এ আই জাজাকী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
এ আই জাজাকী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বাস্তুতন্ত্র

বাস্তুতন্ত্র


বাস্তুতন্ত্র 

আহাদ আদনান


বন্যার জল আর আটকানো গেলো না। প্রতিবারই বাড়ির সামনের মাঠটা ডুবে যায়। এবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে জ্যৈষ্ঠ থেকে। উপোষী মাঠটা আষাঢ়ের গোড়াতেই টুইটুম্বুর। কাচপুরের পাশের খালটা বেয়ে জল চলে যায় শীতলক্ষ্যায়। গত শীতেই যখন ড্রেজার দিয়ে খাল ভরাট হচ্ছিল তখনই কুসুম তার স্বামী আয়নালকে বলেছিল, ‘এইবার বর্ষা আইলে ঘরে পানি ঢুকব, দেইখো তুমি। পানি নামার রাস্তা দিতাছে বন্ধ কইরা। ঘর পাল্টাইবা নাকি এইবার’?

‘এত কম খরচে ঘর পাবি কই তুই? সপ্তাখানেক ইট দিয়া ঠ্যাক দিলেই চলব’।

ঘরটা আসলেই সস্তা এই বাজারে। যাত্রামুড়ার মহাসড়কের ডান পাশ দিয়ে গেছে ছোট গলির মত এক রাস্তা। এটা মিলবে ভুলতার বড় রাস্তার সাথে। রাস্তার দুই পাশে খোলা মাঠ, ধানের জমি। আরেকটু এগুলেই ময়লার ভাগাড়। রাজধানীর বাড়িতে বাড়িতে জমে থাকা আবর্জনা প্রতিদিন নিয়ে আসে সিটি কর্পোরেশনের গাড়িগুলো। ফেলে দিয়ে যায় এই খোলা আকাশের নিচে। পচে পচে এরা দুর্গন্ধ ছড়ায়। বংশবিস্তার করে অতি উর্বর জীবাণুর দল। মাছি এসে পাখায়, পায়ে করে এই দূষিত কণা পৌঁছে দেয় বাসনে বাসনে। এই আবর্জনা যেন স্বাদ বাড়িয়ে দেয় পথের ধারের খুপরি দোকানগুলোর পুড়ি, চপ, চটপটি, ফুচকার। ছেলেদের দল হাঁক দেয়, ‘মামা, ফুচকার লগে টক মারো বেশি কইরা’। 

আলতাফ চৌধুরী থাকেন তারাবোতে। প্রধান সড়কের পাশেই তার পাঁচতলা বাড়ি। কয়েক বিঘা ধানের খেত আছে এই মাঠের সাথেই। এর মাঝেই একটা একতলা ঘর বানিয়ে রেখেছেন। শরিকের জমি। গ-গোল লেগেই থাকে। বাড়িটা তাই এক ধরণের জমি দখলই বলা যায়। দুইটা থাকার ঘর, একটা রান্না ঘর আর একটা টয়লেট। পূব দিকের ঘরে থাকে বজলু। এক ছেলে আর বউ নিয়ে তিন জনের সংসার। বরপা’তে একটা ‘বাংলার তাজমহল’ তৈরি হয়েছে, তার পাশেই একটা চায়ের দোকান তার। আর পশ্চিম দিকের ঘরটা আয়নালের। পরিবারের সদস্য একজন বেশি, কিন্তু আয় কম। সুদের টাকায় একটা অটো-বাইক কিনে সে এই পথেই চালায়। কিস্তির টাকা দিয়ে হাতে থাকে সামান্যই। পাঁচ মাসের বাচ্চাটা রেখে তার বউ কুসুম ছুটা বুয়ার কাজ নিয়েছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যাত্রামুড়া তিনটা ফ্ল্যাটে কাপড় কাঁচা আর ঘর মুছা। বড় মেয়েটার বয়স এগারো বছর। ছোট বোনকে সে দেখে রাখে ভালো মতোই। করোনার জন্য স্কুল বন্ধ। সারাদিন কাটে তার বোনের সাথে খেলা করে। 

বোনটা খুব ঠা-া মিষ্টি’র। মীনা কার্টুন দেখে আর নিজের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রেখে দিয়েছে মিঠু। মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলে, ‘কও, মিঠু। আমার নাম মিঠু’। মিঠু অবশ্য শুনে কিনা এটা নিয়ে সন্দেহ আছে যথেষ্টই। বাড়িতে ডেলিভারি করতে গিয়ে আটকে ছিল অনেকক্ষণ। জন্মের পর কান্না করেছে অনেক দেরিতে। খিঁচুনি হয়ে মরতে বসেছিল বাচ্চাটা। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে বেঁচে গেলেও সারা জীবনের জন্য পিছিয়ে পড়েছে পাঁচ মাসের মিঠু। এখনও তার ঘাড় শক্ত হয়নি। মুখ দিয়ে কোন শব্দও করেনা। আয়নাল তিনটা মাজার থেকে তাবিজ এনে বেঁধে দিয়েছে গলায়, বাহুতে আর কোমরে। ফলাফল লবডঙ্কা। 

আষাঢ়ের মাঝামাঝি। বৃষ্টি হচ্ছে বিকেল থেকে। বজলু ডাক দেয় আয়নালকে।

‘আয়নাল ভাই, এই পুরা বাড়ি তোমারে দিয়া দিলাম। এক তারিখেই আমি ঘর ছারুম। আর পোষাইতাছে না’।

‘ক্যান, কী অইছে? যাইবেন কই’?

‘দোকান বন্ধ হইতে হইতে মাঝ রাইত হয়া যায়। কাছাকাছি একটা বাসা নিছি। এই বাড়িতে মানুষ থাকে? জন-মানব নাই, দোকান-পাট নাই। সারাদিন গুয়ের গন্ধ আর মাক্ষি ঘুরঘুর করে। কোনদিন রাইতে চোর নাইলে ডাকাত আইয়া ল্যাংটা কইরা ফালায়া রাখব। আষাঢ় শেষ না হইতেই সিঁড়িতে পানি আইছে। এইবার ঘর ডুইবা যাইবই। ঘরে পানি হান্দাইলে যাইবা কই মিয়া’?

‘কথা ঠিকই কইছেন। তা আপনার আয় রোজগার মাশাল্লাহ ভালা। আমি এই বেজন্মা কিস্তির ফান্দে পইড়া গেছি। পানি উঠলে ইট দিতে হইব। কয়টা দিনের ব্যাপার’।

বিপদ এবার সব দিক থেকেই আসলো। করোনার জন্য আয় কমে গেছে আগে থেকেই, সাথে যোগ হয়েছে বন্যা। আষাঢ়ের শেষের দিকে ঘরে জল ঢুকে পড়ে। ইট দিয়ে খাট, টেবিল আর ওয়োরড্রৌব উঁচু করে দিয়েছিল আয়নাল। প্রথমে দুটো করে ইট। তারপর চারটা করে। রাতের আঁধারে তারাবো ইটের খোলা থেকে সে চুরি করে আনত ইট। শ্রাবণের বারো তারিখে স্বপরিবারে আয়নাল বাসা বাঁধে বাড়ির ছাদে।

চৌধুরীর কাছে গিয়েছিল আয়নাল। একটা নৌকা, মই আর ত্রিপলের জন্য। শুধু একটা মই দিয়ে দূরদূর করে তাকে বিদেয় করেছে চৌধুরী। নদীর মাঝখানে চরের মত জেগে থাকে বাড়ির ছাদটা। ত্রিপল জোগাড় করতে না পেরে সে লাগিয়ে নিয়েছে পলিথিন। ওঠানামা চলে মই দিয়ে। রোজ সকালে কাছা দিয়ে সাঁতার কেটে সে উঠে জেগে থাকা সড়কে। সাথে পলিথিনে থাকে শুকনো জামা আর লুঙি। সমস্যায় পড়ে কুসুম। ভেজা শাড়িতে ড্যাবড্যাব করে চোখ দিয়ে তাকে ছিঁড়ে খায় পুরুষের দল। এই বিপদে সেও জুটিয়ে ফেলে কালো পুরনো একটা বোরকা। সাঁতার শেষে পথে উঠেই ব্যাগ থেকে বোরকা বের করে নিজেকে দেয় সে ঢেকে। কাজের বাড়ির ম্যাডামকে বলে সে তার আরেকটা শুকনো জামা ওই বাসাতেই রাখার অনুমতি নিয়ে নেয়। 

মিষ্টি এখন যেন আরও বড় হয়ে যায়। কত দায়িত্ব ছোট কাঁধে! বোনকে নিয়ে তার কত গবেষণা! মা বলেছে পানি গরম করে দুধ বানাতে হবে। এখনতো মাটির চুলার জ্বালানি পাওয়া কঠিন। কেরোসিনের স্টোভ কিনে ফেলেছে তাই আয়নাল। পানি কতটুকু গরম করতে হবে? বেশি গরম করলে মুখ পুড়ে যাবে মিঠু’র। মা বলেছে সাথে মিছরি দিতে। আজ একটু চিনি মেশালে কেমন হয়? মা বলেছে তিন ঘণ্টা পরপর খাওয়াতে। আচ্ছা, মাঝে আরেকবার দিলে কেমন হয়? বন্যার দিনগুলোতে মিষ্টি যেন মিঠু’র মা হয়ে যায়।

তার গবেষণার মূল বিষয়বস্তু অবশ্য মিঠু’র থাকার জায়গা। বৃষ্টি লেগেই থাকে সারাদিন। জোরে বাতাস ছাড়লে পলিথিন ছিঁড়ে যেতে চায়। বৃষ্টির ছিটা এসে ভিজিয়ে দেয় ওদের। এই বৃষ্টির জল গায়ে লাগলেই জ্বর, ঠা-া লাগবে। ওষুধ কিনতে হবে। এত টাকা বাবা কোথায় পাবে? ভেবে ভেবে একটা বুদ্ধি বের করে ফেলে মিষ্টি। ওয়োরড্রৌবের ভেতর পিচ্চিটাকে ঢুকিয়ে রাখলে কেমন হয়? এর চেয়ে নিরাপদ জায়গা আর হয়না। কাঠের ওয়োরড্রৌব। চারটা ড্রয়ার, একটার নিচে আরেকটা। পাশে আরেকটা লম্বা খুপরি। ওটাতে শীতের কম্বল, মশারি রেখে দিয়েছে কুসুম। চারটা ড্রয়ারের একটাতেই রাখতে হবে মিঠুকে।

ছোটখাটো মিষ্টি’র জন্য নিচের ড্রয়ারটাই সবচেয়ে সহজ। উপরেরটা সে নাগাল পেলেও উঁকি মেরে দেখতে পারে না। মিঠু কখন জাগবে, খাওয়াতে হবে, প্র¯্রাব করেছে কিনা সেটা বোঝা কঠিন হয়ে যাবে। তাছাড়া একবার প্রস্রাব করে দিলে কাঠ বেয়ে বেয়ে নিচের ড্রয়ারগুলোতে চলে যাবে। কিন্তু নিচের ড্রয়ারটা ইঁদুরের আস্তানা। পুরনো ওয়োরড্রৌবের নিচের দিকে খুপরিতে ওরা থাকে। কোনভাবেই ওদের উৎপাত থেকে বাঁচা যায়না। এই বন্যাতেও ওরা যেন মাটি ফুঁড়ে বের হয়ে আসে। ওরা নিশ্চয়ই মিঠুকে কামড় দিবে। নিচের ড্রয়ারে রাখা যাবে না ওকে।

নিচ থেকে দ্বিতীয় ড্রয়ারটাতে আবার প্রচ- আরশোলার উপদ্রব। ফ্রক বের করে পরার আগে মিষ্টি ভালো করে ঝেড়ে নেয় আগে। কালো কালো শুকনো আরশোলার বিষ্ঠা ছড়িয়ে থাকে মেঝেতে। এই বিষ্ঠা মিঠু’র পেটে গেলে নির্ঘাত ডায়রিয়া হবে। এর ঠিক উপরের ড্রয়ারেও আরশোলা হানা দেয়, তবে প্রতিদিনের পরার জামা সেখানে থাকে বলে খুব বেশি বিষ্ঠা জমেনা ওখানে। তবে সমস্যা হচ্ছে ওটাতে মিঠু প্রসাব করলে নিচের দুইটা ড্রয়ারেও চলে যাবে। অনেক চিন্তা করে মিষ্টি পলিথিন কেটে, আর ভাত ডলে ডলে আঠা বানিয়ে একটা ব্যাবস্থা করে ফেলে। হাফপ্যান্টের মত করে পলিথিন প্যাঁচিয়ে দিলেই নিশ্চিন্ত। কিছুক্ষণ পরপর দেখলেই হবে পলিথিনে মূত্র জমেছে কিনা। কোনো জামার সাথে প্র¯্রাবের মাখামাখি হওয়ার চিন্তা থাকবে না।

কত বড় একটা আবিষ্কার করে ফেলেছে সেটা মিষ্টি প্রথমে বুঝতে পারেনি। আগে ঝড়ো বৃষ্টি হলে বোনটাকে আগলে রাখতে বেশ বেগ পেতে হত তাকে। এখন ড্রয়ারে রেখে ড্রয়ারটা বন্ধ করে দিলেই খালাস। একটু অবশ্য ফাঁকা রাখতে হয়, না হলে দমবন্ধ হয়ে মরে যেতে পারে। তবে বৃষ্টির জলের একটা অণুও মিঠু’র গায়ে লাগার সম্ভাবনা নেই। আবার ওখানে রেখেই পানি গরম করা, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়া, কিংবা ছাদে একা একা এক্কাদোক্কা খেলা সব সহজ হয়ে গেছে।

দুই দিনের দিন মিষ্টি কুসুমকে বলে তার কীর্তির কথা। কুসুম শুনে অবাক হয়।

‘কী কস তুই? পইড়া গেলে’?

‘পড়ব ক্যামনে? এইটাতো নড়েও না, চড়েও না। চিত হইয়া হুইয়া থাকে সারাদিন’।

‘দম বন্ধ হইয়া মইরা যায় যদি’? 

‘তোমারে কইছে? আমি একটু ফাঁক রাখি বাতাস যাওয়ার লেগা। দম ঠিকই নেয় মিঠু’।

‘ফাঁক রাখস, আরশোলা ঢুকবোতো ভিতর। হাইগা নষ্ট করব সব’।

‘তুমি তো লাগাইয়া রাখো, তারপরও আরশোলা আটকাইতে পারছো? আমি বরং বইয়া বইয়া আরশোলা মারি। তুমি ড্রয়ার খুঁইজা দেখো। আরশোলা পাইবা না একটাও। কালো গু’ও নাই। সবকিছু আমিই পরিষ্কার কইরা রাখি’।

‘মুত লাইগা কাপড় গান্ধা হইয়া গেলে কিন্তু তোর বাপে চিল্লাইবো। আর হাগলে কী করছ তুই’?

মিষ্টি তার মাকে পলিথিনের ন্যাংটির মত জিনিসগুলো দেখায়। এই দেশে পলিথিনের মত সহজলভ্য বস্তু আর নেই। মানুষজন ইচ্ছেমতো পলিথিন ব্যবহার করে আর ফেলে দেয় যেখানে সেখানে। বন্যার জলে সেই পলিথিন ভেসে আসে। নিচে নামলেই শত শত পলিথিন। মিঠু’র পলিথিনের ন্যাংটিও তাই অসংখ্য। এতক্ষণে কুসুমের মুখে স্বস্তির হাসি আসে। সে এর মধ্যে বিকেলেও কাজ নিয়েছে। মেয়েটা না থাকলে, এত বুদ্ধি না থাকলে সমস্যায়ই পড়ে যেত সে।


দুই সপ্তাহেও বন্যার জল নামার নাম নেই। আয়নাল সেদিন বলছিল বন্যা এবার রেকর্ড করছে। এত বেশি দিন জল জমে থাকার নজির নেই গত ত্রিশ বছরে। তাদের সমস্যা হচ্ছে এই জল বদ্ধ জল। সহজে নামবে না। ছাদে বসবাস তাই চলতেই থাকে। সেদিন দুপুরের দিকে মিষ্টি নেমেছিল প্রাকৃতিক কাজ সারতে। একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। এসে প্রথমেই ড্রয়ারে দেখতে গিয়েছে মিঠু প্রস্রাব করেছে কিনা। ড্রয়ার টান দিতেই সে ভয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে। কালো একটা বিড়াল গুটিসুটি পাকিয়ে শুয়ে আছে মিঠু’র ঠিক পাশেই। ওর চিৎকার শুনেই এক লাফ দিয়ে পালালো চতুষ্পদ জন্তুটা। বিড়ালটা এলো কিভাবে? ওরা কি সাঁতার জানে? নাকি নিচের ঘরেই লুকিয়ে ছিল? এসব ভাবতে ভাবতেই সে মিঠু’কে কোলে নিয়ে উলটেপালটে দেখে। কামড় দেয়নি তো জানোয়ারটা?  এই বোকা পিচ্চিতো কাঁদেও না। অক্ষত মিঠু’কে দেখে মিষ্টি হাফ ছেড়ে বাঁচে।

মিষ্টি দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। এত শত্রু চারদিকে। ইঁদুর, আরশোলার সাথে যোগ দিয়েছে বিড়াল। এত শত্রু থেকে বেঁচে থাকতে হয় মানুষকে। এটাই বাস্তুতন্ত্রের আদি সূত্র। এদের চেয়ে বড় শত্রু বন্যার জল। মিঠু ঘুমিয়ে গেলে মিষ্টি ছাদে বসে দেখে চারদিক। তাদের ছাদটাকে মনে হয় দ্বীপের মত। আকাশটা মেঘলা হয়ে আছে। বৃষ্টি হবে যেকোনো সময়। মিঠু’কে আরেকবার দেখতে আসে সে। ঘুমিয়ে আছে লক্ষ্মী হয়ে। ভালো করে পলিথিন প্যাচিয়ে আবার আসে সে ছাদের কিনারায়। তাদের ঘরের সামনে একটা নৌকা ভিড়েছে। নৌকায় মাঝির সাথে একটা লোক। লোকটাকে ভালো করে চিনে মিষ্টি। চৌধুরী, ওদের বাড়ির মালিক। বিড়াল দেখার চেয়ে বেশি চমকে উঠে মিষ্টি। আতঙ্ক গ্রাস করে এগারো বছরের একলা মেয়েটাকে।

গত শীতের কথা। ওদের ক্লাসেই পড়ত সোনিয়া। বরপা’র এক বস্তিতে থাকত ওরা। একদিন রাতে হইচই পড়ে গেল। সন্ধ্যা থেকে পাওয়া যাচ্ছে না মেয়েটাকে। এদিকে সেদিকে কত খোঁজাখুঁজি হলো। মসজিদের মাইকে মাইকে ঘোষণা হলো। ‘একটি নিখোঁজ সংবাদ। সোনিয়া নামের একটি দশ-এগারো বছরের মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মেয়েটি দেখতে ফর্সা, চেহারা গোলগাল। উচ্চতা চার ফুটের কাছাকাছি। মেয়েটির পরনে ছিল লাল ফ্রক আর সবুজ পায়জামা। কোন সহৃদয় ব্যক্তি সোনিয়াকে খুঁজে পেলে কাছাকাছি যেকোনো মসজিদের ইমামের সাথে যোগাযোগ করবেন’।  মাঝরাতে খুঁজে পাওয়া গেলো মেয়েটাকে। সিটি কর্পোরেশনের ময়লার ভাগাড়ের পিছনে পড়ে ছিল নিথর দেহ। গায়ে একটা সুতোও নেই। পেশাবের জায়গাটা রক্তাক্ত আর ফোলা। জনস্রোতের সাথে দৌড়ে মিষ্টিও চলে গিয়েছিল সেখানে। রক্তাক্ত, ফোলা আর ছিঁড়ে যাওয়া পেশাবের রাস্তায় মাছি উড়ছিল ভনভন করে। সাথে সাথে বমি করে দিয়েছিল সে। 

সে রাতে কাঁপিয়ে জ্বর আসে মিষ্টি’র। এরপরে আর কিছু মনে নেই। পরে শুনেছিল রাতে পুলিশ এসেছিল। ওর চাচাতো এক ভাইকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। সোহাগ ভাই। ওকেতো চিনে মিষ্টি। ক্লাস নাইনে থাকতেই স্কুল ছেড়ে দিয়েছিল। গত ঈদে সোনিয়ার সাথে ওকেও আইসক্রিম কিনে দিয়েছিল। সেই সোহাগ ভাই এমন করে সোনিয়াকে ‘মারল’। এমন বিবস্ত্র করে ‘মারা’কে কী বলে জানত না সে। ক্লাসের ইঁচড়ে পাকা কয়েকটা মেয়ে ওকে পরে বুঝিয়ে বলেছে। এটাকে বলে ‘ধর্ষণ’। পুরুষ মানুষ খুব ভয়ঙ্কর ধরণের জন্তু। একলা পেলেই এরা ঝাঁপিয়ে পড়ে মেয়েদের উপর। ছিঁড়েফুঁড়ে রক্তাক্ত করে ফেল দিয়ে যায় আবর্জনার ভাগাড়ে। 

চৌধুরী লোকটাকে মিষ্টি ভয় পায় খুব। যে কয়বার ওদের এখানে এসেছে মিষ্টিকে আদর করেছেন তিনি। প্রতিবার বুকের এখানে আঙুল দিয়ে টিপে দিয়েছেন। ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়েছে মিষ্টি। ওর বাবা আর মা দেখেনি এসব। জানেনা কিছুই। শেষবার সিঁড়িতে মিষ্টিকে ডেকে নিয়ে আঙুল দিয়ে সুড়সুড়ি দিয়েছিল ওর পেশাবের রাস্তার উপরে। কুসুম লোকটার কথা উঠলেই বলে, ‘খানকির পুত একটা লুইচ্চা। নজর খারাপ শুয়ারের বাচ্চার’। ‘লুইচ্চা’ কথাটার মানে ততোদিনে শিখে গিয়েছে মিষ্টি। ওর মা কিভাবে জানে এসব? ভেবে কূল পায়নি মিষ্টি। ওর মা’কেও চৌধুরী ‘আদর’ করেনিতো? সেও তো একটা মেয়ে মানুষ।

আজ বাসায় মা’ও নেই, বাবা’ও নেই। সিংহের সামনে একলা খরগোশের গল্পটা জানে মিষ্টি। সে ভয়ে কাঁপতে থাকে। সোনিয়ার চেহারা বারবার চোখে ভাসে তার। দুই মাস সে ভাত খেতে পারেনি। ভাতের বাসনের সামনে মাছি দেখলেই মনে হতো এই বুঝি সোনিয়ার পেশাবের রাস্তা চেটে এসেছে। বমি আসত মুখ ভরে। সে যেন কানে শুনতে পায় সেই ভনভন শব্দ। নাকে ভেসে আসে ভাগাড়ের গন্ধ। শরীরে স্পর্শ পায় ভয়ঙ্কর কোন বিষাক্ত আরশোলার। 

চৌধুরী মই বেয়ে চলে আসে ছাদে। আয়নালকে সে দেখে এসেছে অটো চালাতে। কুসুম নেই সেটাও জানে ভালো করে।

‘মিষ্টি মামনি, ও মিষ্টি মামনি। কই গেছো আম্মা? তোমার জন্য চকোলেট আনছি। খাইবা না। ক্যাডবারি চকোলেট। চুইষা চুইষা খাইতে হয়। কই পলাইছো আম্মা’?

ওয়োরড্রৌবের পাশের লম্বা খুপরিতে লেপ আর মশারির ভাঁজে লুকিয়ে আছে মিষ্টি। ভয়ে তার বুক কাঁপছে। চৌধুরীর প্রতিটা পায়ের শব্দ, শ্বাসের ফোঁসফোঁস শুনতে পাচ্ছে সে। পাশের মিঠু’র ড্রয়ারটাও সে বন্ধ করে দিয়ে এসেছে। দম হয়তো বন্ধ হবেনা। কিছুটা বাতাসতো আছেই। বিড়াল, ইঁদুর আর আরশোলার মত জন্তুদের উপদ্রবের কথা সে ভুলেই গেছে।

একটা দোপেয়ে, মানুষের মত দেখতে জঘন্য অশ্লীল এক জানোয়ার গর্জন করছে তার কয়েক হাতের মধ্যে। পৃথিবীটা খুব ছোট হয়ে আসছে মিষ্টি’র। প্রতিটা সেকেন্ডের ভগ্নাংশে সে কুঁকড়ে যেতে থাকে।   


মাতুয়াইল, ঢাকা। 

 

প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতায় কর্মমুখী শিক্ষা

 প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতায় কর্মমুখী শিক্ষা


 প্রয়োজনীয়তা ও বাস্তবতায়
 কর্মমুখী শিক্ষা

এ আই জাজাকী

কয়েকদিন আগে একটি সরকারি চাকরির লিখিত পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম। তখন এক ব্যক্তির সাথে আমার পরিচয় হয়। দেশের চাকরির বাজার আর শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অনেক কথা বলছিলাম। কথা বলতে বলতে হঠাৎ তিনি প্রায় কাঁদোকাঁদো অবস্থায় বললেন, ভাই গত পাঁচ বছর আগে মাস্টার্স শেষ করেছি। তখন থেকে আজ পর্যন্ত আমার যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির চেষ্টা করছি কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। আমি যেমন চাকরি চাই বা যে বিষয়ের ওপর আমি অনার্স-মাস্টার্স করেছি সে অনুযায়ী কোনো চাকরিই মিলছে না। সার্কুলারে যে স্বল্পসংখ্যক নিয়োগ হয় তাও পর্দার আড়ালেই থেকে যায়। লিখিত পরীক্ষা দিই তো ভাইভার ডাক আসে না, ভাইভা দিই তো পরে যোগাযোগ করা হবে বলে বিদায় করা হয়। পরে আর কোনো খোঁজ-খবর পাই না। দীর্ঘ সতেরো-আঠারো বছর পড়ালেখা করে কি একটা চাকরির যোগ্যতা অর্জন করতে পারিনি? তাছাড়া আমি তো আর এত খারাপ ছাত্রও না। যদি তাই হতাম তাহলে কি আর এতদূর আসতে পারতাম? এ বছরই আমার চাকরিতে আবেদনের বয়স শেষ হবে। এমনও হতে পারে যে, এটাই আমার শেষ চাকরির পরীক্ষা। কারণ আর যে কয়েকমাস বাকি আছে এর মধ্যে তো নতুন সার্কুলার নাও হতে পারে। কথাটুকু বলেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। আমি মনে মনে বললাম, এক কাঙাল বলে আরেক কাঙালকে। আমার নিজেরও তো এই হাল। তারপরও পাশের লোকটিকে সামান্য সান্ত¦নার উদ্দেশ্যে বললাম, ভাই শুধু শুধু সময়গুলো কেন নষ্ট করছেন? উদ্যোক্তা হোন, নিজে কিছু করুন। বাংলাদেশে তো এখন অনেককিছু করার সুযোগ আছে। শুধু সরকারি চাকরির পেছনে ছুটে জীবন পার করলে চলবে? লোকটি আবারও একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ভাই আমিও তাই ভাবছিলাম। কিন্তু কী করব বলুন? দীর্ঘ দেড়যুগ বাপ-মার কাঁধের ওপর বসে খেয়েছি, পরেছি, লেখাপড়া করেছি। শত কষ্ট হলেও লক্ষ লক্ষ টাকা তারা আমার পেছনে ব্যয় করেছে। তাদের তো এখন আমার ওপর একটা দাবি আছে, আশা আছে। পুরোটা পরিবার আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তারা ভাবছে, ছেলে এতদূর লেখাপড়া করেছে। এবার নিশ্চয়ই ভালো একটা চাকরি পাবে। সংসারের হাল ধরবে। এত লেখাপড়া করে গ্রামে গিয়ে চাষবাস করলে সেটা তাদের পক্ষে মেনে নেয়া সম্ভব না। আর ছোট চাকরিও আমার যোগ্যতার সাথে যায় না। তারপরও করতাম। পেটে ভাত না থাকলে মান-সম্মান দিয়ে কী হবে? কিন্তু পরিবার পরিজনের কথা চিন্তা করেই তা করতে পারি না। কারণ তারা একটা সমাজে থাকে। যারা আমার সাথে একই বছর এসএসসি পাশ করে বেরিয়ে গার্মেন্টসে ঢুকেছে তারাও এখন মাসে পঁচিশ-ত্রিশ হাজার টাকা আয় করে। আর আমি যদি এত লেখাপড়া করে এখন ছোট কিছু করতে যাই তাহলে সমাজে পরিবার পরিজনরা মুখ দেখাতেই লজ্জা পাবে।  কথাটুকু বলতে বলতে দেখলাম উনি প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে টিস্যু বের করে চোখ মুছছে। আমি যেন খেই হারিয়ে ফেললাম। ছোট মানুষের চোখে পানি দেখলে সহ্য করা যায় কিন্তু একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের চোখে পানি দেখলে নিজেকে সামলানোই দায় হয়ে পড়ে। তারপরও নিজেকে সামলে বললাম, ভাই ছাড়–ন তো। সরকারি চাকরি কি সবার কপালে জোটে? যাদের মামা-চাচার জোর আছে তারা পড়ালেখা যেমনই করুন না কেন সময়মতো একটা সরকারি চাকরির ব্যবস্থা তাদের হয়েই যায়। আপনি বরং এক কাজ করুন, বেসরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করুন আর নাহয় নিজে উদ্যোক্তা হোন। তিনি বললেন, বেসরকারি চাকরিইবা এখন কম সোনার হরিণ? ইন্টারভিউ দিতে গেলেই আগে জিজ্ঞেস করে, আপনার অভিজ্ঞতা কেমন? আরে ভাই, একটা মান্ষু পড়ালেখা করবে নাকি চাকরি করে অভিজ্ঞতা অর্জন করবে? তারপরও যদি কোনোরকমে চাকরিটা হয় তখন একটা মাস্টার্স পাশ ব্যক্তিকে বেতন দেয় দশ থেকে বারো হাজার। এ যুগে একজন মানুষের কোনোরকমে চলতেই তো পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকার প্রয়োজন পড়ে। আর উদ্যোক্তা হওয়ার কথা বললেন না? সেটা কীভাবে করব। পড়ালেখা করেছি এক বিষয়ে এখন যদি অন্য একটা বিষয় ভালো করে বুঝতে যাই তাহলেই তো পাঁচ বছর লেগে যাবে। আমি বললাম, তা বলেছেন ঠিক। তাই বলে কি মানুষ বেসরকারি চাকরি করছে না? উদ্যোক্তা হচ্ছে না? অহরহ অনার্স, মাস্টার্স করা মানুষ সেসব দশ, বারো হাজারী চাকরিই করছে কিংবা উদ্যোক্তা হচ্ছে। এছাড়া আর উপায় কী?
এ তো গেল একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা। এবার আসল কথায় আসি। বাংলাদেশে এরকম হাজার হাজার প্রমাণ আছে। লাখো লাখো  বেকার আছে যারা উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও পাচ্ছে না যোগ্যতা অনুযায়ী কোনো চাকরি। আর এর আধিক্য বেড়েই চলেছে দিনের পর দিন। এর প্রধান কারণ হিসেবে আমি যেটাকে দাবি করব সেটা হলো কর্মমুখী শিক্ষার অভাব। এরূপ পরিস্থিতি ও একঘেয়ে শিক্ষার ধারণা আমাদের মধ্যে প্রবল হয়ে গেছে। আমরা মনে করছি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাই আমাদের চলার পথ সুগম করে দেবে। আসলে তা নয়। যদি তাই হত তাহলে দেশে লক্ষ লক্ষ বেকার থাকার প্রশ্নই আসত না। অথচ বাস্তবে আমরা তাই দেখছি। আজ কর্মক্ষেত্র নেই অথচ বড় বড় সার্টিফিকেটধারীর কোনো অভাব নেই। অথচ একটা সময় ছিল যখন মানুষকে ডেকে ডেকে চাকরি দেয়া হত। জনসংখ্যার আধিক্য, প্রচলিত একঘেয়ে শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মক্ষেত্রের অপ্রতুলতার জন্য এখন লক্ষ তরুণ ফাইল হাতে ঘুরে বেড়ায় এখানে-ওখানে। আমি একটা কথা সবসময় বলি যে, জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। আর সে সুযোগটা আমাদের তৈরি করতে হবে। মানুষ তো ফেলনা জিনিস নয় বা দেশের জন্য বোঝাও নয়। হ্যাঁ, আমাদের দেশ একটি ছোট্ট ও উন্নয়নশীল দেশ। আর এ সুযোগটাকেই আমাদের কাজে লাগাতে হবে। জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরের দায়িত্বটা প্রথমত সরকারকে গ্রহণ করতে হবে। আর সেটার একমাত্র ও প্রধান উপায় হলো কর্মমুখী তথা বহুমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটানো। এখানে প্রচলন শব্দটি ব্যবহার করা যেত কিন্তু তা না করে প্রসার শব্দটির ব্যবহার করার কারণ হলো, ইতোমধ্যে আমাদের দেশে বহুমুখী শিক্ষার প্রচলন করা হয়েছে। কিন্তু তা খুবই স্বল্প পরিসরে। যা পুরোপুরি প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। আমাদের ধারাণাকে পাল্টে বাস্তবধর্মী তথা কর্মমুখী শিক্ষার প্রসারই একমাত্র দেশের বেকার সমস্যার সমাধান করতে পারে। ঘুরিয়ে দিতে পারে অর্থনীতির চাকা। এখনও বেকারজনিত সমস্যা লক্ষের ঘরেই রয়েছে। তবে তা যে হারে বাড়ছে তাতে কোটির ঘরে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগবে বলে আমার মনে হয় না। তবে এখনই যদি সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় তাহলে লক্ষ তরুণের মেধাকে কাজে লাগানো সম্ভব এবং কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে ভবিষ্যতের এরূপ সমস্যারও সমাধান করা সম্ভব। দেশে বর্তমানে প্রতিবছর ১০টি বোর্ডে ২০ থেকে ২২ লক্ষ এসএসসি পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে। সেখানে শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ শিক্ষার্থীই সন্তোষজনক ফলাফল করে পাশ করছে। আবার প্রতিবছর ১১ থেকে প্রায় ১৩ লক্ষ পর্যন্ত পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিচ্ছে। সেখানেও পাশের হার সন্তোষজনক। কিন্তু একটি বিষয় খেয়াল করবেন যে, প্রতিবছর এসএসসি থেকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কিন্তু প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। তারপর এইচএসির পর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে পারছে তারও অর্ধেক। কিন্তু তারা যাচ্ছে কোথায়? অবশ্যই অনেকে চাকরির পেছনে ছুটছে। অনেকে ছোটখাট ব্যবসার চিন্তা করছে। আবার অনেকে বাবা-মায়ের কাঁধের ওপর বসে খাচ্ছে। চেয়ে আছে ভাগ্যের দিকে। আর যারা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে তারাই কি পড়ালেখা শেষ করে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারছে? অনেকে নির্দিষ্ট বয়সসীমা পর্যন্ত চাকরির পেছনে ছুটতে ছুটতে যখন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত তখন নিজের যোগ্যতার চেয়ে কয়েকগুণ ছোট বেসরকারি চাকরিতে ঢুকতে বাধ্য হয়। আর যারা সে সুযোগটুকুও পান না তারা যোগ হয়ে যান বেকারদের তালিকায়। এর মধ্য খেকে কিছু লোক বের হয় যারা নিজে উদ্যোক্তা হতে পারে। তবে বেশিসংখ্যকদেরই সে সুযোগ বা সামর্থ্য থাকে না। গত কয়েকদিন পূর্বে একটি ভিডিও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরাঘুরি করছিল যেখানে আমিনুল ইসলাম নামে একজন বিসিএস পাশ নন ক্যাডার ব্যক্তি একটি ফেস্টুন বুকে ঝুলিয়ে ঘুরছিলেন একটি উত্তরের জন্য যে, বিসিএস পাশ করেও কেন তিনি বেকার? তার এ প্রশ্ন ছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি। তো এখন কী বলবেন? যেখানে বিসিএস পাশ করেও চাকরি নিশ্চিত হয় না সেখানে আপনি এ সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে কী করবেন? এর কোনো সদুত্তর আছে কি! অথচ লক্ষ লক্ষ তরুণ প্রতিবছর চাকরির আশায় বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে এবং এর মধ্যে বেশিরভাগেরই ধারণা যে বিসিএস পরীক্ষায় পাশ করলেই চাকরি মিলবে। কিন্তু বাস্তব তো তা দেখাচ্ছে না। তবে হ্যাঁ, প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিবছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জনগণের প্রয়োজন হয় যারা সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত। আর বাকি শিক্ষিতদের আর গতি হয় না। তাই এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হলো কর্মমুখী শিক্ষা। যে পদ্ধতিতে শিক্ষাগ্রহণ করলে দেশে একটি মানুষও বেকার থাকবে না। আমার মনে হয় না প্রতিবছর ১০ বা ২০ লক্ষ পরীক্ষার্থীর এসএসসি বা এইচএসসি  পরীক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন আছে। বরং উন্নত বিশ্বের মতো প্রতিটি শিক্ষার্থীকে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানোর পর তাদের অ্যাপটিচ্যুড টেস্ট করে তাদের পছন্দের বিষয়গুলোর উপরে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হোক। যাতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে তারা দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মী হিসেবে বের হয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে। কিছুদিন আগে শুনেছিলাম যে, অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নাকি প্রাথমিক শিক্ষা করা হবে। হ্যাঁ, যদি তা হয় তাহলে খারাপ হয় না বরং এতে কর্মমুখী শিক্ষার পথ আরও সুগম হয়। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়নের পর প্রতিটি শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। যারা অবহেলিত ও দরিদ্র শিশু রয়েছে তাদেরও সরকারি উদ্যোগে প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা হোক। আর এর ভেতরেই সে বাংলা, ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান সম্পর্কে ভালো ধারণা লাভ করবে। প্রাথমিক শিক্ষা স্তর শেষ হওয়ার মধ্য দিয়েই প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজের পছন্দ, ইচ্ছা, অনিচ্ছা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করবে এবং সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। তখন তাদের আগ্রহের ভিত্তিতে বিভিন্ন কারিগরি, কর্মমুখী ও সাধারণ শিক্ষা প্রদান করা যাবে। সেই সময় থেকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাদের শুধুমাত্র সেই একটি বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ (হাতে-কলমে শিক্ষা) দিয়ে তাদের দক্ষ করে তোলা যাবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তারা দক্ষ হয়ে ওঠার পর বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের মেধার মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তারপর তাদের অনায়াসেই রাষ্ট্র কাজে লাগাতে পারে আর তারাও পেতে পারে সুনিশ্চিত ভবিষ্যত।
এখন প্রশ্ন হতে পারে তাহলে রাষ্ট্র এত কর্মক্ষেত্র পাবে কোথায়? এর উত্তরে বলব, যেহেতু প্রতিটি শিক্ষার্থী বিশেষ বিশেষ কাজে দক্ষ হয়ে ওঠবে তখন তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে অবশ্যই তারা অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হবে। আর তাদের সে কর্মসংস্থানের জন্য সরকারকে পূর্ব থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে। অর্থাৎ দেশে কর্মক্ষেত্র তৈরির জন্য সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। বেসরকারি শিল্প-কারখানা স্থাপন পদ্ধতি সহজ করতে হবে। প্রয়োজনে লোন পাওয়ার উপায়ও সহজ করতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানায় বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন  করতে হবে। প্রয়োজনে সেসব পরিচালনার জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় বা দপ্তর স্থাপন করা যেতে পারে। যা একটি নিখুঁত পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষে করা তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়। কারণ যে দেশের জনশক্তি রয়েছে সে দেশে বেকার শব্দটি থাকা সমীচীন নয়। কেননা, তা শুধু আমাদের অর্থনীতিকেই পঙ্গু করে না বরং বিশ্বের দরবারে দেশটির মান ক্ষুণœ করে। বয়ে নিয়ে আসে লজ্জার মহাপ্লাবন।

প্রচ্ছদগল্প : সফর আলীর ঢাকা সফর : এ আই জাজাকী

প্রচ্ছদগল্প : সফর আলীর ঢাকা সফর : এ আই জাজাকী


সফর আলীর ঢাকা সফর
এ আই জাজাকী

প্রায় সারারাত জার্নি শেষে সফর আলী গাবতলী বাস টার্মিনালে নামে সকাল আটটায়। উদ্দেশ্য ঢাকা শহর ঘুরে দেখা। বেশ কিছুদিন হলো সে একটা চাকরি করছে। ছোট থেকে ঢাকার অনেক গাল-গপ্পো সে শুনেছে। সবার কত আকর্ষণ ঢাকার প্রতি। সে দেখেছে দলে দলে কত লোক ঢাকায় এসেছে কাজের সন্ধানে। কাজ করছেও বছরের পর বছর ধরে। আর তারাই গ্রামে গিয়ে ঢাকা সম্বন্ধে কত অদ্ভুত অদ্ভুত গল্প করে। বলে, কতই না সুন্দর সে শহর। বিশাল দালান-কোঠা, প্রশস্ত আর সুন্দর রাস্তাঘাট। আমেরিকার মতো ফর্সা ফর্সা আর ধনী মানুষজন। ছোট থেকে সেসব গল্প শুনতে শুনতে তারও ইচ্ছে জাগে ঢাকা শহর ঘুরে দেখার। দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত থাকার কারণে ছাত্রজীবনে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ঢাকায় আসা সম্ভব হয়নি তার। এখন যেহেতু একটা চাকরি করছে তাই টাকা-পয়সা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সে কারণেই মনের সাধ মেটানোর উদ্দেশ্যে এ সফর।
ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। সারারাত তেমন কিছুই খাওয়া হয়নি। আশেপাশে কোনো দোকানপাটও দেখা যাচ্ছে না। হেঁটে আন্ডারপাস পর্যন্ত যাওয়ার পর দেখা গেল রাস্তার বিপরীতে কিছু অস্থায়ী দোকানপাট দেখা যাচ্ছে। আন্ডারপাস দিয়ে পার হয়ে অপরপাশে চলে গেল সে। আপাতত কিছু চা-বিস্কুট খেলেই চলবে। ঘণ্টা দুয়েক পর নাহয় হোটেলে ঢোকে নাস্তা করে নেয়া যাবে। যতটুকু না ক্ষুধা লেগেছে তারচেয়ে বেশি লেগেছে তৃষ্ণা। দোকানে ঢুকেই ট্যাপ (ফিল্টার) থেকে দুই গ্লাস পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিল সে। তারপর এক স্লাইস কেক আর একটা রং চা নিল। কেক আর চা শেষ করে পানি খেল আরও এক গ্লাস। দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, ভাই কত হলো? দোকানদার বলল, চব্বিশ টাকা। কথা শুনে যেন সফর আলী সামান্য ভরকে গেল। তার হিসেবে একটা কেক আর একটা চা সর্বোচ্চ বারো টাকা হতে পারে। দোকানদার বলল, কী মামা হিসেব মিলতেছে না? দাঁড়ান আমি মিলিয়ে দিচ্ছি। এক কাপ চা ছয় টাকা, একটা কেক বারো টাকা আর তিন গেলাস পানি ছয় টাকা। সফর আলী মনে মনে বলে, লোকটা বলে কী! আমাদের এলাকায় তো পাঁচ টাকায় এরচেয়ে বড় কেক পাওয়া যায় আর পানি দশ গ্লাস খেলেও কোনো দাম দিতে হয় না। তারপর ভাবল, যাগগে, এ সামান্য ক’টা টাকা নিয়ে এত ভেবে কাজ নেই। চব্বিশ টাকা দিয়ে সামনের দিকে পা বাড়াল সে। উদ্দেশ্য মতিঝিল বা গুলিস্তানের বাস ধরে পল্টন যাওয়া। সেখানে আর এক বন্ধু থাকে। তার সাথে দেখা করে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমে যুহরের নামায আদায় করে একসাথে দুপুরের খাবার খাবে। সারা বিকাল এদিক-ওদিক ঘুরে তারপর রাতে বাড়ির উদ্দেশ্যে আবার বাস ধরবে। প্ল্যান মোতাবেক গন্তব্য এখন পল্টন। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ তার সামনে একটা বাস এসে দাঁড়াল। বড় করে লেখা ৮ নম্বর। বাস থামতেই হেলপার ডাকতে লাগল, এই শ্যামলী, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, পল্টন, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী। সফর আলী কাল বিলম্ব না করে ওঠে গেল। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পুরো বাস ভরে গেল। শুধু সিট না, সিটের চেয়ে বেশি লোক দাঁড়ানো যাত্রী। একেবারে উঠার সিঁড়িতে পর্যন্ত যাত্রী দাঁড়ানো। এতেও যদি হেলপার সন্তুষ্ট হত তাতেও একটা কথা ছিল। তারপরও সে ক্রমাগত ডেকেই চলেছে, এই ফার্মগেট, শাহবাগ, পল্টন....। আর সুপার ভাইজার শুধু বলছে, এই মামারা পিছে চাপেন। পেছনে তাকিয়ে দেখলাম আর এক ইঞ্চি চাপার মতো জায়গা নেই। অথচ সে ক্রমাগত বলেই যাচ্ছে পিছে চাপেন। এখন একটা উপায় আছে, যাত্রীরা যদি পেছন দিয়ে ভেঙে বেরিয়ে পড়ে।

সফর আলী চিৎকার করে ওঠল, আরে ভাই কী শুরু করলেন? সফর আলীর কথা শুনে আশেপাশের কয়েকজন তার দিকে তাকাল। সে বুঝতে পারছে না, মানুষগুলো কেন এভাবে তাকাচ্ছে। সে ভাবল, হয়ত এ দৃশ্য দেখতে দেখতে তাদের গা সওয়া হয়ে গেছে। তাই কাউকে এর প্রতিবাদ করতে দেখছে বলে হয়ত এভাবে তাকাচ্ছে। কয়েকটা ছোটখাট জ্যাম পেরিয়ে আসাদগেট থেকে বামে টার্ন নিয়ে বাসটা একটু এগিয়ে যেতেই জানালা দিয়ে দেখা গেল জাতীয় সংসদ ভবন। সে চমকে ওঠল। আরে এটা সংসদ না? আহা রে! টিভিতে কত দেখেছি। দেখি, একটু নেমে ভালো করে দেখি। তারপর খেজুর বাগানের ওখানে বাস থামতেই সে সিট থেকে বেরিয়ে আসে। বাসে এত লোকজন যে ঠিকমতো বের হওয়াও যাচ্ছিল না। সে সিট থেকে উঠতেই দুইজন লোক সিট নিয়ে হৈচৈ জুড়ে দিল। একজন বলছে, আমি বসব। আরেক জন বলছে আমি বসব। দুইজন বেশকিছু কথা কাটাকাটির পর একজন জোর খাটিয়েই যেন বসে পড়ল। কি বিচ্ছিরি একটা অবস্থা! ছোট্ট একটা বাস অথচ সব সিট ভর্তির পরও দুই সারিতে লোক দাঁড়ানো। মাঝখানে এক ইঞ্চি পরিমাণ ফাঁকা নেই। সে কীভাবে নামবে বুঝতে পারছে না। তারপরও বলল, দেখি ভাই, একটু সাইড দিন। নামব। কেউ যেন তেমন কর্ণপাত করছে না। অথচ নামার রাস্তায় তারা দাঁড়িয়ে আছে। সিগনাল ছেড়ে দেওয়ায়, বাস আস্তে আস্তে এগুতে লাগল। এখন তো আর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। সে বাধ্য হয়ে হাত দিয়ে লোকজনকে সামান্য সরিয়ে দিয়ে নামতে লাগল। এদিকে এইটুকু সহ্য করতে না পেরে কয়েকজন চিৎকার করে ওঠল, এই মিয়া ধাক্কান কেন? সিঁড়ির কাছাকাছি যেতেই এমন চাপের মধ্যে একজনের পায়ে সামান্য পারা লাগাতে তিনি চিৎকার করে ওঠলেন, ওই মিয়া দেখে পা ফেলতে পারেন না? সফর আলী মনে মনে বলল, একটা মানুষ নামবে অথচ তাকে তো সাইড দিচ্ছেই না তার ওপর আবার উল্টো তাকেই কথা শোনাচ্ছে। একটা মানুষ নামবে না নাকি? গেটের কাছে যেতেই দেখল গেট বোঝাই লোকজন। মনে হচ্ছে ভেতরে যত লোক ছিল তার দ্বিগুণ এখানে। এবার সে ভাবছে, এতগুলো লোক সরিয়ে সে কীভাবে বের হবে। এদিকে তার কারণে আরও কয়েকজন বেঁকে, নুয়ে আছে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকাও সম্ভব নয়। এর মধ্যেই একজন বলে ওঠল, আরে ভাই নামেন। আপনার জন্য তো সোজাও হতে পারছি না। তারপর সফর আলী বাধ্য হয়েই বলল, ভাই সিঁড়ি থেকে একটু নেমে সাইড দিন। একজন হেল্পার বলল, আরে মামা এখন নামবেন কেমনে? বাস তো ছেড়ে দিচ্ছে। এতক্ষণ কোথায় ছিলেন? পরে নামেন। সফর আলী কিছু বলল না। শুধু মনে মনে বলল, এতক্ষণ তো ঘুমাচ্ছিলাম। সিগনাল পার হয়ে বাস থামলে কয়েকজন নেমে সফর আলীকে নামতে দেয়। সফর আলী বিশ টাকা ভাড়া দিয়ে ফুটপাতে উঠে। এতক্ষণে সে ঘেমে নেয়ে একাকার। একটু জিরিয়ে রাস্তা পার হয়ে সংসদের দিকে চলে যায়। সে ভাবে ভুল করে হয়ত লোকাল বাসে ওঠে পড়ার কারণে এ অবস্থা। পরের বার ভালো বাস দেখে উঠতে হবে। প্রশস্ত আর পরিচ্ছন্ন ফুটপাত দেখে তার ভালোই লাগে। ঝিরঝিরিয়ে বাতাসও বইছে। প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে সে সংসদের চারপাশ, ক্রিসেন্ট লেক আর চন্দ্রিমা উদ্যানটা ঘুরে দেখল। এবার পেটেও যেন টান পড়েছে। চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে বের হয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করল আশাপাশে কোনো হোটেল/রেস্টুরেন্ট আছে কিনা। সে লোক বলল, না মামা, এটা ভিআইপি এরিয়া। এখানে কোনো হোটেল রেস্টুরেন্ট নেই। তবে চন্দ্রিমা উদ্যান বাস স্ট্যান্ডের অপজিটে গিয়ে খেজুর বাগানের দিকে যেতে থাকলে  চাইনিজ রেস্টুরেন্ট পেতে পারেন। বিনে পয়সায় লোকটা পরামর্শ খারাপ দেয়নি। লোকটার কথামতো সে সেভাবেই এগিয়ে গেল। চাইনিজ রেস্টুরেন্ট পেয়েও গেল কিন্তু সেগুলোতে সে ঢুকবে না। কেননা, সে শুনেছে চাইনিজ রেস্টুরেন্টে গলা কাটে। চমকে ওঠবেন না, ঠিক গলা কাটে না। তবে তারচেয়ে একেবারে কম কিছুও না। সেখানে এক বেলা খেতেই নাকি ছয়শো থেকে এক হাজার টাকা লেগে যায়। তার এখন জাস্ট দুটো রুটি বা পরাটা আর একটা ডিম পোজ হলেই চলবে। সর্বোচ্চ ত্রিশ টাকার খাবার। হেঁটে খেজুর বাগানের কাছে যেতেই দু-একটা দেশি খাবার হোটেল পাওয়া গেল। সেখান থেকে নাস্তা শেষ করে বের হয়ে খেজুর বাগান স্ট্যান্ডে গেল। অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরও কোনোক্রমেই বাসে ওঠা সম্ভব হলো না। প্রতিটা বাসের অবস্থা বেগতিক। একেবারে বানরের মতো ঝুলছে মানুষ। কয়েকটা বাসে চেষ্টার পরও যখন উঠতে পারছিল না তখন এক লোক স্বেচ্ছায় এসেই তাকে জিজ্ঞেস করল, মামা কোথায় যাবেন? সে বলল, পল্টন যাব। লোকটি বলল, আপনি এক কাজ করুন, হেঁটে সামনে চলে যান। ফার্মগেটে অনেক লোক নামে। সেখান থেকে উঠতে পারবেন। সফর আলী তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে খামারবাড়ি রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে ফার্মগেট চলে গেল। একজনের কাছ থেকে জেনে নিল বাসে উঠতে হলে ফুটওভার ব্রিজ দিয়ে ওপর যেতে হবে। ফুটওভার ব্রিজের কাছে গিয়ে সিঁড়িতে উঠার রাস্তাই খুঁজে পাচ্ছে না। এত দোকানপাট আর হকারের উপদ্রব যে হাঁটার রাস্তাটা পর্যন্ত নেই। ফুটপাত তৈরি হয় মানুষের জন্য আর এখানে দেখে মনে হচ্ছে বাজার তৈরির জন্য। অনেক্ষণে সিঁড়ি পেয়ে ফুট ওভার ব্রিজে উঠতেই সে আরও অবাক হলো। মনে হলো ফুট ওভার ব্রিজে না, সে ভুল করে কোনো মার্কেটে ঢুকে পড়েছে। পুরো ফুট ওভার ব্রিজ জুড়েই শুধু দোকান আর দোকান। এদিকে মানুষের এত চাপ যে, হাঁটাই দায় হয়ে পড়েছে। অথচ তারা পুরো ফুট ওভার ব্রিজই দখল করে বসে আছে। নিচে নেমে আর দাঁড়াতে হলো না। অমুক সিটিং সার্ভিস নামে একটি বাস দাঁড়ানো। যাবে পল্টন হয়ে গুলিস্তান। দেরি না করে উঠে গেল সে। সিট পেল পেছনের দিকে। সিটে বসে ভাবল, নাহ, বোধ হয় এবার তাহলে ভালো বাসেই উঠলাম। যেহেতু সিটিং সার্ভিস লেখা তাহলে খারাপ হবার কথা নয়। ভেতরটা দেখতেও বেশ চাকচিক্যপূর্ণ। মুহূর্তেই সব সিট পূর্ণ হয়ে গেল। কিন্তু এ কী! এরপরও বাসটা ছাড়ছে না কী জন্য? আরেকটা বিষয় সে খেয়াল করেছে। শহরে সবাই শুধু মামা মামা করে সম্বোধন করে। সে সকাল থেকে বেশ কয়েকবার এটি খেয়াল করেছে। সবাই কি সবার বাপের শালা নাকি? এভাবে মামা মামা বলে ডাকার কারণ কী? ভাই বলা কি এরচেয়ে ভালো নয়? যাগগে, কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে এসব ভাবতে ভাবতে দেখে বাসে অলরেডি দাঁড়ানো যাত্রী পাঁচ-ছয়জনের মতো হয়ে গেছে। তারপরও হেলপার ডাকছে, এই শাহবাগ, পল্টন, গুলিস্তান। সফর আলী যেন থ হয়ে গেছে। এ কী অবস্থা! বাসের গায়ে লেখা সিটিং সার্ভিস, অথচ...। তারপরও সে এবার কিছু বলল না। অন্য দু-একজন যাত্রী যখন রাগ দেখিয়ে বলল, এই মামা কী শুরু করেছ তোমরা? বাসটা ফিলাপ হয়ে লোকজন দাঁড়িয়ে আছে তারপরও বসে আছ কেন? যাও না। এবার যেন চালকের একটু টনক নড়ল। আস্তে আস্তে বাস চলতে লাগল। আরও দু-একজন যাত্রী ওঠার পর একজন লোক বাসে ওঠল। হেলপার মাথার ওপর থেকে একটা হার্ড বোর্ড বের করে দিল। লোকটা যাত্রীদের দিকে চোখ ঘুরিয়ে কী যেন লিখে দিয়ে নেমে গেল। তারপর বাসটার গতি বাড়ল। শুধু গতি বললে ভুল হবে, অনেক গতি। হঠাতই যেন চোখে আঁধার দেখতে লাগল সে। মুহূর্তের মধ্যে ধূলোয় ধূসর হয়ে গেল চারপাশ। লোকজনের হাঁচি আর কাশিতে অবস্থা বেগতিক। কেউ কেউ ড্রাইভারকে বলল, মামা আস্তে চালাও। সফর আলী খেয়াল করল আস্তে চালালেও তেমন কোনো লাভ নেই। আশেপাশের অন্য গাড়িগুলো সমানে ধূলো উড়িয়ে চলেছে। বরং যত দ্রুত যাওয়া যায় ততই ভালো। কয়েকজন মন্তব্য করল, সারাটা বছর রাস্তাগুলোতে খোঁড়াখুড়ি লেগেই থাকে। এ কারণেই এ অবস্থা। কারওয়ান বাজারের কাছাকাছি যেতেই এক মধ্যবয়স্ক লোক পাঁচ টাকা ভাড়া দিয়ে নামতে চাচ্ছে। এদিকে সুপার ভাইজার পাঁচ টাকা ভাড়া নেবে না। সুপার ভাইজার বলে, পাঁচ টাকা ভাড়া নাই। চেক হয়ে গেছে, দশ টাকা দিন। ফার্মগেট থেকে কারওয়ান বাজার এক কিলোমিটার রাস্তাও হবে না। অথচ পাঁচ টাকা ভাড়া দিচ্ছে বলে এ নিয়ে হৈচৈ জুড়ে দিয়েছে। সফর আলী বুঝতেছে না চেকার আসলে কী গুণেছে। শুধু সিটের যাত্রী নাকি দাঁড়ানো নাকি যাত্রীসহ। তার কাছে তো মনে হলো সে কিছু গুণেইনি। শুধু চোখ ঘুরিয়ে কী যেন লিখে নেমে গেছে। আর মালিকপক্ষ তো বোধ করি সিটের বাইরের হিসাব কখনোই চাইবে না।

যেহেতু এতে সিটিং সার্ভিস লেখা। আর কত যাত্রী তো দাঁড়িয়েই আছে। অথচ পাঁচ টাকা কম দিচ্ছে বলে যা শুরু করল। অবশেষে লোকটা দশ টাকা ভাড়া দিয়েই নামতে বাধ্য হলো। কারওয়ান বাজারের কাছাকাছি পৌঁছতেই হুড়মুড় করে বেশকিছু যাত্রী ওঠে গেল। এবার একেবারে ৮ নম্বর বাসে যেমন অবস্থা হয়েছিল ঠিক তেমনই মনে হচ্ছে। একজন পুলিশকেও উঠতে দেখা গেল। বাংলামটর সিগন্যালে সামান্য জ্যামে বসে থাকার পর বাস শাহবাগ বাস থামল। বেশকিছু যাত্রী নামল এবং উঠল। সফর আলীর পাশের সিট খালি হওয়ায় একটা ছাত্র এসে বসল সেখানে। যাত্রী ঠেসে ভরার পর আবার ওঠল এক চেকার। চেকার ওঠতেই পুলিশটি তাকে বলল, এই মামা পুলিশ পাস আছে। সফর আলীর সাথে বসা ছাত্রটিও বলল, মামা ছাত্র আছে। চেকার বলল, ছাত্র কাটা নিষেধ। ছাত্রটা সামান্য তর্ক করলেও হাফ ভাড়া নেয়নি তার কাছ থেকে। অথচ পুলিশের কাছ থেকে নেয়নি এক টাকাও। অর্থাৎ পুলিশের ভাড়া ফ্রি। ছাত্রছাত্রীরা পড়ালেখা করে। তাদের আয় রোজগার নেই। নিলে তাদের ফ্রি নিতে পারে। অথচ তাদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া পর্যন্ত নিচ্ছে না, নিচ্ছে ফুল। আর পুলিশ চাকরি করে, মাস শেষে মোটামুটি ভালো বেতনও পায়। উপরি ইনকামের কথা নাইবা বললাম। অথচ তাদের নেওয়া হচ্ছে ফ্রি।
এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ সফর আলী খেয়াল করল, বিশাল এক জ্যামে পড়ে গেছে তাদের বাস। সে মাথা উঁচিয়ে দেখল যতদূর চোখ যায় ততদূর শুধু জ্যাম। এটা গাড়িও নড়ছে না। আস্তে আস্তে, এক হাত, দুই হাত করে এগুতে এগুতে প্রায় এক ঘণ্টায় মৎস্য ভবন পার হয়ে বাসটা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত যেতে পেরেছে। কেউ কেউ অবশ্য বাস থেকে নেমে হাঁটতে শুরু করেছে। সেখানে আরও আধা ঘণ্টা বসে থাকার পরও যখন জ্যাম ছাড়ছিল না তখন সফর আলী পাশের একজনকে জিজ্ঞেস করল, ভাই পল্টন আর কতদূর? লোকটা বলল, এই তো সামনের মোড় থেকে বামে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই পল্টন। সফর আলী যেন বোকা বনে গেল। মাত্র এইটুকু রাস্তার জন্য সে এত সময় ধরে বাসে বসে আছে? নেমে একটু এগিয়ে একজনকে জিজ্ঞেস করল, ভাই এত জ্যাম কিসের জন্য বলতে পারেন? লোকটা বলল, কোন ভিআইপি নাকি যাবে সেজন্য। সফর আলী বলল, ও মাই গড! এক ভিআইপির জন্য হাজার হাজার মানুষের এত ভোগান্তি? পল্টন মোড়ে গিয়ে তার বন্ধুকে ফোন দিয়ে তার ঢাকায় আসার খবর জানাল। তার বন্ধু রিসিভ করেই বলল, আহা রে বন্ধু! তুই ঢাকায় আসবি তা আমাকে আগে জানাবি না? আমি অফিস থেকে ছুটি নিয়ে রাখতাম। আজ অফিসে খুবই কাজের চাপ। সফর আলী বলল, থাক তাহলে। আমি একাই ঘুরে ফিরে চলে যাই। বন্ধু বলল, না, কী বলিস? দেখি দুই-এক ঘণ্টার জন্য ছুটি পাওয়া যায় কিনা। তুই রাস্তার দক্ষিণ পাশের ফুটপাত ধরে দৈনিক বাংলা মোড়ের দিকে আসতে থাক। আমি তোকে একটু পর কল দিচ্ছি।
সফর আলী ফোন রেখে রাস্তা পার হতে যাবে তখন পুলিশ বলল, এখন পার হতে পারবেন না। ভিআইপি যাবে, তারপর যেতে পারবেন। এদিকে আজানও পড়ে গেছে। যুহরের নামাযটা জাতীয় মসজিদে পড়ার ইচ্ছে ছিল। তাই শেষবারের মতো পুলিশকে রিকোয়েস্ট করল, ভাই আমার একটু জরুরি প্রয়োজন, যেতে দিন প্লিজ। আমার সাথে তো আর গাড়ি নেই, হেঁটে যাব। পুলিশ একটু রেগেই যেন বলল, চোখের পলকে পার হোন, দৌড় দিন। সফর আলী তাই করল। রাস্তার দক্ষিণ পাশের ফুটপাতে উঠতেই সে দেখল একটু সামনেই একটা অ্যাম্বুলেন্স সজোরে ইমার্জেন্সি সাইরেন বাজাচ্ছে। মনে হচ্ছে ভেতরে কেনো মুমূর্ষু রোগী আছে। সে একটু কৌতূহল নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটার কাছে গেল। গিয়ে যা দেখল তা সে জীবনে কোনোদিন ভুলতে পারবে না। সে দেখল, অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে একটা আট থেকে দশ বছরের ফুটফুটে ছেলে বুকের ব্যথায় ছটফট করছে আর পানি পানি করছে। ছেলের এ অবস্থা দেখে আগেই তার বাবা ডাক্তারের কাছে ফোন দিয়েছিল। ডাক্তার জানিয়েছে, এই মুহূর্তে ভুলেও পানি দেওয়া যাবে না আর যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নিয়ে যেতে। এদিকে ছেলের করুণ কণ্ঠভরা পানির জন্য হাহাকার যেন তার মা সহ্যই করতে পারছে না। দুই-তিনটা বাসের পেছনেই এই অ্যাম্বুলেন্সটা। সফর আলী যতক্ষণ আগে ভিআইপি আসার খবর শুনেছে এর মধ্যে পুলিশ চাইলে অ্যাম্বুলেন্সটা ছেড়ে দিতে পারত। সামনের রাস্তা ফাঁকা কিন্তু পুলিশ তা করেনি। অথচ অ্যাম্বুলেন্সের বেদনাসিক্ত সাইরেন অবশ্যই পুলিশের কানে পৌঁছেছে। তারপরও ছেলে যখন একেবারেই যায় যায় অবস্থা তখন ছেলের বাবা দৌড়ে পুলিশের কাছে গিয়ে অনুরোধ জানাল যে, অ্যাম্বুলেন্সটা যেন ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশ বলল, এখন পারা যাবে না। ভিআইপি জিরো পয়েন্টের কাছে চলে এসেছে। ছেলের বাবা আবার দৌড়ে অ্যাম্বুলেন্সের কাছে যেতেই দেখল ছেলের দেহ নিথর হয়ে আসছে। হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি বন্ধ করে একদম ক্ষীণ স্বরে বলছে পানি, পানি। ছেলের মা ছেলের এ অবস্থা সইতে না পেরে নিজেই বোতলের ক্যাপ খুলে ছেলের মুখে একটু পানি ঢালল কিন্তু পানিটা গিলার শক্তি যেন ছেলেটার আর ছিল না। পুরো পানিটাই গড়িয়ে পড়ে গেল গাল বেয়ে। সকলের চোখের সামনে শেষ হয়ে গেল একটা তাজা প্রাণ। মুহূর্তেই তীব্র আর্তনাদে ফেটে পড়ল পল্টন মোড়। একটা অজানা-অচেনা শিশুর জন্য সফর আলীর চোখ থেকেও গড়িয়ে পড়ল কয়েকফোঁটা অশ্রু। ভিআইপি পার হয়ে গেলে সিগন্যাল ছেড়ে দেয়া হলো। অ্যাম্বুলেন্সের পেছনের গাড়িগুলো ক্রমাগত হর্ন দিতে থাকল। তারা হয়ত জানেই না অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরের খবর। সফর আলী আবার ফুটপাতে উঠে দাঁড়াল। সে দেখল, অ্যাম্বুলেন্সটা আর হাসপাতালের দিকে না গিয়ে ইউ টার্ন নিয়ে আবার উল্টো দিকে যেতে শুরু করেছে।
এদিকে সফর আলীর ফোন ক্রমাগত বেজেই চলেছে। কতক্ষণ সময় পার হয়ে গেছে তার খোঁজ নেই। ফোন রিসিভ করতেই তার বন্ধু বলল, কী রে কোথায় তুই? সে বলল, বায়তুল মুকাররমের সামনে। তার বন্ধু বলল, সেই কতক্ষণ ধরে ফোন দিচ্ছি। তুই ধরছিস না বলে আরও ভাবলাম কোনো বিপদ আপদে পড়লি নাকি? সফর আলী বলল, না তেমন কিছু না। তুই আয়। তারপর তার বন্ধু এলে পুরো ঘটনা খুলে বললে সে বলে, ও এই কথা? এরকম কত শত ঘটনা এই আজব শহরে ঘটে। বাদ দে, ঝেড়ে ফেল মাথা থেকে এসব। তারপরও যেন সফর আলীর মনটা কেমন বিষণœ। সে ভাবছে, এ কেমন শহর? মায়া নেই, দয়া নেই সহানুভূতি নেই। তারপর মসজিদে ঢুকে দুইজন অযু করে যুহরের নামাযটা আদায় করে নিল। যদিও দেরি হয়ে যাওয়ায় জামাত ছাড়াই পড়তে হয়েছে। নামাজ শেষ করে দুইজনে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে খাওয়া-দাওয়া শেষ করে। সফর আলীর বন্ধু বলে, আজ সময় দিতে পারছি না বলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। অফিস থেকে এক ঘণ্টার জন্য ছুটি নিয়ে বের হয়েছিলাম। তা তুই এখন কোথায় যাবি? সফর আলী বলল, ইচ্ছে আছে কার্জন হল, দোয়েল চত্বর, শহিদ মিনার আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়টা ঘুরে দেখার। তার বন্ধু বলল, আচ্ছা আমি রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছি, তুই যা। তারপর সন্ধ্যায় আমার বাসায় চলে আসিস। আজ থেকে কাল চলে যাস। সফর আলী বলল, না রে দোস্ত, আজ রাতেই ফিরব। আজ একটা বিশেষ ছুটি ছিল, কাল আবার অফিস ধরতে হবে।
তার বন্ধু রাস্তা দেখিয়ে দিয়ে বিদায় নিল। সে হাঁটতে হাঁটতে গোলাপ শাহের মাজারের কাছাকাছি চলে গেল। ফুটপাতে একটা কাপড়ের দোকানের কাস্টমার আর দোকানদারের বাকবিত-া শুনে সে একটু দাঁড়াল। দোকানদার বলল, এটা চায়না শার্ট, দাম ষোলোশো টাকা। কাস্টমার বলল, তিনশো টাকায় দিবেন? দোকানদার বলল, ধুর মিয়া, শার্ট কিনতে আসছেন? এই দামে চায়না শার্ট না, স্যান্ডু গেঞ্জি কিনে পরেন গা মিয়া। কাস্টমার চলে যাওয়ার সময় দোকানদার বলল, লাস্ট কত দিবেন বলেন। কাস্টমার বলল, ঐ যা বলেছি তাই। দোকানদার বলল, কিছু বাড়াতে পারলে আইসেন। কাস্টমার বলল, এক টাকাও বাড়াতে পারব না। দিলে দেন, না দিলে যাই। দোকানদার বলল, আসেন ভাই, নিয়া যান। এই প্যাক কর। আর এসব কান্ড দেখে সফর আলী মনের অজান্তেই হেসে ওঠে। কোথায় ষোলোশো টাকা আর কোথায় তিনশো। যাগগে, আর সময় নষ্ট না করে সামনের দিকে পা বাড়াল সে। মূল সড়কের কাছে যেতেই ঘটল আরেক আচানক ঘটনা। একটা বাস দাঁড়িয়ে ডাকছিল, এই সদরঘাট, সদরঘাট। আরেক মহিলা জানালার পাশে বসে বসে কারও সাথে ফোনে কথা বলছিল। বড় স্মার্টফোনটা যেন জ্বলজ্বল করছিল। হঠাৎ দ্রুতবেগে এক লোক এসে চিলের মতো ছো মেরে ফোনটা নিয়ে পালিয়ে গেল। সফর আলী বুঝতে পেরে ছুট লাগাল ছিনতাইকারীর পেছনে। কিন্তু মুহূর্তেই ভিড়ের মধ্যে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল ছিনতাইকারী। সফর আলী ফিরে এসে দেখল, মহিলা বাস থেকে নেমে হা-হুতাশ করছে সমানে। কয়েকজন লোক জড়ো হয়ে মহিলাকেই উল্টো দোষারোপ করছে, আপনি জানালার পাশে বসে ফোনে কথা বলেন, শিক্ষা হলো। ভবিষ্যতে আর এমন করবেন না।



কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সফর আলী সামনে পা বাড়াল। একপাশের রাস্তা পার হয়ে ডিভাইডারে উঠতেই চোখে পড়ল চাকচিক্যপূর্ণ আর আধুনিকতায় আচ্ছাদিত একটা ছোট মাজার। লাল রঙের লেখাটা পড়ে দেখল এটাই সেই ঐতিহাসিক গোলাপ শাহের মাজার। কেউ সেজদা করছে, কেউ জিকির করছে আর কিছু পাগল নানা ভঙ্গিতে বসে আসে। মাজারের আরেকটু কাছে যেতেই দেখল, লাল শালুতে ঢাকা কবরের উপরে টাকার রাজ্য। হাজার হাজার নোট ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ভেতরে। সে ভাবল, এ নির্জীব কবর এত টাকা দিয়ে কী করবে? মাজার দেখে তো মনেও হচ্ছে না যে উন্নয়নের কোনো বাকি আছে। রাস্তার মাঝখানে টাইলস মোড়ানো মাজার তো আর স্বর্ণ দিয়ে বাঁধাবে না। মাজারের কাছেই এক পা-হীন প্রতিবন্ধী ভিক্ষা করছে। তার বাটিতে দেখা গেল দুই-চারটা দুই টাকা আর পাঁচ টাকার নোট। অথচ মৃত মানুষের মাজারে পাঁচ টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকার নোট পর্যন্ত আছে। মাজার পাহারার জন্য আবার রাখা হয়েছে আনসার বাহিনীর সদস্য। সফর আলী মনে মনে বলল, হায় আফসোস! দুর্দশাগ্রস্ত জীবিত মানুষ রেখে মৃতের জন্য কত আয়োজন। ফিনিক্স রোডের উত্তর পাশের ফুটপাত ধরে হাঁটা দিতেই চোখে পড়ল সারি সারি মোবাইল আর মোবাইল এক্সেসোরিজের দোকান। সে মনে করল হয়ত তারা পুরাতন মোবাইল কিনে ঠিকঠাক করে বিক্রি করে। কিন্তু আরেকটু সামনে এগুতেই ধারণা পাল্টে গেল। এদিকে সব দামি দামি ব্র্যান্ডের নতুন মোবাইল রেখে বিক্রি করা হচ্ছে। সে চিন্তা করল, দামি দামি ব্র্যান্ডের মোবাইল এ খোলা ফুটপাতে? এবার তার চোখ পড়ল প্রায় দেড়লাখ টাকা মূল্যের আইফোন টেনের ওপর। সে চমকে ওঠল। আরে! দেড়লাখ টাকা দামের মোবাইল এভাবে পলিথিন বিছিয়ে ফুটপাতে রেখে বিক্রি করছে? সে দোকানদারকে জিজ্ঞেস করল, ভাই আইফোন টেনটা একটু দেখি। যদিও তার পকেটে এত টাকা নাই যে একটা আইফোন কিনবে। দোকানদার ফোনটা দিলে সে নেড়েচেড়ে দেখল। নাহ, সব ঠিকই তো আছে। দেখি তো দামটা জিজ্ঞেস করে। দাম জিজ্ঞেস করতেই দোকানদার বলল, মামা যদি দামাদামি না করেন, একদাম দশ হাজার টাকা। সফর আলী যেন আরও চমকে ওঠল। বলে কী! দেড়লাখ টাকা দামের নতুন মোবাইল দশ হাজার? সে বলল, এত দামি মোবাইল এত সস্তায় কীভাবে দেন? দুই নাম্বার নাকি? দোকানদার বলল, না এগুলো টানা মোবাইল। সে বলল, টানা মোবাইল মানে? দোকানদার বলল, টানা বুঝেন না? আচ্ছা, না বুঝলে নাই। এক নাম্বার মোবাইল। নিলে নিতে পারেন। সে বলল, আচ্ছা রাখেন। সামনের দিকে পা বাড়াতেই দোকানদার বলল, এই মামা কত দিবেন? সফর আলী বিড়বিড়িয়ে বলল, আরও কমানো যাবে? বাপ রে, এগুলো কী? আরেকটু সামনে যেতেই এক দোকানদার আর কাস্টমারের মধ্যে তর্কাতর্কি শুনে সে গতিটা শ্লথ করল। কাস্টমার বলছে, মামা এই মোবাইলটা কালকে আপনার কাছ থেকে নিলাম। আজই নষ্ট হয়ে গেছে, আর খুলছে না। দোকানদার বলল, আরে না এই ফোন আমার না। আমি এ ফোন বিক্রিই করি না। কাস্টমার বলল, কী বলেন? কাল নগদ সাত হাজার টাকা দিয়ে আপনার কাছ থেকেই তো ফোনটা নিলাম। দোকানদার বলল, আরে না। আর যদি নিয়েও থাকেন তারপরও তো ফেরত নিতে পারব না। কারণ আমরা কোনো ফোনের গ্যারান্টি, ওয়ারেন্টি দিই না।
সফর আলী তাদের বাকবিত-া দেখার জন্য আর অপেক্ষা করল না। এদিকে এসব তামাশা দেখতে দেখতে বিকাল হতে চলল। সন্ধ্যার আগে কয়েকটা জায়গা ঘুরে এ আজব শহর ছাড়তে হবে। সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের সামনে দিয়ে ডানে টার্ন নিয়ে হেঁটে কার্জন হলে ঢুকল। তারপর লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে দোয়েল চত্বর, শহিদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেখে হেঁটে জাতীয় ঈদগাহের সামনে আসলো। এখান গাবতলীর বাস পাওয়া যাবে। এসে দেখল, সেই সকালের মতো সুবিশাল এক জ্যাম লেগে আছে। তারপরও একটা গাবতলীর বাস দেখে উঠে পড়ল সে। সিট তো দূরের কথা, কোনোরকম গেট থেকে একটু উপরে উঠে দাঁড়াল সে। প্রায় আধা ঘণ্টায় মৎস্য ভবন পর্যন্ত বাস যেতে পেরেছে। অথচ এইটুকু রাস্তা হেঁটে আসলে বড়জোর পাঁচ মিনিট লাগত। এই জ্যাম ঠেলে কতক্ষণে গাবতলী পৌঁছাতে পারবে তা আল্লাহই জানে। সামনের গ্লাস দিয়ে যতদূর চোখ যায় ততদূর পর্যন্ত শুধু জ্যাম আর জ্যাম। সফর আলীর যেন আর ধৈর্যে কুলায় না। সে পাশের একজনকে বলল কমলাপুর কোন দিকে? লোকটি বলে ঐ পূর্ব দিকে। সে বলল, রিকশায় যাওয়া যাবে না? লোকটা বলল, হ্যাঁ যেতে পারবেন। সে আর কোনো কথা না বলে হেলপারের হাতে একটা পাঁচ টাকার নোট দিয়ে নেমে পড়ল। রাস্তা পার হয়ে পূর্বপাশে গিয়ে শিল্পকলা একাডেমির সামনে থেকে রিকশা নিয়ে সোজা কমলাপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। সেগুনবাগিচার আবাসিক এলাকায় ঢুকতেই শুরু হলো তুমুল বৃষ্টি। রিকশাওয়ালা সিটের নিচ থেকে পলিথিন বের করে দিল। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। সে ভিজেই যাচ্ছে। রিকশাওয়ালাকে বলল, ভাই কোনো বাসার সামনে রাখেন, আপাতত দাঁড়াই। একটা বাসার সামনে রিকশাটা রেখে দুইজনেই ঢুকে গেল গেইটের ভেতরে। খাকি পোশাক পরা এক সিকিউরিটি গার্ড বলল, স্যার কয়তলায় যাবেন? সফর আলী বলল, কোনো তলায় না। বৃষ্টির জন্য এখানে এসে দাঁড়ালাম। বৃষ্টি কমলেই চলে যাব। গার্ড বলল, না না, এখানে দাঁড়াতে পারবেন না। এখনই স্যারদের গাড়ি ঢুকবে। তারা এসে আপনাদের দেখলে আমাকে বকবে। মনে করবে আমি আজেবাজে লোক ঢুকিয়েছি। গার্ডের কথা শুনে তারা আর দাঁড়াতে পারল না। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কিছুদূর গিয়ে একটা যাত্রী ছাউনি পেল। মানুষ গিজগিজ করছে সেখানে। তারপরও কোনোরকমে গিয়ে দাঁড়াল। মুষলধারে তখনও বৃষ্টি পড়ছে। অন্তত মোবাইলটা রক্ষা করতে হলেও এখানে দাঁড়াতে হবে। এতক্ষণ খুব কষ্টে মোবাইলটাকে শুকনো রেখেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পানিতে তলিয়ে গেল সামনের রাস্তা। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা সত্ত্বেও আস্তে আস্তে তাদেও পা ডুবে গেল। একঘণ্টা পর বৃষ্টি কমলে রিকশাওয়ালা বলে, আমি যাব না মামা। সব ডুবে গেছে, পানির মধ্য দিয়ে যাত্রীসহ রিকশা নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। সফর আলী বলল, এত পানির মধ্যে আমি কীভাবে যাব? একটু নামিয়ে দেন না। রিকশাওয়ালা বলল, যেতে পারি, যদি দুইশো টাকা ভাড়া দেন। সে বলল, সে কী! আপনার সাথে না আমার একশো টাকার চুক্তি হলো? রিকশাওয়ালা বলল, সেটা বৃষ্টির আগে। এমন পানির মধ্যে যাওয়ার চুক্তি হয়নি। সে বলল, তাহলে আর নাহয় বিশ-ত্রিশ টাকা বেশি নিতে পারেন। তাই বলে একশো টাকাই বেশি? রিকশাওয়ালা বলল, গেলে যান, না গেলে পঞ্চাশ টাকা দেন। আমি চলে যাই। আরও কত যাত্রী আছে যাওয়ার জন্য। অবশেষে দুইশো টাকা ভাড়া দিয়েই যেতে হলো তাকে।
কমলাপুর রেলস্টেশনে গিয়েও সুবিশাল এক লাইন ধরে অবশেষে উত্তরবঙ্গের ট্রেনের একটা টিকিট কাটতে সক্ষম হয় সফর আলী। বড় মনিটরে ট্রেনের টাইম শিডিউল ও প্লাটফর্মের নম্বর দেওয়া। সে মনিটরে ট্রেনের নাম দেখতে পেল কিন্তু প্লাটফর্ম নম্বর তখনও দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ ট্রেন এখনও প্লাটফর্মে ঢোকেনি। ট্রেন ছাড়তে আরও প্রায় এক ঘণ্টা দেরি। তাই সে ওয়েটিং রুমে বসে অপেক্ষা করছিল। ছোট থেকেই তার মনটা একটু কাব্যিক। মাঝে মাঝে ছন্দ মেলাতে পছন্দ করে। হঠাৎ তার মনে নতুন দুটো লাইন এসে গেল। সে আস্তে আস্তে গুনগুনিয়ে আবৃত্তি করতে লাগল-
“এই শহরে মানুষ থাকে
কেমনে থাকে, কেমনে থাকে?”