মীম মিজান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মীম মিজান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বহুরূপী মানুষের নিপুণ চিত্রায়ণ

বহুরূপী মানুষের নিপুণ চিত্রায়ণ

 



বহুরূপী মানুষের নিপুণ চিত্রায়ণ 

মীম মিজান


মানুষ বহুবর্ণিল। এই বর্ণ তারাই দেখতে পান যাদের দেখার চোখ আছে। উপলব্ধির বোধ আছে। এমনই দেখার চোখ ও বোধসম্পন্ন ব্যক্তি হচ্ছেন শফিক সেলিম। কেননা তার সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘ন্যাশনাল কারিকুলাম এন্ড টেক্সটবুক অব  বোর্ড বাজার আইল্যান্ড’র পুরোটা জুড়ে এই মানুষের বহুরূপীতার চিত্রায়ণ হয়েছে নিপুণভাবে।


কাব্যগ্রন্থটির নাম কবিতাটি সচরাচর দেখা কবিতার থেকে ভিন্ন। পুরো কবিতাই সংলাপ। আসলে রাজনীতিক যারা তারা কীভাবে শোষণ করছে তারই এক নিপুণ চিত্র। এক লোক চুরি করে মানে পকেট মারে। মানুষ যখন রাস্তা পারাপারের জন্য আইল্যান্ডে দাঁড়ায় তখন তাদের দৃষ্টি থাকে শা শা বেগে ধাবিত লক্কর ঝক্কর গাড়ি ঘোড়া পেরিয়ে ওপারে যাওয়া। দৃষ্টি সেদিকেই নিবদ্ধ। এই ফাঁকে, চোর হাকে। চেইন খুলে, পকেট হাতড়ে সব নিয়ে নেয়। আমরাও রাজনীতির কাছে বন্দী। ইলেকশনে দাঁড়িয়ে জনপ্রতিনিধি আমাদের সবকিছুও ওভাবে হাতিয়ে নিচ্ছে। আমরা টের পাই না। যখন সম্বিত ফিরে, চোর ধরাছোঁয়ার বাইরে। চোরের কথার মাধ্যমে রাজনীতির সেই চোরা পথ বলছেন কবি:

: আইল্যান্ডে খাড়াইলেই?

: হ, খাড়াইলেই সব কিচু আমার।

: ক্যামনে?

: ইলেকশনে খাড়াইলেই যেমনে নেতারা দ্যাশের গুয়া মারে তেমনে’


এ কবিতায় তিনি বেশকিছু বিষয়ের খোলাসা করেছেন। যেমন শিক্ষিত হলে কী করে ব্যাংক ডাকাতি করা যায়। মেয়ে শিক্ষিতা হলে কার সাথে বিয়ে দিবেন এমন। চোরকে তাই কবির জিগ্যেস আর চোরের উত্তর:

: লেহাপড়া হিকলে কি করতি?

: ব্যাংক লোন নিতাম।

: তারপর?

: ক্যাসিনু খেলতাম, টাকিলা খাইতাম, গাড়ি নিয়া ঘুরতাম, মাগি...

: তর পুলারে কি করবি?

: লেখাপড়া হিকামু, বড়ো চোর বানামু

: তর ম্যায়ারে কি করবি?

: লেহাপড়া হিকামু, বড়ো চোরের কাছে বিয়া দিমু’


উন্নয়ন উন্নয়ন বলে যে জোয়ার। তারই নিচে মানুষ না খেতে পেয়ে, বিনে চিকিৎসায় মারা যায়। আর কিছু বললে চোখে কিছু দেখে না জনগণ। আর যতো সমালোচনা। এই সমালোচনার দারুণ মঞ্চায়নের কবিতা ‘তুমি মিয়া আজাইরা’। কবি বলছেন:

‘আন্দা নাহি তুমি?

‘এত্তো বিজলি বাত্তি, এত্তো ফালাই ওভার, বিলডিং, এত্তো উন্নয়ন কিচ্চু দেহো না?

গণভবন গিল্লা খাইবার চাও?’


আসলে গরীব মানুষেরা কি গণভবন গিলে খেতে চায়? পারবে কি? না। তারা চায় নাগরিক অধিকার। মৌলিক অধিকার, মানবিক জীবন যাপন। যা আমলা, রাজনীতিক আর পাতিরা খেয়ে বিদেশের ব্যাংক ভরেছে, সুরম্য বাড়ি গড়েছে। আবার যারা উচ্ছিষ্ট ভোগী তারাও কম যায় না। কাকের মতো চোখ বুঝে মহারাজের জয়গান করে। এমনই জয়গানের পঙ্ক্তি রচনা করে এসব নিকৃষ্ট মানুষের চরিত্র চিত্রায়ণ করেছেন এভাবে:

‘আমি সরকারি চাকরি করি

সরকার আমাগো খাওয়ায়

দ্যাশ বালো আচে’


শুধু কি আমলা বা সরকারি চাকুরে? অকবি, কুসাহিত্যিক, অপসংস্কৃতি সাধক এরাও কম যায় না। শিল্প যেমন তার স্বসময়কে ধারণ করবে তেমনই তা হবে গণমানুষের। কিন্তু এদের কোনও সৃজন মানুষকে ধারণ করে না। নারী শরীর, প্রেম, প্রকৃতির স্তুতি গাইতে গাইতে বেহুশ। কবি একই কবিতায় এসব মুখোশ আঁকছেন:


‘এহুন বরষা মাস-খালি প্রেমের কবিতা লেহুম

আর পুরোনো প্রেমিকার বিলাউজের মাপ কতো

তাই ভাবুম’

(দ্যাশ বালো চলচে...)


আইনের চোখ নাকি অন্ধ। কাউকে দেখতে পায় না। যার অপরাধ তারই শাস্তি হয়। দেশের সংবিধানও আইন। দেশের নাগরিকদের অধিকার রক্ষার আইন। কিন্তু সেই সংবিধান এখন দেখতে পায়। তার চোখে ক্ষমতাসীন, পুঁজিপতিরা নিষ্কলুষ। যত অপরাধ গরীব হয়ে জন্মানোতে, বিরোধী মত হওয়ায়। তাই সেই সংবিধানের প্রতি নিদারুণ খেদোক্তি কবির:

‘খাড়াইয়া মুততাচি

দেহি, ছেঁড়া বইয়ের পাতা

পাতার উপরে ল্যাহা ২৭ নম্বর আর্টিকেল 

উপরের ল্যাহা বাংলাদেশের সংবিধান’

(আমাগো সংবিধান) 


সংবিধানে অধিকার সংরক্ষিত থাকলেও তার বাস্তবায়ন না থাকায় দেশের সব মানুষই সমালোচনা করে। বিশেষ সমালোচনার স্থান চায়ের দোকান। এক কাপ চা, আর গ্যালন গ্যালন সমালোচনা। এমনই সমালোচনায় বস্তি থেকে সংসদ ভবন এমনকি জাতিসংঘ ও মার্কিন মুলুকও উঠে আসে। কবির কাব্য পঙ্ক্তি বরাবরই নির্মম সমালোচনায়। এমনই নির্মম সমালোচনায় নাকানিচুবানি খাচ্ছেন রাঘববোয়ালরা। দায়িত্বশীল ব্যক্তির উক্তি ছিলো ‘সরল বিশ্বাসে ঘুষ খাওয়া যাবে।’ কবি তাই বলছেন:

‘দুর্নীতি কিচু না

সরল বিশ্বাসে করেন, ক্ষমা পাইবেন

তবে ভুলেও কিন্তু ইচ্চাকিত দুর্নীতি করবেন না

সুযোগ লুইট্যা ন্যান। দ্যাশ যাইক গুয়া মারা’

(চাওয়ালা)


বইটি দুটো ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে ছয়টি কবিতা। আর দ্বিতীয় ভাগ অর্থাৎ ‘সোনার মাকড়ি’ অংশে আছে আঠারোটি কবিতা। দ্বিতীয় অংশের কবিতাগুলোতে কবি নিজের ব্যক্তি জীবনের কথা বলেছেন। কিন্তু ব্যক্তিকে বিশ্বের একজন করে তুলে প্রকাশভঙ্গী এমন করে দিয়েছেন যা হয়েছে সব মানুষের। সবার জীবনের প্রতিচ্ছবি। এককথায় গ্রন্থটিকে বলা যায় মানুষের আয়না। সে প্রান্তিক হোক আর ভুড়িওয়ালা মালদার হোক সবাই স্থান করে নিয়েছেন এখানে। যে গরুর চামড়া ত্রিশটাকা বিক্রি হয় সেই চামড়ার জুতো গুলিস্থানের সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেটে বিক্রি হয় হাজার টাকার উপরে। প্রান্তিক শ্রমিক তাই ভেবে দিশেহারা। এরূপ চেটেপুটে খাচ্ছেন সবাই। সে প্রসঙ্গ ও বুনন হামেশাই দেখা যায়। 


‘সোনার মাকড়ি’ কবিতাটিও গরীব-প্রান্তিক মানুষের। মায়ের সম্পদ বলতে একজোড়া সোনার মাকড়ি। তাই বারংবার সুদে বন্ধক রাখতে হয় স্থানীয় স্বর্ণকারের কাছে। কেননা পরীক্ষার ফি দেয়ার সামর্থ্য নেই মায়ের। পরে নিতান্ত কষ্টে মাকড়ি জোড়া ফেরত নেয়ার টাকা জোগাড় করেন মা। এ যেনো সারা বাংলাদেশের মেটে মজুরের চিত্র।


বোধসম্পন্ন কবি ‘হাসপাতাল’ নামক কবিতায় মানুষের জীবনের দু’টি কান্নার কথা বলেছেন। একটি কান্না বাবা মারা যাওয়ার। আরেকটি নতুন শিশুর ওয়াও। বোধের খোঁজ করতে বলেছেন ‘মানুষের সময় হয় না’ কবিতায়। নিজেকে জানা সব থেকে বড় কাজ। কবি বলছেন:


‘শকুন বদলায়ে যায়। মানুষের সময় হয় না

নিজেকে দেখার।’


কৃষকদের নিয়ে দু’টো কবিতা লিখেছেন তিনি এখানে। কৃষকদের মহত্ত্ব তুলে ধরেছেন মমত্ববোধের কবি:


‘কৃষকের প্রাণ নিয়ে ধানেরা বয়স্ক হয়

তাই, কৃষকের চেয়ে বড়ো কোন ভগবান দেখি না’

(কৃষক)


বঞ্চিত করছি প্রান্তিক মানুষকে। আর পাহাড়, বন-বনানী, প্রকৃতিকে নিজেদের বিলাসিতার জন্য ছেটে-কুটে শেষ করছি। কিন্তু তাতে নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়োল মারছি। কেননা এই প্রকৃতিতেই আমাদের বাস। তাদের ধ্বংসে নিজেদেরই সর্বনাশ। কবি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন:


‘আপনি দেখলেন

আপনি মূলত খেয়েছেন আপনার নিজের হাত, পা এবং হৃৎপি-’

(আপনি একজন মানুষ) 


মানুষ। এই মানুষই আবার শ্রেষ্ঠ দুশমন মানুষের। জাত-পাতের জন্য কত্ত যে মানবের কবর রচিত হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। কবি ‘নাম’ শীর্ষক কবিতায় এ বিষয়টি পরিস্ফুটন করেছেন। দায়। পিতার দায়। মাতার দায়। সন্তানের দায়। কিন্তু এই দায় শুধু পিতা-মাতারাই করে যাচ্ছি। আবার সন্তান হিশেবে পিতা-মাতার দায় এড়িয়ে যাচ্ছি। তাদের ইহধাম ত্যাগে পাবো স্বস্তি। সমস্যা নেই আমাদের ইহধাম ত্যাগের আকুল প্রত্যাশি হবে আমাদের সন্তান। এমনই বিষয়বস্তু ‘বিক্রি’ ও ‘বাবা’ কবিতার। সবচেয়ে বড় চপেটাঘাত দিয়েছেন কবি আমাদের দুই গালে। পঙক্তি দু’টো :

‘পাঁচ ভাইবোন মিলে পরামর্শ করি

বাবা মাকে বিক্রি করলে কেমন হয়’

(বিক্রি)


আমরা কি মানুষ হবো না। না দু’পেয়ে জন্তু হিশেবে থেকে যেয়ে হাম্বা হাম্বা ডাক দিয়ে খেয়ে দেয়ে ঘুরবো? তবে এ মানুষের স্থান লোকালয়ে না হয়ে হোক আমাজনে। আর যদি সত্যিকারের মানুষ হতে পারি তাহলে লোকালয় হবে শেখ ফজলল করীমের কাব্যের স্বর্গ।


ভাষার ব্যবহারে কবির অকৃত্রিমতা লক্ষণীয়। ঠিক যেনো শহীদুল জহিরের গল্পের প্রান্তিক থেকে সংসদ ভবনের বাসিন্দারা কথা বলছে। প্রচ্ছদটি উপলব্ধির জন্য পুরো কাব্যগ্রন্থের শব্দে শব্দে পরিভ্রমণ দরকার। কবি মমিন মানব ফ্ল্যাপে যে কথাগুলো লিখেছেন তা কাব্যগ্রন্থের সারাৎসার। মজার বিষয় কোনও যতিচিহ্ন ব্যবহার করেন নি মমিন। আর একটি বিষয় হচ্ছে যে, যত প্রাতিস্বিক কবি আছেন তাদের কবিতায় ছন্দ আছে। আছে অলংকার। শফিক সেলিমের সব কবিতাই গদ্য। গদ্যের মধ্যে একটি স্বাদ আস্বাদিত হলেও ছন্দের অন্যান্য বিষয়গুলো আমার দৃষ্টিতে পড়ে নি। আমার পরামর্শ থাকবে, কবিতার ভাব, ভাষা, আবহ ও বুননে তার যে দক্ষতা সেখানে যদি ছন্দ ও অলংকার যোগ হয় তাহলে আরও মনোহর হবে কাব্য কানন।


প্রকাশক: বাংলা জার্নাল 

প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি-২০২০

প্রচ্ছদ: রাজীব দত্ত

মূল্য: ১৩৫ টাকা


কুর্দিস্তানি কবি শেরকো বিকাস’র যুদ্ধের ভয়াবহতার কবিতা

কুর্দিস্তানি কবি শেরকো বিকাস’র যুদ্ধের ভয়াবহতার কবিতা


কুর্দিস্তানি কবি শেরকো বিকাস’র যুদ্ধের ভয়াবহতার কবিতা

ভূমিকা ও বাঙলায়ন: মীম মিজান

শেরকো বিকাস একজন কুর্দিস্তানি নির্বাসিত কবি ও স্বাধীনতাকামী নেতা। তিনি ইরাকের কুর্দিস্তানে ১৯৪০ সালের ২রা মে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ফায়েক বিকাস ছিলেন কুর্দিস্তানি প্রখ্যাত কবি ও স্বাধীনতাকামী মানস। মাত্র ১৭ বছর বয়সে শেরকো’র কাব্য প্রকাশ হয়েছিল। তিনি কুর্দিস্তান মুক্তি আন্দোলনের রেডিও ‘দ্য ভয়েস অব কুর্দিস্তান’ এ কর্মরত ছিলেন। তাকে কুর্দিস্তান থেকে একাধিকবার নির্বাসিত হতে হয়েছিল ইরাকি সরকারের চাপে। বিশটির অধিক কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন তিনি। ‘দিওয়ানে শেরকো’ নামে তার কাব্য সংকলন দু’খণ্ডে প্রকাশ হয়েছে। তিনি ১৯৮৭ সালে স্টকহোমের পেন ক্লাবের পক্ষথেকে ‘তুচোলস্কি স্কলারশিপ’ এবং ‘ফ্লোরেন্স সিটি স্বাধীনতা পদকে’ ভূষিত হন। তার কবিতা আরবি, সুইডিশ, ড্যানিশ, ডাচ, ইতালিয়ান, ফরাসি, ইংরেজিসহ বিশ্বের অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি সারাবিশ্বের কাছে মুক্তিকামী জনতার প্রতীক, নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর, জালিমের শোষণের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠ হিশেবে পরিচিত। শেরকো সুইডেনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকাকালীন ৪ আগস্ট ২০১৩ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। শেরকো’র নিম্নোক্ত কবিতাটি ‘ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রাম’ থেকে চয়িত হয়েছে। কুর্দিশ থেকে ইংরেজিতে ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ চাওছাওয়া ও এ. এম. ল্যাভিন্সন-লা ব্রোজ।

সাময়িক ব্লক

সাময়িক ব্লক


সাময়িক ব্লক
ইয়াকুব শাহরিয়ার

নীলা আজকেসহ আমাকে ফেসবুকে পাঁচশ বার হবে ব্লক করলো। খুব সামান্য ব্যাপারে এমনটা হয়। পরে নিজে থেকেই আবার ব্লক খুলে দেয়। এবার আর সেটা হবে বলে মনে হচ্ছেনা। অন্যান্যবার আমি কল দিয়ে বুঝিয়ে বলি তারপর ব্লক খুলে। এবার তার উল্টোটা করেছি। তার ফোন নাম্বারটাই আমার ফোনবুক থেকে ডিলিট করে দিয়েছি। নীলা আমার তিন বছরের জুনিয়র। অনার্স ২য় বর্ষে ইকোনোমিক্সে পড়ে। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে। ইন্টারমিডিয়েটের ২য় বর্ষে পড়ার সময় আচমকা পরিচয় হয়ে প্রেম। তাই হয়তো ইমোশান খুব একটা কাজ করে না। সম্ভবত হঠাৎ করে হয়ে যাওয়া প্রেমে ইমোশান কমই থাকে।

সুনামগঞ্জের পথঘাট আমার চেয়ে ভালোই চিনে নীলা। কলেজ রোডে তাদের বাসা হওয়ায় ওদিকটায় তার সাথে খুব একটা সময় কাটানো হয়নি। ইদানিং দেখা করবার জন্য খুব চাপ দিচ্ছিলো। আমি যাবো যাবো করে অনেকটা সময় পার করে দিয়েছি। আর না যেয়ে পারছিই না। যেতেই হবে। না হলে ব্যাকআপ। ব্যাকআপ শব্দটা তার কাছে পান্তাভাতের মতো। যখন তখন বলে ফেলে। যেনো কিছুই না ব্যাপারটা। আমাকে মেনটেন করে চলতে হয়। যখন মাথা ঠান্ডা হয় তখন বলে- ‘আমু, আমি তোমার সোনাবউ না? আমাকে বিয়ে করবানা? বিয়ের পরেও এসব করবো, তোমাকে কিন্তু মেনটেন করে চলতে হবে। আমি তোমাকে খুব বেশি ভালোবাসি। সত্যি বলছি, তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না।’ অনেকবার এসব বলে কেঁদেছে। আমিও খুব ভালবাসি নীলাকে। সুন্দরী বলতে যা যা গুণ থাকা দরকার সবটাই ওর আছে। আমার কালো চেহারায় খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি থাকবে সেটাই পছন্দ ওর। একটু লম্বা হলেও চলবে। দেখতে কবি সাহিত্যিকদের মতো লাগবে। তবে লেখালেখি করি একদমই চায় না। কবিতা নীলার কাছে সতীনের মতো। এর কারণ জানিনা।

ঘুম থেকে উঠে খবরের কাগজের জন্য আগের দিন রেডি করা একটা আর্টিক্যাল লিখে শেষ করেই বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য হালুয়ারঘাটের সুরমাভ্যালিতে। নীলা সেখানেই আসবে। হাছননগরের বাসা থেকে বেরিয়ে আমাকে কল দিয়ে জানিয়েছে। একটা ছেলে বন্ধুও যাবে ওর সাথে। সাহেদ। দু’জন একসাথে দেখা করে আমাকে ম্যাসেঞ্জারে বলল ‘ডব ধৎব ৎবধপযবফ যবৎব.’ আমিও গতি বাড়াই। নিজের কালো রঙের বাইকে করে দ্রুত পৌঁছে যাই সুরমাভ্যালিতে।

ইচ্ছে করেই গেইটের বাইরে বাইক লক করে রেখে দ্রুত চলে যাই ভিতরে। সেখানে গিয়ে চোখকে বিশ্বাস করাতে পারছি না যে এটা কেমন করে হয়। চোখ কচলাতে শুরু করলাম। ভয়ে ভয়ে সামনে এগিয়ে দেখলাম। না, যা দেখছি তা সত্যিই। নীলা সাহেদের হাত ধরে হাটছে। প্রেমিক-প্রেমিকাদের মতো। সমস্ত শরীর ঘামতে থাকে। দ্রুত ছোটে যাওয়াতে যে এমনটা দেখতে হবে তা কোনো ভাবেই মানতে পারছিলাম না। ভীষণ ভালোবাসি নীলাকে। তাকে কখনোই হারাতে না চাওয়ার ভয়টাই আমার সমস্ত শরীরে কাঁপুনী ধরিয়ে দিয়েছে। ব্যাপারটা ভীষণ দুর্বিষহ ছিলো। শরীর ভীষণভাবে কাঁপছে। মানতে পারছি না। বিড়বিড় বলতে লাগলাম, না এমনটা হতে পারে না। হতে পারে না। আমি ভুল দেখছি। নীলা আমার সাথে এমনটা করতে পারে না। শরীরের এমন কাঁপুনী ও বিড়বিড়ানিতে ঘুম ভেঙ্গে যায় শাওনের। আমু, এ্যাই আমু! বলে ডাকতে লাগলো শাওন। শাওন আমার রুমমেট। একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে সে। তার ডাকে আমি থতমত খেয়ে চোখখোলি। সব কিছু চিমচাম। আবচা আলো রুমের মধ্যে। আমার মুখের উপর শাওনের চ্যাপ্টা মুখ। হাত দিয়ে ঠেলে তাকে সরালাম। উঠে বসার পর বুঝতে পারলাম যে, স্বপ্ন দেখেছি।

ঘুম ঘুম চোখে ফোন হাতে নেই। ম্যাসেঞ্জারে কতকিছু লিখে নীলার অনেকটা ম্যাসেজ। বিশটার বেশি কলও দিয়েছিলো। ড্যাটা অফ করে ফোন সাইলেন্ট মুডে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। যখন নক করতে যাবো তখন দেখি আমি ব্লক্ড। ফোনেও কন্টিউ বিজি...

স্বাধীনচেতা কবি : সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী

স্বাধীনচেতা কবি : সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী


স্বাধীনচেতা কবি
সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী

মীম মিজান

যে জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য সোনার অক্ষরে লিপিবদ্ধ। কেন সেই জাতি আজ নিগৃহীত-লাঞ্চিত? যারা ছিল শাসক ও উত্তম রাষ্ট্রনেতা, কেন তারা আজ শোষিত, পরাজিত ও করুণার পাত্র প্রজা? সেই নিগৃহীত জনগোষ্ঠীটি হলো দিবানিদ্রারত আয়েশী জীবনের পাবন্দ অলস-অকর্মণ্য মুসলিম সমাজ। সেই চোখখুলে দিবানিদ্রারত মুসলিম সমাজকে ডেকে যাচ্ছেন একজন স্বাধীনচেতা মানুষ ও কবি তার নাম হলো সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন শিরাজী। তার আহ্বানটি ছিল,
‘আর ঘুমিও না নয়ন মেলিয়া,
উঠরে মোসলেম উঠরে জাগিয়া,
আলস্য জড়তা পায়েতে ঠেলিয়া,
পূত বিভূ নাম স্মরণ করি।’
উপমহাদেশের প্রখ্যাত সেই ঐতিহ্যবোধের কবি ইসমাঈল হোসেন শিরাজী ১৮৮০ সালের ১৩ জুলাই তারিখে তৎকালীন পাবনা জেলার অন্তর্গত সিরাজগঞ্জ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার সম্পূর্ণ নাম ছিল গাজী - এ- বলকান মওলানা আবু মোহাম্মদ সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী। ( কবি পৈৗত্র পীরজাদা সৈয়দ মুনীর উদ্দৌলা শামীম শিরাজী)। এখানে উল্লেখ্য যে, তার পরিবারের সদস্যগণ শিরাজী বানানে তার পদবি উল্লেখ করেছেন। তাই আমি শিরাজী বানান সিরাজী লিখিনি। উৎস হিসেবে তার পৌত্রের লেখা তাকে নিয়ে অনেকগুলো প্রবন্ধ দেখা যেতে পারে। তার বাবার নাম সৈয়দ আবদুল করীম এবং মাতার নাম নুরজাহান বেগম। তারা উভয়েই ছিলেন অত্যন্ত দ্বীনদার ও পরহেজগার মানুষ।
শিশু ইসমাইল হোসেনের লেখাপড়ার প্রথম সবক দেন তার মা নূরজাহান খানম। নূরজাহান খানম তার শিশুপুত্রকে প্রথমেই কোরআন শিক্ষা দেন। কোরআন শিক্ষা শেষ হলে তাকে মধ্য ইংরেজী স্কুলে ভর্তি করা হয়। মেধাবী ইসমাইল হোসেন অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে মধ্য ইংরেজী বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে সিরাজগঞ্জের বিএল উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও দারিদ্র্যের কারণে এ সম্ভাবনাময় তরুণ লেখাপড়ার ক্ষেত্রে আর অগ্রসর হতে পারেন নি। তাছাড়া স্বদেশের পরাধীনতা, সমগ্র মুসলিম জাহানের দুর্দশার জন্য বেদনাবোধ হতে সৃষ্টি উৎকন্ঠাও তাঁকে স্কুলের চার দেয়ালের মধ্যে বসে থাকতে দেয় নি।
তিনি এ সময়ে নির্যাতিত অবহেলিত, লাঞ্চিত ও পদদলিত মুসলিম জাতির জন্য বেদনাবিধুর, এতই ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন যে, মাত্র ১৬ বছর বয়সেই লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে তুরস্কের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। এ যাত্রায় তিনি তুরস্কে যেতে পারেন নি ঠিক কিন্তু সেই যে মুসলিম জাহানের কল্যাণের মানসে ঘর হতে বের হলেন আর কখনই সুবোধ বালকের মত ঘরে বসে থাকেননি। অবশ্য তিনি পরবর্তীকালের তার বাল্যকালের স্বপ্নের তুরস্কে গিয়েছিলেন তা অনেক পরের কথা।
ইসমাইল হোসেন শিরাজীর সবচেয়ে পরিচিত কাব্যগ্রন্থ হল ‘অনল প্রবাহ’। এটি ১৮৯৯ সনে মুনসী মেহেরউল্লা প্রথম প্রকাশ করেন। পুস্তিকাটি এত জনপ্রিয় ছিল যে ১৯০০ সালে আরো কিছু কবিতা নিয়ে কাব্যগ্রন্থটি আবার প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯০৮ সালে এটি পূর্ণাঙ্গ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে প্রকাশিত হয়। আর এ সময়ই ‘অনল প্রবাহ’ ও লেখক বৃটিশ রাজশক্তির আক্রমণের শিকার হন। ‘অনল প্রবাহ' বাজেয়াপ্ত হয় এবং লেখকের দু’বছর কারাদন্ড হয়। তিনিই প্রথম কবি যার কাব্যগ্রন্থ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয় এবং তিনিই বৃটিশ রাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগে কারাদন্ড ভোগকারী উপমহাদেশের প্রথম সাহিত্যিক।
মুসলমানদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক ও মিথ্যা অপপ্রচার করতো তখন হিন্দু কবি সাহিত্যিকরা। বিশেষ করে চরম মুসলিম বিদ্বেষী ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার লেখায় সুপরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের হেয় করার চেষ্টা করতেন। ইসমাইল হোসেন সিরাজী এ সমস্ত কুৎসিৎ লেখার জবাব দিতে গিয়ে উপন্যাসও রচনা করেন। তার উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে তারাবাই, ফিরোজা বেগম, নুরুদ্দীন, রায়নন্দিনী ও বংকিম দুহিতা। না, জবাব দিতে গিয়ে শিরাজী প্রতিআক্রমণ বা সাম্প্রদায়িক উস্কানি বেছে নেননি। সুন্দর ও যুক্তিপূর্ণ ভাষায় উপন্যাসে তার ক্ষুরধার লেখনীর মাধ্যমে জবাব দিয়েছেন। ইসমাইল হোসেন শিরাজীর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘রায় নন্দিনী’।
শিরাজী রচিত কাব্য, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী ও সঙ্গীত বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থের সংখ্যা ৩২টি।
এগুলোর হচ্ছে, কাব্যগ্রন্থ: উচ্ছ্বাস (১৯০৭), নব উদ্দীপনা (১৯০৭), উদ্বোধন (১৯০৮), স্পেন বিজয় কাব্য (১৯৮৪), মহাশিক্ষা কাব্য প্রথম খন্ড (১৯৬৯), মহাশিক্ষা কাব্য দ্বিতীয় খন্ড (১৯৭১)।
উপন্যাস: রায়নন্দিনী (১৯১৫), তারাবাঈ (১৯১৬), নূরউদ্দীন (১৯১৯)।
প্রবন্ধ গ্রন্থ: মহানগরী কর্ডোভা (১৯০৭), স্ত্রীশিক্ষা (১৯০৭), আদব কায়দা শিক্ষা (১৯১৪), সুচিন্তা প্রথম খন্ড (১৯১৬), তুর্কি নারী জীবন (১৯১৩)।
ভ্রমণ কাহিনী: তুরস্ক ভ্রমণ (১৯১৩)। সঙ্গীত গ্রন্থ- সঙ্গীত সঞ্জীবনী (১৯১৬), প্রেমাঞ্জলী (১৯১৬) প্রভৃতি।
অপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ: সুধাঞ্জলী, গৌরব কাহিনী, কুসুমাঞ্জলী, আবে হায়াৎ, কাব্য কুসুমোদ্যান, পুস্পাঞ্জলী।
অসমাপ্ত উপন্যাস: বঙ্গ ও বিহার বিজয় এবং জাহানারা।
গোটা বিশ্বের মধ্যে প্রথম মুসলিম কবি কে? যিনি কবিতা লেখার অভিযোগে দুই বছর সশ্রম কারাদন্ড ভোগ করেছিলেন, দেশের কোন কবি বাগ্মীশ্রেষ্ঠের মৃত্যুর পর তুরস্কের জাতির জনক মোস্তাফা কামাল আতাতুর্ক প্রথম শোক বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কোন বিদ্রোহী কবির বই বাজেয়াপ্ত করার পর ব্রিটিশ ম্যাজিষ্ট্রেট মিঃ লয়ের তার পারিবারিক লাইব্রেরী পরিদর্শন করে নির্দ্বিধায় নিঃসঙ্কোচে দৃঢ় কন্ঠে বলেছিলেন, গজ. ঝঐওজঅতঊঊ ঘঙঞ ঙঘখণ অ ঘঅঞওঙঘঅখ চঙঊঞ অঘউ এজঊঅঞ ঙজঅঞঙজ ইটঞ অখঝঙ অ এজঊঅঞ ঝঈঐঙখঅজ (শিরাজী শুধুমাত্র একজন জাতীয় কবি এবং উচ্চস্তরের বাগ্মীই নয় একজন বিরাট পন্ডিতও বটে)। হ্যাঁ! তিনিই আমাদের শিরাজী।
১৯৪০ সালের ২২ মার্চ কলিকাতা ২/১ ইউরোপিয়ান অ্যাসাইলাম লেনে, সিরাজী পাবলিক লাইব্রেরী ও ফ্রি রিডিং রুম- এর উদ্বোধন করা হয়। উক্ত দ্বারোঘাটন অনুষ্ঠানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম প্রদত্ত সভাপতির ভাষণে বলেন, ‘সিরাজী সাহেব ছিলেন আমার পিতৃতুল্য। তিনি আমাকে ভাবিতেন জ্যেষ্ঠ পুত্র-তুল্য। তাঁহার নিকট যে স্নেহ আমি জীবনে পাইয়াছি তাহা আমার জীবনের পরম সঞ্চয়। ফরিদপুর কনফারেন্সে তাঁহার সহিত আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়। তাঁহার সমগ্রজীবনই ছিল অনল প্রবাহ এবং আমার রচনায় সেই অগ্নি স্ফুলিঙ্গের প্রকাশ আছে। সাহিত্যিক ও রাজনীতিক ছাড়াও আমার চোখে তিনি প্রতিভাত হয়েছিলেন এক শক্তিমান দরবেশ রূপে। মৃত্যুকে তিনি ভয় করেন নাই, তুরস্কের রণক্ষেত্রে তিনি সেই মৃত্যুর সঙ্গে করিয়াছিলেন মুখোমুখি। তাই অস্তিমে মৃত্যু তাঁহার জন্য আনিয়া দিয়াছিল মহাজীবনের আস্বাদ।’
পল্লীকবি জসিমউদ্দিন শিরাজী স্মরণে লেখেন (হোসেন মোহাম্মদ সম্পাদিত সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজীর সংকলন ১৯ পৃষ্ঠা) ‘সকালবেলা শিরাজী সাহেবের নিকট হইতে বিদায় লইয়া বাড়ি ফিরিবার সময় তিনি আমার হাত ধরিয়া বলিলেন, ‘জসীম! তুমি ত কবি! কবিরা নাকি দেশের দূর-ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। বলতে পার আমার এই আজন্ম সাধনা কি একদিন সফল হবে? আমি নিজের জন্যে সম্মান চাইনে, অর্থ সম্পদ চাইনে, আমি চাই এই ঘুমন্ত জাত আবার মাথা নাড়া দিয়ে জেগে উঠুক- সিংহ গর্জনে হুঙ্কার দিয়ে উঠুক। আমি চাই এমনই একটি মুসলিম-সমাজ, যারা বিদ্যায়, সাহিত্যে, সাহসে, আত্মত্যাগে কারুর চাইতে পিছপা হবে না। যা কিছু মিথ্যা, যা কিছু অন্ধ কুসংস্কার তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। দেশের মেয়েদের পরদায় আবদ্ধ রেখে তাদের কাছ থেকে দুনিয়ার আলো-বাতাস বন্ধ করে রাখবে না স্বাধীন সজীব একটি মুসলিম জাতি। বলত জসীম! একি আমি দেখে যেতে পারব?
আমি বলিলাম, ‘আপনি আজীবন সাধনা করেছেন আমাদের জন্যে। আমাদের অনাগত জীবনের সাধনায় আপনার সেই স্বপ্নকে আমরা রূপ দেব। নিশ্চয় আপনার স্বপ্ন সার্থক হবে।’
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বড় দুর্ভাগ্য যে আমাদের রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা মহান পুরুষ শিরাজীকে হীনমন্যতার কারণে মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ। দেশের মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পাঠ্যসূচিতে শিরাজী রচনাবলী উপেক্ষিত। শিরাজীর লেখা থেকে বঞ্চিত এদেশের শিক্ষার্থীরা। শিরাজী সম্পর্কে তরুণ সমাজকে জানতে দেয়া হচ্ছে না। অথচ শিরাজীর অনলবর্ষী  বক্তৃতায় প্রকম্পিত হয়েছিলো ব্রিটিশ সিংহাসন। তার কণ্ঠ ও লেখা থেকে বারুদের গন্ধ বের হতো। তার বক্তৃতায় জেগে ওঠেছিলো লাখো লাখো তরুণ। সেখানে মুসলিম বা হিন্দু বলে কোনো প্রশ্নের সৃষ্টি হয় নাই। ব্রিটিশ রাজ শুধু তাকে কারাবন্দীই করেনি, তার কবিতাও নিষিদ্ধ করেছিলো। সেই স্বাধীনচেতা মহাকবিকে স্বাধীন রাষ্ট্রের কর্ণধাররা অবমূল্যায়ন করছেন।
যারা মুসলমানদেরকে লাইভস্টক বা গৃহপালিত পশু বলে আখ্যায়িত করছে, যারা আমাদেরকে কাক পক্ষী, দস্যু, তস্কর, দানব, অসুর, অনার্য, ইতর, নরপশু, ডাকাত বলে গালি দিয়েছে তাদের জন্ম-মৃত্যু বার্ষিকী ঘটা করে পালন করা হয়। তাদের লেখা গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, নাটক পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের। অথচ শিরাজীর মত মহানায়কের রচনাবলী পাঠ্য বহির্ভূতই থেকে যাচ্ছে। বর্তমান বাংলাদেশের ক্রান্তিকালীন দুর্বিষহ অবস্থার প্রেক্ষিতে শিরাজীর মতো বিপ্লবী পুরুষের প্রসঙ্গ টেনে আনা অতীব জরুরী।
ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এস. এম. লুৎফর রহমান লিখেছেন, ‘বাংলাদেশী জাতি সৃষ্টির এই গঠনকালে সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজীর উদারতা, দৃঢ়তা, অসাম্প্রদায়িকতা, স্বাতন্ত্র্যবাদ, ঐতিহ্য চেতনা, সংস্কৃতি চেতনা, বিজ্ঞান-ইতিহাস ও সাহিত্য-চেতনা প্রভৃতি থেকে প্রেরণা আহরণ একান্ত কর্তব্য। ঊনবিংশ শতাব্দির প্রথম দশক থেকে চল্লিশের দশক পর্যন্ত সারা উপমহাদেশের মুসলমানদের মনে যে জাতীয় ঐক্যবোধ, জাগরণ স্পৃহা আপন জাতীয় সত্ত্বার পরিচয় ফুটিয়ে তোলার আকাক্সক্ষা এবং সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতিতে যে প্রতিষ্ঠা অর্জনের প্রয়াস তীব্র আবেগে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছিল, আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবোধের প্রেক্ষিতে সেই উদ্যম নিষ্ঠা ও কর্ম-চাঞ্চল্য একান্ত আবশ্যক হয়ে উঠেছে। আবশ্যক হয়ে উঠেছে আজ আবার নতুন করে ঘনিয়ে ওঠা বিভ্রান্তির, দিশাহীনতার দিগন্তের কালো আবরণ ভেদ করে আলোকবন্যা আবাহনের জন্য নতুন করে গর্জে ওঠা হাজার হাজার সিরাজীর।’
‘কবি গাজী শিরাজী যার লেখনী ও বাগ্মিতায় আগুন ঝরতো' শীর্ষক প্রবন্ধে কবি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘দেশের অন্যতম দ্বীপপাল ধর্ম, সাহিত্য, রাজনৈতিক পথপ্রদর্শক মহাকবি, মহাবাগ্মী, অকুতোভয় সাংবাদিক, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা, মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত, মুসলিম রেনেসার কবি, ঔপন্যাসিক, যোদ্ধা, সমাজসংস্কারক, নারী জাগরণের অগ্রদূত, কৃষক নেতা, শিক্ষা ব্রতী, দেশপ্রেমিক, ধর্মীয় নেতা, আধ্যাত্মিক সাধক অনল প্রবাহের কারা লাঞ্ছিত অমর কবি গাজী - এ- বলকান মরহুম মওলানা আবু মোহাম্মদ সৈয়দ ইসমাইল হোসেন শিরাজী। তিনি দেশের প্রথম বিদ্রোহী কবি, যার লেখায় ঝরতো আগুন। নানা বিশেষণের তিনি ভূষিত হয়েছিলেন- বাগ্মী শ্রেষ্ঠ, কবিকুল- সূর্য; সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তাশীল লেখক, অগ্নি পুরুষ, পন্ডিত প্রবর, অনল বর্ষী বাগ্মী, বঙ্গকেশরী, সিংহ সাবক, বাগ্মী প্রবর, বাণী সাগর, জাতিবন্ধু, ইসলাম জগতের নেতা, আধ্যাত্ম সাধক ইত্যাদি বিশেষণে বিশেষিত ছিলেন সিরাজগঞ্জের সিংহ সাবক বাংলার শিরাজী। গাজী ইসমাইল হোসেন শিরাজী সারা বিশ্বের অন্যায় শাসন শোষণের বিরোধিতা করেছেন, সাফল্যে উচ্ছ্বসিত হয়েছেন। উপর্যুক্ত আলোচনা ও তার সমসাময়িক গবেষক, কবি- সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, সম্পাদকগণের তাকে নিয়ে মূল্যায়ন থেকে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে শিরাজী একজন স্বাধীনচেতা কবি ও পরাধীনতার শৃঙ্খলকে ভাঙ্গার বিদ্রোহী কবি।
মাত্র ৫২ বছর বয়সে ১৯৩১ সালের ১৭ জুলাই দুরারোগ্য পৃষ্ঠব্রণ রোগে আক্রান্ত হয়ে মুসলিম বিশ্বের এই মহান পুরুষ ইন্তিকাল করেন। জীবনের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত তিনি সর্বপ্রকার অনাচার, কদাচার, কুসংস্কার, অন্যায় ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সিংহের মত লড়ে গেছেন। না কোথাও কোন কারণে তিনি মাথা নত করেন নি। আজ সেই স্বাধীনচেতা কবির ৮৭তম মৃত্যুবার্ষিক। আসুন তার এই প্রয়াণ দিবসে আমরা শপথ নেই দেশপ্রেমিক হওয়ার! তার অমূল্যবান সাহিত্যকর্মসমূহের ব্যপক পঠণ ও গবেষণার দাবি রাখে।

ফররুখ আহমদ : স্বদেশপ্রেমিক ও বিপ্লবী কবি

ফররুখ আহমদ : স্বদেশপ্রেমিক ও বিপ্লবী কবি




ফররুখ আহমদ
স্বদেশপ্রেমিক ও বিপ্লবী কবি
মীম মিজান

ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যের এক শক্তিমান ও অনন্য দিকপাল কবি ব্যক্তিত্ব। মহাকবি, শিশু সাহিত্যিক, মুসলিম জাগরণের কবি, মানবতাবাদী কবি প্রমূখ পদবী দ্বারা সাহিত্যরস বোদ্ধা ও সমালোচকগণ কর্তৃক তিনি সমাদিত। মা, মাতৃভাষা ও দেশমাতৃকার প্রতি এই বিপ্লবী কবির ছিল অগাধ প্রেম ও প্রচ্ছন্ন আকর্ষণ। যুগসষ্টা এ কবি যশোর জেলার মাগুরা থানার মাঝআইল গ্রামে ১৯১৮ সালের ১০ জুন জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা পুলিশ ইন্সপেক্টর সৈয়দ হাতেম আলী। তাঁর মার নাম রওশন আখতার। বাবা মার দ্বিতীয় সন্তান ছিলেন তিনি । তাঁরা তিন ভাই, দুই বোন।
মাঝআইল গ্রামের পাঠশালায় ফররুখ কিছুদিন পড়েছিলেন। ফারসি-জানা এক মহিলা বাড়িতে এসে তাঁকে ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন। তারপর কলকাতায় গিয়ে মডেল এম.ই.স্কুলে ভর্তি হন তিনি। এরপর কিছুদিন পড়েন বালিগঞ্জ হাই স্কুলে। বালিগঞ্জ হাই স্কুলে কবি গোলাম মোস্তফা তাঁর শিক্ষক ছিলেন। এর পর ফররুখ ভর্তি হন খুলনা জেলা স্কুলে। এই স্কুলে তাঁর শিক্ষক ছিলেন সাহিত্যিক আবুল ফজল ও কবি আবুল হাশেম। এই স্কুলের ম্যাগাজিনে ফরররুখ আহমদের প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। এই স্কুল থেকেই ১৯৩৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন তিনি। কলকাতায় এসে রিপন কলেজে ভর্তি হন। ১৯৩৯ সালে রিপন কলেজ থেকে তৃতীয় বিভাগে আই.এ. পাশ করার পর ঐ বছরই কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শনে অনার্স নিয়ে বি.এ. তে ভর্তি হন। এরপর ১৯৪১ সালে স্কটিশ চার্চ কলেজ ছেড়ে কলকাতা সিটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বি.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। তাঁর অধ্যাপকমন্ডলীর মধ্যে ছিলেন বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, প্রমথনাথ বিশী প্রমুখ। স্কুল-কলেজে তাঁর সহপাঠীদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত চলচ্চিকার সত্যজিৎ রায়, অভিনেতা ফতেহ লোহানী, কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তবে যেকোনো কারণেই হোক, শেষ পর্যন্ত বি.এ. পরীক্ষা দেননি তিনি।
কলকাতায় থাকাকালীন ফররুখ আহমদ অনেকগুলি চাকরি করেছেন। কিন্তু সবগুলিই ছিল স্বল্পস্থায়ী। ১৯৪৩ সালে আই.জি.প্রিজন অফিসে, ১৯৪৪ সালে সিভিল সাপ্লাইতে, ১৯৪৫ সালে মাসিক ‘মোহাম্মদী’-র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে এবং ১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে চাকরি করেন তিনি।
ঢাকা বেতারেই ফররুখ আহমদ দীর্ঘদিন চাকরি করেন। ১৯৪৮ সালের শেষ দিকে তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন এবং ঢাকা বেতারে প্রথমে অনিয়মিত হিসেবে এবং পরে নিয়মিত স্টাফ আর্টিস্ট বা নিজস্ব শিল্পী হিসেবে কাজ করতে থাকেন এবং আমৃত্যু ঢাকা বেতারে ষ্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে আপন খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন (লিলি)-এর সঙ্গে ফররুখের বিবাহ হয়। তৈয়বা খাতুনের বাবার নাম সৈয়দ মোহাম্মদ নূরুল হুদা। বিবাহের উদ্যোক্তা ছিলেন ফররুখ ও তৈয়বা খাতুনের নানা মোহাম্মদ হুরমাতুল্লাহ। তাঁর নিজের বিয়ে উপলক্ষে ফররুখ ‘উপহার’ নামে একটি কবিতা লেখেন। কবিতাটি ‘সওগাত’ পত্রিকায় অগ্রহায়ণ ১৩৪৯ সংখ্যায় ছাপা হয়। ফররুখ আহমদের ছেলে-মেয়ে ১১ জন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্য সাত সাগরের মাঝি (১৯৪৪), সিরাজাম মুনিরা (১৯৫২), নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১), মুহূর্তের কবিতা (১৯৬৩), হাতেমতায়ী (১৯৬৬), হাবেদা মরুর কাহিনী (১৯৮১) ইত্যাদি। পাখির বাসা (১৯৬৫), হরফের ছড়া (১৯৭০), ছড়ার আসর (১৯৭০) ইত্যাদি তাঁর শিশুতোষ রচনা।
সাহিত্যে বিশেষ অবদানে জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬০), প্রেসিডেন্ট পুরস্কার প্রাইড অব পারফরমেন্স (১৯৬১), আদমজী পুরস্কার (১৯৬৬), ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬৬), মরণোত্তর একুশে পদক (১৯৭৭), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৮০) লাভ করেন। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মৌলিক প্রতিভাধর কবি ফররুখ আহমদ ১৯৭৪ সালের ১৯ অক্টোবর, সন্ধেবেলা ঢাকায় ইস্কাটন গার্ডেনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
২৩শে জুন ১৭৫৭ সালের পলাশীর আর্মকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য ঘষেটি বেগম ও মীর জাফরদের ষড়যন্ত্রের ফলে অস্তমিত হওয়ার ফলে বিপ্লবী কবি ফররুখ দেখেছেন ইংরেজ বেনিয়াদের শাসন ও শোষণের অবস্থা। এ দেশবাসীর জন্য স্বাধীনতা ছাড়া মুক্তি নেই। আরো উপলব্ধি করেছেন দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানের জন্য সুযোগ্য নেতা প্রয়োজন। যে নেতা কোটি কোটি মজলুম মানুষের দুঃখ-দুর্দশায় সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারবেন তিনিই হলেন কবির কল্পনায় সৃষ্ট আদর্শ মহানায়ক পাঞ্জেরী। এক রূপক কবিতার মাধ্যমে তিনি প্রকাশ করলেন :
‘জাগো বন্দরে কৈফিয়তের তীব্র ভ্রুকুটি হেরি
জাগো অগনন ক্ষুধিত মুখের নীরব ভ্রুকুটি হেরি
দেখ চেয়ে দেখ সূর্য ওঠার কত দেরী, কত দেরী’
(পাঞ্জেরী: সাত সাগরের মাঝি।)
যদিও তিনি কবি তবে সত্যেন্দ্র নাথ রায়ের মতো তাঁর কাব্যে ছান্দসিক ব্যঞ্জনা না থাকলেও তাঁর কাব্যের পরতে পরতে বৈপ্লবিক আহ্বান লক্ষিত। তাই তো ছন্দে তিনি যাদুকর ছিলেন না, ছিলেন বিপ্লবী।
১৩৫০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ছিল ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী শাসক গোষ্ঠীর চাপানো একটি কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ। এ নিয়ে অনেক কবি কবিতা লিখেছেন। বিপ্লবী কবি ফররুখ আহমদের লেখা ‘লাশ’ এ ফুটে উঠেছে তার বাস্তব অবস্থা। কবি লিখেছেন :
‘মানুষের হাড় দিয়ে তারা আজ গড়ে খেলাঘর
সাক্ষী তার পড়ে আছে মুখ গুঁজে ধরনীর পর।’
[লাশ: সাত সাগরের মাঝি]
অধ্যাপক ড: মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান লিখেছেন : ‘লাশ’ তেরশ পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমিতে লেখা একটি অসাধারণ কবিতা।
সূতরাং ফররুখ আহমদ একজন প্রকৃতই বিপ্লবী কবি।
ব্রিটিশ-বেনিয়ারা এদেশ থেকে তাদের লোলুপতা ও অপশাসন তুলে লেজ গুটিয়ে চলে যাওয়ার পর ভারত বিভক্তি হলে পাক শাসকেরা রাষ্ট্রীয় ভাষা নিয়ে জোচ্চুরি করতে আরম্ভ করে। মায়ের কাছ থেকে শেখা অ, আ, ক, খ’র ভালোবাসার ১৯৫২’র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ফররুখ আহমদকে যথার্থই উদ্দীপ্ত করেছিল। ভাষা বিষয়ে তাঁর সচেতনতা অনেক আগেই দেখা গিয়েছিল। ‘উর্দু বনাম বাংলা’ নামক ব্যঙ্গকবিতায় (মোহাম্মদী, জ্যৈষ্ঠ ১৩৫২) ১৯৪৫ সালেই তিনি তীব্র বিদ্রুপ হেনে লিখেছিলেন,
‘দুই শো পঁচিশ মুদ্রা যে অবধি হয়েছে বেতন/বাংলাকে তালাক দিয়া উর্দুকেই করিয়াছি নিকা'।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই প্রকাশিত তাঁর ‘পকিস্তান’ : রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্যে (‘সওগাত’, আশ্বিন ১৩৫৪) তিনি দ্বিধাহীন জানিয়েছিলেন :
‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে এ নিয়ে যথেষ্ট বাদানুবাদ চলছে। আর সবচাইতে আশার কথা এই যে, আলোচনা হয়েছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে, জনগণ ও ছাত্রসমাজ অকুণ্ঠভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করেছে। সুতরাং এটা দৃঢ়ভাবেই আশা করা যায় যে, পাকিস্তানের জনগণের বৃহৎ অংশের মতানুযায়ী পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্বাচিত হবে। যদি তাই হয়, তাহলে একথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে বাংলা ভাষাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে।’
তিনি ধর্মীয় কুসংস্কার ও পাকিস্তানের অপরিণামদর্শী রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে কঠোর হাতে লেখনী পরিচালনা করেন। এভাবে যখন চলে আসে উত্তাল কাল ১৯৭১ সাল। তখন মাতৃভূমি বাংলাদেশে শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। হাতে বন্দুক নিয়ে রণাঙ্গনে যুদ্ধ না করলেও তিনি স্বাধীনতার পক্ষে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিলেন। তাঁর সম-সাময়িক অনেক লেখক ও বুদ্ধিজীবীকে দেখা গেছে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে ও দেশ স্বাধীনের পরে নিজেকে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বলে প্রচার করতে। অথচ দেশপ্রেমিক এ বিপ্লবী কবির বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সর্বাতœক সমর্থন থাকার পরেও এখন তাঁকে সেভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
মহান কবি ফররুখ আহমদ অমর হয়ে থাকবেন যতদিন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকবে। আমরা কবি ফররুখ আহমদকে একজন ভাষা সৈনিক হিসেবে সম্মান জানাতে পার। মানবতাবাদী কবির অসংখ্য লেখা এখনো যা অপ্রকাশিত রয়েছে তা প্রকাশের ব্যবস্থা করা হোক এ কামনা করি।
কবি ফররুখ আহমদ সেইসব ভাগ্যবান কবিদের মধ্যে অন্যতম, যারা কালের মধ্যে বিচরণ করেও হয়েছিলেন কালোত্তীর্ণ। তিনি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং অকুণ্ঠ মূল্যায়ন পেয়েছেন, সংবর্ধিত হয়েছেন, ব্যাপকভাবে আলোচিত এবং উন্মোচিত হয়েছেন তাঁর অগ্রজ, সমসাময়িক, সময়-উত্তর-এমনকি আজকের শতাব্দীর এই প্রজন্মের লেখক, কবি, সমালোচক ও বিপুল-বিশাল পাঠকদের দ্বারা। ফররুখ আহমদ একটি কাল, এমনকি একটি শতাব্দীতেও যে নিঃশেষ হবার মত কবি নন-তাঁর এই দুর্বার চলমানতাই সেই স্বাক্ষর বহন করে। বিপ্লবী এ কবির মাতৃভাষা প্রেম এবং দেশ মাতৃকার প্রতি একনিষ্ঠ অনুরাগ তাঁর পাঠকমহল সহ সকলকেই আলোরিত করেছিল, করছে এবং করবে। তাঁর কাব্যপাঠে ঈপ্সা হয় ‘পাঞ্জেরী’র মতো একজন বিপ্লবী হতে। এ মহান কবির আজ শততম জন্মজয়ন্তী। এ দিনে তাঁর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। আসুন তাঁর শততম জন্মজয়ন্তীতে আমরা প্রত্যয় গ্রহণ করি একজন বিপ্লবী হওয়ার। একজন একনিষ্ঠ মাতৃভাষা প্রেমিক হওয়ার ও একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক হওয়ার।



মাহে রমজানের গুরুত্ব ও পবিত্রতা

মাহে রমজানের গুরুত্ব ও পবিত্রতা

মাহে রমজানের গুরুত্ব ও পবিত্রতা
মীম মিজান

আরবি বর্ষপঞ্জির নবম মাস মাহে রমজান। মাহে রমজান মুসলমানদের জন্য একটি শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। মহান আল্লাহ্ তায়ালা এই রমজান মাসকে করেছেন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বছরের বাকী এগারটি মাসের থেকে এই মাসটি সমহিমায় উদ্ভসিত। এই মাসটি যে সকল কারণে গুরুত্বপূর্ণ সেগুলি হলো:
১. রমজান হলো কুরআন নাজিলের মাস : আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন: “রমজান মাস, এতে নাজিল হয়েছে আল-কুরআন, যা মানুষের দিশারি এবং স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারী।” (সূরা বাকারা : ১৮৫) রমজান মাসে সপ্তম আকাশের লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে বায়তুল ইজ্জতে পবিত্র আল-কুরআন একবারে নাজিল হয়েছে। সেখান হতে আবার রমজান মাসে অল্প অল্প করে নবী করিম (সা) -এর প্রতি নাজিল হতে শুরু করে। এ মাসে মানুষের হেদায়াত ও আলোকবর্তিকা যেমন নাজিল হয়েছে তেমনি আল্লাহর রহমত হিসেবে এসেছে সিয়াম। তাই এ দুই নিয়ামতের শুকরিয়া আদায় করতে বেশি বেশি করে কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত। প্রতি বছর রমজান মাসে জিবরাইল রাসূলুল্লাহ (সা)-কে পূর্ণ কুরআন শোনাতেন এবং রাসূল (সা)-ও তাকে পূর্ণ কুরআন শোনাতেন। আর জীবনের শেষ রমজানে আল্লাহর রাসূল দুই বার পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করেছেন। সহি মুসলিমের হাদিস দ্বারা এটা প্রমাণিত।
২. এ মাসে জান্নাতের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত রাখা হয়, জাহান্নামের দ্বারসমূহ রুদ্ধ করে দেয়া হয়। নবী (সা) বলেন : “রমজান মাসে এলে জান্নাতের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত রাখা হয় জাহান্নামের দ্বারসমূহ রুদ্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়। (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮০০)
৩. এ মাসে রয়েছে লাইলাতুল ক্বদেরর ন্যায় বরকতময় রজনী : মহান আল্লাহ বলেন, “লাইলাতুল ক্বদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এ রাত্রে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হন প্রত্যেক কাজে, তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিময় এ রজনী, ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত।’’ (সূরা আল ক্বদর : ৩-৫)
৪. এ মাস দোয়া কবুলের মাস : নবী (সা) বলেন, “(রমজানের) প্রতি দিন ও রাতে (জাহান্নাম থেকে) আল্লাহর কাছে বহু বান্দা মুক্তিপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। তাদের প্রত্যেক বান্দার দোয়া কবুল হয়ে থাকে (যা সে রমজান মাসে করে থাকে)।’’ (সহীহ সনদে ইমাম আহমদ কর্তৃক বর্ণিত, হাদিস নং ৭৪৫০)
৫. রোজার পুরস্কার আল্লাহ স্বয়ং নিজে প্রদান করবেন : একটি হাদিসে কুদসিতে রাসূল (সা) বলেন, আল্লাহ বলেন, “বনি আদমের সকল আমল তার জন্য, অবশ্য রোজার কথা আলাদা, কেননা রোজা আমার জন্য এবং আমিই এর পুরস্কার দেবো।’’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮০৫)
৬. রোজা রাখা গোনাহের কাফফারা স্বরূপ এবং ক্ষমালাভের কারণ : রাসূল (সা) বলেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রামাদান মাসে রোজা রাখবে, তার পূর্বের সকল গোনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৯১০)
৭. রোজা জান্নাত লাভের পথ : রাসূল (সা) বলেন, “জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে যাকে বলা হয় ‘রাইয়ান’। কিয়ামতের দিন এ দরজা দিয়ে রোজাদারগণ প্রবেশ করবে। অন্য কেউ এ দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না, রোজাদারগণ প্রবেশ করলে এ দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে আর কেউ সেখান দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।’’ (সহীহ বুখারি, হাদিস নং ১৭৯৭)
৮. সিয়াম রোজাদারের জন্য কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে : রাসূল (সা) ইরশাদ করেন: “কিয়ামতের দিন রোজা এবং কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে, ‘হে রব! আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও প্রবৃত্তির কামনা হতে বাধা দিয়েছি;  সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন।’ কুরআন বলবে, ‘আমি তাকে রাতের বেলায় ঘুমাতে দেয়নি; সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। ফলে এ দুয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।’ ’’ (মুসনাদ, হাদিস নং ৬৬২৬)
৯. রোজা জাহান্নামের অগ্নি থেকে মুক্তিলাভের ঢাল : রাসূল (সা) ইরশাদ করেন : যে বান্দাহ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে আল্লাহর রাস্তায় একদিন রোজা রাখে আল্লাহ তার মাঝে এবং জাহান্নামের মাঝে ৭০ বছরের দূরত্ব তৈরি করেন। (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮৯৪)
১০. এ মাসের রোজা রাখা একাধারে বছরের দশ মাস রোজা রাখার সমান : রাসূল (সা) ইরশাদ করেন, “রমজানের রোজা দশ মাসের রোজার সমতুল্য, ছয় রোজা দুই মাসের রোজার সমান, এ যেন সারা বছরের রোজা।”
১১. রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মিসকের সুগন্ধির চেয়েও উত্তম : রাসূল (সা) বলেন, “যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তার শপথ! রোজাদারের মুখের গন্ধ কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে মিসকের চেয়েও সুগন্ধিময়।’’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮৯৪)
১২. রোজা ইহ-পরকালে সুখ-শান্তি লাভের উপায় : রাসূল (সা) বলেন, “রোজাদারের জন্য দুটো খুশির সময় রয়েছে। একটি হলো ইফতারের সময় এবং অন্যটি স্বীয় প্রভু আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার সময়।’’ (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ১৮০৫)
রোজার আরো ফজিলতের মধ্যে রয়েছে এতে ইচ্ছা ও সঙ্কল্পে দৃঢ়তা সৃষ্টি হয়, চারিত্রিক মাহাত্ম্য অর্জিত হয়, শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি লাভ করা যায় এবং সর্বোপরি তা মুসলিম উম্মাহ্ একতাবদ্ধ হওয়ার এক বাস্তব নিদর্শন।

উপর্যুক্ত গুরুত্বসমূহ ছাড়াও আরো যে সকল গুরুত্ব আছে সেগুলি হলো, দরিদ্র-অসহায়দের সহযোগিতার (দান-খয়রাত) মাস, বদরের মাস, জিহাদের জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাস, এতেকাফের মাস, যাকাত ও দান-সদকা বেশী বেশী দেয়ার মাস, চরিত্র গঠনের মাস, আল্লাহর আইন বাস্তবায়নের শপথ নেয়ার মাস ইত্যাদি।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের দেয়া তাঁর বান্দাদের জন্য গুনাহ্ মাফ করণের এ মাসের যেমন গুরুত্ব রয়েছে; ঠিক তেমনি সেই গুরুত্বসমূহ অর্জনের কতিপয় পবিত্রতা দাবী করে রমজান আমাদের কাছে। নইলে আমরা হব সেই মাঝির মতো যে কিনা নদীতে একটি মূল্যবান জিনিস ভাসতে দেখে সঠিক উপায় অবলম্বন না করে শুধু চিৎকার জুড়ে দিল আমি অমুক জিনিস দেখেছি, আমি অমুক জিনিস দেখেছি। আর মাঝি এতেই ভাবলো যে সে ওমুক বস্তু পেয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তব অবস্থা সম্পূর্ণ এর বিপরীত।
এক হাদিসে আছে, “আমার উম্মত যদি জানতো রোজা কী জিনিস, তাহলে রোজা রাখা এতো কষ্টকর হওয়া সত্তেও সারা বছর রমজান মাসের কামনা করতো।” সূতরাং আসুন এই ফজিলতপূর্ণ রমজানের পবিত্রতা কিভাবে রক্ষা যায় তা জেনে নেই।
১.ফেইসবুক:
তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে আজ দূরত্ব হয়েছে জয়। আর দূরত্ব জয়ের জন্য যে সকল মাধ্যম আমরা ব্যবহার করি তার অন্যতমটি হল ফেইসবুক। কতিপয় উ™£ান্ত যুবক-যুবতীদের দেখা যায় নানা কুরুচি পূর্ণ ছবি টাইম লাইনে আপলোড দেয়। যা তার বন্ধুদের নিউজফিডে অনিচ্ছা সত্তেও চলে যায়। যা রোজাদার ফেইসবুক ব্যবহারকারীগণের রোজাকে করে হালকা ও রমজানের পবিত্রতাকে করে ক্ষুণœ। এহেন খারাপ ছবি পোস্ট থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে রমজানের পবিত্রতাকে রক্ষা করা যাবে।
২. টুইটার:

ফেইসবুকের ন্যায় আরেকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হলো টুইটার। ঠিক এখানেও টুইটের মাধ্যমে রোজাকে হালকা করবে এমন ছবি আপলোড দেয়া হয়। টুইট করার ক্ষেত্রে বা ফলো করার ক্ষেত্রে এরকম অশালিনতা থেকে বিরত থেকে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা যাবে।
৩. পত্র-পত্রিকার বিনোদন পাতা:
দৈনিক, সাপ্তাহিকসহ পত্র-পত্রিকার বিনোদন পাতা গুলিতে বিভিন্ন নায়িকাদের সাক্ষাৎকার প্রচার বা তাদের নিয়ে আলোচনার জন্য তাদের নানা ভঙ্গিমায় আবেদনময়ী ছবিগুলি তুলে ধরা হয়। যা যে কোনো বয়সের পুরুষের রোজাকে হালকা করতে পারে। সূতরাং এ রকম ছবি বিনোদন পাতাগুলিতে না ছাপালে রোজাদারদের মনের পবিত্রতা রক্ষা পাবে ও রমজানকে সম্মান করা হবে।
৪. পর্নোগাফি ওয়েবসাইটগুলো বন্ধ:
উঠতি বয়সের যুব সম্প্রদায়সহ অনেকেই একটু আড়াল বা সুযোগ পেলেই পর্নোগ্রাফি সাইটগুলোতে ঢু মারে। অন্যান্য সময়ের মতই রমজান মাসে এরকম ঘটনা ঘটতে পারে। যা রোজাকে ভঙ্গ করবে এমন কাজে নিমগ্ন করবে। এক্ষেত্রে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় অন্তত এই পবিত্র মাসে এই সাইটগুলো বন্ধ করে রাখতে পারে। তাহলে পবিত্র রমজান মাস সমূহ পবিত্রতার সাথে পালন করা যেতে পারে।
৫.এফএম রেডিও ও কমিউনিটি রেডিওতে গান-বাজনা:
দেশে এখন অনেকগুলি এফএম রেডিও ও কমিউনিটি রেডিও আছে। যারা বছরের অন্যান্য সময় প্রায় সারাটাদিন বিভিন্ন ধরণের গান শুনিয়ে থাকে তাদের শ্রোতাদের। রমজান মাসেও এই রেডিও গুলিতে গান-বাজনা চলে সারাটা দিন ধরেই। শুধুই ইফতারের আগ মূহুর্তে কুরআন তেলায়াত প্লে করে। যদি এই রহমতের মাসে এই রেডিও সেন্টারগুলি এহেন গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকে ও সারাটা দিন কুরআন-হাদিস, ইসলামী সংগিত পরিবেশন করে তাহলে রোজাদারগণ পবিত্রতার সাথে রোজা পালন করতে পারেন।
৬. অর্ধনগ্ন ও রোজা হালকা করে এমন সিনেমা পোস্টার:
বছরের অন্যান্য সময় দেয়ালে দেয়ালে ছেয়ে যায় অর্ধনগ্ন সিনেমার পোস্টারে। আর মাহে রমজানেও তারা এ সকল ব্যবসা বন্ধ করেনা। যার ফলে নতুন নতুন সিনেমা তারা মুক্তি দেয় প্রেক্ষাগৃহ গুলিতে। যে গুলোর প্রচারের জন্য পোস্টারিং করে লোকজনের নজর অনায়াসে পড়ে এমন স্থানগুলিতে। রোজাদার সকল বয়সের মুক্তিকামী মুসলিমের রোজা গুলো হালকা করে এ সকল পোস্টারিং। অধিকন্তু রমজানের শেষের দিকে এসে ঈদকে উদযাপধের জন্য একবারেই নতুন সিনেমা মুক্তি দেয়া হয় প্রেক্ষাগৃহ গুলিতে যে গুলির ও রমরমা পোস্টারিং হয়। এ ধরণের অর্ধ উলঙ্গ পোস্টারিং থেকে বিরত থাকলে ও প্রেক্ষাগৃহ গুলি বন্ধ রাখলে রমজানের পবিত্রতা অনেক খানি রক্ষা হবে।
৮. সরকারি-বেসরকারি সকল টিভি চ্যানেলে গান-বাজনা:
এফ এম রেডিও এবং কমিউনিটি রেডিওগুলির পাশাপাশি দেশীয় ও বিদেশীয় টিভি চ্যানেলগুলিতে দিনভর চলে গান, সিনেমা নাটক ইত্যাদি অনুষ্ঠান। এ সকল প্রোগামেও অর্ধনগ্ন নায়িকাদের আবেদনময়ীতা প্রদর্শন করা হয়। যে গুলি রোজাকে হালকা করে ও রমজানের পবিত্রতার বিপরীত। যদিও তারা নামমাত্র কিছু ইসলামিক প্রোগাম দেখায়। এ ধরণের প্রোগাম ও চ্যানেলগুলি মাহে রমজানে বন্ধ রাখলে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা পাবে।
৯. বিভিন্ন টকশো ও লাইভ প্রেগ্রামে মডেল কন্যা-নায়িকাদের অর্ধ উলঙ্গ কাপড় পড়ে আসা:
ঈদ উপলক্ষে কার কী কী সিনেমা, গান, নাটক ইত্যাদি রিলিজ পাচ্ছে সেগুলি নিয়ে চলে চটকদার লাইভ প্রোগাম বিভিন্ন টিভি চ্যানেল গুলিতে। আর এখানকার হটসিটে বসা মডেল কন্যারাও আসেন রমজানের পবিত্রতাকে ক্ষুণœ করে এমন পরিধেয় নিয়ে। তারা কিন্তু দাবী করছে যে তারাও তাক্বওয়াহ অর্জনকারী রোজা পালন করছে। এরকম প্রোগাম গুলি না করলে মাহে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা পেয়ে মুসলিমগণ একনিষ্ট ভাবে তাদের সিয়াম সাধনা করতে পারেন।
এ ছাড়াও মদের বারগুলি বন্ধ রাখা, দিনের বেলা হোটেল রেস্তোরা বন্ধ রাখা, বেরোজাদারদের প্রকাশ্যে পানাহার থেকে বিরত থাকা, মহিলাদের শালীন পরিচ্ছদ ধারণ করা, মার্কেটে-মার্কেটে না ঘুরে এবাদত করা ইত্যাদি দাবী গুলোও রমজান আমাদের কাছে দাবী করে তার পবিত্রতা ও গুরুত্বের জন্য।
উপর্যুক্ত গুরুত্ব গুলি যদি আমরা গুরুত্বের সাথে পালন করি ও রমজানের পবিত্রতা কে ক্ষুণœ করে এমন কাজ গুলি থেকে বিরত থাকি তাহলে ইনশা আল্লাহ্ আমরা তাক্বওয়াহ্ অর্জন করে পবিত্র দেহ ও মন নিয়ে এ ধরাধাম ত্যাগ করতে পারব। যার ফলে ক্বিয়ামতের কঠিন বিচার দিবসে নিশ্চয়ই সফলকাম হয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে চিরসুখের আকাক্সক্ষীত জান্নাতে প্রবেশ করব। আমীন! সুম্ম-আমীন!


সুফিয়া কামালের কবিতায় ঋতু ও প্রকৃতি- মীম মিজান

সুফিয়া কামালের কবিতায় ঋতু ও প্রকৃতি- মীম মিজান

সুফিয়া কামালের কবিতায় ঋতু ও প্রকৃতি
মীম মিজান

তিন দেশের তিন অভিজ্ঞতার সংমিশ্রনে অনন্য বাংলা সাহিত্যের প্রজ্জ্বল মহিলা কবি সুফিয়া কামাল। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে তিনি যেমন করেছেন ঋদ্ধ তেমনি সমাজ সংস্কারমূলক কাজেও তার অবদান নারী হিশেবে প্রথমস্থান লাভের দাবীদার। তার জীবন বহুমুখী। তার সৃজন কর্মও বহুমুখী। তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণ ও ডায়রির জাতীয় গদ্য ও শিশুতোষ গ্রন্থও রচনা করেছেন। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০টিরও বেশি। তার সাহিত্যকর্মগুলোর মান ও প্রভাব ছিল বিশ্বমানের। সেজন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তার কবিতা অনূদিত হয়েছে। যেমন- জার্মান, রাশিয়া, চীন, ইতালি, চেক, ভিয়েতনাম, হিন্দি, গুজরাট ও উর্দুতে। এই শক্তিমান কবি ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জুন (সোমবার,  ১০ আষাঢ় ১৩১৮ বঙ্গাব্দ),  বেলা ৩টায়, বরিশালের শায়েস্তাবাদস্থ রাহাত মঞ্জিলে জন্মগ্রহণ করেন। তৎকালীন সমাজের নানা কুসংস্কারের মধ্যেও তিনি স্বশিক্ষিত হয়েছেন। অনেক চড়াই উৎড়াই পার করে দ্বিতীয় সংসারে এসে জীবনের পূর্ণতায় মিশেছেন। জনকল্যাণকর কাজ ও সাহিত্যে বিশিষ্ট অবদানের জন্য সুফিয়া কামাল অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন। ১৯৬১ সালে তিনি  পাকিন্তান সরকার কর্তৃক ‘তঘমা-ই-ইমতিয়াজ’ নামক জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন; কিন্তু ১৯৬৯ সালে বাঙালিদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে তিনি তা বর্জন করেন। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পুরস্কার: বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬২), একুশে পদক (১৯৭৬), নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৭৭), মুক্তধারা পুরস্কার (১৯৮২), জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার (১৯৯৫), ডড়সবহ’ং ঋবফবৎধঃরড়হ ভড়ৎ ডড়ৎষফ চবধপব ঈৎবংঃ (১৯৯৬), বেগম রোকেয়া পদক (১৯৯৬), দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ স্বর্ণপদক (১৯৯৬), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭) ইত্যাদি। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের খবহরহ ঈবহঃবহধৎু ঔঁনরষবব গবফধষ (১৯৭০) এবং ঈুবপযড়ংষড়াধশরধ গবফধষ (১৯৮৬) সহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারও লাভ করেন।
সমগ্র জীবন সমাজ সংস্কারের কাজে ব্যয় করে ১৯৯৯ সালে ২০শে নভেম্বর শনিবার সকালে বার্ধক্যজনিত কারণে এই অনন্য নারী মৃত্যুবরণ করেন। সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ২৮শে নভেম্বর তার ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

অনুবাদ কবিতা: হাফিজ ইকবাল ও মীম মিজান

অনুবাদ কবিতা: হাফিজ ইকবাল ও মীম মিজান


পত্র
আমি আকাশ থেকেও কঠিন নিরাশ হব
হে বন্ধু,
নৈরাশ্য, নৈরাশ্য
তুমি কি জানো?
এখানে মেঘ কোনো বর্ষণ করেনা
সূর্য আলো দেয়না
নতুন কোনো চারাগাছ রোপিত হয়না
ভূমি ফাঁপা ও ফাকা
একটি শুষ্ক তৃণও নেই
নিরাপত্তায়
লাঙ্গলের ফলার কোনো চিহ্ন নেই
আমি আকাশ থেকেও কঠিন নিরাশ
হ্যাঁ!
এই নিস্তব্ধ মরুভূমিতে
একজনকে স্মরণ করি।

শহীদুল জহির বাংলা গদ্য সাহিত্যে নব্য ধারার প্রবর্তক- ---মীম মিজান

 শহীদুল জহির বাংলা গদ্য সাহিত্যে নব্য ধারার প্রবর্তক- ---মীম মিজান



বাংলা গদ্য সাহিত্যে যিনি স্বল্প অথচ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন তিনি হলেন শহীদুল জহির। তিনি ১৯৫৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার নারিন্দার ৩৬ ভূতের গলিতে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তার নাম ছিল মোহাম্মদ শহীদুল হক। তার পিতা এ কে নুরুল হক ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা ও মা ছিলেন গৃহিনী। তার পৈতৃক বাড়ি ছিল সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার হাশিল গ্রামে। তার দাদা জহিরউদ্দিন (সম্ভবত তিনি তার জহির নামটি তার দাদার কাছ থেকে নিয়েছিলেন) ছিলেন স্কুলশিক্ষক ও তার দাদী জিন্নাতুন নেসা। তার নানা ছিলেন সিরাজগঞ্জের আমলাপাড়ার আজিমুদ্দিন আহমেদ ও নানি হামিদা বেগম, যাদের কাছে তিনি প্রায়ই বেড়াতে যেতেন। শহীদুল জহির তার স্কুলজীবন শুরু করেছিলেন ঢাকার ৩৬ রাঙ্কিন স্ট্রিটের সিলভারডেল কেজি স্কুলে, পরবর্তীতে ঢাকা, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ, সাতকানিয়া ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্কুলে পড়েছেন। সাতকানিয়া মডেল হাই স্কুল থেকে এস.এস.সি পাশ করেন ও ঢাকা কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পাশ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ওয়াশিংটন ডিসির আমেরিকান ইউনিভার্সিটি ও বারমিংহাম ইউনিভার্সিটিতেও পড়ালেখা করেন। তিনি ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে সহকারী সচিব পদে যোগ দেন। ২০০৮ এ তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় সচিব পদে কাজ করে গেছেন।