আকিব শিকদার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
আকিব শিকদার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

হেলাল হাফিজের কবিতা : সময়ের স্বতন্ত্রস্বর

হেলাল হাফিজের কবিতা : সময়ের স্বতন্ত্রস্বর

 


হেলাল হাফিজের কবিতা : সময়ের স্বতন্ত্রস্বর

অনন্ত পৃথ্বীরাজ


বাংলা ভাষার এক বিরল প্রতিভা কবি হেলাল হাফিজ (জন্ম : ৭ অক্টোবর, ১৯৪৮- মৃত্যু : ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৪)। কবি জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪)-এর পরে হেলাল হাফিজ একমাত্র নিভৃতচারী কবি যিনি অতি অল্প লিখেও তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। হেলাল হাফিজ মূলত জাতকবি। তিনি আসলে কবিতা উদযাপন করেছেন। তাই তাঁর কবিতা কাব্যগ্রন্থ আকারে প্রকাশিত হওয়ার আগেই কালোত্তীর্ণ হয়েছে। দ্রোহ-প্রেম ও যৌবনের কবি হেলাল হাফিজ ছিলেন একজন নির্মোহ ও সাদা মনের মানুষ। কর্মজীবনে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু নেশা ছিল কবিতার অনুধ্যান। কবিতায় রাজনীতির স্বর থাকলেও কবিকে কোনো রাজনৈতিক দলের মোড়ক পড়তে দেখা যায়নি। তিনি জানতেন লেখা শুরু করে কোথায় থামতে হবে। কবি হিসেবে খ্যাতি পাওয়ার পরও দীর্ঘ সতেরো বছর লেগেছে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ (১৯৮৬) প্রকাশিত হতে। তারপর আড়াই যুগের স্বেচ্ছা নির্বাসন। কালপরিক্রমায় দ্রোহের শিল্পভাষ্য থেকে কবি নিজেকে প্রেম ও ধ্রুপদীসত্তায় নিজেকে স্থানান্তরিত করেন। তাই তাঁর কবিতায় নারী কখনো মমতাময়ী, আবার কখনো সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে ধরা দিয়েছে।

বাংলা কাব্যের বহুল পঠিত কবি হেলাল হাফিজ। মাত্র তিনটি কাব্যগ্রন্থ লিখে কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া যায়-তার অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি। ব্যক্তিজীবনে খোলসবদ্ধ, মিতব্যয়ী, স্বল্পভাষী এবং প্রচ- আবেগপ্রবণ এই কবির জীবনই যেন এক রহস্যের ঘেঁরাটোপ। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ ক্র্যাকডাউনের রাতে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া কবি হেলাল হাফিজ-পরবর্তী জীবনকে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত বোনাস বিসেবে বিবেচনা করতেন।  তিনি কম লিখতে। তবে যা লিখতেন তা ছিল সময়ের স্বতন্ত্রস্বর। কবি হেলাল হাফিজের কবিতায় বাংলাদেশের মানুষ, এদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো, অন্যায়-বিচার, নির্যাতন, দ্রোহ-বিদ্রোহ, প্রেম-প্রকৃতি প্রভৃতি বিষয় অবলীলায় এসেছে। 


হেলাল হাফিজ বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা কবি। তিনি কবিতা লিখে বিংশ শতাব্দী শেষাংশে বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। এক সময় বাংলাদেশের কবিতাপ্রেমী পাঠকের মুখে মুখে তার কবিতা উচ্চারিত হত। কবি হেলাল হাফিজের পৈতৃক নিবাস বাংলাদেশের নেত্রকোণা জেলা। তাঁর পিতার নাম খোরশেদ আলী তালুকদার। মাতার কোকিলা বেগম। ১৯৬৫ সালে নেত্রকোণা দত্ত হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৬৭ সালে নেত্রকোণা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। একই বছর হেলাল হাফিজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন। ছাত্রাবস্থায় ১৯৭২ সালে তিনি তৎকালীন জাতীয় সংবাদপত্র ‘দৈনিক পূর্বদেশ’-পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন দৈনিক পূর্বদেশের সাহিত্য সম্পাদক। ১৯৭৬ সালের শেষ দিকে তিনি ‘দৈনিক দেশ’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক পদে যোগদান করেন। সর্বশেষ তিনি দৈনিক যুগান্তরে কর্মরত ছিলেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের রাতে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান হেলাল হাফিজ। সে রাতে ফজলুল হক হলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় পড়ে সেখানেই থেকে যান। রাতে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত ইকবাল হলে (বর্তমানে জহুরুল হক) থাকার কথা ছিল। সেখানে থাকলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের শিকার হতেন। ২৭ মার্চ কারফিউ তুলে নেওয়ার পর ইকবাল হলে গিয়ে দেখেন চারদিকে ধ্বংসস্তুপ, লাশ আর লাশ। হলের গেট দিয়ে বেরুতেই কবি নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গে দেখা। তাকে জীবিত দেখে উচ্ছ্বসিত আবেগে বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে থাকলেন নির্মলেন্দু গুণ। ক্র্যাকডাউনে হেলাল হাফিজের কী পরিণতি ঘটেছে তা জানবার জন্য সেদিন আজিমপুর থেকে ছুটে এসেছিলেন কবি নির্লেন্দু গুণ। পরে নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জের দিকে আশ্রয়ের জন্য দু’জনে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দেন।

প্রথম বই প্রকাশের সতেরো বছর আগেই হেলাল হাফিজ কবি খেতাপ পেয়ে যান-তাঁর কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ লেখার জন্য। এ সময় কবিতাটি ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ওই কবিতার প্রথম দুইটি লাইন ‘এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়; এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, ‘রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয় এবং এখনো পর্যন্ত এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশিবার ব্যবহৃত রাজনৈতিক স্লোগান এটি।


কবি হেলাল হাফিজের প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘যে জ্বলে আগুন জ্বলে’ (১৯৮৬) কবিকে নিয়ে যায় জনপ্রিয়তার শীর্ষে। দীর্ঘ সময় নিজেকে অনেকটা আড়ালে সরিয়ে নিয়ে ছিলেন কবি হেলাল হাফিজ। উদ্দেশ্য পাঠক নতুন কিছু দেওয়া। কারণ, কবিতাই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। হেলাল হাফিজ কবিতার মানের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাই বছর বছর গ্রন্থ প্রকাশের উচ্ছ্বাস তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য ছিল না। আড়াই দশক পরে তিনি পাঠকদের জন্য লেখেন দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা ৭১’ (২০১২), তৃতীয় এবং সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদোনা’ প্রকাশিত হয় ২০১৯ সালে অমর একুশে বইমেলায়।

হেলাল হাফিজ এক নির্মোহ কবির নাম। কবিতা ছিল তাঁর কাছে আনন্দ-বেদনা যাপনের মাধ্যম। কবিতাকে তিনি কখনো উপার্জন অথবা খ্যাতির হাতিয়ার করে তোলেন নি। তাই পুরস্কারের প্রতি তার ছিল বরাবরই বিতৃষ্ণা। তারপরও বিভিন্ন সাহিত্য ও সামাজিক সংগঠন কবিকে বিভিন্ন পুরস্কার, সম্মাননা দিয়ে নিজেদের সম্মানিত করেছেন। এসবের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ বৈশাখী মেলা উদ্যাপন কমিটি কর্তৃক ‘কবি সংবর্ধনা’ (১৯৮৫), ‘যশোহর সাহিত্য পরিষদ পুরস্কার’ (১৯৮৬), ‘আবুল মুনসুর আহমদ সাহিত্য পুরস্কার’ (১৯৮৭), নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজ কর্তৃক ‘কবি খালেদদাদ চৌধুরী সাহিত্য পদক সম্মাননা’ এবং ‘বাসাসপ কাব্যরতœ’ (২০১৯) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। কবিতায় কবি হেলাল হাফিজ ২০১৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন।

‘জলে আগুন জ্বলে’ কাব্যের ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতায় কবির প্রতিভার স্ফূরণ লক্ষ্য করা যায়। পরাধীনতার বেড়াজাল ছিন্ন করে তারুণ্যকে মিছিলে এবং যুদ্ধে যেতে কবি আহ্বান জানিয়েছিলেন ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময়কালে। কবি কী তবে মুক্তিযুদ্ধের আভাস আগেই পেয়েছিলেন। কারণ, কবিরা ত্রিকালদর্শী হয়ে থাকেন। তাছাড়া কবিগণ জানেন আত্মত্যাগের বিনিময়েই অর্জন করা যায় কাক্সিক্ষত সাফল্য। তাই তারুণ্যকে কবি স্বাগত জানিয়েছেন। কবির ভাষায়, 

যদি কেউ ভালোবেসে খুনী হতে চান

তাই হয়ে যান

উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।

এখন যৌবন যার, মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়

এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।


কালজয়ী কবিতার এই পঙ্ক্তি দুটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। পরবর্তীতে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলন- দাবী আদায়ের স্লোগান হিসেবে কবিতাটি গণমানুষের মনে তুমুল সাড়া জাগায়। কবি হেলাল হাফিজের জীবদ্দশায় মাত্র তিনটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ (১৯৮৬)। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিভাষা আর মানুষের হৃদয়ে সঞ্চিত আবেগের মিশেলে রচিত প্রথম কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো যেন হয়ে উঠেছিল গণমানুষের প্রেম ও দ্রোহের শিল্প প্রতিভাষ। তাই গ্রন্থটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই তুমুল জনপ্রিয় পায় এবং পাঠক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। গ্রন্থটি নিয়ে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ থাকায় ১৯৮৬ সালে এখন পর্যন্ত বইটির বৈধ মুদ্রণ হয়েছে ৩৩ বারের বেশি। রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে হেলাল হাফিজের কবিতার পঙ্ক্তি যেমন ব্যবহৃত হয়েছে-তেমনি আশির দশকে বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ ও পারিবারিক টানাপোড়নে প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়। কেবল কবিতার পাঠকের নিরিখে নয়, যে ব্যক্তি অতটাও সাহিত্যের খোঁজ-খবর করেন না, এমন অনেকের হৃদয়েও দোলা দিয়েছে হেলাল হাফিজের পঙ্ক্তি।


কবি হেলাল হাফিজ নিজে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘কবিতাটি ওই সময় কোনো পত্রিকা প্রকাশ করার সাহস পায়নি। কিন্তু কবিতার প্রথম দুটি লাইন আহমদ ছফা এবং কবি হুমায়ুন কবির ১৯৬৯ সালে এক রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়াল লিখন করে দিয়েছিলেন।’ কবি শামীম আজাদ বন্ধু-প্রতিম এবং সমসাময়িক সাহিত্যিক হেলাল হাফিজকে ‘বিরল-প্রজ’ কবি আখ্যা দিয়ে মন্তব্য করেন, ‘উনি কম লিখেছেন; কিন্তু প্রবল জনপ্রিয় ছিলেন। কবিতা ছিল ছোট, কিন্তু ব্যাপক ভাব প্রকাশ করতো সেগুলো।’ লড়াইয়ে, সংগ্রামে, প্রেমে-বিরহে, দ্রোহে-বিদ্রোহে যাপিত জীবনের পরতে পরতে হেলাল হাফিজ স্পর্শ দিয়ে যান। ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’র মতো ‘অগ্ন্যুৎসব’ কবিতাও শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আগুন জ্বেলে দেয়। এ কবিতায় কবি বলেছেন,

 

ছিল তা এক অগ্ন্যুৎসব, সেদিন আমি

সবটুকু বুক রেখেছিলাম স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রে? 

জীবন বাজি ধরেছিলাম প্রেমের নামে

রক্তঋণে স্বদেশ হলো, তোমার দিকে চোখ ছিল না

জন্মভূমি সেদিন তোমার সতীন ছিলো।’ 


কেবল মুক্তিযুদ্ধ কিংবা গণ-অভ্যুত্থানের মতো প্রেক্ষাপটে নয়, যেকোনো অন্যায়ে-শোষণে-অবিচারে হেলাল হাফিজের এ উচ্চারণ সবার হয়ে ওঠে। ‘একটি পতাকা পেলে’ কবিতায় দেশ স্বাধীনের কথা বলেছেন। বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আর সংগ্রামের রক্তাক্ত ইতিহাস বয়ে আসে স্বাধীনতা। স্বাধীনতার মাধ্যমে পাওয়া যায় দীর্ঘ পরাধীনতা থেকে মুক্তি, একটি স্বাধীন ভূখ- এবং একটি পতাকা। যা জাতির বীরত্ব ও সার্বভৌমত্বের পরিচয় বহন করে। কবি লিখেছেন : 


কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে

আমি আর লিখবো না বেদনার অঙ্কুরিত কষ্টের কবিতা

কথা ছিলো একটি পতাকা পেলে

ভজন গায়িকা সেই সন্ন্যাসিনী সবিতা মিস্ট্রেস

ব্যর্থ চল্লিশে বসে বলবেন, ‘পেয়েছি, পেয়েছি’।


‘ফেরিঅলা’ কবিতায় হরেক রকম কষ্টের কথা বলেছেন। একজন ফেরিঅলা যাপিত জীবনের নানা রকম কষ্ট বিক্রি করতে চান। জগৎ সংসারে কষ্টের নানা প্রকারভেদ রয়েছে। প্রেমের কষ্ট, ঘৃণার কষ্ট, নদী এবং নারীর কষ্ট, অনাদর ও অবহেলার তুমুল কষ্ট, ভুল রমণী ভালোবাসার, ভুল নেতাদের জনসভার হাইড্রোজনে দুইটি জোকার নষ্ট হবার কষ্ট আছে। আরও বিভিন্ন প্রকার কষ্টের কথা কবি বলেছেন। কেউ কষ্টের ভার নিতে চাইলে কবি অনায়াতে তা দিতে পারেন। কবি বলেছেন :  

লাল কষ্ট নীল কষ্ট কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট

পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট,

আলোর মাঝে কালোর কষ্ট

‘মালটি-কালার’ কষ্ট আছে

কষ্ট নেবে কষ্ট।

 

‘ইচ্ছে ছিলো’ নিটল প্রেমের এক রোমান্টিক কবিতা। এ কবিতায় কবি তাঁর মানস প্রতিমাকে সাজাতে চান নিজস্ব ঢংয়ে। বাংলার ষড়ঋতুর সৌন্দর্য এনে ঢেলে দেবেন প্রিয়ার শরীরে। প্রয়োজনে নিয়োগ করা হবে সুদক্ষ মেকাপম্যান। তাঁর প্রিয়াকে অনিন্দ্য হতেই হবে। কবির ইচ্ছে ছিলো প্রেমিকাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবেন। প্রেম দিয়ে বাজাবেন বিশ্বভুবন। কবি লিখেছেন: 


ইচ্ছে ছিলো তোমাকে সম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো

ইচ্ছে ছিলো তোমাকেই সুখের পতাকা করে

কান্তির কপোত করে হৃদয়ে উড়াবো।

ইচ্ছে ছিলো সুনিপূণ মেকআপ-ম্যানের মতো

সূর্যালোকে কেবল সাজাবো তিমিরের সারাবেলা

পৌরুষের প্রেম দিয়ে তোমাকে বাজাবো, আহা তুমুল বাজাবো।

 

‘নেত্রকোনা’ কবিতায় কবি যেন ফিরে তাকিয়ে দেখছেন ফেলে আসা অতীতপুরে। আবহমান বাংলার চির-সবুজ গ্রাম; বাল্যস্মৃতিতে ফিরে গেছেন কবি। নাগরিক করপোরেট জীবন মানুষকে অসাড় করে দেয়। ভালোবাসা, মায়া-মমতাহীন ইট, পাথরের শহর এক সময় বিষণœ লাগে। ইচ্ছে করে গ্রামে ফিরতে। যেখানে বাড়ির প্রাঙ্গণে নিষ্পলক কেউ একজন দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে। কেউ ট্রেনের হুইসেলের শব্দে তোলপাড় করে ওঠে। মায়ের কথা মনে পড়ে। অথচ জীবনের পাশাপাশি ওতোপ্রোতভাবে থাকে অদ্ভুত মরণ। কবির ভাষায় : 


কেউ কি তাকিয়ে থাকে নিষ্পলক দাঁড়িয়ে প্রাঙ্গণে?

কারো কি তোলপাড় ওঠে ট্রেনের হুইসেল শুনে মনে?

তোমার মাটির রসে পরিপুষ্ট বৃক্ষ ফুল।

মগড়ার ক্ষীণ কলরোল

অমল কোমল এক মানুষের প্রতীক্ষায় থাক বা না থাক,

তুমি আছো আমার মজ্জায় আর মগজের কোষে অনুক্ষণ,

যে রকম ক্যামোফ্লাজ করে খুব ওতোপ্রোতভাবে থাকে

জীবনের পাশাপাশি অদ্ভুত মরণ।

 

‘প্রস্থান’ কবিতায় কবি তাঁর মানস প্রিয়ার কাছে পত্র চেয়ে পাঠিয়েছেন। কারণ, প্রিয়জনের চিন্তা সব সময় মনকে ব্যথাতুর করে রাখে। যেখানে একটা চিঠি পাওয়া মানে মনের প্রশান্তি। একটা সময় ছিল-যখন যোগাযোগের অন্যতম প্রধান বাহন ছিল চিঠিপত্র। দূরে অবস্থানকারী আপন জনেরা চিঠির মাধ্যমে খবরা-খবর আদান-প্রদান করতেন। কবি তাই চিঠিকেই প্রিয়জনের সাথে যোগাযোগ করার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। প্রিয়জনকে বার বার অনুরোধ করেছেন পত্র দিতে। কবির লিখেছেন : 


এখন তুমি কোথায় আছো কেমন আছো, পত্র দিয়ো।

এক বিকেলে মেলায় কেনা খামখেয়ালী তাল পাখাটা

খুব নিশীথে তোমার হাতে কেমন আছে, পত্র দিয়ো।

ক্যালেন্ডারের কোন পাতাটা আমার মতো খুব ব্যথিত

ডাগর চোখে তাকিয়ে থাকে তোমার দিকে, পত্র দিয়ো।

কোন কথাটা অষ্টপ্রহর কেবল বাজে মনের কানে

কোন স্মৃতিটা উস্কানি দেয় ভাসতে বলে প্রেমের বানে

পত্র দিয়ো, পত্র দিয়ো।


হেলাল হাফিজ সেই দুর্লক্ষ, দুর্লভ কবিদের একজন, যিনি নিতান্ত স্বল্প সৃষ্টি-সম্ভার সত্ত্বেও জয় করেছেন তুঙ্গস্পর্শী জনমানস। সমান্তরালে শিল্প-সিদ্ধিতেও যা পরিপ্লুত। তাঁর কবিতার বিষয় ও প্রকরণ যুগপৎ মেলবন্ধনে সার্থক, কালোত্তীর্ণ। স্বল্প সৃজনেও তিনি বরাবরই প্রাসঙ্গিক এবং প্রোজ্জ্বল। হেলাল হাফিজের কবিতার প্রাণশক্তি বস্তুত ব্যক্তিক মনোলোকের নিগূঢ় অন্তর্বীক্ষণে। আবার ব্যষ্টির অনুভব, চারিত্র, সংক্ষোভ-দ্রোহও তাঁর কবিতার ভরকেন্দ্র। নিউট্রন বোমা বোঝ, মানুষ বোঝ না কিংবা ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’- জনশ্রুতি বা প্রবাদবাক্যে রূপান্তরিত এরকম পঙ্ক্তিসমূহ কাল ছাপিয়ে কালান্তরের দরজায় কড়া নাড়ে। কবি হেলাল হাফিজ বেঁচে থাকবেন স্বীয় কর্মের মাধ্যমে। কবির মহাপ্রয়াণে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। 

কবি ও গবেষক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর। 


আগের জন্মে মানুষ ছিলাম!

আগের জন্মে মানুষ ছিলাম!

 


আগের জন্মে মানুষ ছিলাম!

আসহাবে কাহাফ 



পাখি হয়েই জন্মেছি বলে অসহ্য যন্ত্রণার মাঝেও বেঁচে থাকতে হয়! আচ্চা, পরের জন্মে মানুষ হয়ে জন্মালে কেমন হয়? 

ধুর বোকা, পাখির আবার পরের জন্ম! যেখানে আশরাফুল মাখলুকাত তথা মানুষেরই কোনো পরের জন্ম হয় না, সেখানে পাখি ও পরের জন্ম!


কালো পাখিটির এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভরা মন্তব্যে, লাল পাখিটা কিছুটা নড়েচড়ে উঠল। তারপর, বলল; মানুষ যে বলে, আমি পরের জন্মে এই হবো, ঐ হবো, সেই হবো! তাহলে, এ গুলো কি মিথ্যা? 

হ্যাঁ, এসব মিথ্যা, মানুষের পরের জন্ম বলতে কিছু নেই, যা আছে তা, মৃত্যুর পরের জীবন, যেমন মৃত্যুর পরপর যে জীবন শুরু হয়, সেটা কবরের জীবন। কবরের জীবনের পর মানুষ যেখানে জেগে উঠবে, শেষ বিচারের আশায়, সেটা হাশরের জীবন। এরপর অন্তত কালের জান্নাত বা জাহান্নামের জীবন! 


লাল পাখিটার এমন লম্বা ও গম্ভীর প্রতিত্তোরের প্রতি একধরনের অনীহা থেকে, কালো পাখিটা বলল, চল, দূরে কোথাও উড়ে যায়। 


পৃথিবীতে পাখিদের কোনো সীমানা নেই, সীমাবদ্ধতা নেই, নেই পাসপোর্ট কিংবা ভিসা নীতি, ফলে যখন যেখানে উড়ে যেতে পারে; সূদুর সাইবেরিয়ায় শীত বেশি হলে যেমন, উড়ে উড়ে বাংলাদেশে চলে আসা যায়, একইভাবে, বাংলাদেশে বসে মন-খারাপ হলেও, উড়ে উড়ে যাওয়া যায়, হিমালয়ের দেশে অথবা আরব দেশের মরুভূমির কোনো এক পর্বতশৃঙ্গে। তবে, ইনসান এসব পারে না কেন? ইনসান ত সৃষ্টির সেরা জীব। লাল পাখিটার প্রস্তাব শোনে দুটো পাখি উড়াল দিল আকাশের বুকে।


উড়ে উড়ে ক্লান্ত পাখি দুইটা গিয়ে বসল, একটা গাছের মগডালে। গাছটা স্থির দাঁড়িয়ে আছে জলাশয়ের পাড় ঘেঁষে।। মাঝে-মধ্যে হালকা বাতাসে গাছের পাতাগুলো নড়ে উঠছে, কিন্তু কোনো শিকারী বা দুষ্ট ছেলেদের ঢিল ছুটে আসার ভয় এখানে নেই। গাছটার পাতা গাঢ় সবুজ, কোনো ফল নেই, ফুল নেই; তবে কিছু নতুন পাতা ফুটেছে। হালকা সবুজ রঙের এসব নতুন পাতা দেখে, লাল পাখিটা বলল, এখানে থাকা যায়, হয়তো কিছুদিন পরেই মুকুল আসবে, তারপর ফল।


মাঝে মধ্যে মনে হয়, মানুষের মত, পাখিরা গাছের নাম জানে না, ফুলের নাম জানে না, ফলের নাম জানে না! তবে, কোনটা খাদ্য আর কোনটা অখাদ্য তারা ভালো করেই জানে। এ একজায়গায় মনে হয়, মানুষের চেয়ে পাখিরা এগিয়ে। ইদানীং মানুষ যা খাদ্য তাও খায়, যা অখাদ্য তাও খায়, কোনো বাছ-বিচার নেই। মানুষ ভালো চালের ভাত খায়, দামি দামি মাছ- মাংস খায়, আবার সুযোগ পেলেই ঘুষ খায়, সুদ খায়! অথচ, পাখিদের এমন জীবন, সে যা প্রয়োজন কেবল তা খায়, কোনো সংগ্রহ শালা নায়, সঞ্চয়ের চিন্তা নায়, বাসায় ফ্রিজ নায়। তাই মানুষের মত অত জুলুম শোষণের প্রয়োজন পড়ে না। কিছুক্ষণ পর পাখি দুইটা ধীরে ধীরে আরো নিচের দিকে একটা শক্ত ডালে নেমে আসল। ডালটা কিছুটা জলের কাছাকাছি। উপর থেকে দেখা যায়, স্বচ্ছ জলের উপর নিজেদের ছবি ভেসে উঠেছে। লাল পাখিটা কালো পাখির উদ্দেশ্যে বলল, আজকে তোমাকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে। দেখ, তোমার মাথা, ঠোঁট, পাখনা কী ঝরঝরে! 


কালো পাখিটা সেদিকে কোনো কর্ণপাত করছে না দেখে, লাল পাখিটা আবার জিজ্ঞেস করল, তোমার কী মন খারাপ? 

না। 

তবে এত চুপচাপ যে?

ভাবছি, তুমি কত সুন্দর করে জীবনের কথা বল, আশার কথা বল, তোমার মত সঙ্গি পেয়েছি, আমি কতই না ভাগ্যবান। 

ধুর তুমি, সবসময় বেশি বেশি বল। এসবই ত আমার কাজ, সবসময় আমার সঙ্গীর পাশে থেকে, তাকে অনুপ্রেরণা দেওয়া, খারাপ কাজে নিষেধ করা, ভালো কাজে সহযোগিতা করা। আচ্চা,  বল ত, মানুষগুলো কেন আমাদের মত হয় না? কেউ কারো ভালো সহ্য করতে পারে না, প্রসংশা করতে পারে না, উপকারে এগিয়ে আসে না। পাশে থেকে অনুপ্রেরণা দিতে পারে না। কেবল, অন্যের ভুল-ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা করাই কি মানুষের ধর্ম? 


লাল পাখিটা চিন্তা করল, সত্যিই তাই। পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে বিনা মতলবে কখনোই অন্যের প্রসংশা করে না। সারাক্ষণ, একে অন্যের দোষ খুঁজে, গীবত করে, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কোনো শ্রদ্ধা নেই, স্ত্রীর প্রতি স্বামীর কোনো দায়িত্ববোধ নয়, যা আছে তা কেবল কাম আর কাম! এবার সে কালো পাখির দিকে, তাকিয়ে বলল, চল গোসল করি।


মানুষের মত পাখিদের হয়তো পর্দার বিধান নেই, তাই, পাখি হলে, যেখানে সেখানে গোসল করতে পারা যায়। লজ্জাস্থান ঢাকার কোনো পায়তারা নেই। আবার, মানুষের মতো, আশে-পাশে কেউ আড়ি পেতে আছে, গোপনে ভিডিয়ো করছে এমন কোনো ভয়ও নেই। কিন্তু আমরা যারা মানুষ, তারা এক অদ্ভুত প্রাণী, যে জানে, সেখানে কেউ, গোসল করছে, হোক সে নারী বা পুরুষ,  এটা গোসলের স্থান; তারপরও আমরা উঁকিঝুঁকি দিই। কী বিচ্ছিরি! গোসল শেষে দুটো পাখিই আবার মগডালে উঠে এসেছে। এখানে রোদের ঝিলিক খেলা করছে নতুন পাতার শরীরে। লাল পাখিটা তার ঠোঁট লাগিয়ে দিয়েছে, কালো পাখির ঠোঁটে,  তারপর গলা বেয়ে পালকের নিচে, এভাবে কয়েকবার সে কালো পাখির চারপাশে প্রদক্ষিণ করে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। কালো পাখিটা বার কয়েক ডানা ঝাপটা দিয়ে দুজনেই আবার উড়ে গেল। কোথায় উড়ে গেল? পৃথিবীতে বড়ো বড়ো পাখিদের ত নির্দিষ্ট কোনো ঘর নেই, বাড়ি নেই, কেবল বাবুই আর চড়–ই পাখি ছাড়া। পিছুটানও নেই, যার মায়ায় সাঝবেলায় আবার ফিরে আসতে হবে! তারপরও কি পাখিরা ফিরে আসে? মানুষের মত? প্রতি সন্ধ্যায়? প্রিয়জনের সান্নিধ্য পেতে? মানুষ ফিরে আসে, আসতেই হয়; আপন নীড় ছাড়া পৃথিবীতে মানুষের আর কিছুই নেই, এ পৃথিবী তার কাছে যথেষ্ট ছোটো, যে বাধা পড়েছে, মায়ার কাছে, মানুষের কাছে, প্রেম ও প্রনয়ের কাছে। তাহলে, পাখিদের কি স্বজাতির প্রতি প্রেম নেই? প্রনয় নেই? কে জানে! 


উড়তে উড়তে বহু পথ পাড়ি দিয়ে পাখি দুইটা এবার পৌঁছে গেল বঙ্গভবনের আঙ্গিনায়,  সারি সারি গোছানো গাছ, নানা রঙের ফুলের বাগান। এসব তাদের ভালো লাগে, প্রায় তারা এখানে আসে, এখানকার সবকিছুই যেন, ঘড়ির কাটার সাথে তাল মিলিয়ে ঘুরছে, কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, জটলা নেই, গ্যাঞ্জাম নেই। অদ্ভুত নীরবতা তবে, ব্যস্ততার কমতি এখানে কোনো কালেই ছিলো না। ইতোমধ্যে বঙ্গভবনে সবার খাওয়া দাওয়া শেষ, আশেপাশে আরো কিছু পাখি দেখা যাচ্ছে, যে যার যার মত, গাছে গাছে উড়ছে, নিচে নামছে, খাচ্ছে, কেউ বা নিজস্ব সুরে গান করছে। এমন সময় লাল পাখিটা খেয়াল করল, বঙ্গভবনে প্রবেশ করছে রাষ্ট্রপতির গাড়ির বহর। কিন্তু, আজ যে মানুষটা গাড়ি থেকে নেমেছে, যাকে সবাই চতুর্দিকে ঘিরে আছে, তাকে পরিচিত মনে হচ্ছে না! সে কালো পাখিকে ডেকে বলল, শোনছ? দেখ ত, আজকে যিনি প্রবেশ করছে, তাকে কি তুমি চিন? এ লোকটাকে ত আগে কখনো দেখিনি! এতদিন যে লোকটা ছিলো, সে কোথায়? তাকে দেখছি না কেন? 


কালো পাখিটা তখন বলল, আরে বোকা, এ লোকটিই হল, এদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি, গতকালই যিনি রাষ্ট্রপতি ছিলো, এর আগেও যারা রাষ্ট্রপতি ছিলো,  এখন তারা নাই, তাদের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ।  

কী বল এসব? ক্ষমতা আবার কী? আর যদি ক্ষমতা নামক কোনো কিছু কারও কাছে থাকে, তার আবার মেয়াদ থাকবে কেন? 

সে তুমি বুঝবে না! 

বুঝব না কেন? তুমি কি এটা ভুলে গেছ, এদেশের প্রধানমন্ত্রীও একজন মেয়ে! মেয়ে হয়ে যদি, তিনি একটা দেশ চালাতে পারে, আমি কেন বুঝব না, ক্ষমতা কী? ক্ষমতার মেয়াদ কী? তুমি বল, আমি বুঝব।


পৃথিবীর এ আরেক অদ্ভুত নিয়ম, পাখি হোক আর মানুষ, সবজায়গায় স্ত্রী তথা মা-জাতিকে অবলা ভাবা হয় কেন? কেন ভাবা হয়, তারা সবকিছু বুঝবে না, জানবে না! এটার সঠিক কোনো ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। তবে, মাঝে মাঝে নিজেকেই প্রশ্ন করি, আসলেই কি তারা কম বুঝে? এসব প্রশ্নের সদুত্তর আছে নেই। কালো পাখিটার এ জবাব শুনে, লাল পাখিটা কিছুটা বিব্রতবোধ করল। তারপরও,  নিচু স্বরে বলল, আচ্চা, বলছি তবে, মনযোগ দিয়ে শোন। ক্ষমতা হল, নিম্নবর্গের উপর উচ্চবর্গের কর্তৃত্বের মাপকাঠি! যার কথায় যত দ্রুত কোনো কাজ সম্পন্ন হবে, যে কোনো কাজ যত দ্রুত শেষ করতে পারবে, বুঝতে হবে তার ক্ষমতা তত বেশি। আর, এ যে মুখের কথায় কাজ করানোর বা নিজে কাজ করার যে যোগ্যতা সেটাই ক্ষমতা। আর তুমি বললে না, ক্ষমতার আবার মেয়াদ,  আসলে সবকিছুরই একটা মেয়াদ থাকে, ক্ষমতা যে যাকে দেয়, সেই একটা মেয়াদ দিয়ে দেয়, মেয়াদ শেষে সে ক্ষমতা আর কারো থাকে না, যদি কোনো ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা কাউকে দেয়, সেটার যেমন একটা মেয়াদ থাকে, তেমনি মানুষ যদি কাউকে কোনো ক্ষমতা দেয়, তারও একটা মেয়াদ থাকে। সে মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেই মানুষ তার আপন জায়গায় ফিরে যায়। যাক গে, আগের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা এখন আর নেই, এ যে নতুন মুখ দেখছ, তিনিই এখন এদেশের সর্বময় ক্ষমতার মালিক। 

তাহলে আগের যে রাষ্ট্রপতি ছিল, তিনি এখন কোথায়? 

তিনি তার নিজ বাড়িতে, নিজের কাজকর্মে ব্যস্ত। 

তাকে কি এখন আর এতে নিরাপত্তা দেওয়া ও সেবা করার মানুষ আছে? 

না!  

কী বল? তাহলে একদিন, এখন যিনি নতুন রাষ্ট্রপতি এসেছেন, তাকেও এখান থেকে চলে যেতে হবে? 

হ্যাঁ। 

যদি এসব স্থায়ীই না হয়, তবে কেন তিনি এত আরাম আয়েশে অভ্যস্ত হচ্ছেন? তিনি ত স্বাভাবিক জীবন-যাপন করলেও পারেন। 

জানি না! চল, দূরে কোথাও যায়। 

পাখি দুইটা আবার উড়াল দিল আকাশের দিকে। পাশাপাশি উড়তে উড়তে কালো পাখিটা বলল, তুমি কি পরের জন্মে মানুষ হবে? 

উত্তরে লাল পাখিটা বলল, আমি আগের জন্ম মানুষ ছিলাম!


প্রণয়ের সন্ধ্যাফুল

প্রণয়ের সন্ধ্যাফুল

 



প্রণয়ের সন্ধ্যাফুল

রিয়াদ এনাম


এই যে বিমূঢ় একাকী জীবনের স্বরলিপি গুনি আজও। আলোর পেখম মেলে ধরা তোমার সচিত্র প্রতিমা আঁকার অভিকল্প খুঁজি দিনমান। আমার বিমর্ষ স্বপ্নভেজা সন্ধ্যা না হয় একটি পেয়ালায় তুলে রাখবো, কিন্তু ভোরের আলমিরায় কে তুলে রাখবে আমার নিশীথ জাগা রোদন। যখন দিবাকরের মতো প্রস্ফুটিত চুমু এঁকে দেবো আমার খসখসে গালে। যদিও আমি তোমার আঁচলে মাথা রাখতে চাও না। অদৃশ্যের হাতছানি তাই আমাকে ভিখেরি বানিয়েছে, আমি অবশ্য নতুন কিছুর পিপাসা বোধ করি আজন্ম অনুরোধে।


অবৈধ মানচিত্রে আমি কোন দিন চোখের জানালা খুলে দৃষ্টিপাত করিনি। দেখিনি কারো গালের টোল পড়া বিমুগ্ধ হাসি। আমার ইচ্ছে তো আমরণ বেঁচে থাকা পবিত্র জায়নামাজে; ভুলের সাহু সিজদা আমার জীবনে ক’বারই বা এসেছে! আমি তার মূল্য চুকিয়েছি হাজার বার। সন্ধ্যে নামার আগে একটা পাখি আমায় বলে গেছেতোমার প্রণয়ের সন্ধ্যাফুল আর ফুটবে না। বর্ষায় যদি নদী ভরে যায় শাপলা শালুকে, তবুও আমি বেসে যাবো ভালো; এ কথা আমার জীবনের মতো অদ্বিতীয় সত্য।


শ্রাবণ বর্ষায় যেদিন আমি তোমার খোঁপায় গুঁজে দিয়েছিলাম বেলী ফুলের পাপড়ি, সেদিন আমি ছিলাম উড়ন্ত ঘুঘু আর তুমি ছিলে ডানা ভেজা শালিক। আমি নির্ঘুম চেয়েছিলাম তোমার বাহুর আস্তিনে। আর কান পেতে ছিলাম তোমার ঠোঁট চাপা কোকিলের মিষ্টি গানে। এ যেন অন্তিম ইচ্ছার চিলেকোঠা। কোথাও কোন ছন্দপতন নেই যে সুরের, যেই জাগ্রত মূর্ছনার। তবুও দিনান্তে দ’জন নিহত নক্ষত্রের মতো খসে পড়ি দোটানার তুফানে।


আ, তুমি ভুলে গেছো তোমায় নিয়ে নয়া স্বপ্নের কতো বেসাতি আমি গড়েছি, কত সুঠাম চিন্তার বাহনে হইহুল্লোড়ে যাপিত জীবনের বায়ান্ন বসন্ত পার করে এসেছি। তা তোমার ভুলে যাবারই কথা; কিন্তু আজও আমি ঐ নিমগ্ন চিরকুটের শব্দ দিয়ে বুনি বেঁচে থাকার শীতলপাটি। এটা যদি শেষ ইচ্ছে হয় তবে তো কথা নেই। অন্যথা আমি এর ষোলোআনা পুষিয়ে দেবো কোনো আঁধার মানবীর পথ খুঁজে খুঁজে। জানো না কি, এক অচেনা দুপুরে তোমার পত্রে লিখেছিলাম প্রণয়ের চাদরে কত না আকাশ পাতাল স্বপ্নযুদ্ধ!



পদাবলি : ০১

পদাবলি : ০১

 



কথাকুঞ্জ

ঋতিদীপ্ত শ্যামল


১.

ঘূর্ণায়মান চাকার কেন্দ্রে একটু আধটু তেলের প্রয়োজন হয়ে থাকে, না হয় চাকা ঘোরে না, গতিও বাড়ে না-  ড্রাইভারকে সেকথা জানতে হয়। মানুষের কর্মের গতি বাড়াতেও তেমনি তেল স্বরূপ প্রেরণা দিতে হয়, নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এই বিদ্যা ভীষণ জরুরি। 


২.

খাঁচায় পোষা পরাধীন পাখিরাই শুধু শেখানো কথা বলে থাকে।  তোমার কথাও তারাই  বলছে- যারা তোমার কূটখাঁচায় এখন বন্দি। আর তোমার সেবাই এই বন্দিবিদ্যা। প্রভূত্বপ্রাপ্তিযোগ সেবা থেকেই আসে। তবে প্রভুত্বপ্রাপ্তিলিপ্সা একটি ভাঙা খাঁচা মাত্র।


৩. 

সূর্যকে কেন্দ্র করে যেসব গ্রহ ঘোরে, সবগুলো নিজ নিজ কক্ষপথেই ঘোরে। কেউই অন্য কারো কক্ষপথ কখনও অনুসরণ করে না করবেও না, কিন্তু তাদের সবার কেন্দ্র একই-  সূর্য। কারও কক্ষপথে কেউ ঢুকলে সৌরজগত ভারসাম্য হারিয়ে ফেলত নিশ্চয়ই। তাই তোমাকেও মনে রাখতে হবে: কেউই তোমার মতন হবে না; প্রত্যেককে তারই গুণমতো গড়ে তুলতে পারলে সেই-তারাই তোমার প্রতি কেন্দ্রস্থ শ্রদ্ধা জানাতে বাধ্য হবে। নেতা হতে হলে একথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে।


৪.

যে গাছের একটাই মাথা, সেসব গাছই সরল বা সোজা হয় দেখছি। তাই সহজ মানুষের সমাজেও একজনমাত্র নেতা থাকতে হবে। না হয় সামাজিক পরিস্থিতি জটিল হবে। পারিবারিক স্বস্তিও সেই পরিবারে রয়েছে, যে পরিবার যোগ্যজনের একক সিদ্ধান্তে চলেছে।



কবিতা) 

ভালোবাসা

রাফি ফরায়েজী 


লাল আধর চুষে, মধুর আস্বাদন করা। 

কোমল ছোঁয়াতে, শিহরণ তুলে ঝরে পড়া উদ্বেল যৌবন। এ নয় ভালোবাসা। 

গোলাপে চুমু এঁকে কেবল, মধু সঞ্চয়ের প্রতারণা। কামনা পূরণের খেয়াল সাধনা। 

ভালোবাসা তো ষোড়শী কুমারীর লিপস্টিকের মতন, হৃদয়ে লেপ্টে থাকা করো প্রেমের মায়াবী আল্পনা।



ইনভার্টেড কমার ভেতর

উদয়ন চক্রবর্তী 


আমি একটা জায়গা খুঁজছি 


যেটাকে মনে হবে আমার, একান্ত আমার 

তখনই মহাজাগতিক ঝড় ভাসিয়ে 

নিয়ে এলো নৈসর্গিক ধূলো আর তাপ


যা আমার রক্তের ভিতর শতাব্দীর জমাট 

অহংকার বারবার জমাট বাধে অ্যাসপিরিন দিয়ে

লঘু করি সে কালচে রক্ত

আর ঠিকানা হীন পথে হেঁটে হেঁটে পথ খুঁজে মরি পিঁপড়ে দের মতো


মোবাইল টাওয়ারের মাথায় ক্লান্ত চিল

পড়ন্ত বিকেলে নেশাতুর মানুষের 

না পাওয়ার কান্না শুনে

নিজেকে যথার্থই স্বাধীন ভেবে একবার 

আকাশের দিকে তাকায় 

সূর্যাস্ত দেখবে বলে

উঁচু মানুষেরা কারাগারের

ওপরে বসে আলো ঘড়ি দেখে আস্থানায়

ফেরার মানচিত্র আঁকে


কৌতূহল ওকে জানিয়ে দেয় মৃত্যু নিয়ে 

মানুষের এড়িয়ে যাওয়ার অনুভব 

সেখানে হাজার জিজ্ঞাসা চিহ্ন হাতে দাঁড়িয়ে 

আছে সময়ের অপেক্ষায়

আর আমরা মানুষ নামের পোকা ইনভার্টেড কমার ভেতরে সেঁধিয়ে আছি মুহূর্ত দের হাতে নিয়ে।


শিক্ষার মাথা ন্যাড়া 

মনোজ চৌধুরী 


বেকারত্বের আগুনে জ্বলছে চারিদিক

হাজার হাজার দিন ঘুরে মেরুদন্ড নাজেহাল 

আগামী কী নিথর কানা বোবা ? 

শিক্ষা করলো মাথা ন্যাড়া- ভবিষ্যৎ হল টালমাটাল

তারা’ই কি লোহিতদূর্নীতির বাবা? 

শিক্ষার পোশাক কেড়ে: তারা কি করেছে ঠিক? 


আজ শিক্ষার মাথা ন্যাড়া 

ডুকরে ডুকরে কাঁদছে এক নারী-সমাজ-আগামী 

রঙিন চোখের স্বপ্ন চুরমার করেছে যাঁরা 

অন্ধকারের রক্তে দূষিত এই ভূমি

বেকারত্বের জ্বালায় জ্বলছি তুমি-আমি 


আজ শিক্ষা যেন যন্ত্রণায় কাঁদছে 

তার সঙ্গে কাঁদছে হাজার হাজার মুখ 

ডিগ্রি নম্বর মার্কশিট চুলোয় যাচ্ছে 

শুধু অন্ধকারের রাস্তা উন্মুখ। 


আজ শিক্ষার মাথা ন্যাড়া 

ডুকরে ডুকরে কাঁদছে এক স্বপ্ন 

ডুকরে ডুকরে কাঁদছে সমাজ 

যন্ত্রণায় কাতর এক নারী 

আর অন্ধকার আগামী। 


আজ শিক্ষার মাথা ন্যাড়া

শিক্ষা ডুকরে ডুকরে কাঁদছে।



নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি

রাতিক হাসান রাজীব


একটা নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তিতে 

ছেয়ে যাবে মাঠঘাট, 

ওাস্তার মোড়, রেলস্টেশন

শহরের অলিগলি, সর্বত্র। 

লিখা থাকবে- 

কবির কবিতা হারিয়ে গেছে। 

হারিয়ে গেলে তুমি

হারিয়ে যাবে তোমার সেই চোখজোড়া;

যেখানে পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার ঘনীভূত 

আমি তাকালেই ডুবে যাই অতল সমুদ্রে। 

হারিয়ে যাবে তোমার ঠোঁট;

যার হাসিতে আমার পৃথিবীর সমস্ত সুখ লুকায়িত।


আনাড়ি

রুদ্র সুশান্ত


যে আগুন জ্বলছে জ্বলুক

বৃথা চেষ্টার কি ছিল দরকার? 

এই আগুন জ্বলে জ্বলে নিভে যাবে

না হবে অন্যায় না হবে প্রতিবাদ আর। 


যে মাটি জ্বলছে বিনা দোষে

বিনা কারণে যে হল ছারখার-

পদ্যরা ঘুমিয়ে পড়ে শিরিষতলে

এইখানে আমিই প্রেমিক আমিই সরকার। 


এখানে পানির উপরে পদ্ম ফুটে না

সবুজে সবুজে ভালোবাসার কথা কয়না আর, 

ছেলেটা করেনা প্রেমের বায়না

নিঃসংকোচে জীবন চলছে যার।


প্রথম চুমুর রাত

আশরাফ চঞ্চল


কেউ একদিন ডেকেছিল কাছে-

ছায়াঘূর্ণি রাতে

ঠোঁট মদিরায় চুমুক দিয়ে

হয়েছিলাম রাজা! 

আমার সামনে যারা ছিল সবাই যেন প্রজা!


পদাবলি

পদাবলি

 

    অলঙ্করণ : জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ


সবুজ শাড়ির রূপকথা 

অনিন্দিতা মিত্র     


তোর সবুজ রঙের শাড়ির আলোকলতায় জসীমউদ্দীন এঁকেছেন নকশি-কাঁথার কাব্যচিত্র। আনমনা রোদ চা বাগানের সর্পিল গ্রন্থি ছুঁয়ে হাওয়া হয়ে মিলিয়ে যায় তিস্তার জলে, ইলোরার নিপুণ কারুকার্যে নীলাভ রঙ কাজল হয়ে ধরা দেয় তোর চোখে। নক্ষত্রের অনন্ত গর্ভে মুখ গোঁজে সভ্যতা। সম্পর্কহীন সম্পর্কে উষ্ণতা খুঁজে চলে অবুঝ মন। ভালোবাসার অকৃত্রিম আদিম গন্ধে শুদ্ধ হয় পৃথিবী। 



ফেরা হবেনা কোন দিন

আতিক এ রহিম 


কোন একদিন তোমার শহরে বৃষ্টি নামবে 

আমরা দু’জন মুখোমুখি ফুটপাতে বসে টুংটাং চায়ের কাপের 

শব্দের সাথে কথা মিশিয়ে সুখ দুঃখগুলো ভাসিয়ে দিব বৃষ্টির সনে।

শরতের অলস বিকেলটা ঝিমিয়ে পড়বে সারা শহর জুড়ে 

সঙ্গী বিহীন কাকের কর্কশ শব্দে তোলপাড় করে তুলবে বিজন সড়কটা।

অশত্থ গাছের নিচে বসা পাগলি মেয়েটারও একটা স্বপ্ন ছিল 

হয়তো কোন কপটতার ভাণে পড়ে আজ স্বপ্নটা ভাগাড়ে নিমজ্জিত। 

তোমার শহরে বৃষ্টি নামুক অথবা রোদে ঝলসে যাক আমার আর ফেরা হবেনা এই শহরে কোন দিন।


মেঘনার মেয়ে

গোলাম রববানী 


মেঘনার মেয়ে তুমিতো মুঠোর মতো মুক্তির লিফলেট 

তুমিতো বদ্ধঘরের খোলা দরজা জানালার মতো 

খোলা আকাশের মতো- মাঝেমধ্যে মেঘলোক- 

কখনওবা সূর্যে প্রচন্ড প্রখরতা, আবার কখনওবা ভেজা সন্ধেবেলা-ই বৃক্ষপাতায় লেগে থাকা জল

জলেরও আন্তযোগাযোগ- চাঁদের জোছনার আলো। 


যে কবিতা গনগনে আগুনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়

অসমান্তরাল কোনোএক চলমান প্লাটফর্মে

মর্মে মর্মে মূর্তিরূপে হৃদয়দানিতে সুসজ্জিত হয়

একটি পুতুল আরও একটি প্রজাপতি হয়ে 

সে আর কেউ না- মেঘনার মেয়ে 

মন ও মননজুড়ে আছে সেরিব্রামে


মেঘনার মেয়ে তুমি কবিতার মতো চিন্তার দৃশ্য 

সুউচ্চমাত্রার এক মেডিটেশনথ না পাওয়া ধ্যানজ্ঞান 

যাকে বলা হয় প্রেম: চাইছি ভালোবাসার ফ্রেম।



খুব ভালো আছি

মুস্তফা হাবীব 


রাত কতোটা গভীর হলে

সিঁধেল চোরগুলো শাহানশাহ্ হয়ে যায়

হয়ে যায় ঘুমমগ্ন পৃথিবীতে রাজাধিরাজ! 

এখন রাতের সুনসান নীরবতা, 

বাজার সিন্ডিকেট নির্বিঘ্নে কেড়ে নেয় 

মানুষের ক্ষুদ্র সঞ্চয়, বেঁচে থাকার স্বপ্ন ও সাহস। 


রাত শেষে সূর্যে আলো ফুটলেও

রাত ভেবেই বেনেরা সমুদ্রচুরি করে, 

স্বৈরবৃক্ষের ছায়াকে পুঁজি করে লুটপাট করে

কিছু মানুষ গড়ে তোলে অভয় অরণ্য, 

অত:পর ডায়াসে দাঁড়ায় 

সগৌরবে জানান দেয় ‘খুব ভালো আছি’।



ফিরে এসো 

ইউনুছ ইবনে জয়নাল 


ফিরে এসো; ফিরে এসো হৃদয় পাড়ে; এ বাংলায়-

ফিরে এসো জীবনের সৈকতে,

পালের লাগাম দাও কেটে

তরী ভিড়াও ঘাটে হৃদ্যতে।


ফিরে এসো সেখানে- যেখানে

হৃদয়ের স্পন্ধন থেমে গেছে,

অনেক আগে; সেখানে-

নতুন বন্দর গড়ার মানসে।


ফিরে এসো- যেখানে বুনো হাঁস নীড় বেঁধেছে;

শ্বাপদেরা সারা রাত জেগে থাকে,

নক্ষত্রেরা আলো ছড়ায় আপন মনে

ফিরে এসো-  সেই গাঁয়ের বাঁকে।


অবারিত মাঠে ফসলের ক্ষেতে

ফিরে এসো এ বাংলায়,

আমারে অনুভব করিবে যেথায়

ফিরে এসো সেথায়-

এ রূপসীর দেশে জলে কিম্বা ডাঙ্গায়।


আমরা ও রাজপথ

হিলারী হিটলার আভী 


যে রাজপথে সত্যের কলম থাকার কথা 

সেই রাজপথে রয়েছে লাঠি বোমা আর কামান!


যে রাজপথে মনন আলো থাকার কথা 

সেই রাজপথে রয়েছে তীর্যক মশাল আর শ্লোগান! 

যে রাজপথে স্নেহ মমতা আর অমোঘ প্রেম থাকার কথা 

সেই রাজপথে রয়েছে রক্তশোষক সুদখোর ঘুষখোর আর দালাল!


যে রাজপথে ফুল পাখি আর ইথার-পা থাকার কথা 

সেই রাজপথে রয়েছে সাইরেন রক্তমাখা বুট আর অত্যাধুনিক ব্যারিকেড!

যে রাজপথে স্বর্গীয় হাসি আর হাসি থাকার কথা 

সেই রাজপথে রয়েছে নির্মম ফাঁসি আর ফাঁসি!


যে রাজপথে শুধু রাজা আর প্রজা থাকার কথা 

সেই রাজপথে রাজাও নেই প্রজাও নেই 

রয়েছে শুধু আমার তোমার ও তার অসীম ব্যথা!

অর্থাৎ আমরা রাজা ও প্রজার আদর্শ আসন থেকে হাজার বছর ধরে বিচ্যুতি...!




ভালোবাসার বিচ্যুতি

আশরাফ চঞ্চল


জীবনের সর্বস্ব দিয়ে যাকে ভালোবাসলাম

চরণতলে বিছিয়ে দিলাম নৈবেদ্যের ফুল

সে যখন আমার দিকে তাক করে রাখে

বিষমাখা তীর আর নানা ফন্দি ফিকির

ঘায়েল করার চক্রান্তে থাকে বিভোর

তখন খুবই খারাপ লাগে-


যাকে সুখে রাখতে যেয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলি

যার মুখে খাবার জোটাতে নিজে না খেয়ে থাকি

যার ভালো পোশাক কিনতে দামি মার্কেটে যাই

সে আমার পোশাক দেখে যখন নাক সিটকায়

তখন খুবই খারাপ লাগে-


যার একটু অসুখ হলেই দিশেহারা হয়ে যাই

পাগলের মতো হাসপাতালে দৌড়াই

নিজ শরীরে হাজারো অসুখ রেখে

সুস্থ থাকার ভাণ করি

সে যখন আমার মৃত্যু কামনা করে

তখন খুবই খারাপ লাগে-


যার মুখে হাসি ফুটাতে নিজের হাসি জলাঞ্জলি দিই

যার বিলাসিতার জন্যে নানা ধান্দামিতে লিপ্ত হই

পরিজন ছেড়ে ভেতরে ভেতরে নরক পুষি

সে যখন বলে আমি তাকে কিছুই দিইনি

তখন খুবই খারাপ লাগে-


মন চায় ওকে ঘর ছাড়া করি

কিংবা নিজেই ঘর ছাড়া হই!



চিত্রনাট্য

দীপঙ্কর ইমন


ওখানে নুন ফুরিয়ে যাচ্ছে

এখানে বায়বীয় জল আরও উত্তপ্ত হয়।


মাঝখানে ভাত চাষী

সিন্ধু সভ্যতা থেকে আজ অব্দি

মহাজনের ভুল অঙ্ক মেনে নেয়।


ঈশ্বরের পূর্ণদৈর্ঘ্য ছায়াছবি আজও শেষ হলো না

যদিও,

ধান গাছ গুলো নাস্তিক হয়ে উঠলো এক এক করে।


নুন আনতে আনতে জল উধাও হয়ে যায়!

এখন ভাতের জন্য আরেকটি সভ্যতা চাই

এক পৃথিবী নুনের গল্প।


যদিও

পৃথিবীটা আজ

নিলাম হয়ে গেছে ঈশ্বর সমেত।


ছায়াছবির চিত্রনাট্যে

কেবল মহাজনেরই চরিত্র লেখা আছে।




তোমাকে ছোঁবো না কোনোদিন 

ইসলাম মুহাম্মদ তৌহিদ 


বারুদের গন্ধ হব

যুদ্ধের কান্না ছোঁবো 

তবু তোমাকে ছোঁবো না কোনোদিন

তোমাতে জমে আছে অপ্রেমের ঋণ।


বজ্রপাতের ঝিলিক হব

বিষধর ফণী ছোঁবো 

তবু তোমাকে ছোঁবো না কোনোদিন 

তুমি যে অস্পৃশ্য, প্রেমহীন!


পথিকের পথ হব

সারাদিন লাথি ছোঁবো 

তবু তোমাকে ছোঁবো না কোনোদিন 

তুমিই করেছ আমায় বিষাদে বিলীন।


মহাকাব্যিক দুঃখ হব

অগ্নিকুন্ডের ফুলকি ছোঁবো

তবু তোমাকে ছোঁবো না কোনোদিন 

তুমি যে নিষ্ঠুর মায়াহীন!




ভালোবাসাহীন নগরে 

রুদ্র সাহাদাৎ 


শুক্রবার এলে বাবাকে খুব করে মনে পড়ে, মা’কেও 

“রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা”

কাঁদে চোখ মোনাজাতে দু’হাতও 

জানালাহীন ঘরে যাব আমিও দু’দিন আগে পরে 

শূন্যতায় হাসি রোজ ভালোবাসাহীন নগরে....



প্রতীক্ষা

জহুরুল ইসলাম


 যমুনার বালুচরে কাশবন,

কতোদিন আসি আসি করে আজও আসোনি।


ঘর ছাড়া মন অপেক্ষায় থেকে থেকে,

ঘরে ফিরতেই ইচ্ছে হয় না।

তোমার ঠোঁটের মতো পাতার নড়াচড়া দেখি-

আশ্বিনি আকাশের ধুলোট মেঘ।

ক্ষয়ে যাচ্ছে সময়-

এসো এবার বালুচরের কাশবনে।


একবার এসো-

ভালোবাসার কথা বলিনি,

তোমার রক্তে তা নেই।


চাতকের মতো অপেক্ষায় আছি-

যমুনার ধারে- কৃষ্ণের বৃন্দাবনে।



সত্যিকারের প্রণয় 

কনক কুমার প্রামানিক


জেনে রেখো ওগো প্রিয়তমা

এ প্রণয় ক্ষণিকের নয়,

বিলাসিতা বা বাজীও নয়

এতো দুটি আত্মার জয়।


কামনা বাসনা মোহ নয়

দ্বৈত হৃদয়ের মিলন,

নিদ্রাময় অলীকও নয় 

সুখময় জীবনের ক্ষণ।


আবেগমাখা বচন নয়

আঙ্গুল ছুঁয়ে হাটা নয়,

ভালোবাসা অমর অমলিন

সত্যি প্রেম চিত্ত বিনয়