদের শহরে গণহারে মানুষ মেরে গণতন্ত্রের চর্চা হয়

নারীর যৌনতার আবাদ করে নারীবাদের চর্চা হয়।

বেতনধারী স্বীকৃত বুদ্ধিজীবীদের পানশালা হয় রাজদরবারে।

চলে যাবো এই কাগজে প্লাস্টিকে মোড়ানো শৌপিচের অভিনয় ছেড়ে।


তোমাদের কুকুরগুলো নাকি নবজাত মনিষ্যপুত্রেরও বেশি আদর অভিলাষ নিয়ে লালিত হয়।

তোমাদের অভিজাত শোবার ঘরে, বারান্দায় কুকুরের আশ্রয় থাকতে পারে একজন কবির নয়।

তোমাদের দালানের ছাদে বায়োপ্ল্যাগে মৎসকুলের অভিশাপ নিয়ে আমি এক মুহুর্তও থাকতে চাই না।


আমি সবুজ পাতার ফাঁকে বেরিয়ে আসা একমুঠো রোদ্দুরের জন্য চলে যাবো,

ঝিলে ফোটা রক্তকমলের পাশে মিটিমিটিয়ে হাসা একটুকরো চাঁদের জন্য চলে যাবো।

চলে যাবো ছাগলছানার তিড়িং-বিড়িং নাচের খোঁজে অথবা গরু বাছুরের নিষ্পাপ চাহনির জন্য।

নীল আকাশের তলে দলে দলে পাখির ডানা মেলা সুন্দরের জন্য

চলে যাবো সবুজের আঁচল ছিঁড়ে এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া নদীর জন্য।

চলে যাবো সোঁদামাটি, পলিমাটির গন্ধে ভরা মানুষের কাছে,

চলে যাবো একটি স্নিগ্ধ বিকেল এর কাছে

চলে যাবো শিশির ভেজা একটি সকালের কাছে

চলে যাবো একটি সুন্দর নিশ্চুপ নিশ্চল নিষ্পাপ পৃথিবীর কাছে।



প্রেমিক বলতে এখনো তোমাকেই বুঝি

রফিকুল নাজিম 


অনেকদিন হয় তোমার নাগাল পাই না

কই পালাইছো? 

আমাদের এইদিকে কি আর আসো না?

কেরামতের টং দোকানের চায়ের তৃষ্ণা মিটে গেছে

তোমার রং চায়ের নেশাটা কেটে গেছে?

আজকাল কি তবে দুধ চায়ে ঠোঁট ভিজাও?


জানো?

এখনো সেই শালিকটা বিকেলে আমার বারান্দায় আসে,

রেলিংয়ে বসে। তারপর আমার চোখে মায়া মেখে দেয়

আমি এটা ওটা খেতে দেই, 

শালিকটা ঠোঁট বাড়িয়ে খায়।

আহা! উড়াল পাখিটাও আমার পোষ মেনেছে; 

কেবল তোমাকে আমার বশে আনতে পারিনা,

কেবল তুমি আসো না,

কেন্ আসো না, নাগর?

অথচ আমি নিয়ম করে বারান্দায় আসি

আড়চোখে ইতিউতি তোমাকে খুঁজি

তবুও কোত্থাও তোমাকে আর পাই না।

আচ্ছা-তুমি কি এখন অন্য মহল্লায় যাও

হাতে ফুল নিয়া কি অন্য গলিতে দাঁড়াও

অন্য কোনো বারান্দার দিকে বিড়ালের মত মুখ দাও?

চুকচুক করো?

কার জানালার পর্দা গলিয়ে অন্দরমহলে চোখ বাড়াও?


অথচ আমার চোখ কেবলই তোমাকে খুঁজে... 

আকুলিবিকুলি মনটা তোমাকেই প্রেমিক মানে; 

অন্য কোনো সিটি প্রেমিক সে খোঁজে না

প্রেমিক বলতে এখনো সে শুধু তোমাকেই বুঝে।



স্বকীয়তা হারিয়ে

জহির খান


ঝড়ের বেগে চলছে সময়

অসমাপ্ত গল্পের পিছনে


তবুও নিষ্ঠুর গল্পের নায়ক

দেখার চেষ্টাই করলো না তোমাকে!

ইজাজ মিলনের লেখাগুলো আমাকে অশ্রুসিক্ত করেছে

ইজাজ মিলনের লেখাগুলো আমাকে অশ্রুসিক্ত করেছে

 



ইজাজ মিলনের লেখাগুলো আমাকে অশ্রুসিক্ত করেছে

গোলাম সারওয়ার 


ইজাজ আহ্মেদ মিলন সমকালের গাজীপুর প্রতিনিধি। একাšøই একজন স্বল্পবাক, আত্মমুখীন নিভৃতচারী সাংবাদিক। নিজেকে জাহির করার প্রবণতা সাংবাদিকদের মধ্যে যথেষ্ট প্রকট। এই ব্যাধি থেকে মিলন মুক্ত বলে ওর সঙ্গে কথা হয় কদাচিৎই। স্বল্পবাকই নয়, মিলন চলনে-বলনেও খুব নিরীহ। সম্প্রতি সে আমার সঙ্গে দেখা করে তার প্রকাশিতব্য নতুন গ্রন্থ ‘১৯৭১ :বিস্মৃত সেই সব শহীদ’-এর ভূমিকা লেখার অনুরোধ জানাতেও সে ছিল ™ি^ধান্বিত। দেশে ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক অস্থিরতা। পেট্রোল বোমায় দ¹ব্দ হচ্ছে নারী, পুরুষ, শিশু। হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মাংস পোড়ার গন্ধ, আহতদের আর্তনাদে বাতাস ভারি। ভয়ঙ্কর উত্তেজনা ও ব্যস্ততার মধ্যে সাংবাদিকদের প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত। এ সময়ে কোনো পুস্তকের ভূমিকা লেখার দুরূহ কাজ (যে কাজে আমি আদৌ অভ্যস্ত নই) সম্পন্ন করা সম্ভব নয় বলে জানালেও মিলনের করুণ মুখ দেখে অবশেষে দু’কথা লেখার জন্য সম্মত হয়েও তাকে অনেক দিন অপেক্ষমাণ রাখতে হয়েছে। এ জন্য কিছুটা মর্মবেদনাও অনুভব করেছি। মিলন তার নতুন বইয়ের পা-ুলিপি দেওয়ার সময় প্রকাশিত তিনটি বইও দিলÑ ১. পোড়ামাটির ক্যানভাসে বিরামহীন বেদনা, ২. দেহারণ্যের ভাঁজে শূন্যতার বিলাপ, ৩. ছাতিম গাছের মৃত ছায়া। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘নষ্ট শরীর ভিজে না রৌদ্রজলে’ পাওয়া গেল না।

মিলনের প্রকাশিতব্য গ্রন্থ ‘১৯৭১ :বিস্মৃত সেই সব শহীদ’-এর সূচিবদ্ধ ২৫ শহীদ মুক্তিযোদ্ধার অজানা মর্মস্পর্শী কাহিনীগুলোর ওপর চকিত চোখ বুলিয়েছি। সবগুলো পড়া হয়নি। লেখাগুলো আমাকে অশ্রƒসিক্ত করেছে। স্বামী ফিরে আসবেন Ñ পথের দিকে আজও চেয়ে থাকা শহীদজায়া আনোয়ারার কথা লিখতে গিয়ে বারবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছে মিলন। শুধু আনোয়ারার কথা লিখতে গিয়েই নয়, অন্যদের গল্পেও আবেগ ও বেদনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। মিলনের বাংলা একেবারেই নির্ভার, ঝরঝরে। বর্ণনার অনুষঙ্গে দৃশ্যমান হয়েছে যেন কবির চোখে দেখা প্রকৃতি। শহীদ শামসুদ্দিনের স্ত্রী আনোয়ারার জবানিতে, ‘দুধভাত খুব প্রিয় ছিল তার। সাথে কলা। আমাদের একটা গাভী ছিল। খুব সকালে উঠে রান্না শেষ করেছি। গাভীর দুধ দিয়ে ভাত দিলাম। তিনি খেতে বসলেন। কিন্তু আমাকে ছাড়া খাবেন না। যু™েব্দ না যাওয়ার জন্য বারবার আমি অনুরোধ করেছিলাম। তিনি শুনলেন না। অনেকটা অভিমান করে সেদিন তার সাথে খেতে বসিনি। আমি বসিনি বলে তিনিও আর খেলেন না। চলে গেলেন, অনেকটা অভিমান করে।’ এমনি করে বহতা নদীর মতো এগিয়ে গেছে জীবনের গল্কপ্প, জীবনের বেদনা-অশ্রƒপাত। তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে আমাদের চারপাশের নিসর্গ, প্রকৃতি। সম্ভবত মিলন মূলত কবি বলেই প্রকৃতিতে প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছে। তার কবিতার প্রশংসায় দেশের সেরা কবিরা পঞ্চমুখ। কবি আল মাহমুদ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, মহাদেব সাহা তার কবিতা ও গদ্যের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। গদ্য লিখতে তাকে প্রেরণা দিয়েছেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ও হুুমায়ূন আহমেদ। তারা যে একজন যোগ্য লোককেই অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, তা ‘১৯৭১ :বিস্মৃত সেই সব শহীদ’ পাঠ করে হƒদয়ঙ্গম করতে পেরেছি।

ইজাজ আহমেদ মিলন তার এলাকার বিস্মৃত শহীদদের কথা জানতে, তাদের কথা আমাদের জানাতে গ্রাম-গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছে। জহির উদ্দিনের ‘কষ্টগুলো পাথর’ হয়ে যাওয়ার গল্প, শাহাব উদ্দিনের লাশ হয়ে ফিরে আসার কথা, গোলাম মোস্তফার ‘তেতাল্লিশ বছরেও স্বীকৃতি না মেলা’, শামসুদ্দিনের স্ত্রী আনোয়ারার ‘পথপানে চেয়ে থাকা’, শহীদ খন্দকার আবুল খায়েরের সন্তান আবুল কাশেমের যন্ত্রণার গুরুভার বেদনার অক্ষরে লিপিবদ্ধ করেছে। ইজাজ আহ্মেদ মিলনের গ্রন্থটি প্রকাশকালও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার মনে হয়েছে। বাংলাদেশের গৌরবময়  স্বাাধীনতায় যারা বিশ^াস করে না, যারা মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের বাংলাদেশের বিরুদ্ধে গভীর চক্রান্তে লিপ্ত , যারা দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের চাকা রুদ্ধ করতে চাইছে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা এখন যুদ্ধে লিপ্ত। মিলনের এই পুস্তকটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আরও শানিত করবে বলে আমার বিশ^াস।


[মরহুমের অতীত ভালোলাগার অংশবিশেষ]

বৃষ্টি পড়ে !

বৃষ্টি পড়ে !


অপেক্ষায় ছিল সালমা।অনেক দিনের অপেক্ষা-অনেক বছরের অপেক্ষা।ঢাকা থেকে শামীম রওনা দিয়েছে।
সকালেই বিমান থেকে নেমে ফোন করেছিল,আসছি বউ।উতলা বউটি খুশীতে ডগো-মগো।প্রায় তিন বছর পর স্বামী আসছে।

থৈথৈ উতলা মন থেমে যায়।যখন সালমার ছোট ভাই ও শামীমের ছোট ভাই ঢাকা থেকে, ফিরে এসে বলে,শামীম ভাইয়ের রোগ হইয়িছে,কঠিন রোগ।পুলিশ বলেছে,করোনা হইছে,সে এখন ঢাকাতে হাসপাতালে থাকবে।
দড়বড়িয়ে বৃষ্টি হওয়ার দৌড়ের মত, হঠাৎ থেমে থেমে গুমড়িয়ে ওঠে, সালমার মনের ভিতর।সে যখন আগুন ঝাপ দেবে ভাবছিল, তখন আগুনটা দড়দড় করে, পানি ঢেলে দিয়ে নিবিয়ে দিলো,এই দুঃসংবাদ।

চৈত্রের জোছনাময় রাতে  ঘরে শুয়ে,একা-একা এপাশ-ওপাশ করতে থাকে।সালমার শাশুড়ি আল্লা-আল্লা করে করে,কেঁদে-কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছে।এখন শুধু সালমার আকুতি, বুকভরা যন্ত্রণা,ঢেউ ওঠা পানির মত উথলিয়ে উথলিয়ে উঁপচিয়ে পড়তে চায়।  তিন বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছে।ভরা কলস রেখে, হতভাগ্য স্বামী, ভাগ্য ফেরাতে বিদেশ যায়।টাকা-পয়সা কম পাঠায়নি বাড়িতে।অনেক অনেক টাকা পাঠিয়েছে।সে টাকা দিয়ে সুন্দর একটি বাড়ি বানিয়েছে।ছোট ভাইটার লেখাপড়ার খরচ দিচ্ছে।মাঠে দু'চার বিঘা জমিও কিনেছে।শুধু সালমায় বুকে পাথর বেধে, স্বামীর অপেক্ষায় থেকেছে। এসব ভাবতে ভাবতে, সালমা ক্লান্ত হয়ে যায়।পাড়াঘরের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘরের চালের উপর টুপটাপ কিছু হুড়োজবর পড়ার শব্দ হলো।এরপর শ-শ-শ শব্দে, হালকা ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে।সালমা পাশ ফিরে শুতেই বুকের গহীনে বাতাসের অংশ প্রবেশ করে।বুকটা তার হালকা ভাবে প্রাণ ফিরে পায়।এতক্ষণ যে দম বন্ধ হয়ে আসছিল, তা থেকে একটু মুক্তি পায়।ঘর্মাক্ত ব্লাউজটা নিজের মাথাটা একটু উঁচু করে, খুলে ফেলে।অন্তর্বাসটা আর খোলে না।তবু জোরে নিঃশ্বাস নেয়।
শামীমকে ভেবে আর কি হবে?তবুও মনটা চঞ্চলা টুনটুনির পাখির মত, নেচে নেচে বেড়ায়।শামীম বাঁচবে তো?যদি মরে যায়,আর ফিরে না আসে? তার সামনে সাদা কাফনে মোড়ানো লাশের দৃশ্য ভেসে ওঠে।

গ্রামের মানুষ সবাই মিলে, খাটোয়া কাঁধে নিয়ে, গোরস্থানের দিকে যেতে দেখেছে বহুবার।সালমা যে ঘরে থাকে, ওই ঘরের বেশ দূর দিয়ে, গোরস্থানে লাশ নিয়ে যাওয়া দেখা যায়।অনেকদিন সে, জানালার পাশে এসে দেখেছে,ওই গ্রামের মৃত মানুষকে নিয়ে যেতে। তার শরীরের লোম নেই,তবুও যেন, যে কটা আছে, সেগুলো খাড়া হয়ে, কাটা হয়ে যায়।দ্রুত উঠে গিয়ে,জানালা বন্ধ করে দেয়।তার বড় ভয় করছে।জানালা বন্ধ করার সময়, আকাশের চাঁদের আলো এক ঝলক তার শুকনো মুখে লেগে, হারিয়ে যায়।বিছানায় গড়া দেওয়ার আগে, কিছুক্ষণ বসে থাকে।ব্লাউজটা দু'হাত উঁচু করে, পরে নেয়।তারপর কাঁইত হয়ে শুয়ে পড়ে।হাতের উপর মাথা রাখে।অমনি প্রতিদিনকার পথ আগলিয়ে দাঁড়ানো,সেই বদমাইশটার মুখোচ্ছবি ভেসে ওঠে।তার নাম মিয়াজান।শামীমের সহপাঠি ছিল।অথচ বিয়ে হওয়ার পর থেকে প্রায় এ বাড়িতে আসতো।তার চোখেমুখে ছিল একধরণের দুষ্ট হাসি।সালমা দেখেও না দেখার ভান করতো।শাশুরি ছেলের বন্ধু হিসেবে,তাকে বেশ যত্ন করে,আদর করে ডাকে,আয়সু বাপ-বইসু।

 হতাশার এ রাতে, বার-বার তার মুখের ছবিটা,বোতামখোলা বুকের ছবিটা,  গালজড়ানো হাসিটা সালমাকে মাদকের মত টানছে।মিয়াজানের মুখোচ্ছবি ছাড়া, সে আর কিছুই দেখতে পারছে না।বাইরে থেকে খুব ধীরে ধীরে বৃষ্টি পড়ার শব্দ ভেসে আসছে।সালমার উত্তপ্ত শরীরটা ধীরে ধীরে মিয়াজানের চোখে চোখ রেখে, হারিয়ে যায় ঘুমঘরে।ঘরের চাল থেকে বৃষ্টি পড়ে টিপটপ-টিপটপ....।