মীম মিজান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মীম মিজান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বহুরূপী মানুষের নিপুণ চিত্রায়ণ

বহুরূপী মানুষের নিপুণ চিত্রায়ণ

 



বহুরূপী মানুষের নিপুণ চিত্রায়ণ 

মীম মিজান


মানুষ বহুবর্ণিল। এই বর্ণ তারাই দেখতে পান যাদের দেখার চোখ আছে। উপলব্ধির বোধ আছে। এমনই দেখার চোখ ও বোধসম্পন্ন ব্যক্তি হচ্ছেন শফিক সেলিম। কেননা তার সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ন্যাশনাল কারিকুলাম এন্ড টেক্সটবুক অব  বোর্ড বাজার আইল্যান্ড’র পুরোটা জুড়ে এই মানুষের বহুরূপীতার চিত্রায়ণ হয়েছে নিপুণভাবে।


কাব্যগ্রন্থটির নাম কবিতাটি সচরাচর দেখা কবিতার থেকে ভিন্ন। পুরো কবিতাই সংলাপ। আসলে রাজনীতিক যারা তারা কীভাবে শোষণ করছে তারই এক নিপুণ চিত্র। এক লোক চুরি করে মানে পকেট মারে। মানুষ যখন রাস্তা পারাপারের জন্য আইল্যান্ডে দাঁড়ায় তখন তাদের দৃষ্টি থাকে শা শা বেগে ধাবিত লক্কর ঝক্কর গাড়ি ঘোড়া পেরিয়ে ওপারে যাওয়া। দৃষ্টি সেদিকেই নিবদ্ধ। এই ফাঁকে, চোর হাকে। চেইন খুলে, পকেট হাতড়ে সব নিয়ে নেয়। আমরাও রাজনীতির কাছে বন্দী। ইলেকশনে দাঁড়িয়ে জনপ্রতিনিধি আমাদের সবকিছুও ওভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে। আমরা টের পাই না। যখন সম্বিত ফিরে, চোর ধরাছোঁয়ার বাইরে। চোরের কথার মাধ্যমে রাজনীতির সেই চোরা পথ বলছেন কবি:

: আইল্যান্ডে খাড়াইলেই?

: হ, খাড়াইলেই সব কিচু আমার।

: ক্যামনে?

: ইলেকশনে খাড়াইলেই যেমনে নেতারা দ্যাশের গুয়া মারে তেমনে’


এ কবিতায় তিনি বেশকিছু বিষয়ের খোলাসা করেছেন। যেমন শিক্ষিত হলে কী করে ব্যাংক ডাকাতি করা যায়। মেয়ে শিক্ষিতা হলে কার সাথে বিয়ে দিবেন এমন। চোরকে তাই কবির জিগ্যেস আর চোরের উত্তর:

: লেহাপড়া হিকলে কি করতি?

: ব্যাংক লোন নিতাম।

: তারপর?

: ক্যাসিনু খেলতাম, টাকিলা খাইতাম, গাড়ি নিয়া ঘুরতাম, মাগি...

: তর পুলারে কি করবি?

: লেখাপড়া হিকামু, বড়ো চোর বানামু

: তর ম্যায়ারে কি করবি?

: লেহাপড়া হিকামু, বড়ো চোরের কাছে বিয়া দিমু’


উন্নয়ন উন্নয়ন বলে যে জোয়ার। তারই নিচে মানুষ না খেতে পেয়ে, বিনে চিকিৎসায় মারা যায়। আর কিছু বললে চোখে কিছু দেখে না জনগণ। আর যতো সমালোচনা। এই সমালোচনার দারুণ মঞ্চায়নের কবিতা ‘তুমি মিয়া আজাইরা’। কবি বলছেন:

‘আন্দা নাহি তুমি?

‘এত্তো বিজলি বাত্তি, এত্তো ফালাই ওভার, বিলডিং, এত্তো উন্নয়ন কিচ্চু দেহো না?

গণভবন গিল্লা খাইবার চাও?’


আসলে গরীব মানুষেরা কি গণভবন গিলে খেতে চায়? পারবে কি? না। তারা চায় নাগরিক অধিকার। মৌলিক অধিকার, মানবিক জীবন যাপন। যা আমলা, রাজনীতিক আর পাতিরা খেয়ে বিদেশের ব্যাংক ভরেছে, সুরম্য বাড়ি গড়েছে। আবার যারা উচ্ছিষ্ট ভোগী তারাও কম যায় না। কাকের মতো চোখ বুঝে মহারাজের জয়গান করে। এমনই জয়গানের পঙ্ক্তি রচনা করে এসব নিকৃষ্ট মানুষের চরিত্র চিত্রায়ণ করেছেন এভাবে:

‘আমি সরকারি চাকরি করি

সরকার আমাগো খাওয়ায়

দ্যাশ বালো আচে’


শুধু কি আমলা বা সরকারি চাকুরে? অকবি, কুসাহিত্যিক, অপসংস্কৃতি সাধক এরাও কম যায় না। শিল্প যেমন তার স্বসময়কে ধারণ করবে তেমনই তা হবে গণমানুষের। কিন্তু এদের কোনও সৃজন মানুষকে ধারণ করে না। নারী শরীর, প্রেম, প্রকৃতির স্তুতি গাইতে গাইতে বেহুশ। কবি একই কবিতায় এসব মুখোশ আঁকছেন:


‘এহুন বরষা মাস-খালি প্রেমের কবিতা লেহুম

আর পুরোনো প্রেমিকার বিলাউজের মাপ কতো

তাই ভাবুম’

(দ্যাশ বালো চলচে...)


আইনের চোখ নাকি অন্ধ। কাউকে দেখতে পায় না। যার অপরাধ তারই শাস্তি হয়। দেশের সংবিধানও আইন। দেশের নাগরিকদের অধিকার রক্ষার আইন। কিন্তু সেই সংবিধান এখন দেখতে পায়। তার চোখে ক্ষমতাসীন, পুঁজিপতিরা নিষ্কলুষ। যত অপরাধ গরীব হয়ে জন্মানোতে, বিরোধী মত হওয়ায়। তাই সেই সংবিধানের প্রতি নিদারুণ খেদোক্তি কবির:

‘খাড়াইয়া মুততাচি

দেহি, ছেঁড়া বইয়ের পাতা

পাতার উপরে ল্যাহা ২৭ নম্বর আর্টিকেল 

উপরের ল্যাহা বাংলাদেশের সংবিধান’

(আমাগো সংবিধান) 


সংবিধানে অধিকার সংরক্ষিত থাকলেও তার বাস্তবায়ন না থাকায় দেশের সব মানুষই সমালোচনা করে। বিশেষ সমালোচনার স্থান চায়ের দোকান। এক কাপ চা, আর গ্যালন গ্যালন সমালোচনা। এমনই সমালোচনায় বস্তি থেকে সংসদ ভবন এমনকি জাতিসংঘ ও মার্কিন মুলুকও উঠে আসে। কবির কাব্য পঙ্ক্তি বরাবরই নির্মম সমালোচনায়। এমনই নির্মম সমালোচনায় নাকানিচুবানি খাচ্ছেন রাঘববোয়ালরা। দায়িত্বশীল ব্যক্তির উক্তি ছিলো ‘সরল বিশ্বাসে ঘুষ খাওয়া যাবে।’ কবি তাই বলছেন:

‘দুর্নীতি কিচু না

সরল বিশ্বাসে করেন, ক্ষমা পাইবেন

তবে ভুলেও কিন্তু ইচ্চাকিত দুর্নীতি করবেন না

সুযোগ লুইট্যা ন্যান। দ্যাশ যাইক গুয়া মারা’

(চাওয়ালা)


বইটি দুটো ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে ছয়টি কবিতা। আর দ্বিতীয় ভাগ অর্থাৎ ‘সোনার মাকড়ি’ অংশে আছে আঠারোটি কবিতা। দ্বিতীয় অংশের কবিতাগুলোতে কবি নিজের ব্যক্তি জীবনের কথা বলেছেন। কিন্তু ব্যক্তিকে বিশ্বের একজন করে তুলে প্রকাশভঙ্গী এমন করে দিয়েছেন যা হয়েছে সব মানুষের। সবার জীবনের প্রতিচ্ছবি। এককথায় গ্রন্থটিকে বলা যায় মানুষের আয়না। সে প্রান্তিক হোক আর ভুড়িওয়ালা মালদার হোক সবাই স্থান করে নিয়েছেন এখানে। যে গরুর চামড়া ত্রিশটাকা বিক্রি হয় সেই চামড়ার জুতো গুলিস্থানের সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেটে বিক্রি হয় হাজার টাকার উপরে। প্রান্তিক শ্রমিক তাই ভেবে দিশেহারা। এরূপ চেটেপুটে খাচ্ছেন সবাই। সে প্রসঙ্গ ও বুনন হামেশাই দেখা যায়। 


‘সোনার মাকড়ি’ কবিতাটিও গরীব-প্রান্তিক মানুষের। মায়ের সম্পদ বলতে একজোড়া সোনার মাকড়ি। তাই বারংবার সুদে বন্ধক রাখতে হয় স্থানীয় স্বর্ণকারের কাছে। কেননা পরীক্ষার ফি দেয়ার সামর্থ্য নেই মায়ের। পরে নিতান্ত কষ্টে মাকড়ি জোড়া ফেরত নেয়ার টাকা জোগাড় করেন মা। এ যেনো সারা বাংলাদেশের মেটে মজুরের চিত্র।


বোধসম্পন্ন কবি ‘হাসপাতাল’ নামক কবিতায় মানুষের জীবনের দু’টি কান্নার কথা বলেছেন। একটি কান্না বাবা মারা যাওয়ার। আরেকটি নতুন শিশুর ওয়াও। বোধের খোঁজ করতে বলেছেন ‘মানুষের সময় হয় না’ কবিতায়। নিজেকে জানা সব থেকে বড় কাজ। কবি বলছেন:


‘শকুন বদলায়ে যায়। মানুষের সময় হয় না

নিজেকে দেখার।’


কৃষকদের নিয়ে দু’টো কবিতা লিখেছেন তিনি এখানে। কৃষকদের মহত্ত্ব তুলে ধরেছেন মমত্ববোধের কবি:


‘কৃষকের প্রাণ নিয়ে ধানেরা বয়স্ক হয়

তাই, কৃষকের চেয়ে বড়ো কোন ভগবান দেখি না’

(কৃষক)


বঞ্চিত করছি প্রান্তিক মানুষকে। আর পাহাড়, বন-বনানী, প্রকৃতিকে নিজেদের বিলাসিতার জন্য ছেটে-কুটে শেষ করছি। কিন্তু তাতে নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়োল মারছি। কেননা এই প্রকৃতিতেই আমাদের বাস। তাদের ধ্বংসে নিজেদেরই সর্বনাশ। কবি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন:


‘আপনি দেখলেন

আপনি মূলত খেয়েছেন আপনার নিজের হাত, পা এবং হৃৎপি-’

(আপনি একজন মানুষ) 


মানুষ। এই মানুষই আবার শ্রেষ্ঠ দুশমন মানুষের। জাত-পাতের জন্য কত্ত যে মানবের কবর রচিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কবি ‘নাম’ শীর্ষক কবিতায় এ বিষয়টি পরিস্ফুটন করেছেন। দায়। পিতার দায়। মাতার দায়। সন্তানের দায়। কিন্তু এই দায় শুধু পিতা-মাতারাই করে যাচ্ছি। আবার সন্তান হিশেবে পিতা-মাতার দায় এড়িয়ে যাচ্ছি। তাদের ইহধাম ত্যাগে পাবো স্বস্তি। সমস্যা নেই আমাদের ইহধাম ত্যাগের আকুল প্রত্যাশি হবে আমাদের সন্তান। এমনই বিষয়বস্তু ‘বিক্রি’ ও ‘বাবা’ কবিতার। সবচেয়ে বড় চপেটাঘাত দিয়েছেন কবি আমাদের দুই গালে। পঙক্তি দু’টো :

‘পাঁচ ভাইবোন মিলে পরামর্শ করি

বাবা মাকে বিক্রি করলে কেমন হয়’

(বিক্রি)


আমরা কি মানুষ হবো না। না দু’পেয়ে জন্তু হিশেবে থেকে যেয়ে হাম্বা হাম্বা ডাক দিয়ে খেয়ে দেয়ে ঘুরবো? তবে এ মানুষের স্থান লোকালয়ে না হয়ে হোক আমাজনে। আর যদি সত্যিকারের মানুষ হতে পারি তাহলে লোকালয় হবে শেখ ফজলল করীমের কাব্যের স্বর্গ।


ভাষার ব্যবহারে কবির অকৃত্রিমতা লক্ষণীয়। ঠিক যেনো শহীদুল জহিরের গল্পের প্রান্তিক থেকে সংসদ ভবনের বাসিন্দারা কথা বলছে। প্রচ্ছদটি উপলব্ধির জন্য পুরো কাব্যগ্রন্থের শব্দে শব্দে পরিভ্রমণ দরকার। কবি মমিন মানব ফ্ল্যাপে যে কথাগুলো লিখেছেন তা কাব্যগ্রন্থের সারাৎসার। মজার বিষয় কোনও যতিচিহ্ন ব্যবহার করেন নি মমিন। আর একটি বিষয় হচ্ছে যে, যত প্রাতিস্বিক কবি আছেন তাদের কবিতায় ছন্দ আছে। আছে অলংকার। শফিক সেলিমের সব কবিতাই গদ্য। গদ্যের মধ্যে একটি স্বাদ আস্বাদিত হলেও ছন্দের অন্যান্য বিষয়গুলো আমার দৃষ্টিতে পড়ে নি। আমার পরামর্শ থাকবে, কবিতার ভাব, ভাষা, আবহ ও বুননে তার যে দক্ষতা সেখানে যদি ছন্দ ও অলংকার যোগ হয় তাহলে আরও মনোহর হবে কাব্য কানন।


প্রকাশক: বাংলা জার্নাল 

প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি-২০২০

প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত

মূল্য: ১৩৫ টাকা


কুর্দিস্তানি কবি শেরকো বিকাস’র যুদ্ধের ভয়াবহতার কবিতা

কুর্দিস্তানি কবি শেরকো বিকাস’র যুদ্ধের ভয়াবহতার কবিতা


কুর্দিস্তানি কবি শেরকো বিকাস’র যুদ্ধের ভয়াবহতার কবিতা

ভূমিকা ও বাঙলায়ন: মীম মিজান

শেরকো বিকাস একজন কুর্দিস্তানি নির্বাসিত কবি ও স্বাধীনতাকামী নেতা। তিনি ইরাকের কুর্দিস্তানে ১৯৪০ সালের ২রা মে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ফায়েক বিকাস ছিলেন কুর্দিস্তানি প্রখ্যাত কবি ও স্বাধীনতাকামী মানস। মাত্র ১৭ বছর বয়সে শেরকো’র কাব্য প্রকাশ হয়েছিল। তিনি কুর্দিস্তান মুক্তি আন্দোলনের রেডিও ‘দ্য ভয়েস অব কুর্দিস্তান’ এ কর্মরত ছিলেন। তাকে কুর্দিস্তান থেকে একাধিকবার নির্বাসিত হতে হয়েছিল ইরাকি সরকারের চাপে। বিশটির অধিক কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন তিনি। ‘দিওয়ানে শেরকো’ নামে তার কাব্য সংকলন দু’খণ্ডে প্রকাশ হয়েছে। তিনি ১৯৮৭ সালে স্টকহোমের পেন ক্লাবের পক্ষথেকে ‘তুচোলস্কি স্কলারশিপ’ এবং ‘ফ্লোরেন্স সিটি স্বাধীনতা পদকে’ ভূষিত হন। তার কবিতা আরবি, সুইডিশ, ড্যানিশ, ডাচ, ইতালিয়ান, ফরাসি, ইংরেজিসহ বিশ্বের অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি সারাবিশ্বের কাছে মুক্তিকামী জনতার প্রতীক, নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর, জালিমের শোষণের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ হিশেবে পরিচিত। শেরকো সুইডেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকাকালীন ৪ আগস্ট ২০১৩ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। শেরকো’র নিম্নোক্ত কবিতাটি ‘ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রাম’ থেকে চয়িত হয়েছে। কুর্দিশ থেকে ইংরেজিতে ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ চাওছাওয়া ও এ. এম. ল্যাভিন্সন-লা ব্রোজ।

সাময়িক ব্লক

সাময়িক ব্লক


সাময়িক ব্লক
ইয়াকুব শাহরিয়ার

নীলা আজকেসহ আমাকে ফেসবুকে পাঁচশ বার হবে ব্লক করলো। খুব সামান্য ব্যাপারে এমনটা হয়। পরে নিজে থেকেই আবার ব্লক খুলে দেয়। এবার আর সেটা হবে বলে মনে হচ্ছেনা। অন্যান্যবার আমি কল দিয়ে বুঝিয়ে বলি তারপর ব্লক খুলে। এবার তার উল্টোটা করেছি। তার ফোন নাম্বারটাই আমার ফোনবুক থেকে ডিলিট করে দিয়েছি। নীলা আমার তিন বছরের জুনিয়র। অনার্স ২য় বর্ষে ইকোনোমিক্সে পড়ে। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে। ইন্টারমিডিয়েটের ২য় বর্ষে পড়ার সময় আচমকা পরিচয় হয়ে প্রেম। তাই হয়তো ইমোশান খুব একটা কাজ করে না। সম্ভবত হঠাৎ করে হয়ে যাওয়া প্রেমে ইমোশান কমই থাকে।

সুনামগঞ্জের পথঘাট আমার চেয়ে ভালোই চিনে নীলা। কলেজ রোডে তাদের বাসা হওয়ায় ওদিকটায় তার সাথে খুব একটা সময় কাটানো হয়নি। ইদানিং দেখা করবার জন্য খুব চাপ দিচ্ছিলো। আমি যাবো যাবো করে অনেকটা সময় পার করে দিয়েছি। আর না যেয়ে পারছিই না। যেতেই হবে। না হলে ব্যাকআপ। ব্যাকআপ শব্দটা তার কাছে পান্তাভাতের মতো। যখন তখন বলে ফেলে। যেনো কিছুই না ব্যাপারটা। আমাকে মেনটেন করে চলতে হয়। যখন মাথা ঠান্ডা হয় তখন বলে- ‘আমু, আমি তোমার সোনাবউ না? আমাকে বিয়ে করবানা? বিয়ের পরেও এসব করবো, তোমাকে কিন্তু মেনটেন করে চলতে হবে। আমি তোমাকে খুব বেশি ভালোবাসি। সত্যি বলছি, তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না।’ অনেকবার এসব বলে কেঁদেছে। আমিও খুব ভালবাসি নীলাকে। সুন্দরী বলতে যা যা গুণ থাকা দরকার সবটাই ওর আছে। আমার কালো চেহারায় খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি থাকবে সেটাই পছন্দ ওর। একটু লম্বা হলেও চলবে। দেখতে কবি সাহিত্যিকদের মতো লাগবে। তবে লেখালেখি করি একদমই চায় না। কবিতা নীলার কাছে সতীনের মতো। এর কারণ জানিনা।

ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজের জন্য আগের দিন রেডি করা একটা আর্টিক্যাল লিখে শেষ করেই বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য হালুয়ারঘাটের সুরমাভ্যালিতে। নীলা সেখানেই আসবে। হাছননগরের বাসা থেকে বেরিয়ে আমাকে কল দিয়ে জানিয়েছে। একটা ছেলে বন্ধুও যাবে ওর সাথে। সাহেদ। দু’জন একসাথে দেখা করে আমাকে ম্যাসেঞ্জারে বলল ‘ডব ধৎব ৎবধপযবফ যবৎব.’ আমিও গতি বাড়াই। নিজের কালো রঙের বাইকে করে দ্রুত পৌঁছে যাই সুরমাভ্যালিতে।

ইচ্ছে করেই গেইটের বাইরে বাইক লক করে রেখে দ্রুত চলে যাই ভিতরে। সেখানে গিয়ে চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছি না যে এটা কেমন করে হয়। চোখ কচলাতে শুরু করলাম। ভয়ে ভয়ে সামনে এগিয়ে দেখলাম। না, যা দেখছি তা সত্যিই। নীলা সাহেদের হাত ধরে হাটছে। প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতো। সমস্ত শরীর ঘামতে থাকে। দ্রুত ছোটে যাওয়াতে যে এমনটা দেখতে হবে তা কোনো ভাবেই মানতে পারছিলাম না। ভীষণ ভালোবাসি নীলাকে। তাকে কখনোই হারাতে না চাওয়ার ভয়টাই আমার সমস্ত শরীরে কাঁপুনী ধরিয়ে দিয়েছে। ব্যাপারটা ভীষণ দুর্বিষহ ছিলো। শরীর ভীষণভাবে কাঁপছে। মানতে পারছি না। বিড়বিড় বলতে লাগলাম, না এমনটা হতে পারে না। হতে পারে না। আমি ভুল দেখছি। নীলা আমার সাথে এমনটা করতে পারে না। শরীরের এমন কাঁপুনী ও বিড়বিড়ানিতে ঘুম ভেঙ্গে যায় শাওনের। আমু, এ্যাই আমু! বলে ডাকতে লাগলো শাওন। শাওন আমার রুমমেট। একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে সে। তার ডাকে আমি থতমত খেয়ে চোখখোলি। সব কিছু চিমচাম। আবচা আলো রুমের মধ্যে। আমার মুখের উপর শাওনের চ্যাপ্টা মুখ। হাত দিয়ে ঠেলে তাকে সরালাম। উঠে বসার পর বুঝতে পারলাম যে, স্বপ্ন দেখেছি।

ঘুম ঘুম চোখে ফোন হাতে নেই। ম্যাসেঞ্জারে কতকিছু লিখে নীলার অনেকটা ম্যাসেজ। বিশটার বেশি কলও দিয়েছিলো। ড্যাটা অফ করে ফোন সাইলেন্ট মুডে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। যখন নক করতে যাবো তখন দেখি আমি ব্লক্ড। ফোনেও কন্টিউ বিজি...

স্বাধীনচেতা কবি : সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী

স্বাধীনচেতা কবি : সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী


স্বাধীনচেতা কবি
সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী

মীম মিজান

যে জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য সোনার অক্ষরে লিপিবদ্ধ। কেন সেই জাতি আজ নিগৃহীত-লাঞ্চিত? যারা ছিল শাসক ও উত্তম রাষ্ট্রনেতা, কেন তারা আজ শোষিত, পরাজিত ও করুণার পাত্র প্রজা? সেই নিগৃহীত জনগোষ্ঠীটি হলো দিবানিদ্রারত আয়েশী জীবনের পাবন্দ অলস-অকর্মণ্য মুসলিম সমাজ। সেই চোখখুলে দিবানিদ্রারত মুসলিম সমাজকে ডেকে যাচ্ছেন একজন স্বাধীনচেতা মানুষ ও কবি তার নাম হলো সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন শিরাজী। তার আহ্বানটি ছিল,
‘আর ঘুমিও না নয়ন মেলিয়া,
উঠরে মোসলেম উঠরে জাগিয়া,
আলস্য জড়তা পায়েতে ঠেলিয়া,
পূত বিভূ নাম স্মরণ করি।’
উপমহাদেশের প্রখ্যাত সেই ঐতিহ্যবোধের কবি ইসমাঈল হোসেন শিরাজী ১৮৮০ সালের ১৩ জুলাই তারিখে তৎকালীন পাবনা জেলার অন্তর্গত সিরাজগঞ্জ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার সম্পূর্ণ নাম ছিল গাজী - এ- বলকান মওলানা আবু মোহাম্মদ সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী। ( কবি পৈৗত্র পীরজাদা সৈয়দ মুনীর উদ্দৌলা শামীম শিরাজী)। এখানে উল্লেখ্য যে, তার পরিবারের সদস্যগণ শিরাজী বানানে তার পদবি উল্লেখ করেছেন। তাই আমি শিরাজী বানান সিরাজী লিখিনি। উৎস হিসেবে তার পৌত্রের লেখা তাকে নিয়ে অনেকগুলো প্রবন্ধ দেখা যেতে পারে। তার বাবার নাম সৈয়দ আবদুল করীম এবং মাতার নাম নুরজাহান বেগম। তারা উভয়েই ছিলেন অত্যন্ত দ্বীনদার ও পরহেজগার মানুষ।
শিশু ইসমাইল হোসেনের লেখাপড়ার প্রথম সবক দেন তার মা নূরজাহান খানম। নূরজাহান খানম তার শিশুপুত্রকে প্রথমেই কোরআন শিক্ষা দেন। কোরআন শিক্ষা শেষ হলে তাকে মধ্য ইংরেজী স্কুলে ভর্তি করা হয়। মেধাবী ইসমাইল হোসেন অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে মধ্য ইংরেজী বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে সিরাজগঞ্জের বিএল উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও দারিদ্র্যের কারণে এ সম্ভাবনাময় তরুণ লেখাপড়ার ক্ষেত্রে আর অগ্রসর হতে পারেন নি। তাছাড়া স্বদেশের পরাধীনতা, সমগ্র মুসলিম জাহানের দুর্দশার জন্য বেদনাবোধ হতে সৃষ্টি উৎকন্ঠাও তাঁকে স্কুলের চার দেয়ালের মধ্যে বসে থাকতে দেয় নি।
তিনি এ সময়ে নির্যাতিত অবহেলিত, লাঞ্চিত ও পদদলিত মুসলিম জাতির জন্য বেদনাবিধুর, এতই ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন যে, মাত্র ১৬ বছর বয়সেই লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে তুরস্কের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। এ যাত্রায় তিনি তুরস্কে যেতে পারেন নি ঠিক কিন্তু সেই যে মুসলিম জাহানের কল্যাণের মানসে ঘর হতে বের হলেন আর কখনই সুবোধ বালকের মত ঘরে বসে থাকেননি। অবশ্য তিনি পরবর্তীকালের তার বাল্যকালের স্বপ্নের তুরস্কে গিয়েছিলেন তা অনেক পরের কথা।
ইসমাইল হোসেন শিরাজীর সবচেয়ে পরিচিত কাব্যগ্রন্থ হল ‘অনল প্রবাহ’। এটি ১৮৯৯ সনে মুনসী মেহেরউল্লা প্রথম প্রকাশ করেন। পুস্তিকাটি এত জনপ্রিয় ছিল যে ১৯০০ সালে আরো কিছু কবিতা নিয়ে কাব্যগ্রন্থটি আবার প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯০৮ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়। আর এ সময়ই ‘অনল প্রবাহ’ ও লেখক বৃটিশ রাজশক্তির আক্রমণের শিকার হন। ‘অনল প্রবাহ' বাজেয়াপ্ত হয় এবং লেখকের দু’বছর কারাদন্ড হয়। তিনিই প্রথম কবি যার কাব্যগ্রন্থ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয় এবং তিনিই বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগে কারাদন্ড ভোগকারী উপমহাদেশের প্রথম সাহিত্যিক।
মুসলমানদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক ও মিথ্যা অপপ্রচার করতো তখন হিন্দু কবি সাহিত্যিকরা। বিশেষ করে চরম মুসলিম বিদ্বেষী ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার লেখায় সুপরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের হেয় করার চেষ্টা করতেন। ইসমাইল হোসেন সিরাজী এ সমস্ত কুৎসিৎ লেখার জবাব দিতে গিয়ে উপন্যাসও রচনা করেন। তার উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে তারাবাই, ফিরোজা বেগম, নুরুদ্দীন, রায়নন্দিনী ও বংকিম দুহিতা। না, জবাব দিতে গিয়ে শিরাজী প্রতিআক্রমণ বা সাম্প্রদায়িক উস্কানি বেছে নেননি। সুন্দর ও যুক্তিপূর্ণ ভাষায় উপন্যাসে তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে জবাব দিয়েছেন। ইসমাইল হোসেন শিরাজীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘রায় নন্দিনী’।
শিরাজী রচিত কাব্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী ও সঙ্গীত বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থের সংখ্যা ৩২টি।
এগুলোর হচ্ছে, কাব্যগ্রন্থ: উচ্ছ্বাস (১৯০৭), নব উদ্দীপনা (১৯০৭), উদ্বোধন (১৯০৮), স্পেন বিজয় কাব্য (১৯৮৪), মহাশিক্ষা কাব্য প্রথম খন্ড (১৯৬৯), মহাশিক্ষা কাব্য দ্বিতীয় খন্ড (১৯৭১)।
উপন্যাস: রায়নন্দিনী (১৯১৫), তারাবাঈ (১৯১৬), নূরউদ্দীন (১৯১৯)।
প্রবন্ধ গ্রন্থ: মহানগরী কর্ডোভা (১৯০৭), স্ত্রীশিক্ষা (১৯০৭), আদব কায়দা শিক্ষা (১৯১৪), সুচিন্তা প্রথম খন্ড (১৯১৬), তুর্কি নারী জীবন (১৯১৩)।
ভ্রমণ কাহিনী: তুরস্ক ভ্রমণ (১৯১৩)। সঙ্গীত গ্রন্থ- সঙ্গীত সঞ্জীবনী (১৯১৬), প্রেমাঞ্জলী (১৯১৬) প্রভৃতি।
অপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: সুধাঞ্জলী, গৌরব কাহিনী, কুসুমাঞ্জলী, আবে হায়াৎ, কাব্য কুসুমোদ্যান, পুস্পাঞ্জলী।
অসমাপ্ত উপন্যাস: বঙ্গ ও বিহার বিজয় এবং জাহানারা।
গোটা বিশ্বের মধ্যে প্রথম মুসলিম কবি কে? যিনি কবিতা লেখার অভিযোগে দুই বছর সশ্রম কারাদন্ড ভোগ করেছিলেন, দেশের কোন কবি বাগ্মীশ্রেষ্ঠের মৃত্যুর পর তুরস্কের জাতির জনক মোস্তাফা কামাল আতাতুর্ক প্রথম শোক বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কোন বিদ্রোহী কবির বই বাজেয়াপ্ত করার পর ব্রিটিশ ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ লয়ের তার পারিবারিক লাইব্রেরী পরিদর্শন করে নির্দ্বিধায় নিঃসঙ্কোচে দৃঢ় কন্ঠে বলেছিলেন, গজ. ঝঐওজঅতঊঊ ঘঙঞ ঙঘখণ অ ঘঅঞওঙঘঅখ চঙঊঞ অঘউ এজঊঅঞ ঙজঅঞঙজ ইটঞ অখঝঙ অ এজঊঅঞ ঝঈঐঙখঅজ (শিরাজী শুধুমাত্র একজন জাতীয় কবি এবং উচ্চস্তরের বাগ্মীই নয় একজন বিরাট পন্ডিতও বটে)। হ্যাঁ! তিনিই আমাদের শিরাজী।
১৯৪০ সালের ২২ মার্চ কলিকাতা ২/১ ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেনে, সিরাজী পাবলিক লাইব্রেরী ও ফ্রি রিডিং রুম- এর উদ্বোধন করা হয়। উক্ত দ্বারোঘাটন অনুষ্ঠানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রদত্ত সভাপতির ভাষণে বলেন, ‘সিরাজী সাহেব ছিলেন আমার পিতৃতুল্য। তিনি আমাকে ভাবিতেন জ্যেষ্ঠ পুত্র-তুল্য। তাঁহার নিকট যে স্নেহ আমি জীবনে পাইয়াছি তাহা আমার জীবনের পরম সঞ্চয়। ফরিদপুর কনফারেন্সে তাঁহার সহিত আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তাঁহার সমগ্রজীবনই ছিল অনল প্রবাহ এবং আমার রচনায় সেই অগ্নি স্ফুলিঙ্গের প্রকাশ আছে। সাহিত্যিক ও রাজনীতিক ছাড়াও আমার চোখে তিনি প্রতিভাত হয়েছিলেন এক শক্তিমান দরবেশ রূপে। মৃত্যুকে তিনি ভয় করেন নাই, তুরস্কের রণক্ষেত্রে তিনি সেই মৃত্যুর সঙ্গে করিয়াছিলেন মুখোমুখি। তাই অস্তিমে মৃত্যু তাঁহার জন্য আনিয়া দিয়াছিল মহাজীবনের আস্বাদ।’
পল্লীকবি জসিমউদ্দিন শিরাজী স্মরণে লেখেন (হোসেন মোহাম্মদ সম্পাদিত সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজীর সংকলন ১৯ পৃষ্ঠা) ‘সকালবেলা শিরাজী সাহেবের নিকট হইতে বিদায় লইয়া বাড়ি ফিরিবার সময় তিনি আমার হাত ধরিয়া বলিলেন, ‘জসীম! তুমি ত কবি! কবিরা নাকি দেশের দূর-ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। বলতে পার আমার এই আজন্ম সাধনা কি একদিন সফল হবে? আমি নিজের জন্যে সম্মান চাইনে, অর্থ সম্পদ চাইনে, আমি চাই এই ঘুমন্ত জাত আবার মাথা নাড়া দিয়ে জেগে উঠুক- সিংহ গর্জনে হুঙ্কার দিয়ে উঠুক। আমি চাই এমনই একটি মুসলিম-সমাজ, যারা বিদ্যায়, সাহিত্যে, সাহসে, আত্মত্যাগে কারুর চাইতে পিছপা হবে না। যা কিছু মিথ্যা, যা কিছু অন্ধ কুসংস্কার তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। দেশের মেয়েদের পরদায় আবদ্ধ রেখে তাদের কাছ থেকে দুনিয়ার আলো-বাতাস বন্ধ করে রাখবে না স্বাধীন সজীব একটি মুসলিম জাতি। বলত জসীম! একি আমি দেখে যেতে পারব?
আমি বলিলাম, ‘আপনি আজীবন সাধনা করেছেন আমাদের জন্যে। আমাদের অনাগত জীবনের সাধনায় আপনার সেই স্বপ্নকে আমরা রূপ দেব। নিশ্চয় আপনার স্বপ্ন সার্থক হবে।’
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বড় দুর্ভাগ্য যে আমাদের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা মহান পুরুষ শিরাজীকে হীনমন্যতার কারণে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ। দেশের মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পাঠ্যসূচিতে শিরাজী রচনাবলী উপেক্ষিত। শিরাজীর লেখা থেকে বঞ্চিত এদেশের শিক্ষার্থীরা। শিরাজী সম্পর্কে তরুণ সমাজকে জানতে দেয়া হচ্ছে না। অথচ শিরাজীর অনলবর্ষী  বক্তৃতায় প্রকম্পিত হয়েছিলো ব্রিটিশ সিংহাসন। তার কণ্ঠ ও লেখা থেকে বারুদের গন্ধ বের হতো। তার বক্তৃতায় জেগে ওঠেছিলো লাখো লাখো তরুণ। সেখানে মুসলিম বা হিন্দু বলে কোনো প্রশ্নের সৃষ্টি হয় নাই। ব্রিটিশ রাজ শুধু তাকে কারাবন্দীই করেনি, তার কবিতাও নিষিদ্ধ করেছিলো। সেই স্বাধীনচেতা মহাকবিকে স্বাধীন রাষ্ট্রের কর্ণধাররা অবমূল্যায়ন করছেন।
যারা মুসলমানদেরকে লাইভস্টক বা গৃহপালিত পশু বলে আখ্যায়িত করছে, যারা আমাদেরকে কাক পক্ষী, দস্যু, তস্কর, দানব, অসুর, অনার্য, ইতর, নরপশু, ডাকাত বলে গালি দিয়েছে তাদের জন্ম-মৃত্যু বার্ষিকী ঘটা করে পালন করা হয়। তাদের লেখা গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের। অথচ শিরাজীর মত মহানায়কের রচনাবলী পাঠ্য বহির্ভূতই থেকে যাচ্ছে। বর্তমান বাংলাদেশের ক্রান্তিকালীন দুর্বিষহ অবস্থার প্রেক্ষিতে শিরাজীর মতো বিপ্লবী পুরুষের প্রসঙ্গ টেনে আনা অতীব জরুরী।
ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এস. এম. লুৎফর রহমান লিখেছেন, ‘বাংলাদেশী জাতি সৃষ্টির এই গঠনকালে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর উদারতা, দৃঢ়তা, অসাম্প্রদায়িকতা, স্বাতন্ত্র্যবাদ, ঐতিহ্য চেতনা, সংস্কৃতি চেতনা, বিজ্ঞান-ইতিহাস ও সাহিত্য-চেতনা প্রভৃতি থেকে প্রেরণা আহরণ একান্ত কর্তব্য। ঊনবিংশ শতাব্দির প্রথম দশক থেকে চল্লিশের দশক পর্যন্ত সারা উপমহাদেশের মুসলমানদের মনে যে জাতীয় ঐক্যবোধ, জাগরণ স্পৃহা আপন জাতীয় সত্ত্বার পরিচয় ফুটিয়ে তোলার আকাক্সক্ষা এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতিতে যে প্রতিষ্ঠা অর্জনের প্রয়াস তীব্র আবেগে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিল, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবোধের প্রেক্ষিতে সেই উদ্যম নিষ্ঠা ও কর্ম-চাঞ্চল্য একান্ত আবশ্যক হয়ে উঠেছে। আবশ্যক হয়ে উঠেছে আজ আবার নতুন করে ঘনিয়ে ওঠা বিভ্রান্তির, দিশাহীনতার দিগন্তের কালো আবরণ ভেদ করে আলোকবন্যা আবাহনের জন্য নতুন করে গর্জে ওঠা হাজার হাজার সিরাজীর।’
‘কবি গাজী শিরাজী যার লেখনী ও বাগ্মিতায় আগুন ঝরতো' শীর্ষক প্রবন্ধে কবি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘দেশের অন্যতম দ্বীপপাল ধর্ম, সাহিত্য, রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক মহাকবি, মহাবাগ্মী, অকুতোভয় সাংবাদিক, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত, মুসলিম রেনেসার কবি, ঔপন্যাসিক, যোদ্ধা, সমাজসংস্কারক, নারী জাগরণের অগ্রদূত, কৃষক নেতা, শিক্ষা ব্রতী, দেশপ্রেমিক, ধর্মীয় নেতা, আধ্যাত্মিক সাধক অনল প্রবাহের কারা লাঞ্ছিত অমর কবি গাজী - এ- বলকান মরহুম মওলানা আবু মোহাম্মদ সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী। তিনি দেশের প্রথম বিদ্রোহী কবি, যার লেখায় ঝরতো আগুন। নানা বিশেষণের তিনি ভূষিত হয়েছিলেন- বাগ্মী শ্রেষ্ঠ, কবিকুল- সূর্য; সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তাশীল লেখক, অগ্নি পুরুষ, পন্ডিত প্রবর, অনল বর্ষী বাগ্মী, বঙ্গকেশরী, সিংহ সাবক, বাগ্মী প্রবর, বাণী সাগর, জাতিবন্ধু, ইসলাম জগতের নেতা, আধ্যাত্ম সাধক ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত ছিলেন সিরাজগঞ্জের সিংহ সাবক বাংলার শিরাজী। গাজী ইসমাইল হোসেন শিরাজী সারা বিশ্বের অন্যায় শাসন শোষণের বিরোধিতা করেছেন, সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন। উপর্যুক্ত আলোচনা ও তার সমসাময়িক গবেষক, কবি- সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, সম্পাদকগণের তাকে নিয়ে মূল্যায়ন থেকে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে শিরাজী একজন স্বাধীনচেতা কবি ও পরাধীনতার শৃঙ্খলকে ভাঙ্গার বিদ্রোহী কবি।
মাত্র ৫২ বছর বয়সে ১৯৩১ সালের ১৭ জুলাই দুরারোগ্য পৃষ্ঠব্রণ রোগে আক্রান্ত হয়ে মুসলিম বিশ্বের এই মহান পুরুষ ইন্তিকাল করেন। জীবনের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত তিনি সর্বপ্রকার অনাচার, কদাচার, কুসংস্কার, অন্যায় ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সিংহের মত লড়ে গেছেন। না কোথাও কোন কারণে তিনি মাথা নত করেন নি। আজ সেই স্বাধীনচেতা কবির ৮৭তম মৃত্যুবার্ষিক। আসুন তার এই প্রয়াণ দিবসে আমরা শপথ নেই দেশপ্রেমিক হওয়ার! তার অমূল্যবান সাহিত্যকর্মসমূহের ব্যপক পঠণ ও গবেষণার দাবি রাখে।

ফররুখ আহমদ : স্বদেশপ্রেমিক ও বিপ্লবী কবি

ফররুখ আহমদ : স্বদেশপ্রেমিক ও বিপ্লবী কবি




ফররুখ আহমদ
স্বদেশপ্রেমিক ও বিপ্লবী কবি
মীম মিজান

ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যের এক শক্তিমান ও অনন্য দিকপাল কবি ব্যক্তিত্ব। মহাকবি, শিশু সাহিত্যিক, মুসলিম জাগরণের কবি, মানবতাবাদী কবি প্রমূখ পদবী দ্বারা সাহিত্যরস বোদ্ধা ও সমালোচকগণ কর্তৃক তিনি সমাদিত। মা, মাতৃভাষা ও দেশমাতৃকার প্রতি এই বিপ্লবী কবির ছিল অগাধ প্রেম ও প্রচ্ছন্ন আকর্ষণ। যুগসষ্টা এ কবি যশোর জেলার মাগুরা থানার মাঝআইল গ্রামে ১৯১৮ সালের ১০ জুন জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা পুলিশ ইন্সপেক্টর সৈয়দ হাতেম আলী। তাঁর মার নাম রওশন আখতার। বাবা মার দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন তিনি । তাঁরা তিন ভাই, দুই বোন।
মাঝআইল গ্রামের পাঠশালায় ফররুখ কিছুদিন পড়েছিলেন। ফারসি-জানা এক মহিলা বাড়িতে এসে তাঁকে ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন। তারপর কলকাতায় গিয়ে মডেল এম.ই.স্কুলে ভর্তি হন তিনি। এরপর কিছুদিন পড়েন বালিগঞ্জ হাই স্কুলে। বালিগঞ্জ হাই স্কুলে কবি গোলাম মোস্তফা তাঁর শিক্ষক ছিলেন। এর পর ফররুখ ভর্তি হন খুলনা জেলা স্কুলে। এই স্কুলে তাঁর শিক্ষক ছিলেন সাহিত্যিক আবুল ফজল ও কবি আবুল হাশেম। এই স্কুলের ম্যাগাজিনে ফরররুখ আহমদের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। এই স্কুল থেকেই ১৯৩৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন তিনি। কলকাতায় এসে রিপন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩৯ সালে রিপন কলেজ থেকে তৃতীয় বিভাগে আই.এ. পাশ করার পর ঐ বছরই কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শনে অনার্স নিয়ে বি.এ. তে ভর্তি হন। এরপর ১৯৪১ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজ ছেড়ে কলকাতা সিটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। তাঁর অধ্যাপকমন্ডলীর মধ্যে ছিলেন বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, প্রমথনাথ বিশী প্রমুখ। স্কুল-কলেজে তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিকার সত্যজিৎ রায়, অভিনেতা ফতেহ লোহানী, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তবে যেকোনো কারণেই হোক, শেষ পর্যন্ত বি.এ. পরীক্ষা দেননি তিনি।
কলকাতায় থাকাকালীন ফররুখ আহমদ অনেকগুলি চাকরি করেছেন। কিন্তু সবগুলিই ছিল স্বল্পস্থায়ী। ১৯৪৩ সালে আই.জি.প্রিজন অফিসে, ১৯৪৪ সালে সিভিল সাপ্লাইতে, ১৯৪৫ সালে মাসিক ‘মোহাম্মদী’-র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে এবং ১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে চাকরি করেন তিনি।
ঢাকা বেতারেই ফররুখ আহমদ দীর্ঘদিন চাকরি করেন। ১৯৪৮ সালের শেষ দিকে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা বেতারে প্রথমে অনিয়মিত হিসেবে এবং পরে নিয়মিত স্টাফ আর্টিস্ট বা নিজস্ব শিল্পী হিসেবে কাজ করতে থাকেন এবং আমৃত্যু ঢাকা বেতারে ষ্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে আপন খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন (লিলি)-এর সঙ্গে ফররুখের বিবাহ হয়। তৈয়বা খাতুনের বাবার নাম সৈয়দ মোহাম্মদ নূরুল হুদা। বিবাহের উদ্যোক্তা ছিলেন ফররুখ ও তৈয়বা খাতুনের নানা মোহাম্মদ হুরমাতুল্লাহ। তাঁর নিজের বিয়ে উপলক্ষে ফররুখ ‘উপহার’ নামে একটি কবিতা লেখেন। কবিতাটি ‘সওগাত’ পত্রিকায় অগ্রহায়ণ ১৩৪৯ সংখ্যায় ছাপা হয়। ফররুখ আহমদের ছেলে-মেয়ে ১১ জন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্য সাত সাগরের মাঝি (১৯৪৪), সিরাজাম মুনিরা (১৯৫২), নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১), মুহূর্তের কবিতা (১৯৬৩), হাতেমতায়ী (১৯৬৬), হাবেদা মরুর কাহিনী (১৯৮১) ইত্যাদি। পাখির বাসা (১৯৬৫), হরফের ছড়া (১৯৭০), ছড়ার আসর (১৯৭০) ইত্যাদি তাঁর শিশুতোষ রচনা।
সাহিত্যে বিশেষ অবদানে জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬০), প্রেসিডেন্ট পুরস্কার প্রাইড অব পারফরমেন্স (১৯৬১), আদমজী পুরস্কার (১৯৬৬), ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬৬), মরণোত্তর একুশে পদক (১৯৭৭), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৮০) লাভ করেন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মৌলিক প্রতিভাধর কবি ফররুখ আহমদ ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর, সন্ধেবেলা ঢাকায় ইস্কাটন গার্ডেনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
২৩শে জুন ১৭৫৭ সালের পলাশীর আর্মকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ঘষেটি বেগম ও মীর জাফরদের ষড়যন্ত্রের ফলে অস্তমিত হওয়ার ফলে বিপ্লবী কবি ফররুখ দেখেছেন ইংরেজ বেনিয়াদের শাসন ও শোষণের অবস্থা। এ দেশবাসীর জন্য স্বাধীনতা ছাড়া মুক্তি নেই। আরো উপলব্ধি করেছেন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানের জন্য সুযোগ্য নেতা প্রয়োজন। যে নেতা কোটি কোটি মজলুম মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারবেন তিনিই হলেন কবির কল্পনায় সৃষ্ট আদর্শ মহানায়ক পাঞ্জেরী। এক রূপক কবিতার মাধ্যমে তিনি প্রকাশ করলেন :
‘জাগো বন্দরে কৈফিয়তের তীব্র ভ্রুকুটি হেরি
জাগো অগনন ক্ষুধিত মুখের নীরব ভ্রুকুটি হেরি
দেখ চেয়ে দেখ সূর্য ওঠার কত দেরী, কত দেরী’
(পাঞ্জেরী: সাত সাগরের মাঝি।)
যদিও তিনি কবি তবে সত্যেন্দ্র নাথ রায়ের মতো তাঁর কাব্যে ছান্দসিক ব্যঞ্জনা না থাকলেও তাঁর কাব্যের পরতে পরতে বৈপ্লবিক আহ্বান লক্ষিত। তাই তো ছন্দে তিনি যাদুকর ছিলেন না, ছিলেন বিপ্লবী।
১৩৫০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ছিল ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী শাসক গোষ্ঠীর চাপানো একটি কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ। এ নিয়ে অনেক কবি কবিতা লিখেছেন। বিপ্লবী কবি ফররুখ আহমদের লেখা ‘লাশ’ এ ফুটে উঠেছে তার বাস্তব অবস্থা। কবি লিখেছেন :
‘মানুষের হাড় দিয়ে তারা আজ গড়ে খেলাঘর
সাক্ষী তার পড়ে আছে মুখ গুঁজে ধরনীর পর।’
[লাশ: সাত সাগরের মাঝি]
অধ্যাপক ড: মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান লিখেছেন : ‘লাশ’ তেরশ পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমিতে লেখা একটি অসাধারণ কবিতা।
সূতরাং ফররুখ আহমদ একজন প্রকৃতই বিপ্লবী কবি।
ব্রিটিশ-বেনিয়ারা এদেশ থেকে তাদের লোলুপতা ও অপশাসন তুলে লেজ গুটিয়ে চলে যাওয়ার পর ভারত বিভক্তি হলে পাক শাসকেরা রাষ্ট্রীয় ভাষা নিয়ে জোচ্চুরি করতে আরম্ভ করে। মায়ের কাছ থেকে শেখা অ, আ, ক, খ’র ভালোবাসার ১৯৫২’র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ফররুখ আহমদকে যথার্থই উদ্দীপ্ত করেছিল। ভাষা বিষয়ে তাঁর সচেতনতা অনেক আগেই দেখা গিয়েছিল। ‘উর্দু বনাম বাংলা’ নামক ব্যঙ্গকবিতায় (মোহাম্মদী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৫২) ১৯৪৫ সালেই তিনি তীব্র বিদ্রুপ হেনে লিখেছিলেন,
‘দুই শো পঁচিশ মুদ্রা যে অবধি হয়েছে বেতন/বাংলাকে তালাক দিয়া উর্দুকেই করিয়াছি নিকা'।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই প্রকাশিত তাঁর ‘পকিস্তান’ : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্যে (‘সওগাত’, আশ্বিন ১৩৫৪) তিনি দ্বিধাহীন জানিয়েছিলেন :
‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে এ নিয়ে যথেষ্ট বাদানুবাদ চলছে। আর সবচাইতে আশার কথা এই যে, আলোচনা হয়েছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, জনগণ ও ছাত্রসমাজ অকুণ্ঠভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছে। সুতরাং এটা দৃঢ়ভাবেই আশা করা যায় যে, পাকিস্তানের জনগণের বৃহৎ অংশের মতানুযায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্বাচিত হবে। যদি তাই হয়, তাহলে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে বাংলা ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে।’
তিনি ধর্মীয় কুসংস্কার ও পাকিস্তানের অপরিণামদর্শী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে কঠোর হাতে লেখনী পরিচালনা করেন। এভাবে যখন চলে আসে উত্তাল কাল ১৯৭১ সাল। তখন মাতৃভূমি বাংলাদেশে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। হাতে বন্দুক নিয়ে রণাঙ্গনে যুদ্ধ না করলেও তিনি স্বাধীনতার পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিলেন। তাঁর সম-সাময়িক অনেক লেখক ও বুদ্ধিজীবীকে দেখা গেছে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে ও দেশ স্বাধীনের পরে নিজেকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বলে প্রচার করতে। অথচ দেশপ্রেমিক এ বিপ্লবী কবির বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সর্বাতœক সমর্থন থাকার পরেও এখন তাঁকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
মহান কবি ফররুখ আহমদ অমর হয়ে থাকবেন যতদিন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকবে। আমরা কবি ফররুখ আহমদকে একজন ভাষা সৈনিক হিসেবে সম্মান জানাতে পার। মানবতাবাদী কবির অসংখ্য লেখা এখনো যা অপ্রকাশিত রয়েছে তা প্রকাশের ব্যবস্থা করা হোক এ কামনা করি।
কবি ফররুখ আহমদ সেইসব ভাগ্যবান কবিদের মধ্যে অন্যতম, যারা কালের মধ্যে বিচরণ করেও হয়েছিলেন কালোত্তীর্ণ। তিনি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং অকুণ্ঠ মূল্যায়ন পেয়েছেন, সংবর্ধিত হয়েছেন, ব্যাপকভাবে আলোচিত এবং উন্মোচিত হয়েছেন তাঁর অগ্রজ, সমসাময়িক, সময়-উত্তর-এমনকি আজকের শতাব্দীর এই প্রজন্মের লেখক, কবি, সমালোচক ও বিপুল-বিশাল পাঠকদের দ্বারা। ফররুখ আহমদ একটি কাল, এমনকি একটি শতাব্দীতেও যে নিঃশেষ হবার মত কবি নন-তাঁর এই দুর্বার চলমানতাই সেই স্বাক্ষর বহন করে। বিপ্লবী এ কবির মাতৃভাষা প্রেম এবং দেশ মাতৃকার প্রতি একনিষ্ঠ অনুরাগ তাঁর পাঠকমহল সহ সকলকেই আলোরিত করেছিল, করছে এবং করবে। তাঁর কাব্যপাঠে ঈপ্সা হয় ‘পাঞ্জেরী’র মতো একজন বিপ্লবী হতে। এ মহান কবির আজ শততম জন্মজয়ন্তী। এ দিনে তাঁর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। আসুন তাঁর শততম জন্মজয়ন্তীতে আমরা প্রত্যয় গ্রহণ করি একজন বিপ্লবী হওয়ার। একজন একনিষ্ঠ মাতৃভাষা প্রেমিক হওয়ার ও একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক হওয়ার।