পিঁপড়ে জীবন

 



পিঁপড়ে জীবন

যাহিদ সুবহান


বাজার স্টেশনে আজ খুব হল্লা। এই ভরদুপুরে এমনিতেই রেলের যাত্রী আর নানা পেশার মানুষের চিৎকারে মুখোর থাকে। আজ আরো বেশি হট্টগোল। ধনুকের মতো বাঁকা প্ল্যাটফর্মটার পূর্বধারে একরকম জটলা বেধে গেছে। যারা নতুন এই স্টেশনে পা রাখবেন তারা মনে করতে পারেন হয়তো কোন ঝামেলা হয়েছে। ভয়ে তারা হয়তো এদিকে আসবেন না। দৈনিক যারা এই প্ল্যাটফর্মে আসেন তারা সহজেই ভেবে নেন এটা সাইফুল কবিরাজের ওষুধ বেঁচার মজমা হবে হয়তো। তবে আজকের ঘটনা ভীন্ন। আজকের ঘটনা রিক্সাচালক আলমকে নিয়ে।

ঘটনা দেখতে উৎসুক অন্যান্য মানুষের মতো আফজাল নেংড়া তার অবশ আর লুলা পা ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে শুধুমাত্র কোমরের উপর ভর করে ভীড়ের দিকে এগিয়ে যায়। তবে মূল ঘটনা কী সে তা আবিষ্কার করতে পারে না। একজনকে জিজ্ঞেস করেÑ

-কী অইছে বাই, এইহানে?

-বুজা যাইতাছে না। তয় আলমরে নিয়া কী জানি ক্যাঁচাল বাইনছে!

-আলমরে নিয়া ক্যাঁচাল? ওই হালায় কী করছে? সাগরীরে কি বিয়া কইরা ফালাইছে? আমি জানতাম হালায় একখান জামেলা বাধাইবো! হালায় এইবার মাইনক্যা চিপায় পড়বো গো!

আফজাল নেংড়া তার কাঙ্খিত উত্তর পায় না। ভীড় ঠেলে মানুষের পায়ের ফাঁক গলে মুল ঘটনা আবিষ্কার করার চেষ্টায় ক্ষান্তি দেয়। ঘটনা উন্মোচন করতে না পারলেও সে দেখতে পায় এক মহিলা হাতে ইয়া বড় চেলা কাঠ নিয়ে অগ্নিমূর্তি হয়ে বারবার আলমের দিকে তেড়ে যাচ্ছে আর মুখে খিস্তি দিচ্চে, ‘গোলামের ঘরের গোলাম, আইজ তোরে খুন কইরা ফালাইমু!’

সাইফুল কবিরাজ আজ মজমা বসায় নি। লোকটা বিচিত্র রকমের। খুব মেধাবী। ওর প্রতিভা প্রশংসা করার মতো। প্রাথমিকের গন্ডি পেরুতে না পারলেও খুব সুন্দর করে বাংলা আর ভুলভাল ইংরেজি মিশিয়ে কথা বলতে পারে। ওর সম্মোহন শক্তি খুব প্রখর। শুধু  কি বাংলা ইংরেজি; হিন্দি-আরবী মিলিয়ে এতো সুন্দর করে কথা বলে যে মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর কথা শোনে। শ্রীপুরী টেবলেট, এলার্জি চুলকানি, বাত-বাথার ওষুধ বেঁচে সে। যৌনরোগ-জটিল রোগ আদৌ সারেু কিনা জানা যায় নি। তবে সাইফুল কবিরাজের কথার যাদু থেকে কেউ বের হতে পারে না। ওষুধ প্রয়োজন নেই, অথবা ইচ্ছে করেই ওর ওষুধ কেনে না এমন লোকও ওর কথা দাঁড়িয়ে শোনে। সাইফুল কবিরাজের কথার যাদুর সাথে যোগ হয় দেখতে সুন্দর নয় অথচ অল্প বয়সী সাজগোজ করা মেয়েদের হেরে গলার বে-সুরো গান আর হিন্দিগানের সাথে অশ্লীল এবং মুদ্রাহীন নৃত্য। নি¤œ শ্রেণির মানুষের জন্য এ এক বিশেষ বিনোদন!

বাজার স্টেশনের প্লাটফর্মটা বিচিত্র জায়গা। সারাদিনে মাত্র দুটি ট্রেন এই স্টেশন থেকে ছেড়ে যায়। একটি আন্তনগর ট্রেন আর একটি লোকাল ট্রেন। শতবর্ষী স্টেশনটা পাশের শতবর্ষী কড়ই গাছটার মতোই প্রায় নেতিয়ে যাওয়ার জোঁ। অথচ যৌবনবতী রমণীর মতো এই স্টেশনটারও ছিল জৌলুস। কচি কলাপাতার গায়ে বৃষ্টির ছোয়া পেলে যেমন সজীব দেখায়, সদ্য ¯œান সেরে আসা ভেজা চুলে যুবতীর শরীরের মতো বাজার স্টেশনও সজীব ছিল। সে যেন এখন ভগ্নস্বাস্থ্যের বৃদ্ধা নারীর মতো। সেই সুদিন আর নেই। তবে বাজার স্টেশনের আছে শত বছরের নানা গৌরবের ইতিহাস। 

শুধু সাইফুল কবিরাজ নয় এই স্টেশনের উপর নির্ভর করে অনেক মানুষের রুটি-রুজি। সারাদিন কুলি, রিক্সাওয়ালা-চা ওয়ালা-হকার-পিঠা বিক্রেতা-ঝাল মুড়ি বিক্রেতা-বাদাম বিক্রেতা-ভিক্ষুক-উদ্বাস্তু এমনকি গোপনে ভাম্যমান বেশ্যা আর মাদক ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় মুখর থাকে স্টেশন এলাকা। ভোরে হাঁটার জন্য কিংবা বিকেল বা সন্ধ্যায় সুশীল সমাজ এখানে আসেন এককাপ চা খেতে। দুপুরে ক্লান্ত হয়ে প্লাটফর্মে বসে একটু শ্রান্তির আশায় আসেন বিভিন্ন বে-সরকারী কোম্পানির বিক্রয়কর্মীরা। পুলিশ আসে টহল দিতে। 

আলম স্টেশনের পাশে একটি খুপরি ঘরে থাকে। রিক্সা চালায়। রেলওয়ের সরকারি জায়গায় কয়েকটি টিন দিয়ে কোনমতে একটা খুপড়ি ঘর করেছে। বউ আর চার বয়সী ছেলেকে নিয়ে সেখানেই তার বসবাস। আলমের জীবনের গল্পটা বিচিত্র রকমের। আটাশির বন্যায় সর্বনাশা নদী যমুনা যখন ওদের সবকিছু গ্রাস করেছিল দশ বছর বয়সে বাপের হাত ধরে এই স্টেশনেই ঠাঁই নিয়েছিল ওরা। পানি নেমে গেলে বাড়ি ফেরা হয় নি। এখানেই থেকে গেছে ওরা। মা আর ছোট ভাইটাকে নিয়ে বাবার মতো রিক্সার হ্যান্ডেল ধরেছিল। যে বয়সের নরম হাত বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা সে বয়সেই আলম হয়েছিল রিক্সাচালক। ত্রিশ বছর ধরে এই শহরে সে রিক্স্রা চালায়। কালিবাড়ি-মালশাপাড়া-হোসেনপুর এই শহরের প্রতি ইঞ্চি রাস্তা ওর চেনা। ওকেও সবাই চেনে। এই শহরের রাস্তা আর অলিগলি আলমের ঘামের স্মারক বহন করছে। বাবা মারা গেছেন। ছোট ভাইটা বড় হয়েছে। সে একটা অটো চালায়। মা ওর সাথেই থাকে পাশের একটি খুপড়ি ঘরে। আলমের বউ রিনাও ওর মতো ভাগ্য বিড়ম্বিত। বাপটা অল্প বয়সে মারা গেলে মা ওকে কষ্ট করে মানুষ করেছে। কখনো প্লাটফর্মে পিঠা বিক্রি করে, কখনো সবজি বিক্রি করে। রিনা যথেষ্ঠ সুন্দরী নারী। নানা অভাব-অনটন আর অযতেœ ওর সৌন্দর্যে সামান্য ভাঁটা পড়ে নি। আলমের বাবা অনেক চেষ্টা করে রিনাকে বাড়ির বউ করে নিয়ে এনেছিল। মা যেমন মহাসংকটে পড়ে সংসারের হাল ধরেছিলেন; রিনাও আলমের সংসারের হাল ধরে। শীতে প্লাটফর্মে চিতই পিঠা-ভাঁপা পিঠা বিক্রি করে। এতে সংসারে কিছু পয়সা আসে।

কয়েকদিন ধরে ছেলেটার ভীষণ জ্বর। সেই সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ই রিনা আলমকে বলেছে যেন ইসমাইলের ওষুধের দোকান থেকে জ্বরের একটা সিরাপ নিয়ে আসে। ছেলেটা জ্বরের ঘোরে আবোল তাবোল করছে। ওকে একা ঘরে রেখে দোকানে যাওয়া রিনার সম্ভব নয়। এছাড়া ঘরে কোন টাকা-পয়সা নেই। ইদানিং ঘরে কোন পয়সা রাখার জোঁ নেই। আলম কেমন যেন হয়ে গেছে। ঠিকমতো কাজকর্ম করে না। সকাল দশটা পর্যন্ত নাক ডেকে ঘুমায়। কিছু বলতে গেলে ক্ষেপে যায়। মাঝেমধ্যেই দুজনের এসব বিষয়ে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় ঘটে। অনেক রাতে বাড়ি ফেরে নেশা করে। রিনা প্রতিবাদ করলেই গায়ে হাত তোলে। আলম কী করে কোথায় যায় এসব রিনার কানে আসে। কিন্তু সে বিশ্বাস করতে পারে না। আলম এখন ফেন্সিডিল খোর আর জুয়াড়ীদের সাথে খুব মিশছে। চারপাশে ধারদেনা করে ভরে ফেলেছে। রোজগারপাতির টাকা কোথায় কী করে কোন হিসেব নেই। পাওনাদাররা ইদানিং বাড়িতেও হানা দেয়। সমিতির ঋণের টাকা তোলা রিনার নামে। তাই কিস্তির জন্য এনজিওর সাহেবরা রিনাকেই চাপ য়ে। রিনার কাছে দিনদিন এসব অসহ্য হয়ে উঠছে। 

ছেলের অসুখের কথা বেমালুম ভুলে গেছে আলম। রিনা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে। বিকেল শেষ সন্ধ্যা নামবে এমন সময় বাড়িতে আসে আলেয়ার মা। আলেয়ার মা মাহমুদপুর গ্রামের বাসিন্দা। সুদের ব্যবসা করে। বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতেই সে উচ্চস্বরে চেঁচাতে থাকে আর হাঁক দিয়ে আলমকে ডাকতে থাকে।

-আলম, এ আলম চিটার, বাড়িত আছিস?

-সে তো নাই। সকালে কামে গেছে। ফিরে নাই।

Ñফিরে নাই, না ডাইল খাইয়া কোন জায়গায় পইরা আছে। গেল মাসে আমার টাহা নিল। আসল তো দূরের কথ, সুদের টাহাও তো দিল না। দ্যাহা পর্যন্ত করে না। চিটারে ঘরের চিটার! চ্যাংড়া তো খুব হারামি! আমার টাহা নিয়া জুয়ার ফরে বইছে। আবার হুনি সাগরী মাগীরে লইয়া রং ঢং করে। ভাবছে কী। আমার ট্যাহা হজম করবো? গলার ভিত্রে হাত দিয়া টাহা বাইর কইরা আনমু!

আলেয়ার মা’র শেষ কথাটা বজ্রের মতো আঘাত করে রিনাকে। বুকে শেলের মতো বেঁধে। আলম ইদানিং ফেন্সিডিল খায়, জুয়া খেলে এসবই জানে সে। কায়মনে সে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করে তার স্বামীর জন্য। সে অনেক সহ্য করে। সাগরীকে ভাল করেই চেনে রিনা। মেয়েটা ভাল নয়। কিন্তু আলম এতো নিচে নামতে পারে রিনা কল্পনাও করতে পারে না। রিনার মাথায় আগুন চড়ে। নিজের জায়গায় অন্য নারীর উপস্থিতি মেনে নিতে পারে না সে। আলমের উপর খুব রাগ হয়। উঠোনে রাখা চেলা কাঠের দিকে চোখ যায় তার। ঘরে অবিরাম জ্বরে কাতরাতে থাকা ছেলেটার কান্না রীনাকে আরো ভয়ঙ্কর করে তোলে। রিনা ছুটতে থাকে বাজার স্টেশনের দিকে...



শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট