কবির কাঞ্চন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
কবির কাঞ্চন লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

পদাবলি

পদাবলি




ভিখারি 

নাসরিন জাহান মাধুরী 


ভেতরের অবদমিত প্রতিজ্ঞা 

শপথের বাক্য 

যাও যাও যাও, এই বেলা তুমি যাও

তারপর যেতে থাকি যত দূরে যাওয়া যায়


যত দূরেই যাই 

তোমার বৃত্তের পরিধি, ব্যাস, ব্যাসার্ধ 

কিছুই ডিঙাতে পারি না

সাত রঙা পাহাড় ডিঙাই

ময়ূরাক্ষী নদীতে ভাসি

সাত সমুদ্র তেরো নদী

অনন্ত নক্ষত্র বহুকাল আগে যার আলো

কৃষ্ণ গহ্বরে বদলে গেছে তার আলো ডিঙাই.. 


যাও যাও যাও, এই বেলা তুমি যাও

তারপরও যেতেই থাকি

ব্যথার রাগিণী বেজেই চলে

যাও যাও যাও এই বেলা তুমি যাও


যেতেই হবে! যেতে হবেই!

চোখে বিস্ময় মনে বিস্ময় নিয়ে

চলে যাই চলে যাই অজানায়

সব অগ্রাহ্য করে

আর কোন মোহ নেই

নেই মায়া পাখি 

নেই পিছু ডাক

কোন সীমা রেখা আর আটকাতে পারে না...



ভুলে যেয়ো আমাকে

ম্স্তুফা হাবীব


মানবিকা, আমাকে ভুলে যেয়ো। 

তুমি চেয়েছিলে স্বপ্নের গাছটিতে ফুল ফুটুক, 

সুবাস ছড়াক বসন্তের সুহাসিনী বাতাসে।


আড়িয়াল খাঁর উন্মত্ত ঢেউয়ে 

স্বপ্নগাছটির শেকড় থেকে মাটি সরে গেছে 

আজও ফেরারি আসামির মতো সেই দুর্ভাগা স্বপ্ন 

 অচেনা প্রান্তরে পালিয়ে বেড়ায়।


তোমার রূপনগর আর দেখা হল না আমার

তিল শোভিত পাতাবাহার গালে হল না চুমু খাওয়া

জংধরা আরশিতে চোখ রেখে শুধু স্মৃতির আবাদ। 


মানবিকা, চার দশকেরও অধিক সময়

বেয়ে যাচ্ছি কালের বৈঠা

আগুনমুখা নদীর উপাখ্যান লিখেও 

আজও ভিড়তে পারিনি তোমার ঘাটে।


মানবিকা, ভুলে যেয়ো আমাকে

হৃদয়ের বিলবোর্ডে কেনো লিখে রাখো মুস্তফা হাবীব !


অস্তিত্ব

মুহম্মদ মহসিন হাবিব 


একদিন তরতাজা কলমিলতা হয়ে

খাদকে রূপান্তরিত হবো

আর আমার স্বজাতিরা পোকা মাকড়ের কামড়ে জর্জরিত হবে 

ফিরেও তাকাবে না কেউ

জীবন খিদে মেটাতে আমাকেও

রান্নার রেসিপি হতে হবে কোনো এক পছন্দের থালিতে

কিম্বা পড়ন্ত বিকেলের আলোয় ধুলি মাখা দেহে শিউলি পচা হয়ে 

ঠাই মিলবে আস্তাকুড়ের লুকানো ঠিকানায়

ফুল মালার সমারোহ থাকবেনা;

থাকবেনা মাটি উৎসবের সমারোহ

শুধু থাকবে অন্ধকার আকাশে এক ফালি চাঁদের বিরাজমানতা।



কীর্তিনাশা নদীটি

নাঈমুর রহমান


কীর্তিনাশা নদীটি তারে আমি চিনি

চিনি আমি আগন্তুকের নাম।

চোখ জুড়ে তাঁর বনলতার কালিমা

কীর্তিনাশার ঢেউয়ে বহে কাজলরেখা।

সন্ধ্যা এলে আবার ফিরে শিরীষ গাছের বনে

হলুদ রঙের ডানা মেলে 

কীর্তিনাশার বিস্তীর্ণ বুক জুড়ে।

আমি চিনি তাই,

চিনি আমি আগন্তুকের এলোচুলের হিজল-কমল।

কীর্তিনাশা গাহে, বহে অপরাহ্ণের সমুষ্ণ বাতাস,

খুব কাছাকাছি কলমির ফুলের দলে

সে আগন্তুক শাশ্বত নদীর মেয়েটি।

চিনি আমি কীর্তিনাশা

চিনি আমি আগন্তুকের নাম।




মুক্ত করে দিলাম

প্রণব কুমার চক্রবর্তী 


স্বপ্ন তোকে আর পারছি না 

                            চোখের সামনে ধরে রাখতে ...


ভাবনা তোকেও পারবো না

মনের ভেতরে দু হাতে ধরে রাখতে

খুব বেশী দিন...


আলো গিলে খাওয়া 

অন্ধকারছন্ন মেঘের টুকরোটা 

ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে-

সামনে 

পেছনে 

আমার চারপাশে ......


যাহ্ মন 

তোকে পাখি করে উড়িয়ে দিলাম আজ

খুঁজে নিস 

উড়ে গিয়ে 

তোর বাসা বাঁধার মতো 

নোতুন কোনও 

সবুজ উন্মক্ত মাঠ 

শালিকের মতো গুটি গুটি পায়ে 

খুঁটে তুলে নিস 

ঘাসের নীচে লুকিয়ে থাকা 

                           জীবনের যথার্থ বর্ণমালা...



সময়গুলো বড় নিষ্ঠুর

জহিরুল হক বিদ্যুৎ


সময়গুলো বড় নিষ্ঠুর মমতায় হাত বাড়ায়

কখনো প্রচ- খরা হয়ে, কখনো ঘন কুয়াশা হয়ে।

দৃষ্টি নত হয়, দুর্ভেদ্য মনে হয় দূরের পারাপার

পথ হারায় কুহক চাদরে একঝাঁক শুভ্রকপোত।

বসুধায় কে আছে, যে বুক পেতে রাখে?

খুঁজি তারে, দেখি না তারে,

সে হারায় পথে-ঘাটে-প্রান্তরে, দূরের আবছা আলোয়

নিঃসঙ্গ খুঁজে যায় স্বর্গের অনন্ত সৌরভ,

চাতক পিপাসায় চেয়ে থাকে আকাশপানে

হায়! চোখের জলে কী স্বপ্নভাঙ্গার তৃষ্ণা মেটে?


স্বার্থের সূচকে বিশ্বে ভালোবাসার দরপতন

অসংখ্য কবিতারা দিয়ে যায় আত্মাহুতি;

শেষ ভগ্নাংশগুলো আর্তনাদ করে ওঠে বেদনায়

কবে ফুটবে ফুল কোন বসন্তে, শুদ্ধ মানবচেতনায়?

ঘৃণাগুলো আরো ঘৃণিত হয়ে উঠছে

বিষাদের কালোরঙে লেপ্টে গেছে পৃথিবীর মানচিত্র।

বর্ণবৈষম্যে আজো জ্বলে পুড়ে মরে মানুষ

জাতিগত ভেদে সাম্প্রদায়িক নীল-নকশা আঁকে;

স্বাস্থ্য নিয়ে স্বার্থ খোঁজে অসুস্থ পুঁজিবাদিরা

মেতে ওঠে বিধ্বংসী অনুজীবের উত্থান-পতনে;

হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অচেনা অনুক্ষণ

কে তারে চিনতে পারে বিক্ষুব্ধ নগরে?



বিশ্বাস বিশ্বাস খেলা

ইয়াসিন আরাফাত 


ক্যারম খেলায় অনেকের ভয় হতো আমার সাথে দাঁড়াতে।

বিস্তৃত হাওরের কিনারে ফুটবল খেলেছি বহু

গোল করিনি কখনও তবুও জিতেছি সতীর্থের গোলে।

আর অপ্রিয় খেলা ক্রিকেটে আমি পাকাপোক্ত নই।

এমন আরও অনেক খেলা খেলেছি আমি

গোল্লাছুট, চোর পুলিশ, বউচি, লাই, কপালটুকি আরও কত কী!

প্রচলিত বিধান অনুসারে কখনও হেরেছি কখনোবা জিতেছি।

সেইসব ভুলে গেছি শৈশবমূখর রাত পোহানোর আগে।

কেবল ভুলতে পারি না সহস্র রাত ধরে, বিশ্বাস বিশ্বাস খেলায়

মানুষকে বিশ্বাস করে জিততে পারিনি আজও!



মধ্যবিত্তনামা

মাজহারুল ইসলাম


তোমাকে লিখবো লিখবো করে

কত দিন কেটে যায় আমার!

সকাল দুপুর বিকেল গড়িয়ে

রাতের আঁধার সবকিছু কেমন গ্রাস করে নেয়

মোটা ভাত মোটা কাপড়ের অধিকারটুকু ও।


বেঁচে থাকার জন্য এই যা-

একমাত্র ‘মধ্যবিত্ত’ তকমাটা ছাড়া

আর কিছুই যে থাকে না !

তাইতো আগ-পিছ ভেবে-চিন্তে

তোমাকে আর লেখা হয় না!


জানো তো-

মধ্যবিত্তের জমি-জিরাত ঘর-দোর সবই থাকে

বাড়ির দক্ষিণকোণে শান বাঁধানো পুকুর থাকে

সুখ দুঃখ হাসি-কান্নার রক্ষণশীল গল্প থাকে

উন্মুখ প্রাপক থাকে শুধু প্রেরক থাকে মধ্যবিত্ত মননের !


নীরব নামতা

জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ


ফুরিয়ে যাওয়া একটা দুপুরের মত

ফুরিয়েই যাচ্ছি, কোনো রকম আছি;

এটাকে বেঁচে থাকা বলে; ভালো থাকা নয়।


কিছু খুঁচরো আলো ছুঁতে গিয়ে 

একশ জোনাকির মৃত্যু হয়েছিল; কেউ জানেনা-

সকালের ইতিহাস মনে রাখিনা; এভাবেও যে

পাঠ করে নিতে হয় নীরব নামতা; জানা ছিল না।


তুমি হয়ে গেলে আমার ভালো থাকা; বিরহ-

আমার নির্বাক কবিতার নির্মহ ঘ্রাণ;

তুমি ভাবো না কষ্মিন সময়ে-

অথচ কেউ না হওয়া এই আমি তোমার কেউ একজন।




 

ঘুড়ির আকাশে ঘুরি...

ঘুড়ির আকাশে ঘুরি...

 

    অলঙ্করণ : জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ


ঘুড়ির আকাশে ঘুরি...

মোঃ তাইব হাজারী


আমার ঘরের বাতিটা নষ্ট হয়ে আছে বেশ কিছুদিন যাবত । সারাদিনে এই কথাটি একবারের জন্য হলেও আমার মনে পড়ে না। ছোট বেলায় একটা গল্প প্রায়ই আমার দাদির মুখে শুনতাম। মাঘের শীতে নাকি শিয়ালের খুব কষ্ট হয়। রোজ রাতের বেলা শীত অসহ্য হলে শিয়াল মনে মনে ভাবে যেভাবেই হোক সকাল হলেই লেপ কাঁথার জোগাড় করবো। কিন্তু সকালে রোদ উঠলেই শিয়ালের আর সে কথা মনে থাকে না। আমারো হয়েছে সেই গল্পের শিয়ালের মতো দশা। তবে অন্ধকার ঘরে থাকতে যে খারাপ লাগে তা কিন্তু নয়। চলতে ফিরতে সমস্যা হয় প্রথম একটু আধটু।  অন্ধকার ঘরে প্রথমদিন কেউ থাকলে তার মনে হবে কেউ হয়তো তার গলা টিপে ধরছে! দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এমন হাঁসফাঁস অবস্থা। বেশ কিছুদিন থাকলে সেই সমস্যার সমাধানও হয়ে যায়। পৃথিবীতে কোনোকিছুই স্থানী নয়। আমাদের সমস্যাগুলোও না। আজকে রাতে ঘরে বাতির প্রয়োজন অনুভব করছি কারণ আমার মাথায় ঘুড়ি বানানোর হুজুগ এসেছে। সাঁইত্রিশ বছরের একটি লোকের প্রকাশ্যে ঘুড়ি বানানোর অধিকার নেই। পাশের রুমের বাতেন ভাই দেখে ফেললেই বলে বসবেন রিপন তোমার বয়স দিনকে দিন নিচের দিকে নামছে ! এখন সম্ভবত চৌদ্দ পনের হবে কী বলো?

উনি এমনই। কয়েকদিন আগে বৃষ্টির ভেতর অল্প বয়সী ছেলেদের সাথে ফুটবল খেলছি এমন সময় বাতেন ভাই ছাতা মাথায় আসছিলেন। আমাকে দেখেই ডেকে নিয়ে একগাদা কথা শুনিয়ে দিলেন। আপাতত তার ভয়েই দিনের বেলা ঘুড়ি বানানো হচ্ছে না আমার।  এদিকে রাতে ঘরে বাতি নেই। আজ আর ঘুড়ি বানানো হবে না। অন্য কোনো সময় হলে নিউমার্কেট গিয়ে একটা ঘুড়ি কিনে নিয়ে আসা যেত। সারাদেশে এখন লকডাউন চলছে। ঘর থেকে বের হলেই পুলিশি জেরায় পড়তে হচ্ছে।  স্থান বিশেষে সেনাবাহিনীর লাঠির আঘাতে কারো কারো পশ্চাৎদেশে কালশিটে পড়ে যাচ্ছে। অথচ অতদিন ঘুড়ি কেনার সহজ সুযোগ ছিল কিন্তু আমার ঘুড়ি উড়ানোর সময় হয়ে উঠেনি। সময় হয়ে উঠেনি কথাটা সম্ভবত ভুল হলো। ইচ্ছে থাকলেই সময় হয়ে উঠে। অফিসের নিয়মে বাঁধা কর্মঘণ্টার বাইরে যেটুকু সময় পাওয়া যায় তাতে আর কৈশোরে ফেরার পাগলামি করা হয়ে উঠে না। পৃথিবীর বর্তমান দূর্যোগে ঘরে বন্ধ দিনগুলোয় যখন মন হাপিত্যেশ করছে তখন  এমন ইচ্ছাকে নিজে নিজেই সাধুবাদ জানাতে ইচ্ছা করছে। আমার নিজের কাছে যদি কোনো কাজ ভালো মনে হয় এবং সেই কাজ যদি আমি নিজেই করি তাহলে নিজেই নিজেকে বেশ কয়েকবার ধন্যবাদ দেই। কে কবে কোন কাজের জন্য আমাকে ধন্যবাদ দেবে সেই আশায় তো উৎসাহে ভাঁটা ফেলতে পারিনা। তাই নিজে নিজেই এই উপায় বের করে নিয়েছি। তাতে কে কী বললো শোনার দরকার নাই আমার। আজ আর নিজেকে ধন্যবাদ দিতে পারছি না। বরং নিজেকে এখন একখানা কাগজের ঘুড়ির জন্য তিরস্কার দিতে ইচ্ছে করছে।

যখন যে জিনিসটা পাওয়া কষ্টসাধ্য হয়ে উঠে তখন তার প্রতিই মানুষের অনুরাগ আর আক্ষাঙ্খা প্রবল হয়। 


পুরো পৃথিবীর মানুষ এখন ঘরবন্দী জীবন কাটাচ্ছে। একটি ভাইরাস আজ পৃথিবীর মানুষের সব সাফল্যের অহমিকাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে।  চীনের উহান প্রদেশ থেকে করোনা ভাইরাসের প্রকাশ ও বিস্তার হলো। প্রথম প্রথম চীন সরকার ভাইরাসটির কারণে সেদেশে মৃত মানুষের সংখ্যা গোপন করতে থাকে। মারাত্মক ছোঁয়াচে এই ভাইরাসের সংক্রমণে উপসর্গ হিসেবে সর্দি কাশি জ্বর ও শ্বাসকষ্ট হয়। সাধারণ ফ্লুর মতো উপসর্গ হওয়ায় বিশ্বের তাবড়-তাবড় দেশগুলো প্রথমে পাত্তা দেয়নি করোনাকে। বাংলাদেশের এক জেনৈক মন্ত্রীই ঘোষণা করে বসলেন আমরা সম্মিলিত জাতি করোনার চেয়ে বেশি শক্তিশালী। তখন সবারই কম বেশি মনে হচ্ছিল করোনা কারো কিছু করবে না।

কিন্তু যত দিন গড়ালো করোনা ততই শক্তিশালী এবং প্রাণনাশী হয়ে উঠল। চীনের সাথে সারাবিশ্বের বাণিজ্যিক সম্পর্কের সূত্র ধরে খুব কম সময়ের মধ্যে সারাবিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ল। করোনা বৃদ্ধ রোগীদের জন্য খুবই খারাপ অবস্থার সৃষ্টি করে বসল। তাছাড়া যে সব লোকের ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ রোগ আছে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ায় তাদের জন্যও করোনা ভয়াবহ হয়ে উঠল। চীনের পর ইতালি স্পেন জার্মানীতে করোনার ভয়াল থাবা পৃথিবীবাসীকে বিচলিত করে তুলল। তারপর তার থেকে রক্ষা পেলো না যুক্তরাষ্ট্র যুক্তরাজ্য ফ্রান্সের মতো দেশগুলোও। স্বল্প সময়ে পুরো পৃথিবীতে মানুষের আতংকের নাম হয় উঠল করোনা ভাইরাস। করোনা ভাইরাস তখন মর্যাদা লাভ করলো ডঐঙ থেকে। ডড়ৎষফ ঐবধষঃয ঙৎমধহরংধঃরড়হ কোভিট -১৯ নাম দিলো। কোভিট- ১৯ আক্রান্ত রোগীর সর্বশেষ অবস্থা ক্রোনিক নিউমোনিয়ায় সারাবিশ্বে মরতে শুরু করল প্রতিদিন হাজারে হাজারে মানুষ। পৃথিবীর মস্ত বড় বিজ্ঞানী ডাক্তার নার্সদের ঘুম হারাম হয়ে গেল মূহুর্তের মধ্যে। বার বার জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে করোনা তার প্রতিষেধক তৈরীর সমস্ত চেষ্টাকে ভেস্তে দিতেই থাকল। জেনেটিক পরিবর্তনের সূত্রেই পরবর্তীতে শিশুরাও আক্রান্ত হতে শুরু করল। প্রতিষেধক যেখানে নেই প্রতিরোধই সেখানে একমাত্র উপায় মেনে পুরো পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশে অঘোষিত লকডাউন জারি করলো সরকার। করোনা মোকাবিলা নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের জের ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা রোজ হাসির পাত্র হয়ে উঠলেও সেই হাসিতে তো ছিন্নমূল মানুষের পেট চলে না। তাই কাজের খোঁজে আর সাহায্যের আশায় করোনার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ঘর থেকে এসব মানুষ বের হচ্ছে প্রতিদিনই। সরকার দিনরুজি মানুষের জন্য যে ত্রাণের বরাদ্দ দিলো সেই ত্রাণের চাউল দেশের জনপ্রতিনিধিরা চুরি করে নিলো! ক্ষমতাসীন দলের নেতা, চেয়ারম্যান মেম্বারের গোপন আস্তানায় পুলিশের তল্লাশিতে বের হতে লাগল টন টন চাউল। দেশের এমন পরিস্থিতিতে যারা গরিবের হক মেরে খায় তাদেরকে যে পশুর সাথে তুলনা করা হবে সেই পশুরই জাত যাবে। ভোটের সময় শুধু ধোয়া কাপড়ে আতর মেখে চারিত্রিক শুদ্ধতা প্রচার করলেই হলো। এখন দেশের মানুষ গোল্লায় যাক। এদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার বালাই বলেও কিছু নাই। যদি থাকতো তাহলে এই সব চোরেরা প্রতিনিধি হতে পারতো না। দ্বিতীয়ত্ব করোনা মারাত্মক ছোঁয়াছে রোগ জানা সত্ত্বেও দল বেঁধে আড্ডাবাজি না করলে এদের কারো পেটের ভাত হজম হয় না। 

সরকারি বেসরকারি সব অফিস আদালত বন্ধ। ওষুধ মুদিখানা আর কাঁচামালের দোকান ব্যতীত সমস্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। জনসমাগম এড়িয়ে চলতে বার বার বলা হচ্ছে সরকার ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? ছিন্নমূল লোক রাস্তায় বের হচ্ছে নিছকই পেটের দায়ে আর কিছু পাতি আমজনতা রাস্তায় রঙ তামাশা করে বেড়াচ্ছে কোন আগ্রহে তার কোনো সঠিক ব্যাখা নেই। হুজুগে বাঙালি না দেখে শিখবে আর না ঠেকে শিখবে। ভাব খানা এমন যে যারা জন্ম থেকেই বিদ্যাসাগর তাদের সামান্য করোনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার কিছু থাকতে পারে না। তাদের জানা উচিত করোনা কিন্তু পাগল ছাগল কিছু মানে না। তখন যে দাঁত কেলিয়ে বলবেন আমি পাগল ছাগল মানুষ আমারে ছেড়ে দাও বাপু করোনা। নাহ, সেটা হবে না।

    অলঙ্করণ : জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ

আপাতত ঘুড়ি বানানোর কাগজ কাঠি আর আঁঠা গুছিয়ে রেখে দিলাম। বাতেন ভাই আমার অফিস কলিগ। দুজন পাশাপাশি দুইটা রুমে ভাড়া থাকি। আমি এমনিতে স্মোক করি না। তাই সিগারেট কেনার বালাইও নাই। মাঝেমধ্যে বাতেন ভাইয়ের থেকে নিয়ে খাই। কখনো অর্ধেক পোড়া সিগারেট বাতেন ভাই কাউকে দেন না, দিলে পুরোটাই দেন। আমি গিয়ে বাতেন ভাইয়ের কাছে এক শলাকা সিগারেটের আবদার করলাম। বাতেন ভাই আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন কী ব্যাপার তোমার মন খারাপ নাকি? বাতেন ভাই বিষয়টি আঁচ করতে পেরেছেন বলে লজ্জিত হলাম। অথচ মন খারাপ কম বেশি সবারই হয়। এখানে লজ্জা পাওয়ার মতো কোনো ব্যাপার নেই। আমি বাতেন ভাইয়ের কথায় শুধু ঘাড় নাড়লাম। বাতেন ভাই বললেন তামাক হচ্ছে শরীরের বিষ। খারাপ অভ্যাস না করাই ভালো। তারপর প্যাকেট খুলে একটা সিগারেট আমার দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বললেন এক শ্রেণীর লোক আছে যাদের জীবন অন্যকে ভালো হওয়ার উপদেশ দিতে দিতেই কেটে যায়, তারা নিজে ভালো হওয়ার সময় পান না। কথাটি কার বলতে পারবে? আমি থমথম খেয়ে বললাম আপনার। বাতেন ভাই মুচকি হেসে বললেন কথাটি হচ্ছে সাহিত্য সম্রাট হুমায়ুন আহমেদের। এই যে আমি নিজে একজন চেইনস্মোকার অথচ তোমাকে উপদেশ দিলাম সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস তৈরী করো না। কী অদ্ভুত ব্যাপার তাই না? আমার থেকে উত্তরের অপেক্ষা না করে তিনি বলতে লাগলেন, সাহিত্যের প্রতি একটু অনুরাগী হও। জীবনের অর্থকে খুঁজে পাবে এখানে। বাতেন ভাইয়ের কাছে জোড়াগোল খেয়ে উঠে দাঁড়ালাম। আমার অন্ধকার ঘরে কোথায় কী রাখা আছে আমি জানি। টেবিল থেকে লাইটার খুঁজে নিয়ে সিগারেট ধরালাম। জানালায় দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি। বাতেন ভাই ঠিকই বলেছেন। আমি সাহিত্য বুঝি না। এই যে আমার এখন মনে বাজছে-

পৃথিবীটা সুস্থ হলে 

তুমি আমি ফের আরেকবার দেখা করবো।

আমার জন্য রবি বুধের মাঝামাঝি 

একটি বিকেল রেখো।


অথচ আমার সাথে সেই বিশেষ কারো কোনো দেখা হয়নি। তার কাছে কোনো বিকেলের প্রার্থনা সুস্থ পৃথিবীতেও কোনোদিন করিনি। কোনো কোনো ব্যাপারে অধিকারের প্রয়োজন পড়ে। আমি আজ অবধি সেই অধিকারের হদিস করে উঠতে পারিনি। আর রবি অথবা বুধবার আমার কাছে বিশেষ কোনো দিনও না। 


পরেরদিন ঘুড়ি তৈরির কাজ শেষ হলো।

প্রথমদিন যখন আমি লাটাই নিয়ে ছাদে ঘুড়ি উড়াতে বসলাম তখন আশে পাশের ছেলে বুড়োরা আমার দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে দেখতে লাগলো যেন আমি একজন অপরাধী যে কিনা কিছুক্ষণ হলো জেলের প্রাচীর টপকে অথবা পুলিশের ভ্যান থেকে পালিয়েছি! পাশের বাসার এক মহিলাকে বলতে শুনলাম এমন দূর্যোগের দিনে আধবুড়োর কান্ড দেখে অবাক হতে হয়! মানুষের স্বভাব হচ্ছে যখনই কেউ ভালো কাজ করে আশেপাশের লোকজন তার সমালোচনা করে। তারপর তাকেই আবার অনুসরণ করতে থাকে। আমি দমে গেলাম না এতটুকুও। রোজ সকাল বিকেল দুই বেলা করে ভাড়া বাসার ছাদে ঘুড়ি উড়াতে থাকলাম। সপ্তাহ না ঘুরতেই একজন দুজন করে আশেপাশের প্রায় সমস্ত বাসার ছাদে ছেলে বুড়োর দল ঘুড়ি উড়াতে শুরু করল! নিয়ম ভেঙে কোনো কিছু শুরু করাটাই কঠিন, একবার শুরু হলে চলতেই থাকে। বিকেল হলে এখন আমার চারপাশের আকাশটা নতুন করে সাজে। মূহুর্তেই আমার মন মৃত্যুভয়ের আড়ষ্টতা মুছে ফেলে ঘুড়ির সাথে  আকাশে ভেসে বেড়ায়। খুশীরা ঘুড়ির মতোই এঁকেবেঁকে চলে। আমরা যতসময় খুশি থাকি ততটুকুই বাঁচার স্বাদ পাই।


সন্দেহ

সন্দেহ


সন্দেহ
কবির কাঞ্চন

আবু সুফিয়ান। বয়স আনুমানিক ১২ হবে। এ বয়সেই বাবা-মাকে হারিয়েছে সে। ৭ বছর বয়স থেকেই সে মোতালেব মিয়ার বাড়িতে কাজ করে। প্রথমে তাকে বাড়ির এককোণে অবস্থিত পরিত্যক্ত একটি রুমে থাকতে দেয়া হয়। এরপর বাড়ির সবার যেকোন প্রয়োজনে সুফিয়ানকে ডাকা হয়। সুফিয়ানও সবার সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। বাড়ির বাজার করা, ঘরদোর পরিষ্কার করা, মোতালেব মিয়ার একমাত্র ছেলে সোহেলের দেখাশোনা করা তার প্রধান কাজ।
দিনে দিনে মোতালেব মিয়ার পরিবারের সদস্যদের সাথে তার গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ইতোমধ্যে থাকবার জন্য মোতালেব মিয়ার মূল ভবনের একটি রুমও পেয়েছে সে।

রেহনুমা বেগম। মোতালেব মিয়ার স্ত্রী। একজন ধার্মিক মহিলা। সুফিয়ানকে তিনি খুব দেখতে পারেন। সুফিয়ানও তার ভালোবাসার মাঝে মায়ের অকৃত্রিম ভালোবাসাকে খুঁজে পেয়েছে। মোতালেব মিয়া একটু গম্ভীর স্বভাবের মানুষ হলেও সুফিয়ানকে মাঝে মধ্যে আদর করেন। হাতখরচের জন্য কিছু টাকাও দেন। সোহেল তাকে আপন ভাইয়ের মতোই জানে। এতোদিনে মোতালেব মিয়ার পরিবারের সদস্যদের সে আপন করে নিয়েছে। ওদের মাঝেই বেঁচে থাকার শক্তি ফিরে পেয়েছে।

একদিন বাজার থেকে এসে মোতালেব মিয়া চিন্তামগ্ন হয়ে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করেন। রেহনুমা বেগম নামাজ শেষে জায়নামাজটা গুছিয়ে নিয়ে বললেন,
-কী হলো, সোহেলের বাপ? আজ তোমাকে এমন লাগছে কেন? কোন সমস্যা?
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হতাশার সুরে মোতালেব মিয়া বললেন,
-হ্যাঁ, রেণু, মনটা ভালো নেই।
-হঠাৎ কী হয়েছে?
-কী হয়নি সেটা বল। টেলিভিশনটা অন করে খবরের চ্যানেল দাও।
-কোন খারাপ কিছু?
-হ্যাঁ, সারাবিশ্বে একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। চীনের উহান শহর থেকে করোনা নামক একটা ভাইরাস সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বলতে না বলতেই এটা নাকি আমাদের দেশেও ঢুকে পড়েছে। ইতোমধ্যে বিদেশ থেকে আগত প্রবাসীদের মধ্যে কয়েকজনের দেহে করোনা ভাইরাস পাওয়া গেছে।
-কী বলছো! আজ কয়েকদিন ধরে কোন খবর দেখছি না। হায়! আল্লাহ, একি খবর শোনালে।

এই কথা বলে রেহনুমা বেগম উদ্বিগ্ন হয়ে টিভি সেটটা অন করলেন।
দু’জনে গভীর মনোযোগ দিয়ে খবর শুনলেন। এরপর টিভি অফ করে বেশ কিছু সময় নীরব থাকার পর রেহনুমা বেগম বললেন,
-এখন আমাদের কী হবে? আমরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেলাম!
-হ্যাঁ, রেণু। খুব ভয় লাগছে। কি থেকে কি হয়ে যায়! সোহেল আর সুফিয়ানকে দেখছি না। ওরা আবার কোথায় গেল?
-আর কোথায় যাবে? বাড়ির কোথাও আছে নিশ্চয়।
-এখন থেকে ওদের দিকে বেশি খেয়াল রাখবে। বিশেষ করে সোহেলের সবকিছুতে আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। ওদের স্কুলও বোধহয় বন্ধ হয়ে যাবে। ওর বাড়ির বাইরে যাবার কোন দরকার নেই।
-এভাবে কী জীবন চলবে?
-কেন চলবে না। সুস্থভাবে বাঁচতে হলে আমাদের হোম কোয়ারান্টাইনে থাকতে হবে।
-হোম কোয়ারান্টাইন কী?
-কোনও ব্যক্তি যখন নিজের বাড়িতেই কোয়রান্টিনের সব নিয়ম মেনে, বাইরের লোকজনের সঙ্গে ওঠাবসা বন্ধ করে আলাদা থাকেন, তখন তাকে হোম কোয়রান্টাইন বলে।
-আর কোন ব্যক্তি আক্রান্ত হলে কী করতে হয়?
-কোন ব্যক্তি করোনা পজিটিভ হলে তাকে আইসোলেশনে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়।
আইসোলেশনের সময় চিকিৎসক ও নার্সদের তত্ত্বাবধানে হাসপাতালে থাকতে হয় রোগীকে। অন্য রোগীদের কথা ভেবে হাসপাতালে আলাদা জায়গা তৈরি করা হয় এদের জন্য। অন্তত ১৪ দিনের মেয়াদে আইসোলেশন চলে। অসুখের গতিপ্রকৃতি দেখে তা বাড়ানোও হয়। আইসোলেশনে থাকা রোগীর সঙ্গে বাইরের কারও যোগাযোগ করতে দেওয়া হয় না। তাদের পরিবার পরিজনের সঙ্গেও এই সময় দেখা করতে দেওয়া হয় না। একান্ত তা করতে দেওয়া হলেও অনেক বিধিনিষেধ মেনেই করতে হয়।
-এবার বুঝলাম। আচ্ছা কেউ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে কিনা তা প্রাথমিকভাবে কীভাবে বুঝব?
-জ্বর, সর্দি, গলা ব্যথা, কাশি, মাথা ব্যথা, হাঁচি, অবসাদ, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া ইত্যাদি দেখে।
-আচ্ছা। এ রোগের কোন প্রতিষেধক আবিস্কৃত হয়নি?
-না, এখনও এর কোন প্রতিষেধক আবিস্কৃত হয়নি। তবে আক্রান্ত ব্যক্তিকে এই সময় কিছু অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ দিয়ে, নিরাপদ পানি, ভাল করে খাওয়া-দাওয়া, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো যায় এমন কিছু ওষুধ ও পথ্য দিয়ে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করা হয়। যাদের শরীরে এই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি ও করোনার প্রকোপ অল্প, তারা এই পদ্ধতিতে সুস্থও হন। আর যাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা কম ও রোগের হানা বড়সড় রকমের, তাদের পক্ষে সেরে ওঠা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
রেহনুমা বেগম চিন্তিত হয়ে বললেন,
-আচ্ছা, এ রোগ প্রতিরোধে কী কী ব্যবস্থা নিতে হয়?
মোতালেব মিয়া বাজারের ব্যাগটা টেনে নিয়ে আবার বললেন,
-এখানে কিছু লেবু আছে। এগুলো ধুয়ে যতœ করে রেখে দাও। মাল্টাগুলো ফ্রিজে রেখে দাও। এখন থেকে ‘ভিটামিন সি’ সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। এগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। আর হ্যাঁ, এ সময় নাক, মুখ ও চোখে হাত দেয়া থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। এখন থেকে ঘরের সবাই যেন কিছুক্ষণ পরপর সাবান ও নিরাপদ পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধৌত করে সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখবে।
-তুমি তো দেখছি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের মতো কথা বলছো।
-তুমি জানো না, বাইরে এসব এখন সবার মুখে মুখে।

হঠাৎ সোহেলকে ঘরের দিকে আসতে দেখে মোতালেব মিয়া কাছে ডেকে সোফায় বসিয়ে বললেন,
-শোন বাবা, আজ থেকে খুব জরুরি দরকার ছাড়া আমরা কেউই ঘরের বাইরে যাব না।
-কেন, কি হয়েছে, বাবা?
-দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়। বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সোহেল একটু ভেবে নিয়ে বলল,
-আমিও শুনেছি। টিভি অন করলেই তো এখন করোনার কথা শুনি।
হঠাৎ বাবার হাতে কিছু দেখে সোহেল বলে ওঠলো,
-বাবা, তোমার হাতে ওগুলো কী?
-মাস্ক।
-কয়টা এনেছো?
-৪টা।
-আমাকে দুইটা দাও।
-দুইটা কেন?
-একটা আমার জন্য। আরেকটা সুফিয়ানের জন্য।
মোতালেব মিয়া স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
-ভালো। অনেকক্ষণ ধরে সুফিয়ানকে দেখছি না। ও আবার কোনদিকে গেল?
-বাবা, ও আমার পড়ার রুম পরিষ্কার করছে। তোমারা এখন কথা বল আমি সেদিকে যাচ্ছি।
-আচ্ছা।

দিন যত অতিবাহিত হচ্ছে ততই করোনা ভাইরাসের আতঙ্ক বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানের লোকজন এতে আক্রান্ত হচ্ছে। জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
এরইমধ্যে সুফিয়ান হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। গায়ে জ্বর। তারওপর হালকা কাশি। হাঁচিও আছে।
খুব দুর্বল হয়ে পড়েছে সে। সোহেল তার বাবার কাছে সুফিয়ানের অসুস্থতার কথা জানায়। সুফিয়ানকে এভাবে হঠাৎ অসুস্থ হতে দেখে তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়েন। রাতে স্ত্রীকে কড়া নির্দেশ দেন যেন সকাল সকাল সুফিয়ানকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়। রেহনুমা বেগম স্বামীর এমন আদেশে হকচকিয়ে গেলেন। তিনি চোখ কপালে তুলে বললেন,
-এ কেমন কথা! ছেলেটা এতোগুলো বছর আমাদের সাথে আছে। বাবা-মা নেই। আত্মীয়স্বজন বলতে তো ওর আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। এতটুকু বাচ্চা ছেলে কই যাবে? আর ওর অপরাধই বা কী?
-তুমি ওকে দেখেছো? ওর গায়ে জ্বর, তারওপর হালকা কাশি। হাঁচিও আছে। আমার মনে হয় করোনা ভাইরাস ওকে সংক্রমণ করেছে। ওকে এ বাড়িতে রাখলে আমাদের সবার মাঝে এটি সংক্রমিত হবে।
-আমার মনে হয় তোমার ধারণা ঠিক নয়। ওর এমনিতেই জ্বর, কাশি হয়েছে। ঋতু পরিবর্তনের কারণে হয়তো এমনটি হয়েছে।
-না, আবেগে জীবন চলে না, রেণু। তুমি ওকে কালই বাড়ি থেকে বের করে দেবে। আমি আর কোন ঝুঁকি নিতে চাই না।
রেহনুমা বেগম স্বামীর হাত ধরে অনুরোধ করে বললেন,
-প্লিজ, সোহেলের বাপ, তুমি দয়া করে ছেলেটাকে বাড়ি থেকে বের করে দিও না। প্রয়োজনে আমাদের পরিত্যক্ত রুমে ওকে থাকতে দাও।
-আচ্ছা ঠিক আছে। তাই কর। তবে রুমের বাইরে তালা মেরে রাখবে। খাবার সময় হলে বাইরে থেকে দেয়া যাবে।
এই কথা বলে মোতালেব মিয়া বাজারের দিকে চলে গেলেন।

পরদিন সকালে রেহনুমা বেগম সুফিয়ানকে কাছে ডেকে কেঁদে কেঁদে সব বুঝিয়ে বললেন। সুফিয়ান চোখের জল ছেড়ে খালাম্মার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। রেহনুমা বেগম নিরপরাধ সুফিয়ানকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।  এরপর নিজে গিয়ে সেই পরিত্যক্ত রুমটি পরিষ্কার করে সুফিয়ানকে রেখে আসেন।

এভাবে দিন যায়। সুফিয়ান একাকী একটি পরিত্যক্ত রুমে বন্দী  থেকে অঝরে কান্না করে। সোহেল মাঝেমধ্যে ওর কাছে যেতে চায়। কিন্তু বাবার বারণ আছে বলে যায় না। শুধু খাবার দিতে মোতালেব মিয়া নিজে যান। তাও বাইরে থেকে খাবার দিয়ে চলে আসেন।

প্রতিদিনের মতো আজও বিকালবেলা সোহেলকে সঙ্গে নিয়ে নলচিরা ভূঁঞার হাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠের দিকে আসেন মোতালেব মিয়া। বাবা-ছেলে প্রায় এক ঘন্টা ধরে ব্যায়াম করে বাসায় ফেরে। কিন্তু আজ মোতালেব মিয়ার সাথে স্কুল মাঠে মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে দেখা হয়। মহিউদ্দিন চৌধুরী মোতালেব মিয়ার একসময়ের সহপাঠী ছিলেন। কলেজে পড়ার সময় তারা খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এরপর মহিউদ্দিন চৌধুরী হঠাৎ করে ইতালিতে চলে যান। অনেকদিন পর তিনি দেশে ফিরেছেন।  মহিউদ্দিন চৌধুরীর সাথে তার ছেলেও আছে। সিজন চৌধুরী। সোহেলের সমবয়সী। মহিউদ্দিন চৌধুরী ও মোতালেব মিয়া একে অন্যের সাথে কোলাকুলি করে গল্প করতে থাকেন। অল্প সময়ের মধ্যে সোহেল ও সিজনও একে অন্যের খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে যায়।  তারা দু'জনে একসাথে খেলতে থাকে।
এরিমধ্যে মাগরিবের আযান দিলে তারা যে যার গন্তব্যে চলে যায়।
এভাবে প্রায় সপ্তাহ খানেক সময় পার হলো।

শনিবার সকালবেলা। মোতালেব মিয়া ফজরের নামাজ আদায় করে সোহেলের রুমের দিকে আসেন। সোহেলকে তখনও বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখে তিনি জোরে জোরে শব্দ করে বললেন,
- কী হলো সোহেল, তুমি এখনও শুয়ে আছো?
সোহেল কাতরাতে কাতরাতে বলল,
- আব্বু,  আমার খুব খারাপ লাগছে। জ্বরে আমার গা পুড়ে যাচ্ছে।

এরইমধ্যে সোহেল বেশ কয়েকবার হাঁচি-কাশিও দিয়েছে। মোতালেব মিয়া ছেলের কপালে হাত রেখে চিন্তায় পড়ে যান। রেহনুমা বেগম রান্নাঘর থেকে এসে বললেন,
- সোহেলের কী হয়েছে গো? ও কাঁদছে কেন?
- দেখো, জ্বরে ছেলেটার গা যেন পুড়ে যাচ্ছে। তারওপর হাঁচি-কাশিও হচ্ছে। এখন কী করবো? ভেবে কোন কূল পাচ্ছি না। না জানি ওকেও করোনা ভাইরাস সংক্রমণ করেছে।
- অমন অলক্ষুণে কথা বলো না। আমি ওর মাথায় জলপট্টি দিই। ততক্ষণে তুমি গিয়ে ডাক্তার নিয়ে এসো।
- আচ্ছা।
এই বলে মোতালেব মিয়া বাজারের দিকে চলে আসেন। স্থানীয় একজন গ্রাম্য ডাক্তারকে সব খুলে বললে তিনি 'জাতীয় করোনা ভাইরাস হেল্পলাইন' এ কল দিতে বলেন।
মোতালেব মিয়া হেল্পলাইনে কল দিলে কিছুক্ষণের মধ্যে একটা টীম এসে সোহেলকে মেডিক্যালের দিকে নিয়ে যায়।  সেখানে ওর সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হয়। এরপর রিপোর্ট হাতে এলে মোতালেব মিয়া জানতে পারেন তার ছেলে করোনা পজিটিভ। মুহূর্তে মোতালেব মিয়া ও রেহনুমা বেগমের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। এরপরই সোহেলকে আইসোলেশনে নেয়া হয়।
মোতালেব মিয়া তার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
- আমার মনে হয় সুফিয়ানের কাছ থেকে আমাদের সোহেলের মাঝে করোনা ছড়িয়েছে। আমি তোমাকে কতো করে বলেছি ওকে বাড়ি থেকে বের করে দাও। তুমি দাওনি। মায়া দেখিয়েছিলে। শুধু তোমার কারণে  সোহেলের আজ এমন অবস্থা হয়েছে।
রেহনুমা বেগম স্বামীর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে সান্ত্বনার ভাষায় বললেন,
- শান্ত হও, সোহেলের বাপ। রোগব্যাধি আল্লাহর দান। আবার আল্লাহই ভালো করে দেন। আর তুমি শুধু শুধু সুফিয়ানকে দোষারোপ করছো।
তুমি নিজে সবকিছু জেনেবুঝেও সোহেলকে নিয়ে প্রতিদিন বিকেলে বের হতে। হোম কোয়ারান্টাইনের নিয়ম পুরোপুরিভাবে মাননি। আমার মন বলছে, সুফিয়ানের এমনিতেই জ্বর-কাশি হয়েছিল। করোনা হলে তো এতোদিনে ওর বেঁচে থাকবার কথা নয়।
- তাহলে সোহেলের কোথা থেকে হয়েছে?
- আল্লাহই তা ভালো জানেন। তোমার মনে সন্দেহ হলে সুফিয়ানকেও টেস্ট করে দেখতে পার।

স্ত্রীর এমন কথায় মোতালেব মিয়া একটু চিন্তিত হয়ে ভাবতে লাগলেন। এরপর তিনি আবার হেল্পলাইনে কল করলেন। অল্প কিছুক্ষণের  মধ্যে মেডিকেল টীম এসে সুফিয়ানকেও নিয়ে গেল। ওর সকল পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হলো। মেডিকেল টীমের কাছ থেকে রিপোর্ট হাতে পেয়ে মোতালেব মিয়া স্ত্রীর মুখের দিকে লজ্জার চোখে তাকিয়ে থাকেন।

শীতের পদাবলি : ০২

শীতের পদাবলি : ০২








মায়াবী বেদনা
আহমাদ সোলায়মান

একটি জীবন্ত মিথ্যার আঘাতে
একটি প্রশান্ত সকাল আক্রান্ত হলো
কয়েকটি পৃথিবী দেখলো
অতঃপর পাশ-কেটে হেঁটে গেল
পদচিহ্নে রয়ে গেল বেদনায় মায়া।


নিরুত্তাপ হাসি
সিত্তুল মুনা সিদ্দিকা

শিশিরে ভেজা দূর্বা ঘাসের উপর
পা ফেলে যাই আলতো করে,
শীতের সুখানুভবের ছোঁয়ায়!
কনকনে শীতে ধোঁয়াটে
কুয়াশা মেখে বিহ্বল আত্মা,
একটু পরে ভোর হয়,
সূর্য উঠে নিরুত্তাপ হাসি নিয়ে ,
একটু উষ্ণতার জন্য কতোটা
প্রতীক্ষায় ক্ষণ গুনে চলা!
কালের গর্ভে একে একে
হারায় প্রতিটি মূহুর্ত,
পথে যেতে যেতে দেখি শিশির ভেজা
পাটি পাতায় জমেছে ধুলো,
হিমেল আবহে অতীত পিছু ডাকে বার বার..!
আগের মতো করে নান্দনিক প্রহর
আর আসেনা ফিরে!


বেগুনি রঙের ক্ষত
মুহম্মদ আশরাফুল ইসলাম
.

অপেরা, তবে কী এই শীতেও তুমি আসবেনা?
তোমার প্রত্যাখ্যানের পাশে আমিই তো পরিণত মিথ্যেবাদী এক।

অথচ আঙুলের সমস্ত গোঙানি আড়াল করে,
সে তোমার অপেক্ষাতেই প্রতিদিন সদ্যোজাত হই;
অবিরত ঝলমল করি জ্যোৎস্নায় শানানো চাকুর মতো।

অপেরা, তবে কী এই শীতেও তুমি আসবেনা?
এদিকে বিরুদ্ধ আগুনে পুড়ে যাচ্ছে আমার যাবতীয় বাগানপাট!

অন্যকারও প্রেমিকার দিকে আর কতকাল তাকিয়ে থাকবো?
যৌথ খামারের কথা ভাবতে ভাবতে আর কত রাত,
লালচে চোখে শুধু হেঁটে যাবো নিজের কঙ্কালের দিকে?

অপেরা, তবে কী এই শীতেও তুমি আসবেনা?
পরিত্যক্ত ডুমুরের আয়ু সেলাই করে কবেই তো ভোলে গেছি সব।

এমন প্রসিদ্ধ শীতে কে হবে আমার মনোহর ফাঁদ?
পরোক্ষ যন্ত্রণা পুনরুদ্ধার প্রকল্পে তুমিইতো শিল্পিত সংঘাত;
তুমিইতো স্বেচ্ছাকৃত ভুল। তুমুল অন্ধকারে বেগুনি রঙের ক্ষত।

অপেরা, তবে কী এই শীতেও তুমি আসবেনা?
একার সন্ন্যাসে নৃশংস সুন্দরের মতো কে আছে আমার আর?

অন্ধচোরা গলির বিপাকে কে শোনে তোমার স্তনের কলরব?
কে দেখে তোমার জীর্ণ প্রমোদ, ঝোড়ো খেয়ালে, খুব সন্ধ্যেবেলা?
প্রতিবার, এমন শীতের শেষে কার বুকে বাজাও অবাধ্য প্ররোচনা?


শীতের আবেশ
শাহীন রায়হান

দেশটা জুড়ে ঠান্ডা আবেশ শীতের ছোঁয়া শুধু
যায় না দেখা আলোর রেখা দিগন্তটা ধুধু
দুধ কুয়াশায় মাঠ ঢেকে যায় ক্ষেতের ফসল তাও
থমকে থাকে জনজীবন পরান মাঝির নাও।

গাছির জীবন তাও থামেনা হাতে রসের হাড়ি
ভাঁপা চিতুই গন্ধ ছড়ায় মম করে বাড়ি
সর্ষে ক্ষেতে হলুদ ছোঁয়া পাখির ডাকাডাকি
নেই কোথাও রোদের দেখা সূর্যটা দেয় ফাঁকি।

টাপুরটুপুর শিশির ঝরে গাছের সবুজ পাতায়
হুড়মুড়িয়ে শীত ঢুকে যায় খুকুর গরম কাঁথায়
ঝিরিঝিরি হিমেল হাওয়ায় শেয়াল ডাকে রাতে
শীত সকালে পাখপাখালি আনন্দে সব মাতে।

হঠাৎ জাগে সূর্য্যি মামা নীলচে মেঘের ফাঁকে
খেজুর রসের মিষ্টি পায়েস ইশারাতে ডাকে।






ই-পেপার : ধানশালিক : সংখ্যা ১২৭

ই-পেপার  : ধানশালিক  : সংখ্যা ১২৭
তারুণ্যের শিল্প সরোবর । । ধানশালিক ।। সংখ্যা ১২৭
বৃহস্পতিবার, ১৪ নভেম্বর, ২০১৯

















গল্প : একজন শ্রমিকের গল্প

গল্প : একজন শ্রমিকের গল্প



একজন শ্রমিকের গল্প
কবির কাঞ্চন

পিনাকী দু'হাতে অনবরত মেশিন ঘুরাচ্ছে। গা থেকে অবিরম ঘাম ঝরছে। তবু গায়ের কষ্ট একদম মুখে বোঝা যাচ্ছে না। ওর মুখে জুড়ে সারাক্ষণ হাসি থাকে। সিনিয়রদের আদেশ যথাযথভাবে পালন করে। আবার বয়স ও উচ্চতায় সবার চেয়ে ছোট হওয়ায় ফ্যাক্টরীর সবাই ওকে খুব আদর করে।
ও যেদিন প্রথম এই ফ্যাক্টরীতে চাকরি নিতে আসে, সেদিন থেকে ওর প্রতি ম্যানেজমেন্টের লোকজনের স্নেহের দৃষ্টি আছে।
ওকে যেখানে শিশু বলে চাকরিতে নিচ্ছিলেন না, সেখানে এখন সবাই ওর ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করে।
ওর মায়ের শারীরিক অবস্থার কথা জিজ্ঞেস করে। ওর পড়াশুনা চালিয়ে যাবার অনুপ্রেরণা জোগায়।

এক সময় পিনাকীর জীবনকাল বেশ ভালোই কাটছিল। তখন ওর বাবা, অপু চৌধুরী একটি স্কুলের সহকারী শিক্ষক পদে চাকরি করতো। বেসরকারি স্কুলে মাসে যে সামান্য বেতন পেতেন তা দিয়ে নিয়মের মধ্যে থেকে ভালোই এগুচ্ছিলেন। পিনাকীর মা ছিলেন পুরোপুরি ঘরমুখো মহিলা। কোনদিন ঘরের বাইরে তার পদচিহ্ন পড়েছে বলে মনে হয় না।
পিনাকীর বাবা ছেলেকে নিয়ে উচ্চস্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। ছেলেকে দুরন্ত মেধাবী ছাত্র হিসেবে তৈরি করতে চাইলেন তিনি। পিনাকীও সেপথে এগুচ্ছিল। পঞ্চম শ্রেণিতে জিপিএ-৫ সহ ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ করে সে।
এরপর বুকভরা আশা নিয়ে তাকে নিজের স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করালেন। ষষ্ঠ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় ও প্রথম স্থান লাভ করে। স্কুলের সব শিক্ষক পিনাকীর প্রশংসা করেন। বাবা হিসেবে পিনাকীকে নিয়ে ওর অপু চৌধুরীরও গর্ব হয়।
সপ্তম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে নিয়মিত ক্লাস করতে থাকে সে।
কিন্তু বার্ষিক পরীক্ষার ঠিক দুইদিন আগে অপু চৌধুরী
বাসায় এসে ভাত খেয়ে শুতে গেলেন। মিনিট পাঁচেক পর " বুক ব্যথা! বুক ব্যথা! " বলে তিনি চিৎকার করতে লাগলেন। পিনাকী ও ওর মা দৌড়ে তার কাছে ছুটে আসে।
অপু চৌধুরী তখনও অনবরত ঘামছেন। তিনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন,
- বাবা, পিনাকী আমার আরো কাছে এসো।
এরপর পিনাকীকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
- আমার হাতে মনে হয় আর বেশি সময় নেই। বাবা, বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হবে। সব সময় সৎপথে চলবে। আর একটা কথা, কখনও কারো সম্পদের দিকে লোভ করো না। নিজের যেটুকু রবে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থেকো।
এবার অপু চৌধুরী স্ত্রীর দিকে মায়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
- আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, মনিকা। আমি তোমাদের জন্য তেমন কিছুই রেখে যেতে পারলাম না। তোমরা আমায় ক্ষমা করো।
এরপর পিনাকীর হাতটা আলতো করে ওর মায়ের হাতে দিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লেন অপু চৌধুরী।
হঠাৎ তার চোখ দু'টো বন্ধ হয়ে গেল। নিথর দেহ মেঝেতে পড়ে আছে। হাতদু'টো জড়বস্তুর ন্যায় পড়ে রইলো। কোন নড়াচড়া নেই। বাবাকে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন দেখে পিনাকী বাবার হাতদু'টো ধরে টানতে টানতে বলল,
- বাবা, এখন ঘুমিয়ে গেলে কেন? উঠো, আমাদের সাথে কথা বলো।
পিনাকীর মা ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বুকফাটা আর্তনাদ শুরু করেন।
মাকে কাঁদতে দেখে পিনাকীও হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।

পিনাকীর বাবার সৎকার করার সাথে সাথে যেন ওদের সব সুখেরও সৎকার হয়ে যায়। স্বামীর জন্য চিন্তা করতে করতে দিনেদিনে অসুস্থ হয়ে পড়েন পিনাকীর মা।

পিনাকীর বাবা মারা যাবার পর প্রথম প্রথম অনেকেই এগিয়ে এসেছিল। সবাই সমবেদনা জানিয়েছে।
কেউ কেউ সাহায্যের হাতও বাড়িয়েছিল। কিন্তু সময় যতোই গড়াচ্ছিল ততোই কেটে পড়ছিল সবাই।

দিনেদিনে পিনাকীর বয়সও বাড়ছে। অষ্টম শ্রেণির জেএসসি পরীক্ষার পর ফল বের হলো। পিনাকী এবারও জিপিএ-৫ পেয়েছে।
পিনাকীর মা স্বামীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে পিনাকীর পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
স্বামীর রেখে যাওয়া সামান্য সম্পদের ওপর ভর করে এতোদিন চলেছেন। কিন্তু অসুস্থ হয়ে বিছানার সঙ্গী হওয়ায় এখন আর সংসার খরচও চলে না।
তার ওপর নিজের জন্য ঔষধ কেনার টাকাও নেই। ইত্যাদি ভেবে ভেবে তিনি খুব দিশেহারা হয়ে পড়েন। একসময় পিনাকীদের জীবনে নেমে আসে চরম দারিদ্র। সব আশা নিরাশায় পরিণত হলে পিনাকী চাকরির জন্য এই ফ্যাক্টরীতে ছুটে আসে।

একদিন পিনাকীদের ফ্যাক্টরীর মালিক, রাতুল চৌধুরী কাউকে কোন কিছু না জানিয়ে ফ্যাক্টরীর প্রোডাকশন সেকশনে চলে আসেন। তিনি ধীরপদে ঘুরে ঘুরে সবার কাজ দেখছেন। যারা মালিককে আগে থেকে চিনতো তারা বসা থেকে উঠে নিচুগলায় সালাম দিলে তিনি সবাইকে শব্দ না করে কাজ করার ইঙ্গিত করেন।

পিনাকী তখনও গভীর মনযোগ দিয়ে মেশিনে কাজ করছে। রাতুল চৌধুরী ওর সামনে এসে বেশ কিছু সময় ধরে নির্বাক  দাঁড়িয়ে থাকেন। হঠাৎ আগন্তুক ব্যক্তিকে সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে মেশিনে হাত চালাতে চালাতে বলল,
- আসসালামু আলাইকুম, স্যার।
- তোমার নাম কি?
- ‎পিনাকী।
- ‎কত বছর ধরে এখানে কাজ করছো?
- ‎এই দুই বছর হবে।
- ‎এত অল্প বয়সে চাকরি করছো কেন?
- ‎সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য।
- ‎ঠিক বুঝলাম না। খুলে বলবে?
পিনাকী কাজ বন্ধ করে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
- আমার দরকার ছিল বলে চাকরি নিয়েছি। আর আপনি আমাকে ডিস্টার্ব করবেন না, পি¬জ। আমার হাতে এখন অনেক কাজ।
- ‎তুমি চাইলে তো কাজে ফাঁকি দিতে পারো।
মুখে বিরক্তির ছাপ এনে পিনাকী বলল,
- আপনি কে? আমি তা জানি না। তবে একটা কথা জেনে রাখবেন, মাস শেষে আমার মালিক আমাকে আমার ন্যায্য বেতনভাতা দেন। আমি আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করলে আমার মালিকের লাভ হবে না। আর মালিকের লাভ না হলে এক সময় ফ্যাক্টরী বন্ধও হয়ে যেতে পারে। তখন আমরা চাকরি করবো কোথায়?
- ‎তবুও----।
এই কথা শোনে পিনাকী লোকটার ওপর রেগে গিয়ে বলল,
- আপনি এখন যান তো। আমার কাজের ডিস্টার্ব হচ্ছে।
পিনাকীর লাইনের সুপারভাইজার এগিয়ে এসে কিছু বলতে চাইলে মালিক তাকে চোখের ইশারায় নিষেধ করেন।
এরপর পিনাকীর মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি বাইরে চলে যান।
লাইন সুপারভাইজার পিনাকীকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
- এই পিনাকী, তুমি উনাকে চিনতে না!
- ‎না, কে উনি? অনেকক্ষণ ধরে আমার কাজের ডিস্টার্ব করছিলেন।
- ‎তুমি উনার সাথে যেভাবে কথা বলেছো তা একদম ঠিক হয়নি। আগে তোমার বোঝা উচিত ছিল, মন চাইলেই বাইরের যে কেউ এখানে আসতে পারেন না। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েই আসতে হয়। তাছাড়া যারা আসেন তারা সবাই কর্তৃপক্ষেরই লোক।
আমার মনে হয় আজই তুমি চাকরিটা হারাবে।
- ‎কেন? উনি কে ছিলেন?
- ‎উনিই আমাদের ফ্যাক্টরীর মালিক। রাতুল চৌধুরী। খুব ভালো মানুষ। শ্রমিকদের মনে কোনরূপ অসন্তুষ্টি আছে কিনা তা জানতে স্যার প্রায়ই এভাবে স্বশরীরে ফ্যাক্টরী ভিজিটে আসেন।

পিনাকী চিন্তিত হয়ে ভাবতে লাগলো- আমি তো স্যারের সাথে অন্যায়মূলক কোনকিছু বলিনি। স্যার রাগ করে আমায় চাকরি থেকে বাদ দিবেন কেন? আল¬াহ কপালে যা রেখেছেন তা-ই হবে।
লাইন সুপারভাইজার বললেন,
- আবার কী ভাবছো?
- ‎না, কিছু না।
পিনাকী আবার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেল। আরও দুই ঘন্টা পর মধ্যাহ্নভোজের বিরতি হলো। পিনাকী  সবার সাথে একসাথে লাঞ্চ করছে।
এই ফাঁকে পিনাকীর লাইন সুপারভাইজারের কাছে অফিস থেকে একটা চিরকুট এলো।
দুপুর ২:০০ ঘটিকায় পিনাকীকে ফ্যাক্টরীর মালিকের কক্ষে ডাকা হয়েছে।
লাইন সুপারভাইজার সেই প্রথম থেকেই ওর কাজে সন্তুষ্ট ছিলেন। পিনাকীর বয়স কম হলেও তার লাইনের সবচেয়ে একটিভ ছেলে পিনাকীই। যদি ওর চাকরি চলে যায়, তবে আমিই মালিকের হাতে-পায়ে ধরে হলেও ওকে আবার কাজে নিয়ে নেবো।

এরিমধ্যে আবার সবাই যার যার আসনে গিয়ে কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
লাইন সুপারভাইজার পিনাকীর কাছে এসে বললেন,
- পিনাকী, তোমাকে মালিকের কক্ষে ডাকা হয়েছে। কোন চিন্তা করো না। মালিক যা বলবেন, বুঝে শুনে সুন্দরভাবে জবাব দিও।
- ‎জ্বি, তাহলে আমি আসছি।
এই কথা বলে পিনাকী মালিকের কক্ষের দিকে পা বাড়ায়।
ফ্যাক্টরীর ম্যানেজমেন্টের সাথে মিটিং-এ  বিভিন্ন বিষয়ে খোঁজখবর নেন রাতুল সাহেব। এক পর্যায়ে
তিনি ম্যানেজারের ওপর রেগে গিয়ে বললেন,
- আমার ফ্যাক্টরীতে শিশুশ্রমিক কেন? আপনাদের কতো করে বলেছি, ফ্যাক্টরীতে কোন শিশুকে যেন চাকরি দেয়া না হয়। সরকার ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা শিশুশ্রম বিষয়টি খুব গুরুত্বের সাথে দেখছে।
পিনাকীর মতো আর কতজন আছে?
- ‎না, স্যার, পিনাকী ছাড়া আর কোন শিশুশ্রমিক নেই। ওকে চাকরিটা মানবিক দিক বিবেচনা করে দেয়া হয়েছে।
- ‎মানবিক বিবেচনায় মানে!
- ‎ছেলেটার বাবা মারা গিয়েছে। তার ওপর মাও অসুস্থ, মৃত্যু পথযাত্রী। ও খুব মেধাবী। পিএসসি ও জেএসসিতে এ+ পেয়েছে। শুধু অর্থের অভাবে মায়ের চিকিৎসা ও নিজের পড়াশুনা চালিয়ে নিতে পারছিল না। মূলতঃ এইসব বিবেচনা করেই ওকে চাকরিতে নেয়া হয়েছে। তাছাড়া ওর কাজের রিপোটেশনও ভাল।
- ‎ও কি এখন পড়াশুনা কন্টিনিউ করছে?
- ‎জ্বি স্যার, আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ফ্যাক্টরী থেকে ফিরে গিয়ে বাকী সময়টা ও পড়াশুনাতেই কাটায়। আবার পরীক্ষার সময় এলে ছুটি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে।

দুপুর ২:০০ টা। পিনাকী সালাম দিয়ে অনুমতি নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করে। রাতুল চৌধুরী পিনাকীর আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বললেন,
- তুমি আমাকে আগে কখনও দেখোনি?
পিনাকী নম্রগলায় বলল,
- না, স্যার, আমি এর আগে আপনাকে কখনও দেখিনি। তাই চিনতে পারিনি। কাজের ব্যস্ততায় আমি আপনার সাথে সুন্দর করে কথা বলিনি। আপনার মনে কষ্ট দিয়েছি। আমায় ক্ষমা করুন, স্যার। দয়া করে আমাকে চাকরি থেকে বহিষ্কার করবেন না। এ চাকরিটা আছে বলে, মায়ের চিকিৎসা করাতে পারছি। আমার পড়াশুনাও চালিয়ে যেতে পারছি। চাকরি না থাকলে তো আমার সব শেষ হয়ে যাবে।
- ‎আজ থেকে এই ফ্যাক্টরীতে তোমাকে  চাকরি করতে হবে না।
পিনাকী কেঁদে কেঁদে বলল,
- দয়া করে আমাকে চাকরি থেকে বাদ দিবেন না, স্যার।
পিনাকী উপস্থিত সবার মুখের দিকে তাকিয়ে মাথানিচু করে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলো।
রাতুল চৌধুরী আবার বললেন,
- তুমি মাস শেষে কত টাকা বেতন পাও?
- ‎স্যার, ৯৫০০টাকা।
- ‎তাতে কি হয়?
- ‎জ্বি, কোনমতে হয়।
- ‎চাকরি চলে গেছে বলে খুব ভয় পেয়ে গেলে?
- ‎স্যার, পি¬জ আমাকে মাফ করবেন।
এই কথা বলে ফ্যালফ্যাল করে কাঁদতে থাকে পিনাকী। ততক্ষণে রাতুল চৌধুরী চেয়ার থেকে উঠে এসে পিনাকীকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন,
- আমি তোমার আচরণে খুব সন্তুষ্ট হয়েছি। সবাই তোমার মতো কাজ করলে আমাদের ফ্যাক্টরীর সমৃদ্ধি হতে বেশি সময় লাগবে না। আগামীকাল থেকে তুমি নিয়মিতভাবে স্কুলে যাবে। ফ্যাক্টরীতে আসবে প্রতি মাসের এক তারিখে। শুধু বেতন নেয়ার জন্য। আর হ্যাঁ, তোমার মায়ের চিকিৎসার খরচও আমি দেবো। কী,এখন খুশি তো?
পিনাকী নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। মালিকের মুখের দিকে পরম কৃতজ্ঞতায় তাকিয়ে রইলো।