নৃ মাসুদ রানা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নৃ মাসুদ রানা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রাষ্ট্র যা চায় ...

রাষ্ট্র যা চায় ...

 


রাষ্ট্র যা চায়...

সাদিকুর রহমান


রাষ্ট্র কি কিংবা তার পরিচয় কি এসবের আলোচনায় না গিয়ে বরং সে কি চায় তার আলোচনাই এখানে মুখ্য। আমরা যাকে বাংলায় রাষ্ট্র বলি ইংরেজিতে তাকে স্টেট বলে। আর এই স্টেট শব্দটির উৎস হলো ল্যাটিন শব্দ স্ট্যাটাস বা অবস্থা। অর্থাৎ আজকে আমাদের দেশের যে অবস্থা, তাই হলো এই স্টেট। আর এই স্টেটের শাসক যেই হোক না কেন, তারা যা চায় তার মাঝে খুব একটা পার্থক্য নেই। বরং তারা ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে বা দলে বিভক্ত হয়ে একই স্বার্থ হাসিলের জন্য একই পদে আরোহন করতে চায়। আর ওই পদটিই হলো মূলত আমাদের রাষ্ট্র। তিনি সর্বদা ভীতি ছড়াতে ও শক্তিমান কিন্তু তার বিপরীত তাকে কর্দমাক্ত করে নুইয়ে দিতে চান। তিনি চান, গোলাপের সৌরভ কেবল তারই হোক। সেই সৌরভ গোলাপ ছড়ালেও আমরা যে ঘ্রাণ পাচ্ছি, তা কেবল তার বদান্যতা ও কৃপায়। তিনি চাইলে এই গোলাপের গাছকে শিখরসহ উপড়ে ফেলতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননি। কারণ তিনি দয়ালু, কৃপাময় ও পরোপকারী এবং বড় মনের উদার মানুষ। আমরা যে সৌরভ পাচ্ছি এজন্য তার গুণগান গাওয়ার পাশাপাশি স্বয়ং গোলাপেরই উচিত তার জন্য অধিক কাল বেঁচে থাকার প্রার্থনা করা। এই রাষ্ট্র এমন গোলাপের চারা বর্তমানে রোপণ করছে,  যেখান থেকে কোন সৌরভ চড়াবার কোন সম্ভাবনা নেই। বরং এই গোলাপের পেছনে অর্থ ব্যয় কোন ইনভেস্ট নয় বরং ওয়েস্ট (অপচয়)। আর এমন অপচয় রাষ্ট্র বারবার করতে প্রস্তুত। কারণ যে তাকে কাপুনি ধরিয়ে দিতে পারে কিংবা তার নড়বড়ে ভিক্তিকে সমূলে উৎপাটিত করে দিতে পারে এমন বৃক্ষের চাষাবাদ তিনি কেন করবেন? না তার কখনো এমন বৃক্ষের চাষাবাদ কিংবা রোপন করা উচিত নয়! বরং এই ধরায় বৃক্ষ যদি তার সত্তাকে ভুলে গিয়ে অন্যের মতো হয়ে বাঁচতে চাওয়ার আবেদন কে মেনে নেয়, তবেই তার চাষাবাদ উর্বর হবে। আর তাইতো এখন সব দেশেই চলছে এমন যুবকের উর্বর চাষাবাদ। যে সকালের রোদকে ঘরে প্রবেশ করতে না দিয়ে বরং কপাটকে শক্ত করে আটকে দিয়ে কম্বল মুড়িয়ে উষ্ণতা খুঁজে। অথচ তার চেয়ে আরো আরামের উষ্ণতা এই সুন্দর প্রাকৃতিক রৌদ্রময়ী সকাল তাকে স্বাগত জানাচ্ছে। সে স্বাগতম পছন্দ করবে কেন? সে পছন্দ করবে কোন উর্বশী তরুণীর তাড়না। যে তাকে দুঃখ বা যন্ত্রণা দিলেও সে এই জ্বালাকে সাদরে গ্রহণ করে নিবে। যে চাওয়া তাকে বেদনা দেয়; সে এমন চাওয়া বারবার চাইবে তাতে আপত্তি নেই বরং আপত্তি যে তাকে স্বাগতম জানাবে তাকে গ্রহণ না করার। সে উর্বশী কোন তরুণীকে না পাওয়ার বেদনায় আক্ষেপ করতে প্রস্তুত, কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে কিংবা বৃহৎ উদ্দেশ্য সাধনে ঘর থেকে বের হতে রাজি নয়। বরং আমি না গেলেও চলবে; অন্য আরো অনেকে তো আছে। তারা এসে করে ফেলবে, এমন মানসিকতায় ভরপুর আজ এই দেশ। বৃহদাকার যৌবন ধারণ করা এই তরুণ যুদ্ধে যাওয়ার সকল সম্ভাবনাকে অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, এখন পরিস্থিতি এমন দাড়িয়েছে যে, সামান্য কায়িক শ্রম করতেও দিতে রাজি নন আমাদের পিতামাতারা। ফলে আমরা উৎপন্ন হয়েছি শোপিচ বৃক্ষে। যে দেখতে সুন্দর, পরিপুষ্ট ও নড়বড়ে। আর রাষ্ট্র সর্বদা রোপণ করে দেখতে সুন্দর, পরিপুষ্ট ও ক্ষয়িষ্ণু এমন  বৃক্ষের। যে ভয় পাবে ঝড়কে এবং ঝড়ের সময় সে যেন প্রয়োজনে রাবারের মত হেলে পরতে ও নিজেকে বাঁচাতে পারে এমন কৌশল তাকে শিখিয়ে দিবে। সে এমন বৃক্ষের চাষাবাদ কিংবা রোপন করে না, যে ঝড়ের সময় সিনা টান করে দাঁড়িয়ে ঝড়কে হুংকার দিয়ে উঠতে পারে! রাষ্ট্র এখন যে তরুণের রোপণ ও চাষাবাদ করছে তাকে দিয়ে বিপ্লবের ফুল আর ফুটবে না বরং প্রেম নামক স্থুল অনুভূতি তসরুফ করে দিয়েছে যুবকের সব! 


উঠতি বাজির ঘোড়া...

উঠতি বাজির ঘোড়া...

 


উঠতি বাজির ঘোড়া

মাহমুদ নোমান


যে লেখক লিখতে এসে কাগজের পর কাগজে নিজের ভাব বোধকে অক্ষরে তুলে ধরতে নিরলস সাধনায় মগ্ন থাকতেন, তিনিও আজ বার্ধক্যে এসে প্রাণপণে ফেইসবুকে কবিতা গল্প নিজের মতামত বুড়ো আঙুলে টিপে টিপে ঢেলে দিচ্ছেন। প্রতিজন লেখকের ফেইসবুকের সময়খাতাটি একেকটি সাহিত্য পাতা। কারও দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন মনে করি না। আগে পত্রিকায় লেখা পাঠিয়ে একখানা চিঠিও লিখতো, জীবদ্দশায় কখনও সাহিত্য সম্পাদকের সাথে সশরীরে দেখা হবে কীনা প্রশ্ন ছিল সেটি এখন বার্তাবক্সে সেরে যায়। উল্টো সাহিত্য সম্পাদকের পোস্টে লাইক কমেন্ট না করলে গোস্বাটি দ্বিগুণ ফুঁসে ওঠে আরেকজন লেখকের পোস্টে লাইক কমেন্টে বেশি প্রশংসা করতে দেখলে। ভীষণ অভিমানে লেখা আর ছাপেন না। এরমধ্যে সাহিত্য সম্পাদকের দাম বেড়েছে এই মর্মে সাহিত্য সম্পাদক আরও বেগবান বিস্তারে শক্তিশালী হয়ে উঠেন নিজে নিজে। লেখা ছাপা হবে না এই ভয়ে কেউ কেউ প্রকাশ্যে হঠাৎ ঝলকে আগল খুলে প্রকাশ্যে হে হে উচ্চকণ্ঠের মতামত রাখে। এসবের কসরতে পত্রিকায় ছাপা হওয়া লেখাটিই কবি ছবি তুলে কানে ধরে এনে বুড়ো আঙুলে চেপে মুখবইয়ের সময়খাতায় তুলে দেন, জাতি যেন হৈচৈ করে ওয়াও, নাইস, কংগ্রেটস্, কংগ্রেচুলেশন, অভিনন্দন জানান... অর্থাৎ মুখবইয়ের (ফেইসবুক) সময়খাতা (টাইমলাইন) একমাত্র সত্য, আসল....


সেই সময়ে এসে কেউ ছাপা হওয়া বইয়ের শিল্পকে বুকে লালন করবে, এটা হঠাৎ দুঃস্বপ্ন দেখার মতোই। যখন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম হৈচৈ করে বাড়ছে প্রতিদিন। খাওয়ার জিনিস, পরার জিনিসের দাম যেখানে বাড়ছে বইয়ের কাগজের দাম না বেড়ে থাকেনি। আগেই বলেছি ফেইসবুক থাকতে সব ফেইক, ছাপা হওয়া বই কেন পড়বে যদি সেটি ফেইসবুকে পাওয়া যায়? অপরজনেরা মাংস চিবোচ্ছে প্রতিবেলা, প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানে বুঝে এখন অনেক টাকার মালিক হওয়া, আগে যেখানে মুরব্বিরা বলতো - মানুষ হও....

এই যে মানুষ হতে জ্ঞানীর কথা পড়তে হবে। সেসব জ্ঞানী ভালো মানুষ সব তো এখন ফেইসবুকে। সারাদিন দুর্নীতি করে ফেইসবুকে এসে কাউকে একটা কম্বল দান করছে সেটি পোস্ট দিয়ে ভালো মানুষ সাজে, ব্যস্ত ক্লান্ত হয়ে নেতিয়ে পড়ে ঘুম.....

এরপরে ঐ মুখস্থ করে ডিগ্রি অর্জন শুধু টাকা কামানোর জন্য আর টাকা কামাতে দুর্নীতি যে যেরকম চমৎকার করে পারে এইরকম ব্যাপার....

এই সময়ে ছাপা হওয়া বই করার স্বপ্ন যাঁরা দেখে অর্থাৎ লেখকের স্বপ্নকে সবার সম্মুখে তুলে ধরে যেসব মানুষ তাঁদেরকে সত্যিকারের মানুষ মনে হয়। আলাদা খুশবু পাই তাঁদের শরীর থেকে। আবার তাঁরা যদি হয় বয়সে চল্লিশের আগে, তাহলে এরা নিষ্পাপ....

এদেরকে লালন করার যতœ নেওয়ার সেই স্পর্ধা রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিরও নেই, কেননা অপবিত্র হাতে এদের আগলে রাখবে কীভাবে!

এসব প্রকাশকদের মধ্যে কয়েকজনের স্বপ্ন আমি জেনেছি, তাঁদের অসহনীয় কষ্ট দেখেছি, অনুভব করতে চেয়েছিও তাঁদের সাথে উঠাবসা করে তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে বেশ অগ্রসর মনে হলো এইসময়ে-


১. পেন্ডুলাম পাবলিশার্সে রুম্মান তার্শফিক:



রুম্মান তার্শফিক এখনও ত্রিশ ছুঁয়নি। এই বয়সে প্রকাশনার বিষয়ে বিস্তর পড়াশোনা আর এই জগতের ধুলাবালিও মেখে নিয়েছে পরম ভালোবাসায়; প্রকাশনাকে কীরকম অন্তস্ললে লালন করে, যেন সেখানে কোন দোষে বাহিত না করে। নিরলস প্রচেষ্টার মধ্যে প্রেসে প্রেসে ঘুরে এমনকি নিজের চোখেও দেখেছি প্রেসে, বাঁধাইয়ের ঘরের মেঝেতে অতো পুরুষের মাঝেও স্বতস্ফূর্তভাবে বসে পড়ে বইয়ের খুঁটিনাটি ঠিক করতে। লেখক লিখেন কিন্তু সেটাকে প্রচার-প্রকাশযোগ্য অর্থাৎ সমাজে রাষ্ট্রে যোগ্য করে উঁচিয়ে তুলে ধরার অভিভাবক বনে যান একজন প্রকাশক। কী পরম মমতায় লেখকের বই নিজের করে লালন করে রুম্মান তার্শফিক। সবাই জানেন- সৃজনশীল প্রকাশনায় ভবিষ্যৎ নেই’ এই অর্থে টাকা পয়সা নেই অথচ রুম্মান যে পরিমাণ কষ্ট সহ্য করে হতাশা মাড়িয়ে হাসে, প্রাণবন্ত থাকে সত্যিকার অর্থে সম্মানের যোগ্য। একজন কবিত্ব মনের অধিকারী হিসেবে এই প্রকাশনা শিল্পীর এমন আত্মত্যাগ আমাকে ঋণী করে.....


প্রকাশনা জগতে পেন্ডুলাম পাবলিশার্সের উল্লেখযোগ্য কাজ -

আমরা হেঁটেছি যাঁরা (ইমতিয়ার শামীম), কন্যা ও জলকন্যা (জাকির তালুকদার), মান্টো কে আফসানে (অনুবাদ: কাউসার মাহমুদ), ফিফটিন গভর্নরস আই সার্ভড উইথ (অনুবাদ: আনোয়ার হোসেন মঞ্জু), হোয়াই ইজ সেক্স ফান (অনুবাদ: সন্ন্যাসী রতন)।


২. উপকথা প্রকাশনের ফকির তানভীর আহমেদ:


নামের আগে ফকির- এটি নিয়ে তানভীর ভাইকে কখনও প্রশ্ন করিনি কিন্তু ভেবে পেয়েছি তিনি সত্যিকারের ফকির। অর্থাৎ ফানা হয়ে যাওয়া, আত্মত্যাগ শুধু যে শিল্পে; ফকির তানভীর ভাইয়ের পড়াশোনাও বেশ, মার্জিত বোধ সম্পন্ন প্রকাশনার প্রতিটি কাজ। উপকথা প্রকাশনাকে ইতোমধ্যে বেশ গাম্ভীর্যে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।


প্রকাশনা জগতে উপকথা প্রকাশনার উল্লেখযোগ্য কাজ -

সতীনাথ ভাদুড়ী রচনাবলি ৪ খন্ড, দারোগার দপ্তর ৩ খন্ড, বিমল কুমার সমগ্র ২ খন্ড, জয়ন্ত মানিক সমগ্র ৩ খন্ড,

তারাশঙ্কর রচনাবলি ২৫ খন্ডে ।



৩. চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনের মঈন ফারুক:



ইতোমধ্যে চট্টগ্রামের ‘চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনকে বেশ নির্ভরযোগ্য জায়গায় নিয়ে গেছেন মঈন ফারুক। বেশ বুদ্ধিদ্বীপ্ত আর কৌশলে রয়েছে আন্তরিকতার ছাপ। হোঁচট খেয়ে দাঁড়ানোর মানসিকতা মঈন ফারুককে নিয়ে যাবে অনন্য উচ্চতায়...


প্রকাশনা জগতে চন্দ্রবিন্দু প্রকাশনের উল্লেখযোগ্য কাজ-

উপন্যাস সমগ্র : মলয় রায়চৌধুরী, গল্প সংগ্রহ : মোহাম্মদ রফিক, জয়নালের ইতালিযাত্রা : জাহেদ মোতালেব, পয়েন্ট ওয়াই (থ্রিলার) : জয়নুল টিটো, তারাশঙ্কর : জাকির তালুকদার।


৪. জাগতিক প্রকাশনের রহিম রানা :



রহিম রানাকে সম্ভবত বেশি অনুভব করি স্নেহে ভালোবাসায়। সেটি রহিম রানার প্রাপ্য। রহিম চমৎকার রানার। প্রকাশনা জগতে কে কখন ল্যাং মারে সেখানে রহিম রানার দৃঢ়চেতা মনোভাব, সেই সাথে স্কিলফুল ফোর্স প্রকাশনার বিবিধ সৌন্দর্যে রহিম রানা বেশ এগিয়ে যাচ্ছে। প্রকাশনা শিল্প নিয়ে রহিম রানার স্বপ্নের নিজস্ব জগৎ বেশ বর্ণিল...


প্রকাশনা জগতে জাগতিক প্রকাশনের উল্লেখযোগ্য কাজ-

বিপ্লবী বাংলাদেশ (১৯৭১ সালে প্রকাশিত পত্রিকা), পুঁজি ও পুঁজিবাদ (নাওজীশ মাহমুদ), শাহবাগ। ধর্ম রাজনীতি চেতনা (বিধান রিবেরু), স্মৃতির খেয়ায় যাই ভেসে যাই (আনোয়ারা সৈয়দ হক), বধ্যভূমির পথে পথে (ড.সেলিনা রশীদ)।



আহত পতাকার কান্না

আহত পতাকার কান্না

 



আহত পতাকার কান্না 

মুহাম্মাদ মাসুদ


কান্নার শব্দে থেমে গেলাম। বোবা কান্নার মতো। শব্দ যেন ভিতর থেকে বের হতেই চা”েছ না। ঠিক যেন মোমবাতিতে আগুন জ্বালালে কোন ধোঁয়া আসে না। শুধু নিভু নিভু করে আগুন জ্বলতেই থাকে। মোম গলে যেমন মোমবাতি চুইয়ে চুইয়ে পরে ঠিক তেমনি চোখের অশ্রু নামক রক্তগুলো গাল বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে পরছে। বারবার গামছা দিয়ে চোখের রক্তগুলো মুছলেও আবার এক নিমেষেই পূরণ হয়ে যা”েছ।

পুরনো একটি ব্যাগ। ধুলাবালি, মাটি আর এটাসেটা লেগে অন্যরকম একটা রুপ নিয়েছে ব্যাগটি। একটা বোতল। পানির বোতলই হবে। মনে হচ্ছিল অনেকদিন ধরে বোতলটি ব্যবহার করলেও কোনরকম ঘষামাজা বা ধোয়া হয়নি। আর্সেনিকের কারনে হয়তো বোতলটা হলুদে ভরে গেছে। তবুও যেন বোতলটিই নিত্য সঙ্গী।

সাদা একটি চাদর। আসলে চাদরকে চাদর বলে সম্বোধন করা ঠিক হবে না। কেননা, চাদরের গায়ে লাল রঙের অনেক লেখা, কালো রঙের অনেক শোকাহত স্মৃতিচারণ, সবুজ রঙে দেশের কথায় ভরে গেছে চাদরটি। তাছাড়া, চাদরটি এক নাগাড়ে শরীরে দেওয়ায় ময়লায় অন্য রকম একটি ছবিতে পরিপূর্ণ হয়েছে। তবে লেখাগুলো এখনো ফুটে আছে। লাল রঙের লেখাটি ঠিক রক্তের মতো লাগছে। মনে হচ্ছিল দুই একদিন আগে আঁকা হয়েছে। চাদরে নানান রকমের ইতিহাসের চিহ্ন। ধীরে ধীরে আমার মনে প্রচন্ড আগ্রহ হচ্ছিল প্রকৃত ঘটনাটি জানার। সেজন্য একটি ট্রেন মিস করেও বসেছিলাম।

হাতে কিছু পাথর ছিলো। একটু দূরে বসে থাকার কারণে বুঝতে পারছিলাম না। একটি সিগারেট জ্বালিয়ে পাশে গিয়ে দাড়ালাম। কখনও লাল রঙের পাথরের টুকরো দিয়ে লিখেই আবার পরক্ষণেই মুছে ফেলছে। আবার কখনও কালো রঙের পাথরের টুকরো দিয়ে লিখেই আবার পরক্ষণেই মুছে ফেলছে। আমার কাছে সবকিছুই গন্ডগোল লাগছিলো। তবে, মুছে ফেলা লেখাগুলো আমাকে খুব নাড়িয়ে দিয়েছে। বাম হাতে থাকা কাপড়ের টুকরোটি মুছে মুছে অনেক ক্ষয় করে ফেলেছে। মনে হ”িছল কাজটি অনেকক্ষণ ধরেই একনাগাড়ে করছিলো।

হাতে মুকুট বিড়ি। ব্যাগের ভেতর কি যেন খুঁজছিল? ব্যাগের মধ্যে যা কিছু ছিলো তন্নতন্ন করে খুঁজেও পা”িছলো না। পকেটের ভিতর হাত দিয়েও যখন পেলেন না তখন আর কি করা? বিড়িটা আবার রেখে দিলেন।। কিন্তু ততক্ষণে বেশ নেশা হয়ে গেছে। কেমন যেন একটা অসস্তি অনুভব করছিল। প্রথমে নেশাগ্রস্ত মনে হচ্ছিল। কিন্তু না। সেরকম কিছু না। একটু পরেই আবার আগের মতো...।

সিগারেটের আগুন দেখেই মুচকি হেসে উঠলো। যেন জীবন জীবদ্দশায় কিছুটা দম ফিরে পেয়েছে নিশ্বাস

নেওয়ার মতো। ততক্ষণে পকেটে রাখা বিড়িটা বের করেছে। বুঝে উঠতে দেরি হলনা আমার তখন.....। তবে এরকম মলিন হাসি অনেকদিন দেখিনি। হয়তো আবার দেখতে পাবো কিনা সেটাও জানিনা। মনে হয় পৃথিবীতে যারা অল্প কিছু নিয়ে সুখে থাকার চেষ্টা করে শুধুমাত্র তাদের মধ্যে এই হাসিটা পাওয়া যায়। 

বাম হাতে বিড়ি, ডান হাত দিয়ে সিগারেটের আগুনটা নিয়ে ধরাবে এমন সময় কেউ একজন এসে সিগারেটের উপর পা দিয়ে সামনের দিকে হাটতে থাকে। রেলস্টেশনতো অনেক মানুষের ভিড়।

আকাশে মেঘ জমালে যেমন পৃথিবীটা স্তব্ধ ও অন্ধকার হয়ে যায় ঠিক তেমনি এমন মুচকি হাসি মুখ নিমেষেই নিশ্চুপ হয়ে গেল। দুয়েক মিনিট শুধু আগুনের দিকে চেয়ে রইলেন। আর জোরে জোরে নিশ্বাস ছাড়তে লাগলেন।

গ্যাস লাইট। চোখের সামনে ধরতেই আবার পুনরায় সেই হাসি। খুবই ভালো লাগছিলো এরকম হাসি দেখে। সময়টা যদি ফ্রেমে বন্দী করা যেতো তাহলে আরও বেশি আনন্দমুখর হতো। আমার হাত থেকে গ্যাস লাইট নিয়েই বিড়ি ধরালো।

বিড়ি টানা শেষ। এতো তারাতাড়ি বিড়ি টেনে শেষ করতে এই প্রথম দেখলাম। ক্ষুদার্ত হাতির সামনে যেমন হালকা কিছু খাবার খেতে দেওয়া। কয়েকটি ছবি তুলে রেখেছিলাম। কিন্তু মোবাইল নষ্ট হওয়ার কারণে সব কিছু ডিলিট হয়ে গেছে।

এবার একটু উঠে দাঁড়ালো। খুব সহজেই যে উঠতে পারলো তেমন কিন্তু নয়। লোহার খুঁটি ধরে ধরে উঠতেই যেন মিনিট দুয়েক লেগে গেল। মনে হ”িছল অনেকসময় ধরে বসে থাকার কারণে হাত-পা গুলো জ্যামে পরে গেছে।

কাকা ধরবো?

কথাটা শুনে কেমন যেন একটু ইতস্তা বোধ করলো। ডান হাত নাড়িয়ে ইশারায় বললো না না। উঠতে গিয়ে হঠাৎ টোলে পরে যাওয়ার মতো হওয়ায় আমি গিয়ে ধরে ফেলি। তখন অবশ্য কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ালেন। আমি আর কিছু বলিনি।

বেশকিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকার পরে আবার বসে পরলেন। এইবার মনের মধ্যে কেমন যেন একটা কৌতুহল এসে বারবার ডেকে যাচ্ছে। 

কোনরকম সংকোচ না করেই বললাম, কাকা কিছু খাবেন? 

কোন উত্তর পেলাম না। ভাবলাম হয়তো শুনতে পায়নি। 

পূনরায় বললাম, কাকা কিছু খাবেন? 

এবারও কোন সাড়াশব্দ নেই। মনের মধ্যে একটু রাগ হলো। 

তারপরও শেষবারের মতো বললাম, কাকা কিছু খাবেন?

এইবার বলার আগেই মাথা নাড়িয়ে দিলো। 

আমি আর দেরি না করে হুট করে পাশের দোকান থেকে রুটি, কলা আর কেক পানি নিয়ে হাজির।

কাকা খাচ্ছে। আর আমি বসে শুধু দেখছি। 

কাকার খাওয়ার তালে তালে জিগ্যেস করলাম, ‘কাকা কোথায় যাবেন?’ 

কিন্তু কাকা কিছুই না বলার কারণে বুঝতে পারলাম এমনিতেই কথা বলে না তারপর আবার খাচ্ছে।

হঠাৎ চোখ দুটো কেমন যেন বড় বড় করে তাকালেন। আমিও বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। কি যেন বলতে চাচ্ছে? কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না। তবে, মনে হচ্ছিল কিছু একটা হয়েছে। মাটিতে লুটে পরতেই বুঝতে আর দেরি হলো না কি হয়েছে? পাশে রাখা পানির বোতল তারাতাড়ি খুলে মুখে দেওয়ায় স্বস্তি ফিরলে একগাল হেঁসে বলল, ‘বাবা তুমি আমার জীবনটা পূনরায় বাচিয়ে দিলে।’

তালা দেওয়া মুখের কুলুপ যেন এবার খুলে গেল। লটারির পুরুষ্কারের মতো। সুযোগটা হাত ছাড়া করিনি। আস্তে আস্তে ভাব জমাতে শুরু করলাম। শিকলে বাঁধা মনের গোপন কথাগুলো বের হতে থাকলো।

বাড়ি নিতাইগঞ্জ। বাবার নাম কেষ্ট ঠাকুর। তিনিও নাকি যুদ্ধের আগেই গত হয়েছে। মা ছিলো তবে দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগে ভুগে তিনিও ওপাড়ে চলে গেছেন।

বয়স ৫২ ছুঁই ছুঁই। শরীরটা যে খুব ভালো যাচ্ছে সেটাও নয়। তবে এখনো কারোরই দারস্থ হয়নি। এক ছেলে আর মেয়ে নিয়ে সংসার। গৃহকর্ত্রী বছর দুয়েক হলো নিশ্বাস ছেড়ে দিয়েছে।

ইতিমধ্যে চোখের কোনায় অশ্রুজলের ছড়াছড়ি। টপটপ করে কয়েক ফোটা অশ্রুজল পরে গেলো। ভাবলাম কথাগুলো মনকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ডান হাত দিয়ে চোখদুটো মুছে ফেললেন। আবেগ আপ্লুত কন্ঠে কি যেন গড়গড় করে বলতে চেয়েও থেমে গেলেন।

-কাকা, কাঁদছেন কেন? প্রিয়জনের কথা মনে পরেছে?

-জি, বাবা। সবসময়ই মনে পরে। তবে যারা জীবিত আছে তাদের কথায় মনে পরে বেশি। আর মনে পরলে বুকের ভেতরটা দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। হৃৎপিন্ডটা পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। যেটুকু বাকী থাকে সেটুকুও ধীরে ধীরে পচেগলে গন্ধ ছড়াতে থাকে।

-কাকা এতো কষ্ট কিসের? কিসের জন্য বুকে এতো হাহাকার?

-আর বলিস নারে বাপ! এতো কষ্ট করে রোজগার করে যাদের মানুষ করালাম তারাই আজ ফাঁকি দিতে শুরু করেছে। পিতৃত্বের পরিচয় বোধ হয় তাদের আর দরকার নেই। বাবা অক্ষরের দুটি শব্দের মানুষটি যে আজও বেঁচে আছে হয়তো তারও কোন খোঁজখবর নেই তাদের কাছে। জমিজমা যেটুকু ছিলো সবইতো নিয়েছে। দেহটাও পারলে বোধহয় এতোদিনে নিয়ে নিতো। ভাসিয়ে দিয়ে আসতো কলাগাছের ভেলায়। বাবারে! মেয়ের কথা বাদই দিলাম। অভাবী সংসারে ছেলে সন্তান নিয়ে কেমন করে আমার সেবাযতœ করবে। তবে যেটুকু সামর্থ্য আছে তার সেবাযতœ করে।

-আর ছেলে?

-ন্ডমম, আর ছেলে! ছেলের কথা বলিস নারে বাপ। বুকের হাড়গুলো ধস্তাধস্তি জবরধস্তি করে ভেঙে যেতে চায় তার কথা শুনে। কুলাঙ্গারটা আমার জমিজমাটুকু লিখে নিয়ে শশুর-শাশুড়ী আর বউ নিয়ে আমোদ প্রোমোদে ব্যস্ত। আমাকে খাওয়াতে নাকি তার অনেক খরচ পরে। বলতে বলতে আবার ধুকধুক করে কেঁদে উঠলেন। কাঁদতে কাঁদতে আবার বলতে শুরু করলেন...।

চোখের কোনায় অশ্রু নামক শব্দটি এসে ভিড় করছে। চোখের পাতা নড়তেই দুই ফোটা অশ্রুজল পরে গেল। নিজেকে হয়তো সংযত রাখতে পারিনি। রাখার কোন কৌশল আছে বলেও আমার জানা নেই। অসহায়ত্বের গল্প বুঝি এরকমই। পুঁজি বলে শুধু হাউমাউ করে কাঁদতে পারা আর দুঃখগুলো বুকের ভিতর চাষ করাটাই মুখ্য বিষয়।

চোখমুখে পানি দিয়ে আবার একটি সিগারেট জ্বালিয়ে পাশে বসে টানছি। দুঃখগুলোকে বিদায় জানানোর জন্য একটি অহেতুক চেষ্টা। ভুলে থাকার বাহানা শুধু। অভিনয় সে-তো অনেক আগেই হৃদয় পুড়ে পুড়ে রপ্ত করেছি।

-বাবা! আমাকে একটা দেওয়া যায় না?

কোন রকম চিন্তা না করেই সিগারেটের প্যাকেট বের করে হাতে দিলাম। একটি পকেটে রাখলেন আর একটি...।

সত্যি কথা বলতে কি এরকম বন্ধুত্ব হয়তো আগে কখনও হয়নি। একজন ৫০ উর্ধ্ব আর একজন যুবক। অভাবনীয় ব্যাপার।

-কাকা, ঢাকায় এসেছেন কেন? কার কাছে এসেছিলেন?

কোন কথায় বলছিলেন না। মনে হচ্ছিল ধোঁয়ার মাঝে নিজেকে মেলে ধরেছে। আশেপাশে তাকানোর কোন সুযোগ নেই। একনাগাড়ে টেনে সিগারেট শেষ করে ফেললেন। 

তারপর বললেন,

-বাবা, কি যেন বলতে ছিলে?

-বলছিলাম ঢাকায় কেন এসেছিলেন?

কাকা গড়গড় করে বলতে শুরু করলেন। 

বললেন,

- বাবা, আমি মুক্তিযোদ্ধা। হয়তো কাগজ কলমে কোন প্রমাণ নেই। তবে সত্যি বলছি স্বাধীনতা যুদ্ধে দলবেঁধে যুদ্ধ করেছি।

প্রিয় কয়েকজন বন্ধু, সহযোদ্ধাকেও হারিয়েছি মুক্তিযুদ্ধে। ছোট ভাইকেও তো হারিয়েছি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরা যারা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা নামক শব্দটি ছিনিয়ে এনেছি তাদের কপালে কি জুটেছে? কিছুই নয়। হাহুতাশ করা ছাড়া কিছুই করার নেই। অনেক দিন চেয়ারম্যান, মেম্বারদের কাছে গিয়েও কোন কিছু পায়নি। উপজেলা অফিসে গিয়ে কোন সুরাহা হয়নি। সবাই শুধু আশ্বাস দিয়ে যায়। কিন্তু...। 

অবশেষে, কেঁদে কেঁদে চোখের জল ফেলতে শুরু করলেন।

বাবা! তারপর থেকে আর কারোরই দারস্থ হয়নি। যেখানে সেখানে দিনরাত পার করি। কখনও খেয়ে আবার কখনও না খেয়ে। কখনও রেলস্টেশনে আবার কখনও গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকানেই কাটে সবসময়। তবে বাবা, আমি প্রতিমাসে ঢাকায় আসিনা। বিশেষ কিছু দিন ছাড়া ঢাকায় আসা হয়না আমার। দিনগুলোর কথা মনে পরলে বুকের ভেতর ফাঁকা মাঠের মতো হয়ে যায়। যেখানে শুধু মরিচীকারা বাস করে। শুকনো পাতাগুলো মরমর করে ভাঙতে থাকে।

আমি একটু থমকে গিয়ে বলতে শুরু করলাম, ‘কাকা বিশেষ দিন? মানে বুঝলাম না।’

ভাবলাম এরকম একজন নিরিহ মানুষেরও কি বিশেষ দিন থাকে? যার কারণে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসা এই ব্যস্ত নগরী ঢাকায়। তাহলে কি সেই বিশেষ দিন? মনের মধ্যে ধীরে ধীরে আরও বেশি আগ্রহ জমতে থাকলো। পিপাসিত কাকের মতো হন্যে হয়ে গেলাম।

-বিশেষ দিন বলতে ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর। এই তিনদিই আমার ঢাকা আসা হয়। যত ঝর বৃষ্টি, বাঁধা বিপত্তি আসুক না কেন আমাকে তুমি পাবেই। 

খুবই শক্ত গলায় কথাগুলো বলতে ছিলেন তিনি। কথার মধ্যে কেমন যেন একটা গন্ধ আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বর এই তিনটি দিনই যে আমার সত্তাকে নাড়িয়ে যায়। বাংলা ভাষাভাষী সকল মাতৃপ্রাণকে উজ্জীবিত করে।

-কেন কাকা? শুধুমাত্র এইদিগুলোতেই ঢাকায় আসেন কেন?

আবার সজোরে কাঁদতে শুরু করলেন। আমি কয়েকবার চেষ্টা করেও কোন সুরাহা করতে পারিনি। আসলে মনের মধ্যে গুপ্ত কষ্টগুলো এভাবেই মানুষকে আঘাত করে সুখ পায়। আর ভিতরের হৃদয় নামক কলকব্জাগুলো ধ্বংস করতে থাকে।

কান্না জড়িত কন্ঠেই বলতে শুরু করলেন,

-বাবারে! এই তিনটিদিনে আসলে বুকের পাঁজরগুলো ভেঙে তছনছ হওয়ার উপক্রম হয়। নিশ্বাস নিতে চাইলে কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হয়ে পরি। থতমত হয়ে যায় কণ্ঠনালী। ফুসফাস শব্দ ছাড়া আর কিছুই বের হয় না।

-বাবা রে!! আমি সবচেয়ে বেশি কেঁদেছিলাম কোন দিন জানিস? জানিস না। সেদিনের অশ্রুজলে আমি নিজেই ডুবে যেতাম। 

হাউমাউ করে কাঁদতে ছিলেন তিনি। বলতে ছিলেন,

-গত কয়েক বছর আগে ঢাকা শহরে ‘লাখো কন্ঠে সোনার বাংলাদেশ’ অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। অসংখ্য মানুষের আনাগোনায় ভরে গিয়েছিল পুরাতন বিমানবন্দর। দলবেঁধে, যে যার মতো, বিভিন্ন গার্মেন্টস, পোশাক শিল্প, স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছাত্রীর পদচারণে মুখরিত হয়েছিল সমস্ত মাঠ। একসঙ্গে লাখো মানুষের জাতীয় সংগীত গাওয়া ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। সেদিন বাংলাদেশ সরকার লাখো কন্ঠে সোনার বাংলাদেশ এর সার্টিফিকেট, পানি, ঔষধ এবং খাদ্যদ্রব্যও বিলিয়ে দিয়েছিলেন। কিš‘ আমার কাছে মনে হয় সেদিনই ছিলো বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিশপ্ত দিন। নাহলে কি এইদিন দেখতে হতো? কতো মায়ের বুক খালি করে, কতো বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে, কতো পিতার অশ্রু দিয়ে, কতো নিরীহ মানুষের জীবন বলিদান দিয়ে, কতো ভাইয়ের রক্তের দাগে, কতো নববধূর সিঁথির সিধুর মুছে স্বাধীনতা নামক শব্দটি ছিনিয়ে এনেছি, লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে নিয়ে এসেছি। সবই আজ বিফল মনে হচ্ছে। এই দুঃখগুলো আমাকে প্রতিনিয়ত কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। সেদিন দেখলাম হাজার হাজার পতাকা মাঠে গড়াগড়ি খাচ্ছে, কেউ কেউ ছিড়ে ফেলছে, কেউ কেউ ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে, আবার কেউ কেউ...ব্যবহার করছে।



-লাখ লাখ মানুষ সেদিন জাতীয় পতাকার উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। অগুনিত পতাকা গুলো এভাবেই আর্তনাদে কেঁদে উঠছিলো বারবার বারবার। অনেকেই আবার পতাকার উপর... করছিলো। এই যদি দেশের মানুষের চিন্তাভাবনা হয়, এই যদি দেশের সরকারের উৎসব অনুষ্ঠান হয় তাহলে লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে লাল সবুজের পতাকা অর্জনের দরকার ছিলো না। দরকার ছিলো না ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চ, ১৬ই ডিসেম্বরে কোটি কোটি টাকা খরচ করে মিছিল মিটিং, প্রচার প্রচারণা করার। যেখানে বাঙালীরা একটি মাত্র পতাকার সম্মান দিতে পারে না।

-বাবা রে! আমরাতো যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছি। বিনিময়ে কিছুই পাওয়ার আশা করিনি। যদি পাওয়ার নেশায় বিভোর থাকতাম তাহলে সেদিন নিজের জীবন বিপন্ন রেখে দেশ রক্ষায় নিজেকে বিলিয়ে দিতাম না।

-বাবা রে! ঢাকায় আসি এই একটাই কারণে। নিজ উদ্যোগে যতটুকু পারি রাস্তাঘাটে, বাসস্ট্যান্ডে, রেলস্টেশনে এমনকি শহীদ মিনারে ছিটিয়ে থাকা পতাকা গুলো কুড়িয়ে এনে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে দিই। যাতে করে পতাকা গুলো কারো পদতলে না পরে। পদতলে পরলে ব্যথা অনুভূত হয় আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের শরীরে। আহত পতাকার কান্না জড়িত আওয়াজ সবসময়ই কানে বাজে। চিৎকার করে বলতে থাকে এ কেমন স্বাধীনতা!

নিশ্চুপ বসে আছি। দুই হাত দিয়ে মুখটাকে ঢেকে রেখেছি। চোখ খুলে তাকানোর সাহসটুকু হারিয়ে ফেলেছি। এইতো গতকাল ১৬ ডিসেম্বর ছিলো। ভাবতেই অবাক লাগছে আমি নিজেও পতাকার অপব্যবহার করেছি। শাস্তি আমারও হওয়া উচিত। মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার, দাঁড়িয়ে নিশ্বাস নেওয়ার শক্তিটুকু ইতিমধ্যেই হারিয়ে ফেলেছি। কোন রকম শব্দ ছাড়াই কেঁদে উঠলাম।

পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলাম। 

-কাকা, আমাকে ক্ষমা করে দিন। আমাকে মাফ করে দিন।

-আরে বাবা! কাঁদছিস কেন? কি হয়েছে? তোর উপলব্ধি নিজে থেকেই তোকে মাফ করে দিয়েছে। তোর মতো উপলব্ধি যদি সবার হতো তাহলে...।

ইতিমধ্যে বাড়ি যাওয়ার শেষ ট্রেন এসে গেছে। লজ্জায়, অপমানে তাঁর দিকে না তাকিয়েই ট্রেনে উঠে পরি। শেষবারের মতো এক পলক দেখার জন্য ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিলাম। কিন্তু মানুষের ভিড়ের কারণে দেখতে পারিনি।

আজ ২২শে ফেব্রুয়ারি। অনেক আশা নিয়েই রেলস্টেশনে বসেছিলাম সারাদিন। কিš‘ যাঁর খোঁজে সারাদিন বসে বসে কাটালাম তাঁর দেখা পেলাম না। ভেবেছিলাম গতকাল ২১শে ফেব্রুয়ারি ছিলো অবশ্যই তাকে এখানে পাওয়া যাবে। কিন্তু না, তাঁকে খুঁজে পায়নি।

ফেরার পথে একটু থমকে দাঁড়ালাম। রেলস্টেশনের একটি দেয়ালে ছবি লাগানো। 

সেই মানুষটির ছবি। যাকে আমি খুঁজছিলাম।

হারানোর বিজ্ঞপ্তি, ‘মানসিক ভারসাম্যহীন শ্রী নারায়ণ চন্দ্র দাশের কোন খোঁজখবর পেলে নিচের নাম্বারে যোগাযোগ করুন। তাকে বিশেষ পুরুষ্কার দেওয়া হবে।’

বুকটা ধড়ফড়িয়ে উঠলো। উল্লেখিত নাম্বারে যোগাযোগ করলাম। 

বলল, আমরা ওনাকে খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু তিনি...।

-কিন্তু তিনি কি ভাই?

অপরপ্রান্ত থেকে কান্নাজরিত কন্ঠে বলল, ‘তিনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন।’

ততক্ষণে দুচোখ অশ্রুজল ভিজিয়ে দিয়েছে। আর কোনকিছু জিজ্ঞাসা না করে শুধু বললাম, ‘আপনার ঠিকানাটা পাওয়া যাবে?’

-ঠিক আছে লিখে নিন...।


এই পতাকা আমার, আমার আত্মার!

এই পতাকা আমার, আমার আত্মার!

 



এই পতাকা আমার, আমার আত্মার!

মুহম্মদ মাসুদ


একটি শোক সংবাদ! একটি শোক সংবাদ! উত্তর পাড়ার...।

শেষরাত্রি। ফজরের আজানের খুব কাছাকাছি। মিনিট কয়েক দূরত্ব। হয়তো তারও একটু কাছাকাছি। সত্যি! এই সময়টায় মৃত্যুর সংবাদ কলিজা অবধি গেঁথে যায়। খুবই আফসোস হয় এই ভেবে কেউ একজন ফজরের নামাজ আদায় করতে পারলো না।

ঘুমের ঘোরে তখন হুঁশ বেহুঁশে অজ্ঞান অবচেতন হয়ে ঘুমিয়ে আছি। নানামুখী স্বপ্নের অংশগ্রহনে সংক্ষিপ্ত পদার্পণ এবং হেলে-দুলে জার্সি পরে মাঠে খেললেও আজানের মিষ্টি শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। মাকে ডাক দিয়ে বললাম, ‘মা, উঠেছ কি?

‘হ, উঠছি।’

‘আব্বায়?’

‘হ, তোর বাপ জানেও উঠছে।’

‘কিছু শুনেছ?’

‘হ, হেইজন্য তোর বাপ জানে তাড়াতাড়ি গেলো।

মসজিদের কাছাকাছি যেতেই কান্নার শব্দ কানে এসে ভিড় করলো। পরিচিত কন্ঠস্বর। এ কন্ঠস্বরের রিংটোনে পরিত্যক্ত কলিজার সবটুকুই শুকিয়ে গেলো নিমেষেই। আত্মাটা ছাঁইছুঁই ছাঁইছুঁই করতে লাগলো।


মমিন চাচা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলো। হাউমাউ করে কান্না! পিতৃশোকের কান্না। এ কান্না জীবন ঝড়ের কান্না। যে কান্নার অশ্রুবর্ষণে কোন ছলচাতুরী নেই। অহংকার নেই। আছে নির্ভেজাল ভালবাসা।

ইমাম সাহেব মমিন চাচাকে অনেক বোঝালেন। বললেন, ‘সবাইকেই যেতে হবে। আমরা আলাদা আলাদা এসেছি আর আলাদা ভাবেই খোদার কাছে চলে যাবো।’

পাখি পোষার শখ ছিলো দাদুর। খুবই শখ ছিলো। বিশেষ করে ময়না টিয়াপাখি। কেননা, পাখিদুটো মিষ্টি করে কথা বলতে পারে। যা শেখানো যায় তাই বলে। বিশেষ করে ময়না পাখি। সে রোজরোজ পাঁচ ওয়াক্ত নিয়ম করে বলে উঠতো আজান দিয়েছে, আজান দিয়েছে।

পাখির খাঁচায় কোন পাখি নেই। সেই আদুরে ময়না টিয়াপাখিও নেই। খাঁচাগুলো খাঁচার জায়গায় এখনো স্বাক্ষরিত দেখে মমিন চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘চাচা পাখিগুলো কোথায়?’

মমিন চাচা বলল, ‘আব্বা বলেছিল, তিনি মরে গেলে যেন পাখিগুলো ছেড়ে দেই। যদি রাতে মরে যায় তবে যেন ফজরের নামাজের আগে ছেড়ে দেই।’

‘এরপরে কি পাখিগুলো চোখে পড়েছে?’

‘না। আর চোখে পড়েনি। তবে টিনের চালে খাবার দিয়ে রেখেছি।’

প্রাইমারী স্কুল মাঠে বিজয় দিবসের গান বাজছে। আজ বিজয় দিবস। ১৬ই ডিসেম্বর মনে করতেই কলিজার মধ্যে একটা অচেনা ধকল শরীরটাকে শিহরিত করলো। স্মরণ হলো দাদু যদি বেঁচে থাকতো এতোক্ষণে নিশ্চয়ই স্কুল মাঠে পৌঁছে যেত।

পতাকা পতপত করে উড়ছে। লাল সবুজের বিজয় পতাকা উড়ছে। কিন্তু কদমগাছ তলায় মুঞ্জিল দাদু বসে নেই। এইতো প্রতিদিনই, যখন লাল সবুজের পতাকা পতপত করে উড়তো। সেই শব্দটি দাদু কান পেতে শুনতো। দাদুকে জিজ্ঞেস করতাম, ‘এ শব্দে কি পাও? 

‘দাদু বলতো মুক্তিযুদ্ধের ডাক শুনতে পাই। মুক্তিযোদ্ধার পায়ের শব্দ পাই। বিজয়ের ধ্বনি শুনতে পাই। গোলাবারুদের আওয়াজ শুনতে পাই।’


কদমগাছটি আজ কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কত-শত কাহিনী, কত-শত ঘটনার সূত্রপাতের স্বাক্ষী সে। দাদুর মুখে শুনেছি এই কদমগাছ তলায় নসু মিয়াকেও গুলি করে হত্যা করেছে পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যরা। যে ছিলো সত্যিকারের সাহসী যোদ্ধা, বীরপুরুষ।

স্কুল মাঠে সবাই তখন সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাইছে। মনপ্রাণ উজাড় করে গাইছে, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’

হঠাৎই একটি ময়নাপাখি এসে পতাকার বাঁশের খুঁটিতে বসে পাখা নাড়তে শুরু করলো। আর হঠাৎ করে জাতীয় সংগীত গাওয়া বন্ধ হয়ে যেতেই ময়নাপাখি গাইতে শুরু করলো, ‘চিরদিন তোমার আকাশ তোমার বাতাস...।’


বিষফোঁড়া

বিষফোঁড়া


বিষফোঁড়া 
নৃ মাসুদ রানা 

সৌমিনী ঘুরে এসেই ভাত চাইতে লাগলো। মা পাতিল থেকে দুমুঠো ভাত প্লেটে দিতেই রেগেমেগে সৌমিনী বলতে লাগলো তরকারি কই। হুদা ভাত আমি খামু না। প্রত্তিবার খালি হুদা ভাত আর ভাত।
লতা কোন কথা না বলে চৌকাঠে বসে দরজার সাথে মাথা রেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কোন কথা বলছে না। চিন্তায় চিন্তায় শুকিয়ে যাচ্ছে সে।
মা! ও মা! তরকারি দিয়া যাও। হুদা ভাত ক্যামনে খামু?
না! লতা কিছুই শুনছে না। চিন্তায় মশগুল। দূর আকাশের কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
মা! ও মা! কি অহেছে?
না, কিচ্ছু অয়নি। তুই যা, ভাত খা।
ভাত কি দিয়া খামু?
কি দিয়া খাবি মানে? আমার মাথা দিয়া খা।
সৌমিনী কাঁদো কাঁদো হয়ে ভাতে নুন মিশিয়ে খেতে লাগলো। আর বলতে লাগলো আমার আব্বায় থাকলে আমার লেইগা মাছ কিইন্না আনতো।
লতা কথাটি শুনেই বলতে লাগলো, তুইও তোর বাপের লগে মরতি। আমি বাঁইচা যাইতাম। যত দুঃকু আল্লায় আমারে দিচে।
বাসাবাড়িতে কাজ করে লতা। রিকশাচালক স্বামী গাড়ির সাথে এক্সিডেন্ট করে মারা গেছে। ঢাকার বুকে ছোট্ট মেয়ে সৌমিনীকে নিয়েই তার সংসার। কিন্তু এখন বেঁচে থাকাটাই দুষ্কর।
বাংলাদ্যাশে নাকি করোনা ভাইরাস ঢুকেচে। প্রাণঘাতি ভাইরাস। একবার অইলে আর বাঁচন যাইবো না। এজন্যে বাড়ির মালিকেরা কাজে যেতে মানা করেচে। কিন্তু সংসারের যেই একডা অবস্থা বাসা ভাড়া দিতেই হিমসিম খেতে অইবো। তারপর দু’দুটো মুখ, দুটো পেট। কথাগুলো লতার মাথা মগজে ঢুকে কিলবিল কিলবিল করছে। কি করবে ভেবে পাচ্ছে না।
সপ্তাহ খানেক পর।
মা! আমি আর থাকবার পারছি না। খুউপ ক্ষিধে লাগচে। খাওন না পাইলে আমি কিন্তু মইরা যামুনে। কাঁদতে কাঁদতে বলছে সৌমিনী।
লতা সৌমিনীকে ধরে হাঁটু গেড়ে বসে চোখের পানি ফেলছে। মেয়ের কথার উত্তর তার জানা নেই। গত দুইতিন দিন আগে ভিড় ঠেলে যেটুকু আটা, চাউল পেয়েছিল সেটা শ্যাষ অইয়া গ্যাছে। এখন কি খাইবো? এদিকে বাড়িওয়ালাও বলে গেছে বাসা বাড়া দিতে। নইলে...।
কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেছে সৌমিনী। লতা পাশের রুম থেকে ১০০ টাকা চুরি করে গাঁইটে বেঁধে সৌমিনীকে নিয়ে পালিয়েছে।
ট্রাক ড্রাইভারের পা ধরে কান্নাকাটি করে কোনরকম পিছনে উঠে বসেছে। গ্রামে যাইবো। সৌমিনী জন্ম নেওয়ার পর এই প্রথম গ্রামে যাওয়া। কিন্তু লকডাউন হওয়ায় ড্রাইভার নিজেও নিতে চায়নি। সারা রাস্তায় পুলিশ থাকে। কিন্তু লতার কান্নাকাটিতে তাকে নিতেই হয়েছে।
বাস চলছে। বহু দূরের পথ। পথের দূর। রাত ডিঙিয়ে জোৎস্নার সাথে ভাব জমিয়ে ট্রাক চলছে। আর জাতাঁকলে পিষ্ট হওয়া পিচ ডালা রাস্তা বিদায় দিচ্ছে শহরের।
ভোর সূর্যের দেখা। খুব কাছাকাছি সে আলো। যে আলোয় পৃথিবীর দিন হয়। আর দিনের শুরু হয় ব্যস্ততা, মহামারী, টানাপোড়েন। আরও কতো কি?
আলোর ঝলকানিতে ঘুম ভেঙে যায় লতার। না, তখনও ঘুম ভাঙেনি সৌমিনীর। এখনও ঘুমিয়ে রয়েছে। বাসের হেলপার চড়া গলায় বারবার নামতে বলছে। তখন সৌমিনীর ঘুম ভেঙেছে। ঘুম থেকে উঠেই বলল, মা! আমার ক্ষিদে লেগেছে। আমাকে কিচু খেতে দাও।
বাসস্ট্যান্ডে কোন দোকান খোলেনি। লতা হেলপারকে বললো, ভাই! আমার মেয়েডার ভীষণ খিদে লাগছে। যদি আমাকে দশডা টাকা ফেরত দিতেন...।
হেলপার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে পকেট থেইক্কা দশটা টাকা আর ট্রাকের বক্স খুলে একটা রুটি-কলা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো, যেখানে যাবেন। তারাতাড়ি যান। পুলিশ কিন্তু আইয়া পড়বো।
সৌমিনীকে কোলে নিয়ে হাঁটছে। খুঁড়ে খুঁড়ে হাঁটছে । হাঁটতে হাঁটতে খুবই ক্লান্ত সে। শরীরটা টলমল করছে। খাওয়া দাওয়া নেই। পানির পিপাসা লেগেছে খুব।
রাস্তায় কোন গাড়িঘোড়া নেই। মানুষও নেই। শুধু মাঝে মধ্যে দুই একটি ট্রাক যাচ্ছে।
অবশেষে অনেকখানি রাস্তা হেঁটে গ্রামের রাস্তার গড়ান দিয়ে নামতেই পা পিঁচলায়ে ধানক্ষেতে পড়ে যায় লতা। না, হুঁশ নেই। নিশ্বাস মাঝেমধ্যে এসেই চলে যাচ্ছে। সৌমিনী পাশের ডিপকল থেকে চোইলে করে পানি এনে মুখে ছিটিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফেরে লতার।
ধানক্ষেতের আইলে বসে আছে দুইজন। সৌমিনী জিজ্ঞেস করলো, মা, এগুলো কি?
লতা উত্তর দিলো, এগুলো ধান।
ধান থেকে কি অয়?
ধান থেইক্কা ভাত অয়।
তয় এতো এতো ভাত থাকতো আমাগোর ভাতের অভাব ক্যা?

সুদীর্ঘ শোক সংবাদ

সুদীর্ঘ শোক সংবাদ




একটি শোক সংবাদ! একটি শোক সংবাদ! চৌবাড়ীয়া নিবাসী…।
হকচকিয়ে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠি। পুরো শরীরটা ঝিনঝিন করছে। ঝিনঝিন শব্দের তালে শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। ঘামের শিশিরবিন্দুর শীতলতায় বুকের মধ্যে ধুকপুকানি শুরু হয়েছে। এ ধুকপুকানি মৃত্যুর ঘ্রাণে জীবন্ত। জীবন্ত মৃত্যুর ভয়।
জানালার কাছাকাছি হ্যারিকেন। হ্যারিকেনের আলো আয়নার কাঁচে আবদ্ধ, বদ্ধ। আয়নায় ভাসে পরিচিত মুখ। মুখ লুকিয়ে ভীতু কেউ একজন চিন্তামগ্ন। চিন্তায় মশগুল আঁখি যুগল। আরে! এ ছদ্মবেশী চেহারার মালিক তো আমি নিজেই। যাক, ভয়…।
‘একটা বিয়ে বাড়ি। বাড়িতে মানুষের আনাগোনা, ভিড়ভাট্টা। অথচ অচেনা অতিথির আগমন। আগমনে হৈ-হুল্লোড় হট্টগোল। হট্টগোলের হাসি-তামাশায় পুরোদস্তুর খুশি পুরো বাড়ি।’
সর্বশেষ এ স্বপ্নটিই তো দেখেছিলাম। হ্যাঁ, একদম ঠিক। পুরোপুরি ঠিক। আমি শিওর। এইতো মনে পড়ছে। হুমম, পুরোপুরি খেয়াল আছে। কিন্তু…। কিন্তু, তারপরেই তো সংবাদটা পেলাম। শুনেছি বিয়ের স্বপ্ন দেখলে মৃত্যুর সংবাদ আসে।
আমার সন্নিকটেই চৌকি। চৌকির কোলে বালিশ ঘুমিয়ে। বালিশের নিচেই নেংটি পড়া হাতঘড়ি। হাতঘড়িতে ৪ঃ বেজে ৪৭ মিনিট। এ সময়টাতে স্বপ্নও নাকি সত্যি হয়। সত্যি হলে, এতোদিনে রাজপুত্র হয়ে যেতাম।
দরজায় ঠকঠক শব্দ। আমি ভীতসন্ত্রস্ত, অসহায়, গুটিসুটি হয়ে চৌকিতে শুয়ে আছি। কে যেন ডাকছে? ভয়াবহ সেই ডাক। ডাকে কলিজা অবধি শুকিয়ে গেছে। তৃষ্ণায় ধুঁকছে হৃৎপিণ্ড, শ্বাসনালী। শ্বাসনালীর জ্বালা যন্ত্রণায় হা-হুতাশের গরমে পুরো শরীর ঘেমে লবনাক্ত।
এই অতন্দ্র! এই অতন্দ্র! কিরে, আমার কথা শুনছিস না?
পরিচিত কন্ঠস্বর। হুঁশ ফেরে। হুঁশের হুঁশিয়ারিতে চোখ খোলে। চোখ ডলে ডলে সকাল আলোর সন্ধান মেলে। সন্ধানে ভয়ের স্বপ্নগুলো ফুড়ুৎ করে উড়ে চলে।
‘হ, শুনছি।’
‘ওঠ তাড়াতাড়ি। তোর নিমাই দাদু মরে গেছে।’
বুকের মধ্যের হৃৎপিণ্ডটা জাতাঁকলে পিষ্ট। পিষ্ট দেহ ভিটে মাটি। মাটিতে লুটে পড়লো কয়েক ফোঁটা অশ্রুসজল। অশ্রুসজলে বেদনার ছাপ। ছাপের পাপে আসামি দেহপিঞ্জর। দেহপিঞ্জর দণ্ড বিধানে সাজাপ্রাপ্ত।
ইস্! কতোইনা হাসি-তামাশা করেছি। ইয়ার্কি মশকারি করেছি। মুক্তিযোদ্ধার সনদ নিয়েও কতো কটুকথা বলেছি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়েও…। বলেছি, আর কতো বানিয়ে বানিয়ে বলবে। এইতো গতকালই বলেছিলাম।
অশ্রুসিক্ত আঁখিদুটি। আঁখিদুটি আঁখিজলে রোগাক্রান্ত। রোগাক্রান্ত পার্থিব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। আনন্দ আহ্লাদ। হাসি-তামাশা, খিলখিলিয়ে হাসি।
এই বুঝি স্বপ্নের সিঁড়ি। যে সিঁড়ির প্রত্যেক ভাঁজে ভাঁজে হারানোর শোক। শোকবার্তায় সংহতি মনোকষ্ট। মনোকষ্টের চিপাগলিতে ঠুকরে কাঁদে বুক পর্দার দেয়াল প্রাচীর।
অবশেষে, স্বপ্নটা সত্যি হলো। সত্যি কানামাছি ভোঁ ভোঁ জীবন।