ধারাবাহিক উপন্যাস : পর্ব ০১



জোছনা রাতে জাগে আমার প্রাণ
আবুল কালাম আজাদ

১.
অন্তর গল্প লিখতে বসেছিল।
গল্পের বিষয় বস্তু আগে থেকেই মোটামুটি ঠিক করা ছিল। সায়েন্স ফিকশন গল্প। ভিন গ্রহের একটা প্রাণীর সাক্ষাত পাওয়া যায়। সৌর জগতের ৫৮১ নামের তারা ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে একটা গ্রহ। এই গ্রহটি বিভিন্ন নক্ষত্র জগতের তুলনায় পৃথিবী থেকে যথেষ্ট কাছেই অবস্থান করছে। পৃথিবী থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২০ আলোক বর্ষ। এক আলোক বর্ষ সমান প্রায় ৯ লাখ ৪৬ হাজার কোটি কিলোমিটার। অর্থাৎ, আমরা যদি পৃথিবী থেকে এমন একটা নভোযানে চড়ি, যার গতিবেগ আলোর গতির দশ ভাগের এক ভাগ, তবে সেই গ্রহে পৌছুতে প্রায় ২০০ বছর লেগে যাবে।
সেই গ্রহের একজন অধিবাসী এই পৃথিবীতে এসে পড়েছে। সে যে স্বেচ্ছায় এসেছে তা নয়। তাদের গ্রহের একজন খারাপ মানুষ শত্রুতা করে তাকে পৃথিবীতে ফেলে রেখে গেছে। সেই ভিন গ্রহের অধিবাসীকে নিয়েই তৈরী হবে অন্তরের গল্প।
শেষ পর্যন্ত অন্তর ভিন গ্রহের প্রাণীটিকে ঘিরে কোনো নাটকীয়তা তৈরী করতে পারবে কি না, গল্পটা শেষ পর্যন্ত গল্প হয়ে উঠবে কি না এ ব্যাপারে      ওর মনে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সব সন্দেহ মনের মধ্যে রেখেই ও কাগজ-কলম নিয়ে বসেছে।
অন্তর যে লেখালেখি করে বা ওর ভেতর লেখক হওয়ার স্বপ্ন আছে তা নয়। ও গল্প লিখতে বসেছে নিতান্ত নিরুপায় হয়ে।
ওর স্কুলের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। রেজাল্ট বের হবে সপ্তাহ খানেক পরে। এই সপ্তাহ খানেক সময় ওর অবসর। তারপর তো নতুন ক্লাশ, নতুন বই। বাবা-মা চাইবে সবকিছু দূরে ঠেলে রেখে, ও শুধু বইয়ের পড়াগুলো    হাপুস-হুপুস গিলুক। বইয়ের পড়া হাপুস-হুপুস করে গেলা ছাড়াও যে জ্ঞান অর্জনের আরও পথ আছে সেটা কেউ বুঝতে চায় না।
অন্তরের ইচ্ছে ছিল এই অবসর সময়টায় কোথাও বেড়াতে যাবে। ঘরে বসে থাকলেই মাথায় আসে দুঃশ্চিন্তা। রেজাল্ট কেমন হবে, কততম প্লেস থাকবে-এরকম প্রশ্ন ভেসে উঠে মনে। এই অবসর সময়টায় মাথায় লেখাপড়া বিষয়ক কোনো চিন্তা আসুক ও তা চায় না।
বেড়াতে যেতে হলে বাবাই একমাত্র অবলম্বন। অন্তর বাবাকে বলল, বাবা, চলো কোথাও থেকে ঘুরে আসি।
কী!
বাবা এমনভাবে ‘কী’ বলল যেন অন্তর কানো বোমা বিস্ফোরন ঘটিয়েছে। অন্তর বলল, ফাইনাল পরীক্ষা হয়ে গেছে। স্কুল বন্ধ। এই অবসর সময়টা.......।
বাবা হাতের বইটা পাশে রেখে সোজা হয়ে বসল। বলল, তোর স্কুলে ফাইনাল পরীক্ষা আছে। ফাইনাল পরীক্ষার পর স্কুল বন্ধ হওয়ার রেওয়াজ আছে। আমার অফিসে এসব কিছু নেই। সাতশ’ ত্রিশ দিন পর রিক্রেশান লিভ পাব তখন আসিস, যাব কোথাও।
সাতশ’ ত্রিশ দিন! অন্তর মনে মনে হিসাব কষে দেখল সাতশ’ ত্রিশ দিনে হয় দুই বছর। দুই বছর পর বাবা রিক্রেশান লিভ পাবে, তখন বেড়াতে যাবে। ততদিনে ও আরও দু’টি ক্লাশ টপকে যাবে, শরীরে মাপও বাড়বে।
অন্তর বলল, তাহলে আমি এই অবসরে কী করবো?
নাই কাজ, কই ভাজ। যা খই ভাজগে।
খই ভাজা অন্তরের পক্ষে সম্ভব নয়। তার চেয়ে গল্প লেখাই ভাল।
অন্তর পড়–য়া ছেলে। পাঠ্য বইয়ের পাশাপাশি সে গল্প-উপন্যাস পড়ে খুব। বাংলা সাহিত্যে যারা শিশুতোষ লেখা লিখেছেন বা লেখেন তাঁদের প্রায় সবার লেখাই সে কম-বেশি পড়েছে। হুমায়ূন আহমেদ আর জাফর ইকবাল ভ্রাতৃদ্বয়ের অনেক বই ওর পড়া। তাঁদের সায়েন্স ফিকশানও পড়েছে বেশ। যা হোক, সে মনে মনে এরকম আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে যে, অন্তত একটা গল্প সে লিখতে পারবে।
গল্পের প্রথম লাইন অন্তরের মাথায় এসে গেছে। প্রথম লাইনটা হিট হয়ে গেলে নাকি পুরো গল্পটাই হিট হয়ে যায়। বড় একজন লেখকের ইন্টারভিউতে কথাটা পেয়েছিল সে।
লেখক বলেছিলেন, তাঁর যদি মনে হয় প্রথম লাইনটা মনের মত হয়নি, তাহলে তাঁর গল্প আর এগোয় না। সেই লাইনটাই মনের মধ্যে খোঁচাতে থাকে-তোমার প্রথম লাইনই তো যুতসই হয়নি, গল্প ভাল হবে কেমন করে?
অন্তরের প্রথম লাইনটা হল-একদিন চন্দ্রার বনে।
একদিন চন্দ্রার বনে কী? এরপর কী লিখবে তা সে জানে না। নিজে কোনোদিন চন্দ্রার বনে যায়ওনি। তারপরও সে এমন একটা লাইন দিয়ে গল্প শুরু করল কেন?
তবে লাইনটা লিখে সে মোটামুটিটি তৃপ্ত। এরপর যাই লিখুক গল্প এগিয়ে যাবে ভালভাবেই। আর ভিন গ্রহের প্রাণী নিয়ে গল্প লিখতে গেলে     বন-বাদার দিয়ে শুরু করাই ভাল। 
দ্বিতীয় লাইন লেখার আগেই দরজায় খটখট। খটখট বেশ জোরে।
গল্প লেখার সময় দরজায় খটখট অবশ্যই বিরক্তিকর ব্যাপার। বাসায় সবাইকে বলে নেয়া উচিত ছিল, আমি এখন গল্প লিখতে বসব, কেউ অন্তত ঘন্টা দু’য়েক দরজায় খটখট করবে না।
তবে তা বললে বোধহয় ব্যাপারটা আরও ঘোলাটে হয়ে যেত। মা বলত, ওমা! আমার বাপধন দেখি লেখক হয়ে যাচ্ছে। লেখক হুমায়ুন আহমেদ।
তারপর তার কৌতুহল আরও বেড়ে যেত। গল্পটার বিষয় কী, ছোট গল্প না বড় গল্প এরকম নানা বিষয়ে প্রশ্ন তুলত।
মা’র চেয়েও বেশি ঝামেলা করত মাজেদা। মাজেদা ওদের বাসার কাজের সহায়ক মেয়ে। কিন্তু বাবা ওকে বলে ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। ও না থাকলে নাকি এই বাসা চলত না। বাবা-মা’র কাছে মাজেদা গুরুত্বও পায় খুব।
মাজেদার একটা বদ অভ্যাস হল, তাকে যা করতে নিষেধ করা হবে সে তা হাজার বার করবে। সে এসে বলত, ভাইজান, পাওটা উঠায়ে বসেন, ঝাট দিব।
ঝাট দিয়ে চলে যাবার পাঁচ মিনিট পর এসে বলত, ভাইজান, টিস্যু পেপার হবে? নাক দিয়া খুব সিনাত ঝরতেছে।
টিস্যু পেপার নিয়ে যাবার পাঁচ মিনিট পর এসে বলত, ভাইজান, গল্প লেখা বাদ দেন। নাটক লেখেন। টিভিতে কী সব হাবিজাবি নাটক দেয়,     প্রেম-টেম ঠিক জমে না।
আর বাবা কী বলত বা করত অন্তর তা ভাবতে পারে না।
তৃতীয় বারের মত খটখট। অন্তর উঠে গিয়ে দরজা খুলল। তাকে পাশে ঠেলে দিয়ে বাবা ঘরে ঢুকল। ঘরে ঢুকে খাটের ওপর দুই পা তুলে বসে পড়ল। বললেন, কী করছিস?
গল্প লিখছি-এরকম একটা উত্তর দেয়া ঠিক হবে কিনা অন্তর তা বুঝতে পারল না। তাই সে সত্যটা চেপে গিয়ে বলল, কিছু না বাবা।
কিছু না? কিছু একটা তো অবশ্যই করছিলি।
তারপর বাবা তাকাল টেবিলে। সেখানে খাতা-কলম খোলা। চশমা নামানো। বাবা খাতাটা টেনে নিয়ে পড়ল, একদিন চন্দ্রার বনে।
তারপর বাবা চোখ বড় ও গোল করে তাকাল অন্তরের মুখে। বললেন, একদিন চন্দ্রার বনে কী? সেখানে কি ফ্লাইং সসার নেমেছিল? ভিন গ্রহের কোনো প্রাণী এসেছিল?
বাবার কথায় অন্তর খুশি হল। কারণ, সে গল্পের প্রথম প্লট পেয়ে গেছে। সে চন্দ্রার বনে ভিন গ্রহের প্রাণীকে নামাবে। অন্তর বলল, গল্প লিখছি বাবা।
গল্প লিখছি! গল্প লিখছি মানে কী?
গল্প লিখছি মানে গল্প লিখছি।
তোর কি লেখক হবার পরিকল্পনা আছে? জানিনি তো কখনো।
না, সেরকম কোনো পরিকল্পনা নেই।
তাহলে?
খই ভাজতে পারি না বলে একটা গল্প লিখতে বসলাম।
এরকম টাইম পাসের উদ্দেশ্যে গল্প লিখতে গিয়ে শেষে দেখবি ফেঁসে গেছিস।
ফেঁসে গেছিস মানে?
পৃথিবীতে অনেক বিখ্যাত লেখক আছেন, যাদের এইম ইন লাইফ ছিল অন্য রকম। কোনো কারণে কিছু লিখতে গিয়ে শেষে লেখক হয়ে গেছেন। লেখক হয়ে গেলে কিন্তু জীবন ত্যাজপাতা হয়ে যাবে। যে যত বড় লেখক তার জীবন তত বড় ত্যাজপাতা।
কেন, ত্যাজপাতা হবে কেন?
রাস্তা-ঘাটে বের হতে পারবি? পেছনে লেগে থাকবে সাংবাদিকের দল। তার সাথে থাকবে ভক্তবৃন্দ। আরও থাকবে প্রকাশকের দল। ইন্টারভিউ দাও, ছবি দাও, অটোগ্রাফ দাও, পান্ডুলিপি দাও। শুধু দাও আর দাও। ঠিক মত খেতে পারবি না, ঘুমাতে পারবি না, বাথরুমটাও সারতে পারবি না। তুই ভাত বাম হাত দিয়ে মুখে তুলিস, না ডান হাত দিয়ে মুখে তুলিস, পানি গিলে খাস, না চিবিয়ে খাস, বাসায় লুঙ্গি পড়িস, না পাজামা পড়িস সব বিষয়েই থাকবে তাদের সীমাহীন কৌতুহল। অটোগ্রাফ শিকারির কথা আর কী বলবো। একবার ঘেরাও করে ধরলে......। তুইও ফাঁসবি, আমাকেও ফাঁসাবি।
তুমি আবার ফাঁসবে কেন?
খুব বড় লেখক হয়ে গেলে সাংবাদিকরা কি আমাকে ছেড়ে কথা বলবে? বিখ্যাত লেখকের বাপ। ধর, আমি বাজার থেকে ফিরছি। ধরে বসল সাংবাদিক, আপনার ছেলের এতবড় লেখক হয়ে ওঠার পেছনে কোন জিনিসটা বেশি কাজ করেছে দয়াকরে বলবেন কি? আমিও বলতে শুরু করে দেব, বাড়িতে প্রথম থেকেই লেখালেখির আবহ ছিল। এটা আমাদের বংশগত। নজরুল, রবীন্দ্র, মানিক, বিভূতিভূষন সবাই তো আমাদের বাড়িতে ছিলই...
[ক্রমশ]

শেয়ার করুন

লেখকঃ

পূর্ববর্তী পোষ্ট
পরবর্তী পোষ্ট