মোহাম্মদ অংকন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মোহাম্মদ অংকন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সাংবাদিক মুনশী ইকবাল’র ‘গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য’

সাংবাদিক মুনশী ইকবাল’র ‘গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য’


সাংবাদিক মুনশী ইকবাল’র 
‘গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য’

মোহাম্মদ অংকন


বিশ্বের বেশিরভাগ সফল এবং ধনী মানুষের মধ্যে একটি জায়গায় দারুণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তা হল- তাঁরা প্রায় সবাই প্রচুর বই পড়েন। ওয়ারেন বাফেট একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি  দিনের শতকরা আশি ভাগ সময় বই পড়ে ব্যয় করেন, প্রতিদিন প্রায় পাঁচশ পাতা পড়েন। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জুকারবার্গ বছরে পঞ্চাশের অধিক বই পড়ে থাকেন। বিশ্ববরেণ্য কোটিপতিদের সাফল্যের পিছনে তাদের পড়া বিভিন্ন বইয়ের অবদান কোনো অংশে কম নয়। পাঠকদের বই পড়ার দারুণ আগ্রহবোধ থেকে লেখকরা প্রতিনিয়ত বই লিখছেন। শুধু বইমেলা উপলক্ষ্য নয়, সারাবছরই কমবেশি বই প্রকাশ হচ্ছে। মৌসুমি লেখকদের আড়াল থেকে বেরিয়ে সেপ্টেম্বর (২০১৯) মাসে বই প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক মুনশী ইকবাল। তিনি বই লিখেছেন গ্রাম বাংলার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিভিন্ন উপাদান নিয়ে। বইটির নামকরণ করেছেন- ‘গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য’।

লেখক মুনশী ইকবাল মূলত একজন সাংবাদিক। তিনি সাংবাদিকতা বিষয়ক একজন দক্ষ প্রশিক্ষকও।  এর বাইরে তিনি একজন লেখক ও কবি। কর্মরত আছেন উত্তরপূর্ব জনপদের প্রভাবশালী দৈনিক জালালাবাদের ক্রাইম ও কারেন্ট বিটে। এছাড়া তিনি দীর্ঘদিন দৈনিক জালালাবাদের সাহিত্য বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। লেখক সময় পেলেই বেরিয়ে যান মাঠে প্রান্তের। চলে যান পাহাড়, নদী আর বন-বনানীর কাছে। ঘুরে বেড়ান জনপদ থেকে জনপদে,  কথা বলেন সাধারণ মানুষের সাথে। রিপোর্টিংয়ের বাইরে তাঁর লেখালেখির মূল রসদ আসে এখান থেকেই। ‘গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য’ বইটির মূল উপাদান তাঁর এই ঘুরে বেড়ানো থেকে নেওয়া। তিনি বইটিতে শিশু-কিশোরদের উপযোগী করে সহজভাবে তুলে এনেছেন হারিয়ে যাওয়া সেইসব ঐতিহ্যের কথা যা কিছুদিন আগেও আমাদের চোখে পড়তো। ‘গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য’ বইটি পালকি, ঢেঁকি, হুক্কা, গ্রামোফোন, গরুর গাড়ি, হ্যাজাক বাতি, চিঠি, কাঠের লাঙল, নৌকাবাইচ, মাটির পাত্র নিয়ে লেখা তথ্যনির্ভর প্রবন্ধ দিয়ে সাজিয়েছেন। এসব জিনিসপত্র আমাদের ঐতিহ্য। কিন্তু কিভাবে এসব আজ বিলুপ্তির পথে, তা বইটি পাঠের মাধ্যমে জানা সম্ভব।


‘গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য’ বইয়ের ভূমিকা লিখেছেন সত্তরের দশকের খ্যাতনামা কবি ও সাংবাদিক, গবেষক নিজাম উদ্দীন সালেহ। প্রচ্ছদ করেছেন খ্যাতনামা কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, ডিজাইনার ও প্রকাশক আহমেদ ফারুক। ‘শ্রীহট্ট’ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত আশি পৃষ্ঠার বইটির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র দুইশত টাকা। প্রকাশনীর প্রদর্শনী উপলক্ষে বিশেষ ছাড়ে ৪০% কমিশনে বইটি পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া রকমারি ডটকম থেকেও বইটি সংগ্রহ করা যাবে। আমি বইটি পাঠ করেছি। ভীষণ ভালো লেগেছে। দেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যচর্চা ও রক্ষায় এ ধরণের বইয়ের বিকল্প নেই।

করোনা বিষয়ক শব্দমালা

করোনা বিষয়ক শব্দমালা



‘করোনার’র দিনগুলিতে প্রেম

এতটা দূরত্বের কারণ হয়ে দাঁড়াবে ‘করোনা’
আমি ভাবতেও পারিনি কভু!
অবিশ্বাস্য লাগছে যাপিত দিনগুলো-
একই পথে দাঁড়িয়ে দুজন; অথচ স্পর্শ নেই
কিছুটা দূরত্বে দুজন; বাতাসের বিপরীতে মুখ।

ঐ ঠোঁটে চুমু না এঁকে কখনো আমি ফিরিনি
বড় খরা যাচ্ছে ভালোবাসায়;
ঝাঁপটে ধরার আকাক্সক্ষা বড় পীড়া দিচ্ছে; সুযোগ নেই
‘করোনা’র দুর্বিনীত ছোবল নিঃস্ব করতে সক্ষম প্রেমের বন্ধন।

‘করোনা’র দিনগুলিতে প্রেম সত্যি আমাকে ভাবিয়ে তুলছে
পাশাপাশি বসা নেই যোজন যোজন দিন; এমন মনে হচ্ছে।
কবে কাঁটবে এই ঘোর অমানিশা?
তোমার আমার প্রেমের জন্য তো বটেই-
আমাদের প্রেমের স্বীকৃতি দিতে বাঁচুক পৃথিবীর মানুষেরা।



করোনা’র চে ওরা ভয়ঙ্কর!

করোনাভাইরাসের করালগ্রাসে বিপর্যস্ত সবাই যখন-
প্রতিরোধের নাম করে মানুষ পিটাচ্ছে ওরা তখন।
সরকারের ঐ পুলিশ-প্রশাসনই জানে না-ক ঠিকটা
মাস্ক পরলে করোনা যায়- বলেছে কোন লোকটা?
নিদের্শনায় আছে- রোগী ও ডাক্তারগণ পরবে মাস্ক
সুস্থ মানুষ পরবে কি’না ওরা কখনো করেছে আস্ক?
(ভূঁয়া মাস্কে সয়লাব দেশ, দাম বাড়িয়েছে সি-িকেট
করোনা’র চে ওরা ভয়ঙ্কর, কাঁটছে মানুষের পকেট।
শুধু এন-৯৫ মাস্ক করোনাভাইরাসকে পারে রুখতে
এই মাস্ক কেনার সাধ্য নেই জনগণের, হবে বুঝতে।)
খেটে-খাওয়া মানুষগুলো পেটের দায়ে কাজে নামছে
কানধরা, লাঠিপেটানোর পর পুলিশ-প্রশাসন থামছে!
কর্মবিহীন মানুষগুলোর মুখে আহার দেওয়ার বদলে-
প্রহার করে ছবি তোলে ওরা কোন সে ক্ষমতার বলে?
জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে যাদের ওপর করবে সবাই নির্ভর
ও রে ভাই দেখছি একি- করোনা’র চে ওরা ভয়ঙ্কর!!


 জীবাণুযুদ্ধ

যুদ্ধ লেগেছে তামাম বিশ্বে; অস্ত্র-গোলাবারুদবিহীন যুদ্ধ-
কারো হাতে রাইফেল নেই, কোথাও নেই বোমাবাজি,
মানুষে মানুষে সংঘাত নেই, দেশে দেশে শত্রুতা নেই,
তবুও যুদ্ধ শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়ে। অবাক কা- দেখছি!

চীনে লাশের মিছিল; ইতালি, স্পেন সব ছাড়িয়ে উর্ধে-
বাংলাদেশ, ভারতেও বাজছে যুদ্ধের দামামা।
যুদ্ধটা দেশ-মহাদেশ ছাপিয়ে বিশ্বব্যাপী এখন-
কেউ জানে না থামবে কবে? আর কত মানুষ মারবে?

উত্তর কোরিয়া যুদ্ধ মোকাবিলায় পরমাণু নিয়ে প্রস্তুত!
না, তাতেও কাজ হচ্ছে না। 
পরমাণুর মহরা এ যুদ্ধের কাছে তুচ্ছ, এ অদৃশ্য যুদ্ধ!

এ যুদ্ধ জয়ের হাতিয়ার নাকি ঘরবন্দি থাকা-
নিজেকে যতবেশি পরিষ্কার রাখা, হাত ধোঁয়া,
জনসমাগম থাকা চলবে না মাঠে-ময়দানে-হাটে-ঘাটে।
এ কেমন যুদ্ধ? অবাক-বিস্ময়কর! ঘটনা কি?

জীবাণুযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে বিশ^ আজ দিশেহারা-
এটা তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ; জাতি নিধনে সক্রিয়।
এ যুদ্ধেই তামাম বিশ্বের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সক্ষম-
পরমাণুর বিষবাষ্প হটিয়ে এ যুদ্ধ ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার।



 কারফিউ

কারফিউ জারি হয়েছে- তোমাকে স্পর্শ করার ক্ষমতা নেই।
দূরত্ব বজায় রাখা এখন বাধ্যতামূলক,
ক’দিন কারফিউ চলবে? জানি নে।
কবে হাসপাতালের নার্স হেক্সিসোল নয়, ফুল হাতে দাঁড়াবে?

শহরের অলিতে-গলিতে জুবাইদাকে দেখি না
তোমার জন্য কেনা হয় না ফুল; সে টাকা বিদ্যানন্দকে দিয়েছি।
সজল মামার চায়ের দোকানে কেউ বসছে না;
সে-ও কেঁদে বলে, ‘মামা, খাওনের টাহা নাই।’
(মানিব্যাগে যা ছিল দিয়েছি।)
শহরের কর্মহারা মানুষগুলো লকডাউন মানছে না-
ট্রাকের ডালায় ফিরছে বাড়ি; ভিড়েও করোনা’র ভয় নেই।

জনশূণ্য শহরে তোমাকে নিয়ে চক্কর দিতে মন চাচ্ছে,
নগর পুলিশের টহলে সব ইচ্ছে মিয়্রমান আজ।
অতএব, প্রেম না হওয়ার দিনগুলো মনে করি;
যখন ছিল আমাদের ভালোবাসার কারফিউ।



পারিপার্শ্বিক গল্পের বই ‘শহরের অসম প্রেম’

পারিপার্শ্বিক গল্পের বই ‘শহরের অসম প্রেম’



পারিপার্শ্বিক গল্পের বই 
‘শহরের অসম প্রেম’

অনিক মাযহার

‘শহরের অসম প্রেম’ সতেরোটি ছোটগল্পের একটি সংকলন। প্রতিটি গল্পই পাঠকের কাছে ধরা পড়বে খুব পরিচিত হয়ে। কারণ এগুলো প্রায়ই ঘটছে বা ঘটেছে আমাদের জীবনে। বিশেষ করে আমরা যারা শহরে থাকি, তাদের মনে ছড়াতে পারে আরো গভীর রোমাঞ্চ।

চাকরির উদ্দ্যেশে বাবা তার মেয়েসহ পরিবারকে গ্রাম থেকে নিয়ে যায় শহরে। আর এখানেই বিচ্ছেদ ঘটে ভালোবাসার সর্ম্পকের। যা আমরা দেখতে পাই, ‘বসন্ত এলে মনে পড়ে’ গল্পে। উঁচু-উঁচু দালানের ভীড় ঠেলে শহুরে জীবনে সকালের স্নিগ্ধ রোদ দেখা বেশ কষ্টসাধ্য একটা বিষয়। কিন্তু অনেকেরই ইচ্ছা থাকে সকালের সাফল্য গাঁথা রৌদ্র ছুঁয়ে দিনটা শুরু করার। পরিশেষে যখন রোদের দেখা পাওয়া যায়, তখন তা হয়ে ওঠে সাবালোক। যা সকলেই এড়িয়ে চলতে চায়। এমনই স্নিগ্ধ রোদের পরশ না পাওয়ার আপসোস আমরা টের পাই ‘সকালের রোদ’ গল্পে।

আলোমতি, ষোলো বছর বয়সের এক মেয়ে। বাবা বিছানায়, মা অনেক দিন হল বিদায় নিয়েছে। তাই সংসারের ভার সামলাতে তাকে চালাতে হয় একটি টঙ (দোকান)। সেখানেও শান্তি নেই তার। মানুষরূপি কিছু শকুনের দৃষ্টি হরহামেশা থাকে তার ওপর। আর তখনই রক্ষাকবচ হয়ে ছুটে আসে গফুর। যে অনেক দিন হল হারিয়েছে বাকশক্তিসহ মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা। যতদূর জানা যায়, নিজের চোখের সামনে মিলিটারিদের হাতে বড় বোনকে ধর্ষণ ও হত্যা হতে দেখে। ফলে তার আজ এমন দশা। এমনই সাহসিকতার প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে ‘রক্ষাকর্তা’ গল্পে।

কিছু সফলতা অনুপ্রেরণা যোগায় অনেকের পথ চলায়। তেমনই একটা সফলতার গল্প ‘ভাগ্য বদল’। যেখানে মনির স্নাতক পাশ করে বেকার সময় কাটাচ্ছিল গ্রামে। কিন্তু এ জীবন কখনোই পছন্দ না তার। ঘুরে দাঁড়াতে চায় সে; কিন্তু সরকারি চাকরির পিছনে ছুটবে না। কেননা, তেমন টাকা-পয়সা বা চেনা-জানা মানুষ কোনোটিই নেই তার। তবুও আশাহত হয়নি কখনো। নিজ পায়ে দাঁড়ানোর লক্ষে একদিন পাড়ি জমায় শহরে। ঠাঁই মেলে চাচার বাসায়। ভর্তি হন স্নাতকোত্তর করার জন্য। পাশাপাশি খুঁজতে থাকে চাকরি। এভাবেই অনেক খোঁজাখুঁজির পর ডাক আসে একটি বেসরকারি কোম্পানি থেকে। বেশি কিছু না ভেবে ঢুকে যায় সেখানে। দিনরাত চরম পরিশ্রম করতে থাকে। ওদিকে তার থাকা নিয়ে চাচার সাথে চাচির প্রায়ই বাঁধতো বাকবিত-া। এক পর্যায়ে মেসে উঠতে হয় তাকে। যাতে খরচ চালাতে গিয়ে আরো হিমশিম খেতে হয়। এভাবেই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পার হয় দুটি বছর। বের হয় স্নাতকোত্তরের ফলাফল। সফলতার সাথেই পাশ করে সে। তারপরই খুলতে থাকে ভাগ্যে দুয়ার।

গ্রামের ছেলে সুবোধ। শহরের একটি ভার্সিটিতে পড়াশোনা করে। স্বপ্ন দেখতে খুব ভালোবাসে। কিন্তু বাস্তবে স্বপ্নগুলো তার থেকে অনেক অসম, তাই তাদের থেকে পাশ কাঁটিয়ে চলে। পড়াশোনায় সুবোধ খুব ভালো। নিয়মিত ক্লাস করা, পড়া রেডি করা, এ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করা, ক্লাসটেস্ট সম্পর্কে খোঁজ-খবর রাখা ইত্যাদিতে কোনো গাফিলতি নেই তার। হয়তো এসব কারণে ভার্সিটিতে ম্যাডাম থেকে শুরু করে অনেক সহপাঠিই খুব পছন্দ করে তাকে। অনেকেই গড়তে চাই প্রেমের সম্পর্ক। কিন্তু এসব থেকে সুবোধ যতটা পারে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে। কারণ এসব অসম সম্পর্কগুলোর সাথে তাল মিলিয়ে চলার অর্থ-কড়ি, সময়, যোগ্যতা কোনেটি নেই তার। কিন্তু শিক্ষিকা তাকে প্রেমের সর্ম্পকে জড়াতে বাধ্য করে। ছাত্র হয়ে শিক্ষিকার সাথে অসম প্রেম সুবোধ মেনে নিতে পারে না। এভাবেই সুবোধের শেষ হয় প্রতিটি দিন। আবারো জেগে ওঠে অসম সম্পর্কগুলো। যতটা পারা যায় দূরে রেখে বড় হওয়ার সংগ্রামে। এমনই নানা অসম সম্পর্কের উপাখ্যান ভেসে ওঠে ‘শহরের অসম প্রেম’ গল্পে। এ গল্পকে কেন্দ্র করে গ্রন্থের নামকরণ করা হয়েছে।

শুধু এ কটা নয়, তরুণ লেখক মোহাম্মদ অংকন সবগুলো গল্পে এমন সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন  আমাদের ব্যস্ততম জীবনের ঘটে যাওয়া নানা ঘটনাকে। প্রতিটা গল্প খুবই জীবনঘনিষ্ঠ ও বাস্তবমুখি। আশা করি, গল্পগুলো মন কাড়বে সকল পাঠকের।


গল্পগ্রন্থ : শহরের অসম প্রেম
লেখক : মোহাম্মদ অংকন
প্রচ্ছদ : আল নোমান
প্রকাশক : চর্যা প্রকাশ
প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০২০
মূল্য : ২৩০ টাকা।


অনিক মাযহার, অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ,
৩৯, জেল রোড, ঘোপ যশোর।



শুভ জন্মদিন মোহাম্মদ অংকন

শুভ জন্মদিন  মোহাম্মদ অংকন


শুভ জন্মদিন
মোহাম্মদ অংকন

ধানশালিক ডেস্ক :
৭ই নভেম্বর তরুণ লেখক মোহাম্মদ অংকন -এর শুভ জন্মদিন। তিনি চলনবিল অধ্যূষিত নাটোরের সিংড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি)’তে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিষয় নিয়ে স্নাতক শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখির মাধ্যমে তিনি এখন পরিচিত মুখ। দেশের জাতীয় দৈনিক পত্রিকার পাতাগুলো তার একচ্ছত্রে দখলে। শুধু তাই নয়, ভারত, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন বাংলা পত্রিকায় লিখেন। প্রতিদিন কোনো না কোন পত্রিকায় কলাম, গল্প, কবিতা, ছড়া, কৌতুক, ভ্রমণ ও বিভিন্ন ফিচার প্রকাশ হচ্ছে। অমর একুশে বইমেলা ২০১৯ এ প্রকাশ হয় তাঁর প্রথম শিশু-কিশোর গল্পগ্রন্থ ‘দুষ্টুদেরও বুদ্ধি আছে’।

জন্মদিন পালনের অনুভূতি জানতে চাইলে তরুণ এই লেখক বলেন, ‘জন্মদিন আসা মানে মৃত্যুর দিন এগিয়ে আসা। তাই জন্মদিন পালনে আগ্রহবোধ খুবই কম। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচুর মানুষের শুভেচ্ছা পাই; কল, বার্তা পাই- এগুলোতেই সন্তুষ্ট আমি।’

মোহাম্মদ অংকন -এর লেখালেখির প্রায় এক দশক পেরিয়েছে। তরুণ এই লেখক অনবরত লিখে চলেছেন। আগামী বইমেলায় কোনো বই প্রকাশ হচ্ছে কি’না এমন প্রশ্ন করলে তিনি জানান, ‘ঋজু প্রকাশ থেকে ‘এক রাজ্যে দুই রাজা’ শিরোনামে একটি শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ আসছে। আরও দু’টি শিশুতোষ গল্পের বই আসতে পারে। অন্যধারা পাবলিকেশন্স থেকে আসছে সম্পাদিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ। এছাড়া বেশ কয়েকটি যৌথ বই আসছে। আমার আত্মবিশ্বাস, পাঠকমহলে আমার বইগুলো গ্রহণযোগ্যতা পাবে।’

তরুণ এই লেখক লেখালেখি করে ইতোমধ্যে বেশ সম্মানিত হয়েছেন, পেয়েছেন বিভিন্ন পুরষ্কার। পেয়েছেন অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা, অর্জন করেছেন সু-পরিচিতি। লেখক অংকন’র ২২ বছর পূর্ণ হওয়ায় আমাদের পক্ষ থেকে জানাই প্রাণঢালা শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। শুভ জন্মদিন।

গল্প : শহরের অসম প্রেম

গল্প : শহরের অসম প্রেম


শহরের অসম প্রেম
মোহাম্মদ অংকন

প্রতিদিন সকাল হতেই পাশের বাসার ছাঁদগুলোতে রোদ এসে পড়ে। ছাঁদে জমে থাকা সারা রাতের বৃষ্টির পানিতে যখন রোদ পড়ে, বিশুদ্ধ পানি তখন ঝলমল করে ওঠে। বাতাসের ধাক্কায় মৃদু ঢেউ খেলে যায়। সেই পানিতে পড়া সূর্যের তীর্যক রশ্মি সোজা সুবোধের চোখে গিয়ে লাগে। তারপর সুবোধ ঘুম থেকে জেগে ওঠে। জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে বিশাল আকাশের একাংশ দেখে। পরিষ্কার আকাশ। আকাশ দেখতে দেখতে সময় বয়ে যায়। তবুও সে বিছানা ছাড়ে না। কিছুক্ষণ পর ঘর থেকেই বুঝতে পারে প্রতিদিনের মত আজও হাজার হাজার লোকজন অফিস, আদালত ও হাট-বাজারের দিকে ছুটছে। খোলা জানালা দিয়ে গাড়ির হর্ণ ও রিক্সার বেলের টুনটাং আওয়াজ কানে আসে। সবাই যেন ব্যস্ত, সে বোধটুকু সুবোধের হয় তখন। তারপরও তার চোখের ঘুম ছুটে পালালেও স্বপ্ন দেখা একদমই থেমে থাকে না। সারা রাতেও তার স্বপ্ন দেখা হয়ে ওঠেনাই। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল হয়তো। স্বপ্নরা কাছে ভিড়তে পারে নাই। তাই এই শেষ সকালে শহরের মত জেগে ওঠেতার হাওয়ায় ভাসানো সাদাকালোকয়েকশত অগোছালো স্বপ্ন। এগুলোকে ঠিক স্বপ্ন বললে ভুল হবে বোধহয়। এগুলো তার বিচ্ছিন্ন কিছু ইচ্ছে, কিছু আশা।

সুবোধ ক্যাম্পাস থেকে ফিরে সাঝবেলা দু’টো টিউশনি করায়। মাস শেষে কিছু টাকা-পয়সা হাতে পায়। নিজের খরচখরচাদির টাকা রেখে বাড়িতেও পাঠাতে হয় সেসব টাকা।বলা চলে, মাস শেষে আবার খালি হাতে পড়ে যায়। তবুও তার ইচ্ছে হয় কিছু টাকা জমিয়ে একটি দু’চাকারগাড়ি নেওয়ার। কেন এমন ইচ্ছে হয় সুবোধের? সে প্রতিনিয়তই দেখে তার শহুরে বন্ধুরা নামি দামি গাড়ি নিয়ে ক্যাম্পাসে আসা যাওয়া করে। তারা সহপাঠিদের নিয়ে এখানে সেখানে বেড়াতে যায়। তাই সুবোধ মনে করে,‘তারও যদি একটি গাড়ি থাকতো তাহলে তারও অনেক বন্ধু-বান্ধবি জুটতো। হয়তো তাদের সঙ্গে নিয়েকোনো একদিনবহুদূরে চলে যাওয়া যেত। সদ্য মুক্তি পাওয়া সিনেমা দেখা যেত।’ এসব ভাবার সময় সুবোধ তার দরিদ্র পরিবারের কথা একদমই ভুলে যায়। তার স্বপ্ন বিলাসী মনে তাকে তাড়া দেয়। ‘গ্রামে থাকুক নাপরে গর্ভবতী বোন কিংবা অসুস্থ বাবা। কিছুটা সময় হারিয়ে যাই না হয় অচিনপুরে।’প্রতিটি মুহূর্তে¦ এমনই কয়েকশত ইচ্ছে ভাসে সুবোধের নিজস্বআকাশে। মেসে যখন একাকী থাকে, তখন কল্পনার জগতে চলে যায়। আবার যখন রাস্তা দিয়ে হাঁটে তখনও কল্পনায় যেন হোঁচট খায়। কেউ হয়তো হাত আগলে বাঁচায় তাকে। সম্মানবোধ থেকে ‘সরি’ বলে আবার হাঁটতে থাকে। কিন্তু সে যতই স্বপ্ন দেখুক আর ইচ্ছের বীজ রোপন করুক, দিনের শেষে সেসব ইচ্ছে রং হারিয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। স্বপ্ন দেখার জন্য আবার রাত লাগে। ফিরেও আসে শহরের রঙিন রঙিন রাত।কিন্তু স্বপ্নগুলো আর বাস্তব হয় না। শুধু প্রেক্ষাপট বদলে যায়।

নয়টা বেজে যায়। সুবোধ তখন ভীড় বাসেতে বাদুড় ঝোলা হয়ে ক্যাম্পাসের দিকে রওনা দিয়েছে। ছাত্র মানেই হাফ পাশ। আর তাইতো কন্ডাক্টররা সিটের বন্দোবস্ত করে দেয় না। ব্যস্ত সময়ে অনেকেই সুবোধের মত ঝুলে ঝুলে গন্তব্যে পাড়ি জমায়। কেউবা অফিস আদালতে, কেউবা সুবোধের মত ক্যাম্পাসে ছুটেছে।ঘামের ঘ্রাণেতে নারী-পুরুষরা মাখামাখি হয়ে যায়। কেউ নাক আটকে ধরে। আবার কেউ ম্যানিব্যাগ সামলায়। সুবোধের সেসব দিকে কোনো নজর থাকে না। কেননা, তার তো কোনো ম্যানিব্যাগই নাই। দু একশত যা আছে তা ডান পকেটের কোনো এক ভাজে পড়ে আছে। সুবোধেরই নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। তাই দৃষ্টি তার অন্য দিকে খেলা করে। সিটে বসে থাকা কোনো এক যুবতির দিকে তার চোখ চলে যায়। মনে মনে সেই যুবতির সৌর্ন্দযের প্রশংসায় বিভোর হয়ে পড়ে। দু’চার জন যাত্রী ধাক্কা দিয়ে পাশ কেটে চলে গেলেও তার বোধোদয় হয় না। সে ভাবে, ‘শহরের মেয়েরাই ঝুঝি সকল সৌর্ন্দযের আধার।তাদের অঙ্গে সবসময় বেলী ফুলের গন্ধ শোভা পায়।’ তারপর কারো কারো সাথে সময় বুঝে একটু আধটু চোখাচোখি হয়। শহরের যুবতিরা মৃদু হাসে। আবার কেউ কেউ নাক ছিটকায়। পরের স্টপেজে যখন মেয়েরা নেমে যায়, তখন তার অপ্রাসঙ্গিক ঘোর কাটে। তাদের উষ্ণ সিটে বসে বাস্তব জগতের কথা ভাবে। ‘শহরের মেয়েদের নিয়ে স্বপ্ন দেখা অন্তত আমার মানায় না।এ এক অসম প্রেম। এতে শতভাগ ব্যর্থতা রয়েছে।’

শহরের রাজপথ ধরে বাস চলে অবিরাম গতিতে। আর একটু পাড়ি দিতে হবে। তারপর রংধারী সুবিশাল ক্যাম্পাস। মোবাইলের ঘড়ির দিকে সুবোধ তাকায়। সময় দেখে। মোবাইলের আলো নিভতে না নিভতেই একটি ম্যাসেজ আসে। ইনবক্স খুলতেই ইরানির নামটি ভেসে ওঠে। ‘আজ নোমান স্যারেরক্লাসটাবাদ দিও সুবোধ। প্লিজ, প্লিজ! আমি আর তুমি ক্যাফেটেরিয়াতে বসব। তোমাকে আমার আজ কিছু বলার আছে।’ ম্যাসেজটা দেখে সুবোধের জ্ঞান ফেরে। তারপর তার ডান হাতটি প্যান্টের পকেটে ঢুকায়। আগুলের ভাজে নোটগুলো ফেলে গণনা করে কতটাকা আছে। মোবাইলে তারিখ দেখে, আজ কত তারিখ চলছে। এই ইরানি হল শহরের বড়লোকের দুদালি। সুবোধের সাথে সখ্যতা আছে। হয়তো সুবোধের প্রেম প্রত্যাশী। সুবোধ তা মেনে নিতে পারে না। তার হাত খরচ দেখলে সুবোধের মাথা ঘুরায়। সুবোধ ভাবে, ‘ওর থেকে দূরে থাকাটাই আমার জন্য নিরাপদ।’ কিন্তু ইরানি তাকে সর্বত্র খুঁজে বেড়ায়। ইরানি নানা কারণেই সুবোধকে বন্ধু বানিয়েছে। আবার ভালোও বাসতে চায়। ক্লাসের যাবতীয় পড়ার খোঁজখবর জানা, এ্যাসানমেন্ট করা, কবে কোনো বিষয়ের ক্লাস টেস্ট সব তথ্য যেন সুবোধ জানে। তাই অনেকেই তার পেছন ছাড়ে না। সুবোধ ভালো ছাত্র। তাই এসব বিষয়ে সে বরাবরই বন্ধুসুলোভ। কিন্তু ভয় তার ওদের সাথে মিশলে কখন যে কিসের ট্রিট দেওয়া লাগবে তা বুঝে উঠা মুশকিল। ওরা সারাক্ষণ এর জন্মদিন, ওর পার্টি ইত্যাদি নিয়ে থাকে। এসব করতে যেমন টাকার দরকার, তেমনি সময়েরও দরকার। তার আরওভয়, ইরানির মত আরও কেউ যদি তার প্রেমে পড়ে যায়, তাহলে তাকে নিয়ে শহরের নামিদামি রেস্টটুরেন্টে যাওয়া লাগতে পারে।শহরের কসমেটিক্সের দোকানেও যাওয়া লাগতে পারে। যা সুবোধের জন্য জুলুম।

প্রতিদিন বিকালের দিকে সবার ক্লাস শেষ হয়।অনেকেই বাসায় চলে যায়। অনেকে ক্যাফেটেরিয়াতে বসে, চায়ের দোকানে আড্ডা দেয়। কিন্তুসুবোধের তন্নিম্যাডামেররুমে ডাক পড়ে যায়। তন্নি ম্যাডাম দেখতে যেন সুবোধের সহপাঠিদের বয়সী। চেহারায় চেনা যায় না যে তিনি একজন শিক্ষিকা। কিন্তু বয়স তা হবে বত্রিশের উপরে। তারপর আবার তাঁর এখনও বিয়ের কাজটি সমাপ্ত হয় নাই। সুবোধকে তিনি কি কারণে প্রতিদিন ক্লাস শেষে ডাকেন তা নির্ণয় করা কারও সম্ভব নয়। তবে যে কাজগুলো হয় তা সর্ম্পকে টুকিটাক জানা যাক এখন। সুবোধ ভালো ভালো কবিতা লিখতে পারে। বিশেষ করে রোমান্টিক প্রেমের কবিতা। তবে সে আবৃত্তিতে একদমই কাঁচা। যতদূর অনুধাবন করা যায়, সেগুলো শুনতে সুবোধকে ডাকেন তিনি। তাই বলে প্রতিদিন? একবার সুবোধ বলেছিল,
: ম্যাডাম, রোজ রোজ কবিতা আবৃত্তি আমার ভালো লাগে না। আর আপনিও জানেন, আমি ভালো করে আবৃত্তি করতেও পারিনা।
তখন ম্যাডাম উত্তরে বলেছিলেন,
: তুমি কি ভালোভাবে পরীক্ষায় পাশ করতে চাও হে যুবক?
তারপর থেকে সুবোধের অন্তরে ফেল করার ভয় ঢুকে যায়।সে ভাবে, ‘যেনতেন ভাবে হলেও আমাকে কবিতা আবৃত্তি করতেই হবে।’আবার সুবোধ এরকমও ভাবে, ‘ম্যাডামের মন অন্য কিছু চাচ্ছে না তো?’ তারপর নিজের জিহ্বায়কামড় দিয়ে তওবা করে।

সুবোধযখন তার ম্যাডমের কক্ষে কবিতা আবৃত্তি করে শোনায়, তখন সে কেমন যেনহাঁফিয়ে উঠে। যেন তার মাথায় মালামাল, শ্রমিকের মত বহন করছে। ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসএসির বাতাসেও তার শরীরকে ঠান্ডা করতে পারে না সে। ম্যাডাম তার থেকে বেশি দুরে বসে নয়। আবার সে যখন আবৃত্তি করে, তিনি তখন টহল দেন, কণ্ঠ মেলান।সুবোধের হাফিয়ে ওঠা দেখে ধমক দেন। ধমক শুনে আবার কবিতা আবৃত্তি শুরু করে। তখন তার চোখে ম্যাডামেরচুলগুলো ভাসতে থাকে। লক্ষ্য করে দেখে, ম্যাডামের কপালের টিপটা কেন্দ্র বরাবর নাই। হাত দিয়ে টিপটা ঠিকঠাক করে দিতেই ম্যাডামই তাকে আলতোভাবে স্পর্শ করে জরিয়ে ধরে। যেন সুবোধের দেহে জোয়ার বয়ে যায়। তারপর সেছন্দহীন একটি কবিতা আবৃত্তি করে। আর ভাবে, ‘যাক বাঁচা গেল!ফেলটাঠেঁকালাম।’ এমন করে প্রতিদিন এক ঘন্টা করে সুবোধের অসম প্রেমের পরীক্ষা চলে। এসব কেউ জানতে পারে না।

ততক্ষণে বেলা গড়ে যায়। সুবোধ ফিসফিস করে নিজেকে বলে, ‘আজওআমার বাসায় ফিরে যেতে সন্ধ্যা হবে।কখন যে ওদের পড়াতে যাব তা ভেবে পাচ্ছি না।’ সারাদিনের ক্লাস শেষে সুবোধের ক্ষুধা লেগে যায়। এ ক্ষুধা ফুসকা, চটপটির ক্ষুধা নয়।ডাল-ভাতের ক্ষুধা। কিন্তু ম্যাডামকে বোঝাতে পারে না। ম্যাডাম কি যেন এ ফাইলে ও ফাইলে রাখারাখি করে। আর সুবোধ ঠায় বসে থাকে।অতঃপর সুবোধের মোবাইলে ইরানির কল আসে। কিন্তু সুবোধ ধরে না। আবারফোনের পর ফোন আসে। ফোনের কম্পনে তার শরীরও যেন কম্পিত হয়।ইরানি শহরের মেয়ে হলে কি হবে সুবোধের ভালোই খোঁজখবর রাখে। তার চোখ বলে, সুবোধকে সে সত্য সত্যই মন দিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সুবোধ তা কখনই মানতে রাজি নয়।

ইরানি সুবোধের সবই জানে। সে এও জানে, ম্যাডাম তাকে ইচ্ছে মতন তার পেছনে ঘুরায়। কখনও একটুখানি তাঁরকথা না শুনলে তিনিযখন তখন সুবোধকে ধমক চড়ায়। সুবোধের অবুঝ কষ্টগুলো দেখে ইরানির ভীষণ মায়া হয়।শুধুমাত্র ম্যাডামের কারণে সে সুবোধের সাথে ভালভাবে মিশতে পারে না। সরাসরি বলতেও পারে না তার হৃদয়ে জমানো কথাগুলো। ম্যাডাম একদিকে যেমন প্রতিদ্বন্দি, অন্য দিকে সুবোধের অনীহা লক্ষ্য করে। অনেক সহপাঠিই সুবোধের সাথে মিশতে চায়। কিন্তু ম্যাডাম তাদেরকে সুযোগ দেয় না। ম্যাডামের কাছে সুবোধ সবচেয়ে প্রিয়। শ্রেণিতে যখন সি.আর নির্বাচন করা হয়, তখন অন্য কোনো ছেলেমেয়েকে নির্বাচন করা হয় না। প্রতি সেমিস্টারে সুবোধকে সি.আর বানানো হয়। যাতে করে সুবোধ আর ম্যাডামের মধ্যে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকে। ক্লাসের দুষ্টু ছেলেরা সুবোধকে ক্ষেপায় আর বলে, ‘সুবোধ রে তোর তো কপাল খুলে গেছে, মামা। স্বয়ং ম্যাডামই তোর প্রেমে হাবুডুব খাচ্ছে।’ সুবোধ ওদের কথায় একদমই কান দেয় না। সে ভাবে, ‘এই ক্যাম্পাসে আমি যতই সুদর্শন হইনা কেন, আমি কখনইঅসম প্রেমকে মেনে নেব না।’

অতঃপর বিকাল সাড়ে পাঁচটা বেজে যায়। ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে আসে। তখন মুক্তি পায় একুশ বছরের সুবোধ নামের নির্বোধ ছাত্রটা। তার আর দেরী সহ্য হয় না। ‘কখন বাসায় ফিরে যাব?’ কেউ পেছন ফিরে ডাকলেও যেন তাকানোর সময় থাকে না। তার মন তখন উদাস হয়। তার মনে তখন একটাই প্রার্থনা, ‘সাঁঝনেমে আসুক। আঁধারে ঢেকে যাক আমার দেহের অদৃশ্য ময়লাগুলো। আর পারছি না। শরীরটা বেশ ক্লান্ত। সারাদিন প্যান্ট আর শার্টের চিপুনিতে শরীরে যেন কয়েকশত দাগ বসে উঠেছে।বড্ড বিশ্রাম প্রয়োজন।’ তারপর আবার সেই চিরচেনা বাসে ওঠে। শরীরখানা সিটে বিছিয়ে দিয়ে বাসায় ফেরে।

তারপর..অন্ধকারের পর্দা নামে শহরে। সঙ্গে সঙ্গে নিয়ন বাতিগুলো ঝলসে ওঠে। সুবোধইচ্ছে করে বসে থাকে অন্ধকারে। সেদিন আর টিউশনিতে যাওয়া হয়ে ওঠে না। ক্লান্ত শরীরে যেন শহরের বাতির আলোগুলো এসে অকপটে ঝিলিক দেয়।সুবোধের মনের ভেতর অনেক কথাই লুকিয়ে থাকে। বলা হয় না কাউকে। প্রতিবাদও করতে পারে না। গ্রাম থেকে মায়ের ফোন আসে।
: বাজান, তুমি কি ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরেছ? দুপুরে কি খাবার খাইছ?
: মা, আমি ব্যস্ত আছি এখন। তোমাকে আমি পরে কল করব।
এই বলে মোবাইলটা সাইলেন্ট করে রেখে দেয়। মায়ের সাথে মিথ্যা কথা বলায় তারপর তার মনটা ভীষণ পোড়ে। অতঃপর তার মনেরগ্লানিগুলো চাঁদেরবিচ্ছিন্ন কপালে গিয়ে আঘাত করে। তার মনটা মরে যায়। জেগে থাকে নিস্তব্ধ রঙিন শহর। সুবোধের চোখের ক্লান্তির ঘুম আসে। তারপর আসে কয়েকশত স্বপ্ন, এসে আঘাত করে। কিন্তু ঘুমের ভেতর প্রবেশ করতে পারে না। তারাও সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে। শহরের মেয়ে ইরানির মত তারাও সুযোগ খোঁজে। কিন্তু ম্যাডামের মত করে তাকে কেড়ে নেয় ঘুম।

প্রতিনিয়ত এভাবেই অসম প্রেমের কিছু উপাক্ষান নিয়েই জেগে থাকে সুবোধের শহর। তার দুঃখগুলো যুগান্তরের বাহনেরা নিজ দায়িত্বে বহন করে চলে।আর তার ইচ্ছেগুলো চুপসে যায়, সে খোঁজ কেউই রাখে না। সবাই তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে মনটাকে নিয়ে খেলতে চায়। তার শরীরকে টক তেঁতুলের মত করে চুষতে চায়। তার শরীরে যে হৃদয়টা দারিদ্রতার কষাঘাতে মরেগিয়েছে, তার খোঁজ কেউ রাখে না। সে তার মেধার বিকাশের জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে তাও কেউ অনুধাবন করে না। সুবোধ পরক্ষণে শান্ত¡না পায় এই ভেবে যে হয়তো তার মত অনেকেই আছে এই শহরে যারা কি না তাদের ইচ্ছে কে বির্সজন দিয়ে অসম প্রেমে গা ভাসাচ্ছে। অতঃপর সুবোধের চোখ বন্ধ হয়ে আসে। বিছানায় পড়ে রয় সুদীর্ঘ দেহ। আর ঘুমের ঘোরে সুবোধ বলতে থাকে, ‘কবে আমি মুক্তি পাবো?’ অপরদিকেঅপেক্ষায় থাকে আরেকটি সকাল সুবোধকে জাগিয়ে ব্যস্তময় অসম প্রেমের শহরে নিক্ষেপ করতে।