ইলিয়াস বাবর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ইলিয়াস বাবর লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

হাওরপারের জীবন ও জীবীকা

হাওরপারের জীবন ও জীবীকা

 

     ছবি : জি এম ফ্রাজের ।

সুনামগঞ্জ হাওরপারের জীবন ও জীবীকা 

ওবায়দুল মুন্সী 


কথিত আছে, বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের একটি বড় অংশ এক সময় ‘কালীদহ সাগর’ নামে বিশাল জলরাশিতে নিমজ্জিত ছিল। পরবর্তীতে ভূপ্রাকৃতিক বিবর্তনের ফলে তা পিরিচ আকৃতির নিম্ন সমতলভূমিতে পরিণত হয়, এই সমতলভূমিই এখন হাওর। হাওর শব্দটিও সাগর শব্দের অপভ্রংশ। সাগর থেকে সায়র, সায়র থেকে হাওর।

সুনামগঞ্জ জেলার মোট হাওর সংখ্যা প্রায় ৯৫টি । অপূর্ব সুন্দর এক জনপদের নাম হাওর! হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশ খুবই নাজুক। যেখানে বছরে প্রায় ছ’মাস থাকে জলের নীচে। তখন হাওরকে দেখা যায় বিশাল সমুদ্রের মতো। গ্রামগুলোকে মনে হয় ছোট ছোট দ্বীপ। বাকি ছয় মাস শুকনা মৌসুমে হাওর হয়ে ওঠে সবুজ গালিচা বিছানো মনোরমা আর; সোনালি ফসলের  মাঠ। 

ভৌগোলিক কারণেই সুনামগঞ্জ হাওর অঞ্চলের জীবনযাত্রা ভিন্ন। প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার সক্ষমতা এই অঞ্চলের মানুষদের একটু ভিন্নভাবে পরিচয় বহন করে। মূলত দুই ধরনের পেশার ওপর এই হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবিকা নির্বাহ হয়। সেটা হলো কৃষি এবং মৎস্য শিকার। দুটি পেশার সাথে এই অঞ্চলের নারী-পুরুষের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বেঁচে থাকার তাগিদে ঘরে-বাইরে সব জায়গাতেই সবার শ্রম দিতে হয়। সামাজিক প্রথার কারণে গৃহস্থলির সার্বিক কাজটা সামলে নিয়ে নারীরাও কৃষিকাজে শ্রম দেয়।

     ছবি : জি এম ফ্রাজের ।

হাওরের নারী শ্রমিক একাধারে একজন গৃহিণী এবং কৃষাণীও। মাঠে ধান আর গলায় গান বৈশাখ মাসে হাওর অঞ্চলে এ যেন এক মধুময় দৃশ্য। কালের পরিক্রমায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বর্তমান হাওর অঞ্চল এক অনিশ্চয়তা আর হতাশার নাম। মাঝে-মাঝে হাওরের প্রকৃতি ভয়াবহ রূপ নেয়। বর্ষাকালীন ঝড় এলে হাওরের পানি ফোঁসে ওঠে। এসময় হাওরে চলাচলকারী নৌকাগুলোকে নিরাপদ স্থানে এসে আশ্রয় নিতে হয়। নৌকাগুলো হিজল অথবা করচ গাছের সাথে বেঁধে রাখতে হয়।

বাতাস দীর্ঘস্থায়ী হলে ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে গ্রামগুলোর ওপর। এ সময় বাড়িঘর ভাঙতে থাকে। হাওরের লোকেরা এ দুর্যোগকে বলে ‘আফাল’। এই ‘আফাল’ থেকে ঘরবাড়ি রক্ষার জন্য রীতিমতো লড়াই করতে হয় হাওরবাসীকে। ভাঙন প্রতিরোধে বাঁশ, কচুরিপানা ও বিভিন্ন প্রকার জলজ উদ্ভিদ দিয়ে বাড়ির চারপাশে নির্মাণ করতে হয় শক্ত বাঁধ।


 হাওরাঞ্চলকে বাংলাদেশের খাদ্য গুদামও বলা হয়ে থাকে। সুনামগঞ্জ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষিজীবী। শরতে ধবধবে সাদা কাশফুল, হেমন্তের শুকনো মৌসুমে চারদিকে ফসলি মাঠ, গাঁয়ের আকাঁবাঁকা মেঠোপথ, শীতে দুর্বাঘাসে শিশির ফোঁটা মুক্তার মতো হাসে। কবিমন ভাবনায় ডুবে যায় হাওরের অপরূপ এই রূপ দেখে! তখন হাওরপারের কৃষকদের  কলরবে সারা মাঠ মুখরিত হয়ে ওঠে। পৌষ-মাঘে শীতের পিঠা খাওয়ার উৎসব শুরু হয় কৃষকের ঘরে  ঘরে। বসন্তে গাছে গাছে নতুন পাতা ও ডালপালা গজায় আর সবুজ সমারোহে ভরে যায় হাওরের প্রকৃতি। কোকিলের কুহু কুহু ডাকে জানান দেয় বসন্তের আগাম বার্তা। তখন কী যে অপরূপ দৃশ্যপট তা হাওরবাসী মাত্রই জানে। আবার যখন বৈশাখ মাসে পাকা ধানের সোনালি রঙে সারা মাঠ ভরে ওঠে। হাওরপারের কৃষাণ কৃষাণীরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে শুধু কাজ আর কাজ নিয়ে ব্যস্ত দিন কাটায়। মাঝেমধ্যে চৈত্র মাসে ভারতীয় পাহাড়ি ঢালে, বছরের একমাত্র বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সব সময় কৃষকদের তাড়া করে। কোনো কোনো সময়  ফাল্গুন মাস এলে সুনাগঞ্জের অনেক হাওরে পানির জন্য হাহাকার দেখা দেয়।

চারদিকে খাল বিল শুকিয়ে চৌচির হয়ে যায়। এঁটেল এবং দো-আঁশ মাটির এসব এলাকায় মাটি ফেটে ধানক্ষেতে গর্তের সৃষ্টি হয়। খাল এবং বিলে পানি না থাকার কারণে বিপাকে পড়েন বিভিন্ন উপজেলার হাওরবাসী কৃষক। 



দেশের বৃহত্তম মৎস্য ভান্ডার সুনামগঞ্জের নলোয়ার হাওর, দেখার হাওর, মইয়ার হাওর, করচার হাওর, শনির হাওর, টাঙ্গুয়ার হাওর সহ প্রায় সবকটি হাওর। অত্র অঞ্চলের ভাষায়- লাছো মাছ ও গইন্না মাছ’ একমাত্র টাঙ্গুয়ার হাওরেই জন্মে। এই দুই প্রজাতির কার্পজাতীয় মাছ এখান থেকেই সারা দেশের হাওরাঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। 

এ জেলায় প্রচুর বিল-বাদাল, ডুবা-নালা, জলাশয় থাকার ফলে অনেক মাছ উৎপন্ন হয়। যা দেশের অমূল্য সম্পদ। প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টিতে জীবনের মায়া উপেক্ষা করে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে জেলেরা বেরিয়ে পড়ে মৎস্য শিকারে। কেউবা পালতোলা ছোট ছোট নৌকা নিয়ে আর কেউ ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে। ভয়-ভীতি কিছুই  নেই! তাদের শুধু একটা চিন্তা মাছ শিকার।

জীবন ও জীবিকার খুঁজে এভাবেই বিরূপ  প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে হাওরপারের মানুষের জীবন কাটে। 


হাওর গবেষণা, চর্চা, সংরক্ষণ এবং পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সব কিছুই আজ কালের গর্ভে হারাতে বসেছে। হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাপন, হাওরের (আফাল) ঢেউয়ের সাথে হাওরবাসীর মানিয়ে নেওয়া জীবন-জীবীকা, শৈল্পিকতা, হাওরের সংস্কৃতি, গান, বিচিত্র পেশা, হাওরের মৎস্য সম্পদ, হাওরের সোনালি ধান, হাওরের সম্ভাবনা, হাওরাঞ্চলের জলেভাসা দ্বীপ ছোট ছোট গ্রাম, ঢেউয়ের গর্জন, হিজল-করচের বাগ, হাওরে জোছনা উদযাপন প্রভৃতি আমাদের বাঙালি জাতিসত্তার কৃষ্টি-সভ্যতার অংশ।


জীববৈচিত্র্েযর আধার ও সৌন্দর্যের জলকন্যা টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটনের নামে যে পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যক্রম চলছে তা অচিরেই বন্ধ করতে হবে। হাওরের নানাবিধ সমস্যা নিয়ে  সুনামগঞ্জ হাওর বাঁচাও আন্দোলন নামে একটি সক্রিয় সেচ্ছাসেবী সংগঠন নিরলসভাবে কাজ করছে। শুধু সরকারি  আইন করে হাওরের পরিবেশ রক্ষা করা যাবে না। এ জন্য হাওর উন্নয়নমূলক বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং  হাওরপারের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে  হাওরের পরিবেশ রক্ষা করতে। যদি হাওরের পরিবেশ রক্ষা করা যায়,তখনই নিরাপদ থাকবে  হাওরপারের মানুষ; সুন্দর ও সুখময় হবে তাদের জীবন ও জীবীকা। 


লেখক: হাওর বাঁচাও আন্দোলন কর্মী, সুনামগঞ্জ। 


পারিবারিক অ্যালবাম

পারিবারিক অ্যালবাম

 

    গ্রাফিক্স : জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ


পারিবারিক অ্যালবাম

আরিফুর রহমান 


‘এমন জোরে হাঁটছে যেন বাড়িতে কেউ মারা গেছে!’ মুখ ফসকে কথাটি বেরিয়ে গেল আমার। 

লোকটি আমার আগে আগে হনহন করে হাঁটছেন। আমি কিছুতেই তার সাথে পা মিলিয়ে চলতে পারছি না। এদিকে আমাদের সামনে কিলোমিটার খানেকের এক পাথার। তাছাড়া একটু দূরের খালের উপরে যে ব্রিজ তার গা ঘেঁষে একটি শ্মশানও আছে। তিনি আর আমি ছাড়া এই সন্ধ্যার মুখে এপথে আর কেউ নেই। তার সাথেই আজ আমাকে এই পাথার পেরিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। অথচ আমি তার নাগালই পাচ্ছি না! ফলে মনে মনে বিরক্তি বাড়ছিল, সাথে ভয়ও, তাই কথাটি বলে ফেলেছি! 

আমি ছোটোবেলা থেকেই কিছুটা ভীতু। ওই যেদিন একজন প্রতিবেশীর কাফনে মোড়ানো শরীর দেখে চমকে উঠেছিলাম পরিচিত অবয়বের ব্যতিক্রম বলে এবং রাতে ভীষণ জ্বর হয়েছিল, সেদিন থেকে। আর সেদিনই ভয়টা আমার মনে যোগ হয়েছিল, কারণ রাতভর জ্বরের ঘোরে জানালার পাশের চিরপরিচিত জারুলগাছ জুড়ে দেখতে পেয়েছিলাম ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কাফনের কাপড়! ‘ওই যে তরু মিস্ত্রি, ওই যে তরু মিস্ত্রি!’ সবাই আমার এমন বিড়বিড় শুনে বুঝতে পেরেছিল আমি তরু মিস্ত্রির লাশ দেখে ভয় পেয়েছি। তারপর বহুদিন আমাকে কোনো মরাবাড়িতে যেতে দেওয়া হয়নি! 

আমার কথা শুনে লোকটি থমকে দাঁড়ালেন এবং ঘাড় ঘুরিয়ে আগুন চোখে তাকালেন। মুখ দেখতেই তাকে চিনতে পারলাম। আমাদের পাড়ার জিন্নাহ দাদু, যার সাথে নাতিনাতনিদের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ সম্পর্ক সম্ভবত আমারই। আমি তার দিকে এগোতে এগোতে বললাম, দাদু আপনি! হাটে গিয়েছিলেন? আমি ছোটো ফুপুর বাড়িতে গিয়েছিলাম। ফিরতে দেরি হয়ে গেল। যাক, চলুন এগোই। 

দাদু কোনো কথা বললেন না! নড়লেনও না এতটুকু! গোধূলির শেষ আলোয় তার চোখমুখ বেশ লাল দেখাচ্ছে। আমি গায়ে না মেখে আবারও বললাম, দাদু চলুন। 

সাথে সাথে জিন্নাহ দাদু আমার ডান হাতটি খপ করে ধরলেন এবং সেটা বেশ শক্ত হাতেই! হঠাৎ ভয়ের একটি শীতল ¯্রােত বয়ে গেল আমার শরীর জুড়ে! আর খুব দ্রুত দেহের শক্তি কমতে লাগল। অল্পক্ষণ পরই মনে হলো আমার খুব ঘুম পাচ্ছে। আমি তলিয়ে যাচ্ছি গভীর ঘুমে। তখুনি দাদু সম্পূর্ণ অচেনা গলায় আমাকে বললেন, চল এগোই। 

জিন্নাহ দাদুর বামহাতের ভেতরে আমার ডানহাত তেমনি আটকে আছে। টের পেলাম আমরা ধীরে ধীরে হাঁটছি। আর প্রতিটি পদক্ষেপে শোঁ শোঁ শব্দ করে কিছু যেন আমাদের পাশদিয়ে পেছনে চলে যাচ্ছে! আমি কিছুতেই চোখের পাতা খুলতে পারছি না কিংবা কোনো কথা

বলতে পারছি না! সেই শক্তিই যেন আমার নেই। অথচ ধীরপায়ে হলেও আমি হাঁটছি!

কিছুক্ষণ হাঁটার পর দাদু তার হাতের ভেতর ধরে রাখা আমার হাতে একটু চাপ দিয়ে বললেন, মুন্না, চোখ খুলে দেখ। 

আমি ঘুমকাতুরে শিশুর মতো টেনে টেনে অতি কষ্টে চোখের পাতা খুলতে পারলাম। দেখলাম, খুবই সুন্দর একটি পথের বাঁকে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। দুপাশে সারি করে দাঁড়ানো গাছের ছায়াশীতল পথটির ওই বাঁকে আমাদের বাড়ি, আশেপাশে আর কোনো বাড়িঘর নেই! বিস্ময়াভিভূত আমি আনন্দ সূচক কিছু একটা বলতে চাইলাম কিন্তু নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেলাম না! দেখলাম, আমাদের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে ঠিক আমার মতো দেখতে একজন আমারই কণ্ঠে কিছু বলছে! ‘হেই মিয়া...’ আমি কেবল এই শব্দ দুটো বুঝতে পারলাম। পরের অংশটুকু ভিসিআরে টেনে টেনে সিনেমা দেখার মতো দ্রুত ঘটতে লাগল! 

আমার বিস্ময়ের সীমা রইল না; কয়েকমাস আগে হুবহু এরকম ঘটনা ঘটেছে আমাদের বাড়িতে! সেদিন একজন প্রতিবেশীর উপরে এভাবেই নিজের ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছিলাম আমি। যদিও তার ভুল সে-রকম কিছু ছিল না, ভুল করেছিল তার পোষা গরু। কিন্তু গরুটির ভুলের অছিলায় ওর মালিকের কিছু কথার শোধ তোলার সুযোগ সেদিন আমি আর ছাড়িনি! আজ অবশ্য মনে হচ্ছে, প্রতিবেশীর সাথে অমন ব্যবহার করা মোটেই উচিত হয়নি আমার। 

আমি সবিস্ময়ে জিন্নাহ দাদুর দিকে তাকালাম। দেখলাম, দাদু মুচকি হাসছেন। 

আমরা আরও কিছুটা এগিয়ে গেলাম। এই পথের আগের বাঁকটির মতো আরেকটি বাঁকে এসে দাঁড়ালাম আমরা। আর আমি বিস্ফারিত নয়নে আমাদের বাড়িটিকেই পুনরায় দেখতে পেলাম! গতবছর আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভতির্র আগে বাড়ির বাইরের বারান্দায় বাবা-কাকাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংক্রান্ত বৈঠক দেখা যাচ্ছে এবার! এতটা দূর থেকেও স্পষ্ট শুনতে পেলাম আমি মিনমিন করে বলছি, ‘সাহিত্যে আমার আগ্রহ বেশি, আমি ভাষা ও সাহিত্যে ভর্তি হতে চাই।'

সাথে সাথে ছোটো কাকার ধমকে ওঠা, জ্যেঠার চোখ পাকানো, মেজো কাকার তিরস্কার, বাবার হায় হায় করে ওঠা সব দৃশ্যমান হলো! এমনকি দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে মা’র ফুঁপিয়ে ওঠাটাও টের পেলাম! যেন আমি নিজেকে গোল্লায় নিয়ে যেতে চেয়েছি, সেভাবেই আমার প্রস্তাব ছুঁড়ে ফেলে বলা হলো, ‘পাস করার পর কিছু একটা করে খেতে পারবে এমন একটি বিষয় বেছে নিতে হবে।’

এখন টের পাচ্ছি, আমার মেরুদ-টা তখন খুব একটা সোজা ছিল না!

এরপর আমাকে বিস্মিত হবার সীমানার বাইরে নিয়ে একটু একটু করে এগোতে এগোতে দেখানো হলো, টুনি আপার অমতে তাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া, দীর্ঘদিন অসুখে ভুগে সুস্থতার দিকে এগোনো দাদীজানের রহস্যজনক মৃত্যু, অন্য ধর্মের এক যুবকের সাথে ছোটো ফুপুর পালিয়ে যাওয়া, চিরকুমার বড়ো কাকার গলায় ফাঁস নেওয়া, বাড়িতে ডাকাত দলের হানা, পৃথিবীতে আমার আগমনের সময় মা’র মৃত্যুপুরী ঘুরে আসা-সহ অসংখ্য ঘটনা! 

প্রতিটি ঘটনায় একটি কালো ছায়ার উপস্থিতি আমার দৃষ্টি এড়ালো না। কিন্তু ছায়াটি কার তা বুঝে উঠতে পারলাম না।

আবার গভীর ঘুমে জড়িয়ে যেতে লাগল আমার দুচোখ। আমি খুব ঘুমকাতুরে গলাতেও দাদুকে জিজ্ঞেস করতে চাইলাম, এখন কোথায় চললেন? কিন্তু এখনো নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পেলাম না। 

আমার ডানহাত এখনো আটকে আছে দাদুর বামহাতের ভেতরে। তিনি যেন তাঁর স্বাভাবিক উচ্চতার তুলনায় কিছুটা উঁচু থেকে টানলেন আমাকে। হাঁটতে শুরু করলাম আর তক্ষুনি টের পেলাম আমি শূন্যে হাঁটছি! নিজেকে পাখির মতো হালকা লাগছে। হাওয়ার গায়ে ভর দিয়ে হেঁটে চলার সময়টা দুচোখ ভরে উপভোগ করতে পারলে নিশ্চয়ই আরও মনোমুগ্ধকর হতো, কিন্তু আপাতত আমার চোখের পাতায় ঘুমপরিদের বসতি।

ওভাবে হেঁটে হেঁটে উপরের দিকে উঠতে উঠতে হাওয়ায় জলের স্পর্শ পাওয়ার পর জিন্নাহ দাদু থামলেন। আর এই এতটা সময় পরে আমার হাতটাও ছেড়ে দিলেন। ধীরে ধীরে আমার দেহের শক্তি ফিরে এলো। আমি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ পেলাম এবং চোখ খুললাম। দেখলাম, আমি খুবই অদ্ভুত এবং অচেনা একটি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশ কুয়াশাজড়ানো, যদিও আমি জানি এখন শীতকাল নয়! সেই কুয়াশার আড়াল থেকে সামনে এলেন আমার বড়ো কাকা ও দাদীজান! তারপর এলেন আমার দাদু এবং আরও কয়েকজন, যাঁরা সবাই আমাদের পারিবারিক অ্যালবামের সদস্য! আমাকে কাছে পেয়ে তাঁরা বেশ আনন্দিত। কিন্তু আমি প্রচ- ভয়ে কুঁকড়ে যেতে লাগলাম, তাহলে কি আমি মারা গেছি? নাকি জিন্নাহ দাদু কোনো মন্ত্রবলে আমাকে এখানে এনেছেন?

আমাকে ভয় পেতে দেখে তাঁদের মধ্যে সোরগোল শুরু হয়ে গেল। আমার দাদু আমাকে এভাবে এখানে আনার জন্য জিন্নাহ দাদুকে ধমকে দিলেন। ফলে বিব্রত ভঙ্গিতে জিন্নাহ দাদু হালকা কুয়াশায় আড়ালে চলে গেলেন। আর আলোর শেষে আবছা অন্ধকারে তাঁকে একটি কালো ছায়ার মতো মনে হলো এবং সাথে সাথে কিছুক্ষণ আগে দেখে আসা ঘটনাগুলোর ছায়াটিকে চিনতে পারলাম আমি; জিন্নাহ দাদু! 


জিন্নাহ দাদু না আমি, আমি তোমার ছোটো পিসেমশাই, মুন্না! 

কারোর ধাক্কাধাক্কি ও ডাকাডাকিতে সম্বিত ফিরে পেলাম আমি। দেখলাম, আমার মাথাটি ছোটো ফুপার কোলে। আর তিনি ক্রমাগত বলছেন, আমি মুন্না, আমি! তোমার ছোটো পিসেমশাই! তোমার...!

আমি ফুপার কোল থেকে মাথা উঠিয়ে চারপাশটা দেখে জিজ্ঞেস করলাম, ফুপা, আমি এখানে? 

তোমাকে এখানে এই অবস্থায় দেখে আমিও খুব অবাক হয়েছি! তুমি ব্রিজ ছেড়ে খালের জলে....! তুমি আমাদের বাড়িতে তোমাদের পারিবারিক অ্যালবামটা ফেলে এসেছিলে। সেটা দিতেই তোমার ছোটো পিসি তাড়াহুড়ো করে আমাকে পাঠাল যাতে পথেই তোমাকে পেয়ে যাই।

আমরা খাল থেকে ব্রিজের ওপরে উঠে এসেছি। চারপাশ থেকে মাগরিবের আযান ভেসে আসছে। ফুপা ব্রিজের রেলিং থেকে তার বিখ্যাত সাইকেলটি সোজা করে নিলেন। তারপর বললেন, পেছনে বসো। তোমাকে তোমাদের বাড়ির পেছনের মোড়ে নামিয়ে দিয়ে আসি।

আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, চলুন।..... কাউকে কিছু বলবেন না, প্লিজ ফুপা! 

ফুপা হাসলেন। 

মোড়ে নামতেই আমার মনে খটকা লাগল, নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে। লোকজনের মধ্যে কেমন যেন খাপছাড়া ভাব। নাকি আমার মনের ভুল? হতেই পারে, যে ধকল গেল! 

বাড়িতে ঢুকব তখুনি মসজিদের মাইকে ঘোষণা শুরু হলো, একটি শোক সংবাদ, একটি শোক সংবাদ। গোবিন্দপুর পূর্বপাড়া নিবাসী মোঃ জিন্নাহ ম-ল আজ বিকাল সাড়ে পাঁচ ঘটিকায় তাহার নিজ বাড়িতে ইন্তেকাল ফরমাইয়াছেন, ইন্না-লিলল্লাহি....! 

আমার পুরো শরীর কেঁপে ওঠল! বুঝলাম, এ-যাত্রায় জ্বর থেকে নিস্তার নেই। 

হলোও তাই, সারারাত প্রচন্ড জ্বর আর সীমাহীন ঘোরের ভেতর আটকে রইলাম। কখনও কুয়াশাচ্ছন্ন সেই জায়গাটির দৃশ্যগুলো ফিরে এলো তো কখনও আমিই সেই দৃশ্যের ভেতর ফিরে গেলাম। পরিচিত সেই মুখগুলোই আমার চারপাশে কিন্তু আমাকে নিয়ে তাঁরা আর উৎফুল্ল নন, বেশ চিন্তিত! অনাগত সময়ের নানাবিধ আশঙ্কা তাঁদের উচ্ছ্বাসে ভাটার টান নিয়ে এসেছে আর তাতে পড়েছে দুশ্চিন্তার অসংখ্য ভাঁজ! ফলে আমার মহান পূর্বপুরুষগণের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নতুন প্রজন্মের এই যে আমি, তার জীবনের বালিয়াড়ি জুড়ে হয়ত তাঁরা কেবল দুর্বোধ্য আঁকিবুঁকি দেখতে পাচ্ছিলেন আর আঁতকে উঠছিলেন। কিন্তু ঘোরের ভেতর থেকেও আমি ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে নিয়ে বেশ নির্লিপ্ত হয়ে উঠলাম! আর মনে মনে সেই বালিয়াড়ি জুড়ে জীবনের হিসাব কষে নিতে লাগলাম! 

ফজরের পরপরই আমার জ্বর নেমে গেল। কিন্তু শরীরে ক্লান্তি জাঁকিয়ে বসেছে বলে শুয়ে রইলাম বেশ বেলা পর্যন্ত। খোলা জানালা দিয়ে লোকজনের যাতায়াত দেখলাম। কেউ কেউ জানালার কাছে একটু থেমে ‘আমি এখন কেমন বোধ করছি’ তা জেনে গেল। তেমনই একজন আগন্তুক, আমার বন্ধু শাহিন, একসময় এসে জানতে চাইল, কেমন আছিস এখন? 

বিছানা থেকে শরীরটা অর্ধেক উঠিয়ে কনুইয়ে ভর দিয়ে বললাম, ভালো। 

তুই ভর সন্ধ্যাবেলা শ্মশানের কাছে খালের ভেতর নামতে গেছিলি কেন রে? শুনেই আমার হাতপা ঠা-া হয়ে গেছিল! অমন পাথার একা পার হয়ে আসা.....! বাপরে! 

আমি চোখ পাকিয়ে শাহিনকে থামতে বললাম। ও প্রসঙ্গ পাল্টে আমাকে জিজ্ঞেস করল, জিন্নাহ বুইড়ার জানাজায় যাবি?

হুম। একটু দাঁড়া, আসছি। 

জিন্নাহ দাদুর নামাজে জানাজা সকাল আটটায় অনুষ্ঠিত হবে বলে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দাদুর বাড়ি লোকে লোকারণ্য। তাঁর প্রশংসাসূচক বাক্য, টুকরো টুকরো স্মৃতি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দ মিলে চাপা গুঞ্জন চলছে।

নির্দিষ্ট সময়ের আগে আগে সবাই সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ালেন। 

মাইকে প্রয়োজনীয় কথা সেরে নেওয়া হলো। 

জানাজার নামাজ শুরুর আগমুহূর্তে আমার কি হলো কে জানে, নিজেকে বেশ জোরে-সোরে বলতে শুনলাম, আমি কিছু বলতে চাই! 

দেখলাম, যে যেভাবে সম্ভব আমাকে দেখছেন। অনেকেই বেশ বিরক্ত। 

ওসব তোয়াক্কা না করে জিন্নাহ দাদুর খাটিয়ার সামনে গিয়ে মাইকের দখল নিলাম। তারপর দৃঢ় উচ্চারণে বলতে শুরু করলাম সেই কথাগুলো যেগুলো আমাদের বংশের অনেকেই জানেন। কিন্তু অনেক কথা বলা হলেও আজ এখানে সেই কথাগুলোর একটিও উচ্চারিত হয়নি! অথচ আমার মনে হলো, কথাগুলো বলা দরকার।

বললাম, সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত লোমহর্ষক দুটো খুন এবং আকন্দদের বাড়িতে অগ্নিকা-ের ঘটনায় জিন্নাহ দাদুর সংশ্লিষ্টতার কথা! 

সাথে সাথে দাদুর চার ছেলে হৈচৈ বাঁধিয়ে ফেলল। আর জমায়েতের পেছনদিকটায় অস্বাভাবিক নড়াচড়া শুরু হলো একদল লোকের। আমি তাকিয়ে দেখলাম আমাদের বংশের মানুষের মুখগুলো ফ্যাকাসে এবং নত। 

বিশৃঙ্খলার মধ্যেই হঠাৎ দুরাউন্ড গুলি চলল! আর তক্ষুনি দেখলাম, আমি ধীরে ধীরে হেঁটে উঠে যাচ্ছি উপরের দিকে! আমার চারপাশে আমাদের মহান পূর্বপুরুষগণ, যাঁরা সকলেই আমাদের পারিবারিক অ্যালবামের সদস্য! তাঁরা বেশ আনন্দিত। আমি তাঁদের সাথে সানন্দে এগিয়ে চললাম। নিচের নশ্বর দেহটির দিকে একবার ফিরেও তাকালাম না, একবারও না! কিন্তু টের পেলাম, নিজের কণ্ঠস্বর হারিয়ে ফেলা আমার মা পারিবারিক অ্যালবামটি বুকে জড়িয়ে হাপুসনয়নে অশ্রু ঝরাচ্ছেন। ওতে সর্বশেষ যে ছবিটি যোগ হলো সে আমারই!

আমাদের পারিবারিক অ্যালবামে কোনো জীবিত মানুষের ছবি নেই! 


মাতৃভাষার পদাবলি

মাতৃভাষার পদাবলি













কামনায় যে সকাল
মো: লুৎফর রহমান রবি

একটা সুন্দর সকালের অপেক্ষায়,
অগুনিত বিনিদ্র রজনীর ঘটে অবসান।
যে সকালে তুমি থাকবে পাশে।
যে সকালে তোমার চুলের সুগন্ধ ভাঙ্গাবে নিদ্রা।
যে সকালে নীল শাড়ি গায়ে জড়ায়ে বাড়িয়ে দিবে প্রেম পিয়াস।
যে সকালে ছোট্ট চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ডাকবে তুমি।
যে সকালে উষ্ণতায় এ হ্রদয়ে ফুটবে কালো গোলাপ।
যে সকালে বৃষ্টি ঝড়বে চারিধার ঝরঝর।
যে সকালে তোমার শাড়ির আঁচলে লুকাবো বদন।
যে সকালে মনন জুড়ে শুধু তোমার প্রতিক্ষা।
যে সকালে পাশাপাশি দু’জনা বসে চখাচখি।
যে সকালে ঝাপটে ধরে বুকে বলবো, ভালোবাসি সখি।
এমনি একটা সকালের প্রতিক্ষা হ্রদয়ে।
শত শত যাতনা করে বিদায়,
গড়েছি ভালোবাসার মহাসিন্ধু।
ভালোবাসি তোকে বন্ধু শত শত বর্ষ পরেও
বলতে চাই ভালোবাসি



যে বিশ্বাস কখনো হারেনা
আবু ইউসুফ সুমন

চারপাশে চলাফেরা করা সংশয়গুলো যখন পাহাড়সম আকার নিয়ে আসে
অবিশ্বাসী শক্তির কাছে আমার অন্তরের সামান্য বিশ্বাসটুকু যখন আর পেরে উঠেনা।

সৃষ্টি হয়েও যখন স্রষ্টার অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দিতে মন বিরোধিতা করে
রঙ বেরঙের শব্দের ফাঁদে পড়ে যখন মিথ্যেগুলো সত্য হয়ে উঠে।

যখন চিন্তার সীমাবদ্ধতাগুলো স্রষ্টার অবাধ্যতায় মনকে উষ্কানি দেয়
ঐশ্বরিক বিশ্বাস ছেড়ে যখন শুধু বস্তুবাদী চোখ দিয়ে দুনিয়াকে দেখি।

যখন অনুমোদিত আলাপের চেয়ে নিষিদ্ধ আলোচনা আকর্ষণীয় হয়ে উঠে
কমনসেন্স আর যুক্তিবোধ লোপ পেয়ে যখন মরিচিকার পিছনে ছুটতে থাকি।

ঠিক তখন একদিন আমি কুরআন নিয়ে বসি; যার প্রত্যেকটি আয়াতের প্রেক্ষাপটও মর্মার্থ বোঝার চেষ্টা করি
আমি একমাত্র সত্য, সভ্য আর পরম মহিমাপূর্ণ আদর্শের সন্ধান পাই, কেঁপে উঠে আমার অন্তরাত্মা।

এই কুরআনের শক্তির কাছেই একদিন পরাজিত হয়েছিলো আরববাসী
নবী মুহাম্মাদ (সা.) এর মুখনিসৃত বাণীতে
প্রকম্পিত হয় তাদের হৃদয়ের কুঠুরি।

হেরে যায় তাদের সকল সংশয় অবিশ্বাস আর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রশ্ন
প্রবল প্রতিকূল পরিবেশকে পরাস্ত করে দিকবিদিক উড়ে শুধু বিশ্বাসের পতাকা।

যে বিশ্বাস কখনো হারেনি, যে বিশ্বাস কখনো হারেনা
যে বিশ্বাসের পতাকাবাহীদের পরাজিত মুখ কেউ দেখিনি...
হে আল্লাহ, আপনি আমাকে সেই সকল বিশ্বাসীদের দলে কবুল করে নিন।




অস্তমিত প্রায় 
হাসান মাসুদ

বৈঠকী ঢংয়ে কথায় কথায়
ফুরিয়ে যাচ্ছে শীত।

বাবা সারাদিন খাটুনির পর
একটু বিশ্রাম নিতে চেয়েও
নিতে পারছেন না।

ভিটামিন শূন্যতায় ঝাপসা
হয়ে আসছে মায়ের গহীন
চোখ - আমরা হেঁটে চলেছি
নৈপন্থের দিকে।

হটাৎ মনে হলো

শীতের মতই চলাচল হয়ে
বয়সের আলাপচারিতায়
ফুরিয়ে যাচ্ছে বাবা।

আর মায়ের গহীন চোখ দুটোও
স্বপ্ন দেখাতে দেখাতে পুড়ে
যাচ্ছে ইদানিং; তবুও আমরা
হেঁটে চলেছি নৈপন্থের দিকে।



কৃষ্ণচূড়ার ত্রাস
সাব্বির হোসেন 

বসন্তে নিখোঁজ হয়ে দেখো
কত ডালে ঝরে কত ফুল,
নারী যদি ফাগুনের হয় ফুল
নর তুমি নৈঋতের বায়ু কূল।

শিমুল পলাশের আঁচলে মাতাল বাতাস
হলুদ গাঁদায় বয়ে চলে জন¯্রােত,
ভালোবাসো যদি কাছে এসো
এক চিমটি সিঁদুরে রাঙাবো তোমার ঠোঁট।

চোখ যদি ভেজে কালো রাতে
ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিতে ভেজে মন,
তোমার বসন্তে আমার কৃষ্ণচূড়ার ত্রাস
ঊাসন্তী; তুমিই তাঁর কারণ।


ইদানীং ভালোবাসা আঁকা শিখছি
নূরনবী সোহাগ


‘দ’ দিয়ে পাখি আঁকা শিখেছিলাম মায়ের কাছে
দ’য়ের হইছে মাথা ব্যথা, শূন্য আসছে দেখতে
বাইশজন আসছে কবিরাজ, বসতে দিলাম লাঠি
একটানে বানাইলাম পাখি
তখন ছন্দ পড়ে পড়ে পাখি আঁকি
খেয়ালে, দেয়ালে সর্বত্র পাখি আর পাখি
দিনগুলো হয়ে উঠেছিল পাখিময়

ইদানীং জাদুকরের কাছে ভালোবাসা আঁকা শিখছি
চোখ ও চিবুকের গোপনমন্ত্রে; হাসির রঙ ছিটিয়ে
হৃদয়ের মধ্যে সবুজ সবুজ ভালোবাসা আঁকছি
আমার মনের লাজ নেই আর
আপনি ছাড়া কাজ নেই তার
ছন্দ পড়ে পড়ে আমি ভালোবাসা আঁকি অবিরাম
তোয়াক্কা নেই দিন রাতের; সময় কিংবা অসময়
দিনগুলো হয়ে উঠছে ভালোবাসাময়




দুঃখ বলি, শোনো
নিঃশব্দ আহামদ


দুঃখ বলি, শোনো
যে দুঃখ, চেয়েছিলে জানতে
জানো তো, দুঃখ পেলে দুঃখ বাড়ে
চারপাশে

এভাবে সন্ধ্যা আসে, ধুপ জ¦ালাও
শাড়ির ভাঁজে পরিপাটি বেশ
নিজেকে জানান দিতে থাকো, সব ই ঠিকঠাক
ঠিক ভেতর থেকে, গভীরতর-এক কান্না
রোজ লুকায়-গৃহস্থালি চোখ

দ্যাখে দ্যাখে তোমাকে
রোজদিন একটা ভয়, ঠিক এসব সন্ধ্যায়
ভাবায়, আর আমি অভিলাষটুকু মরে যেতে যেতে
শেষবার, ইচ্ছে করে বেঁচে উঠি মরতে মরতে আবার
গমস্ত শূন্যতা পাশে

বয়োভারে নুয়ে যায় বৃক্ষ, বয়সের মতোন
সমবেদনা তার মর্মমূলে, ঠিক তোমার চোখে
আমি শুধু আক্ষেপে বাঁচি, একদিন তুমিও নেবে শোক
এপার ওপারে, যতোটা কাছে থাকার মতো
না, তবু হয়ে উঠেনা-মুছে দেবার ভেজা চোখ

জানো, এতোটা দিনের পরেও কতোটা দুঃখ শেষে
আমরা কেবল মেনে নেবার প্রবণতা করছি মুখস্ত
যদি আসে অপেক্ষার সন্ধ্যায় এমনো শোক



বর্ণমালার ইতিকথা
শাহীন রায়হান

অর্ধেক শহীদ মিনার বিধ্বস্ত পড়ে আছে আহত বর্ণমালায়
অথচ এই বর্ণমালার হৃৎপি-সম
প্রতিটি বর্ণই আমার জন্মদাতা মা
যার অবরুদ্ধ জঠর ছিঁড়ে আমি আজ
অফুরন্ত কথা বলতে শিখেছি-
রাত্রির গাঢ়তম অন্ধকার ঠেলে নীরবে জেগে ওঠা
শহীদ মিনারে আজও আমি ভাষা শহীদের পদধ্বনি শুনি
শুনি রফিক সালাম বরকতের ঊর্দু পোড়ানো অগ্নি শ্লোগান।

আজও আমি প্রজ্জ্বলিত সূর্যের মুখোমুখি দাঁড়াই
রোদোজ্জ্বল এক নতুন দিনের আলিঙ্গনে
প্রিয়তম বাতাসে শুনি বায়ান্নর প্রতিধ্বনি
যেখানে ঊর্দুর কফিনে মহাসমারোহে বাঁজে
আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।


ভাষামানবের গান
সৌরভ দত্ত

অনিকেত সন্ধ্যায় রাশি-নক্ষত্র বদলের পর
ফেনিল জরায়ু  ছিঁড়ে উঠে বসে মিথুনভাষা

সূর্যাস্ত চিনিয়ে দেয় গাছের অস্থিকোটর
আবিষ্কার করি পাখিদের বিমর্ষ গান...

আত্মমুখী কাঁঠালের মর্মরে বেজে ওঠে
সারোদ; হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার বাঁশি-

নীল জলের অথই থেকে তুলে আনতে চাই
গায়ে অক্ষর আঁকা একটা ডুবন্ত মানুষকে

দীর্ঘ ছায়ায় বিদ্যাসাগরের চোখ যেন স্বপ্নময়
ইশারার ধ্বনি-আবার কোথায় হারিয়ে যায়

সাতটি তারার তিমির আঁকড়ে পড়ে আছে
আমাদের জন্মান্তরের প্রিয় গুহালিপিগুলো

গ্রাম্য কৃষকের অশস্যল সময়ের না- কবিতায়
কৃষ্ণচূড়ার মত ফুটে আছে বাংলাভাষা।।

ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৩৫

ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১৩৫
তারুণ্যের শিল্প সরোবর : : ধানশালিক :  : সংখ্যা ১৩৫
শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২০