সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বিজয়ের বেদনা

বিজয়ের বেদনা

 



বিজয়ের বেদনা

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান


তখনও পুব আকাশে সূর্য ওঠেনি, সকাল হতে আরও কিছু সময় বাকি। এদিকে প্রচন্ড প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করছে কিশোরী বঁধূ ছালেহা বেগম। বাড়ির বাহির বারান্দায় বসে অস্থির ভাবে হুক্কা টানছে ফজলু মিয়া। অল্প কিছু সময় পরেই করুণ সুরে ফজরের আযান দিচ্ছে মুয়াজ্জিন হুজুর। ফজলু হুক্কা রেখে পুকুরে গিয়ে ওযু করে মসজিদের দিকে পা বাড়ায়। যদিও সে সূরা কালাম কিছুই পারে না। মুয়াজ্জিন হুজুর তখন সুন্নত নামাজ পড়ে মসজিদের বারান্দায় বসে তসবীহ পড়ছেন। ফজলুকে মসজিদের উঠানে দেখেই মুয়াজ্জিন হুজুর ভূত দেখার মতো চমকে উঠে দাঁড়িয়ে যান। দশ বছর আগে তার বাবা মারা যাওয়ার দিন শেষ বারের মতো তাকে তিনি  মসজিদে আসতে দেখে ছিলেন। হুজুর ভাবলেন আবার কোন অঘটন ঘটলো নাকি। তাই তিনি ফজলুকে প্রশ্ন করতেই সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে। হুজুর তখন ধরেই নিলেন কেউ হয়তো মারা গেছে, তাই তিনি বিড়বিড় করে পড়তে থাকেন ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন..। তখন ফজলু কান্নারত অবস্থায় বলে উঠে, এখনো কেউ মরে নাই কিন্তু মরণাপন্ন অবস্থা। আমার বউটা প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাইতাছে। দাই বেডি কইছে অবস্থা নাকি খুব খারাপ, প্রচুর রক্ত যাইতাছে। হুজুর তখন ফজলুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেন এবং ধৈর্য্য ধরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে বলেন। তারপর জামাতে ফজরের নামাজ আদায় করে হুজুর ফজলুর সাথে তার বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। যাওয়ার সময় পুরোটা পথ তিনি দোয়া দুরুদ পড়তে পড়তে গেলেন। বাড়ির উঠানে পা রাখতেই তারা নবজাতক বাচ্চার কান্না শুনতে পান। তখন দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠে ‘সুবহান আল্লাহ্’। প্রথম সন্তানের মুখ দেখতে অস্থির হয়ে উঠে ফজলু। তখন তার মা লতিফা বানু ঘর থেকে বের হয়ে বড় মুখ করে জানায় পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েছে ছালেহা। তখন রক্তিম সূর্য আভায় রাঙিয়ে আছে পুবের আকাশ। নিজের পুত্রের মুখ দেখতেও যেন ঠিক পুবের সূর্যের মতোই লাল বর্ণের। তাই সন্তানের নাম রাখে সে লাল মিয়া। মুয়াজ্জিন হুজুর ইতিমধ্যেই নবজাতক পুত্র সন্তান জন্মের জানান দিলেন বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে উচ্চ স্বরে আযান দিয়ে।


ছালেহা সন্তানের মুখ দেখে সব কষ্টের কথা ভুলে যায়। সংসারে বংশের প্রদীপ পুত্র সন্তানের আগমনের খুশিতে কদিন মধ্যেই দুটো খাসি জবেহ দিয়ে আকিকা করে। আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশী সবাইকে দাওয়াত করে ফজলু। যারাই তার শিশুপুত্র লাল মিয়ার মুখ দেখেছে, সবাই খুব প্রসংশা করেছে। নামও তার লাল, ছোট মুখখানি দেখতেও লাল। বেশ সুখেই কাটছে ফজলু ও ছালেহার সংসার। তবে এই সুখ বেশি দিন রইলো না। হঠাৎ করেই দেশে একটা গন্ডগোল লেগে যায়। চারদিকে অস্থিরতা বিরাজ করছে কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষ তখনও কিছু বুঝে পেরে ওঠেনি। তবে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের পর কমবেশি সবাই বুঝতে থাকে, এবার একটা কিছু হতে যাচ্ছে। তবে এসব নিয়ে ফজলুর খুব বেশি মাথা ব্যথা নেই। সে একজন কৃষক মানুষ, এসব বিষয়ে তার চিন্তা না করলেও চলবে। তবে চিন্তা না করতে চাইলেও কি চিন্তা না করে থাকতে পারে? দেশে তখন যুদ্ধ লেগে গেছে। পাক বাহিনী সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, শহরের পর শহর তছনছ করে নির্বিচারে গুলি করে পাখির মতো মানুষ হত্যা করছে। শহরের মানুষ সপরিবারে গ্রামে ফিরে আসছে। সবার চোখে মুখে শুধু আতঙ্ক, কেউ স্বস্তিতে নেই। বাঙালিরাও দলে দলে মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিতেছে। মুক্তি বাহিনী অল্প দিনের মধ্যেই প্রতিরোধ গড়ে তুলে পাক বাহিনী বিরুদ্ধে। দেশে তখন পুরোদস্তুর যুদ্ধ চলছে। ফজলুর মনে তখন একটাই চিন্তা, এবার কোন রকমে ক্ষেতের ফসল ঘরে তোলার। তাহলেই সে নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে। তবে ঘরে নতুন ফসল তোলার আগেই তাদের গ্রামের হাই স্কুলে ক্যাম্প বসায় পাক আর্মি। একদিন ওদের বিশাল সুঠাম দেহ, পোষাক ও অস্ত্র দেখে ফজলু রীতিমতো ভয়ে কাঁপতে থাকে। স্কুলের মাঠে আশেপাশের কিছু যুবকদের ধরে এনে নির্যাতন করেতেছে। তাই মনের আতঙ্কে ফসলের মাঠ ছেড়ে সে দৌড়ে বাড়ি ফিরে আসে। তারপর কেটে গেল সপ্তাহ খানেক।


একদিন রাতে ফজলুর ফুফাতো ভাই মতিন এসে তার বাড়িতে উঠে। সে কিছুদিন থাকার পর মতিনের আরও দুই বন্ধু এসেও এক রাত যায়। ওদের চলাফেরা ও কথাবার্তায় ফজলুর মনে কিছু সন্দেহ হতে থাকে। মতিনকে চাপ দিয়ে ধরতেই সে সবকিছু খুলে বলে। মতিনের কথা শুনে ফজলু খুব উত্তেজিত হয়ে উঠে। মুক্তি বাহিনী এসে তার বাড়িতে উঠেছে। এবার তো আর কোন রক্ষা নেই। মতিন আরও জানায়, পাক আর্মির গতিবিধি লক্ষ্য রাখতেই সে এখানে এসেছে। আর কটা দিন থেকেই সে চলে যাবে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফুফাতো ভাই হওয়ার কারণে ফজলু না করতে পারলো না। পাক আর্মির চেয়ে রাজাকারদের দাপটে অতিষ্ঠ হয়ে গেছে গ্রামবাসী। তবে প্রতিবাদ করার সাহস কারো নেই। তাদের জোর জুলুম নির্যাতন নীরবে মেনে নিচ্ছে। কদিন পরে মতিন চলে যায় এবং এর দু’দিন পথেই পাক আর্মির উপরে মুক্তি বাহিনীর গেরিলা হামলা হয়। এতে করে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। মুক্তি বাহিনীর খোঁজে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে যেতে থাকে। একদিন রাতে ফজলুর বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে গ্রামের তিন রাজাকার তার নাম ধরে ডাকতে থাকে। ফজলু বের হয়ে দেখে শুধু রাজাকার না, সামনে পাক আর্মিও আছে। সে ভয়ে তখন এক দৌড়ে পালিয়ে যায়। এটাই ছিল তার চরম বোকামি। তখন পাক আর্মিও তার পিছু পিছু দৌড়াতে থাকে। এক পর্যায়ে এলোপাতাড়ি গুলি করে ফজলুকে হত্যা করে। তারপর আবার ফজলুর বাড়ি এসে তল্লাশি করতে থাকে। তখন তার কিশোরী স্ত্রীকে দেখে জোর করে তুলে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। যদিও ছালেহার কোলে তখন পাঁচ মাসের শিশু সন্তান। সে পাক আর্মির পায়ে ধরে কান্নাকাটি করতে থাকে। তবুও তাদের মনে বিন্দু পরিমাণ দয়া মায়া হয়নি।


পরদিন ভোর সকালে গ্রামের মানুষ দেখে রাস্তার ঝোপের আড়ালে ফজলুর লাশ পড়ে আছে। কেউ তার লাশ ধরেনি, এমনকি বাড়ি গিয়ে খবরও পৌঁছে দেয়নি। মুয়াজ্জিন হুজুরের কানে খবর পৌঁছাতে তিনি তখন লোকজন নিয়ে ফজলুর লাশ তার বাড়িতে পৌঁছে দেন। তিনি নিজেই দায়িত্ব নিয়ে ফজলুর দাফন কাফনের ব্যবস্থা করেন। এদিকে পিতা-মাতা হারা নাতি লাল মিয়াকে কোলে নিয়ে ফজলুর মা লতিফা বানু যেন অথৈ সাগরে ভাসছেন। একমাত্র ছেলে হারানোর শোকে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে অঝোরে কাঁদছেন। ওই দিকে ছেলের বউ আছে আর্মির ক্যাম্পে। তার সুখের সংসার এভাবে কেউ এসে তছনছ করে দিবে, এটা তার দুঃস্বপ্নেও কখনো আসেনি। দু’হাত তুলে আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ করে যাচ্ছে আর পাক আর্মিদের অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছে। এমন সময় এলাকার রাজাকার মুন্সী নিয়ামত উল্লাহ তার দলবল নিয়ে ফজলুর বাড়ি দখল করে নেয়। চোখের পানি আঁচলে মুছতে মুছতে নাতি লাল মিয়াকে কোলে নিয়ে লতিফা বানু স্বামীর ভিটে ছেড়ে ভিখারির মতো বের হয়ে যান। এই দৃশ্য দেখে মুয়াজ্জিন হুজুর বলে উঠেন, তোদের পাপের কলসি পূর্ণ হইছে, এখন পতন অনিবার্য। তিনি ফজলুর মাকে কিছু দিনের জন্য পাশের গ্রামের একজনের বাড়িতে কিছু দিনের জন্য আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেন। মতিনের কানে সব খবর পৌঁছে যায়। সে তখন নিজেকে কোন ভাবেই ক্ষমা করতে পারছে না। সবকিছুর জন্য সে নিজেকে দায়ী করছে। যদি না সে ফজলুর বাড়িতে না যেত, তাহলে আজকে তার এমন করুণ পরিণতি নাও হতে পারতো। সব খোঁজ খবর নিয়ে একদিন সুযোগ করে মতিন মুয়াজ্জিন হুজুরকে দিয়ে তার ফুফু লতিফা বানু ও ভাতিজা লাল মিয়াকে তাদের গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করে।


কিছু দিন পরেই এক রাতে গ্রামের হাই স্কুলের আর্মি ক্যাম্পে মুক্তি বাহিনী গেরিলা হামলা করে তাদের কোনঠাসা করে ফেলে। বেশ কজন মুক্তি বাহিনীর গুলিতে মারা যায়। যারা বেঁচে ছিল, তারা কোন উপায় না দেখে প্রাণের ভয়ে পালিয়ে যেতে থাকে। তখন মতিন তন্নতন্ন করে ছালেহাকে খুঁজতে থাকে কিন্তু কোথায় খোঁজে পায়নি। কোথায় আছে ছালেহা, সেটা কেউ জানে না। উত্তেজিত হয়ে উঠে মতিন এবং সে রাজাকার মুন্সী নিয়ামত উল্লাহ এর বাড়িতে একদিন রাতে হামলা করে। নিয়ামত জানায়, কদিন আগে পাক আর্মি অন্য একটা ক্যাম্পে ছালেহাকে নিয়ে যায়। তবে কোন ক্যাম্পে নিয়ে গেছে, সেটা সে জানে না। মতিন আর ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারেনি, সে নিয়ামতের পায়ে গুলি চালায়। তারপর তার বুক বরাবর তিনটা গুলি করতেই নিয়ামতে মৃত্যু হয়। মতিন আবার ফিরে যায় যুদ্ধের ময়দানে। তখন খুব কঠিন সময়, পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। সারা দেশেই পাক আর্মি অনেকাংশে কোনঠাসা হয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বলতে গেলে যাকেই পাচ্ছে, তাকেই মারছে। তবে মুক্তি বাহিনীর শক্ত প্রতিরোধে কাছে অল্প দিনের মধ্যেই তারা পুরোপুরি কোনঠাসা হয়ে পড়ে। ১৬ ডিসেম্বর পাক আর্মির আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাঙালির চূড়ান্ত বিজয় আসে। নাতি লাল মিয়াকে কোলে নিয়ে স্বামীর ভিটে মাটিতে আবার ফিরে আসেন লতিফা বানু। তবে আর ফিরে আসেনি কিশোরী পুত্রবধূ ছালেহা।


মতিনের দেখভল ও সামান্য আর্থিক সহায়তায় নাতি লাল মিয়াকে কোলে নিয়ে আবার শুরু হয় লতিফা বানুর জীবন যুদ্ধ। একদিন লতিফা বানুর জীবন যুদ্ধ থেমে যায়, তখন নাতি লাল মিয়ার বয়স তেইশ বছর বয়স। তখন চাচা মতিন মিয়া তার বিয়ে করিয়ে বাড়িতে নতুন বউ নিয়ে আসে। বর্তমানে লাল মিয়া একজন মধ্যবয়সী পুরুষ, একজন অটোরিকশা চালক। সে প্রাইমারি স্কুলেই লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে দিলেও নিজের তিন সন্তানের লেখাপড়া নিয়ে খুবই আন্তরিক। তার বড় মেয়ে রাফিয়া বর্তমানে কলেজে লেখাপড়া করছে। তার একটা সরকারি চাকরির জন্য লাল মিয়া অনেকের ধারে ধারে ঘুরে এখন বড্ড ক্লান্ত। সবাই জানে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তি বাহিনীকে বাড়িতে আশ্রয় দেওয়ার জন্য তার পিতা ফজলু মিয়াকে হত্যা করা হয় এবং তার মা ছালেহা বেগমকে ক্যাম্পে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তবুও অনেক চেষ্টা করেও লাল মিয়া পায়নি সরকারি ভাবে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের সনদপত্র। এমনকি কোন দিন সরকারি ভাবে কোন রকমের সহায়তাও তার ঘরে আসেনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার জন্মের পাঁচ মাস পরেই একই দিনে তার বাবা-মা দুজনকেই হারায়। এতিম হয়ে শৈশব ও কৈশোর কাটানোর কষ্ট একমাত্র লাল মিয়া নিজেই জানে। শুধু জানে না এই সমাজ ও রাষ্ট্র। তাই বিজয় দিবসে সবাই যখন বর্ণিল আয়োজনে ব্যস্ত, তখন লাল মিয়া ঘরের কোণে বসে নীরবে কাঁদে। বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান শেষে মুক্তিযোদ্ধার যখন বিভিন্ন সরকারি উপহার নিয়ে বাড়ি ফিরে, লাল মিয়া তখন চোখের পানি মুছে অটোরিকশা নিয়ে বের হয় সংসারের গ্লানি টানতে। বিজয়ের আনন্দ কখনো লাল মিয়াকে স্পর্শ করেনা। তার কাছে বিজয় মানে হতাশা, বেদনা ও বুক চাঁপা কান্না।


কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

কুইন্স, নিউইয়র্ক, আমেরিকা


সব পাখি ঘরে ফেরে না

সব পাখি ঘরে ফেরে না


সব পাখি ঘরে ফেরে না
সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

অফিস থেকে বাসায় ফিরে আসিফ দেখতে পেল দরজায় তালা ঝুলছে। বুঝতে বাকি রইলো না, তিশা আবারো বাসা ছেড়ে চলে গেছে। এই নিয়ে ছয় বার, তাই আসিফ খুব বেশি অবাক হয়নি। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাড়িওয়ালার বাসায় গেল চাবি আনতে। চাবি দেওয়ার সময় বাড়িওয়ালা দু’চার কথা শুনিয়ে দিল। ‘শুনেছি প্রেম করে বিয়ে করেছিলে। দুই বছর পার হলো না এর মধ্যে অনেকবার ঘর ছেড়েছে। কেমন প্রেম করেছিলে যে বউ কথায় কথায় ঘর ছেড়ে চলে যায়। এবার বাচ্চাকাচ্চা নাও মিয়া, এতে করেও যদি তোমাদের সংসার কোনো রকমে টিঁকে থাকে।’ এসব শুনে আসিফ অভ্যস্ত হয়ে গেছে। চুপ করে মাথা নুইয়ে চাবি হাতে নিয়ে সালাম দিয়ে বিদায় নেয়। তালা খুলে ঘরে ঢুকে ডাইনিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে এক গ্লাস পানি খেয়ে জগের নিচে রাখা চিরকুটটা হাতে নিল। তারপর বেড রুমে ঢুকে বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে চিরকুট খুলে বেশ কিছু সময় তাকিয়ে রইলো। গতানুগতিক সেই একই কথা। ‘তোমার সাথে আর সংসার করা সম্ভব নয়। আর ফিরে আসছি না। ভুলেও আমার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করবে না।’ তবে এবার নতুন করে যোগ হল, ‘আমি তোমাকে খুব দ্রুত ডিভোর্স নোটিশ পাঠিয়ে দিব। এটাই আমার ফাইনাল ডিসিশন।’ আসিফ চিরকুট থেকে চোখ সরাতে পারছে না। ডিভোর্স নামক শব্দে তার চোখ আটকে আছে। কখন যে চোখের কোণে পানি এসে গেল, সে বুঝতে পারলো না। চোখের পানি মুছে মোবাইলটা হাতে নিয়ে তিশাকে কল দিতে গিয়ে থেমে গেল। ডিভোর্সের কথাটা মনে হতেই আসিফের খুব অভিমান হয়েছে। গতকাল রাতে ঝগড়ার এক পর্যায়ে রাগের মাথায় একটা চড় মেরেছে, তাই বলে ডিভোর্স দিতে হবে! এটা কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছে না আসিফ। অফিস থেকে ফিরে হালকা নাস্তার অভ্যাস আছে কিন্তু কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না। পেটে ক্ষুধা নিয়েই বিছানায় শুয়ে থেকে এক ভাবনার জগতে হারিয়ে গেছে। মনে পড়ছে সেই পুরানো দিনে কথা।

এক সময় আসিফের ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের ব্যবসা বেশ ভালোই চলছিল। একের পর এক বিভিন্ন রকম ইভেন্ট অর্গানাইজ করে তখন দু’হাত ভরে টাকা কামাই হচ্ছিল। একটা ইভেন্টের কাজে আসিফের সাথে তিশার পরিচয়। তারপর ফেসবুকে বন্ধুত্ব এবং মেসেঞ্জারে চ্যাটিং করতে করতে একসময় ঘনিষ্ঠতা। আসিফের সাথে যতবারই তিশার দেখা হয়েছে, কোনো না কোনো নামীদামি রেস্টুরেন্টে কিংবা শপিং মলে। এছাড়াও প্রাইভেট কার ভাড়া করে এখানে ওখানে লং ড্রাইভে যাওয়া। তিশাকে খুশি করতে একসময় আসিফ ব্যাংক লোন নিয়ে ডাউন পেমেন্ট করে নিজেই একটা প্রাইভেট কার কিনে নেয়। আসিফের চাকচিক্য ও আভিজাত্য তিশাকে বরাবরই মুগ্ধ করে রাখে। স্বামী হিসেবে মেয়েরা এমন ছেলেই পছন্দ করে। আসিফকে বিয়ে করতে তিশা মরিয়া হয়ে উঠে। যদিও আসিফ তখন বিয়ের জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তারপরেও তিশার চাপ উপেক্ষা করতে পারেনি। তাই বেশ জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। তিশার ইচ্ছায় বিয়ের পর হানিমুনে গেল থাইল্যান্ড। হানিমুন থেকে ফিরে এসে আসিফ ব্যবসায়ে মনোযোগ দিতে গিয়ে দেখে প্রচুর দেনা পড়ে গেছে। কিন্তু দেনা পরিশোধের জন্য ব্যাংক একাউন্টে তেমন টাকাও নেই। আসিফ ভালো ব্যবসায়ী, তাই সাপ্লাইয়ের পার্টিরা বাকিতে ইভেন্ট অর্গানাইজ করার মালামাল দিত। বাকিতে মালামাল নিলেও সে সবার টাকাই ঠিক মতো পরিশোধ করত। তবে বিগত চার মাস যাবত আসিফ কারো টাকাই ঠিকমতো পরিশোধ করেনি। বর্তমানে সাপ্লাইয়ের বিভিন্ন পার্টি পাওনা টাকা পরিশোধের জন্য অফিসে বসে থাকে। এদিকে নতুন কাজ হাতে নিতে পারছে না কারণ টাকা পরিশোধ না করা পর্যন্ত কেউ বাকিতে মালামাল দিবে না। তখন আসিফের মনে পড়ে, যে টাকা দিয়ে সে ধুমধাম করে বিয়ে এবং হানিমুনে করেছিল, সেটা ছিল সাপ্লাই পার্টিদের বাকির টাকা। বাধ্য হয়ে ডাউন পেমেন্টে কেনা নতুন গাড়ি বিক্রি করে দেয়। যদিও বেশি টাকা পায়নি কিন্তু অল্প করে পার্টিদের কিছু টাকা পরিশোধ করে। এদিকে আসিফের ব্যবসার দূরাবস্থা, অন্যদিকে তিশার উচ্চ বিলাসিতা। কোনো দিক সে ঠিক মতো সামাল দিতে পারছে না। দিনে দিনে তিশা বেপরোয়া হয়ে উঠে এবং প্রায় প্রতিদিন এটা ওটা নিয়ে আসিফের সাথে রাতভর ঝগড়া করে। যেদিন মাত্রাতিরিক্ত ঝগড়া হয়, পরের দিন সকালে তিশা বাপের বাড়ি চলে যায়। আবার আসিফ শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে অনেকটাই নাকে খত দেওয়ার মত করে তিশাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

অনেক চেষ্টা করেও আসিফ ব্যবসায়ে ফিরে আসতে পারেনি। একের পর এক কাজ হারাতে থাকে। অফিস ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন দেওয়া যেখানে দায়, সেখানে পাওনাদারের টাকা পরিশোধ যেন গোদের উপর বিষফোঁড়া। তাই শেষ মূহুর্তে বাধ্য হয়ে আসিফ তার এক বন্ধুর কাছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটা বিক্রি করে দিয়ে সবার দেনা পরিশোধ করে। ব্যবসা হারিয়ে সে হন্য হয়ে চাকরি খুঁজতে থাকে। ভাগ্য ভালো ছিল, তাই এক বন্ধুর সহযোগিতায় একটা স্বনামধন্য এড ফার্মে সে চাকরি পেয়ে যায়। মোটামুটি যা বেতন পেত, দুজনের পরিবার সুন্দর ভাবেই চালানো যেত। কিন্তু তিশার উচ্চ বিলাসি মানসিকতা আসিফের প্রতিকূল পরিস্থিতি বুঝতে চাইতো না। বিভিন্ন ভাবে আসিফকে মানসিক টর্চার করত। সে আপ্রাণ চেষ্টা করেও তিশার মন জয় করতে পারত না। কারণ তিশার বিলাসিতার কাছে আসিফের আয় ছিল সীমিত। এক সময় তিশা নিজেও চাকরি করতে চায়। সেই চাকরিটাও আসিফ জোগাড় করে দিল। চাকরিতে জয়েন করার মাসখানেক পর থেকে তিশা আসিফের প্রতি আরো বেশি উদাসীন হয়ে যায়। আসিফ খেল কি খেল না, কোনো কিছু নিয়ে তিশার মাথা ব্যথা নেই। সংসারের খরচ আসিফ দিয়ে যাচ্ছে আর তিশা নিজের ইনকাম দিয়ে বিলাসিতা করছে। এভাবেই চলছে, তবুও আসিফের তেমন কোনো অভিযোগ নেই। যদিও মাঝেমধ্যে নিজের সাথে আক্ষেপ করে কিন্তু মুখ খুলে কিছু বলেনি। সে সব সময়ই চেষ্টা করে তিশার সাথে ঝগড়া এড়িয়ে চলতে। তবে এক সময় লক্ষ্য করে তিশার মধ্যে কিছু পরিবর্তন এসেছে। তিশা মাঝরাতে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কথা বলে। তার মোবাইল ফোন ধরলে আসিফের সাথে ঝগড়া করে। কখনো কখনো রাত করে বাসায় ফিরে। এসব নিয়ে কথা বললেই আসিফের সাথে তুমুল ঝগড়া শুরু হয়। আবারো বাপের বাড়ি চলে যায়। আবারো নাকে খত দেওয়ার মত করে তিশাকে ফিরিয়ে আনতে হয়। শেষমেশ অনেকটাই নিরুপায় হয়ে আসিফ তিশার সবকিছুই বাধ্য হয়ে মেনে নেয়। সে চায় অন্তত সংসারটা টিঁকে থাকুক। সত্যি কথা বলতে, আসিফ তিশাকে ভীষণ ভালোবাসে। তাই সে চায় না কোনো ভাবেই তিশাকে হারাতে। একটা গানের কথায় আছে, মন ছুটলে কাউকে ধরে রাখা যায় না। তিশার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হল।

অফিসের কাজে পারদর্শী না হলেও কীভাবে বসের মন জয় করতে হয়, তিশা সেটা খুব ভালোই জানে। তাই চাকরির ছয় মাসের মাথায় জব কনফারমেশনের সাথে একটা প্রমোশনও পেয়ে যায়। তিশা তখন ধরাকে সরা জ্ঞান করে চলতে থাকে। দিনে দিনে বেপরোয়া হয়ে উঠে। অফিসে বসদের সাথে ঘেঁষাঘেষি করা যেন তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। অন্যান্য নারী কলিগরাও এসব দেখে নাক সিটকায় কিন্তু এতে করে তিশার কিছুই যায় আসে না। একদিন অফিসের এক পার্টিতে পরিচয় ঘটে অন্য এক কোম্পানির একজন ইয়াং ডিরেক্টর নাঈম আহমেদের সাথে। তিশা তার সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে নাঈম আহমেদের নজরে আসার চেষ্টা করে এবং এসেও যায়। ফেসবুকে ও মোবাইলে আলাপচারিতায় কিছুদিনের মধ্যেই দুজনের মধ্যে বেশ অন্তরঙ্গ একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে তার হাত ধরে মাস দুয়েক পর সে ওই কোম্পানির অফিসে ডাবল প্রমোশন নিয়ে জয়েন করে। নতুন অফিসে জয়েন করার পর তিশার গেটআপ বদলে গেছে। এখন তার মধ্যে একটা আভিজাত্য ভাব ফুটে উঠেছে। নাঈম আহমেদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পার্টিতে যাচ্ছে। সে যেমন জীবন চেয়েছিল, তার সাথে সেটাই খুঁজে পাচ্ছে। এদিকে আসিফের প্রতি তিশার প্রায় সব রকম আগ্রহ ও টান ফুরিয়ে গেছে। শুধুমাত্র একটা সামাজিক দায়বদ্ধতার জন্য আসিফের সঙ্গে থাকা। একদিন রাতে আসিফ তিশাকে একটা ভিডিও ফুটেজ দেখায়। নাঈম আহমেদের সঙ্গে তিশা অভিজাত হোটেলের রুমে ঢুকছে। ওই হোটেলে চাকরি করে আসিফের বন্ধু। সে সিসি ক্যামেরা হতে ওই ফুটেজ সংগ্রহ করে আসিফকে দিয়ে ছিল। ওই ফুটেজের বিষয়ে তিশার সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হতে হতে এক পর্যায়ে আসিফ তিশার গালে একটা চড় বসিয়ে দেয়। তিশা আর কোনো কথা না বলে বিছানায় শুয়ে থাকে আর আসিফ ড্রয়িং রুমের সোফায়। পরদিন সকালে ঘুম ওঠে আসিফ রেডি হয়ে অফিসে চলে যায়। তিশার সেদিন ডে-অফ থাকায় সে দরজার চাবি নিয়ে যায়নি। আসিফ চলে যাওয়ার পর তিশা ঘুম থেকে ওঠে। তারপর লাগেজ গুছিয়ে একটি চিরকুট লিখে ডাইনিং টেবিলের জগের নিচে রেখে বাসা ছেড়ে চলে যায়। যাওয়ার আগে বাসার চারি বাড়িওয়ালার হাতে বুঝিয়ে দেয়।

তিশার উপর আসিফের রাজ্যের অভিমান থাকলেও সে যোগাযোগ না করে থাকতে পারেনি। সপ্তাহখানেক পর তিশার বাবার মোবাইলে কল দেয়। সালাম দিয়ে ভালো মন্দ খোঁজ খবর নিয়ে তিশার বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান তিশা তো বাসায় আসেনি। তখনই আসিফের মাথাটা চক্কর মেরে ওঠে। তিশার বাবা অতিমাত্রায় একজন ভদ্রলোক। শুধুমাত্র উনার জন্যেই তিশা প্রত্যেক বার আসিফের কাছে ফিরে আসতে বাধ্য হয়ে ছিল। তবে তিশার মা তার ঠিক উল্টো। আসিফকে নাকে খত দিয়ে তারপর তিশাকে যেতে দেয়। যা হোক, আসিফ ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় কিন্তু শ্বশুরকে জানায়নি যে তিশা এক সপ্তাহ আগে বাসা ছেড়ে চলে গেছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও যখন তিশার কোনো খোঁজ পাচ্ছে না, তখনই একটা কল আসে আসিফের মোবাইলে। সে কল রিসিভ করতে অপর প্রান্ত থেকে বলে উঠে, ‘আমি নাঈম আহমেদ। আপনার স্ত্রী তিশা আমার কাছে আছে। সে আপনাকে ডিভোর্স দিতে চায়। যদি মিউচুয়ালে হয়, তাহলে সবকিছু সহজেই হয়ে যাবে। আশাকরি আপনি কোনো আপত্তি রাখবেন না। আপত্তি করলেও তিশা আপনাকে একতরফা ডিভোর্স দিবেই। আপনি ভেবে চিনতে আমাকে আগামী তিনদিনের মধ্যে জানাবেন।’ আসিফ তিনদিন ধরে অনেক অনেক চিন্তা ভাবনা করে কিন্তু কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারেনি। আবারো নাঈম আহমেদের কল আসে। সে জানিয়ে দেয় মিউচুয়াল ডিভোর্সে সে রাজি নয়। তিশার জন্য সে অপেক্ষা করবে, যদি তার সিদ্ধান্তের কোনো পরিবর্তন আসে। আসিফের কথা শুনে নাঈম আহমেদ অট্টহাসিতে মেতে ওঠে এবং বেস্ট অফ লাক বলে কল কেটে দেয়। কিছুদিন পরেই তিশার পক্ষ হতে ডিভোর্সের উকিল নোটিশ আসে। তবুও আসিফ হাল ছাড়েনি। অপেক্ষা করতে থাকে। যদি তিশার সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময় শেষে ডিভোর্স চূড়ান্ত ভাবে কার্যকর হয়। তখন আসিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উপলব্ধি করে, সব পাখি ঘরে ফিরে না।


একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মবিলাপ

একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মবিলাপ



একজন মুক্তিযোদ্ধার আত্মবিলাপ
সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

প্রায় বছর দশেক আগে আমার এক বন্ধুর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাই। এক বিকালে ওদের গ্রাম্য বাজারের টং দোকানে বসে আমার বন্ধুর সাথে চা খাচ্ছিলাম। তখন দেখলাম একজন পঞ্চাশোর্ধ অর্ধনগ্ন পঙ্গু লোক পাগলের মতো জোরে জোরে বলছে, ‘তোরা আমার সখিনারে ফিরাইয়া দে, আমার সখিনারে মারিছ না, তোদের আল্লার দোহাই, সখিনার ইজ্জত নষ্ট করিছ না।’ আমার জানতে ভীষণ আগ্রহ জাগলো, এই লোকটিকে আর কে সেই সখিনা, কারা তার ইজ্জত নষ্ট করবে? আমার বন্ধুর কাছে জানতে পারি, তিনি ওদের গ্রামের একজন সনদবিহীন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমি সাথে সাথে দাঁড়িয়ে গেলাম, তারপর সেই বীর মুক্তিযোদ্ধার কাছে গিয়ে উনাকে আমার পাশে নিয়ে এসে বসালাম। তিনি আমার সাথে তখন খুব স্বাভাবিক আচরণ করলেন। উনাকে চা-বিস্কিট খেতে দিয়ে কিছু সময় গল্প করলাম। তারপর উনাকে তার জীবনের গল্প বলতে বললাম।

তিনি উনার গল্প বলা শুরু করলেন এভাবেই-
আমার নাম তোরাব আলী। আমার জন্মের কয়েক মাস পরে বাপ মইরা যায়। মায়ে আর বিয়া বয় নাই। আমার দাদা, দাদী, আমি আর আমার মায়েরে লইয়া আমাগো গৃরস্থ পরিবার। দাদাজানের জমিজমা আছিল বিস্তর। কোন অভাব আছিল না। আমি সারাদিন দোস্তগো লগে ঘুরাইতাম । মায়ে কতো বকাঝকা করতো, দাদাজানের জমিজমা দেখশন করতে কইতো। দাদাজান মায়েরে উল্টা কইতো, তুই ওরে বকিস না বেটি, আমি এখনও বাইচ্ছা আছি। তোরা আমার পুলার শেষ নিশানা, আমার কলিজা, আদরের নাতি, থাকুক হের মন মতন। আসলে আমার মনডা পইড়া থাকত অন্য জায়গায়। হা.. হা.. হা.. কি কমু শরমের কথা, সারাদিন পইড়া থাকতাম মোল্লা বাড়ির সামনের পুকুরের বাঁশঝাড়ের চিপায়। সখিনা ঘাটে আইলে আমি হাবলার মতো তাকাইয়া থাকতাম। সখিনাও কাজল টানা চোখ তুইল্যা দুই এক নজর আমারে দেখতো আর আঁচল দিয়া মুখ লুকাইয়া মিটমিটাইয়া হাসতো। আহারে, কি যে সুখ পাইতাম। মনের সুখে গান ধরতাম, আরো কতো যে পাগলামি করতাম। আসল কথা অইলো, সখিনারে আমি বহুত মহব্বত করতাম।

সখিনা দেখতে আছিল আসমানের পরীর লাহান। টানা টানা চোখ, দুধে আলতা চেহারা, মাথার চুল আছিল মাশাল্লাহ। একদিন সখিনারে পথে একলা পাইয়া, পথ আটকাইয়া দাঁড়াইলাম। সখিনা আমারে সালাম দিয়া কইলো, তোরাব ভাই পথ ছাড়েন। আমি সখিনারে কইলাম, তোমার সাথে আমার কথা আছে। সখিনা জওয়াব দিল, আমি মোল্লা বাড়ির মাইয়া, পথে ঘাটে কারো লগে কথা কই না, আফনে পথ ছাড়েন। আমি লগে লগে পথ ছাইড়া দিলাম আর সখিনা হনহনাইয়া হাইট্যা যাইতাছিল। আমি সাহস নিয়া পিছন থাইক্যা জোরে কইয়া উঠলাম, সখিনা আমি তোমারে অনেক মহব্বত করি। আমার কথা শুইন্না, সখিনা আঁচলে মুখ ঢাইকা একটা মুচকি হাসি দিয়া একবার পিছন ফিরা কইলো, ‘আফনে একটা বেশরম মানুষ, লজ্জা শরমের মাথা খাইছেন। আমার বুঝি শরম নাই, এইসব কথা কেউ এমনে কয়।’ কথাডা শেষ কইয়াই হের বাড়ির দিকে জোরে দৌড় দিছিল। তহনই পুরাপুরি বুঝতে পারছি, সখিনাও আমারে মহব্বত করে। হেই দিন এই দুনিয়ায় আমার মতো সুখী মানুষ আর কেউ আছিল না। হেই খুশিতে আমার হগল দোস্তদের ছাগল জব দিয়া খাওয়াইছি।

হঠাৎই একদিন মাইনষের মুখে শুনি, দেশে কি জানি ঝামেলা চলতাছে। আমি মাথা ঘামাইনাই, এই গুলা অইলো রাজাগো ব্যাপার। কিন্তু না, ঘটনা তো অইন্য রকম। শেখ সাবে নাকি কইছে, যার কাছে যা কিছু আছে, তাই লইয়া পাক সেনার উপর ঝাঁপাইয়া পর, দেশ পাক সেনার হাত থাইক্যা মুক্ত কর। তহন আমার টনক নড়লো। শাব্বাস শেখের ব্যাটা, জব্বর একখান কথা কইছে। কি করমু, কি করমু ভাবতাছি। এমুন সময় আবারও হঠাৎ একদিন শুনি, গভীর রাইতে পাক সেনারা নাকি ঢাকাতে হামলা করছে। গুলি কইরা পাখির মতো হাজার হাজার বাঙ্গাালী মারছে। তহনই দেশ স্বাধীনের ঘোষণা আইছে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু অইয়া গেছে, প্রত্যেক দিন হাজারে হাজারে বাঙ্গালী মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিতাছে। আর চুপ কইরা থাকতে পারলাম না। আমিও সিদ্ধান্ত নিলাম, মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিমু, দেশ পাক সেনা মুক্ত করমু। দোস্তগো লগে যুক্তি করলাম, সবাই রাজি অইয়া গেলো যুদ্ধে যাইতে। শরীলডাতে তহন আগুন জ্বলতাছে, আর তর সইতাছেনা। তারপর যে যার মতো বাড়িত গেলাম।



রাইতে খাইতে পারি নাই, ঘুম আহে নাই। চিন্তায় পইড়া গেছি, দাদাজান আর মায়েরে কেমনে কথাডা কই। চিন্তা করতে করতে এক সময়ে ঘুমাইয়া পড়ছি আর খোয়াবে দেখলাম আমি যুদ্ধের ময়দানে গুলি কইরা পাক সেনা মারতাছি। এমুন সময় একটা পাক সেনা পিছন থাইক্যা আইয়া আমার গাঢ়ে স্টেনগান দিয়া গুতা মারছে। আমি রাগে থাবা দিয়া হের স্টেন গানের নলে ধইরা টান দিয়া কইলাম, গুলি মারলে সামনে দাড়াইয়া আমার সিনাতে গুলি মার। তহনি ঘুম ভাইঙ্গা গেছে আর দেহি মায়ে আমার সামনে দাঁড়াইয়া আছে আর আমার হাতে একটা লাটি। হা..হা..হা.. মায়ে আমারে ঘুম থাইক্যা জাগাইবার লাইগ্যা লাটি দিয়া গুতা দিছিল। খোয়াবে লাটিডারে স্টেনগান মনে কইরা টান মারছিলাম। মায়ে আমারে জড়াইয়া ধইরা কইলো, বাজান তুই কি কুনু খারাপ খোয়াব দেখছত নাকি? কেডা তোরে পিছন থাইক্যা গুলি মারবো?

মায়েরে সাহস নিয়া কথাডা কইয়া ফালাইলাম, আমি মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিমু, পাকসেনার সাথে যুদ্ধ কইরা দেশ স্বাধীন করুম। মায়ে আমার কথা হুইন্না হাউমাউ কইরা কাইন্দা উঠছে। আমারে কিরা কসম দিয়া যুদ্ধে যাইতে নিষেধ দিতাছে। আমি অইলাম বংশের একমাত্র বাত্তি, আমি যদি যুদ্ধে মইরা যাই, তাইলে বংশের বাত্তি নিব্বা যাইবো। আরো কতো কথা কইতাছে, আমি ফতুয়াডা কান্দে লইয়া না খাইয়া বাজারে দিকে পথ দিলাম। মায়ে পিছন থাইক্যা ছিল্লাইতাছে, ওরে পুত কিছু মুখে দিয়া যা। আমি আর শুনলাম না, সিদা বাজারে আইয়া আকছির মিয়ার চায়ের দোকানে গিয়া বইলাম। তহন আকছির মিয়া আমারে ফিসফিসাইয়া কইলো, মাইনষের মুখে হুনলাম তোমরা নাকি যুদ্ধে যাইবা? আমি কইলাম, তুমি হুনলা কেমনে? আকছির মিয়া তহন চাপা স্বরে কইলো, যাইবার অইলে আইজকা রাইতের মইধ্যে যাও, নাইলে কাইলকাই হারামী শান্তিবাহিনী তোমরারে পাকসেনার হাতে ধরাই দিব, আমার কাছে খবর আছে।

মাথার মইধ্যে খুন চাইপ্পা গেল, মনে মনে নিয়ত করলাম আইজকা রাইতেই পথ দিমু। কিছু সময়ের মইধ্যেই আমার সব দোস্তরা বাজারে আইল। সবাইরে লইয়া মিটিংয়ে বইয়া আমার সিদ্ধান্তের কথা জানাইয়া দিলাম। সাথে সাথেই রশিদ, করিম, ফিরোজ, জলিল, মুক্তার, হরিপদ আর অসীম আইজকা রাইতে আমার সাথে যাইতে রাজি অইয়া গেল, বাকিরা বাড়িত গিয়া সিদ্ধান্ত নিব। আমি সবাইরে কইলাম, যারা আমার সাথে যুদ্ধে যাইবা, আইজকা রাইতে দশটার সময় নদীর ঘাটে থাকবা। তারপরে হগলে বুক মিলাইয়া যার যার মতো বিদায় নিলাম। আমি তহন মোল্লা বাড়ির দিকে রওনা দিলাম সখিনার লগে এক নজর দেহা করতে। পুকুর ঘাটের বাঁশঝাড়ের নিচে বহুত সময় বইসা আছিলাম কিন্তু সখিনা ওই দিন পুকুর ঘাটে আর আহে নাই। সখিনা গো বাড়ির একটা ছোট মাইয়ারে পথে পাইয়া কইলাম, সখিনারে কইছ আমি আইজকা রাইতে যুদ্ধে যাইমু আর হয়তো দেখা নাও হইতে পারে। তারপর বাড়ির দিকে রওনা দিলাম আর বুকের মইধ্যে তহন ধুকপুকানি শুরু হইছে।

বাড়ির উঠানে পা রাখতেই দাদাজানের গলার আওয়াজ শুইন্না কইলজাডা শুকাইয়া কাঠ অইয়া গেছে। দাদাজানে আমারে কইলো, তর মায়ের মুখে আমি কি শুনলাম? আমিও সাহস নিয়া জওয়াব দিলাম, যা শুনছো, ঠিকি শুনছো। মায়ে আর দাদীজানে মরা কান্দন শুরু করছে আর দাদাজানে কতো কিছু বুঝাইতাছে কিন্তু আমি অনড়। শেষমেশ দাদাজানে মায়ে আর দাদীরে কান্দন থামাইতে কইলো। আরো কইলো, ‘তোরাবের শরীলে আমাগো রক্ত, জবানে যখন কইয়া লাইছে, কথা আর নড়বো না, তোমরা হের যাওনের ব্যবস্থা কর।’ তহন মায়ে আর দাদীজান আমার পছন্দের তরকারি রানতে গেছে আর আমি কিছু কাপড়-ছাপর গুছগাছ কইরা বিছানায় শুইয়া একবার সখিনা আরেক বার যুদ্ধের কথা ভাবতাছি। এমুন সময়ে মায়ে আইয়া খাইতে ডাকলো কিন্তু আমার  ক্ষিধা নাই। তবুও গিয়া দাদাজানের লগে বইলাম। সবাই মিল্লা জোর কইরা অনেক কিছু খাওয়াই দিল। রাইত বাড়তাছে আর যাওনের সময় কাছাইয়া আইছে।

আমি সবাইরে কইলাম, আমি পথ দিমু অহন। মায়ে আর দাদীজান তহন আমারে জড়াইয়া ধইরা কান্দন শুরু করলো। আমি সান্তনা দিয়া কইলাম, সুযোগ মতো মাঝে মইধ্যে আইয়া দেহা করুম, চিন্তা কইরো না। দোয়া কইরো, আমরা যেন যুদ্ধে জিততে পারি। মায়ে তখন কইলো, তুই যেদিন দেশ স্বাধীন করতে পারবি, হেই দিন আমার কাছে ফিরা আবি। এহন এই দেশ তোর মা, দেশ স্বাধীনের আগ পর্যন্ত আমি তোর সব দাবি ছাইড়া দিয়া দেশের কাছে সইপ্পা দিলাম। মায়ের কথায় সিনা টানটান হইয়া গেছে, শরীলে রক্ত ফুটতাছে। মায়ে আমার হাতে চিড়া, মুড়ি, গুড় আর নাড়–র একটা পুটলি ধরাইয়া কইলো, ক্ষিধা লাগলে খাইছ বাজান আর দাদাজানে আমারে বেশ কিছু খরচের টাকা দিয়া কইলো আরো লাগলে খবর পাঠাইছ। আর দেরী না কইরা সবাইরে পায়ে ধইরা সালাম কইরা পথ দিলাম নদীর ঘাটের দিকে। সখিনা গো বাড়ির রাস্তা পার হমু, এমুন সময় কেডা জানি আমারে পিছন থাইক্যা জড়ায়া ধরছে। বুঝতে পারতাছি কুনু মাইয়া মানুষের শরীল। চাপা স্বরে কইলাম, কেডা তুমি...??? তখন চাপা কান্দন সুরে কইয়া উঠলো, আমি সখিনা। আমার তহন মনে হইছিল, আসমান থাইক্যা মাটিত পড়ছি। যে সখিনার হাত ধরতে পারি নাই, ঠিক মতো কথাই কইতে পারি নাই, হে আইয়া আমারে জড়ায়া ধরছে!!
সখিনা আমারে কইতাছে, ‘তুমি আমারে ফালাইয়া একলা যুদ্ধে যাইতে পারবা না তোরাব ভাই, আমিও তোমার লগে যামু।’ আমি পিছন ঘুইরা সখিনার মুখের দিকে চাহিয়া দেহি কাইন্দা চোখ ভাসাইয়া লাইছে। তখন আমার মনে হইতাছিলো, শরীলডা অবশ হইয়া গেছে, জবানে আওয়াজ দিতে পারতাছিলাম না। তবুও বুকের মইধ্যে পাষাণ বাইন্ধা কইলাম, ‘তুই মোল্লাবাড়ির মাইয়্যা, তুই এতো রাইতে বাইরে আয়োন উচিত হইছে না।’ সখিনা আমার কথাডা শুইন্যা রাইগা কইলো, ‘আমি আর বাড়ি ফিরা যামু না। হয় তোমার সাথে যুদ্ধে যামু আর নয়তো দুই চক্ষু যেদিক যায়।’ আমি তহন আমার মহব্বতের কসম দিয়া কইলাম, ‘তুই যদি আমারে হাছা মহব্বত করছ, বাড়ি ফিরা যা কেউ দেহনের আগে। আমি তোরাব আলী রাইতের আইন্ধারে তোরে সাথে নিয়া দুই পরিবারের ইজ্জত মারতে পারুম না। আমি যুদ্ধ শেষে ফিরা আইয়া তোরে বিয়া কইরা ঘরে তুলুম। যা এই বার তুই বাড়ি ফিরা যা।’

কথাটা শেষ কইরা আমি এক মূহুর্ত না দাড়াইয়া হাটা শুরু করলাম। আমার বুকটা তহন ফাইট্যা যাইতাছিল। এমুন সময়ে সখিনা পিছন থাইক্যা কইয়া উঠলো, ‘তোরাব ভাই কথা দিয়া যাও, তুমি ফিরা আইবা।’ আমি তহন পিছন ফিরা কইলাম, ‘আমি তোরাব আলী তোরে জবান দিলাম, আমি যুদ্ধ শেষে ফিরা আমু।, ইনশআল্লাহ’ । সখিনা তহনও পথে বইসা কানতাছে, আমি আবার কইলাম, যা সখিনা, বাড়ি ফিরা যা। সখিনা তহন দাঁড়ায়া কইলো, ‘আমিও জবান দিলাম, তুমি না ফিরা আসা পর্যন্ত সারাজীবন তোমার অপেক্ষায় থাকুম।’ তহন আমার চোখের পানি আটকাইতে পারলামনা। আর কথা না বাড়াইয়া চোখের পানি মুছতে মুছতে নদীর ঘাটের দিকে পথ দিলাম। গিয়া দেখি সব দোস্তরা আমার আগেই আয়া পড়ছে। হগলে বুক মিলাইয়া তারপওে নৌকায় উইঠা যুদ্ধে যাওনের যাত্রা শুরু করলাম। নদী পার হইয়া রাইতের মইধ্যেই বর্ডার পার হইয়া ইন্ডিয়া ঢুইকা গেলাম মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিতে।

মুক্তি বাহিনীর ক্যাম্পে আমরা সবাই ট্রেনিং লইলাম। ট্রেনিং শেষে পঁচিশ জন কইরা বেশ কয়ডা গেরিলা গ্রুপ বানাইয়া দিলো। একটা গেলিরা গ্রুপে আমরা নয়জন দোস্ত আছিলাম, বাকিরা সবাই আছিল কলেজের ছাত্র আর একজন কলেজের স্যার। কইতে গেলে আমরা আছিলাম একটা নওজোয়ান গ্রুপ, সবাইর শরীলের রক্ত টকবগ করতাছে যুদ্ধের ময়দানে নামতে। আমাগো গ্রুপের কমান্ডার আছিল ওই স্যার আবীর আহমদ আর আমি আছিলাম গ্রুপের সহ-কমান্ডার। আমরা সবাইর হাতে অস্ত্র তুইল্যা দিয়া ক্যাম্পের ক্যাপ্টেন সবাইরে লইয়া শপথ বাইক্য পড়াইলো। শপথ পড়তে পড়তে রক্ত গরম হইয়া গেছে, শপথ বাইক্য শেষ কইরা সবাই এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ফায়ার করলাম দেশের নামে, এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ফায়ার করলাম মায়ের নামে, এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ফায়ার করলাম শহীদি ভাইয়েদের নামে, তারপর ক্যাম্প থাইক্যা বিদায় নিয়া গ্রুপে গ্রুপে ভাগ হইয়া রওয়ানা দিলাম যুদ্ধের ময়দানে।

যুদ্ধের ময়দানে আমরা মাইলের পর মাইল হাঁটছি, খাইছি কি না খাইছি। আমরা গাও গেরামের পুলাপাইন আছিলাম, তেমুন অসুবিধা অয় নাই কিন্তু ছাত্র পুলাপান এই কষ্ট সইতে পারে না, তবুও হার মানে নাই। ক্ষিধার জ্বালায় লতাপাতা খাইছি, আমার মায়ে আর দাদাজানে যদি দেখতো, কাইন্দা মইরা যাইতো। পাক বাহিনী আর রাজাকারদের লাইগ্যা জঙ্গলে জঙ্গলে রাইত কাটাইছি। আমরা এর মইধ্যে বেশ কিছু গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিছি, এর মইধ্যে চাইরটাতেই জিতছি কিন্তু আমাগো দোস্ত পরিমল, ছাত্র পুলা সোহেলরে হারাইছি। দুই জনেই একই দিনে শহীদ অয়। পরিমল আর সোহেলের লাশ কারো বাড়ি পাঠাই নাই, জঙ্গলেই নিজেরা বিনা কাফনে দাফন করছি। তহন ইংরাজি অক্টোবর মাসের শুরু, এমুন সময় হেড কোয়ার্টার থাইক্যা খবর আইলো, বড়ো একটা যুদ্ধের মিশন আছে, সবাই সাব-ক্যাম্পে যাওয়ার নির্দেশ পাওয়া মাত্র ক্যাম্পে ফিরা গেলাম।

এইবার আমাগো মিশন আছিলো, আর্মির বড়ো একটা ক্যাম্প দখল করা। হেইখানে বন্দি বাঙালি মা-বইনদের আর আটক বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাগো ক্যাম্প থাইক্যা উদ্ধার করা। সব মিলাইয়া আমরা সবাই পঁচাত্তর জনের একটা বড় গ্রুপ হইলাম। এই গ্রুপ পনেরো জনের পাঁচটা ছোটো ছোটো গ্রুপে ভাগ অইলাম। এইবার আমারে একটা ছোটো গ্রুপের কমান্ডার বানাইয়া দিলো। তারপর প্ল্যান মোতাবেক একদিন রাইতে গ্রুপে গ্রুপে ভাগ হইয়া বিভিন্ন দিক থাইক্যা সরাসরি পাক বাহিনীর ক্যাম্পে ঝাপইয়্যা পড়লাম, তবে খুব সাবধানে। যাতে কইরা শুয়রের বাচ্চারা বুঝতে না পারে। তহন হায়েনার বাচ্চারা বাঙালি মা বোনের ইজ্জত লইয়া ফুর্তি করতাছে আর রাজাকারের বাচ্চা গুলা ক্যাম্প পাহারা দিতাছে। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাগো উপর অমানবিক জুলুমবাজি চালাইতাছে।

প্রথমে আমরা দুই গ্রুপ সামনে আর পিছন দিকে পাহারা দেওয়া রাজাকারের বাচ্চা গুলার উপর হামলা করি আর দুই গ্রুপ এই ফাঁকে ক্যাম্পের দুই পাশ দিয়া ভিতরে ঢুইকা পড়ে। আরেকটা গ্রুপ ক্যাম্পের চাইর দিক ঘেরাও দিয়া রাখে। ক্যাম্পের ভিতরের আর্মিরা প্রস্তুতি নিতে নিতে আমরা হগলে পুরা ক্যাম্প ঘেরাও কইরা ফেলি আর যেদিকে আর্মি দেখি, ফায়ার করতাছি। এইভাবে একের পর এক আর্মি মারতাছি, আর বন্দি মা বইনদের চিল্লাইয়া কইছি আশেপাশে নিরাপদ দূরে সবাই একসাথে লুকাইয়া যাইতে। সবাই মিল্যা তাই করলো কিন্তু এর মধ্যেই পাক আর্মি পুরা প্রস্তুতি নিয়া আমাগো উপর পাল্টা হামলা শুরু করলো। ক্যাম্পে আমরা আগুন ধরাই দিলাম, তবুও কাম হইলো না। আসলে আমরার ধারণার থাইক্যা দ্বিগুণের বেশি পাক আর্মি আছিলো, প্রায় একশোর বেশি অইবো। তুমুল যুদ্ধ চলতাছে, বৃষ্টির মতো গোলাগুলি।

আর্মি যেমন মরতাছে, তেমন কইরা আমাগো পুলাপাইন গুলি খাইতাছে। এইটাই আছিলো আমাগো সবাইর প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ। হঠাৎ কইরা একটা গুলি লাগে আমার পায়ে তারপরে মাথায়, আর কিছুই কইতে পারি না। শুধু মনে আছে ওই দিন আমি একলাই পাঁচটা পাক আর্মিরে কতল করি। যহন আমার হুশ আইলো, তহন আমি ইন্ডিয়ার কোনু একটা হাসপাতালের বিছনাতে শুইয়া আছি। তহনও কিচ্ছু কইতে পারি না, আরো কিছু দিন গেছে এমুন কইরা। আস্তে আস্তে হগল কিছু মনে পড়ছে। আমি নার্স দিদির কাছে দেশের খবর জানলাম, আমরা নাকি যুদ্ধে জিতছি, পাক বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করছে। সাথে সাথে জয় বাংলা, জয় বাংলা কইয়া ছিল্লাইয়া উঠলাম। দেশে ফিরা আইতে অস্থির অইয়া গেলে, ডাক্তর সাব আমারে ছাইড়া দিলো। দেশে ফিরা সোজা বাড়ি ফিরা দেহি, বাড়ি আর বাড়ি নাই, একটা ধ্বংস লীলা অইয়া আছে।

আমার গেরামে ফিরা আইবার খবর পাইয়া আশেপাশের দুই চাইর জন আইয়া কইলো, মুক্তি বাহিনীর বাড়ি বইল্যা আমার দাদাজান, দাদী আর মায়েরে গুলি কইরা মাইরা এই বাড়ির ভিতরে আগুন লাগাইয়া সবাইরে পুড়াইয়া দিছে পাক আর্মি আর হারামী রাজাকারের বাচ্চারা। আমি রাগে কষ্টে চিল্লাইয়া উঠলাম, তারপর দৌড়াইয়া সখিনা গো বাড়ির দিকে গেলাম। সখিনা গো বাড়ির উঠানে দাঁড়াইয়া সখিনারে ডাকা ডাকি করতাছি। এমুন সময়ে সুরোজ চাচা কাছে আইয়া কইলো, সখিনারে পাক সেনারা ক্যাম্পে তুইল্যা নিয়া গেছে, তারপর আর ফিরা আহে নাই। তহন আমি আবার চিল্লাইয়া আকাশ পাতাল এক কইরা ফালাই। এরপর থাইক্যা মাইনষে আমারে পাগল কয়। অই পুলা, আমি কি পাগল, তোর কি তাই মনে অয়..??

আমি তখন দুচোখের পানি মুছতে মুছতে বললাম, আপনি পাগল নন, আপনি বীর মুক্তিযোদ্ধা। তখন তিনি আমাকে আবার বলে উঠে, ‘তাইলে তুই আমার দাদাজান, দাদী আর মায়েরে ফিরাইয়া দে... আমার সখিনারে ফিরাইয়া দে... সখিনা কইছিলো আমার লাইগ্যা সারাজীবন অপেক্ষা করবো। তোরা কেউ আমার দাদাজান, দাদী, মায়ে আর সখিনারে রক্ষা করতে পারলি না, তয় কি এই তোদের লাইগ্যা আমি দেশ স্বাধীনে গেছিলাম...’ এসব কথা বলতে বলতে আমাকে তিনি মারধর শুরু করলেন। সবাই মিলে উনাকে আমার কাছে থেকে সরিয়ে নিয়ে পাগল বলে মারতে শুরু করলে আমি সবাইকে বাঁধা দেই। তখন একজন বলে উঠলেন, ‘এই পাগলারে মুক্তিযুদ্ধের কথা জিগাইলেই হের পাগলামি শুরু অয়। আপনি নতুন মানুষ, জানেন না, তাই অযথাই হয়রানি হইলেন।’ আমি উনার পুরো গল্প শুনে এবং উনার পাগলামি দেখে বাক রুদ্ধ হয়ে গিয়ে ছিলাম। তিনি আমার সামনে দিয়ে সখিনা সখিনা বলে চলে যাচ্ছিলেন কিন্তু আমি উনাকে ডাকতেও পারছিলাম না। কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে উনার চলে যাওয়া পথের পানে তাকিয়ে ছিলাম আর দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।

কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
চৌধুরীপাড়া, মালিবাগ, ঢাকা।



লেখিকা হওয়ার গল্প

লেখিকা হওয়ার গল্প




লেখিকা হওয়ার গল্প
সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

মানুষের জীবনে হঠাৎ করেই এমন কিছু মোড় আসে, যা তার জীবনটা বদলে দেয়। এমনকি বদলে যায় তার পরিচিতি। আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে আমি ছিলাম একজন ষোড়শী যুবতী। তখনই আমার বিয়ে হয় আর আমি লাল শাড়ি পরে হয়ে গেলাম একজন নারী। বাপের বাড়ি ছেড়ে স্বামীর বাড়িতে যাওয়ার পর আমার নামটাও বদলে যায়। বাবার দেওয়া নাম সোনালী ইসলাম থেকে তখন স্বামী আসিফ রহমানের নামের শেষাংশ গ্রহণ করে হয়ে গেলাম সোনালী রহমান। বছর ঘুরতেই আমাদের প্রথম সন্তান জারিন এবং ঠিক তার দুই বছর পর দ্বিতীয় সন্তান তৌসিফের জন্ম। খুব দ্রুতই হয়ে উঠি দুই সন্তানের জননী। সংসার ও সন্তান সামলাতে গিয়ে লেখাপড়া একদম শিকে উঠে কিন্তু আমার বই প্রীতি ঠিকই থেকে যায়। যখনই সুযোগ পেতাম, আমার প্রিয় লেখকদের বই পড়তাম। তবে সাংসারিক চাপে বই পড়ার সুযোগ খুবই কম পেতাম। বিয়ের পাঁচ বছর পর স্বামীর হাত ধরে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যাই স্বপ্নের দেশ আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে। সেখানে শুরু হয় সম্পূর্ণরূপে এক নতুন জীবন। বলতে গেলে নতুন করে একটা জীবন যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে গা ভাসিয়ে কখন যে বাঙালি ললনা থেকে আমেরিকান মেম হয়ে গেলাম, সেটাই টের পাইনি। এক সময় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বাতিল করে আমেরিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ হয়ে গেলাম পুরোদস্তুর আমেরিকান। যদিও আমাদের মতো মাইপ্রেট করা নাগরিকদের এখানে বাঙালিই বলা হয়ে থাকে। এটা বলাটাই খুব স্বাভাবিক কারণ আমাদের পরিচয় বদলে নিলেও অনেকেই মনেপ্রাণে ষোলো আনা বাঙালি থেকে যায়। তাদের মধ্যে আমিও একজন। শাড়ির প্রতি আমার ভীষণ টান, প্রায়ই ছুটির দিনে জীবনানন্দের বনলতা সেন সেজে আয়নার সামনে বসে থাকি।

স্বপ্নের দেশ আমেরিকা থাকলেও সবার জীবন স্বপ্নের মতো রঙিন হয় না। কারো কারো জীবনের রঙ বেদনার ধূসর রঙে ঢেকে থাকে। এক কথায় বলা যায়, কষ্টের সাথে বারোমাস বসবাস। কষ্টকে নিয়তি মেনে চরিত্রহীন মাতাল স্বামীর অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেও শেষ পর্যন্ত আর সংসার টিকিয়ে রাখা গেল না। হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে নরক থেকে মুক্তি নিয়ে নতুন করে শুরু করি আরেক জীবন যুদ্ধ। আমার সন্তানেরা বড়ো হয়ে গেছে। তারা তাদের নিয়েই থাকে মহাব্যস্ত আর আমি কাজকর্মের ফাঁকে বইয়ের রাজ্যে। মাঝেমধ্যে সময় পেলে ফেসবুকেও কিছু সময় কাটাই কিন্তু ততোটা সময় হয়ে উঠে না। ফেসবুকে অনেক নামীদামি বাঙালি লেখক-লেখিকার সাথে আমার বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় ও ম্যাগাজিনে তাদের লেখা গল্প ও কবিতা ছাপা হয়। আমি তাদের লেখাগুলো ভীষণ মনোযোগ দিয়ে পড়তাম। মাঝেমধ্যে নিজেও ফেসবুকে টুকটাক লেখালেখি করতে চেষ্টা করতাম কিন্তু তেমন পেরে উঠতাম না। তাই আমার অধিকাংশ লেখাই ফেসবুকে ‘অনলি মি’ করে রেখে দিতাম। তবে হ্যাঁ, আমার পরিচিত বন্ধুদের কেউ কেউ আমার কিছু লেখা পড়ে বেশ প্রসংশা করে। যদিও ওই লেখাগুলো ছিল নিউইয়র্কে আমার চলার পথে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন মজার ঘটনাবলি। আমার কষ্টের জীবনে এসব লেখা লিখে এক ধরণের মানসিক প্রশান্তি অনুভব করতাম। তবে নিজে কখনো যে একজন লেখিকা হয়ে উঠবো, সেটা স্বপ্নেও কল্পনাও করিনি। যেদিন বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় পত্রিকার সাহিত্য পাতায় আমার লেখা গল্প ছাপা হলো, সেটা নিজেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার বন্ধুরা তো রীতিমতো ঠাসকি খেয়ে যায়। এমনকি ফেসবুকে আমার নামীদামি লেখক-লেখিকা বন্ধুরাও অবাক হয়ে যায়। তাদের অনেকেই ধারণা করেছিল, আমি হয়তো কোন ভাবে ম্যানেজ করে আমার লেখা গল্পটি ওই পত্রিকায় ছেপেছিলাম। নয়তো আমার লেখা কেন ছাপাবে? আমি তো কোন ভাবেই লেখিকা নই। ফেসবুকে মাঝেমধ্যে কিছু রম্য টাইপের লেখালেখি করি। এসব লিখে তো কেউ আর লেখিকা হতে পারে না। মজার ব্যাপার হলো, এক সময় দেখা গেল বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো শীর্ষস্থানীয় জাতীয় পত্রিকায় ও ম্যাগাজিনে আমার লেখা গল্পগুলো গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হতে থাকে। ধীরে ধীরে কিভাবে যেন আমিও একজন নামীদামি লেখিকা বনে গেলাম। এখন সবাই আমাকে ‘লেখিকা’ বলেই সম্বোধন করে। তবে হ্যাঁ, আমি লেখিকা হয়ে উঠার পেছনে একজন লেখকের গল্প জড়িয়ে আছে। যার একান্ত প্রচেষ্টায় আমার লেখিকা হয়ে উঠা।



ফেসবুকে সাঈদ জামানের সাথে আমার পরিচয়। তিনি খুব ভালো লিখেন এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় ও ম্যাগাজিনে নিয়মিত ভাবে তার লেখা প্রকাশিত হয়। আমি ছিলাম তার লেখার একজন একনিষ্ঠ ভক্ত। ফেসবুকে তার প্রতিটি লেখাই আমি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তাম। মাঝেমধ্যে আমার মুগ্ধতার কথা জানিয়ে মন্তব্য করতাম। হঠাৎ একদিন ফেসবুক নোটিফিকেশনে দেখলাম আমার একটি পোস্টে সাইফ জামান মন্তব্য করেছেন। আমি খুব উত্সাহ নিয়ে সেই মন্তব্য পড়ে অবাক হয়ে কয়েক মিনিটের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গিয়ে ছিলাম। তিনি মন্তব্য করে ছিলেন, ‘আপনার লেখায় যথেষ্ট মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। লেখাটা অব্যাহত রাখুন। মুগ্ধতা জানিয়ে গেলাম। ‘এমন মন্তব্য পড়ে ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো এমনিতেই আমার মতো ভক্তকে খুশি করতে এই মন্তব্য করেছেন। তবুও মনের কৌতুহল থেকে উনার ইনবক্সে গিয়ে নক করলাম।
কেমন আছেন। আপনার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, আপনার মন্তব্যটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে।
মেসেজ লিখে অপেক্ষায় রইলাম দীর্ঘ সময় ধরে কিন্তু তিনি অনলাইনে আসছেন না। অনলাইনে এসেও আমার মেসেজ পড়লেন না। মন খারাপ করে উত্তরের আশা ছেড়ে দিলাম। হঠাৎ দুদিন পর দেখি উনার মেসেজ।
প্রথমেই দুঃখিত, আপনার মেসেজ পড়তে দেরি হয়ে গেল। আলহামদুলিল্লাহ্ ভালো আছি। আমি কখনো মিথ্যা কিংবা বাড়িয়ে মন্তব্য করি না।
তাই নাকি! তাহলে কী সত্যি সত্যিই আমার ওই লেখাটি আপনার ভালো লেগেছে?
শুধু ভালো নয়, ভীষণ ভালো লেগেছে। আপনার বেশ কয়টি লেখা পড়ে ওই মন্তব্য করে ছিলাম।
আমার একদম বিশ্বাস হচ্ছে না। আমি তো আর আপনার মতো লেখক নই।
আমার চাইতেও অনেক ভালো লিখতে পারবেন। আপনি সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদের ভক্ত।
জ¦ী একদম ঠিক বলেছেন। আমি উনার অন্ধ ভক্ত। তবে আপনি সেটা কিভাবে বুঝলেন?
আপনার লেখা পড়েই বুঝতে পেরেছি। তবে হ্যাঁ, আপনার লেখায় নিজেস্ব ধাঁচ আছে। সেটাও আমাকে বেশ আকৃষ্ট করেছে।
কি বলছেন, কিছুই তো বুঝতে পারছি না। আমার লেখার নিজেস্ব ধাঁচ আপনাকে আকৃষ্ট করেছে।
নিজের উপর আস্থা রাখুন, নিয়মিত লেখালেখি করুন। আপনার রম্য লেখার হাত আছে। এইদিকে খুব ভালো করতে পারবেন।

সাঈদ জামানের সাথে কথা বলার পর গভীর চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমার কয়েকজন বন্ধুর সাথে এক আড্ডায় সাঈদ জামানের সাথে যেসব কথা হলো, সেসব নিয়ে আলোচনা করলাম। তারা সবাই খুব হাসাহাসি করলো। আমাকে টিপ্পনী কেটে বললো, সম্ভবত ওই লেখক লেখাতে নয়, আমার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। লেখকদের চরিত্র এমনই হয়, ভুলিয়ে ভালিয়ে নারীদের মন জয় করা। ওদের কথায় সাঈদ জামানের প্রতি আমার ভীষণ রাগ হলো। এরপর থেকে বেশ কিছু দিন তার কোন লেখাও পড়িনি। হঠাৎ একদিন আমার ইনবক্সে সাঈদ জামানের একটা মেসেজ পেলাম। মেসেজ দেখেই চমকে উঠলাম। আমার লেখা একটা গল্প বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকার রম্য ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। গুগুলে সার্চ দিয়ে দেখলাম ঠিক আছে। জীবনে এই প্রথম আমার লেখা কোন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, সেটাও কি-না এতো জনপ্রিয় একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে! তারপর সাঈদ জামানের সাথে যোগাযোগ করলাম। তিনি জানালেন, আমার টাইম লাইন থেকে গল্পটি নিয়ে কিছু সংশোধন করে ওই পত্রিকায় ইমেইলে পাঠিয়ে দিয়ে ছিলেন। তখন আমি উনার সাথে ঝগড়া শুরু করে দিলাম। কেন আমার অনুমতি ছাড়া আমার লেখা পত্রিকায় পাঠালেন। উনার আসল উদ্দেশ্য জানতে চাইলাম, কেন আমাকে ইম্প্রেস করতে চাইছেন। তিনি তখন ভীষণ বিরক্ত হলেন। আমাকে রাগান্বিত হয়ে বললেন, আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াতেই তিনি লেখাটা ঠিকঠাক করে পত্রিকায় পাঠিয়ে ছিলেন। এখানে অন্য কোন উদ্দেশ্যে নেই। ধীরে ধীরে আমরা দুজন বেশ ভালো বন্ধু হয়ে যাই। যদিও বয়সে সাঈদ জামান আমার চেয়ে বেশ ছোট কিন্তু তার ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ। লেখালেখির বিষয়ে আমাকে অনেক পরামর্শ দিত এবং বিভিন্ন ভাবে সহযোগিতা করত। আমি তার পরামর্শ ও সহযোগিতা পেয়ে আমার চারপাশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা থেকে একের পর এক রম্য গল্প লিখে যাচ্ছি।

একদিন সাঈদ জামান আমার ইনবক্সে বেশ কিছু ইমেইল এড্রেস দিলেন। তিনি জানালেন, এগুলো বিভিন্ন জনপ্রিয় পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের ইমেইল এড্রেস। আমি যেন আমার লেখা গল্পগুলো ইমেইলে পাঠিয়ে দিই। আমার ধারণা ছিল, আমার লেখা পত্রিকায় ছাপাবে না। তবুও সাঈদ জামানের চাপে গল্পগুলো বিভিন্ন পত্রিকায় ইমেইলে পাঠিয়ে দিলাম। কিছু দিনের মধ্যেই সবগুলো লেখা প্রকাশিত হয়। তখন সাঈদ জামান আমাকে ইনবক্সে বললেন,
এবার তো আমি ইমেইলে লেখা পাঠাইনি। তবুও কিভাবে এতোগুলো পত্রিকায় আপনার লেখা গল্প গুলো ছাপা হলো? রহস্যটা কি বলুন তো?
আমি তখন বেশ লজ্জা পেলাম। সেই সাথে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। কোন উত্তর না দিয়ে কিছু সময় চুপ করে রইলাম। তারপর উত্তর দিলাম,
নিজের উপর আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল। তবে শুধুমাত্র আপনার সহযোগিতার জন্যেই মনে হচ্ছে আমিও একদিন লেখিকা হয়ে উঠবো।
হা হা হা.. এখনো কী লেখিকা হতে পারেননি? আমার আর কোন সহযোগিতা আপনার দরকার নেই। আপনি এগিয়ে যান, শুভকামনা রইলো।
আমি সাঈদ জামানের মেসেজ পড়ে বেশ কষ্ট পেলাম। তিনি কেন যেন আমার থেকে দূরে সরে গেলেন। এদিকে পত্রিকা অফিস থেকে বিভিন্ন পত্রিকা অফিস থেকে আমার কাছে ইমেইল আসছে নতুন গল্প পাঠাতে। আমি তো অবাক হয়ে যাচ্ছি। অনেক উত্সাহ উদ্দীপনা নিয়ে নতুন করে গল্প লিখে ইমেইলে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আমার লেখাগুলো নিয়মিতভাবে ছাপা হচ্ছে। আমার ভক্তের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুজন প্রকাশক আমার লেখা গল্পগুলো দিয়ে বই প্রকাশের আগ্রহ প্রকাশ করে। আমি তখন খুশিতে আত্মহারা। যথা সময়ে বই দুটি প্রকাশিত হয় এবং বইমেলায় ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। বইমেলা উপলক্ষে আমি বাংলাদেশে গিয়ে ছিলাম। তখন আমাকে নিয়ে আমার ভক্তদের আগ্রহ দেখে অবাক হয়ে যাই। এতো সাধারণ একজন মানুষ, যার লেখাপড়াও খুব বেশি নয়। সেই মানুষের কাছে অটোগ্রাফ নিয়ে ভক্তরা বই কিনছে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকরা এসে ইন্টারভিউ নিচ্ছে। এটা যেন আমার কাছে অকল্পনীয়। যে মানুষটির জন্যে অকল্পনীয় ব্যাপারটি বাস্তব হলো, সেই মানুষটির সাথে আমার কখনো দেখা হয়নি। অনেক চেষ্টা করেও তার দেখা পাইনি। বর্তমানে আমার পরিচয়, আমি একজন জনপ্রিয় লেখিকা। তবে আমার লেখিকা হওয়ার পেছনের গল্পটাই সবার কাছেই অজানা।

কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
চৌধুরীপাড়া, মালিবাগ, ঢাকা



স্বপ্ন ভাঙ্গার গল্প...

স্বপ্ন ভাঙ্গার গল্প...


স্বপ্ন ভাঙ্গার গল্প
সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

আফজাল হোসেন ঢাকা শহরে একটি স্বনামধন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করে কোনো রকমে তৈরি হয়ে সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে যান, আবার রাত ৯টার মধ্যে বাসায় ফেরেন। অফিসে যাওয়া ও আসার মধ্যে রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে আটকে এক ঘণ্টার পথে তিন ঘণ্টা চলে যায়। তিনি এই বৃত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। এর বাইরে কোথাও সময় দেওয়ার মতো সময় তাঁর ছিল না। বিয়ের আগে অফিস ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে ঘণ্টাখানেক আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরতেন। কিন্তু বিয়ের পর বাসা, আর অফিস। ছুটির দিনে ঘুমিয়ে ও বাজার সদাই করে এবং পরিবারের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে তাঁর দিন কেটে যায়। বলতে হয় আফজাল সাহেবের নাগরিক জীবন এমনই নির্ঝঞ্ঝাট ছিল। নিজেকে আধুনিক ও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে অফিসের কলিগ ও বন্ধুদের অনুরোধে তিনি নিজের একটি ফেসবুক আইডি চালু করেন। প্রথম দিকে তেমন একটা সময় দিতেন না। মাস ছয়েক পর তিনি ফেসবুকে বেশ সক্রিয় হলেন। অফিস থেকে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে বিছানায় শুয়ে ফেসবুকে ঘণ্টাখানেক সময় দেওয়া অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল। ক্রমেই তিনি ফেসবুকের প্রতি ঝুঁকে গেলেন। এখন তিনি অফিসে, গাড়িতে বসে ফেসবুকে নিয়মিত সময় দেন। ঘণ্টা দুয়েক সময় ফেসবুকে না ঢুকলে তাঁর মধ্যে অস্থিরতা শুরু হয়। বর্তমানে তিনি এতে অনেকটাই আসক্ত বলা যায়।

চিরস্মরণীয়, বিস্ময়কর সাহিত্য প্রতিভা হেলেন কেলার

চিরস্মরণীয়, বিস্ময়কর সাহিত্য প্রতিভা  হেলেন কেলার



চিরস্মরণীয়, বিস্ময়কর সাহিত্য প্রতিভা 
হেলেন কেলার

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান

‘আমার দৃষ্টিদ্বয় তারা সরিয়ে নিল
যেখানে যা হওয়া উচিত ছিল
কিন্তু আমি স্মরণ করি মিল্টনের স্বর্গখনি,
আমার শ্রবণদ্বয় তারা সরিয়ে নিল
যেখানে যা হওয়া উচিত ছিল
বিটোফেন এসে মুছালো আমার চোখের পানি।
-হেলেন কেলার
(জন্ম: ২৭ জুন ১৮৮০ ইং- মৃত্যু: ১ জুলাই ১৯৬৮ ইং)

শারীরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের অনেকেই প্রতিনিয়ত হতাশায় ভোগে। কেউ কেউ হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে জীবনের অবসান ঘটাতে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। আর প্রতিবন্ধী হলে তো কোন কথাই নেই। সমাজের মানুষের করুণা নিয়েই প্রতিবন্ধীদের সারাটি জীবন বেঁচে থাকতে হয়। প্রতিবন্ধীদের বিধাতার চরম অভিশাপ হিসেবে দেখা হয়। তবে এই ধারণাটি মিথ্যা প্রমাণ করতে কিছু ব্যতিক্রম নজির থাকে, যা আমাদের কাছে হয়ে উঠে অবাক বিস্ময়। পৃথিবীর বুকে এমন কিছু বিস্ময়কর প্রতিভার আবির্ভাব ঘটে, যা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়েও অনেকেই নিজ প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে পৃথিবীর বুকে এমন কিছু অনন্য কীর্তি রেখে রাখেন, যা সুস্থ স্বাভাবিক মানুষেরও চিন্তার বাইরে। এমনি এক অবাক বিস্ময়কর প্রতিভার নাম হেলেন কেলার। তিনি ছিলেন একজন দৃষ্টি, বাক ও শ্রবণশক্তিহীন প্রতিবন্ধী। তবে নিজের শারীরিক অক্ষমতার জন্য তিনি দমে যাননি। বরং নিজের ভেতরের সুপ্ত প্রতিভা দিয়ে পৃথিবীর বুকে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চির স্মরণীয় হয়ে আছেন। এই মহীয়সী নারী একাধারে ছিলেন একজন খ্যাতিমান সাহিত্যিক, মানবতাবাদী সমাজকর্মী, রাজনীতিবিদ ও জনপ্রিয় বক্তা। শারীরিক সব অক্ষমতাকে প্রচন্ড মানসিক শক্তি দিয়ে কিভাবে জয় করতে হয়, তিনি সেটা শিখিয়ে গেছেন। পৃথিবীর সকল প্রতিবন্ধীদের অনুপ্রেরণা ও আত্মবিশ্বাসের নাম হেলেন কেলার। সারা বিশ্ব জুড়ে আছে তার বিরল প্রতিভার খ্যাতি। অনন্য সাহিত্য প্রতিভা দিয়ে সাহিত্যিক হিসেবে পৃথিবীর বুকে নিজের নামটি স্বর্ণাক্ষরে লিখে গেছেন। সাহিত্যিক হেলেন কেলারের রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ১২ টি। এর মধ্যে প্রধান গ্রন্থ গুলো হচ্ছে ‘দি স্টোরি অফ মাই লাইফ, লেট আস হ্যাভ ফেইথ, দি ওয়ার্ল্ড আই লিভ ইন, ওপেন ডোর ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিশপ্ত বিড়ম্বনা জীবনের বিষাদের ওপর একটি চলচ্চিত্র (ডেলিভারেন্ট-১৯১৯) নির্মাণ করেন। এই চলচ্চিত্রে তার নিজের ভূমিকায় তিনি নিজেই অভিনয় করেছেন। অসম্ভবকে সম্ভব করা হেলেন কেলার বলতেন, ‘অন্ধত্ব নয়, অজ্ঞতা ও অনুভূতিহীনতাই দুনিয়ার একমাত্র দুর্ভেদ্য অন্ধকার।

১৮৮০ সালের ২৭ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা তাসকাম্বিয়া গ্রামে হেলেন কেলার জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আর্থার কেলার এবং মায়ের নাম কেইট অ্যাডামস। পিতা আর্থার কেলার ছিলেন সামরিক বিভাগের একজন অফিসার। পিতামাতার খুব আদরের সন্তান ছিলেন হেলেন। শৈশবে তিনি ছিলেন ভীষণ চঞ্চল প্রকৃতির কিন্তু তার এই চঞ্চলতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র ১৯ মাস বয়সেই হেলেনের জীবনে একটি মারাত্মক দূর্ঘটনা ঘটে। গোসল করানোর সময় মায়ের কোল থেকে হঠাৎ পড়ে যান শিশু হেলেন। সেই আঘাতে সাময়িক জ্ঞান হারানোর পর তা ফিরে এলেও তার মা লক্ষ্য করলেন তার আদরের সন্তানের দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি একেবারেই লোপ পেয়েছে। নিরুপায় পিতামাতা তখন শরণাপন্ন হলেন ডাক্তারের নিকট। ডাক্তার অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানালেন তার এই শারীরিক বিপর্যয়ের কারণ হলো মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর আঘাত। মা-বাবা প্রাণপ্রিয় কন্যার জীবনের আশা-ভরসা ছেড়ে দিলেও একেবারে ভেঙে পড়েননি। হেলেনের চিকিৎসা করা শুরু করেন। বহু চিকিৎসার পর হেলেনের জীবন রক্ষা পায়। কিন্তু তার কথা বলা, শোনা এবং দেখার শক্তি চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়। ছয় বছর বয়সে হেলেনকে নিয়ে পিতা আর্থার যান ওয়াশিংটনের আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের কাছে। ইনিই হলেন যোগাযোগ প্রযুক্তির অগ্রদূত টেলিফোন আবিষ্কারক বেল। প্রাথমিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বেল জানালেন হেলেন আর কোনোদিন চোখে দেখতে এবং কানে শুনতে পারবে না। তবে গ্রাহাম বেল হেলেনের তীক্ষè বুদ্ধিমত্তা দেখে আর্থারকে হেলেনের জন্য যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পরামর্শ দিলেন। যাতে স্বাভাবিক জীবনের কাছাকাছি একটি সুন্দর জীবন ফিরে পেতে পারে হেলেন।

বেলের পরামর্শ অনুযায়ী বোস্টনের পার্কিনস ইন্সটিটিউশনে হেলেনকে ভর্তি করা হয়। এই প্রতিষ্ঠানটির কাজ ছিল অন্ধদের শিক্ষাদান করা। এর প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার হো হেলেনের শিক্ষা গ্রহণের ভার নিজ হাতে তুলে নেন। তিনি হেলেনকে স্নেহ দিয়ে লেখাপড়া শেখাতে শুরু করেন। কিন্তু অকস্মাৎ ডাক্তার হো মারা গেলে হেলেনের পিতামাতা পুনরায় তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় পড়েন। তখন পার্কিনস ইন্সটিটিউশনের নতুন ডিরেক্টর পদে দায়িত্ব নেন মাইকেল এ্যাগানোস। তিনি হেলেনের সমস্ত কথা শুনলেন এবং অ্যানি সুলিভ্যান ম্যানসফিল্ড নামের এক গৃহশিক্ষিকার হাতে হেলেনের জীবনকে আলোকিত করার দায়িত্ব দেন। অ্যানির কাছে শিশু হেলেন হাতে স্পর্শের মাধ্যমে জগত চিনতে লাগলেন। আস্তে আস্তে হেলেন অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সব শিখে নিতে থাকেন। লুই ব্রেইল আবিষ্কৃত ব্রেইল পদ্ধতির মাধ্যমে হেলেন লেখাপড়া শিখতে শুরু করেন। কয়েক বছরেই হেলেন ইংরেজি, ল্যাটিন, গ্রীক, ফরাসি এবং জার্মান ভাষায় পারদর্শী হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে সে ব্রেইল টাইপ রাইটারে লিখতে শেখে। হেলেন এগারো বছর বয়সে এক বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে কথা বলার চর্চা করতে থাকে। ধীরে ধীরে চিকিৎসার মাধ্যমে তার বাকশক্তি অনেকটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। ১৯০০ সালে হেলেন রেডক্লিফ কলেজে ভর্তি হন। সেখানে বিশ্বখ্যাত লেখক মার্ক টোয়েনের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। ১৯০৪ সালে হেলেন প্রথম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হিসেবে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

বিশ বছর বয়সে হেলেন সাহিত্য, দর্শন, ধর্ম, ইতিহাসে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। কলেজে পড়াকালীন তিনি লিখেন তার প্রথম আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘ঙঢ়ঃরসরংস’। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি লিখেন তার আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ 'ঞযব ংঃড়ৎু ড়ভ সু ষরভব'ষরভব'। যেখানে তিনি তার জীবনের বিপর্যয়, লড়াই, অ্যানির কাছ থেকে শিক্ষালাভ, তার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসার জীবনচিত্র তুলে ধরেন তার অপূর্ব লেখনীতে। আর এই রচনার মধ্য দিয়ে তিনি ব্যাপক খ্যাতিও অর্জন করেন। লোকের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে থাকে হেলেনের নাম। বলতে গেলে, এই গ্রন্থ রচনার পরেই তিনি একজন সুপ্রতিষ্ঠিত লেখিকা হয়ে উঠেন। তারপর হেলেনকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তখন ছিল শুধু সামনের দিকে এগিয়ে যাবার। হেলেন একের পর এক গ্রন্থ রচনা করেন এবং তার প্রতিটি গ্রন্থ পাঠকের মাঝে ব্যাপক সাড়া সৃষ্টি করে। জীবনের নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে হেলেন সাংবাদিক পেশায় তার কর্মজীবন শুরু করেন। ভালোই চলছিল সবকিছু কিন্তু রাজনৈতিক প্ররোচনায় হেলেনের লেখার নামে বিভিন্ন সমালোচনা ও কুৎসা রটতে থাকে। তারপর হেলেন ঠিক করলেন সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে দেবেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেওয়া এবং তা থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে জীবনধারণ করবেন। তার বক্তৃতায় সূক্ষ্মতা ও চিন্তার গভীরতা দেখে মুগ্ধ হন শ্রোতারা। কিছুদিনের মধ্যেই হেলেনের অসংখ্য অনুরাগী ভক্ত তৈরি হয়। সেই সময়ে আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় বক্তা মার্ক টোয়েনের সহযোগিতা পান। একই মঞ্চে টোয়েনের পাশাপাশি হেলেনও বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ পান। ক্রমেই হেলেন একজন জনপ্রিয় বক্তা হয়ে উঠেন। বিভিন্ন দেশ হতে বক্তব্য প্রদানের জন্য হেলেনের আমন্ত্রণ আসতে থাকে। তিনি যখন যে দেশ গিয়েছেন, সে দেশের মানুষই তাকে অকুণ্ঠ ভালোবাসা আর শ্রদ্ধায় সিক্ত করেছে। এভাবেই দেশ-বিদেশে বাড়তে থাকে তার অনেক অনুরাগী ভক্তের সংখ্যা। এই  বিস্ময়কর নারীর প্রতিভা দেখে রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ সকলেই মুগ্ধ হতেন। তিনি প্রচন্ড রাজনীতি সচেতন ছিলেন। নারীদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে তিনি ছিলেন সোচ্চার। সবাইকে লিঙ্গগত বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানাতেন। সর্বোপরি, নিজের কঠিন জীবন সংগ্রামের গল্প বলে সাধারণ মানুষের মনে আত্মবিশ্বাস ও অনুপ্রাণিত জোগাতেন।

হেলেন দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও সঙ্গীত উপভোগ করার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল। স্বাভাবিক মানুষের চেয়েও বেশি সঙ্গীত উপভোগ করতেন। বাদ্যযন্ত্রের ওপর হাত রেখেই বলতে পারতেন কী ধরনের সুর বাজছে। গায়ক-গায়িকার কণ্ঠে হাত দিয়ে অনায়াসে বলতে পারতেন কী সঙ্গীত গাইছে। তার এমনই আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল যে, বহুদিনের পরিচিত মানুষের সঙ্গে করমর্দন করে বলে দিতে পারতেন তার পরিচয়। দৃষ্টিহীন হয়েও তিনি নৌকা চালাতে, নদীতে সাঁতার কাটতে পারতেন, খেলতে পারতেন দাবা ও তাস। এমনকি তিনি সেলাই পর্যন্ত করতে পারতেন। হেলেন সমাজসেবার ব্রত নিয়ে তার মতো আরও যারা বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী রয়েছেন, তাদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করে গেছেন। ১৯১৫ সালে জর্জ কেসলারকে সঙ্গে নিয়ে হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। সংস্থাটি এখনও বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। হেলেন এই প্রতিষ্ঠান ছাড়াও পৃথিবীর বহু দেশের বিভিন্ন সংস্থার সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। বিভিন্ন সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দিয়ে যা অর্থ পাওয়া যেত, তা দিয়ে বিভিন্ন দেশে পঞ্চাশটিরও বেশি অন্ধদের কল্যাণার্থে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন হেলেন। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সাহায্য পেয়ে হাজার হাজার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ শিক্ষালাভ করেছে। নিজেকে সফলভাবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে। হেলেন রাজনৈতিক বিষয় নিয়েও লেখালেখি করেছেন। তিনি ছিলেন আমেরিকান সোশ্যালিস্ট পার্টির সমর্থক। ১৯০৯ সালে তিনি এই পার্টিতে যোগ দেন। তিনি আয়ের সুষম বণ্টন দেখতে চাইতেন। ধনতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অসমতার শেষ দেখাই ছিল তার ইচ্ছা। তার বই ‘আউট অব দ্য ডার্ক’-এ এই ইচ্ছার কথা লিখে গেছেন তিনি। প্রতিটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ইউজিন ভি ডেবসের সমর্থন পেয়েছিলেন। ১৯১২ সালে তিনি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ডে যোগ দেন। তিনি ছিলেন একজন প্যাসিফিস্ট এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার জড়িত থাকার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তবে ১৯৪১ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের অনুরোধে হেলেন বিভিন্ন হাসপাতালে যুদ্ধাহত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাবিক ও সৈনিকদের দেখতে যেতেন এবং শান্তি ও আশার বাণী শোনাতেন।

হেলেন কেলারের সাথে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সুসম্পর্ক ছিল। রবীন্দ্রনাথ হেলেনকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। নোবেল প্রাপ্তির পর আমেরিকার এক সম্মেলনে বক্তৃতা দেয়ার আমন্ত্রণ পান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। হেলান কেলারের সাথে সেখানেই তার পরিচয়। হেলেন রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে শান্তিনিকেতনে যাওয়ার আমন্ত্রণ পান। তবে রবীন্ত্রনাথ ঠাকুরের জীবিত থাকা অবস্থায় হেলেন শান্তিনিকেতনে আসতে পারেননি। ১৯৫৫ সালে ভারতে আসেন হেলেন। সেই সময়েই দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয় হেলেনকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করে। ১৯৫০ সালে হেলেনের পঞ্চাশ বছরের কর্মময় জীবনকে সম্মান জানাতে প্যারিসে এক বিরাট সংবর্ধনা সভার আয়োজন করা হয়। তখন তার বয়স সত্তর বছর। ১৯৫৯ সালে হেলেন জাতিসংঘ কর্তৃক বিশেষ সম্মানে ভূষিত হন। ১৯৬৮ সালের ১ জুলাই হেলেন কেলার চলে যান পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান। তবে তিনি পৃথিবীর মানুষের কাছে আজও বিস্ময়কর প্রতিভা। হেলেন কেলার এমনই এক নাম যা অন্ধ, বিকলাঙ্গ, প্রতিবন্ধী মানুষের কাছে এক আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। যুগে যুগে এই মহীয়সী নারীর রেখে যাওয়া দৃষ্টান্তই হোক সকলের পথচলার মন্ত্র। প্রচ- ইচ্ছেশক্তি মানুষকে যে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, তার এক জ্বলন্ত উদারহণ হেলেন কেলার। তিনি কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ভরে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

সৈয়দ আসাদুজ্জামান সুহান
কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
সম্পাদক, ত্রৈমাসিক আমাদের গল্পকথা।
চৌধুরীপাড়া, মালিবাগ, ঢাকা।