কাঁসার বাটি-এইচ এম সিরাজ




দূরগ্রামে এক কবিরাজের সন্ধান পাওয়া গেছে। ভাবীর ছেলেটা সেখানে সকালে গিয়েছিল। ছেলেটার সব সমস্যা বইয়ের মুখস্তপড়ার মতো গড়গড় করে সে বলে দিয়েছে। মানুষ তার কাছে অমাবস্যার মুখ নিয়ে যায় আর ফিরে আসে চাঁদমুখ নিয়ে।
দীর্ঘদিন রোগে ভুগতে কারই বা মন চায়? এই ডাক্তার, সেই ডাক্তার দেখিয়ে জীবনটা তার তিক্ত হয়ে গেছে। কিছুদিন ভালো যায় আবার হঠাৎ করেই রোগটা তারে ধরে বসে। তার কাছে এতো ভোগাভোগি আর ভালো লাগে না। মানুষ নানা ঘাট ঘেটে যখন সমাধান না পায়, তখন যে যা বলে তাতে বিশ্বাস করে বসে। বাঁচতে সবাই চায়। মানুষ বাঁচার জন্য বিশ্বাস পাল্টাতেও দ্বিধা করে না। আরোগ্য লাভের আশা মানুষের আজন্মকাল।
আরোগ্য লাভের কিঞ্চিত আশা বুকে বেঁধে বিকালে রওয়ানা দিয়ে প্রদীপ বাড়িতে গিয়ে পৌঁছায় রাতে। খুব ভোরে উঠে ভাতিজাসহ প্রদীপ মোটরবাইকে চড়ে বসে। কবিরাজ আজ প্রদীপের ভাতিজার চিকিৎসা দেবেন। খুব সকালে গিয়ে সেখানে হাজির হতে না পারলে সিরিয়ালে পিছনে পড়তে হবে। তখন ফিরতে বিকাল হয়ে যেতে পারে।
একগ্লাস পানি পান করে যাত্রা। প্রথমে দেড় কিলোমিটারের মতো ইটের জাম্পিংরোড অতিক্রম করে ভাঙাচোরা পিচের রাস্তা পার হয়ে হাই-রোড। হাই-রোডের স্বাস্থ্যফিগার ভালো। চেহারা দেখলেই বোঝা যায় হার্বাল চিকিৎসার মতো স্বাস্থ্য পুনর্গঠন করা হয়েছে। আমাদের দেশের রাস্তাঘাটের এই এক অবস্থা। হার্বাল চিকিৎসার টনিক মেডিসিনের মতো টনিক সামগ্রী দিয়ে রাস্তার স্বাস্থ্য গঠন করা হয়। কিছুদিন পরে আবার রোগীদের ভগ্ন-স্বাস্থ্যের মতো রাস্তা-ঘাটও ভগ্ন-স্বাস্থ্য ফিরে পায়। স্বাস্থ্যবান রাস্তার ওপর দিয়ে মোটরবাইক শা-শা শব্দে গন্তব্যের দিকে ছুটে চললো। পাঁচ-ছয় কিলোমিটার যাওয়ার পরে আবারো এলাকার পিচের ভাঙা রাস্তা। তারপরে আবারো দুই কিলোমিটার পরে ইটের জাম্পিংরোড। মনে হয় রাস্তার ভেতরে স্প্রিং বসানো।
কবিরাজ বাড়ির সামনে গিয়ে যখন বাইক থামলো তখন ঘড়ির কাঁটা সকাল ছয়টার ঘর ছুঁয়েছে। বাড়ির সামনে নতুন পাকা মসজিদ। পাশে পুকুর। অপর পাশে একটা দোকানও আছে। বাড়ির সামনে একটা ছোট ঘর। এইসব এলাকায় ঘরটিকে ‘কাছারি ঘর’ বলে। এখানে বসেই কবিরাজ রোগী দেখেন। রোগীরা এখনো কেউ আসেনি। বসার জন্য কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার রাখা আছে। কাছারি ঘরের উত্তরপাশে ছোট একটা বারান্দায় মহিলাদের বসার ব্যবস্থা আছে। হুজুরের বসার টেবিল বরাবর উত্তরপাশে একটা জানালা। সেই জানালা দিয়ে হুজুর আর রোগিনীদের সাক্ষাত হয়, চিকিৎসা হয়। সেখানে দুইজন মহিলা ইতোমধ্যে এসে বসে রয়েছে।

প্রদীপরা উঠে চেয়ারে বসলো। এখানে কবিরাজ বলা যায় না, হুজুর বলতে হয়। সবাই হুজুরের প্রতীক্ষায় মিনিট গুণছে। একএক করে সাড়ে ছয়টার মধ্যে পাঁচ-সাতজন রোগী এসে প্রদীপের পিছনের চেয়ার দখল করলো। একটু পরপর মোটরবাইক থামার শব্দ শোনা যাচ্ছে। দূরের রোগীরা মোটরবাইকে আর কাছের রোগীরা মোটরভ্যানে করে আসে।
টেবিলের ওপরে একটা রেক্সিন দেয়া। কিছু ছোটছোট কাগজ সাইজ করে কেটে ক্লিপ দিয়ে বেঁধে রাখা। পানির একটা গ্লাস মহিলাদের জন্য জানালার পাশে রাখা আর একটি পুরুষদের জন্য টেবিলের দক্ষিণপাশে রাখা। টেবিলের মাঝখানে বড় একটা কাঁসার বাটি উপুর করে রাখা আছে। হুজুরের চেয়ারে একটা ছেঁড়া বালিশ আর একটা পুরনো তোয়ালে রয়েছে। ঘরের চেহারাটা নববধূর মতো নয়। আলসে চরিত্রের কোনো মানুষের গায়ের মতো। আনাচে-কানাচে ঝুট-ময়লার কোনো সংকট নেই। হুজুরের চেয়ারের পিছনের দরজায় জীর্ণ-শীর্ণ একটা ধূসর হলুদ পর্দা টাঙানো। ওখান থেকেই মূলত হুজুর আসা-যাওয়া করে। হুজুর-হুজুর বলে হঠাৎ একটা সাড়া পড়ে গেছে।
সর্বমান্য হুজুর সদর দরজা দিয়ে ঢুকে সবাইকে সালাম দিয়ে চেয়ারে বসলো। তার সামনে এক লোক এসে বসেছে। লোকটার কথাবার্তা ও হাবভাব দেখে লোকটারে হুজুরের চামচা বলে মনে হলো। কিছুক্ষণ পরে প্রদীপের ধারণাই সঠিক হয়। ‘হুজুর, এই রোগী আগে ছেড়ে দেবেন, ইনি মেলা দূর হতে এসেছে’ এই রকম কথাবার্তা কয়েকজন সম্বন্ধে লোকটা বললো। প্রদীপের পক্ষ থেকে তার ভাতিজা নির্ধারিত টাকা টেবিলে রেখে তাদেরকে দেখার অনুরোধ জানায়। হুজুর তার পাশে গিয়ে দাঁড়ানো দুজনকে দেখিয়ে ‘এরা নামাজের পরে এসেছে। এদেরকে একটু আগে ছাড়তে হবে। আপনারা একটু ধৈর্য ধরে বসুন’ বলে সান্ত¦না দেয়।

সবাই ধৈর্য ধরে বসে। প্রদীপও চুপচাপ বসে আছে, কোনো কথা নেই। ভদ্রতা বলে একটা কথা আছে। আর যা-ই হোক মানুক বা না মানুক সবখানে তো অভদ্র হওয়া যায় না। তারওপর প্রদীপ একজন ভদ্র ছেলে। হুজুরের রোগী দেখা শুরু হলো। হুজুর প্রত্যেকের জন্য তার কাঁসার বাটিতে জগ থেকে এককাপ পরিমাণ পানি ঢালেন। তারপরে রোগী তার নাম বললে হুজুর সেই পানির মধ্যে লাল কালিভরা কলমটির নিপটাকে একবার ডুবিয়ে তোলেন। বাটির পানি সঙ্গে সঙ্গে লাল হয়ে যায়। হুজুর ওই লাল পানির মধ্যে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রোগীর সম্বন্ধে বলেন। তারপরে সেই কাঁসার বাটির লাল পানিটুকু গ্লাসে ঢেলে রোগীকে পান করতে দেন। রোগীরা সেই কলম ডুবানো পানিটুকু ডকডক করে পান করে ফেলে। এরপর আরবি লেখা কাগজগুলো সাত দিন, এগারো দিন রোগীদেরকে পানিতে ভিজিয়ে পান করতে বলে। সেই পানি পান করলে সব সমস্যা সেরে যাবে, এমনই বিশ্বাস রোগীদের।
দ্বিতীয় রোগী একজন ছাত্র। হুজুর বললো, ‘ওর লেখাপড়ায় মন বসে না। পড়া ভুলে যায়, বদরাগী। ভয় পেয়েছে আর ওর ওপরে একটা আছড়ার ভাব আছে। দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসা দিলে ঠিক হয়ে যাবে।’

প্রদীপ ভাবে স্কুলপড়ুয়া গ্রামের ছেলেমেয়েরা অনেকেই এখন এরকম হয়ে থাকে। কোন পরিবারের বাচ্চারা কী রকম হতে পারে এই হিসেব করে হুজুর সমস্যা বলে দিচ্ছে। এরপর এক মহিলা জানালার ভেতর থেকে টাকা দিয়ে জানালো সে সুদূর ঢাকা থেকে এসেছে। তার নাতনির সমস্যা। তাকে একটু আগে ছেড়ে দিতে হবে।
হুজুর ‘দেখতেছি’ বলে ওই ছেলের জন্য তাবিজ-কবজ দিলো। হুজুরের চামচা  ওই মহিলাকে দেখার জন্য হুজুরকে তাগাদা দিয়ে একজন মহিলার পর একজন পুরুষ দেখার অনুরোধ করলো। রোগীরা কে কী করবে না করবে তার একটা বয়ান সে রোগীদেরকে দেয়। মহিলা রোগীর কাছে তার নাতনির নাম জিজ্ঞেস করা হলো। হুজুর নাম শুনে তার তরিকামতে বললো, ‘আপনার নাতনির মেয়েলী সমস্যা। পেটে ব্যথা, অনিয়মিত ঋতুস্রাব, মাথা ঘুরায়, শরীর দুর্বল, তিন মাস তেরো দিনের সমস্যা। তারে দোষে পেয়েছে। চিকিৎসা দিলে সুস্থ হয়ে যাবে। চিকিৎসা নেবেন?’

মহিলা হুজুরকে চিকিৎসা দিতে বললেন। হুজুর তার চিকিৎসায় বরখাস্ত ও শরীরে বাঁধার তাবিজ দিলেন। নিয়ম করে খেতে বললেন। একদিন পরে চারটি যে কোনো কাঁচা কলা নিয়ে আসতে বললেন। হুজুর কলায় দোয়া-কালাম পড়ে ফুঁ দিয়ে দেয়। সেই কলা ছুরি দিয়ে কাটতে হয়। এখানের নিয়ম আছে। কলা হুজুরই কেটে দেন। রোগীরা কাটতে গিয়ে ভুলভাল করে ফেলবে। এজন্য হুজুরকে কলা-কাটা বাবদ মাত্র বিশ টাকা দিতে হয়। যারা দুই-পাঁচশো টাকা যাতায়াতে খরচ করে যায়, তাদের পক্ষে হুজুরকে কলা কাটার জন্য বিশ টাকা দেয়া কোনো ব্যাপারই না। মহিলার নাতনিকে দেখার পরে হুজুর আরেক রোগী ধরেন। প্রদীপের ভাতিজা হুজুরকে তাগাদা দিলেন। কোনো কাজ হলো না। জানালার ভেতর থেকে আরেক মহিলা হুজুরকে টাকা দিয়ে দেখার অনুরোধ করলো। সেও দূর থেকে এসেছে।

প্রদীপ বসে আছে, মুখে কোনো কথা নেই। সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছে। এইসব চিকিৎসার ওপরে তার কোনোকালে বিশ্বাস ছিলো না। তারপরও সবার অনুরোধে এসেছে। হুজুরের দরবার দেখে তার পছন্দ হয়নি। এখানে লিখিত কোনো সিরিয়াল নেই। সিরিয়াল হলো হুজুর যখন যাকে দেখেন তার সিরিয়াল নাম্বার তিনি লিখে রাখেন। এতে রোগী সমাগমের ধারাবাহিকতা মাঝে মধ্যে ব্যাহত হয়। কোনো রোগী এতে আহত হলেও হুজুরের দরবারে তা বলতে পারে না। মাঝে-মধ্যে অবশ্য দুএকজন উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। উত্তেজনা প্রদীপের মাঝেও সৃষ্টি হচ্ছে। প্রথমদিকে এসেও তারা পাঁচ-সাতজনের পিছনে পড়ে গেলো। তার কাছে মনে হলো কোথাও যেন নিয়ম নেই।
মহিলাদের ওপাশ থেকে আবারো হুজুরের সহকারি একজনকে দেখার অনুরোধ করে। মহিলাও তাকে দেখার জন্য হুজুরকে বলে। প্রদীপ আর নিশ্চুপ থাকতে পারে না। সে মহিলাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘আপনার আগে আমরা অনেক দূর থেকে এসেছি। আমাদের পরে আপনাকে দেখা হবে।’
হুজুর এরমধ্যে তার টেবিল মোছা, হাত মোছা একটা নেকড়া দিয়ে পুরুষদের পানি পানের গ্লাসের ভেতরটা মুছে নিলো। প্রদীপের কাছে বিষয়টা ভালো লাগে না। সে এক ফাঁকে মাথা উঁচু করে দেখে কাঁসার বাটির ভেতরেও অনেক ময়লা জমে আছে। যেন এই কাঁসার বাটি কোন আমলে ধোয়া হয়েছে তার ঠিক নেই।
হুজুর প্রদীপকে সান্ত¦না দিয়ে বসিয়ে রেখে আরো একজন রোগী দেখলেন। তারপর প্রদীপের ভাতিজারে কিছু তাবিজ-কবজ ও কলা পড়ে দিলেন। হুজুরের সহকারি প্রদীপের ভাতিজা কলা কাটতে পারবে না বলে তার কাছ থেকে কলা কাটা বাবদ বিশ টাকা চেয়ে নিলো।
এবার প্রদীপের পালা। প্রদীপের নাম শুনে হুজুর পানিতে কলমের নিপ ডুবিয়ে বলতে লাগলো, ‘সমস্যাটা আপনার দীর্ঘদিনের। আগে ভালো অবস্থানে ছিলেন, এখন ডাউনে আছেন। বুকের ডানদিকে ব্যথা। পেটে একটা দাগ আছে। কি ঠিক আছে?’
প্রদীপ উত্তর করলো, ‘না। ব্যথা বুকের ডানদিকে না, পেটের ডানদিকে। আর পেটে কোনো দাগ নাই।’
হুজুর বললেন, ‘দাগ পেটের মধ্যে। ব্যথাটা কতদিনের?’
প্রদীপ খটকা উত্তর দিলো হুজুরকে ‘আপনিই বলেন ব্যথাটা কতদিনের।’
হুজুর একটু না-খোশ হয়ে বললেন, ‘আপনার মন অস্থির। তারওপর লোকের ক্ষতি আছে। দুইটা লোক আপনার ক্ষতি চায়, চিকিৎসা দিলে আর ক্ষতি করতে পারবে না। কি চিকিৎসা দেবো?’
প্রদীপ চিকিৎসা দেয়ার জন্য হুজুরকে সম্মতি দেয়। হুজুরের চিকিৎসা দেখা প্রদীপের সখ। হুজুর কিছু বরখাস্ত লিখে তা ভিজিয়ে সাতদিন, এগারো দিন খেতে বলে। কাঁসার বাটির পানি গ্লাসে ঢেলে প্রদীপকে পান করতে দেয়। এই পানি পানে তার ভেতরে সায় নেই। সে একটু আগে গ্লাসটা ময়লা নেকড়া দিয়ে মুছতে দেখেছে। আবার পানি পান না করলে যদি হুজুর বেয়াদব কিংবা ভক্তি না থাকলে সে কেন গিয়েছে, এরকম কিছু একটা বলে বসেন তখন পরিস্থিতি ভিন্ন রকম হতে পারে। এখানে যারা এসেছে তারা সবাই অজ্ঞ, অন্ধ। এরাও তাকে তিরস্কার করা থেকে বিরত থাকবে না। সে গ্লাসের অল্প একটু পানি কোনোমতে মুখে নিয়ে হুজুরকে সালাম দিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে যায়। পথের মধ্যে বরখাস্তগুলো প্রদীপ তার ভাতিজারে দিয়ে বলে, ‘এগুলো তুই রাখ, আমার লাগবে না।’
বাড়িতে আসার পরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, সে কেন সবটুকু পানি পান করেনি। বাড়ির সবার এক কথা। ভক্তি না করলে সেখানে কেন গিয়েছে। ভক্তিতে মুক্তি মেলে। এরকম কথার অভাব হলো না। তার মা বলে, ‘সবাই সেখানে গিয়ে উপকার পায়, সবাই সে পানি খায়। তুই খেলে সমস্যা কী ছিলো?’
প্রদীপ বলে, ‘আমাকে ওদের সাথে তুলনা করবা না। অনেক কিছু শুনে গিয়েছিলাম। যা দেখার তা তো দেখেই আসলাম। ওখানে যারা যায় তারা অজ্ঞ-অন্ধ। অন্ধ-মানুষদের বিশ্বাস নিয়ে যত খেলা। কাঁসার বাটির পানির মধ্যে সবকিছু যদি দেখেই থাকবে তবে আবার আমার কাছে সমস্যা কতদিনের জানতে চাইবে কেন?’
প্রদীপের মতো একজন মানুষ তার দরবার থেকে বিমুখ হয়ে ফিরে আসলেও একখানা কাঁসার বাটির কেরামতীতে হুজুরের দরবারে অন্ধবিশ্বাসীদের প্রতিদিন অভাব হয় না।


_________________

শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট