অনিন্দিতা মিত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অনিন্দিতা মিত্র লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সৈয়দ শামসুল হকের রচিত কবিতা

সৈয়দ শামসুল হকের রচিত কবিতা

 


সৈয়দ শামসুল হকের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৭ শে ডিসেম্বর। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা কুড়িগ্রামে। আট ভাই-বোনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিলেন সৈয়দ হক। ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্ত হয় সৈয়দ শামসুল হক ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।



একেই বুঝি মানুষ বলে


নষ্ট জলে পা ধুয়েছো এখন উপায় কি?

আচ্ছাদিত বুকের বোঁটা চুমোয় কেটেছি।

কথার কোলে ইচ্ছেগুলো বাৎসায়নের রতি,

মানে এবং অন্য মানে দুটোই জেনেছি।

নষ্ট জলে ধুইয়ে দেবে কখন আমার গা,

তোমার দিকে হাঁটবে কখন আমার দুটো পা?

সেই দিকে মন পড়েই আছে, দিন তো হলো শেষ;

তোমার মধ্যে পবিত্রতার একটি মহাদেশ

এবং এক জলের ধারা দেখতে পেয়েছি-

একেই বুঝি মানুষ বলে, ভালোবেসেছি।



তুমিই শুধু তুমি


তোমার দেহে লতিয়ে ওঠা ঘন সবুজ শাড়ি।

কপালে ওই টকটকে লাল টিপ।

আমি কি আর তোমাকে ছেড়ে

কোথাও যেতে পারি?

তুমি আমার পতাকা, আমার কৃষির বদ্বীপ।


করতলের স্বপ্ন-আমন ধানের গন্ধ তুমি

তুমি আমার চিত্রকলার তুলি।

পদ্য লেখার ছন্দ তুমি−সকল শব্দভূমি।

সন্তানের মুখে প্রথম বুলি।


বুকে তোমার দুধের নদী সংখ্যা তেরো শত।

পাহাড় থেকে সমতলে যে নামি-


নতুন চরের মতো তোমার চিবুক জাগ্রত−

তুমি আমার, প্রেমে তোমার আমি।


এমন তুমি রেখেছ ঘিরে−এমন করে সব-

যেদিকে যাই-তুমিই শুধু-তুমি!

অন্ধকারেও নিঃশ্বাসে পাই তোমার অনুভব,

ভোরের প্রথম আলোতেও তো তুমি!


এপিটাফ


আমি কে তা নাইবা জানলে।

আমাকে মনে রাখবার দরকার কি আছে?

আমাকে মনে রাখবার?

বরং মনে রেখো নকল দাঁতের পাটি,

সন্ধ্যার চলচ্চিত্র আর জন্মহর জেলি।

আমি এসেছি, দেখেছি, কিন্তু জয় করতে পারিনি।

যে কোনো কাকতাড়–য়ার আন্দোলনে,

পথিক, বাংলায় যদি জন্ম তোমার,

আমার দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাবে।


পদাবলি

পদাবলি




ভিখারি 

নাসরিন জাহান মাধুরী 


ভেতরের অবদমিত প্রতিজ্ঞা 

শপথের বাক্য 

যাও যাও যাও, এই বেলা তুমি যাও

তারপর যেতে থাকি যত দূরে যাওয়া যায়


যত দূরেই যাই 

তোমার বৃত্তের পরিধি, ব্যাস, ব্যাসার্ধ 

কিছুই ডিঙাতে পারি না

সাত রঙা পাহাড় ডিঙাই

ময়ূরাক্ষী নদীতে ভাসি

সাত সমুদ্র তেরো নদী

অনন্ত নক্ষত্র বহুকাল আগে যার আলো

কৃষ্ণ গহ্বরে বদলে গেছে তার আলো ডিঙাই.. 


যাও যাও যাও, এই বেলা তুমি যাও

তারপরও যেতেই থাকি

ব্যথার রাগিণী বেজেই চলে

যাও যাও যাও এই বেলা তুমি যাও


যেতেই হবে! যেতে হবেই!

চোখে বিস্ময় মনে বিস্ময় নিয়ে

চলে যাই চলে যাই অজানায়

সব অগ্রাহ্য করে

আর কোন মোহ নেই

নেই মায়া পাখি 

নেই পিছু ডাক

কোন সীমা রেখা আর আটকাতে পারে না...



ভুলে যেয়ো আমাকে

ম্স্তুফা হাবীব


মানবিকা, আমাকে ভুলে যেয়ো। 

তুমি চেয়েছিলে স্বপ্নের গাছটিতে ফুল ফুটুক, 

সুবাস ছড়াক বসন্তের সুহাসিনী বাতাসে।


আড়িয়াল খাঁর উন্মত্ত ঢেউয়ে 

স্বপ্নগাছটির শেকড় থেকে মাটি সরে গেছে 

আজও ফেরারি আসামির মতো সেই দুর্ভাগা স্বপ্ন 

 অচেনা প্রান্তরে পালিয়ে বেড়ায়।


তোমার রূপনগর আর দেখা হল না আমার

তিল শোভিত পাতাবাহার গালে হল না চুমু খাওয়া

জংধরা আরশিতে চোখ রেখে শুধু স্মৃতির আবাদ। 


মানবিকা, চার দশকেরও অধিক সময়

বেয়ে যাচ্ছি কালের বৈঠা

আগুনমুখা নদীর উপাখ্যান লিখেও 

আজও ভিড়তে পারিনি তোমার ঘাটে।


মানবিকা, ভুলে যেয়ো আমাকে

হৃদয়ের বিলবোর্ডে কেনো লিখে রাখো মুস্তফা হাবীব !


অস্তিত্ব

মুহম্মদ মহসিন হাবিব 


একদিন তরতাজা কলমিলতা হয়ে

খাদকে রূপান্তরিত হবো

আর আমার স্বজাতিরা পোকা মাকড়ের কামড়ে জর্জরিত হবে 

ফিরেও তাকাবে না কেউ

জীবন খিদে মেটাতে আমাকেও

রান্নার রেসিপি হতে হবে কোনো এক পছন্দের থালিতে

কিম্বা পড়ন্ত বিকেলের আলোয় ধুলি মাখা দেহে শিউলি পচা হয়ে 

ঠাই মিলবে আস্তাকুড়ের লুকানো ঠিকানায়

ফুল মালার সমারোহ থাকবেনা;

থাকবেনা মাটি উৎসবের সমারোহ

শুধু থাকবে অন্ধকার আকাশে এক ফালি চাঁদের বিরাজমানতা।



কীর্তিনাশা নদীটি

নাঈমুর রহমান


কীর্তিনাশা নদীটি তারে আমি চিনি

চিনি আমি আগন্তুকের নাম।

চোখ জুড়ে তাঁর বনলতার কালিমা

কীর্তিনাশার ঢেউয়ে বহে কাজলরেখা।

সন্ধ্যা এলে আবার ফিরে শিরীষ গাছের বনে

হলুদ রঙের ডানা মেলে 

কীর্তিনাশার বিস্তীর্ণ বুক জুড়ে।

আমি চিনি তাই,

চিনি আমি আগন্তুকের এলোচুলের হিজল-কমল।

কীর্তিনাশা গাহে, বহে অপরাহ্ণের সমুষ্ণ বাতাস,

খুব কাছাকাছি কলমির ফুলের দলে

সে আগন্তুক শাশ্বত নদীর মেয়েটি।

চিনি আমি কীর্তিনাশা

চিনি আমি আগন্তুকের নাম।




মুক্ত করে দিলাম

প্রণব কুমার চক্রবর্তী 


স্বপ্ন তোকে আর পারছি না 

                            চোখের সামনে ধরে রাখতে ...


ভাবনা তোকেও পারবো না

মনের ভেতরে দু হাতে ধরে রাখতে

খুব বেশী দিন...


আলো গিলে খাওয়া 

অন্ধকারছন্ন মেঘের টুকরোটা 

ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে-

সামনে 

পেছনে 

আমার চারপাশে ......


যাহ্ মন 

তোকে পাখি করে উড়িয়ে দিলাম আজ

খুঁজে নিস 

উড়ে গিয়ে 

তোর বাসা বাঁধার মতো 

নোতুন কোনও 

সবুজ উন্মক্ত মাঠ 

শালিকের মতো গুটি গুটি পায়ে 

খুঁটে তুলে নিস 

ঘাসের নীচে লুকিয়ে থাকা 

                           জীবনের যথার্থ বর্ণমালা...



সময়গুলো বড় নিষ্ঠুর

জহিরুল হক বিদ্যুৎ


সময়গুলো বড় নিষ্ঠুর মমতায় হাত বাড়ায়

কখনো প্রচ- খরা হয়ে, কখনো ঘন কুয়াশা হয়ে।

দৃষ্টি নত হয়, দুর্ভেদ্য মনে হয় দূরের পারাপার

পথ হারায় কুহক চাদরে একঝাঁক শুভ্রকপোত।

বসুধায় কে আছে, যে বুক পেতে রাখে?

খুঁজি তারে, দেখি না তারে,

সে হারায় পথে-ঘাটে-প্রান্তরে, দূরের আবছা আলোয়

নিঃসঙ্গ খুঁজে যায় স্বর্গের অনন্ত সৌরভ,

চাতক পিপাসায় চেয়ে থাকে আকাশপানে

হায়! চোখের জলে কী স্বপ্নভাঙ্গার তৃষ্ণা মেটে?


স্বার্থের সূচকে বিশ্বে ভালোবাসার দরপতন

অসংখ্য কবিতারা দিয়ে যায় আত্মাহুতি;

শেষ ভগ্নাংশগুলো আর্তনাদ করে ওঠে বেদনায়

কবে ফুটবে ফুল কোন বসন্তে, শুদ্ধ মানবচেতনায়?

ঘৃণাগুলো আরো ঘৃণিত হয়ে উঠছে

বিষাদের কালোরঙে লেপ্টে গেছে পৃথিবীর মানচিত্র।

বর্ণবৈষম্যে আজো জ্বলে পুড়ে মরে মানুষ

জাতিগত ভেদে সাম্প্রদায়িক নীল-নকশা আঁকে;

স্বাস্থ্য নিয়ে স্বার্থ খোঁজে অসুস্থ পুঁজিবাদিরা

মেতে ওঠে বিধ্বংসী অনুজীবের উত্থান-পতনে;

হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অচেনা অনুক্ষণ

কে তারে চিনতে পারে বিক্ষুব্ধ নগরে?



বিশ্বাস বিশ্বাস খেলা

ইয়াসিন আরাফাত 


ক্যারম খেলায় অনেকের ভয় হতো আমার সাথে দাঁড়াতে।

বিস্তৃত হাওরের কিনারে ফুটবল খেলেছি বহু

গোল করিনি কখনও তবুও জিতেছি সতীর্থের গোলে।

আর অপ্রিয় খেলা ক্রিকেটে আমি পাকাপোক্ত নই।

এমন আরও অনেক খেলা খেলেছি আমি

গোল্লাছুট, চোর পুলিশ, বউচি, লাই, কপালটুকি আরও কত কী!

প্রচলিত বিধান অনুসারে কখনও হেরেছি কখনোবা জিতেছি।

সেইসব ভুলে গেছি শৈশবমূখর রাত পোহানোর আগে।

কেবল ভুলতে পারি না সহস্র রাত ধরে, বিশ্বাস বিশ্বাস খেলায়

মানুষকে বিশ্বাস করে জিততে পারিনি আজও!



মধ্যবিত্তনামা

মাজহারুল ইসলাম


তোমাকে লিখবো লিখবো করে

কত দিন কেটে যায় আমার!

সকাল দুপুর বিকেল গড়িয়ে

রাতের আঁধার সবকিছু কেমন গ্রাস করে নেয়

মোটা ভাত মোটা কাপড়ের অধিকারটুকু ও।


বেঁচে থাকার জন্য এই যা-

একমাত্র ‘মধ্যবিত্ত’ তকমাটা ছাড়া

আর কিছুই যে থাকে না !

তাইতো আগ-পিছ ভেবে-চিন্তে

তোমাকে আর লেখা হয় না!


জানো তো-

মধ্যবিত্তের জমি-জিরাত ঘর-দোর সবই থাকে

বাড়ির দক্ষিণকোণে শান বাঁধানো পুকুর থাকে

সুখ দুঃখ হাসি-কান্নার রক্ষণশীল গল্প থাকে

উন্মুখ প্রাপক থাকে শুধু প্রেরক থাকে মধ্যবিত্ত মননের !


নীরব নামতা

জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ


ফুরিয়ে যাওয়া একটা দুপুরের মত

ফুরিয়েই যাচ্ছি, কোনো রকম আছি;

এটাকে বেঁচে থাকা বলে; ভালো থাকা নয়।


কিছু খুঁচরো আলো ছুঁতে গিয়ে 

একশ জোনাকির মৃত্যু হয়েছিল; কেউ জানেনা-

সকালের ইতিহাস মনে রাখিনা; এভাবেও যে

পাঠ করে নিতে হয় নীরব নামতা; জানা ছিল না।


তুমি হয়ে গেলে আমার ভালো থাকা; বিরহ-

আমার নির্বাক কবিতার নির্মহ ঘ্রাণ;

তুমি ভাবো না কষ্মিন সময়ে-

অথচ কেউ না হওয়া এই আমি তোমার কেউ একজন।




 

আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী বিপ্লবী কবি

আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী বিপ্লবী কবি

 


আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী বিপ্লবী কবি

রোকে ডালটন 


ভাষান্তর : আকিব শিকদার


রোকে ডালটন লাতিন আমেরিকার অন্যতম শক্তিশালী বিপ্লবী কবি, যাঁকে চে গুয়েভারার পরেই স্থান দেয় লাতিন বিশ্ব। তাঁর জন্ম ১৯৩৫ সালে, সালভাদরের এক উচ্চবিত্ত পরিবারে। ১৯৫৫ সালে তিনি কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৫৯-৬০ এ কৃষক অভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশ নিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন। তাঁর মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করে স্বৈরাচারী একনায়ক সরকার। কিন্তু অদ্ভুতভাবে ফাঁসির দিনেই সেই স্বৈরশাসকের পতন ঘটে, আর তিনি বেঁচে যান। ১৯৬১ তে দেশত্যাগ করে মেক্সিকো চলে যান। সেখানেই তাঁর কাব্যপ্রতিভার বিকাশ ঘটে। এরপর তিনি চলে যান কিউবা, এবং লাতিন আমেরিকার একজন অন্যতম প্রধান বিপ্লবী কবি হয়ে ওঠেন। কিউবা থেকে যান প্যারাগুয়ে, সেখানে তাঁর রাজনৈতিক বক্তৃতা অনেককে চমৎকৃত করে।

১৯৬৫ তে ফিরে আসেন দেশে। সশস্ত্র বিপ্লবে অংশ নিয়ে আবার গ্রেপ্তার হন। তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৭৫ এর ১০ মে, বিপ্লবীদের মধ্যে চলা এক আন্তঃসংঘর্ষে।



কেবল তো শুরু


আমার সুহৃদু, এক সম্ভাব্য কবি,

মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর হা-হুতাশকে

এভাবে করলেন চিত্রায়িত:

‘আমি তো বুর্জোয়ার কয়েদবন্দী,

তা ছাড়া আমি আর কীই বা হতে পেরেছি।’


এদিকে মহান বের্টোল্ট ব্রেখট,

কম্যুনিস্ট, জর্মন নাট্যকার ও কবি

(পদবিক্রমটা ঠিক এমনি) লিখেছিলেন:

‘ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অপরাধের তুলনায়

ব্যাংক ডাকাতি তেমন কি আর মন্দ কাজ?’


এ থেকে আমি যে উপসংহার টানি, তা দাড়ায়: 

নিজেকে অতিক্রম করতে গিয়ে

যদি মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী 

ব্যাংক ডাকাতি করেই ফেলে

তবে বলতে হবে সে তেমন কিছুই করেনি

কেবল নিজেকে একশ’ বছরের ক্ষমা

পাইয়ে দেওয়া ছাড়া।



লাল বিপ্লব


পাখিরা উড়ে যায়, রাঙা বিপ্লব ছড়িয়ে যায় চারপাশে- 

রক্ত সবসময়ই লাল, লাল ডুবে যাওয়া সূর্য 

বারুদের আগুনও লাল, ঈগলের ঠোঁটের আঘাতে 

যে রক্ত বেরিয়ে আসে জংলি মেসের পিঠ থেকে- 

লাল, শুধু লাল।


ডুবে যাওয়া সূর্যের দুহাই, জ্বলে ওঠা বারুদের দুহাই

আমাকে তোমরা ঈগলের মত হিংস্র হতে বলো না- 

মেসের চামড়া উৎপাটনরে মত তোমাদের 

বিপর্যয় ডেকে আনতে যেও না।


অসংহতি

অসংহতি

 



অসংহতি 

জায়্যিদ জিদ্দান


‘তুই যা করার কর। আমি কিছু করতে পারবো না। তোকে বলছি না? কিছু করার আগে আমাকে আগে জানাবি। না জানিয়ে কিছু করবি না। কথা তো শুনোছ না। এখন যা ইচ্ছে কর।’

একনাগাড়ে কথাগুলো বলে একটু থামলো ফরিদ। ওর চোখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। আগুন বেরুচ্ছে যেন। একটু বেশিই রাগ হয়েছে মনে হয়।  আমি চুপ করে শুনে যাচ্ছি ওর বকবকানি। আমারো ইচ্ছে করছে অনেককিছু বলতে। কিন্তু কিছু বলছি না। এখন না বলাটাই হয়তো ভালো হবে। ফরিদকে আমি চিনি অনেকদিন। আমি জানি কিছুক্ষণ বকাবকি করে ও ঠিক শান্ত হয়ে যাবে। বড়ভাইয়ের মতো মমতা মিশিয়ে একটু পরেই আমাকে শান্তনা দিবে। বুঝাবে। মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে আমাকে শিশুর মতো আদর করবে। তখন মনে হয় ফরিদ আমার কত বছরের বড়। কিংবা আমরা এক মায়ের । পেটের ভাই। ও আমার বড় ভাই। 

তারপর কথা বলতে বলতে ও একসময় কেঁদে ফেলবে। অনেকক্ষণ কাঁদাকাটি করার পর বলবে ‘তোর কি লাগবে বল। আমি সব দিবো। তারপরও উল্টাপাল্টা কিছু করিছ না’। এই সময়টার জন্যেই আমি অপেক্ষায় থাকি। যা চাই তাই পাওয়া যায়।

ফরিদের চেহারার রং পাল্টাচ্ছে। আস্তে আস্তে শান্ত হয়ে আসছে গলাটা অসম্ভব নরম করে ও বললো।

‘তুই একটা কথা কেন বুঝিছ না। আমার এসবে ভীষণ ভয় হয়। তুই জানস আমি তোরে কতটা আপন ভাবি। তোকে আমি এত তারাতাড়ি হারাতে রাজী না।

‘আমি তো তেমন কিছু করি নাই। জাস্ট... 

‘চুপ কর ! জানি তো কি মহান কাজটা করেছিস। এখন বল কি করতে চাচ্ছিস? কি করবি?

‘তুই জানস আমি এখন কি করবো। প্রত্যেকবার যা করেছি এখনো তাই। নতুন করে বলার কিছু নাই। 

‘মানে? তুই এখনো খুন করবি?

‘হুম। এ খেলার শেষ পরিণাম শুধুই মৃত্যু। 

‘কিন্তু লোকটা তো ভালো ছিল। আমাদের শ্রদ্ধাভাজন। 

আমি একটু মেকি হাসলাম। এ হাসির আড়ালে এমন কিছু আছে যেটা ফরিদ জানে না এবং কখনো জানবেও না। 

‘রজব আলী কি শ্রদ্ধাভাজন ছিল না? রাতুল মল্লিক? ওরা সবাই হাজী সাহেব ছিল। 

‘হুমম। শুনেছি শিহাব শিকদারও নাকি হজ্বে যাচ্ছে দুইদিন পর।

‘ভুল শুনেছিস। শিহাব শিকদার আর হজ্ব করতে যাচ্ছেন না।

‘কেন? একটু আগেই দেখা হলো আমার সাথে। এবং কিছুক্ষণ পর ফোনও দিবে বললো আমাকে।

‘তাহলে এটাও জেনে রাখ, শিহাব শিকদার তোকে আর ফোনও করবে না।

‘মানে..? 

ফরিদ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ওর চোখের চারপাশে শিশির বিন্দুর মতো ফুটে আছে অসংখ্য জিজ্ঞাসা।

আমি গলা ছেড়ে হেসে উঠলাম। হাসির বিকট আওয়াজ প্রতিধ্বনিত হলো দেয়ালের চারপাশে।





পদাবলি : ০২

পদাবলি : ০২

 


স্মৃতি 

সুশান্ত হালদার 


তোমাকে ভালোবাসার পর 

ভূমিকম্পে নড়েচড়ে বসেছে পৃথিবী সাড়ে সাত বার 

এমনই কপাল আমার 

সূর্য সংঘর্ষে হারিয়ে ফেলেছি নিজেরই প্রজ্জ্বলিত অধিকার  


তোমাকে ভালোবাসার পর 

তুষার ঝড়ে দুমড়েমুচড়ে গেছে ইউক্যালিপটাস

এমনই কপাল আমার

চাঁদ পোড়া আগুনেই হারিয়ে ফেলেছি বসন্ত আবার 


তোমাকে ভালোবাসার পর 

নদীর জলে সাধু সন্ততি ডুবে মরেছে শত শত বার 

এমনই কপাল আমার 

কান পাতলেই বুদ্ধ ধ্যানে চিৎকার শুনি মরুময় সাহারার


তোমাকে ভালোবাসার পর 

ড্রোন হামলায় শুধু আমারই ভেঙেছে দক্ষিণ দুয়ারি ঘর

এমনই কপাল আমার 

কুরুক্ষেত্রের স্মৃতি নিয়ে হেঁটে চলছি এখন অযোধ্যা থেকে লাদাখ বরাবর!  


তুমি আছো বলেই পৃথিবী এতো সুন্দর 

মুস্তফা হাবীব


জরির ওড়নায় সুষম সাজে যখন তোমাকে দেখি

আনত নয়নে লাজন¤্র ঠোঁটে গোলাপ ফোটাও

আমার স্বপ্নের দিগন্ত হেসে ওঠে সবুজ- শ্যামলে।


ঘুমঘোরে তুমি যখন নীলাম্বরী সাজে এসে

বসন্ত সরোবরে শরীর ভেজাও

আমি আপ্লুত দেখে তোমার নিসর্গ সৌরভ

অলখে ভুলে যাই জীবনানন্দের বিম্বিসার ধুসর জগত।


তোমার বিকল্প কোনো কনকলতা আমাকে টানেনা

জাগতিক ঝর্ণার উচ্ছ্বল রূপ দেখে যতোদূরে যাই

দিনের শেষে আমি তোমাতেই বিলীন।


অনিন্দিতা, তোমাকে ভালোবাসি বলেই 

আকাশের তারাগুলো ভেসে ওঠে জলপদ্ম চোখে 

তুমি আছো বলেই বাঁচতে সাধ হয় জনম জনম, 

অনিন্দিতা, তুমি আছো বলেই পৃথিবী এতো সুন্দর!


বিষাদ দুঃখ 

সাব্বির আহমাদ 

[প্রয়াত জান্নাতুল ফেরদৌসকে]


বন্ধ কবাটের ওপাশে নিস্তব্ধতায় 

ছেয়ে গ্যাছে বুক। 

একটা নতুন কবরের উপর ফুটে আছে ফুল  

ডনশ্চুপ, নির্ঘুম।  


খয়েরি আকাশ বেয়ে উড়ে যাচ্ছে পাখি। 

মৃদু ছন্দে দুলছে পাহাড়ি ফুল। 

কারো চোখ বেয়ে নদী হচ্ছে হৃদয় ভাঙ্গা বুক। 


সময় হলে খুলে দিয়ো কবাট 

বন্দ কবরের মুখ। 

কথা দিলাম সন্ধ্যা সংগীতে আমি;

মুছে দিবো তোমার সমূহ বিষাদ দুঃখ।


অবকাশ

জয়িতা চট্টোপাধ্যায়


গতবার চলে গেছ বড় তাড়াতাড়ি

ভেঙেছিল বুকের ভেতর বালিতে গড়া বাড়ি

চলে গেছে কতো জোয়ার, শরীর অনন্ত ভাঁটায়

তুমি আসবে বলে আজ ও চাঁদ প্রহর কাটায়

তোমাকে ফিরিয়ে নেব অবশেষে জোয়ারে

আমি পাহাড় হয়ে উঠবো, যদি বলো পাহাড়ে কাটাবে

শরীর উষ্ণ হয়ে ওঠে, যতটা উত্তাপ তুমি চাও

ছিঁড়ে ছিঁড়ে নিজেকে রেখেছি, একবার তাকাও

কতদূর যেতে চাও? এনেছো কতটা অবকাশ?

চিন্তা চিন্তা করো না তোমার শরীরে ছোঁয়াবো না আকাশ।



স্পর্শহীন বালিকা

এবি ছিদ্দিক 


মন ভালো নেই - ডাক্তার সাব

স্পর্শহীন বালিকা লেখাপড়ার খরচা বাবদ

হাজারখানেক টাকা নিয়ে গেছে


আপনি এতো কথা বলেন কেন ?

আমি সরল বিশ্বসী কবি

কণ্ঠনালি বেয়ে গড় গড় করে শব্দ বেড়িয়ে আসে!


আমি আপনার মতো খস খস করে ওষুধ লিখি

আচ্ছা - দাঁড়ান আমি তৈরি হয়ে আসি 


ভোর হয় সূর্য উঠে ডাক্তার আসে

রোগী আসে - পরিচিত অপরিচিত রোগী

একজন জিজ্ঞেস করেন - কেমন আছেন ?

গায়ে চিমটি কেটে উত্তর দিই - হ্যাঁ, বেঁচে আছি


নৈসর্গিক আকাঙ্ক্ষা

এম সোলায়মান জয়


এই ভরা মাঘের শীতে

কম্বলের মতো অবয়বে জড়িয়ে নিই তোমার প্রেম

তোমার রূপের উষ্ণতার গোপন প্রত্যাশায়

নিমগ্ন থাকে আমার মহাবেগী হৃদয়।

কুয়াশা ভেদ করে তোমার বার্মুডা ট্রায়াঙ্গেল খেত

কেন্দ্রের গভীর গহ্বরের অস্বাভাবিক নেশা

হৃদয়ের শিরা উপশিরায় পৌঁছে দেয়

চারকোলের উত্তপ্ত দাহ।


শুভ্র কুয়াশাচ্ছন্ন অলিক্ষে আকাঙ্ক্ষার বিশাল দেয়াল

ভেদ করে সূর্যরশ্মির মতো কিরণ ফেলে

শিশিরভেজা ডালিমকুমারী চঞ্চু।

মিলনের বৈচিত্র্য প্রাচীনপন্থায়

অনুভূতির স্পর্শে শীতল অন্তরে 

মিলনের দামামা বাজিয়ে 

গুপ্ত হামলা চালিয়ে পরিপূর্ণ নির্জাস নেয়

তোমার রূপের নৈসর্গিক আকাঙ্ক্ষা।




দুঃখের প্যাটার্ন লক

আজমল হুসাইন


এই আমি যা শুভ্র বলি, কও সেটাকে- কালো

আমার কাছে মন্দ যেটা তোমার কাছে ভালো।


যে পথটাতে ভীষণ কাঁটা, কও সেটাকে ফুল-

এসব নিয়েই তোমার সাথে আমার হুলুস্থুল।


ছয় যেটাকে বললাম আমি, বললে সেটা নয়

সবটুকু বুঝ শেষ হয়ে যায় তোমার বিদ্যালয়।


পৃথিবী নয় সূর্য ঘুরে, বললে না না স্থির;

উল্টো ¯্রােতে ভাসছো ভাসো, নেই জানা তাফসির।


বললাম আমি মিষ্টি এটা, বললে না না টক-

বাক্সবন্দী আনন্দরা দুঃখের- প্যাটার্ন- লক।



মনে রাখবে তো আমায়?

এম. তাওহিদ হোসেন 


পরের জন্মে অতলান্ত আশ্চর্যের সমাহার নিয়ে তোমার দরজায় কড়া নাড়বো, বর্তমানের সব অনুভূতি ভালোবাসার পরতে পরতে ভাঁজ করে রাখবো,

তুমি মনে রাখবে তো আমায়? 


হৃদয়ের গহীনে মস্তো বড় ছাদ গড়বো

শীতলপাটি বিছিয়ে দেব

সন্ধে হলে বসবো দু’জনে অব্যক্ত কথাগুলো নিয়ে।

তুমি বসবে তো আমার সঙ্গে? 


হঠাৎ, একটি দুটো তারা খসবে;

তোমার চোখের পাতায় তারার আলো প্রতিবিম্ব হবে

তখন আমি চুপটি ক’রে দুচোখ ভরে চেয়ে থাকবো

তুমি কী ততোদিন মনে রাখবে আমায়?


এই জন্মের দূরত্বটা পরের জন্মে চুকিয়ে দেব

এই জন্মের মাতাল চাওয়া পরের জন্মের জন্য রক্ষিত করো, পাওনাদার হয়ে আমি সে চাওয়াগুলো দাবি করবো

সে পর্যন্ত মনে রাখবে তো আমায়?


আমি হবো উড়নচন্ডি, উস্কোখুস্কো,

এই জন্মের অপারিপাটি আমিকে সবার আগে, পরিপাটি করে পরজন্মে হাজির হবো! 

তোমার জড়ো করা চোখের অশ্রুকে 

চিরতরের জন্য মুছে দিবো,

সেই সুযোগ দিবে তো আমায়?


মনে রাখবে তো আমায়?

আমি পর জন্মে কবি হবো

তোমায় নিয়ে সহ¯্র কবিতা, গান লিখবো

তোমার অমন মোলায়েম ওষ্ঠ নিয়ে

মায়া ভরা কাজল কালো চোখ নিয়ে

মাথা ভরা কৃষ্ণ কালো মসৃণ কেশ নিয়ে

¯্রােতস্বিনী নদীর মতো বয়ে যাওয়া তোমার ঐ চিকন গড়ন দেহ নিয়ে আমি গান বানাবো

মনে রাখবে তো আমায়?


দুই শালিক

দুই শালিক

 


দুই শালিক 

সাব্বির হোসেন 


আমার নাম শের আলী। জগতনন্দী নদীর ঘটেই আমার একমাত্র দোকান। প্রতিদিন কতশত মানুষ আসে যায় নদীর এপার থেকে ওপারে।

আমার দোকান জগতনন্দী নদীর পাড়েই। দোকান লাগোয়া ছোট দুটো বাঁশের টং আছে। লোকজন পারাপারের সময় চা নাস্তা করে। এক কেজি ননী গোপালের রাজভোগ মিষ্টি নিয়ে আমার একমাত্র নাতি ছগির, আজ উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে বাড়ি ফিরেছে। নানাজান যেহেতু ভোরে ঘাটে এসে দোকান খুলে বসে আর রাতবিরাতে বাড়ি ফিরে তাই নাতি আমার টাটকা মিষ্টি নিয়েই বাড়ি হয়ে আমার দোকানে এসে হাজির।

আমার নাতি আবার নানাজানের গল্পের পাগল। তাই বরাবরের মতই আজও গল্প শোনার আবদার করে বসল। সূর্য তখনও মাথার উপরে আসেনি। দোকানের খরিদ্দের নেই বললেই চলে। তাই মিষ্টি খেতে খেতে গল্প ধরলাম। দুই শালিকের গল্প।  

দুটো মানুষ। একজনের বয়স পয়তাল্লিশ কিংবা সাতচল্লিশ হবে আর অন্যজনের চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। প্রথমে ছোট জনের কথা বলি। ছোট জনের কোন নাম নেই। মানে নাম, খ্যাতি, সম্মান, সম্পদ এককালে ছিল তবে এখন নেই। সব কিছু হারিয়েছে সে। প্রশ্ন হল, কিভাবে হারালো আর কেন হারালো? যদি বলেন কাজের কোন ছোট বড় নেই তাহলে উদাহরণটা এভাবে দেওয়া যেতে পারে, ছোট জন ছিল মাঝি। নৌকায় এপার ওপার করে আর মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। পরিবারের মধ্যে গণ্যযোগ্য হলেও কোনদিন কেউ গণ্যমান্য হিসেবে গণনা করেনি। এমনকি সে নিজেও এভাবে চিন্তা করেনি। কেন চিন্তা করেনি জানেন, কারণ সে মানুষকে খুব বিশ্বাস আর ভালোবাসতো। সমাজের সবার সাথে কাছের মানুষের মত হাসিমুখে চলত। এভাবে সময়গুলো ঠিকঠাক কাটছিলো।

একদিন হঠাৎ মাঝির নৌকা, কে বা কারা চুরি করে নিয়ে যায়। মাঝি তখনও কিছু বুঝতে পারল না। মাঝির কোন জমানো অর্থ ছিল না যে সে, নতুন একটা নৌকা কিনবে। তাই সে পরিবারের সকলের কাছে টাকা ধার চাইল কিন্তু তাকে সাহায্য করার মত কেউ এগিয়ে এলো না। এরপর সমাজের বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী যাদের সে আপন মনে করত তাদের কাছে গিয়েও সে তার সমস্যার কথা জানালো কিন্তু তাতেও তারা কেউই সাহায্য করল না। মাঝি তখন বড় বিপদে পড়ল। মাঝির ঘরে ক্ষুধার্ত দুই সন্তান, স্ত্রী আর মা অপেক্ষা করে। মাঝি ফেরে না। মাঝি তখন চরম এক বাস্তবতার সম্মুখীন। দু’রাত মাঝি ঘরে আসেনি। স্ত্রীর গালমন্দ সভাব। তাই স্ত্রীর গালিগালাজ হরদম চলছেই আর মা তো খাওয়া দাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন সন্তানের চিন্তায়। ঘাটে মাঝিকে সবাই ভোলা নামেই চেনে। 


আসুন বড় জনের ব্যাপারে একটু জেনে নেই। বড় জন ছোট জনের একদম অনুরুপ। বয়স বেশি। মন আকাশের চেয়েও বিশাল। মা ভক্ত। বউ বাচ্চাকেও অনেক ভালোবাসে। শুধু একটা সমস্যা বড় জনের। মিথ্যা, চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাস কোনটাই তার ভেতরে নেই। শুধু একটা সমস্যা ছাড়া। আর সেটা হল মাদকের প্রতি আসক্ত। বড় জন হল মাদকাসক্ত। মায়ের আদরের সন্তান সে। ভাই বোনের মধ্যে সে মধ্যম। ছেলে হিসেবে সে পরিবারের মধ্যমনি। কিন্তু সবাই এই একটা বিষয় নিয়েই চিন্তিত আর বিরক্ত আর সেটা হল, মাদক সেবন। 

একদিন পরিবারের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল, গাঁয়ের সংসারী মেয়ে দেখে তাকে বিয়ে দিলে হয়তো ছেলেটি শুধরে যাবে। কথা মত তাই হল। বিয়ে হল অজপাড়া গাঁয়ে। মেয়েটিকে পেয়ে বড় জন নতুন জীবন গাঁথতে শুরু করেছে। এমনকি সে মাদক সেবন ছেড়ে দেয়। শুরু হয় আলাদা একটা পৃথিবী। মায়ের কথা মত নামাজ আদায় করে। বিয়ের কিছুদিন ঘোরাঘুরি আর শশুড়বাড়ি ঢু দেয়া ছাড়া কোন কাজ তেমন নেই তার। এক্কেবারে আলালের ঘরে দুলাল। বিয়ের কয়েক মাস কাটানোর পর হঠাৎ বড় জন আবিষ্কার করল অন্য এক সময়কাল। আসলে সে কি করছে? বউ শশুড় বাড়ির লোকের ঐ এক কথা “জামাই কি করে?” 

তার কি উত্তর সে দেবে? আর বিয়ের পর ভরনপোষণ এর একটা দায়িত্ব থেকে যায়। শুধু শুধু ঘরে থাকলেও তো চলবে না। বাবা মায়ের কাছে বিষয়টি তুলে ধরলে তেমন আশাবাদী উত্তর সে পায় না। এরমানে হল, বউ আর বউয়ের বাড়ির লোকেরা তাকে কিছু বলেছে। যেমন ধরুন কথায় কথায় খোঁটা দেয়া। স্বামী অকর্মা। বেশ কিছুদিন ছটফট করে হঠাৎ একদিন সে বেড়িয়ে গেল এক নদীর পাড়ে। কোন নদীর পাড়ে জানেন? 

এ সেই নদী, যেখানে ভোলা নৌকা ভেড়াতো। জগতনন্দী নদী। বড় জনের নাম হল শাহীদ। 


মানুষের কাঁধে যখন দায়িত্ব ঝুলিয়ে দেয়া হয় তখন সে হয়ে ওঠে অন্য এক মানুষ। ভোলা খুব অল্প বয়সেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিল। সব ঠিকঠাকই কাটছিলো শুধু হঠাৎ এক বৈরী হাওয়া অর্থাৎ নৌকা চুরি যাওয়া। ভোলা সব কিছু হারিয়ে নদীর পাড়ে চায়ের দোকানে মানে আমার টঙ্গের উপর বসে আছে। পকেটে কোন টাকা নেই যে এক কাপ চা খাবে। তবে সে হাল ছাড়েনি। এই যদি পরিচিত কোন কাস্টমার এর সাথে দেখা হয়ে যায় সে হয়তো এক কাপ চা এর অনুরোধ করে বসতে পারে। সেরকমই হল, শাহীদের সাথে দেখা হয়ে গেল ভোলার। এইতো কয়েকদিন আগের কথা, শাহীদ পরিবার পরিজন নিয়ে ভোলার নৌকায় চরে নদী ভ্রমণ করেছে। দু’জনের ঠিকই মনে আছে। তাই আর বুঝতে এবং কুশলাদি বিনিময় করতে দেরি হল না। বিকেল ঠিক চারটে। দু’জনের কথোপকথন -

শাহীদ- ভোলা দা, কেমন আছো? আজ নৌকা বের করোনি? মুখ দেখে তো মনে হচ্ছে সারাদিন তেমন কিছু খাওনি। কিছু হয়েছে নাকি? বলো তো? 

ভোলা- আর শাহীদ ভাই। ভগবান যে হালোতে রাখেন ভালই আছি। আশাকরি আপনিও ভাল। নৌকাটা আর নেই ভাই। শকুনের চোখ পরেছে। হঠাৎ দু’দিন আগে কে বা কারা আমার নৌকাটা চুরি করে নিয়ে গেল। ওটাই আমার একমাত্র সম্বল ছিল। হাতের অবস্থা এতোটাই খারাপ যে বাসায় কিছু নিয়ে যেতে পারিনি। পেটেও তেমন কোনো দানাপানি পরেনি। এখানে বসে বসে ভাবছি কি করব।

এই কথা শুনে শাহীদের বুঝতে বাকি রইল না যে ভোলা তেমন কোন ভাল পরিস্থিতিতে নেই। বড় জন, ছোট জনের কথা থামিয়ে দিয়ে দোকানিকে দুটো টোস্ট বিস্কুট আর দু কাপ দুধ চা দিতে বললেন। তারপর আবার ছোট জনকে কথা শুনতে চাইল। 

“বিশ্বাস আজ কোথায় বলতে পারেন! কই আমি তো কারও ক্ষতি করিনি। বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবার নিয়ে আলাদা হয়ে গেলাম। দিন আনি দিন খাই। আজ দু’দিন হল বাড়ি ফিরি না। কোন মুখ নিয়ে ফিরবো তাও বুঝে উঠতে পারি না। চোখের সামনে সন্তানের অনাহারী মুখ ভেসে ওঠে। গ্রাম থেকে লোক পাঠায় খবর নিয়ে গেছে। আয়ের থেকে ব্যয় বেশি। নিজে অসুস্থ। ঔষধের দাম বেশি দেখে খাই না। এই তো কয়দিন আগে ঘাটেই অজ্ঞান হয়েছিলাম। চোখ খুলে দেখি হাসপাতালে মেঝেতে শুয়ে আছি। চোখে ঝাপসা আলো। কত মানুষ চলাচল করছে কেউ কারও দিকে তাকানোর সময় নেই। বাসায় জানাইনি। জানি, বাসায় জানালে চিন্তায় সবাই অসুস্থ হয়ে যাবে। সুস্থতা দেখিয়ে ডাক্তার বাবুর হাতে পায়ে ধরে হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। ডাক্তার সাহেবের মুখে শুধু এতুটুকু জেনেছি শরীরের ভেতর রক্ত পচে গেছে।“ 

এই বলে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চুপ হয়ে গেল ভোলা। চায়ের কাপে চা শেষ। শাহীদ তাকিয়ে আছে ভোলার মুখের দিকে। কিছু বলবে মনে হল। হঠাৎ করে ভোলা বলে উঠল, “আমাকে কিছু টাকা দিতে পারেন? এই ধরেন হাজার বিশেক টাকা। নতুন একটা নৌকা কিনে আমি ধিরে ধিরে শোধ করে দেব। অনেক্কেই তো বলেছি। কেউ সায় দিল না।” 

সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। মাগরিবের আজান পরছে। শাহীদ ভোলাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “কাল দেখা হবে। আমি নামাজ পড়ে চলে যাবো। আর আমি টাকার ব্যবস্থা করছি। আপাতত আমার কাছে পাঁচশত টাকা আছে। এটা রাখো। কিছু খরচ নিয়ে বাসা যাও। আমি আগামীকাল বিকেলে আসবো। তুমি চিন্তা করোনা।” 

টাকা পেয়ে ভোলা অনেক খুশি। আশার আলো দেখতে পেয়েছে সে। হাট বাজার থেকে ব্যাগ ভর্তি করে বাজার করে বাসায় ফিরল ভোলা। আর এরই মাঝে সব কিছু মন দিয়ে শুনছিলাম, দেখছিলাম আমি, শের আলী। 

পরদিন দুপুর ঘনিয়ে বিকেল। ছোট জন ভোলা মাঝি হাজির। অপেক্ষা শাহীদ নামের সেই বড় জনের জন্য। ভোলা আত্মহারা। গুনগুনিয়ে গান গাইছে। মনের কামনা পূর্ণ হবার পালা। ভোলা বলল- 

“আলী চাচা, এক কাপ চা দাও। তুমি দেখে নিও যারা আমার ক্ষতি করেছে তাদের ভগবান একটা বিচার করবে। গতকাল বাড়িতে গিয়ে বাচ্চা দুইটারে দেখিয়া চোখের পানি আটকাইতে পারি নাই। জানো আলী চাচা, থাকতে থাকতে হঠাৎ মাথা চক্কর দেয়। ডাক্তার বাবু বলেছিল শরীরে বড় অসুখ! সব ঠিক হয়ে যাবে কি বল চাচা? কিন্তু গতকালের ঐ ভাই আসতে চাইল। এখনও নেই।” 

এভাবে অপেক্ষা করতে করতে সময় পেড়িয়ে যায়। সন্ধ্যা নেমে আসে। তারপর ভোলা মাঝি চুপচাপ চলে যায়। 

পরের দিন বিকেল বেলা বড় জন এসে ছোট জনের কথা জিজ্ঞেস করে। জানালাম, গতকাল এসেছিল। আজ আসেনি। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল। এসব শুনে বড় জন আমাকে একখানা প্যাকেট দিয়ে বলে ভোলা মাঝি আসলে যেন তাকে এই প্যাকেটটা দেই। আর বলে, সে দু’ একের মধ্যে দেখা করবে। এই বলে শাহীদ আর দেরি করে না। 

কাগজের প্যাকেট টা হাতে নিয়েই আমার আর বোঝার বাকি নেই যে এর মধ্যে ভোলা মাঝিকে ওয়াদা করা সেই বিশ হাজার টাকা আছে। তবে যাই হোক আমাকে আমানত বুঝিয়ে দিতে হবে। একদিন পর ভোলা ঘাটে ফিরলে আমি তার হাতে প্যাকেট টা বুঝিয়ে দিলাম আর বললাম শাহীদ মিয়া তোমাকে এটা দিতে বলেছে। আর বলেছে খুব তাড়াতাড়ি সে তোমার সাথে দেখা করবে।

ভোলার চোখে তখন জল টলমল করছে। এ এক আকস্মিক ঘটনা। মনে হল, ভগবান নিজে এসে ভোলার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ভোলা হু হু করে কেঁদে উঠলো। ভোলা আর নিজেকে সামলাতে পারলোনা। আমাকে জড়িয়ে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করল। আমি বুঝে উঠতে পারলাম না যে এটা কষ্টের কান্না নাকি উপকারীর উপকারের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ। ভোলাকে সামলাতে বলে এক কাপ চা বানিয়ে দিলাম। ভোলা মাঝ দরিয়ার মত শান্ত হয়ে কি যেন ভাবলো। চা খাওয়ার পর কাগজের প্যাকেট টা হাতে নিয়ে বলল, “আলী চাচা, আমি চলি। নৌকাটা তাড়াতাড়ি প্রস্তুত করতে হবে। আমার প্রাণের শাহীদ ভাই কখন চলে আসবে জানি না। এসে যদি দ্যাখে নৌকা এখনো জগতনন্দীর ঘাটে বাঁধতে পারিনি তাহলে মনে কষ্ট পাবে। হাতে সময় কম। আমি চললাম চাচা। আমি চললাম।”


ইতিমধ্যে সূর্য মাথার উপর ঢলে পরেছে। জোহরের ওয়াক্ত হয়ে এসেছে। কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই মুয়াজ্জিন জোহরের আজান দিবে। আমি আর আমার নাতী ছগির, মুড়ি আর খেজুরের গুড় মাখা টিন নিয়ে বসলাম। বললাম, দ্যাখ তোর নানীজান কতো সুন্দর করিয়া মুড়ি মাইখা দিছে। নে খা। 

ছগির মুড়ি চিবাইতে চিবাইতে বলল, “ও নানা, তারপর কি হইল কও তো”। 

“ওরে আমার আদরের পোলা, আগে খাওনটা শ্যাষ কর। আমি নামাজটা আদায় করে আসি।”

ছগির মুড়ি চিবাইতে চিবাইতে আবার বলল, “তুমি ঝটপট আসো কইলাম। আমি তোমার গল্প শেষ না কইরা যাইতাম না।” আমি নামাজ বাদ কবর জিয়ারত করিয়া আবার দোকানে গিয়া দুই মুঠ মুড়ি নিয়া খাইতে খাইতে গল্প শুরু করলাম।


দেখতে দেখতে পনের দিন পাড় হল। শাহীদ মিয়ার দেখা নেই। ভোলা নতুন নৌকা নিয়ে আবার লোকজন পারাপারের ব্যবসা শুরু করে। বিকেল হলে আবার আমার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, ‘আলী চাচা, শাহীদ ভাইয়ের কোন খবর আছে?” আমি প্রতিবারেই একই জবাব দেই - “না”। তারপর হঠাৎ করে ক’দিন পর বিকেল বেলা শাহীদ মিয়া হাজির। আমি তড়িঘড়ি করে দোকান থেকে নেমে শাহীদ মিয়ারে জিজ্ঞেস করলাম, “এই মিয়া এতোদিন কই ছিলা। তোমার অপেক্ষায় আমাদের ভোলা মাঝি আধখান হয়ে গেছে। প্রতিদিন বিকালে এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে শাহীদ ভাই এর কোন খবর আছে কি না? তুমি বসো মিয়া। কিন্তু মিয়া, তোমার শরীরের এই অবস্থা কেন? মনে হয় বহুদিন ধরে ভাত খাও না। কি হইছে? অসুস্থ নাকি?

আমি ভোলারে ডাক দেই। 

ভোলা, ভোলারে, তাড়াতাড়ি আয়। শাহীদ মিয়া আইছে। আমি চা বিস্কুট দিতাছি তোমারে। তুমি খাও অপেক্ষা কর। ভোলা আইবোই আইবো।” 

এরপর ভোলা মাঝি আর শাহীদ মিয়া একসাথে বসে অনেক সময় কাটায়। অনেক গল্প করে। আমি শুধু ওদের দু’জনের চোখে মুখে এক দীপ্ত কিরণের ঝলকানি দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার মনে তখনও কিছু প্রশ্ন বারবার নাড়া দিচ্ছিল, শাহীদ মিয়া এই টাকা পেলো কোথায়? কেন এতো দিন পর শাহীদ মিয়া ভোলার সাথে দেখা করতে এলো? শাহীদ মিয়া এতো দিন কোথায় ছিল?


একদিন ভোলা মাঝি শাহীদ মিয়াকে সংগে করে নৌকা নিয়ে নদীর মাঝ খানে গিয়ে মাছ ধরার জাল ফেলে বসল। অকুতভয় ভোলা শাহীদ মিয়াকে বলল, “ভাইজান, এতো দিন কোথায় ছিলেন?” 

শাহীদ বলল, “আমি মনে হয় বেশি দিন তোমার নৌকায় যাত্রী হতে পারবো না ভোলা। আমি অনেক একা মানুষ। আগুনে পুড়ে পুড়ে এখন স্বপ্নহীন একজন মানুষ। শহরের সমভ্রান্ত পরিবারে আমার জন্ম। আমাদের খানদান চেনে না এমন কেউ নেই। আমার স্থাবর সম্পত্তি থেকে প্রতি মাসে যে ভাড়া পাই তা খেয়ে দেয়ে আমি এবং আমার পরিবারের দিব্বি চলে যায়। শুধু চলে যায় না, খেয়ে পড়ে আরো বেঁচে যায়। কিন্তু ভোলা জানো, উপরে উপরে আমি যতই সুখি দেখাই না কেন ভেতরে একজন মরা মানুষ। আমার স্ত্রী, আমার সন্তান আমাকে কোন মূল্যায়ন করে না। সম্মান করে না। বাড়ির চাকর-ঝি এর মত আচরণ করে। কেন করে তাও জানি। মেয়েকে কেউ যদি প্রশ্ন করে যে, তার বাবা কি করে তাহলে সে কি বলবে সে উত্তর তার কাছে নেই। বউকে তার পরিবারের সদস্যরা যদি প্রশ্ন করে যে তার স্বামী কি করে সে প্রশ্নের উত্তরও তার জানা নেই। আমি আমার সয় সম্পত্তি আমার বউকে লিখে দেয়ার পরেও তার ভালোবাসা আমি আজও পাইনি। এসব কিছু সহ্য করতে না পেরে আমি নেশা করতে শুরু করেছি। এমনকি তোমাকে যে অর্থ আমি দিয়েছি সেও আমাকে বউয়ের হাতে পায়ে ধরে এনে দিয়েছি। আমার আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না ভোলা। বউয়ের অকথ্য গালিগালাজ শুনে বাসায় থাকতে ইচ্ছে করে না। তার এই অমানবিক অত্যাচারে আমি সাত হাজার টাকা বেতনে পাশের এক পাড়া গ্রামে দোকানের চাকরি নিয়েছি। যেখানে মানুষ আমাকে না চেনে। আমার সম্পত্তির ভাড়ার টাকা সব আমার স্ত্রী একাই নিয়ে নেয়। একটি টাকাও আমাকে দেয় না। সকালে পায়ে হেঁটে যেতে হয়। ইদানিং আমার বেতনের টাকার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। আমার মেয়ে আমাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলে। এও কি সম্ভব ভোলা।

শাহীদ ভাই, আমার যে বড্ড অসুখ। আমিও হয়তো

বলতে বলতে ভোলা আর শাহীদ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। মনে হল পৃথিবী এই দুই জনের কাছে অনেক ঋণী। পৃথিবীর কি কোন শক্তি আছে এ দুজনের বুকের উপর থেকে পাহাড় সমান পাথর সরিয়ে দেবে? 


একদিন ভোলা বিকেল বেলা এসে শহীদ আর ভোলার কথাগুলো গল্পের তালে তালে সব আমাকে জানালো। আমি বিষন্নতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আসমানের দিকে চেয়ে রইলাম। বেশ কিছুদিন যাবৎ শাহীদের দেখা নেই। আগের মত নদীর পাড়ে আসে না। ভোলারও দিন যায় নিশ্চুপে। ভোলার চিকিৎসা চলছে কিন্তু অর্থ যোগান দিতে না পেরে হোমিওপ্যাথি উপর ভরসা রেখে দিন রাত্রি এক করে কাজ করে যাচ্ছে। তবুও মাঝে মধ্যে লোক মুখে শোনা যায় ভোলা প্রায়শই অজ্ঞান হয়ে যায়। 

একদিন হঠাৎ দুপুর বেলা ক’জন লোক চা খেতে খেতে আলাপ করছিল, গড়ের মাঠ নামক স্থানে কে বা কারা অজ্ঞাতনামা একজন মানুষকে খুন করে হাটখোলায় ফেলে রেখেছে। থানার দারোগা আর সাংবাদিকরাও উপস্থিত হয়েছে। পোশাক আসাক আর গড়ন গঠনের কথা শুনে ভেতরটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল। দোকানে আর থাকতে পারলাম না। দ্রুত নেমে হাটখোলার দিকে হাঁটা ধরলাম। ভীর ঠেলে উঁকি দিয়ে দেখলাম, আমারদের বড় জন। সারা শরীর জুড়ে জখম। কাপড় রক্তাক্ত। লাশ পুলিশ ভ্যানে তুলবে এমন একটা পরিস্থিতি। আমি পিছিয়ে গেলাম। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পাচ্ছি না। এ কি আমাদের শাহীদ মিয়া!! আমি ভোলা- ভোলা করতে করতে নদীর পাড়ের দিকে দৌড়ে গেলাম। 

“ভোলা কোথায়? ভোলা?” পাড়ে এসে অনেককে জিজ্ঞেস করলাম। রতন নামের আরেক মাঝি আমাকে দেখে দৌড়ে এসে বলল, আলী চাচা কি হইছে? 

“ভোলাকে দেখছ কি রতন?” ভোলারে আমার খুব দরকার।

রতন বলল, “ ক্যান চাচা, আপনে জানেন না, ভোলারে দাহ করতে শ্মশানে নিয়ে গেছে। গতকাল মাঝ দরিয়ায় ভোলা অজ্ঞান হয়ে যায়। আমরা ধরাধরি কইরা হাসপাতালে নিতেই ডাক্তার বাবু কইল ভোলা আর নাই। চাচা ও চাচা, কথা কওনা কেন!” 

না, আমি ঠিক আছি রতন। খুব কাছ থেকে দুইটা শালিক পাখি উইরা যাইতে দেখলাম রতন। 

নাতী ছগিরকে নিয়ে আলী চাচা বাড়ি পথে হাঁটা ধরল। 


রংপুর


পুতুল বউ

পুতুল বউ

 


পুতুল বউ

দিপংকর দাশ


রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠেই ছুটে যেতাম তেঁতুল গাছের তলায়। মগডালে চড়ে তেঁতুল পেরে পকেট ভর্তি করে বসতাম পুকুর পাড়ে। আগে থেকেই পকেটে কাঁচামরিচ আর লবণ ভরে রেখেছিলাম। এবার তেঁতুলের সাথে এগুলো মিশিয়ে খেতাম। অত্যন্ত ঝাল। জিভে জ্বালাপোড়া করতো। তবুও এর স্বাদ বলার মত নয়। রিংকু আর সুমন দুটোই ঝগড়াটে। কথায় কথায় ঝগড়া করত। কখনো রিংকু সুমনের তেঁতুল কেড়ে নিত আবার কখনো সুমন রিংকুরটা কাড়ত। ঝগড়া থামাতে বেগ পেতে হত আমায়। যেভাবেই হোক থামাতাম। খাওয়া শেষ। মায়ের ডাকডাকি। বাড়ি ফিরে আসতাম। ওরাও নিজেদের বাড়ি চলে যেত।


খাওয়া দাওয়া শেষে স্কুলে যাওয়ার সময় আবার একসাথে তিনজন। নানান গল্প আর কোথায় কি আছে চুরি করার পরিকল্পনা করতে করতে স্কুলে গমন। স্কুল থেকে ফিরে মায়ের সাথে খাওয়া। খাওয়ার পর কি আর মায়ের কথা কানে আসে? ছুটে গেলাম নদীর পাড়ে। রহিমুদ্দিনের ডিঙিতে চেপে তিনজন গেলাম পদ্ম বিলে। কুড়িয়ে নিলাম অনেক পদ্ম। আসার সময় আবার ঐ দুই শয়তানের ঝগড়া। এক সময় রিংকু ধাক্কা মারে সুমনকে। সুমন পানিতে পড়ে যায়। টেনে তোলার দায়িত্ব তো আমারই। তুললাম টেনে নৌকায়। কোনো রকম তীরে আসলাম। পদ্ম দিয়ে মালা তৈরী করলাম।


এদিকে সিঁথি, ডলি, কেয়া আর সঞ্চিতা মিলে তৈরী করে পাতার ঘর। ওদের কাছে মালা নিয়ে হাজির হই আমরা। এক নতুন ধরণের খেলা আবিষ্কার করেছে সিঁথি। খেলার নাম পুতুল-বউ। বউ সাজবে সিঁথি আর বর কে হবে তাই নিয়ে চলছে যুদ্ধ। কিন্তু সিঁথি যাকে বলবে সেইতো হবে বর। সবার মুখ বন্ধ করে সিঁথি আমাকেই বর হিসেবে বেছে নিলো। আহ! পরম তৃপ্তি পেয়েছি আমি। খুশিতে আকাশে চিল হয়ে উড়তে ইচ্ছে করছে আমার। সিঁথি একটি শাড়ি পড়ে মাথায় পাতার তৈরী মুকুট পড়েছে। দেখতে পরীর চেয়েও সুন্দরী মনে হয়েছে ওকে। মন জুড়িয়ে গেলো।


রিংকু আর সুমন মিলে আমাকেও বর সাজাচ্ছে। পাঞ্জাবী পড়লাম। মাথায় ফুল আর পাতার তৈরী মুকুট। দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে আমাকে, রিংকু বলল। আমরা পাতার তেরী ঘরে (কনের বাড়িতে) পৌঁছে গেলাম। ওরাও তৈরী। বিয়ে শুরু। বিয়ে পড়াচ্ছে সুমন। তারপর কত্ত মজা হলো। পুতুল বউ খেলাটা আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় খেলার মধ্যে একটি। কেননা এই খেলার মাঝেই আমি সিঁথিকে বউ হিসেবে পেয়েছিলাম।


আজ আমি অনার্স তৃতীয় বর্ষে। সিঁথিও। আমি বৃন্দাবন সরকারি কলেজে আর সিঁথি মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে। মনে পড়ে মাঝে মাঝে। কিন্তু কথা হয় না সাত বছর ধরে। হয়তো কাউকে পেয়ে গেছে মনের মতো। আমাকে ভুলে গেছে। কিন্তু আমি ওকে ভুলতে পারি নি। ভুলবও না। যখন চাকরি পাবো ওকে বিয়ে করবো সবার অনুমতি সাপেক্ষে। জীবনের প্রথম যাকে পুতুল বউ হিসেবে পেয়েছি আজীবন পেতে চাই ওকে, আজীবন।


পদাবলি

পদাবলি

 

    অলঙ্করণ : জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ



সুরের খোয়াব

নীহার মোশারফ


চেহারা নিয়ে অনেকেরই অপছন্দে সময় কাটে

       কৃষ্ণকলির বুকে শরতের হাওয়া

একাডেমির মাঠের কোনায় বৃক্ষের ছায়ায়

             আদরে-সোহাগে সন্ধে গড়ায় তার।

সেই চেনা ঘাট, বিষুদবারের হাট

ভেতরে প্রখর রোদে কৃষ্ণকলি হাঁটে।

   শাড়ির আঁচলে পুষ্পের ঘ্রাণ

           চোখের ধাঁধায় জাগে সুরের খোয়াব।

নবাবী হালচালে ধুনধুমার নেই, 

মিয়ার কথায় হয় না কাবু

                     হাবুর পরিবার।

পরচর্চায় মোহ বাড়ে

                   ঘরে ঘরে উর্বর ঝগড়ার চাষ।

তবুও দুঃখ নেই কৃষ্ণকলির,

রাগে-অনুরাগে ছুঁয়ে যায় ভ্রমর



অন্তরের ধ্বংসস্তূপ 

এম সোলায়মান জয়


বৈতরণী থেকে হৃদয়ে সূর্য ডুবছে

স্মৃতির জানালায় উঁকি-ঝুঁকি দেয় বৃদ্ধ কোকিল

আহ্নিকগতির বেলায় আকাশে ভাসে স্বপ্নের মেঘ

অঙ্কুরিত আকাক্সক্ষায় ফেটে পড়ে যৌবন

হারিয়ে খুঁজি নির্বাসিত বাসনা

কষ্টের শৈল্পিক ভ্রুকুটি নিষ্প্রভ

হতাশার হ্রেষায় নির্বাপিত সময়।


এখানে টুকরো হওয়া অন্তর জমে আছে;

গভীর যাতনায় বেড়ে উঠা অন্তর

ছলনায় স্বপ্ন কবর দেওয়া অন্তর

আমি জীবন থেকে দূরে- 

অন্তরের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে আছি।




বেকার প্রেমিক

অভিষেক 


স্মৃতির কঙ্কাল করছি ফেরী

বুকের বামপাশে তোমার বাড়ি

উৎসবমুখর দ্বিকবিদিক 

কত আলোর রোশনাই 

নীলা আমি তোমার বেকার প্রেমিক

তোমার কাজলা দিঘীর মতো

চোখে আমি বারেবার হারিয়ে যাই

অভিমান, মনখারাপ আর বাকিটা ব্যক্তিগত। 

নদীবক্ষের সামনে হাতে হাত ধরে 

একদিন আমরা বলেছিলাম দুজন দুজনকে কখনও ছেড়ে যাবো না 

অথচ তোমাকে ছেড়ে আমাকে থাকতে হবে, 

জীবনযুদ্ধে একা একা লড়াই করতে হবে- 

ভাবিনি কখনও!


শুধু এটুকু’ই বলবো 

আমাকে ছেড়ে 

সরকারী চাকরী করা যে ছেলেটার হাত ধরেছো তার সাথেই 

তুমি সুখে থেকো 

ভালো থেকো 


কারণ, ভালোবাসার অপর নাম- ‘ভালো রাখা’

তোমার ভালোতেই আমার ভালো

দু’চোখে যতই বিষাদের মেঘ 

করুক না কেনো আমি চাই

তুমি ভালো থেকো।



বাতিঘর 

সাজ্জাদুর রহমান 


বিচার-অবিচারের পাল্লায় যখন 

দোল খায় ভাগ্যের পরিহাস 

তখন বলতে পারবোনা সঠিক কথাটি।


নির্মমতার ফণা তুলে বিষকান্নায়

স্বপ্নের ডালপালা ভেঙ্গে পড়ে

সজ্জিত জীবনের বাতিগুলো নিভে যায়

হাস্যজ্জ্বল দৃশ্যে ধরে পচন

ম্লান হয় রঙিন স্বপ্নের চেনামুখ ! 


বাতাসের গায়ে কাঙ্গালের আর্তনাদ 

আকাশে ভাসে অশ্লীল পদাবলী 

নর্তকীর দেহ তল্লাসি করে নষ্ট চুমুর দাগ।


আমি দূরে বসে-

থৈ থৈ অন্ধকারে হাতড়াই ব্যথার প্লাবন।




চোখ রজনীর ফাঁদে  

রহমান মিজান 


এখনো রাত নামেনি 

ভুলে গেছি কখন নেমেছিল রাত চোখে, 

বুক পকেট অসহায়ত্ব বারো জোড়া বাঁপাশে যাতনা। 

ধারদেনা করা এক প্যাকেট আসক্তি পড়ে আছে নিয়মিত যেন জীবন্ত প্রযোজনা।

রাত নামেনি চোখে জীবিকার বিশ্রী ভাষায় অতিষ্ঠ, 

শেষ রাতের জংশন স্টেশনে নেমে কথোপকথন হয়েছে 

চারপাশের নীরব হত্যাকান্ডের চেয়ে ঢের ভালো কাকতালীয় জীবন।



ফেরারি

ইবনে আব্দুর রহীম খুরশীদ 


নগরের অলিগলি কংক্রিটের পিচঢালা পথ

পাহাড়ের উপত্যকা, বিস্তির্ণ মরুভূ’র মাঠ,

প্রত্যন্ত অঞ্চলেই খুজি তারে কাব্যের শপথ

যদিও বা তার খোঁজে আত্মদান নয়তো বিরাট।


পাখিদের ঘুমভাঙা, প্রভাতের দীপ্ত ঊষা-ক্ষণ

দুপুরের তীব্র রোদ- পিপাসার্ত লো-হাওয়ার দিন,

বিকেলের নিরুত্তাপ, নিশিথের কালো আবরণ

আকাক্সক্ষা সর্বদা তার খুজে থাকে উদাসীন।


আকাশের চাঁদ-তারা সাক্ষী আরো পাহাড়-পর্বত,

অরণ্য-জঞ্জালেও তার খুজে ঘুরেছি অধিক,

নদী আর সাগরের তীরে তীরে সুদীর্ঘ পথ,

নিশ্চিহ্ন করে শেষ হারিয়েছি উন্মুক্ত দিক।


একদিন খুজে খুজে অবিশ্রান্ত আশার ঝলক

প্রত্যাশার প্রান্তরে সহসাই দেখা পাবে তার,

অভিমানে হবে লাল আকুতির সোনার ফলক

একফালি হাসিতেই ঘুচে যাবে ক্লেশ সাধনার।



শিকড়ে পৌঁছাতে

মাজরুল ইসলাম


বুড়ো পানকৌড়ি বসে বসে কতগুলো কথা বলে গেল।


আর তাতেই

চেলার ধূসর ডানা হয়েছে রূপোলি।

এখন কাদা-বালি ধসিয়ে নদী, নদীর তীর

গিলার মিশনে মেতেছে বুড়ো পানকৌড়ির চেলা।


দেখছে বিশ্ব !


খরার মুখে পড়ে- অন্ধকার, হাহাকার

চারিদিকে লাশ আর লাশ !


পা রাখার জায়গাটুকু হারানোয়

বসে থাকতে পারলো না- মরণ আর কি !


বার বার নামে ওরা

নরকাসুরের থাবা দুয়ার থেকে ফিরিয়ে দিতে 

কিংবা শিকড়ের নাগালে।




বেড নম্বর উনিশ

মুস্তফা হাবীব


যেদিন ভেসে আসে তোমার মুখরশ্মি- অবয়ব

মায়ায় জড়ানো কবিতার সংসারে রেখেছি খুব যতœ করে।


তারপর কত প্রকল্প গড়েছি, বুনেছি ফাঁদ 

তুমি আসবে, তুমি আসবে উড়ালপঙ্খী ডানায়

এসে বসবে পাশাপাশি। রিনিঝিনি হাসি

আর রসভারি কবিতার জলে ভেজাবে হৃদকমল।


আশ্চর্যের আশ্চর্য!

অনেক স্বপ্নের কাচাপাতা ঝরে গেছে বিনা নোটিশে

তবু এক নদী আবেগে তোমাকে দেখার শাশ্বত প্রবাহ

দু’চোখে মর্মরিত হতেই ছিল দিনের পর দিন।


অবশেষে বীরের বেশে তোমাকে খুঁজে পেলাম

একটি বনিদী হাসপাতালের ডি ব্লক- লিফটের পনেরো, 

ষোল- বি কক্ষের উনিশ নম্বর বেডে।



প্রেমিকের শার্ট আর সংগোপিত অক্ষরমালা

অনিন্দিতা মিত্র   

সাগরের উথাল পাথাল ঢেউয়ের কাছে গচ্ছিত রাখো সংগোপিত স্বপ্নের মণিমালা, স্মৃতির পত্রাবলিতে অভিমানের টুকরো টুকরো সংকেত, তোমার রয়াল ব্লু শার্টের কলারে টুপটাপ দীপ জ্বালায় ঝিলিমিলি তারাদের দল, নিঃসঙ্গতার বাকল খসিয়ে বিরহিণী স্টারলিং ঠোঁট রাখে প্রেমিকের ঠোঁটে। ঝরা ম্যাপেলের বনে উদাসী বিকেলের প্রবল উল্লাস, নতুন ভালোবাসার স্বপ্ন তুমি সন্ধান করতে থাকো নির্জন গোধূলির জলমহলে।